১৬
ঋজু তার ঘরে গিয়ে শুয়েছিল। পাশের ঘর থেকে ক্রমাগত কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
সে কিছুক্ষণ পর বাইরে বেরোল, মিশ্রজি দুঃখিত মুখে বসেছিলেন।
ঋজু বলল, ‘আমি একটু আসছি। ওদের কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে ফোন করবেন।’
মিশ্রজি ঘাড় নাড়লেন।
বাইরে বেরিয়ে ঋজু বড় করে শ্বাস নিল। হোমস্টে’র ভেতরটা গুমোট হয়ে গেছে। শহরে মানুষের ঢল নেমেছে। এখন দুপুর তিনটে বাজে।
শহর থামে না, পৃথিবী থামে না। শুধু কিছু মানুষের জীবন থমকে যায়। ঋজু ক্লিনিকের দিকে রওনা দিল। গেটের সামনে এসে বেশ কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে অনেকটা শ্বাস নিয়ে ক্লিনিকের ভেতরে ঢুকল। রিসেপশনিস্টকে বলল, ‘সকালে একজন ইসিজি করে গেছিলেন। তার গ্রাফটা দরকার। উনি মারা গেছেন।’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘ওকে স্যার, টেকনিশিয়ান এখনও আছেন। আমি ওনাকে ডাকছি।’
রিসেপশনিস্ট টেকনিশিয়ানকে ডেকে পাঠাল। ঋজুর মুখ থেকে খবরটা শুনে ভদ্রলোক দুঃখিত গলায় বললেন, ‘আমি ওঁকে তখনই বলেছিলাম হাসপাতালে গিয়ে একজন ডাক্তার দেখিয়ে নিতে। বললেন দেখাবেন। ওঁর হার্ট রেট ঠিক ছিল না, কার্ভটাও স্পষ্ট বোঝাচ্ছিল হার্ট ঠিক নেই। আমি জিগ্যেসও করেছিলাম কাকে নিয়ে এসেছেন। বললেন একাই এসেছেন। আমি আর কিছু বলিনি। ভেবেছিলাম বুঝে যাবেন। এখানে এত পেশেন্ট থাকে, আলাদা করে তো অ্যাটেনশন দেওয়া যায় না, কিন্তু ভদ্রলোক আমাকে বললেন তখনই গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাবেন। আমিও আর বেশি ঘাটাইনি।’
ঋজুর চোখে জল চলে এসেছিল, সে বলল, ‘আমাকে গ্রাফটা দেওয়া যাবে?’
ভদ্রলোক ভেতর থেকে গ্রাফটা নিয়ে ঋজুকে দিলেন। সে ডাক্তার নয়। কিছুই বুঝবে না। তবু দেখল। একটা গ্রাফে আঁকিবুঁকি কাটা একটা কার্ভ… লোকটা কিছুতেই নিজের শরীর খারাপ সেটা মেনে নিল না? এ তো আত্মহত্যার সামিল!
ঋজু রাস্তায় বেরিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে কিছুক্ষণ হেঁটে চন্দনদাকে ফোন করল, চন্দনদা ফোন ধরে বলল, ‘হ্যাঁরে, চিন্তা করিস না। আমি ফিরে যাব। তুই কোথায়?’
ঋজু বলল, ‘ঘাটের দিকে যাচ্ছি। গিয়ে বসব।’
‘ঠিক আছে। যা। সাবধানে থাক। আমি যাব সন্ধের দিকে তোর ওখানে।’
‘ঠিক আছে।’
ঋজু হাঁটতে হাঁটতে দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে এসে বসে চা নিল। চা-ওয়ালা তাকে চিনে গেছে। প্রথম অম্বালিকাই চা খেতে চেয়েছিল তার কাছে। কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে গেল আবার।
চেয়ার পাতা হয়েছে ঘাটে। সন্ধ্যারতি হবে। অভ্যাসমতো সে চেয়ারের কাছে আসতেই দেখল এর মধ্যেই ভিড় হয়ে গেছে। ঋজু পাশের অহিল্যাবাই ঘাটে গিয়ে বসল। শীত করছে। এখানে বেশিক্ষণ বসে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে। জ্যাকেট আনতে ভুলে গেছে সে।
ঋজুর কি প্রথমেই উচিত ছিল হোটেল পালটে নেওয়া? নিয়তিতে যা ছিল, তাই হল। শুধু এখন আরেকটা প্রস্তুতি নিতে হবে তাকে। আঁখি আসবে, ওর বর আসবে। ওদের পরিবার আসবে।
আজকের রাতটা গুরুজির ওখানে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই কথাটা চন্দনদাকে বলা হয়নি।
বলতে হবে। আজ বেনারসে আর কোথাও থাকার জায়গা পাওয়া যাবে না। গোটা পৃথিবীর লোক মনে হয় এখানেই চলে এসেছে।
ঋজুর খিদে পাচ্ছে। কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না। মাসি আর ঝিমলিও কিছু খায়নি। তার হয়তো খেয়ে নেওয়া উচিত। কিন্তু পারছে না। অস্বস্তি হচ্ছে।
কতগুলো ছবি চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ফুটে উঠছে। ও বাড়ির সবাই যখন তাকে ঘেন্নার চোখে দেখেছে, মাসিও দেখেছিলেন, মেসো দেখেননি। কেমন অনায়াসে আপন করে নিয়েছিলেন।
প্রতিটা নদীর দুটো পাড় থাকে, প্রতিটা গল্পের দুটো দিক থাকে। মেসো সেটা বুঝেছিলেন। শুধু বেনারসেই না, বিয়ের সময়েও মেসো যেভাবে জমিয়ে রেখেছিলেন, তা ভোলার নয়। শ্বশুরবাড়ির সুখস্মৃতির সিংহভাগ জুড়ে মেসোই আছেন। সে লোকটার এই পরিণতি মেনে নেওয়া যায় না।
এখানে আসার পর থেকেই ঋজু শুনেছে বেনারসে মৃত্যু হলে আর পরের জন্ম হয় না। মানুষ সরাসরি স্বর্গে যায়। মেসোর মতো মানুষের পরজন্ম হওয়া দরকার। এই দিন দিন স্বার্থপর হয়ে যাওয়া নীচ মানুষে ভর্তি পৃথিবীতে মেসোর মতো মানুষের দরকার। সমস্যা হল, তারাই এখন সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছেন।
নিজের অজান্তেই আবার চোখে জল চলে এসেছিল তার, একজোড়া খুদে শিব-পার্বতী সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাত পেতে হাসছে, ঋজু পকেট থেকে দশ টাকা বের করে দিল। মহাদেব সেজে থাকা বাচ্চা ছেলেটা এসে তাকে একবার জড়িয়ে ধরে চলে গেল।
তার সঙ্গে ওদের রোজই দেখা হয়েছে। দারিদ্র্যের তাগিদে ছোটবেলাটা ঘাটেই কেটে যাচ্ছে ওদের। ছেলেটা কেন জড়িয়ে ধরল তাকে? তার চোখের জল দেখতে পেয়েছিল? তাই হবে হয়তো। ভোলানাথ মাঝে মাঝে কাছ থেকেই এভাবে ছুঁয়ে দিয়ে যান হয়তো, বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করে, অবিশ্বাসীরা করে না। কিন্তু এখন এই আচমকা জড়িয়ে ধরাটার দরকার ছিল ঋজুর।
শীতের বিকেল দ্রুত শেষ হচ্ছে, নদীতে নৌকো ভিড় করছে, ঘাটের সামনে মানুষের ভিড় বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। ঋজু উঠে পড়ল। ভিড় ঠেলে ফেরার পথ ধরল। রাস্তায় একদল তুমুল ঝগড়া করছে, কেউ ‘হর হর মহাদেব’ বলতে বলতে এগোচ্ছে, চাট ভাণ্ডারের সামনে এখন থেকেই ভিড় হয়ে গেছে, মিষ্টির দোকানগুলোতেও কম ভিড় নেই।
মেসো এই খাবারের দোকানগুলো দেখলেই পাগল হয়ে যেতেন। বেশি করে মাখন দেওয়া স্ট্রিট ফুডের দোকানটার সামনে একবার থমকে গিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল ঋজু।
ভিড়ের উলটো দিকে যেতে যেতে ঋজু ক্লান্ত হয়ে এক সময় দাঁড়িয়ে পড়ল। রিকশায় যেতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু এ রাস্তায় রিকশা ঢুকতে দেবে না। আগে থেকেই ব্যারিকেড করে দিয়েছে। এখানে শুধু মানুষ যাবে।
ঋজুর মনে পড়ল মেসো এলাহাবাদ যাবার কথা বলছিলেন। ভাগ্যিস মাসি যাননি! মাঝরাস্তায় খুব বড় সমস্যায় পড়ে যেতেন তখন।
হোমস্টে’র সামনে এসে চন্দনদার দেখা পেল সে। চন্দনদা তাকে দেখে বলল, ‘চারজন ফ্লাইটে আসবে, সন্ধের মধ্যেই ঢুকে যাবে। বাকিরা শুনলাম কাল ভোরে আসবে। কাল সকালেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তুই কিছু খেয়েছিস?’
ঋজু মাথা নাড়ল, ‘না। ওরা কী খাবে?’
চন্দনদা বলল, ‘আমি দেখছি। তুই খেয়ে নে।’
ঋজু বলল, ‘রাতে তোমার ওখানে থাকতে হবে আমাকে। এখানে তো…’
চন্দনদা থামিয়ে দিল, ‘সে আবার বলতে? ওসব নিয়ে ভাবিস না।’
ঋজু বলল, ‘ভাগ্যিস তুমি ছিলে চন্দনদা।’
‘ওরকম বলিস না। এগুলো সব আগে থেকে ঠিক হয়ে থাকে। ভদ্রলোক অনেক পুণ্য করেছিলেন। এখানে এসে তার পরিবারের কোন কষ্ট হল না।’
ঋজু বলল, ‘লোকটাই রইল না চন্দনদা। কষ্ট তো সারাজীবন থেকে যাবে। এসব তো সাময়িক।’
চন্দনদা মাথা নাড়ল, ‘না রে, সব কিছুর সময় থাকে। ভদ্রলোকের সময় হয়েছিল। তুই বুঝবি না। আমি বুঝি। একটা সময় দড়ি নিয়ে বন্ধ ঘরে ফ্যানের তলায় অনেকটা সময় কাটিয়েছিলাম তো! ভেবেছিলাম টার্ম ইনসিওরেন্স আছে, আমি মরলে ফ্যামিলিটা বেঁচে যাবে। হয়নি। ওটা আমার মরার সময় ছিল না।’
ঋজু শিউরে উঠল, ‘এসব কী বলছ তুমি?’
চন্দনদা বলল, ‘একটুও বাড়িয়ে বলছি না। ঠিক তার পরদিন গুরুজির সঙ্গে দেখা হল। কোনো ম্যাজিক দেখাননি, কোনো বুজরুকি নেই। খুব স্পষ্ট কয়েকটা কথা বলেছিলেন সেমিনার রুমে। সেদিনের পর থেকে আর আমি ওসব কথা ভাবিনি। জীবন তো একটাই। এত সহজ নাকি সব শেষ করে দেওয়া? লড়ে যেতে হবে। তোদের কলকাতায় একটা স্লোগান ছিল না—লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই। জীবনের মূল কথা ওটাই। লড়াই চাই। আর লড়াই ছাড়া কিচ্ছু নেই। ফার্স্ট টু লাস্ট, এভ্রিথিং ইজ স্ট্রাগল। স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স। বাঁচতেই হবে আমাদের। যে করেই হোক বাঁচতে হবে।’
সন্ধে নামছে। চন্দনদা একপ্রকার জোর করে তাকে মিষ্টি খাইয়ে দিল।
চন্দনদা বলল, ‘তুই ব্যাগ গুছিয়ে নে। চল দেখি।’
ঋজুকে নিয়ে চন্দনদা আবার ঋজুর ঘরে এল।
আঁখিরা এলে রাতটা অন্তত এই ঘরে শুতে পারবে। মিশ্রজি জানালেন পরদিন তার ঘরে আরেক জনের বুকিং আছে, সকাল এগারোটায় ঘর ছেড়ে দিতে হবে। সেই বুকিং ক্যান্সেল করা যাবে না। তবে পাশের গলিতে আরেকটা হোটেল আছে মিশ্রজির, সেখানে দুটো ঘরের ব্যবস্থা করে দেবেন।
মাসি ঘর থেকে বেরোলেন। একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেছেন। ঋজুকে বললেন, ‘তুমি কি চলে যাচ্ছ?’
ঋজু বলল, ‘আমি দাদাদের ওখানে উঠছি। এখানে ওরা এসে থাকতে পারবে।’
ঝিমলি ঘর থেকে বেরিয়ে প্রায় ছুটে এসে ঋজুর হাত ধরে বলল, ‘তুমি থাকো ঋজুদা। প্লিজ থাকো।’
এই সময়েই গেট থেকে আঁখিরা ঢুকল। আঁখি ঋজুকে দেখে থমকে দাঁড়াল।
ঋজু বলল, ‘দিদিরা এসে গেছে ঝিমলি। ওরা আমার ঘরে থাকুক। আমি ভোরে চলে আসব। ভেব না।’
আঁখিকে দেখে ঝিমলি আবার কাঁদতে শুরু করল। আঁখি ঝিমলিকে জড়িয়ে ধরল, ‘আয়। এ ঘরে আয়। একটু বসি।’
আঁখির সঙ্গে আঁখির বর এসেছে। বাবাও এসেছেন। ঋজু চন্দনদাকে বলল, ‘চলো চন্দনদা।’
চন্দনদা মাসিকে বলল, ‘আমার নাম্বার মিশ্রজিকে দিয়েছি। কোনো সমস্যা হলে ফোন করবেন। আর মিশ্রজি তো আছেনই।’
মাসি ঘাড় নাড়লেন।
দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে এল ঋজু।
আঁখি মুখোমুখি হবার পর থেকে তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে…
