৬
সকালে যে ভিড়টা দশাশ্বমেধ যাবার রাস্তায় ছিল, সন্ধেয় সে ভিড় বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাস্তায় তিলধারণের জায়গা নেই। কাশী চাট ভাণ্ডারের সামনে ভিড়টা আরও বেশি।
উদ্দেশ্যহীনভাবে কিছুক্ষণ হাঁটল ঋজু। দশাশ্বমেধ ঘাটের সন্ধ্যারতি তুমুল খ্যাতি লাভ করেছে। লোকজন সেই আরতি দেখার জন্য ভিড় করে সেদিকে যাচ্ছে। সে প্রথমে ভেবেছিল আজকেই দেখে নেবে, যাওয়া সম্ভব না বুঝে হাল ছেড়ে দিল। দশাশ্বমেধ ঘাটের উলটো দিকের রাস্তায় হেঁটে হোমস্টে’র বিল্ডিংয়ের কাছে এসে মনে হল সন্ধে সাতটা বাজব বাজব করছে। এখন কী খাওয়া যায়? খিদে পাচ্ছে। চাট যত ভালোই হোক, তার খেতে ভালো লাগে না।
মিষ্টি খাবে না খাবে না করেও একটা দোকানে দাঁড়িয়ে পড়ে গাজরের হালুয়া কিনে খেল। অল্পই খেল, হালুয়ার স্বাদ অপূর্ব। খেয়ে উঠে গোধূলিয়া চকের রাস্তায় দাঁড়িয়েই ভিড়টাকে দেখল সে।
গোটা ভারতবর্ষ যেন বেনারসে এসে হাজির হয়েছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারতীয়, বাঙালি থেকে পাঞ্জাবি, কে নেই? রাস্তাতেই কোথাও খিচুরি ভোগ দেওয়া হচ্ছে। এখানে এসে কেউ যদি ঠিক করে খাবার পেছনে কোনো খরচা না করে বিনামূল্যে খাবে, তাহলে তার কোনো সমস্যা হবে না।
সোমনাথদেরও দেখল সে। দেখেই মুখ ঘুরিয়ে উলটো দিকে হাঁটা দিল।
সারনাথ থেকে ফেরার পর সে বলেছে শরীর খারাপ লাগছে। বাকি দিনটা ঘুমিয়ে কাটাবে। সোমনাথও বেশি পীড়াপীড়ি করেনি আর।
সাড়ে সাতটা নাগাদ একটা হোটেলে ঢুকে পড়ল সে। প্রথমে ভেবেছিল বাঙালি হোটেলে খাবে, কিন্তু সেখানে বিরাট লাইন। হাল ছেড়ে নিরামিষ থালি খেয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। প্রৌঢ় কেয়ারটেকার গেট খুলে বললেন, ‘অনেক ঘুরলেন মনে হচ্ছে?’
সে বলল, ‘হ্যাঁ। এলাকাটা চক্কর কেটে নিয়েছি। কাল একবার মন্দিরে যাব।’
‘ভোরে যাবার চেষ্টা করুন। আমি ডেকে দেব। যত দিন গড়াবে, ভিড় তত বেশি হবে। খেয়ে নিয়েছেন নাকি খাবার আনিয়ে নেব?’
ঋজু বলল, ‘খেয়ে নিয়েছি। আমি এবার ঘুমিয়ে পড়ি বরং, টায়ার্ডও লাগছে।’
প্রৌঢ় বললেন, ‘হ্যাঁ, শুয়ে পড়ুন।’
ঋজু ঘরে ঢুকে জামা-কাপড় পালটে বাথরুমে গিয়ে হাত- পা ধুয়ে আবার ঘরে এসে কম্বল মুড়ি দিল। রাত বাড়তে বাড়তে শীত বাড়ছে। এই বিল্ডিংয়ের পাশেই একটা বড় মাঠ, দুনিয়ার গাড়ি সেখানে পার্ক করা হচ্ছে। বাস থেকে শুরু করে ছোট বড় গাড়ি। ঘরের ভেতর অবশ্য এত বোঝার উপায় নেই।
পৌষালি মিসড কল মারতে শুরু করেছে আবার। সে মেসেজ করল, ‘বলো, কী বলবে?’
‘ঘরে ঢুকেছ, না এখনও ঘুরছ?’
‘ঢুকেছি, শোব এবার।’
‘তোমরা ছেলেরাই ভালো আছ। কেমন একা একা ঘুরে বেড়াতে পারো আমি তাই ভাবছি।’
‘হুঁ।’
‘কী হুঁ?’
‘কিছু না।’
‘আমি বোর হচ্ছি।’
‘আমি কী করতে পারি বলো।’
‘কিছু না। তুমি তোমার মতো আনন্দ করো। এনজয় ইওর লাইফ। খুব ভালো আছ।’
‘তা আছি। ঘুমাই এবার?’
‘এখন? এত তাড়াতাড়ি? কলকাতায় তো বারোটায় ঘুমোতে।’
‘এখানে ঘুম পাচ্ছে তাড়াতাড়ি। টায়ার্ড লাগছে।’
‘যাও। আর বিরক্ত করব না।’
‘গুড নাইট।’
‘যাও।’
ফোন রাখল ঋজু। আজকাল কারও সঙ্গেই কথা বলতে খুব একটা ভালো লাগে না তার। কোনো কথা বলার প্রয়োজনীয়তাই খুঁজে পায় না কারও সঙ্গে। ফোনটা নিয়ে অ্যালার্ম দিল ভোর সাড়ে পাঁচটার। জানে না এই শীতের মধ্যে এত ভোরে উঠতে পারবে নাকি, তবু চেষ্টা করতে হবে।
কেয়ারটেকার বাইরে টিভি চালিয়েছে। শাল মুড়ি দিয়ে বসে বসে টিভি দেখছে। সে টিভির শব্দ শোনার চেষ্টা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙল ভোর সাড়ে চারটেয়। অ্যালার্ম বাজার আগেই। ভাগ্যিস মাথায় মাফলার জড়িয়ে শুয়েছিল। এত শীত লাগবে আগে বুঝতে পারেনি। ঘুমের ঘোরে ফোন খুলে দেখল পৌষালি রাত দুটোয় মেসেজ করেছে, ‘তুমি ঠিক আছ তো?’
সে রেগে মেগে লিখতে যাচ্ছিল, ‘ঠিক না থাকার কী হল?’ লিখতে গিয়েও লিখল না। এবার সময় এসেছে পৌষালির সঙ্গে কথাবার্তা কমিয়ে দেবার। যে-কোনো অভ্যাস তৈরি হয়ে যাবার আগে বন্ধ করে দিতে হয়। নইলে সে অভ্যাস নিজে থেকে ছেড়ে গেলে বড় কষ্ট হয়।
চারদিক নিস্তব্ধ বলেই এখন রাস্তায় গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। পার্কিং স্পেসে তার মানে অনেকগুলো গাড়ি ঢুকছে এখন। উঠে বাথরুমে যেতে গিয়ে ঋজু দেখল বাথরুমের দরজা বন্ধ। প্রৌঢ় স্নান করছেন। এত ভোরে? তাকেও অবশ্য আর কিছুক্ষণ পর স্নান করতে হবে। দরজায় নক করে বলল, ‘জলদি।’
‘হা হা ঠিক হ্যায়, জারা রুকিয়ে।’
কয়েক মিনিটের মধ্যে দরজা খুলে গেল, ভদ্রলোক ভেজা গায়ে বেরিয়ে এলেন। সে জিগ্যেস করল, ‘এখনই স্নান করে নিলেন?’
‘জি, আমি ভোরেই করি, আপনিও করে নিন। মন্দিরে যাবেন তো?’
উত্তর না দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। কিছুক্ষণ পর একবারে স্নান করেই বেরোল। ভালো করে ঢাকা দিয়ে মন্দিরের উদ্দেশে যখন রওনা দিল তখন সূর্য না উঠলেও মন্দির অভিমুখে মানুষের ঢল নেমেছে। সে ভিড়ে মিশে গেল। গোধূলিয়া চকে পৌঁছে মন্দিরের রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কার জন্য দিচ্ছে পুজো? জানে না ঋজু। মাথার মধ্যে পুজোর শিডিউল গেঁথে আছে, অন্য কোনো কিছু নিয়ে আর ভাবেনি সে। যেতে হবে বলেই যেন এই যাওয়া। সরু গলিগুলো জেগে উঠেছে এর মধ্যেই। কোথাও পুজোর ডালা পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও মিষ্টি, কোথাও দুটোই।
কত বছর পুরোনো হবে এই দোকানগুলো? বংশানুক্রমিক দোকানদার এরা। বছরের পর বছর ধরে কেউ পৌরোহিত্য করছে, কেউ পুজোর সামগ্রী ভিক্ষা করছে। বেনারসের সঙ্গে বাঙালির টান তো আজকের না। দোকানদারেরা সবাই প্রায় বাংলা বলে, অনেক বাঙালি দোকানদারও আছে।
একটা লকার ভাড়া নিয়ে তাতে ফোন রেখে সে দোকান থেকেই ডালা নিয়ে লাইন দিল। গেট খুলে গেছে, এর মধ্যেই বাঁদরের দৌরাত্ম্য শুরু হয়ে গেছে। এক মহিলার পুজোর ডালা নিয়ে চলে গেল। একজন পেছন থেকে ফিসফিস করল, ‘ভগবান চান না ইনি পুজো দেন।’ কেউ কেউ তাতে সায়ও দিল।
লাইনে বেশিক্ষণ লাগল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঋজু পুজো দিয়ে বেরোতে পারল। যে পথ দিয়ে গেছিল, সেই গেট দিয়ে বেরিয়ে ফোন, বেল্ট আর মানিব্যাগ লকার থেকে বের করে নিয়ে ঘাটের দিকে রওনা দিল। দিনের আলো ফুটছে, শহরের একাংশ তার আগেই জেগে গেছে।
