১৯
কোনো কোনো আত্মীয়স্বজন থাকে, যারা শুধুমাত্র ঝামেলা করার জন্য তৈরি থাকে।
আঁখির একটা জ্যাঠতুতো দাদা আছে, বিয়ের দিন অনেক ঝামেলা করেছিল, কোর্টেও খুব বাঁকা বাঁকা কথা বলেছিল। সেই লোকটা চা-ওয়ালার থেকে চা নিচ্ছে। মাঝে মাঝে ঋজুকে আড়চোখে দেখছে। পাশে আঁখির বর দাঁড়িয়ে। ঋজু বোঝার চেষ্টা করছে লোকটা কি তাকে আজেবাজে কথা বলবে? বললে সে কী করবে? একটা সময় সে উত্তর দিত। এখন ক্লান্ত লাগছে। বললে বলে যাবে।
দুপুর বারোটা বাজে। একটু আগে সব কাজ শেষ হয়েছে। যারা শ্মশানের কাজ করেছে, তারা গঙ্গায় ডুব দিয়ে ঘাটের স্নানের জায়গায় জামা-কাপড় বদলাতে গেছে। মাসিকে নিয়ে আঁখি, ঝিমলি, আঁখির মা ঘাটেই বসে আছে।
চন্দনদা এসে ঋজুর কাছে দাঁড়াল, ‘তুই এবার যেতে পারিস। আর তো থাকার দরকার আছে বলে মনে হয় না। ওদের লোকজনও সব এসে গেছে। তুই থাকলেই আবার কোন কথা থেকে কী কথা উঠে আসবে। দরকার আছে থাকার? দ্যাখ, তুই যা ভালো বুঝিস, তাই কর।’
ঋজু বলল, ‘চলে যাওয়াটাই ভালো। আমারও তাই মনে হয় চন্দনদা।’
চন্দনদা বলল, ‘মাসিকে বলে আয়।’
‘ঠিক আছে।’
ঋজু মাসির কাছে গিয়ে দাঁড়াল, ‘আমি তাহলে আসি। আমাকে ফিরতে হবে। আমি হয়তো আজকেই ট্রেন ধরব।’
ঝিমলি বলল, ‘তুমি চলে যাবে ঋজুদা?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ, এবার আসি ঝিমলি। অফিসের ছুটি শেষ হয়ে গেছে।’
মাসি বললেন, ‘সাবধানে যেও বাবা। তুমি না থাকলে যে কী হতো, আমি ধারণাও করতে পারছি না। তোমার সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার করেছি, তার জন্য আমায় ক্ষমা করে দিও।’ মাসি দু’হাত জড়ো করে প্রণাম করতে গেলেন।
ঋজু লজ্জিত হয়ে পড়ল, ‘না না। এসব কী বলছেন? যা হয়েছে, তার জন্য কোনো সান্ত্বনাই যথেষ্ট নয়। আপনারা সবাই বরং সাবধানে থাকবেন। আমি এখন আসি।’
মাসি অস্ফুটে বললেন, ‘ঠিক আছে।’
ঋজু একবার আঁখির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে আঁখির সঙ্গে মণিকর্ণিকা ঘাটে দেখা হওয়াটা একটা রূপক হয়ে থেকে গেল।
চন্দনদার গা থেকে সাবানের গন্ধ আসছে। সে বলল, ‘চন্দনদা, তোমার গা থেকে চন্দনের গন্ধ আসছে।’
চন্দনদা বলল, ‘এখন তোর এই কথা মনে হল?’
‘হ্যাঁ, কী আশ্চর্য, তাই না? অথচ আমার এখন মন খারাপ হবার কথা ছিল। আঁখিদের পরিবারের সব থেকে ভালো লোকটা চলে গেলেন।’
‘ওই ছেলেটা তোর কথা জিগ্যেস করছিল আঁখির দাদাকে। আমি শুনেছি।’
ঋজু বলল, ‘ওর জায়গায় থাকলে আমিও জিগ্যেস করতাম। এখানে আমার থাকাটা খুব অকওয়ার্ড। এরকম অকওয়ার্ড জিনিস চারদিকে খুব একটা হয় না তো। হয়েছে যখন, জিগ্যেস তো করবেই।’
দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে এসে আবার সেই সাধুবাবার সঙ্গে দেখা হল ঋজুর। চোখে মুখে ছাই মেখে বসে থাকা মানুষটা তাকে দেখে আগের মতোই হাসলেন। ঋজু সরাসরি তার কাছে গিয়ে বসে পড়ল, ‘আপনি কি আমাকে চেনেন?’
সাধুবাবা মাথা নাড়লেন, ‘না।’
ঋজু বলল, ‘তাহলে আমাকে দেখে হাসেন কেন প্রতিবার?’
সাধুবাবা তার কথার উত্তর না দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। ঋজু উঠে দাঁড়াল। সবাইকে দেখেই হাসেন হয়তো। ঋজুর আলাদা কিছু মনে হয়েছিল।
চন্দনদা বলল, ‘কী হয়েছে?’
ঋজু বলল, ‘জানি না। আমাকে দেখলে হাসেন, কেন হাসেন জানি না।’
চন্দনদা বলল, ‘গুরুজি বলেন, এখানে যে কত ধরনের লোক আছে, তা কেউ জানে না। হতে পারে কোনো দাগি আসামি ছাই মেখে বসে আছে, কিংবা অনেক উচ্চমার্গের কোনো সাধক। হাসলে হাসুক। তুই আর ওসব দেখিস না।’
ঋজু শ্বাস ছাড়ল, ‘হ্যাঁ। এখানের তো সব ফুরোল, এবার আমায় ফিরতে হবে। বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল একই জায়গায়। আমার কিছুই ঘোরা হল না ঠিক করে। হোমস্টে, অসসি ঘাট আর দশাশ্বমেধ ঘাট হয়ে মণিকর্ণিকা, কিংবা উলটোটা।’
নিজের মনেই বলে চলল ঋজু, ‘আমি আর কোনোদিন এখানে আসব না চন্দনদা। এক বারেই অনেক বারের মতো ঘুরে নিলাম। অথচ এবারে আমার এখানে আসার কথাই ছিল না। শুরুতে ঠিক করেছিলাম হরিদ্বার যাব। বাবা আমাকে যেখান থেকে কফি খাওয়াত, সেখানকার কফি খাব। ছুটি চাইলাম, পেলাম না। তারপর প্রচুর ঝামেলা হল বসের সঙ্গে, শেষমেশ যখন ছুটি পেলাম, কী এল মাথায়, বেনারসের টিকিট কেটে ফেললাম। অনেক ঘুরে ফেলেছি। আর আসব না আমি।’
চন্দনদা বলল, ‘আমাদের হাতে কি কিছু আছে? কিচ্ছু নেই। আসার হলে আবার আসবি।’
ঋজু বলল, ‘তুমি খুব বিশ্বাসী হয়ে গেছ, তাই না?’
চন্দনদা বলল, ‘হয়েছি বোধ হয়। প্রচুর যুক্তিবাদী লোকজনও তো ভূতের গল্প লেখে। তাই না?’
ঋজু হেসে উঠল। অনেকক্ষণ পর ভালো করে হাসতে পারল সে।
চন্দনদা বলল, ‘আঁখি আসছে একা একা। দ্যাখ কী বলতে চাইছে। কথা বলে আয়।’
ঋজু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। ঠিক তো! কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো হেঁটে আসছে। ঋজু অবাক হয়ে বলল, ‘আবার কী হল?’
চন্দনদা বলল, ‘যা। গিয়ে দ্যাখ।’
ঋজু বলল, ‘আসুক। আমি আর যাব না।’
‘ঠিক আছে। আমি এগোলাম। তুই আয়।’
চন্দনদা দাঁড়াল না আর। চলে গেল।
আঁখি ঋজুর কাছে এসে পৌঁছাতেই ঋজু বলল, ‘এলে কেন? ওরা কী ভাববে? এই তো আমাকে বোঝাচ্ছিলে ওখানে আমার থাকাটা ঠিক না। আবার কী হল?’
আঁখি মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি সরি বলতে এলাম। তোমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছি। করা উচিত হয়নি।’
ঋজু বলল, ‘এটা বলার জন্য এলে? যাও। প্রবীর দেখছে।’
আঁখি কাঁদছে। কত দিনের কান্না? তারও তো ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল মেয়েটার কাছে। সব দোষই তো তার। সে জানেও। কান্নাটা দেখতে ভালো লাগছে? কোনোমতে বলল ঋজু, ‘আঁখি, ফিরে যাও। ওঁরা খারাপ ভাববেন।’
আঁখি হাতের মুঠো শক্ত করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে চোখের জল নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে লাগল। ঋজু বলল, ‘যাও।’
আঁখি কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। পিছু ফিরে ধীর পায়ে ফেরার পথ ধরল।
না চাইতেও ঋজুর চোখ সাধুবাবার দিকে গেল। এখনও হাসছেন। ঘাটে চেয়ার পাতা শুরু হয়েছে আবার।
এখন একটা নৌকো নিলেই গুরুজির ওখানে চলে যাওয়া যেত।
কিংবা আরেক বার গোধূলিয়া চকে…
ঋজুর আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। একটা চেয়ারের উপর বসে পড়ল সে। ঘাটে থাকা এক বাঙালি ভদ্রলোক তীব্র শ্লেষে বলে উঠলেন, ‘বোঝো কাণ্ড, এখন থেকেই লাইন দিচ্ছে!’
ঋজু হেসে ফেলল। অনেকটা ওই সাধুবাবার মতোই মনে হল হাসিটা…
***
