৭
ঘাটে গিয়ে ঋজুর ‘শিশু ভোলানাথ’ কবিতাটা মনে পড়ে গেল। ছোট ছোট ছেলেরা ভোলানাথ সেজেছে। মেয়েরা পার্বতী। তাদের মায়াভরা চোখ উপেক্ষা করে কার সাধ্যি! পাঁচ টাকা, দশ টাকা দিতেই খুশি। এই সময় অসসি ঘাটে আরতি হয়। সেদিকে আর গেল না ঋজু। খানিকটা রাস্তা ঘুরে মণিকর্ণিকা ঘাটে গিয়ে বসল। শ্মশান থেকে যত দূরে বসা সম্ভব। হাওয়া দিলেও মনোরম পরিবেশ।
এই সময় কাপল কাউন্সেলিংয়ের কথা মনে পড়া উচিত নয়। তবু মনে পড়ে গেল। তার উপর আঁখির যে এত রাগ আছে, বোঝেনি সে। নিজেরই খারাপ লাগছিল তখন। অপরাধী মনে হচ্ছিল নিজেকে। মনে হচ্ছিল, তার সঙ্গে না থাকলেই ভালো থাকবে আঁখি। আঁখির সন্তান চাই, তার চাই না, দু’পক্ষের টাগ অফ ওয়ারে শেষ অবধি বিচ্ছেদ জিতে গেল।
এখন আঁখি ভালো আছে। মেয়ে হয়েছে তার। মাঝে মাঝে ফেসবুকে আঁখিকে দেখত ঋজু। একদিন আঁখি তার প্রোফাইল লক করে দিল। আঁখিকে আর দেখা গেল না।
ঠিকই তো করেছে। দেখবে কেন? উঁচু প্রাচীর পেরিয়ে আঁখিকে দেখাটা বন্ধ করা দরকার ছিল। চলে যাবার পরই আঁখিকে দেখাটা অভ্যাস হয়ে উঠছিল। ঋজু নিজেই বুঝতে পারত, না দেখলে অস্বস্তি হয়। নিজেই বুঝতে পারত এবার দেখাটা বন্ধ করা দরকার। শুরুতে কষ্ট হতো। বাড়ির একা ঘরটা তাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছে, বহুদিন লেগেছে স্বাভাবিক যাপনে ফিরতে।
মণিকর্ণিকার আগুন সে দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ঋজু বিভোর হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। না চাইতেও আগুন দেখা দিচ্ছে তাকে। এই শীতের সকালের গঙ্গা, ঘাটে মানুষের ভিড়, বাচ্চাদের দৌড়োদৌড়িতে আর উঠে যেতে ইচ্ছে করছিল না তার। এই জন্যই কি যৌবনের পরেই বানপ্রস্থকে উপেক্ষা করে সন্ন্যাস নিয়ে এখানেই এত জন গেরুয়া জড়িয়ে ফেলেছেন? এখানে বসে যে পরম শান্তির অনুভূতি সে পাচ্ছে, তা তো উপেক্ষা করার মতো নয়। কোনোভাবেই নয়।
কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া মানে তো রোবটের মতো কতগুলো দ্রষ্টব্য স্থান দেখে খাওয়া-দাওয়া করে ফেরার পথ ধরা হতে পারে না।
সেই পরিবেশে দেহ মন যতক্ষণ না সম্পূর্ণ ডুবে যাচ্ছে, ততক্ষণ সে জায়গাটা তার হল কই? গঙ্গা তো তাদের কলকাতাতেও আছে, চাইলে কত বার গঙ্গার ধারে গিয়ে বসতে পারত, কেন মাঝে মাঝেই অফিসফেরতা বসেনি? এত কাছে, এত সহজে কত কিছু তার সামনেই ছিল, অথচ সে ওই রোবটই হয়ে গেছে।
ঋজু ঠিক করল শহরে ফিরে এবার থেকে মাঝে মাঝেই গঙ্গার কাছে গিয়ে বসবে। গঙ্গার কাছে গিয়ে বসার অর্থ তো সেই গঙ্গোত্রী থেকে ভেসে আসা এ নদীর দীর্ঘ যাত্রাপথেরও সঙ্গী হওয়া।
ঋজু মাথা ঘুরিয়ে দেখল সোমনাথের স্ত্রী। খানিকটা বিরক্ত লাগলেও সে মুখে সেটা প্রকাশ না করে বলল, ‘ভোরে এসেছি। সোমনাথ কোথায়?’
‘ও হোটেলেই আছে। আমি একা একা হাঁটতে এলাম।’
সোমনাথের স্ত্রী তার পাশে বসে পড়ল। ঋজুর অস্বস্তি হলেও কিছু বলল না সে।
‘আপনার বন্ধু আপনাকে আমার নাম বলেনি। আমার নাম অম্বালিকা। কাল কি আপনি রাগ করেছিলেন?’
ঋজু মাথা নাড়ল, ‘না না। রাগ করার কী আছে?’
‘থাকতেই পারে। কী বলতে কী বলেছি। আমার জটিল মনের রোগ আছে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় গোটা পৃথিবী আমাকে ঘিরেই ঘুরছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। কাকে কী বলে দিই আমি নিজেই জানি না।’
এ কথার কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না ঋজু। শুধু বলল, ‘ও।’
‘ভয় পাচ্ছেন?’
‘না না। আপনি একা বেরিয়েছেন, ওরা চিন্তা করবে না?’
‘মা-বাবা চিন্তা করতে পারে। আপনার বন্ধু করবে না। ওর আমাকে আর পছন্দ না।’
‘না না, এরকম কেন হবে? আপনার ভুল ধারণা হয়েছে।’
‘আমার এখন মাথা ঠিক আছে কিন্তু। আমি সজ্ঞানেই কথা বলছি। আপনার বন্ধুর আর আমাকে ভালো লাগে না। বউ বুড়ি হয়ে গেলে ছেলেদের আকর্ষণ কমে যায়। আপনার বন্ধুর সেটা হয়েছে। একটু জিগ্যেস করে দেখবেন, বলে দেবে কার সঙ্গে প্রেম করছে। নাকি বলেছে?’
সোমনাথের বউ উৎসুক হল।
ঋজু বলল, ‘না না, আমাকে কেন বলবে? তাছাড়া সোমনাথ যথেষ্ট সংসারী ছেলে। এসব কথা ও ওর সুদূর কল্পনাতেও আনবে না।’
‘ভুল বললেন, হয় আপনি খুব ধূর্ত, নয় আজকালকার দিনের লোকেদের ভালো করে চেনেনই না। এরা সামনে এক রকম। পেছনে আরেক রকম। আপনি নিশ্চিত তো, আপনার বন্ধু আপনি না থাকলে আপনার সম্পর্কে খারাপ কথা বলে না?’
ঋজু বলল, ‘আমি নিশ্চিত। আমি ওকে ছোটবেলা থেকে চিনি। ওর কিছু বলার থাকলে আমার মুখের উপর বলবে।’
‘তাহলে ঠিক আছে। চা খাওয়ান তো!’
ঋজু শ্বাস ছাড়ল। কতক্ষণ এসব সহ্য করতে হবে বুঝতে পারছে না সে।
একজন ভ্রাম্যমাণ চা-ওয়ালাকে ডেকে চা নিল সে। অম্বালিকা বলল, ‘ছেলেরা বড় অদ্ভুত। বিয়ের আগে এক রকম, বিয়ের পরে আরেক রকম। বিয়ের আগে যে লেভেলের অ্যাটেনশন তারা দেয়, বিয়ের পরে মনে হয় তারা তাদের বউকে চেনেই না। এই যদি বিয়ের আগে ফোন করে আমাকে না পেত, অস্থির হয়ে যেত। অথচ সেই কখন বেরিয়েছি হোটেল থেকে, আপনার বন্ধুর কোনো ফোনই নেই। কেমন টেকেন ফর গ্র্যান্টেড ভেবে নেয় সবাই।’
ঋজু এর উত্তরে কী বলবে? চুপ করে রইল। অম্বালিকা বলল, ‘আপনি ডিভোর্স করেছেন কেন?’
‘বলুন। আমার শোনার ইচ্ছে করছে। শুনতে ইচ্ছে করলে আমার পেট ফুলতে শুরু করে। সমস্যা হয়। বলুন।’
‘সম্পর্কটা জমে ওঠেনি। ঝগড়া হতো। রোজ রোজ ঝামেলা। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে লেগে যেত।’
‘ওহ। আপনি তাহলে সিংহ টাইপ মানুষ। ঝগড়া করেন। আমার বর হল ভাল্লুক টাইপ। মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ে। বাচ্চা পয়দা হয়ে গেছে, দায়িত্ব শেষ। এখন বউ বাচ্চা মানুষ করবে আর সে অফিস থেকে এসে ঘুমিয়ে পড়বে।’
ঋজু বলবে না বলবে না ভেবেও বলে ফেলল, ‘আপনি জীবন সম্পর্কে একটু বেশি নৈরাশ্যবাদী।’
‘জীবনই আমাকে সেরকম করে দিয়েছে। এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই।’
একটা বাচ্চা এসে জিগ্যেস করছে নৌকো চড়বে নাকি। অম্বালিকা বলল, ‘চড়বেন?’
ঋজু ঘাবড়ে গেল, ‘না না।’
অম্বালিকা বলল, ‘তা বটে। বন্ধুর বউয়ের বাচ্চা টাচ্চা হয়ে গেছে। যৌবন থাকলে বারণ করতেন না নিশ্চয়ই।’
ঋজুর কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করল। এ মেয়ের মুখে কিছুই আটকায় না। সে বলল, ‘আমি বরং আসি। সেই সকালে বেরিয়েছি তো, বাথরুম যেতে হবে।’
‘ওহ। এর মধ্যেই পেয়ে গেল! তা তো পাবেই। যান।’
ঋজু আর দাঁড়াল না। হনহন করে হাঁটতে শুরু করল। অম্বালিকার সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলা সম্ভব না। মাথায় সমস্যা থাকুক আর যেখানেই সমস্যা থাকুক, কথাগুলো এমন জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে তার যাওয়া উচিত না।
ঘাটের রাস্তাতেই হেঁটে যাচ্ছিল সে, দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে গিয়ে দেখল এক সাধুবাবা তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। সে দাঁড়াবে না দাঁড়াবে না করেও দাঁড়িয়ে পড়ল। সাধুবাবা হাত নেড়ে তাকে ডাকলেন। সে এগিয়ে গিয়ে হিন্দিতে বলল, ‘কিছু বলবেন?’
সাধুবাবা ফিকফিক করে হাসতে হাসতে তাকে ইশারা করে চলে যেতে বললেন। ঋজু অপ্রস্তুত হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। যারা ধ্যান করেন, তারা একটা সময় মানুষের ভেতরটা দেখতে পান। উনি কি বুঝতে পেরেছেন অম্বালিকা তাকে কী বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছিল? সেই জন্যই কি ওভাবে হাসছিলেন? তাই হবে।
গরম গরম কচুরি ভাজা হচ্ছে দেখে ঋজু আর লোভ সংবরণ করতে পারল না। বসে পড়ল। এক প্লেট কচুরি আর একটা মালাইও খেয়ে ফেলল। বেনারসে শীতকালে মালাইওর চাহিদা তুঙ্গে থাকে। তাছাড়া এখন ফুড ভ্লগিংয়ের যুগ। সব কিছুই ভ্লগিংয়ের মাধ্যমে হাইপ করা হয়। কে কখন কীভাবে বিখ্যাত হয়ে যায়, কেউ জানে না। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক আসার পর প্রতিষ্ঠান-সর্বস্বতা কমেছে।
সোমনাথের ফেসবুক প্রোফাইল দেখেছিল সে। অম্বালিকার প্রোফাইলটা দেখবে নাকি? ফোন বের করে সার্চ করল। হ্যাঁ, প্রোফাইল আছে। কিন্তু লক করা।
ঋজু কি আসলে অসুস্থ? নইলে সব কিছুতে লোকের সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্রোফাইল খোঁজে কেন? একটা সময় ছিল যখন আঁখির প্রোফাইলে সারাদিন পড়ে থাকত সে। আঁখি কিছু পোস্ট করত, সেটা যদি সামান্য আক্রমণাত্মক পোস্ট হয় তার প্রতি, বা তার মনে হল সেটা তাকেই ইঙ্গিত করা পোস্ট, তার প্রবল অস্বস্তি হতে শুরু করত।
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক যে জীবনের এত গভীরে প্রভাব ফেলতে পারে, সে জানত না। সে বুঝত, তার অবচেতন চায় আঁখি খুব খারাপ থাকুক। ওর সব কিছু শেষ হয়ে যাক। পরে নিজেই লজ্জিত হয়েছে। মনে হয়েছে, দূরে গিয়ে তাহলে ঠিকই হয়েছে। যাকে কোনো একদিন ভালোবেসেছে সে, তার এত বড় সর্বনাশ চাইল কী করে?
আঁখি বাঁচিয়েছে তাকে নিজের প্রোফাইল লক করে।
গোধূলিয়া চকে হাঁটতে হাঁটতে আবার নিজের ডেরায় ফিরল সে। একটু গড়িয়ে নিল। ঘুম ভাঙল ফোনের রিঙে। সোমনাথ ফোন করছে। ধরল সে, ‘বল।’
‘শোন না, একটা সমস্যায় পড়েছি।’
‘কী হয়েছে?’
‘আরে আমার বউ সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিল, তারপর প্রায় চার ঘণ্টা হয়ে গেছে, এখনও ফোনে পাচ্ছি না। এখন দেখছি ফোনটা হোটেলেই ফেলে গেছে। কী করব বল তো? আমার তো মাথা কাজ করছে না।’
ঋজু স্তম্ভিত হয়ে গেল।
