হৃদয়ের পদ্মবনে – ১৫

১৫

আঁখির কথাটাই বার বার মনে পড়ছিল ঋজুর। কোনো কিছুই বিনা কারণে ঘটে না। বেনারসে একই জায়গায় মেসোদের আসারও নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য ছিল। চন্দনদা আর ওর কলিগ আইয়ারকে নিয়ে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায় যেতে যেতেই ঝিমলির আবার ফোন পেল সে। প্রথমে ঝিমলি কোনো কথাই বলতে পারছিল না। কাঁদতে কাঁদতে যা বলল তাতে ঋজুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। মেসো কোনো সাড়া দিচ্ছে না। একজন ডাক্তার দেখে বলেছেন সব শেষ হয়ে গেছে। সে যেন হেরিটেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছায়। ওরা ওখানেই আছে।

টোটো করে সবে মন্দিরের গেট অবধি পৌঁছেছিল মাসিরা। টোটো থেকে নেমেই মেসো বুক চেপে রাস্তায় বসে পড়েন। আশেপাশে যারা ছিল সবাই ছুটে আসে। টোটো করে হাসপাতাল নিয়ে যাবার রাস্তাতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে পড়েন মেসো।

হাসপাতালের সামনে মাসি পাথরের মতো একটা বেঞ্চে বসে আছেন। মেসোর নিথর শরীরটা কোলে নিয়ে বসে কেঁদে যাচ্ছে ঝিমলি। ঋজুর মাথা ঘুরে গেল। সে নিজেও গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় বসে পড়ল। চন্দনদা তাকে সামলাতে যেতেই সে বলল, ‘আমাকে দেখার দরকার নেই, তোমরা দ্যাখো কী করবে। আমি দেখতে পারব না। অন্য দিকে যাচ্ছি।’

সে কোনোমতে উঠে উলটো দিকে হাঁটতে শুরু করল। নিজেকেই দোষী বলে মনে হচ্ছিল তার। মেসোর কথা শুনেই মনে হচ্ছিল ইসিজি টেকনিশিয়ান কিছু একটা বলেছিলেন। হয়তো তখনই ভর্তি হতে বলেছিলেন। মেসো শোনেননি। একটা বেঞ্চে কোনোমতে বসল ঋজু।

এত প্রাণোচ্ছল একটা মানুষ, এভাবে চলে গেলেন? বুঝতে পেরেছিলেন নিশ্চয়ই, নইলে ওই কথাগুলো বলতেন না। ঝিমলির কান্না তার মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল সে। কিছুতেই কাঁদা যাবে না। নিজেকে অপদার্থ মনে হচ্ছিল তার।

আঁখি বলত, ঋজু কোনো কাজের না, লোকজন বিপদে তাকে ডাকছে আর সে এসে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ঠিকই বলত। নিজের উপরেই ঘেন্না হচ্ছিল তার।

চন্দনদা এসে বলল, ‘ওদের বাড়ির কাকে চিনিস? ফোন কর। খবর দে। যাকে পারিস তাকে খবর দে। ওদের দু’জনের সঙ্গে কথা বলার পরিস্থিতি নেই এখন। কিছু তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে।’

ঋজু ফোন বের করে কয়েক সেকেন্ড শূন্য চোখে বসে থেকে আঁখিকে ফোন করল। ফোন কেটে গেল। সে মেসেজ করল, ‘মেসো আর নেই।’

এবার আঁখি কল ব্যাক করল, সে ফোন ধরতেই ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, ‘কী হয়েছে?’

ঋজু সবটা বলল।

আঁখি চুপ করে গেল। ঋজু বলল, ‘আমি এখানেই আছি। আমাকে একটা ডিসিশন দাও। মাসির সঙ্গে আমি কথা বলতে পারব না। তুমি ফোন করো। করে যা ঠিক করবে, দ্যাখো।’

ফোন কেটে গেল। একটু পরে আবার আঁখি তাকে ফোন করে বলল, ‘আমরা বেনারস যাচ্ছি। দেখছি ফ্লাইট পাওয়া যায় নাকি। তুমি ততক্ষণ…’

ঋজু বলল, ‘আমি আছি। তোমরা এসো।’

ফোন কেটে গেল।

চন্দনদা এসে বলল, ‘গুরুজি ব্যবস্থা করছেন। এখানেই সব কাজ হবে, মাসি বললেন। ওর বাড়ির লোকজন আসবেন। বডি রাখার ব্যবস্থা, ডেথ সার্টিফিকেট সব কিছু গুরুজি দেখে নেবেন। ভাবিস না।’

ঋজু বলল, ‘কী আশ্চর্য চন্দনদা, এই তো সকালে ইসিজি করাতে নিয়ে গেলাম। এর মধ্যে এত বড় কিছু…’

ঋজুর হাত-পা কাঁপছে। বুক ধড়ফড় করছে। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে যাতে চন্দনদা কিছু না বোঝে।

চন্দনদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘কপাল। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক জিনিসটা এরকমই। কারও কিছু করার ছিল না। ভদ্রলোক কিছু ইঙ্গিত পেয়েছিলেন নিশ্চয়ই। শরীর ঠিকই সিগনাল দেয়। বুঝতে চাননি।’

মাসি দু’হাতে মুখ ঢেকেছেন। কাঁদছেন। ঋজু বলল, ‘কী একটা পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। এর থেকে তো আমি এখানে না থাকলেই ভালো হতো। আমার থাকা অবস্থাতেই এরকম কিছু হতে হল?’

চন্দনদা ঋজুর কাঁধে হাত দিল, ‘হবার ছিল। হয়েছে। তোর তো কিছু করার নেই।’

ঋজুর মনে হল, চাইলে কি বাঁচানো যেত? ইসিজি করে এসে মাসিকে যদি সে তার সন্দেহের কথাটা বলত, তাহলে হয়তো কিছু করা যেত। সত্যিই সে একটা অপদার্থ।

অন্যান্য দিনের মতো আজকের দিনটা কুয়াশাচ্ছন্ন নয়। রোদ ঝলমলে একটা শীতের দুপুর। বছরের শেষ দিন। শহর সেজে উঠছে। চলে যাবার জন্য এমন বিশেষ একটা দিন নির্বাচন করলেন মেসো? কী অদ্ভুত সমাপতন! সকালে মন্দিরে গেলেন, মন্দির থেকে ফিরে ইসিজি করিয়ে ঘুরতে বেরোলেন, আর সব শেষ।

বিয়ের দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল ঋজুর। অনেক গান, গল্প, আড্ডা হয়েছিল বাসর জাগার রাতে। মেসো একাই জমিয়ে রেখেছিলেন। যখনই কোথাও গেছেন, সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। সেই লোকটার এভাবে যাবার ছিল? কেমন নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন এখন!

ডাক্তারবাবু এসেছেন। ঝিমলি চিৎকার করে কাঁদছে। মাসি গিয়ে দাঁড়িয়েছেন ঝিমলির কাছে।

ওকে সান্ত্বনা দিতে দিতে নিজেই কেঁদে ফেলছেন।

চন্দনদা বলল, ‘তোর ওই বাড়ি থেকে সবাই আসবে, তাই তো?’

ঋজু মাথা নাড়ল, ‘হুঁ। থাকতে হবে এখন যতক্ষণ না আসে। আসুক, তারপর না হয় চলে যাব।’

চন্দনদা বলল, ‘তুই বস। বডি আপাতত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চিন্তার কিছু নেই, আমি কথা বলছি। ওরা ফিরে গিয়ে একটু রেস্ট করুক।’

ঋজু বলল, ‘রাজি হবে?’

‘এখানে সারাদিন থাকার তো কোনো মানে নেই। এভাবে থাকা যায়?’

ঋজু বলল, ‘দ্যাখো কথা বলে।’

চন্দনদা না থাকলে কিছুই হতো না হয়তো। হয়তো হতো, কিন্তু এত মসৃণভাবে হতো না। একাই সবটা সামলে নিল ফোন করে। বডি রাখার ব্যবস্থাও হল। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে সব কিছু মিটিয়ে দিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে দিল। বলল আরও কিছু কাজ আছে। করে পরে যাচ্ছে।

গাড়িতে উঠে ঝিমলি ঋজুর হাত ধরে আবার কাঁদতে শুরু করল। ঋজু কী বলবে বুঝতে পারল না, চুপ করে রইল।

মাসি ধ্বস্তকণ্ঠে বলল, ‘বরাবরের এসকেপিস্ট। সেই পালিয়ে গেল। বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। সকাল থেকে বললাম তুমি খালি পেটে থেকো না। শুনল না। ইসিজিতে নিশ্চয়ই কিছু ধরা পড়েছিল।’

এখনও চুপ করে আছে ঋজু। মাসি বলল, ‘তোমাকে বিপদে ফেলে দিলাম। কিন্তু আমরা তোমাকে ছাড়া তো কাউকে চিনি না এখানে। ওরা এলে না হয় তুমি…’

ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে। এখন এসব নিয়ে এখন ভাবার দরকার নেই।’

মাসি শূন্য চোখে বসে রইলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *