১৪
আঁখি আগে জানত না, পরে জেনেছিল, ঋজু সব থেকে বেশি ভয় পায় হাসপাতাল যাওয়া। কোনো একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন অসুস্থ কাউকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয়, ঋজুর রীতিমতো হৃৎকম্প হয়। সে ঘামতে শুরু করে। নিজেকে বা তার কাছের লোকেদের সে জায়গায় কল্পনা করে আরও ঘাবড়ে যায়।
কবে থেকে এটা শুরু হয়েছিল সে জানে না, কিন্তু যখনই এরকম কোনো পরিস্থিতি হয়, ঋজু নিজেকে সামলাতে পারে না।
মেসোকে ইসিজি করতে নিয়ে গেছে সে। তাদের হোমস্টে থেকে কিছুটা দূরেই ক্লিনিক। মেসো শুরুতেই বলে দিয়েছে ইসিজি ঠিক থাকলে একটু রাবড়ি খাবে। মাসি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালে মেসো বলেছে সকাল সকালই খেয়ে নেবে। রাতের আগে সব হজম হয়ে গেলে চিন্তার আর কোনো কারণ থাকবে না।
রাস্তায় বেরিয়ে মেসো বললেন, ‘খুব বেশি মাখন দিয়ে একটা স্ট্রিট ফুড বানাচ্ছিল দেখলে, গোধূলিয়া চকের ওখানে?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি, একটা গোটা মাখনের কিউব দিচ্ছে। দেখেই তো কেমন কেমন লাগছে!’
মেসো বললেন, ‘কেমন কেমন না, চেখে দেখবে। সব নিষিদ্ধ বস্তুর স্বাদই লা জবাব হয়। তোমাদের এখন বয়স কম, তোমরাই তো খাবে, আমার ছাপ্পান্ন, আর বছর পনেরো কম বয়স হলে দেখিয়ে দিতাম। এমনিতেই তোমার মাসির শাসনে অস্থির হয়ে থাকি। এমনভাবে জেরা করা শুরু করে, ভয়ে সব বলে দিতে হয়।’
ঋজু বলল, ‘বলে দেওয়াই ভালো। বাইরের খাবার একবারেই হেলদি না। এখানে অনেক ভালো ভালো খাবার আছে, আবার এমন কিছু আছে, যেগুলো না খাওয়াই ভালো। ওই পরিমাণ মাখন শরীরে ঢোকানোর কোনো মানে হয় না।’
মেসো হতাশ হয়ে বললেন, ‘আমার পরবর্তী জেনারেশনের আর কোনো আশা নেই। আমরা ছোটবেলায় লোহা খেয়ে হজম করে ফেলতাম। খাসির মাংস খাবার সময় পাশে বালতি রেখে যেতে বলেছি। কোনো বিয়েবাড়িতে এক বালতি মাংস মেরে দিলাম তো পরের বিয়েবাড়িতে মিষ্টি। এখন কেউ খেতে পারে না, দূর দূর।’
ঋজু হাসতে হাসতে বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি এখন নিজের শরীর নিয়ে ভাবুন। এসব কথা পরে ভাবা যাবে।’
মেসো বললেন, ‘ও কিচ্ছু হয়নি। ওসব খেয়ে গ্যাস হয়েছে, আর কিছু না। তোমার মাসি যাতে বেশি না বকতে পারে, সে জন্য এলাম।’
ক্লিনিকে ঢুকেই ঋজুর অস্বস্তি শুরু হল। হাত-পা কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে এর মধ্যেই। মেসোর ইসিজির জায়গায় যাতে তাকেই ইসিজি করতে না হয় তার জন্য প্রাণপণে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
মেসোকে দেখে বোঝা সম্ভব না তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে। গটগট করে হেঁটে গিয়ে ইসিজি করে এসে বললেন, ‘চলো কিছু খেয়ে নিই। এবার খাওয়াই যায়।’
ঋজু বলল, ‘খাওয়া যাবে, মানে? কী বলল?’
‘কিছু বলল না। তাহলে তো ঠিকই আছে, তাই না?’
ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে, চলুন, বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।’
মেসো ঋজুর কপালে ঘাম দেখে বললেন, ‘কী হয়েছে তোমার?’
বাইরে বেরিয়ে স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে ঋজু বলল, ‘আমার এরকম জায়গায় এলে সমস্যা হয়। এবার বলুন, ডাক্তার কী বলল?’
মেসো বললেন, ‘ডাক্তার না, টেকনিশিয়ান। তবে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা থাকে ওদের। বলল ডাক্তার দেখিয়ে নিতে। আমাকে গ্রাফটা দিয়ে দিচ্ছিল, আমি বললাম রিপোর্ট বানিয়ে তারপর দিতে। একটা দিন তো, কিছু হবে না।’
ঋজু অবাক হল, ‘এরকম হয় নাকি? একটা দিনের ঝুঁকি ওভাবে নেওয়া যায় না। চলুন, গ্রাফটা নিয়ে এসে কলকাতায় কাউকে ছবিটা পাঠিয়ে রাখি।’
ঋজু ভেতরে যাচ্ছিল আবার। মেসো তড়িঘড়ি ঋজুর হাতটা ধরে বলল, ‘এই ছোকরা, কোথায় যাচ্ছ তুমি? বললাম তো কাল নেব। চলো দেখি।’
ঋজুকে কিছুতেই ভেতরে যেতে না দিয়ে জোর করে ধরে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলেন মেসো, ‘আজ আছি, কাল
নেই। এই টেনশনে আমি আজকের দিনটা খারাপ করতে পারব না। মাসিকে কিছু বলবে না। শুধু বলবে কাল রিপোর্ট দেবে।
‘এই জন্য আমি ব্লাড টেস্টও করাই না। করাতে দিলেই এটা কম, ওটা বেশি, এটা খেও না, সেটা খেও না। কী দরকার আছে সুস্থ শরীরকে অসুস্থ করার? আমি তো বুঝতে পারছি আমি ভালো আছি। আমি বুঝতে পারলে আর কিছু দরকার নেই। আমি ঠিক আছি, সেটাই এনাফ। মাসিকে বলবে না কিচ্ছু। আজ বেরিয়ে চম্পারণ ট্রাই করব।’
ঋজু বলল, ‘বলব না কেন? তাহলে আপনি কিছু খাবেন না। রিস্ক নেবার কোনো দরকার নেই। এখানে এমনিতেই এত ভিড়। কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসা ঠিক করে হবে না। চম্পারণ মাটন কলকাতাতেও পাওয়া যায়। ফিরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে খাবেন।’
মেসো হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘কলকাতায় বাঘের দুধও পাওয়া যায়। কিন্তু স্থান মাহাত্ম্য বলে একটা কথা আছে না? বিহার কিংবা উত্তরপ্রদেশে এলাম অথচ মাটন খেলাম না, বলি উপরে গিয়ে চিত্রগুপ্তকে কী জবাব দেব বলো তো?’
ঋজু বলল, ‘এবারে খাবেন না। কাল শরীর খারাপ লাগছিল তো। ঘুরে নিন, ফিরে গিয়ে দেখা যাবে।’
মেসো সহাস্যে বললেন, ‘ঠিক আছে। খাব না। ভেব না। ভাবনার কিছু নেই। জীবনে কিচ্ছু নেই ঋজু। আজ আছি, কাল নেই। শরীর নিয়ে ভাবি না।’
ঋজু বলল, ‘মাসি আছেন, ঝিমলি আছে। ঝিমলি একবারে ছোট। এসব কথা বলার আগে ভাবা উচিত আপনার।’
মেসো বললেন, ‘তুমি তো এই ভয়েই বাচ্চা নিতে চাও না, ঠিক না?’
ঋজু অন্য দিকে তাকাল, ‘হ্যাঁ। আমি ভয় পেতাম। শুধু মনে হতো আমার কিছু হলে বাকিদের কী হবে?’
মেসো বললেন, ‘এটাকে নারসিসিস্টিক অ্যাটিচুড বলে। একটা কথা মনে রাখবে, তোমার কিছু হলে কারও কিচ্ছু হবে না। বাড়ির লোকের শোক বড়জোর দু-চার মাস। তারপর সব ঠিক হয়ে যায়। তোমাকে ঘিরে পৃথিবী ঘোরে না। পৃথিবীতে সবাই কিছুদিনের জন্যই এসেছে। কিন্তু বিয়ে করেছ, বাচ্চা নেবে না, এটা কী ধরনের অ্যাটিচুড বলো তো? একটা চমৎকার সম্পর্ক নিজের হাতে ভেঙে দিলে তোমরা। কাউন্সেলরকে বলেছিলে?’
ঋজু বলল, ‘না। বলিনি।’
মেসো বললেন, ‘বলতে পারতে। বললে দেখা যেত একটা কোনো সলিউশন বেরিয়ে আসত। কাউন্সেলরের কাছে পেটে কথা রাখতে নেই। যাই হোক, এসব জ্ঞান দিয়ে আর কী হবে? মোদ্দা কথা, মানুষ আজ আছে, কাল নেই। এই পৃথিবীর সব কিছুই মোহ এবং মায়া।’
ঋজু বলল, ‘হতে পারে। কিন্তু একটা মানুষের থাকা না-থাকার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করে। আমার জ্যাঠতুতো দাদা বাড়ির সব অনুষ্ঠান একাই মাতিয়ে রাখত। হঠাৎ স্ট্রোকে চলে গেল। মানুষ না থাকার শূন্যতা কোনো কিছু দিয়ে পূর্ণ হয় না। যেখানে পরিমিত জীবন যাপন করলে সুস্থ থাকা যায়, সেখানে কেন আপনি অনিয়ম করবেন?’
মেসো হঠাৎ চোখে আঙুল দিয়ে বললেন, ‘কী একটা পড়ল চোখের কোণে। ঠিক আছে। চলো, তোমার কথা মেনেই চলা যাক। আমি কিছু খাব না। তবে মাসিকে বোলো না কিছু। অকারণ চিন্তা করবে। আমি কলকাতায় গিয়ে ভালো করে ডাক্তার দেখাব। ডিল?’
ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে। ডিল। চলুন।’
মাসি অপেক্ষা করছিলেন সোফায় বসে। সঙ্গে ঝিমলি। তাদের ফিরতে দেখে বললেন, ‘কী হল? সব ঠিক আছে?’
মেসো বললেন, ‘কাল রিপোর্ট দেবে। চিন্তার কিছু নেই। চলো এলাহাবাদ ঘুরে আসি।’
মাসি ঋজুর দিকে ফিরলেন, ‘সব ঠিক আছে তো? এলাহাবাদ যাওয়া যাবে?’
ঋজু আমতা আমতা করে বলল, ‘মেসো একাই ঢুকেছিলেন ইসিজি করতে। বলল তো কাল রিপোর্ট দেবে।’
মাসি কড়া গলায় মেসোকে বললেন, ‘কী হয়েছে বলো।’
মেসো অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, ‘বললাম তো কিছু হয়নি। অহেতুক চিন্তা কোরো না। ঠিক আছে এলাহাবাদ যেতে হবে না। চলো লোকাল ঘুরে আসি। সেটা যাবে তো?’
মাসি বললেন, ‘ঠিক আছে, চলো।’
ঋজু বাঁচল। সে বলল, ‘আপনারা তবে ঘুরুন। আমি একটু বেরোব।’
মেসো বললেন, ‘বেশ বেশ। বিকেলে দেখা হবে। ভালো করে ঘুরে নাও।’
ঋজু বেরিয়ে গেল।
তার কি মানসিক চিকিৎসা দরকার? ওই সময় উচিত ছিল টেকনিশিয়ানকে নিজেই গিয়ে একবার জিগ্যেস করে নেওয়া। সে করতে পারল না। একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকতে দেখে তার মাথা ঘুরছিল।
আরেকজন বসেছিল, সম্ভবত তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে, হাতে চ্যানেল করা। দেখার পর থেকে অস্বস্তি হচ্ছে। সেই অস্বস্তি এখনও আছে। ছেড়ে যায়নি।
রিকশা নিল ঋজু। গুরুজির কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলে মন শান্ত হতে পারে ভেবে সেদিকেই রওনা দিল। সাড়ে এগারোটা বাজতে চলল, এখনও শহরটা আড়মোড়া ভাঙতে পারেনি। এখনও কোনো কোনো দোকানে ঘুমের ঘোরে চোখ মুছতে মুছতে শাটার তুলছে দোকানদার। অবশ্য এটাও ঠিক, ওরা অনেক রাত অবধি দোকান খোলা রাখেন।
এই শহরটা একটু দেরি করে শুরু হয় আর অনেক রাত অবধি চলে।
এত মন্দির, মসজিদ… তবু বেনারসকে কি ঠিক ধর্মস্থান বলা যায়? যায় না বোধ হয়। এখানে একটা অদ্ভুত ধরনের প্রাণশক্তি আছে। এ ক’দিনে কলকাতার সঙ্গে বেনারসের অনেক মিল খুঁজে পেয়েছে সে। দুটো শহরেই মানুষের ঢল নামে এবং দুই শহরই এত লোক সামলেও একটুও ক্লান্ত হয় না।
ভোর রাতের দিকে সে স্বপ্ন দেখেছিল, ঘাটের কাছে রিকশা থেকে নেমে সে গুরুজির আশ্রমের খোঁজে হাঁটতে শুরু করেছে। এখানেই নেমে কিছুটা হেঁটে ডান দিকের গলি ছিল। কী আশ্চর্য, গলিতে ঢুকে বাড়ির দরজাটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না সে। এরকম হয় নাকি? তাহলে কি ভুল গলিতে ঢুকে গেছিল?
আবার বড় রাস্তায় বেরিয়ে এসে পরের গলিতে খুঁজে দেখল। নাহ। সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে না।
চন্দনদাকে ফোন করল। ফোন নট রিচেবল বলছে। সবুজ রঙের বড় দরজা ছিল একটা। গোটা বাড়ি এভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় নাকি?
প্রায় আধ ঘণ্টা খুঁজে কোনো সুবিধে করতে না পেরে যখন গলি থেকে বেরিয়ে আবার বড় রাস্তায় এসে পৌঁছাল, তখনই চোখে পড়ল চন্দনদা আর দু’জন অপরিচিত লোককে নিয়ে গুরুজি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছেন। সে যত ছুটে গিয়ে তাঁদের কাছে পৌঁছাতে চাইছে, ওঁরা ততই দূরে সরে যাচ্ছেন।
এখন অবশ্য গুরুজির বাড়ি খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হল না। গুরুজি টিভি দেখছিলেন। তার স্বপ্নের কথা শুনে বললেন, ‘তুমি কি কোনো ব্যাপার নিয়ে খুব স্ট্রেসড হয়ে পড়েছ?’
ঋজু বলল, ‘স্ট্রেস তো না চাইলেই চলে আসে। আমি আবার ফেরার টিকিট না কেটে এসেছি। তৎকালে না হবার স্ট্রেস আছে।’
গুরুজি জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না বাপু। তোমার টিকিটের স্ট্রেস নেই। ঢপ মারছ। বলে ফেলো যা বলার আছে। আমার কাছে লজ্জা পেয়ে লাভ নেই।’
চন্দনদা বলল, ‘আপনি একটু ওর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলুন গুরুজি। আমি বাইরে যাই।’
গুরুজি বললেন, ‘ঠিক আছে। যাও। শুনি কী বলছে।’
চন্দনদা বাইরে চলে গেল।
গুরুজি বললেন, ‘বলো, শুনব আমি।’
ঋজু বলল, ‘আমার তেমন কিছু বলার নেই গুরুজি। আমি নিজেও জানি না আমার স্ট্রেসটা কোত্থেকে আসছে।’
গুরুজি চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। ঋজুও কোনো কথা বলল না। যখন চোখ খুললেন, তখন বললেন, ‘আমার মনে হয় তুমি তোমার রিলেশনশিপ নিয়ে চিন্তিত। ঘোরতর চিন্তিত। তাই তো?’
ঋজু বলল, ‘হতে পারে। আমি শিওর নই। তবে অপরাধবোধ আছে। নিজের বিয়ে ভেঙে দেবার অপরাধবোধ আমাকে প্রতিদিন কুরে কুরে খায়। আমার বিয়েটা একটা সফল বিয়ে হতে পারত। হল না। এর জন্য নিজেকেই দায়ী মনে হয় আমার।’
গুরুজি বললেন, ‘নিজেকে দায়ী করার কোনো প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজোড়া নরনারীর মধ্যে বিয়ে হলেও তা ভেঙে যেতে পারে। একটা সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে, তা এখনও বিতর্কসাপেক্ষ। গবেষণার বিষয়ও বটে। তুমি এই চিন্তাটা ভুলে যাও।’
ঋজু বলল, ‘পারছি না তো। ও আমার কাছে সন্তান চেয়েছিল। প্রথমে আমি কুঁকড়ে থাকতাম, ভাবতাম বেশি উৎসাহ না দেখালে চুপ করে যাবে। চুপ করেনি, বার বার বলতে শুরু করল। বিরক্ত হয়ে গেলাম। বিচ্ছিরি ঝগড়া শুরু হয়ে যেত তখন।
‘এক দুপুরে ঝগড়ার মধ্যেই হঠাৎ বাড়ি চলে গেল। আমিও শক্ত হয়ে রইলাম। ঠিক করলাম, যাই হয়ে যাক, আমি ওকে ফিরিয়ে আনতে যাব না। ওকেই ফিরতে হবে। আমি জানতাম ও ঠিক ফিরবে। কিন্তু ফিরল না। আমিও আর গেলাম না। এত রাগ হতো, মাঝে মাঝে মনে হতো মেরে দিয়ে আসি। ফেসবুকে ওর প্রোফাইল দেখতাম, প্রতিটা স্ট্যাটাস দেখে আমার প্রবল রাগ হতো। আমাকে ছাড়া ভালো আছে কেন? কী করে ভালো থাকে?
‘ডিভোর্সের প্রপোজাল আমিই দিলাম। মনে হল, এল না যখন তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দিই। বুঝবে মজা। তাতেও রাজি হয়ে গেল! কোনও কিছুই বাধা হল না।
‘সামনে যত বার দেখা হয়েছে, পাথরের মতো মুখ করে থেকেছে। এখন বিয়ে করেছে, বাচ্চা হয়েছে, তবু আমি ওকে ভুলে এগিয়ে যেতে পারছি না। যত বার ভেবেছি মুভ অন করে গেছি, পারিনি। কিছু না কিছু বিষয় এসে আমার বোঝাপড়ার মাঝখানে দাঁড়িয়েছে।
‘এখানে নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে এলাম। এখানেও ওর মাসির পরিবার একই জায়গায় এসে উঠল। তাদের সঙ্গে আবার কথাও হচ্ছে। আমি চাই না ও কোথাও থাকুক, তবু থেকে যাচ্ছে। কোনো না কোনো ভাবে ঠিক থেকে যাচ্ছে।’
গুরুজি সবটা শুনে বললেন, ‘তোমার বাচ্চা পছন্দ না?’
‘বিষয়টা বাচ্চা না। আমার হাসপাতাল, রক্তপাত, নার্সিং হোমে ভয়। যত বার কল্পনা করেছি ও হাসপাতালে ভর্তি আছে, ওর পেট কাটা হবে, আমি ঘাবড়ে গেছি। ভয় পেয়েছি।’
‘ওকে বলেছিলে?’
‘বলেছিলাম। ও বলেছিল তোমায় চিন্তা করতে হবে না। ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে বুঝে নেবে। আমি মানিনি।’
গুরুজি হেসে ফেললেন, ‘আচ্ছা ঘোঁতন পাবলিক তো তুমি!’
‘হ্যাঁ, আমি এরকমই। এটাই আমার সমস্যা, আমি জানি। জেনেও কিছু করতে পারিনি।’
‘এরপর কী প্ল্যান তোমার? ভেবেছ কিছু?’
ঋজু হাসল, ‘আপাতত ফেরার টিকিটটা নিয়ে ভাবছি। ওটা না হলে লোকাল ট্রেনে ফিরতে হবে। সমস্যা কিছু নেই। তবে বাথরুম আছে কিনা জানি না, থাকলেও একবার উঠলে জায়গা চলে যাবে।’
‘যেতে পারবে না। ট্রেনগুলো চলে ওই অবধিই, একবার দাঁড়িয়ে পড়লে আর নড়ে না। সময়ের কোনো ঠিক-ঠিকানা থাকে না। বিকেলে যেতে চাইলে আজ বিকেলেও চলে যেতে পারো। তোমার টিকিটের ব্যবস্থা আমি করে দেব। ভেব না। তবে এখন যেতে পারবে বলে মনে হয় না।’
ঋজু অবাক হল, ‘কেন? আমার ছুটি শেষ হয়ে গেছে। আমি এখন না গেলে ঝামেলায় পড়ে যাব তো! আপনি প্লিজ বিকেলের টিকিটই করে দিন। বেরিয়ে যাই। যদি করতে পারেন তাহলে খুব উপকার হয়।’
গুরুজি বলল, ‘ঠিক আছে। আমি দেখছি। তা বলো তো বাবা, বেনারস তোমায় কতটা শান্তি দিল?’
ঋজু বলল, ‘জানি না। আদৌ কোনোদিন শান্তি পাব নাকি, জানি না আমি।’
গুরুজি উঠে দাঁড়িয়ে কলসি থেকে এক গ্লাস জল গড়িয়ে খেলেন। তাকেও জল খাবে কিনা জিগ্যেস করলেন। ঋজু মাথা নেড়ে খাবে না বলল।
ঋজুর ফোন বাজতে শুরু করেছে, আননোন নাম্বার দেখেও ধরল না।
গুরুজি বললেন, ‘কী হল?’
ঋজু বলল, ‘ফালতু ফোন আসে মাঝে মাঝে। কোত্থেকে নাম্বার পায় জানি না। জ্বালিয়ে খেল।’
গুরুজি বললেন, ‘ধরো। সব কিছু কি ফালতু হয়? এই চক্করে কত গুরুত্বপূর্ণ ফোন মিস হয়ে যায় আমাদের।’
ঋজুর ফোন আবার বাজতে শুরু করল। একই নাম্বার। ঋজু এবার ধরতেই ওপ্রান্ত থেকে ঝিমলির আর্তনাদ শোনা গেল, ‘ঋজুদা, বিএইচইউ-র বিশ্বনাথ মন্দিরের সামনে এসো, শিগগিরি! বাবা পড়ে গেছে… বুঝতে পারছি না কী করব…’
ঝিমলি কাঁদতে শুরু করেছে চিৎকার করে।
ঋজু হতভম্ব হয়ে গুরুজির দিকে তাকাল। গুরুজি বললেন, ‘কী হয়েছে?’
ঋজু বলল সবটা।
গুরুজি বললেন, ‘আমার গাড়ি আছে। নিয়ে যাও… আচ্ছা দাঁড়াও, ব্যবস্থা করছি।’
ব্যস্ত হয়ে গুরুজি ঘরের বাইরে বেরিয়ে চিৎকার করে লোকজন ডাকতে শুরু করলেন।
