হৃদয়ের পদ্মবনে – ২

২

দলে ভিড়লে লোকে আজেবাজে কাজ করে। অ্যালার্ম দেওয়া সত্ত্বেও তার আগেই ঘুম ভেঙে গেছিল। একদল ছাত্রছাত্রীর গলা পাওয়া যাচ্ছিল। দীন দয়াল উপাধ্যায় স্টেশনে নামবে সে। অথচ সেই ছাত্রছাত্রীর দল হঠাৎ করেই সামনের দিকে এগোতে শুরু করায় তার মনে হয়েছিল ওদের সঙ্গে যাওয়াটাই ঠিক হবে।

প্রায় দুটো বগি হেঁটে পার হবার পর তার খেয়াল হল সে একটা ব্যাগ রেখে এসেছে। ওটাতেই মানিব্যাগ আছে। অগত্যা আবার পিছনের দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। রাতের অন্ধকারে আবার নিজের বার্থ খুঁজে ব্যাগটা পেয়ে ধড়ে প্রাণ এল।

একইসঙ্গে এই প্রশ্ন এল, এরা সবাই সামনের দিকে এগোচ্ছে কেন? অ্যাপ দেখাচ্ছে দীন দয়াল উপাধ্যায় স্টেশন আসতে এখনো আধ ঘণ্টা বাকি। সে নিজের সিটেই মিনিট দশেক বসল। বাকিরা সবাই রীতিমতো ঘুমোচ্ছে।

মিনিট দশেক বসেই আবার মনে হল ওরাই হয়তো ঠিক। হয়তো যত সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়, ততই ভালো। আবার ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল ঋজু।

ছাত্রছাত্রীরা যে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল, তাদের কাছে গিয়েই দাঁড়াল। কেউ বাঙালি, কেউ অবাঙালি। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে সব। নিজেদের মধ্যেও কথা বলছে না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় সবাই ঝিমোচ্ছে।

ঋজু ভাবল একবার জিগ্যেস করে কেন এত তাড়াতাড়ি ওরা এগোল, কিন্তু আর জিগ্যেস করল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাড়ি থেকে ছুটি কাটিয়ে এসে আবার কলেজ যাওয়ার কষ্টের দিনগুলো মনে পড়ল তার। টুয়েলভ অবধি বাড়িতে থেকে তারপর সেই যে একবার বাইরে বেরোনো, বাকি জীবনটা আর ফেরা হয়ে ওঠে না।

বাড়ির টান কি আর এত সহজে ভোলা যায়? বাকি জীবনটা সেই টান ভুলতে ভুলতেই কেটে যায় যেন।

ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ দীন দয়াল উপাধ্যায় স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াল। ঘোর অন্ধকারের সঙ্গে কুয়াশায় ঘিরে আছে স্টেশন চত্বর। বাকিদের ওভারব্রিজে উঠতে দেখে ঋজু তাদের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। ঘোর কুয়াশায় যেন কোনো স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে। কিছুই চেনে না সে। কিছুক্ষণ পর অ্যাপ ক্যাব বুক করার চেষ্টা করল। গাড়ির ড্রাইভার জানিয়ে দিল যাবে না। এই সময়ে কেই বা যেতে চায়? হতাশ হয়ে ক্যাবের আশা ছেড়ে দিল ঋজু।

আর এই কুয়াশার মধ্যেই সে ঘোষালদার দেখা পেল। এই তীব্র শীতের মধ্যে একটা হাফ-হাতা সোয়েটার পরে ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন।

কোথাও যাবার এই একটা সমস্যা। চেনা শোনা কোনো না কোনো লোকের সঙ্গে ঠিক দেখা হয়ে যাবে। এখানেও ঘোষালদার সামনে পড়ার প্রস্তুতি একেবারেই ছিল না তার। ঋজু থমকে গিয়ে বলল, ‘আরে, তুমি?’

ঘোষালদা বিরক্ত মুখে বললেন, ‘আর বলিস না ভাই। শ্বশুরমশাই গোটা গুষ্টি নিয়ে এসেছেন। আমাকেও আসতে হয়েছে। তুই পালা। তোর বউদি তোকে দেখতে পেলেই ওর বোনের সঙ্গে আলাপ করতে বলবে।’

ঋজু দাঁড়াল না। ঘাবড়ে গিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এর আগে ঘোষালবউদির পাল্লায় একবার পড়েছিল সে। ভয়ানক মহিলা। কাছেপিঠে না থাকাই ভালো।

অটোওয়ালারা স্টেশনের বাইরে মুরগি ধরার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে ঠিকানা বলায় একজন বলল চারশো টাকা নেবে। এই শীতের মধ্যে অটোতে চারশো, আর ক্যাব দেখাচ্ছিল ছ’শো টাকা।

এদিক সেদিক দরদাম করে দেখল এর কমে কেউ যাবে না। অগত্যা তাতেই রাজি হতে হল।

অটো কিছুটা যেতেই দাঁড়িয়ে গেল, কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঋজু সভয়ে জিগ্যেস করল, ‘কী হবে এবার?’

অটোওয়ালা পান খেতে খেতে জানাল চিন্তার কোনো কারণ নেই। এই জায়গাটা পেরোলেই নাকি অত কুয়াশা থাকবে না।

ঋজু অবাক হল, ‘কিন্তু পেরোবেন কী করে?’

অটোওয়ালা অটো স্টার্ট করে বলল, ‘ও ঠিক চলে যাব। অভ্যাস আছে।’

‘দেশে বিদেশে’ মনে পড়ে গেল ঋজুর। আলি সাহেব জানিয়েছিলেন ভয়াবহ বাঁক এলে তিনি চোখ বন্ধ করে দেন, বাস ড্রাইভার হেসে বলেছিলেন তিনিও তাই করেন।

ঋজুর ঘোরতর সন্দেহ হল অটোওয়ালাও তাই করেছে। তবে কিছুক্ষণ পর দেখা গেল ঠিকই বলেছিল। অটোর আলোয় ব্রিজ, রাস্তাঘাট, অলিগলির মধ্যে ছোট ছোট মন্দির, সবই স্পষ্ট দেখা গেল। ঠান্ডা হাওয়া আসছে, ঢেকেঢুকেও শীত আটকানো যাচ্ছে না।

অ্যাপের মাধ্যমে যে ঘরটা বুক করেছে, তার মালিককে ফোন করতে সে জানাল তার চেক-ইন সকাল দশটায়। এখন কোনো ঘর নেই, তবে তার জন্য বাথরুম আর বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

অটো থেকে নেমে তার নির্দেশমতোই ঋজু একটা বিল্ডিংয়ের তিন তলার এক কোণে পৌঁছে দেখল এক প্রৌঢ় তার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাকে দেখে কোলাপসিবল গেট খুলে দিলেন।

ঋজুকে ব্যাগ রাখতে দিয়ে প্রৌঢ় জানালেন এখন দুটো ঘরই ভর্তি। তবে তার জন্য লেপ-তোশক রাখার ঘরটা খুলে দেবেন। সে সেখানেই বিশ্রাম করতে পারে।

ঘর খুলে দেবার পর দেখা গেল বিরাট ঘর। ঝকঝক করছে। মেঝেয় তোশক পেতে বিছানা করে রাখা আছে।

শেষ রাতের ঘুম ভাঙাটা বড় বিরক্তিকর ছিল। ঋজু বাথরুম সেরে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *