১
মাঝরাতে, মাঝের কোনো স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠার অনেক সমস্যা আছে।
প্রথম সমস্যা হল, ট্রেনে উঠে নিজের সিট খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনিতে দিনের আলোতেই সিট খুঁজে পায় না সে, রাতে কী করে পাবে? এসি টু-টায়ার বলে আবার পর্দাও টাঙানো থাকবে। বার্থে গিয়ে দেখা যাবে নিশ্চিত কারও নিজের বার্থ পছন্দ হয়নি, তার বার্থেই শুয়ে আছে। তাকে তুলতে গেলে সে শাহেনশার মতো অন্য একটা সিট নাম্বার বলে বলবে, ‘ওখানে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।’
ঋজু কোনোকালেই এসব কথা শোনে না। অতএব সে ঝগড়া করতে শুরু করবে। ঝগড়া করলে তার প্রেশার বেড়ে যেতে পারে।
চল্লিশ পেরোলে নাকি প্রেশারের দিকে নজর রাখা উচিত। আজকাল লোক দুমদাম হার্ট অ্যাটাক, না হয় হঠাৎ স্ট্রোকের শিকার হয়। কোভিডের পর আরও বেশি হচ্ছে। চিৎকার করলে তার আজকাল নিজেরই ভয় লাগে। চিৎকার করতে চায় না। কিন্তু করতে হয়।
আসানসোল থেকে ট্রেনে উঠতে হয়েছে। অফিসের এক কলিগের সঙ্গে তার গাড়িতে করে আসানসোলে এসে গোটা দিন কাটিয়ে রাতে ট্রেনে উঠেছে ঋজু।
সুন্দর একটা লোয়ার সিট পেয়েছে, সেটা ছেড়ে কেনই বা অন্য সিটে বসতে যাবে?
আশ্চর্যজনকভাবে এবারে সেসব সমস্যা হল না। ট্রেনে উঠে একবারেই নিজের বার্থ খুঁজে পেল, এবং দেখা গেল সেখানে কেউ শুয়েও নেই। খুশি হয়ে ব্যাগ রেখে চাদর-টাদর পেতে শুয়ে পড়তেই ট্রেন ছেড়ে দিল।
শীতকাল, তবু এসির তাপমাত্রা অনেকটাই কম করা আছে। এত রাতে কে আর কোচ অ্যাটেনডেন্ট খুঁজতে যাবে? ঋজু ভালো করে মাফলারটা পরে নিল।
একজনের নাক বেশ শব্দ করে ডাকছে। সে হেডফোন কানে দিল। শেষ রাতে স্টেশন আসবে। অ্যাপ দেখে নামার সময়টা ঠিক করে ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে গান শুনতে শুরু করল।
ট্রেন গতি নিচ্ছে। ছোট থেকে ঋজুর ট্রেন বড় প্রিয়। ট্রেন মানেই ছুটি। সেই ছোটবেলা থেকে ছুটিটাই তো পাওয়া যায় না। মনে পড়ে প্রথম দার্জিলিং যাবার কথা। সেই রাতের বেলা ট্রেন ছাড়ল শিয়ালদা থেকে। নস্টালজিয়া বড় বিচ্ছিরি বস্তু। মন খারাপ করে দেয়।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। অনেক লড়াই ঝগড়া করে ছুটি পাওয়া গেছে। ইদানীং মনে হয় চাকরি না করলেই ভালো হতো। কেন সে চাকরি করছে? পরক্ষণেই মনে হয়, চাকরি না করলে কী করত? কনজিউমারিজমের চূড়ান্ত শাখায় বিরাজ করেছে এককালে সে। দামি দামি ফোন কিনেছে, দামি ঘড়ি। চাকরি না করলে কোত্থেকে টাকা আসত? কিছু কিনতে না পারলে মন খারাপ হয়ে যায়।
আঁখি বলত এগুলো নাকি তার রোগ। সব সময় কিছু কেনার ইচ্ছে, রোগ ছাড়া আর কী হতে পারে?
তার হেডফোনটাও বেশ দামি। হাতের ঘড়িটাও। সাইটে দেখেছে, কিনে নিয়েছে। সন্ন্যাস নিলে এগুলোর কী হবে? সে কি ছাড়তে পারবে? ভিক্ষে করে খেতে পারবে সে? পারবে না। হাত পাততে পারে না ঋজু।
আজেবাজে কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুম এসে গেছিল তার। যখন ঘুম ভাঙল, তখন ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। উঠে দেখল কাচের জানলার বাইরে অন্ধকার। ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে কোথাও একটা। রাত দেড়টা বাজে। অ্যাপ খুলে দেখল ট্রেন আধ ঘণ্টা দেরি করছে। করলেই ভালো। শীতের শেষ রাতে উত্তরপ্রদেশে প্রচুর কুয়াশা থাকে। ট্রেনটা দেড়-দু-ঘণ্টা দেরি করে পৌঁছালে কোনো ক্ষতি নেই।
ফোনে মেসেজ এসেছে, ‘ঘুমাচ্ছ নাকি?’
পৌষালি। ঋজু মেসেজ সিন করল না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না এখন। পৌষালির নাকি রাতে ঘুম আসে না। সারারাত জেগে বসে থাকে। ওর বর আর বাচ্চা ঘুমায়।
ও সারারাত সিনেমা দেখে। সঙ্গে মেসেজে কথা বলে।
ঋজু ইদানীং চেষ্টা করছে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর। অন্তত এগারোটার মধ্যে ফোন রেখে ঘুমাতে পারলে শরীর সুস্থ থাকে। রিলগুলো সেসব হতে দিচ্ছে না। কিছু না হলেও আজেবাজে জিনিস দেখে খেয়াল হয় কোনোদিন একটা, কোনোদিন দুটো বেজে গেছে।
ট্রেনের ঘুমটাই বরং ভালো। এখানে ঘুমের আলাদা পরিবেশ আছে। ফোনে নেটওয়ার্ক মাঝে মাঝে চলে যায় বলে রিল বন্ধ হয়ে যায়। কোনোদিন ইনসমনিয়া হলে সে ট্রেনে উঠে শোবে।
ট্রেন নড়ছে, সে চোখ বুজল। আজ এমনিতেই ঘুম কম হবে। ফোন প্যান্টের পকেটে রেখে দিল সে।
