হৃদয়ের পদ্মবনে – ১৭

১৭

গুরুজি ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিলেন। একটা সুন্দর ধুপের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

তাদের দেখে বললেন, ‘তোমরা ফরাশে বসো। আমি চা বলছি। নিশ্চয়ই কিছু খাওয়া-দাওয়াও হয়নি। আইয়ার এসেই খাবার আনতে বেরিয়েছে। চা খেয়ে কিছু খেয়ে নাও।’

ঋজু ব্যাগ রেখে বলল, ‘আপনি আমাকে সকালেই বলেছিলেন আজ বিকেলে আমার ফেরা হবে না। কী করে জানলেন?’

চন্দনদাকে সে এই প্রশ্নটা রাস্তায় আসার সময়েই করেছিল, চন্দনদা শুধু বলেছিল, ‘তুই-ই জিগ্যেস করিস।’

ঋজুর প্রশ্নের উত্তরে গুরুজি বললেন, ‘এমনিই বলেছিলাম। তোমার টিকিট হয়নি, মনে হল ফেরা হবে না। অলৌকিক কিছু ক্ষমতা নেই আমার।’

ঋজুর বিশ্বাস হল না। তার স্পষ্ট মনে আছে গুরুজি কথাটা বলেছিলেন। গুরুজি বললেন, ‘ভদ্রলোক কি একেবারেই কিছু মেনে চলতেন না?’

ঋজু মাথা নাড়ল, ইসিজি ক্লিনিকের কথাও বলল। গুরুজি বললেন, ‘আমাদের অনেকের মধ্যেই অস্বীকার করার প্রবণতা থাকে। কেউ একটুতেই ভয় পেয়ে যায়, আবার কেউ কেউ কিছুতেই স্বীকার করতে চায় না তার কিছু হয়েছে। ভদ্রলোক সেরকমই ছিলেন। মনুষ্যজীবন, বুঝলে? আমাদের এই দেহের কোনো মূল্য নেই, সবটাই ওই প্রাণবায়ু ধরে রেখেছে। প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়া মানে সব ওখানেই শেষ।’

শ্বাস ছাড়লেন গুরুজি।

চন্দনদা বলল, ‘আমার মনে হয় তোর ওদিকে আর না গেলেও হয়। ওদের পরিবারের সবাই এসে গেছে। ওরা সামলে নেবে।’

ঋজু কিছু বলার আগেই গুরুজি বললেন, ‘কেন যাবে না? যে ঘটনায় ঋজু না চাইতেও জড়িয়ে পড়েছে, সেখানে এই সময় ও না থাকলে হয়? সবটা ছিল, এটুকুও থাকুক। ওই পরিবারের সঙ্গে ঋজুর কবে ডিভোর্স হয়ে গেছে। এরকমও হতে পারত, ভদ্রলোকের সঙ্গে ঋজুর আর দেখাই হতো না কোনোদিন, অনেক দিন পর ঋজু জানতে পারল উনি আর নেই। দুটো ঘটনা কি ঋজুর মনে একই প্রভাব ফেলবে? কেউ চেয়েছেন বলেই তো হয়েছে?’

ঋজু মাথা নিচু করে বসে রইল। সারাদিন এই কথাটা তারও মনে হয়েছে। যে লোকটার সঙ্গে তার এত দিন দেখাই হয়নি, যে সম্পর্কটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছিল, এভাবে এমন একটা দিনে তার সামনেই এই ঘটনাটা ঘটতে হল?

চন্দনদা বলল, ‘না মানে গুরুজি, ঋজু আসলে একটু ঘাবড়ে যায়। ইসিজি করতে গিয়েও ঘাবড়েছিল, ওখানে হাসপাতালেও একবারও বডির সামনে যেতে পারেনি।’

গুরুজি বললেন, ‘কোনোদিন মুখোমুখি হতে হয়নি বলে। কিন্তু হতে তো হবেই। জীবন যেমন আছে, মৃত্যুও আছে। মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সাহস আনতে হবে। মুখোমুখি হতে হবে ঋজু।’

ঋজু বলল, ‘বাবা-মা’র কিছু হবে ভাবলেও আমার শরীর খারাপ লাগে গুরুজি।’

গুরুজি বললেন, ‘তাতে কি কিছু আটকাবে? সময়ের নিয়মে সব কিছু হবে। আমরা কিচ্ছু করতে পারব না। মনুষ্যজন্ম মানে বেঁচে থাকো, কর্ম করো, দুঃখ ভোগ করো, সুখ ভোগ করো, চলে যাও। এর অন্যথা তো কারও জন্য হয়নি। কোনো কিছুকেই তোমার দুর্বলতা বানিও না। সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, তবে না তুমি বুঝবে মানবজীবনের প্রতিটা ধাপের মানে। পৃথিবীতে আমরা এসেছি মানে চলেও যেতে হবে ঠিক। মানুষ আজ থাকবে, কাল থাকবে না। না থাকলে কী হবে, সেটা ভেবে নিজে অসুস্থ হবে কেন?’

ঋজু বলল, ‘এই বয়সে এই শিক্ষা নিয়ে আর কী হবে গুরুজি? আমার তো সব শেষ হয়েই গেছে।’

‘কিচ্ছু শেষ হয়নি। কোনো কিছু এত সহজে শেষ হয় না। তুমি কাল যাবে। বয়স আবার কী? চল্লিশ বছর কোনো বয়স নাকি? আমি সত্তর বছর বয়সি আমেরিকানদের দেখেছি বিয়ে করে হানিমুনে এদেশে ঘুরতে এসেছে। আসলে জীবনটাকে আমরা ভীষণ ভয়ের চোখে দেখে ফেলেছি। এত ভয়ের তো কোনো দরকার নেই। পাবে ভয়?’

ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে গুরুজি। ভয় পাব না। মুখোমুখি বসে দেখব কী করতে পারি।’

টিভিতে বিভিন্ন দেশের নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন দেখানো চলছে। আইয়ার খাবার নিয়ে এসেছেন। তাদের সবাইকে খাবার দেওয়া হল। একসঙ্গে খেতে বসেছে সবাই। গুরুজি আইয়ারের সঙ্গে তামিলে কথা বলছেন। ঋজু রুটি খেতে চাইছিল না, ধমক দিয়ে রুটি খেতে বললেন তিনি।

খেয়ে দেয়ে উঠে চন্দনদা বলল, ‘তুই ঘুমিয়ে পড়। সকালে আমি তোকে ঘাটে নিয়ে যাব। বেশ ক্লান্ত লাগছে তোকে।’

ঋজু বলল, ‘একটু বসি। এখন সবে আটটা বাজে। এখনই কী ঘুমাব?’

চন্দনদা বলল, ‘ঠিক আছে। বস তাহলে কিছুক্ষণ।’

ঋজু গুরুজির ঘরে গিয়ে বসল। গুরুজি বললেন, ‘আইয়ার রাবড়ি এনেছে। এখন খাবে, না আরেকটু পরে খাবে?’

ঋজু বলল, ‘খেতে ইচ্ছে করছে না গুরুজি।’

গুরুজি বললেন, ‘একটু বসো। খানিকক্ষণ পরেই খিদে পাচ্ছে দেখবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভেব না।’

ঋজু দেওয়ালে হেলান দিল। সে চন্দনকে বলেছে বটে এখন ঘুমোবে না, কিন্তু একটু চোখ বুজতেই ঢলে পড়ে যাচ্ছিল। চন্দনদা বকা দিল, ‘এই দ্যাখো, ঘুম পেয়েছে, এদিকে বলছে ঘুমাবে না। চল চল।’

গুরুজি বললেন, ‘হ্যাঁ, ওকে ঘুম পাড়িয়ে দাও। একেবারেই নরম গোছের ছেলে দেখছি।’

চন্দনদার ঘরটা ছোট হলেও চমৎকার বিছানা করা। কম্বল মুড়ি দিতেই ঘুম নেমে এল চোখে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, খেয়াল নেই, ঘুম ভাঙল ফোনের রিংয়ের শব্দে। সে দেখল ঝিমলি ফোন করছে। অবাক হয়ে ধরল ফোনটা, ‘বলো ঝিমলি।’

‘তুমি কাল আসবে তো ঋজুদা?’

কাতর কণ্ঠে জিগ্যেস করল ঝিমলি।

ঋজু বলল, ‘আসব। ভেব না। তুমি খেয়েছ?’

‘হ্যাঁ। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ঋজুদা।’

ঋজু কী বলবে বুঝতে পারল না। চুপ করে রইল।

ঝিমলি বলল, ‘দিদি বলছিল তোমাকে যেন বলি আর আসতে হবে না। আমি বারণ করেছি। বলেছি তুমি যে সময়টা ছিলে, তখন তো কেউ ছিল না। তাহলে শ্মশানে কেন থাকবে না?’

ঋজু বলল, ‘আমি থাকব। কাল ঠিক চলে যাব। ভেব না। বাকিরা এসেছেন?’

‘শেষ রাতের দিকে চলে আসবে সবাই।’

‘ঠিক আছে, একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো।’

ঝিমলি ফোন কাটল না। ঋজু বুঝল ঝিমলি কাঁদছে। বাইরে থেকে বাজি ফাটার শব্দ আসছে। আরেকটা নতুন বছর এল।

কারও শোক আছে নাকি, কারও রোগ আছে নাকি, তা দেখার দায়িত্ব বাজির থাকে না। একটানা শব্দ হয়ে চলেছে।

ফোন কানে দিয়ে শুয়ে রইল ঋজু।

ঝিমলিকে সান্ত্বনা জানানোর ভাষা তার জানা নেই…

পৌষালিও মেসেজ করেছিল। রিপ্লাই দেয়নি ঋজু। বার বার ফোন করছিল বলে ব্লক করে দিয়েছে। আর কথা বলবে না পৌষালির সঙ্গে। এই অভ্যাস থেকে তাকে বেরোতে হবে। সব অভ্যাসই গলার ফাঁস হবার আগে সেটা থেকে বেরোতে হয়। সে বাকি সব কিছু থেকেই বেরোতে পেরেছিল। পৌষালির থেকেও পারবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *