হৃদয়ের পদ্মবনে – ৪

৪

প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ঘুমাল ঋজু। এই ঘরের ভেতরে বাইরের শব্দ আসে না, কোনো চিৎকার চ্যাঁচামেচিও নেই। পাশের ঘর থেকে কিছু শব্দ আসে, যারা আছেন, তারা কথা বললে কিছুটা শোনা যায়, তবে তারাও তখনই চেক-আউট করে বেরিয়ে গেলেন বলে ফাঁকা হয়ে গেল হোমস্টে।

একপ্রকার নিরুপদ্রব ঘুম হল। দুটো পাশাপাশি ঘর। একটা বড় হলঘর। একটা কমন বাথরুম। সে একটা ঘর পেয়েছে। আরেকটা ঘরে অন্য কেউ আসবে।

ঘুমের মধ্যে মাঝে-মাঝেই আঁখির সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে সে। ঘুম থেকে ওঠার পর দেখে ঘামে মাথা ভিজে গেছে। এটা কি হাই প্রেশারের লক্ষণ? সেই কবে হাই প্রেশার ধরা পড়েছিল, তারপর থেকে একই ওষুধ খেয়ে যায়।

ঘর থেকে বেরিয়ে ঋজু দেখল প্রৌঢ় কেয়ারটেকার খবরের কাগজ পড়ছেন। ওকে দেখে বললেন, ‘আপনি কি ঘুরতে বেরোবেন?’

ঋজু বলল, ‘নাহ। আর একবার ঘাটগুলো থেকে ঘুরে আসি। কাল না হয় অন্য কোথাও যাব।’

‘এখানে অনেকে এসে আপনাকে ধরবে, নৌকো ভ্রমণ ইত্যাদির নামে একগাদা টাকা চাইবে। এসবের পাল্লায় পড়বেন না।’

‘নাহ। আমি ঘুরতেই এসেছি।’

এসব বলে তৈরি হয়ে নীচে নেমেই সে এক টোটোওয়ালার ফাঁদে পড়ে গেল। কোথায় নতুন মন্দির হয়েছে, কোথায় নতুন নতুন ঘাট হয়েছে, এসব বলে টোটোয় তুলে নিল তাকে। অবশ্য এই সময় হাঁটতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না তার।

টোটোয় বসে শহরটাকে দেখতে দিব্যি লাগছিল। এত বড় শহর, একেকটা দিকে একেক রকম ছবি, মুগ্ধ হবার মতোই। পৌষালি মিসড কল মেরেছে। রিপ্লাই পায়নি, বার বার মেসেজ করছে। ঋজুর এখন একেবারে ফোন ঘাঁটতে ইচ্ছে করছে না।

ফোনের ভেতরের দুনিয়াটা যে কতটা মেকি, তা বুঝতে শেখার পর থেকে তার ফোন ঘাঁটার আগ্রহ কমে গেছে। তবে সময় না কাটলে ফোনের বিকল্প নেই তার কাছে। আজকাল বইও পড়তে ইচ্ছে করে না। অথচ একটা সময় বই-ই সব ছিল তার। সারাক্ষণ গল্পের বই পড়ে যেত। ফোন এসে বই পড়াটাকে শেষ করে দিয়েছে।

মাফলারটা ভুল করে ঘরে ফেলে এসেছিল। ভেবেছিল দুপুরের দিকে লাগবে না। দেখা গেল বেশ ঠান্ডা লাগছে। বেনারসের শীতকে উপেক্ষা করা ঠিক হয়নি। টোটো দাঁড় করিয়ে একটা টুপি কিনে নিল ঋজু। টোটোওয়ালা নৌ-যাত্রার টোপ দিচ্ছিল, সে জানাল পরের দিন যাবে।

টোটোওয়ালা এক বিখ্যাত লস্যির দোকানে নিয়ে গেল ঋজুকে। খাবে না খাবে না করেও শেষমেশ খেয়েই নিল। সত্যিই লস্যির স্বাদ অপূর্ব।

লস্যির টাকা দিয়ে টোটোতে উঠতে যেতেই সোমনাথের সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল তার। সোমনাথ পরিবার নিয়ে টোটোতে যাচ্ছিল। টোটো দাঁড় করিয়ে তড়িঘড়ি নেমে এসে বলল, ‘আরে তখন ওদের ফোন পেয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে গেলাম। আর কথা হল না। এখন কোথায় যাচ্ছিস? আয় একবার ওদের সঙ্গে পরিচয় করে নে।’

সামাজিকতা রক্ষা ঋজুর কোনোকালেই খুব একটা আসে না। তবু হাত জোড় করে সোমনাথের শ্বশুর, শাশুড়ি এবং স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করল সে। দেখল সোমনাথের বউয়ের মুখ থমথমে। ঝগড়া হয়েছে হয়তো।

সোমনাথ বলল, ‘তুই কি ঠিক করে রেখেছিস কোথায় যাবি?’

ঋজু বলল, ‘সেরকম কিছু না। এদিক সেদিক ঘুরছি।’

‘তাহলে আমাদের সঙ্গেই চল। আমরা এখন নমো ঘাটে যাচ্ছি। আমি বরং তোর টোটোতে উঠে যাই।’

ঋজু আর বারণ করল না। সোমনাথ তার টোটোতে উঠে পড়ল। দুটো টোটো একসঙ্গে চলতে শুরু করল।

সোমনাথ বলল, ‘আজ একেবারে সারনাথটাও করে নেব ভাবছি। তুই কি সারনাথ যাবি?’

ঋজু একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘যাওয়াই যায়। টোটোওয়ালাও তো শুরুতে যাবে বলেছিল।’

সোমনাথ বলল, ‘চল চল। ঘুরে নিই। তুই থাকলে আর অতটা একঘেয়ে লাগবে না ঘুরতে।’

ঋজু বলল, ‘একঘেয়ে লাগার তো কিছু নেই। দিব্যি লাগছে।’

‘তুই বুঝবি না।’ সোমনাথ গম্ভীর হয়ে গেল।

ঋজু আর কিছু বলল না। শহরের এক কোনা থেকে অন্য কোনা অবধি টোটো যাচ্ছে। এদিকটা বড় রাস্তা আছে, মাঝে মাঝে প্রবল ঠান্ডা হাওয়াও দিচ্ছে। একটু পরে সোমনাথ বলল, ‘বিয়েটা কেন করলাম ভাই?’

ঋজু হেসে ফেলল, ‘কী নিয়ে ঝগড়া করলি আবার?’

সোমনাথ বলল, ‘পরে বলব। অনেক জটিল কেস। ডাক্তার দেখানো দরকার।’

ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে। পরে বলিস।’

টোটো দুটো কাছে এলে না চাইতেও সোমনাথের স্ত্রীর উপর চোখ পড়ে যাচ্ছিল। সচেতনভাবে অন্যদিকে দেখল ঋজু। কোনো কোনো তথ্য না জানলেও খুব একটা অসুবিধা হবার কথা না।

নমো ঘাট নতুন তৈরি হয়েছে। টোটো থেকে নেমে সোমনাথ বলল, ‘এখান থেকে সারনাথ যাব তবে। কী বলিস?’

ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে। তোরা ঘোর। আমি একটু চা খেয়ে নিই।’

সোমনাথ কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। পরিবারের সঙ্গে ঘাট চত্বরের ভেতরের দিকে রওনা দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *