হৃদয়ের পদ্মবনে – ১২

১২

পার্কিং লটে ভিড় বাড়ছে। থার্টি-ফার্স্ট নাইট এখানেই পালন হবে অনেকের। আজ ভাতের দোকানে ভিড় একটু কম থাকায় ঋজু সেখানেই ঢুকে গেল। ডাল, আলু ভাজা, পনিরের তরকারি। খেতে খেতে আটটা পনেরো বাজল।

হলে ঢুকে দেখল মাসি রীতিমতো মিশ্রজির ক্লাস নিচ্ছেন। কাঁচা হিন্দিতে যা বুঝিয়ে যাচ্ছেন তার সারমর্ম দাঁড়ায়—‘এখানে অনেক লোক আসে, আমি কিন্তু বাথরুম পরিষ্কার চাই। বাথরুম সাফ না থাকলে আমি অ্যাপে কমপ্লেইন করে দেব।’

মিশ্রজি বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় নাড়ছেন।

ঋজু তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। মিশ্রজিকে সবাই কেয়ারটেকারই ভাবে। মাসিও ভেবেছেন।

বেনারসের একটা অংশ এখন ভিড় করে গোধূলিয়া রোড ধরে ফিরছে। কেউ ঘুমিয়েছে, কেউ ঘুমোয়নি।

কলকাতায় থাকলে এই সময়টাই একা লাগত বেশি। মন খারাপ হতো। দিশাহীনতা গলা টিপে ধরত। এখানে এত বেশি ঘুরছে, রাত হলে ক্লান্তিতেই চোখে ঘুম নেমে আসছে।

শীতের রাত, এই ঘরগুলোয় এমনিতেই বাইরের শব্দ বেশি আসে না।

ফ্যান না চলার ফলে পাশের ঘরের কথা এ ঘরে আসছে। আগের দিন সে ক্লান্ত ছিল বলে পাশের ঘরে কে কী বলছে, তার কিছুই শুনতে পায়নি। এসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন কথা শোনা যাচ্ছে।

এই মুহূর্তে মাসির গলা পাচ্ছে। মেসোকে বলছেন, ‘তুমি একা একা কোথাও যাবে না। ঠিক আছে? শুনতে পাচ্ছ কী বলছি? কী খেয়েছিলে বিকেলে বেরিয়ে? এখনো তো বললে না?’

মেসো উত্তর দিচ্ছেন না। ঋজু কণ্ঠস্বর শুনে দৃশ্যটা কল্পনা করল। মেসো ভিজে বেড়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। মাসি ঝেড়ে যাচ্ছেন। বেচারা নিপাট ভদ্রলোক।

ঝিমলির গলা শোনা গেল, ‘থামো না মা! এই জন্য আমি আসতে চাইনি। তোমরা যেখানেই যাবে, শুধু ঝগড়া করবে।’

মেসো বললেন, ‘ঝগড়া কোথায় দেখছিস? এক পক্ষ ঝেড়ে যাচ্ছে, আরেক পক্ষ শুনে যাচ্ছে।’

ঋজুর অস্বস্তি হল, এই ঘরে যদি সবই শোনা যায়, তাহলে তার সম্পর্কে যা বলবেন, তাও শুনতে পাবে সে।

আর কিছুক্ষণ পরেই একত্রিশে ডিসেম্বর পড়ছে। আবার একটা বছর চলে গেল। একটা সময় রেজোলিউশন বানাত সে। এখন ঝিম মেরে পড়ে থাকে। যে বছর যাবার, এমনিই চলে যায়। কম্বল মুড়ি দিয়ে গান চালিয়ে দিল ফোনে, কোনো শব্দ শোনার দরকার নেই। অহেতুক মনের উপর চাপ না দিলেই হল।

ঘুমিয়ে পড়েছিল গান শুনতে শুনতেই, ঘুম ভেঙে গেল দরজা ধাক্কার শব্দে। ঝিমলির গলা পাওয়া যাচ্ছে, বেশ আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর, ‘ঋজুদা, এই ঋজুদা!’

ঋজু উঠে বাইরে এসে বলল, ‘কী হয়েছে?’

ঝিমলি বলল, ‘বাবা কেমন করছে। এসো প্লিজ।’

ঋজু তড়িঘড়ি পাশের ঘরে গেল, মেসো খাটে বসে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। মাসি পায়চারি করছেন। ঋজু বলল, ‘কী হয়েছে?’

মেসো করুণ গলায় বললেন, ‘বুঝতে পারছি না। গ্যাস হয়েছে মনে হয়।’

ঋজু বলল, ‘মিশ্রজিকে দেখছি না। দাঁড়ান। ডাক্তার দেখাতে হবে।’

মেসো বললেন, ‘না না। ডাক্তার লাগবে না। ও এমনিই সেরে যাবে।’

মাসি রেগে গেল, ‘তুমি থামো। ও ঠিকই বলছে।’

মেসো চুপ করে গেলেন।

ঋজু ঘর থেকে বেরিয়ে স্টোর রুমের দরজা ধাক্কাল। একটু পর দরজা খুলে মিশ্রজি বেরিয়ে এলেন। ঋজু ডাক্তারের কথা বলায় মিশ্রজি সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করে একটু কথা বলেই জানালেন, এই বিল্ডিংয়েই একজন ডাক্তারবাবু আছেন। তিনি শিগগিরি আসছেন।

মাসি ঋজুকে বলল, ‘সত্যি আসবে তো? নাকি হাসপাতালে নিতে হবে?’

ঋজু বলল, ‘আসবেন। মিশ্রজি এখানকার পুরোনো মানুষ। অনেক চেনাশোনা। এই বাড়িসহ বেনারসে অনেক বাড়ি আছে ওঁর। উনি বললে নিশ্চয়ই আসবেন।’

মাসিও তার মতোই অবাক হলেন, ‘মানে? উনি কেয়ারটেকার নন?’

ঋজু বলল, ‘না।’

মাসি গম্ভীর হয়ে গেলেন।

মিনিট দশেকের মধ্যেই ডাক্তারবাবু এলেন। বেশ কিছুক্ষণ মেসোকে দেখে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘বাইরে বেরিয়ে অনেক কিছু খেয়েছেন জানালেন। গ্যাস হয়ে গেছে, কাল সকালে পারলে একটা ইসিজি করে নেবেন। তবে আমার মনে হয় না ওসব কিছু আছে। তাও, জাস্ট সেফ সাইডে থাকার জন্য বললাম।’

মাসি রেগে গেলেন। থমথমে মুখে ঝিমলিকে বললেন, ‘দেখেছিস? আমি তো জানি বাইরে খেয়ে এসেছে। যেভাবেই হোক এই বাইরে খাওয়াটা কমাতে হবে।’

ঋজু কিছু বলল না। সে নিজে দেখেছে মেসো কী খেতে পারেন, তবে সেটা মাসি জানলে এখন তুলকালাম লেগে যাবে।

ডাক্তারবাবু ভিজিট নিয়ে চলে গেলেন। মেসো ঘর থেকে বেরিয়ে হলে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘আজকাল কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। ডাক্তারকে বললাম বাহার মত বোলো, সব বলে দিল।’

মাসি গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে গেলেন। ঝিমলি বলল, ‘জানো ঋজুদা, পুজোর সময় বাবা বাইরে এগরোল খেয়ে এসেছিল, সে কী পেট খারাপ! জানে বাইরের খাওয়া সহ্য হবে না, তবু খাবে।’

মেসো বললেন, ‘থাম থাম। বাইরের খাওয়া। কী এমন খাচ্ছি? তোর মা দিনরাত সেদ্ধ খাইয়ে খাইয়ে আমার মাথা খেয়ে নিল।’

ঋজু বলল, ‘আপনার ঠিক লাগছে তো? সেরকম হলে এমারজেন্সিতে নিয়ে যাওয়া যায়।’

মেসো ঋজুর কথা ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন, ‘না না, ওসব কিছু না। গ্যাস থেকেই হয়েছে। তুমি ঘুমোও গিয়ে। বিরক্ত করলাম।’

ঋজু হলেই চেয়ার নিয়ে বসে বলল, ‘ঠিক আছে। ঘুম যখন ভেঙেছে, একটু বসেই যাই। আপনি হাঁটুন।’

ঝিমলিও বসল, বলল, ‘কোথাও বেড়াতে এসে বাবা এত দিন সুলভ খুঁজে বেরিয়েছে। এবার যা খেল দেখাল, তাতে এরপর থেকে মা বাবার হাত-পা বেঁধে ফেলবে নির্ঘাত। তুমি না থাকলে কী যে হতো ঋজুদা।’

ঋজু বলল, ‘ধুস, মিশ্রজি ছিলেন তো। আমি না থাকলে কিছুই হতো না। মিশ্রজি বেনারসের খুব মান্যিগণ্যি মানুষ। আমরা যারা বাইরে থেকে আসি, তারা বুঝতে পারি না।’

মেসো বললেন, ‘কপালে থাকলে ভালো মানুষ এভাবেই জুটে যায়। ভালো কাজ করতে হয়। আমি ভালো কাজ করেছিলাম বলেই তো! তোরা মা আর মেয়ে বুঝবি কী করে? সারাক্ষণ আমার পেছনে লেগে আছিস!’

ঝিমলি গলা নামিয়ে বলল যাতে তার মা শুনতে না পায়, ‘হুঁহ! থামো। আর ভালো লাগে না। কোথায় কলেজের গ্রুপটার সঙ্গে যেতাম, তা না, তোমাদের ঝগড়ার মধ্যে পড়ে গেলাম’

ঋজু হাসল। তাদের যখন বিয়ে হয়েছিল ঝিমলি তখন ছোট ছিল। এখন কেমন বড়দের মতো কথা বলছে।

মেসো একটু হেঁটে নিয়ে বললেন, ‘এবার ঘুমিয়ে পড়ি। কনফিডেন্স পাচ্ছি বুঝলে? আসলে কোথায় একটা পড়লাম, বুক ব্যথা মাত্রেই গ্যাস নাও হতে পারে। ওই জন্যই ভয় হয়। তোমায় খামোখা…।’

ঋজু বলল, ‘বেশ করেছেন। দরকারে আবার ডাকবেন। এবার ঘুমিয়ে পড়ুন সবাই মিলে।’

ঝিমলি বলল, ‘কাল ভোরে মন্দিরে যাবার কথা ছিল। হবে না মনে হয়।’

মেসো বললেন, ‘না না, হবে না কেন? সব হবে। আমি ফিট আছি। ভাবিস না, আমি এবার টোটাল কন্ট্রোলে থাকব। আর চিন্তার সুযোগই দেব না।’

ঝিমলি বলল, ‘হুঁ, তাহলেই হয়েছে। চলো।’

মেসোকে নিয়ে ঘরে ঢুকল ঝিমলি। ঋজুও নিজের ঘরে প্রবেশ করল। রাত সাড়ে বারোটা বাজে এখন। ঘুম ভেঙে গেল, আবার কি সহজে আসবে? পাশের ঘর থেকে মাসির গলা পাওয়া যাচ্ছে। ঋজু হেডফোন বের করে কানে দিল।

তার একটা কথা মনে হল হঠাৎ করেই। আঁখি বলত, মানুষের সঙ্গে যা হয়, তা অনেক হিসেব কষেই হয়।

এই যে মাসিদের সঙ্গে এখানে দেখা হল, সেটা কেন হল? কার হিসেবে হল? তার পুরোনো ক্ষতকে জাগানোর জন্য হল?

পৌষালি অনেকগুলো মেসেজ করেছে সারাদিনে। রিপ্লাই দেওয়া হয়নি। আবার মেসেজ করতে শুরু করেছে এখন, ‘তুমি কি আমাকে আর রিপ্লাই দেবে না ঋজু?’

ঋজু লিখল, ‘নেটওয়ার্কের একটু প্রবলেম চলছে। কলকাতায় ফিরে দেব না হয়।’

‘হুঁ। তুমি আমাকে অ্যাভয়েড করছ, আমি বুঝতে পারছি।’

‘না না। অ্যাভয়েড করব কেন? টাওয়ার না থাকলে কী করব?’

‘ওকে। এখন কথা বলবে?’

‘খুব ঘুম পেয়েছে। কাল কথা বলি?’

উত্তরের অপেক্ষা না করে ফোন ফ্লাইট মোডে দিয়ে দিল ঋজু। নইলে এখন পৌষালি আবার মিসড কল মারতে শুরু করে দেবে…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *