১১
দুপুরে খাবার পর ফিরে গিয়ে ঋজু দেখল মাসি, মেসো আর ঝিমলি তৈরি হয়ে বেরোচ্ছে। তাকে দেখে মাসি গম্ভীর হয়ে গেলেন। ঋজু ওদের দিকে না তাকিয়ে তালা খুলে ঘরে ঢুকল। আজ একটু বিশ্রাম নেবার পরিকল্পনা আছে তার। এত দিন যতগুলো আট ঘণ্টার ঘুম হয়নি, সেই সব ঘুমগুলোকে উসুল করে ঘুমাতে হবে।
বাথরুমে গিয়ে হাত-পা ভালো করে ধুয়ে ঘরে এসে যখন শুয়ে পড়ল, তখন দুপুর দেড়টা। ঘুম ভাঙল সাড়ে তিনটেয়। দুপুরবেলা ঘুমালে একটা বিচ্ছিরি মন খারাপ হয় তার। এই সময়টা কিছুই ভালো লাগে না। সব কিছু অর্থহীন বলে মনে হয়।
ফোনটা হাতে নিয়ে একবার আঁখির প্রোফাইল দেখল সে। সেই তালা ঝোলানোই আছে। হোয়াটসঅ্যাপের প্রোফাইল পিকচার সরিয়ে দিয়েছে। এর অর্থ তাকে ব্লক করাও হতে পারে। অম্বালিকার যাবার সময়ের কথাটা মনে পড়ল ঋজুর, ‘বিয়ে করে নিন।’
অম্বালিকার কেন মনে হল তার আবার বিয়ে করা উচিত? বিয়ে না করে সন্ন্যাস নিয়ে নিলেই তো ভালো হয়। এই বয়সে বিয়ে হলে বাচ্চা যখন মাধ্যমিক দেবে, তখন কি সে বেঁচে থাকবে? এত নিয়ম কানুন মেনে তো সে কোনোকালেই চলতে পারে না। দু’দিন খাবার দাবার কন্ট্রোল করে খাবে, তিন দিনের দিন আজেবাজে কিছু খেয়ে নেবে, একদিন এভাবেই বড় কোনো রোগ হয়ে পৃথিবী থেকেই যাবার সময় হয়ে যাবে।
বিয়ে করে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার কি কোনো মানে হয়?
ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল মেসো পায়চারি করছেন। তাকে দেখে অপ্রস্তুত হাসি হেসে বললেন, ‘তিনটে হোটেল দেখলাম। কোথাও ফাঁকা নেই। আমারই হয়েছে জ্বালা।’
ঋজু বুঝল তার মতো মাসিও এই ঘরটা ছাড়ার কথা ভেবে ফেলেছেন। সে বলল, ‘এখন সিজনের চূড়ান্ত সময় চলছে। পাবেন না কিছু।’
মেসো বললেন, ‘অগত্যা তাই করতে হবে।’
একবার নিজের ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে মেসো ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে এখন পুপাইয়ের কথা হয়?’
ঋজু মাথা নাড়ল, ‘না না। সেসব কিছু হয় না।’
মেসো বললেন, ‘ওহ। সব কিছুই অত্যন্ত আনফরচুনেট। কেউই তো তোমরা খারাপ ছিলে না। শুধু মিলমিশ হল না কিছুতেই। বিয়ে করবে আর?’
ঋজু বলল, ‘ওসব নিয়ে ভাবিনি।’
মেসো তেতো মুখে বললেন, ‘কী দরকার? ভালোই তো আছ। এখন কি আবার বেরোবে?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘যাও। ঘুরে এসো। ছাড়া গোরু এখন। আমি তো একটা মিষ্টিও খেতে পারলাম না। সব সময় কটমট করে তাকিয়ে আছে। আর ইয়ে, এখানে খেয়েছ?’
মেসোর কণ্ঠস্বর আরও নেমে গেল। ঋজু মাথা নেড়ে বলল, ‘নাহ। ইদানীং খুবই কম খাওয়া হচ্ছে।’
‘শরীর সচেতন হয়েছ?’
‘খানিকটা।’
‘ঠিক আছে। ঘুরে এসো।’
‘আপনারা ঘুরলেন না? বেরিয়েই চলে এলেন নাকি?’
‘হ্যাঁ। দুপুরে খেয়ে ঘুমাচ্ছে তো ওরা। আচ্ছা, চলো দেখি, তোমার সঙ্গে বেরোই। ঢোকার সময় আলাদা আলাদা সময়ে ঢুকে পড়ব না হয়।’
ঋজু হাসল, ‘ঠিক আছে।’
তার ঘরে সে তালা দিয়ে মেসোর সঙ্গে বেরোল। রাস্তায় বেরিয়ে মেসো বড় করে শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘উফ, আগে চলো তো বাবা।’
তাকে একপ্রকার টানতে টানতেই মিষ্টির দোকানে নিয়ে গিয়ে দুটো মালাইও আর প্রায় দুশো গ্রাম রাবড়ি খেয়ে, এক গ্লাস জল খেয়ে শ্বাস নিয়ে মেসো বললেন, ‘আহা, শান্তি হল এই বারে। মনে হচ্ছিল জেলে ছিলাম। একা একা বেরিয়েও খাওয়া যেত, কিন্তু সাহস হল না।’
ঋজু বলল, ‘আপনার সুগার কত?’
‘যতই হোক। হেঁটে মেক-আপ দিয়ে দেব। এবার যেন শরীরে একটু বল পাচ্ছি। চলো হেঁটে নিই।’
সদর্পে তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেছেন ভদ্রলোক। কিছুটা যাবার পর বললেন, ‘বিয়েটা ভেঙে যাওয়ায় আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আমার কারও ডিভোর্স শুনলেই খারাপ লাগে অবশ্য। আজকাল তো ঘরে ঘরে ডিভোর্স। এই একটা বিয়ে খেয়ে এলাম, পরে শুনি ডিভোর্স হয়ে গেছে। ডিভোর্স না মহামারী, বোঝা শক্ত। তোমার পয়েন্ট অফ ভিউটা অবশ্য আমি জানি না। তুমি চাইলে আমায় বলতে পারো কিন্তু।’
ঋজু ম্লান হেসে বলল, ‘কী বলব বলুন তো? আর কিছু বলার নেই। আঁখি এখন নতুন সংসার করছে, প্রাউড মাদার, এখন আমি কী বলি বা না বলি, তাতে কি কিছু যায় আসে?’
মেসো বললেন, ‘তোমার বাড়ির লোক? বাবা-মা কিছু বলেনি?’
‘খারাপ লেগেছে ওদের। ওই অবধিই। বেশি ভেতরে ঢোকেনি কেউই।’
‘ওহ। মডার্ন ফ্যামিলি।’
‘মডার্ন ঠিক না। তবে রোজ রোজ ঝগড়া দেখে ওরাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আঁখির সঙ্গে আমার নিত্য দিনের ঝগড়া ওরাও আর নিতে পারছিল না। কোনোদিন আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি, কোনোদিন আঁখি। কোনো কিছুই মেটার কোনো নাম ছিল না। সব মিলিয়ে সব হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল। শেষে সবাই যেন বাঁচল।’
‘এমনি এমনি ঝগড়া করেছে? কোনো কারণ ছিল না?’
‘ছিল। আমিই দায়ী হয়তো সব কিছুর জন্য। মাসি আপনাকে কিছু বলেনি এসব ব্যাপারে?’
মেসো চিন্তিত হয়ে পড়লেন, একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘বলেছে হয়তো। সব কথা তো শুনি না। অফিস থেকে ফিরে অন্যের সংসার ভাঙার খবর কে-ই বা শুনতে চায়? যখন বলেছে, তখন হয়তো টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তোমার মাসিও তো ওই একই, অফিস থেকে ফেরার পর থেকেই চিৎকার। এখানে জুতো কেন, সেখানে জামা কেন, প্রথম প্রথম মনে হতো, আরে অফিস থেকে এত টায়ার্ড হয়ে ফিরলাম, একটু তো কনসিডার করো। তা করবে কেন?
‘পরে বুঝলাম ব্যাপারটা ওদের দিক থেকেও দেখা উচিত। সব পক্ষের কথা শোনা উচিত।
‘ডিভোর্সের খবরটা শোনার পর আমি চেয়েছিলাম তোমার সঙ্গে কথা বলতে। মাসি বারণ করল। বলল, “তোমার কী দরকার?” আমিও হাল ছেড়ে দিলাম। ঠিকই তো। আমার কী দরকার। সাজা ঘোষণা তো হয়েই গেছে। এখন আর কথা বলেই বা কী হতো? তোমরা তো আর সিদ্ধান্ত পালটাতে না।
‘ডিভোর্স একদিনে হয় না। অনেক যুদ্ধর পর একজন আরেকজনকে ছেড়ে দেয়। অনেক ক্যালকুলেশন, অনেক চিন্তাভাবনা আর হতাশার ফলে শেষে আর কিছু করার না থাকলে ডিভোর্স হয়। তোমরা যখন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, তখন ভেবেচিন্তেই নিয়েছিলে নিশ্চয়ই।’
রাস্তায় আরেকটা মিষ্টির দোকান পড়ল। মেসো রসমালাই দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। করুণ মুখে বললেন, ‘এরপর খেলে আর দেখতে হবে না। নাহ, হাল ছেড়ে দিলাম। আমি আর খাব না।’
ঋজু বলল, ‘আগে হেঁটে নিন। তারপর না হয় খাবেন।’
মেসো বললেন, ‘ঠিক। চলো।’
আবার অনেকটা রাস্তা এগিয়ে গেলেন জোর পায়ে। মিনিট দুয়েক পর দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমার না, পেটে কোনো কথা থাকে না। যতক্ষণ না বলব, আমার পেট ফাঁপতে থাকে। ঘাম হয়, মাথা ফাথা ঘোরে। তোমাকে কথাটা বলেই দি।’
ঋজু বলল, ‘কোন কথা বলুন তো?’
মেসো বললেন, ‘এখানে কাল আঁখিদেরও আসার কথা ছিল। ওর মাসি ফোন করে তোমার কথা বলে দিয়েছে। এখন মনে হয় আর আসবে না।’
ঋজু বলল, ‘এখন এলেই বা কী, আর না এলেই বা কী!’
মেসো বললেন, ‘তাই কি? ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ, এরকমই দাঁড়ায়।’
মেসো বললেন, ‘কিন্তু আঁখি ক্যান্সেল করতে চাইছে কেন?’
ঋজু বলল, ‘এসব নিয়ে আমি আর ভাবব না মেসো। মাথায় এসব কথা ঢোকাব না। আপনি অন্য কিছু ভাবুন বরং।’
মেসো মাথা নিচু করলেন, ‘ঠিকই। আমি আবার এসব কম বুঝি। প্রবীর ভালো ছেলে। ওরা ভালো আছে। এই অবধিই থাক সব কিছু। বেনারসটা বরং এক্সপ্লোর করা যাক।
‘ভালো ঠুমরি শুনলে? কিংবা ভালো খাওয়া-দাওয়া কোথায় কোথায় করলে বলো তো? নন-ভেজ নিশ্চয়ই এখানে পাওয়া যায় না। মন্দিরের কাছেপিঠে তো পাওয়া যাবার কথা নয়ও।
‘এখানে কিন্তু ভালো চম্পারণ মাটন পাওয়া যায়। হাঁড়িতে খাসির মাংসটাকে নিয়ে কম আঁচে একটা স্বর্গীয় রান্না হয়। খেয়েছ চম্পারণ মাটন?’
মেসো জুলজুল করে তাকাল তার দিকে। ঋজু বলল, ‘না, বাইরের দিকে যাইনি এখনও। তবে চম্পারণ মাটন খাবার ইচ্ছে তো আছেই।’
‘খেয়ে নাও। সুযোগ পেলে আমিও যাব। উফ, খিদে পেয়ে গেল। এই হল সমস্যা। কথায় কথায় খিদে পায়।’
মেসোর ফোন বাজছিল। মেসো নাম্বার দেখামাত্র চমকে উঠলেন, ‘ওই দ্যাখো, মোগাম্বোর ঘুম ভেঙে গেছে মনে হয়। হ্যালো… হ্যাঁ… এই বাইরেই, হাঁটছি। না না, কিছু খাচ্ছি না… দশ মিনিট আর… রাখলাম।’
ফোন কেটে মেসো বড় করে নিশ্বাস নিলেন, ‘উফ, একটু মিথ্যে বলতেও আজকাল খুব অসুবিধা হচ্ছে। এই হল বয়সের দোষ। যত বয়স বাড়ে, তত ব্যাগেজ বাড়ে। কিন্তু আমি দেখেছি, সব সত্যি বলা উচিত না। একটু-আধটু ঢপ রাখা উচিত। অধিক সত্যিতে গাজন নষ্ট হয়।’
ঋজু বলল, ‘আপনি কি তবে ফিরে যাবেন?’
মেসো বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি যাই। নইলে কিছু একটা বুঝে গেলে আবার অশান্তি করতে পারে। আমার আর বেড়াতে এসে অশান্তি ভালো লাগে না বাবা। জীবন তো কাটিয়েই দিলাম। আসি।’
ঋজু মাথা নাড়ল। মেসো হনহন করে ফেরার পথ ধরলেন।
ঋজু রিকশা নিয়ে অসসি ঘাটের দিকে রওনা দিল। এখন দশাশ্বমেধের দিকে যাওয়া যাবে না। সন্ধ্যারতির সময় ভীষণ ভিড় হয়। কাল সোমনাথরা ছিল বলে ভিড়ে একা মনে হয়নি, আজ হবে। রিকশাওয়ালা বলল, ‘আপনি কি কলকাতা থেকে এসেছেন?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো?’
‘শাড়ির শোরুমে নিয়ে যাব? এখানে ভালো শাড়ি পাবেন।’
এই এক সমস্যা। সবাই শাড়ি কিনিয়েই ছাড়বে। ঋজু বলল, ‘নাহ। লাগবে না।’
রিকশাওয়ালা কথা বলতে ভালোবাসে। এবার নৌকো নিয়ে পড়ল। ওদের মনে হয় কোনো টার্গেট থাকে। অবশ্য পেটের দায় বড় দায়। সব জায়গাতেই এটা হয়। ঋজু সেটাও মানা করে দিল। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে ঘাটের দিকে রওনা দিল।
কলেজের কয়েকটা ছেলে-মেয়ে গিটার নিয়ে বসে আছে। তাদের পাশে বসে কিছুক্ষণ গান শুনল ঋজু। তারপর মনে হল সোমনাথের খবর নেওয়া দরকার। ফোন করতেই একবারে ধরল সোমনাথ, ‘হ্যাঁ ভাই, সবাই ঠিকঠাকই উঠতে পেরেছি, ভাবিস না।’
‘এটা জানার জন্যই ফোন করেছিলাম। পরে মনে হল স্টেশনে গেলে ভালো হতো। তুই সবাইকে নিয়ে ট্রেনে উঠতে পেরেছিস তো?’
‘হ্যাঁ। কষ্ট কি আর হয়নি? হয়েছে। যা ভিড়, ভাবতে পারবি না। সবাই এক জায়গা থেকেই যেন ট্রেনে উঠছে। ছেলে- মেয়ের তো ভীষণ মন খারাপ। বলছে ঋজু আঙ্কেলকে নিয়ে এলে না কেন? ওদের কে বোঝাবে?’
ঋজু হাসল। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে তো সেভাবে সময়ও কাটায়নি সে, তবু ওরা তার কথা মনে রেখেছে। জীবনের এই সময়ে এসে মনে হচ্ছে আঁখিই ঠিক ছিল। সে ভুল।
অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে জীবনে।
ফোন রেখে নৌকোয় বসে আরতি দেখার একটা দলের সঙ্গে ভিড়ে যাচ্ছিল সে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা হাত তার কাঁধ ছুঁল, একটা চেনা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে, ‘ঋজু না?’
ঋজু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল চন্দনদা। চন্দনদা দিল্লিতে থাকে। তার মায়ের দিকের আত্মীয়। কোনো না কোনো অনুষ্ঠান হলে দেখা হয়।
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ, তুমিও এখানে?’
চন্দনদা অবাক হল, ‘আমি মানে? আর কে কে আছে এখন বেনারসে?’
ঋজু হেসে ফেলল, ‘সে লম্বা লিস্ট। যাকে দেখি, সে-ই এখন বেনারসে আছে। আমার মনে হচ্ছে পরিচিত-অপরিচিত যে যেখানে আছে, সব এখানেই চলে এসেছে। তুমি কি একা এসেছ না বউদিরা এসেছে?’
চন্দনদা বলল, ‘একাই এসেছি বলতে পারিস। এক গুরুজি আছে। তার আশ্রমে উঠেছি। আমি বছর খানেক হল একটু ধর্ম-কর্ম করছি। ট্র্যাডিশনাল ওয়েতে নয় যদিও। দিল্লি থেকে চার-পাঁচজন মিলে এসে ওখানে আছি।’
ঋজু বলল, ‘ওহ, জানতাম না তো। তুমি ধর্ম-কর্ম করছ বলোনি তো!’
চন্দনদা বলল, ‘হ্যাঁ, অফিসের কাজবাজে প্রেশার খুব বেড়ে যাচ্ছিল। আর নিতে পারছিলাম না। তখন এই ভদ্রলোক দিল্লিতে এসেছিলেন মেন্টাল পিস নিয়ে একটা সেমিনার করাতে। অফিসেই। কথাবার্তা এত ভালো লেগে গেছিল, বললাম মাঝে মাঝে আপনার কথা শুনতে চলে যাব। তা উনি বলেছিলেন এখানে এসে কিছুদিন থাকতে। আমি চলে এসেছি।’
ঋজু বলল, ‘তা শান্তি পেলে?’
চন্দনদা বলল, ‘তোরা, মানে এই কলকাতার বাঙালিরা তো সহজে কিছু বিশ্বাস করতে চাস না, সেটা অবশ্য ভালো প্র্যাকটিসও, তবে এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললে খারাপ লাগবে না। আমরা বেঁচে আছি কেন বল তো? দৌড়ানোর জন্য? নাকি রাস্তাঘাটে ঝগড়া করার জন্য?’
ঋজু মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি জানি না। আমার অবশ্য ঝগড়া দেখতে মন্দ লাগে না। তবে হ্যাঁ, আমার কিন্তু অঢেল সময় আছে। এখনও দু’দিন আছি। তুমি এই ভদ্রলোকের কাছে আমাকে নিয়ে যেতে পারো।’
চন্দনদা তার কাঁধে চাপড় মেরে বলল, ‘গুড। তাহলে তো ভালোই হল। আমি গুরুজির জন্য পিৎজা আনতে এসেছি, চল নিয়ে নিই।’
ঋজু অবাক হয়ে বলল, ‘পিৎজা খান নাকি উনি?’
‘আরে হ্যাঁ, চল না। গিয়ে দেখবি কেমন ডায়নামিক লোক। দিল খুশ হয়ে যাবে। চল চল।’
পিৎজা নিতে একটু সময় লাগল। দোকানটা খুবই বিখ্যাত। লাইন ছিল। ঋজু বলল, ‘উনি কি নন-ভেজ খান?’
চন্দনদা বলল, ‘না। ভেজ খান। তবে পানিপুরি খেতে খুব ভালোবাসেন। স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া করেন। স্পিরিচুয়াল লোক। আশ্রমে কর্পোরেট লোকই আসে। কিছু একটা ব্যাপার আছে। নিজেই দেখে নে।’
ঋজু আপত্তি করল না। এমনিতেই এখন একটু মন খারাপ হচ্ছিল। কোথাও গিয়ে বসতে পারলে ভালো হতো।
চন্দনদা হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘তুই এখানে একাই এসেছিস?’
ঋজু দীঘশ্বাস ছাড়ল, ‘হ্যাঁ, একাই।’
চন্দনদা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সেদিনই বাড়িতে আলোচনা করছিলাম। তোর লাইফটা ঘেঁটে গেছে একটু। আমারও যে খুব প্রমিসিং লাইফ চলছে, তাও না। একগাদা লোন হয়ে আছে। মাঝে মাঝে ভয় হয়, আমি যদি মরে যাই, আমার ফ্যামিলি তো রাস্তায় বসবে।
‘তোর বউদি একটা ব্যবসা শুরু করেছে। তবে বিশেষ সুবিধা করতে পারছে না। উঠে বসে থাকতাম মাঝরাতে। এদিকে অফিসে এত প্রেশার। দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলাম। চাকরিতে লাথ মেরে বেরিয়ে আসার দরকার, অথচ ইএমআই মেটানোর বাধ্যবাধকতায় সেটাও করতে পারছি না।
‘বাবার বাড়ি তো জানিসই, শরিকি ঝামেলায় জর্জরিত। কোনো দিক থেকেই কোনো রিলিফ পাচ্ছিলাম না। এত কিছুর মধ্যেও গুরুজির কথাগুলো মন শান্ত করতে পারছে আমার। ইমপ্রেস তো হবই।’
একটা গলিতে ঢুকে কিছুটা যাবার পর একটা বড় দরজা পেরিয়ে বাড়িটার ভেতরে প্রবেশ করা গেল। বেনারসের পুরোনো বাড়ি, দরজা খুলে ঢুকেই বড় বারান্দা, সেটা পেরোতে ঝকঝকে ঘরদোর।
একটা বড় হলঘরে একজন ভদ্রলোক গেরুয়া পরে একাই পায়চারি করছিলেন। টিভিতে খবর চলছে। চন্দনদা পরিচয় করালেন।
ভদ্রলোক হাসিমুখে চেয়ারে বসে টি টেবিলের উপর পিৎজার একটা স্লাইস ঋজুকে, আর একটা স্লাইস চন্দনদাকে দিয়ে নিজেও পিৎজা খেতে শুরু করলেন। ঋজু একটু ইতস্তত করছিল, চন্দনদা বলল, ‘খেয়ে ফেল।’
গুরুজি স্পষ্ট বাংলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, খাও, লজ্জা পেও না। এই পিজার স্বাদই আলাদা। উপরওয়ালা সবাইকে রান্নার হাত দেন না। যাদের দেন, তারা তার খুব প্রিয় পাত্র হন।’
ঋজু খেয়ে দেখল সত্যিই এই পিৎজা বেশ সুস্বাদু। দোকানের ভিড়ের কারণটা বোঝা গেল। গুরুজি চন্দনদাকে বললেন, ‘আইয়াররা বেরোল, বলল রাবড়ি নিয়ে আসবে। আমি যদিও ওদের বললাম এখন মিষ্টি খেও না বেশি, কিন্তু আইয়ারের নাকি কাল থেকেই মিষ্টির ক্রেভিং হচ্ছে। ব্যাটার চোখ-মুখ দেখে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ওর শুগার বেশি আছে। একটু ধমক দিয়ে দিও তো চন্দন, শেষে এখানে এসে ওর শরীর খারাপ হলে তো লোকে বলবে আমার জন্যই হয়েছে। কেমন গুরু হয়েছি বলো দেখি, আমার কথাই কেউ শোনে না। এই ছেলেটি কে?’
চন্দনদা বলল, ‘আমার ভাই। ঋজু।’
গুরুজি বললেন, ‘বাঃ। ভালো ছেলে। চোখ মুখ থেকে বেশ একটা আলো বেরোচ্ছে। ভালো ছাত্র ছিলে তুমি, তাই না?’
চন্দনদা বলল, ‘হ্যাঁ, ও মাধ্যমিকে ওর ডিসট্রিক্টে ফার্স্ট হয়েছিল, এরকমই একটা শুনেছিলাম।’
গুরুজি বললেন, ‘তারপর উচ্চমাধ্যমিকে পাখনা গজিয়েছিল এবং সম্ভবত অঙ্কেই ঝুলিয়েছিলে, তাই তো?’
ঋজু এবার সত্যিকারের অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি কী করে জানলেন?’
গুরুজি পিৎজায় কামড় বসিয়ে বললেন, ‘আমি কিছুই জানি না, অনেক বাঙালির উচ্চমাধ্যমিকে এরকম গল্প আছে কিনা, তাছাড়া অনেকের আবার ওই সায়েন্স নেবার নেশায় উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট ঝুলে গেছে।’
ঋজু বলল, ‘আপনি কি বাঙালি?’
গুরুজি বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি বাঙালি। তবে এখানকার বাঙালি। আমার মামাবাড়ির লোকজন কলকাতার। ছেলে তো মামাবাড়ির মতোই হয়, আমিও হয়েছি। মামাতো ভাইদের থেকে ওদিককার সব খবরই পাই।’
চন্দনদা বলল, ‘গুরুজি অদ্ভুত ধরনের লোক রে ঋজু। আইয়ারের সঙ্গে তামিলেই কথা বলেন। অনেক ভাষা জানেন।’
গুরুজি বললেন, ‘নতুন ভাষা শিখতে আমার ভালো লাগে। তবে ইদানীং বয়স হচ্ছে, মেমোরি নষ্ট হচ্ছে। নতুন কিছু সেভ হচ্ছে না, স্পষ্ট বুঝতে পারছি। জাপানি ভাষাটা শিখতে চাইছিলাম। হচ্ছে না। দেশটায় যেতে ইচ্ছে করছে। ওরা খুব উন্নতি করেছে। অথচ এত পারফেক্ট জীবনেও ওদের নাকি মানসিক স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো নেই। এ যেন ওই গানটার মতো, “সব পেলে নষ্ট জীবন।”
‘আমার তো আজকাল মনে হয় এই ভারতীয় মিডল ক্লাস জনগণই ভালো আছে। শুরুতেই কিছু একটা কিনে ফেলবে মোটা লোন নিয়ে। তারপর বাকি জীবনটা সেই লোন মেটাতে কেটে যাবে। না চাইতেও জীবন একটা লক্ষ্য স্থির করে দেবে তোমার সামনে। তাতে সব পাওয়ার কোনো ব্যাপারও থাকবে না, মানুষ বেঁচে থাকবে অনেক দিন।’
চন্দনদা বলল, ‘বেঁচে থেকে কী হবে গুরুজি?’
গুরুজি খাওয়া থামিয়ে দিলেন, ‘কী হবে মানে? বেঁচে থাকাটাই তো আসল। এই নিশ্বাস নিচ্ছি, এই ছাড়ছি, এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে বলো তো? ভালো লাগছে না এই দুর্দান্ত দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে?’
চন্দনদা খানিকটা ইয়ার্কি মেরেই বলল, ‘আপনার প্রণামি থেকে কিছু টাকা আমাকে দিয়ে আমার লোন মিটিয়ে দিন। আমিও আর আপনার বিরোধিতা করব না।’
গুরুজি বললেন, ‘আমি দেব। তুমি নেবে তো?’
চন্দনদা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘নাহ। আমার মনে হয় আমি একটা ওয়ে আউট বের করে ফেলব।’
গুরুজি বললেন, ‘লোন ট্র্যাপে পোড়ো না, তাহলেই হবে। লোন নেওয়া একটা বদভ্যাস। একটা-একটা করে ইএমআই বাড়তে থাকে। লোন নেওয়া কোনো কাজের কথা না।’
চন্দনদা বলল, ‘কী করব বলুন, আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা শখ পূরণ করতে লোন ছাড়া কী নেবে?’
গুরুজি জোরে হেসে উঠলেন, ‘শখ পূরণ না ছাই, সব শো-অফ করার জন্য করা। যাই হোক, এগুলো নতুন কোনো কথা না। আমরা সবই জানি। তারপরেও ভুল করি। কনজিউমারিজম তো লোনের উপরেই টিকে আছে। একটা দামি কিছু কিনলে, লোন নিলে তিন বছরের। এক বছর পর সেই দামি জিনিসটার পরবর্তী ভার্সন বেরিয়ে যাচ্ছে। জিনিসটার দাম এত পড়ে যাচ্ছে যে তিন বছর পর সেটার দাম একটা ইএমআই-এর সমান হয়ে যাচ্ছে। অথচ নিজেকে জাহির করার লোভ সবার এত বেশি হয়ে যাচ্ছে যে তখন জিনিসটা সহজে পাচ্ছে বলে আর দু’বার ভাবছে না।
‘তুমি শো-অফ কমিয়ে দাও, লোন নেবার প্রয়োজন পড়বে না, ধীরে ধীরে এই অবস্থা থেকে অনায়াসে বেরিয়ে আসবে। অবশ্য তোমাকে দেখে আজকাল আমার ভালোই লাগে, মনে হয় মেন্টালি খানিকটা স্টেবল হয়েছ তুমি, ঈশ্বর তোমাকে এরকমই রাখুন। আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করব।
‘আর তোমার ভাইয়ের বিষয়ে বলো। ওর কী ক্রাইসিস? চোখের তলায় কালি পড়ছে কেন? চাকরির চাপ? না সম্পর্ক? আমি কিন্তু অন্তর্যামী নই বাবা, কথা বলে নিজেদের ভালো রাখার চেষ্টা করি মাত্র, আমাকে ভণ্ড ভেবে বোসো না।’
ঋজু জিভ কাটল, ‘ছি-ছি, আমি ওসব ভাবব কেন? আমার ভালো লাগছে এখানে এসে।’
ঋজু বলল, ‘পরীক্ষার সময় খুব মানতাম, আজকাল মানছি একটু একটু। এখানে এসে পুজোও দিয়েছি।’
গুরুজি হো-হো করে হেসে উঠলেন, ‘বাঃ চন্দন, তোমার এই ভাইটি বড়ই রসিক। কথাটা আমার পছন্দ হয়েছে। পরীক্ষার সময় মানত। জীবন মানে কী বলো তো ভাই? যত বয়স হবে, তত বেশি ক্ষত বুকে বয়ে নিয়ে চলা হল জীবন। জীবনের শুরুতে বেশির ভাগেরই তো বাবা-মা বেঁচে থাকেন। যত বয়স বাড়ে, তত মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া শুরু হয়।
‘শেষ বয়স মানে কত মৃত্যু বলো তো, একটা সময় পাথর হয়ে যাওয়া। ঈশ্বর তো এই সময়টা তোমার সুখ-দুঃখের সাথি হন, এছাড়া ওই যা বললে, পরীক্ষার সময়, দুঃখের সময়, কষ্টের সময়। ওই যে মন্দিরের ভিড়টা দেখলে, দ্যাখোনি কতজন এসে মানত করছে, কত বিশ্বাস সবার। ওই বিশ্বাসটুকুই আসলে ঈশ্বর।’
ঋজু বলল, ‘তাই হবে। তবে আপনার ওই ঈশ্বর বিষয়ে কিছু মানুষ আজকাল বড়ই অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে। তাতে ঈশ্বর কি খুব খুশি হচ্ছেন?’
গুরুজির পিৎজা খাওয়া হয়ে গেছিল। হাত মুছে নিয়ে বললেন, ‘মানুষ মানুষে কাটাকাটি করলে তাঁর খুশি হবার তো কথা নয়। কেন খুশি হবেন? কারও ক্ষতি চাইলে তো তোমার ভালো হবে না। তাতে তোমারই ক্ষতি হয়। তোমার মনে হয় সম্পর্ক বিষয়ক সমস্যা, তাই না? কী হয়েছিল?’
ঋজু বলল, ‘ডিভোর্স হয়েছে। বিচ্ছেদের পরেও বহুদিন মায়া ত্যাগ করতে পারিনি। মনে হতো খারাপ থাকুক। ভুল করেছে আমাকে ছেড়ে, সেটা বুঝুক। পরে দেখলাম ভুলটা আমি করছি। আপনি যে কথাটা বললেন, সেটাই ঠিক। খারাপ চাওয়া আমার মস্ত বড় ভুল হয়েছিল।’
গুরুজি বললেন, ‘তাহলে এখন চোখের কোণে কালি আসছে কেন? অনুতাপ হচ্ছে?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ, তা হচ্ছে।’
‘আর দ্বিধা হচ্ছে আবার কোনো সম্পর্কে জড়াবে নাকি সে বিষয়ে?’
ঋজু মাথা নাড়ল, ‘না, সেটা হচ্ছে না। আমি আর কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাইছি না। বাকি জীবনটা একা থাকলেই ভালো হয়। আমি ঠিক সম্পর্কে থাকার মতো লোক নই। ফালতু বিষয়ে ঝগড়া করি, অতিরিক্ত টক্সিক হয়ে যাই। ওই আপনারা সবাইকে বলেন না, টক্সিক লোকের থেকে দূরে থাকতে, আমি হলাম সেই টক্সিক লোক, নেগেটিভ এনার্জি।’
গুরুজি ঋজুর হাত ধরে বললেন, ‘ধুর পাগল, নেগেটিভ এনার্জি আবার কী? এগুলো লোকে বলে বলে তোমার শরীর আর মন দুই-ই খারাপ করে দেবে। প্রত্যেকটা মানুষের একটা দ্বিতীয় চান্স পাওয়া উচিত। তোমারও পাওয়া উচিত। তুমি রিস্টার্ট করো, নতুন করে আবার সব কিছু নিয়ে ভাবো।’
ঋজু বলল, ‘আবার যদি একইরকম হয়? আবার সব শেষ হয়ে যায়?’
‘হলে হবে। যা হবার আছে, তাই হবে। সন্ন্যাস তোমার জন্য নয়।’
আশ্চর্য! কাল অম্বালিকাও একই কথা বলল। ঠিক কী দেখে ওরা বুঝতে পারছে?
ঋজু বলল, ‘সন্ন্যাসই নিতে হবে, এরকম কোনো ব্যাপার নেই। একা থাকব। ঘুরব, চাকরি করব। এভাবেই চলে যাবে।’
গুরুজি চন্দনের দিকে তাকালেন, ‘তোমার কী মনে হয়? এতে চলবে?’
চন্দন বলল, ‘যদি ইএমআই না থাকে, তাহলে না চলার কোনো কারণ দেখছি না।’
গুরুজি আবার হেসে উঠলেন, ‘সবাই নিজের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে যাচ্ছে। ঠিক আছে বাবা, তোমার যা মনে হবে, সেভাবে তুমি এগোও। ভ্যালিডেশন চাইলে আমার কাছে আসতেই পারো, বা ফোনেও পাবে আমাকে। আমি কিন্তু সেরকম সাধু বা সন্ন্যাসী কিছুই নই। পৈতৃক বাড়িতে থাকি, সবার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। এটুকুই। সাধক হবার চেষ্টাও করিনি।
‘পিপিটি বানাতে শিখেছি, চন্দনদের কোম্পানির মতো লোকজন আমাকে মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে নিয়ে যায়। আমি ওখানে একটু জীবন নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি। মানুষের কথা বলার অনেক কিছু আছে, শোনার লোক কমে যাচ্ছে। আমি মানুষের কথা শুনি।’
চন্দনদা বলল, ‘গুরুজি আবার বিনয়ী হয়ে যাচ্ছেন।’
গুরুজি বললেন, ‘নাহ। যা সত্যি, তাই বলছি। কোথায় উঠেছ ঋজু?’
ঋজু জায়গাটার নাম বলল। গুরুজি বললেন, ‘ওহ, মিশ্রজির ওখানে? মিশ্রজিকে কেয়ারটেকার ভাবোনি তো? ও কিন্তু ওই প্রপার্টির মালিক। বেনারসে ওর চার-পাঁচটা বাড়ি আছে। থাকবে ওরকম কেয়ারটেকার সেজে। ভোরে স্নান করবে, বাথরুম পরিষ্কার করে দেবে লোকেদের জন্য। একটা পুরোনো সোয়েটার পরে হলের সোফায় বসে দিন কাটিয়ে দেবে।’
ঋজু চমকে উঠল। সে তো সত্যিই ভদ্রলোককে কেয়ারটেকারই ভেবেছিল!
সে কথা বলায় গুরুজি বললেন, ‘স্বাভাবিক। মানুষ মাটির কাছাকাছি থাকলে, তাদের পা মাটিতে থাকলে লোকজন তাদের চাকর বাকরই ভাবে। লোন নিয়ে গাড়ি কিনে, ফোন কিনে, দামি জামা পরলে ভাবে এটাই দস্তুর। মিশ্রজি আমাদের জন্য আদর্শ উদাহরণ হতে পারেন। কোনো চিন্তাভাবনা নেই, শান্ত স্নিগ্ধ মানুষ, সবাইকে সাহায্য করার চেষ্টা করেন।’
ঋজুর মনে পড়ল সে ভোরবেলায় এসেছিল বলে মিশ্রজি তার জন্য ঘর অবধি খুলে দিয়েছিলেন। সে কথা বলায় গুরুজি বললেন, ‘মানুষ এমনই তো হওয়া উচিত। আজকাল মানুষ ফ্ল্যাটে থাকে, নিজের একটা ঠিকঠাক গাড়ি থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশীকে দামি গাড়ি কিনতে দেখলে রেষারেষিতে সে আরও একটা দামি কিনে ফেলে। সবটাই প্রতিযোগিতা। তাতে কি শান্তি পাওয়া যায়? কী চন্দন, তুমিই বলো, তাতে কি মানুষ শান্তি পায়?’
চন্দনদা মাথা নেড়ে বলল, ‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি গুরুজি। শান্তি দূরস্থ, আজকাল বেঁচে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে। দেড় লাখ মাইনের যদি এক লাখ তিরিশ ইএমআই-তে চলে যায়, তাহলে দিল্লির মতো শহরে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন।’
গুরুজি বললেন, ‘মাঝে মাঝে পথে বেরিয়ে যাবে। ইচ্ছে হল, গঙ্গোত্রীর দিকে হাঁটতে শুরু করে দিলে। কেদারজির দর্শন সেরে এলে। পথে নামলে বুঝতে পারবে, পথ আমাদের জন্য কীভাবে সব আগে থেকে ঠিক করে রেখেছে। যত বেশি হাঁটবে, তত নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। নিজের সঙ্গে কথা বললে তবেই না বুঝতে পারবে তুমি কী চাও।
‘আমাদের চাওয়া-পাওয়াগুলো যে কী, আমরা সেটাই ভালো করে বুঝে উঠতে পারি না। শুধু সবার ক্ষতি চেয়ে যাচ্ছি। এই ক্ষতি চাওয়ার জন্য শরীরে একটা ভীষণ নেগেটিভ এনার্জি তৈরি হয়। অকারণ দ্বেষ, মানুষকে ছোট দেখানোর চেষ্টা, হিংসা, এই সব কিছুই আমাদের নিজেদের ক্ষতি করে।
‘এই কথা আমি বলছি না। যুগে যুগে মনিষীরা বলেছেন। তারাই আমাদের পথ দেখিয়ে গেছেন। আমরা যদি শুধু তাদের কথার সারমর্মটুকু বুঝে জীবন কাটাতে পারতাম, তাহলে জীবন এত জটিল হতো না।’
ঋজু বলল, ‘খুব ভালো লাগল আপনার সঙ্গে কথা বলে গুরুজি। চন্দনদা যথার্থ বলেছিলেন, এখানে এলে মন শান্ত হবে।’
গুরুজি ঋজুর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘সব ভালো হবে। জীবনকে জীবনের মতো চলতে দাও। ঈশ্বর আমাদের ক্ষত সইবার শক্তি দিন শুধু। মানুষ পৃথিবীতে এসেছে ক্ষতবিক্ষত হতে। তুমি ভালো থাকো বাবা।’
গুরুজির বাড়ি থেকে ঋজু যখন বেরোল, তখন সন্ধে নেমেছে।
ঋজুর সঙ্গে চন্দনদাও বাড়ি থেকে বেরিয়ে বলল, ‘দেখলি কেমন ভদ্রলোক?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যিই ভালো লোক। তোমার বাকি সঙ্গীরা কোথায়?’
চন্দনদা বলল, ‘আইয়ার পাগলা আছে। নিশ্চয়ই রাবড়ি নিতে গিয়ে সন্ধ্যারতি দেখতে চলে গেছে। সে ঠিক আছে, আমি এখন আছি, তুই ঘুরতে ঘুরতে কালও একবার আসিস। আমার মনে হয় আমার সামনে তুই তোর রিলেশন নিয়ে কোনো কথা জিগ্যেস করতে পারিসনি। আমি বরং অন্য ঘরে চলে যাব। তুই ক্লিয়ার হয়ে নিস।’
ঋজু ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু কী-ই বা জিগ্যেস করব?’
চন্দনদা বলল, ‘কিছু জিগ্যেস না করলে এমনি এসে বসে থাকিস। মন ভালো থাকবে। চল রিকশা ধরিয়ে দিই। এখান থেকে তোর ওই জায়গা অনেক দূর হবে।’
ঋজু বলল, ‘তোমার কত লোন হয়েছে?’
চন্দনদা বলল, ‘সে কোটি ছাড়িয়েছে।’
ঋজু চোখ কপালে তুলল, ‘বলো কী গো?’
চন্দনদা বলল, ‘এ খুব স্বাভাবিক, ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনতে গেলে এরকমই লোন হয়। আজকাল তো মনে হয় সব ব্যাঙ্ককে ফেরত দিতে আবার ভাড়াবাড়িতে চলে যাই। শেষমেশ হয়তো তা-ই করব। ষাট বছর অবধি চাকরি করার ইচ্ছে নেই আমার। সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এখানেই চলে আসব একদিন। ছেলেটা টুয়েলভ দেবে। পড়াশুনোয় ভালো হয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়াক। তখন আমি ঝাড়া হাত-পা।’
‘আর বউদি?’
‘কিছু একটা হবে নিশ্চয়ই। আর কত দৌড়াব বল তো? সারাজীবন শুধু দৌড়ে গেলাম। এত কিছু করে কী হবে? সারাক্ষণ স্ট্যাটাস মেইনটেনের মিথ্যে দুনিয়ায় ছুটে ছুটে বিতৃষ্ণা এসে গেল।’
‘দেখা যাক। জীবন খুবই চ্যালেঞ্জিং। পারব নাকি সেটাই বড় কথা। মুক্তির পথ জানি, কিন্তু সে পথে ঢোকার বুকের পাটা সবার থাকে না।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলল চন্দনদা।
