ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

হিলি হ্যাকার – সৈকত মুখোপাধ্যায়

হিলি হ্যাকার

হিলির সঙ্গে আমার আলাপ টিনার মাধ্যমে। হিলির আসল নাম হিল্লোল ঘোষ। বয়সে আমাদের চেয়ে অনেকটাই বড়ো। নিজেই একবার কথায় কথায় আমাকে বলেছিল, দু’হাজার সাতে ওকে নাকি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট থেকে বের করে দিয়েছিল। তার মানে এখন ওর বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ তো হবেই।

আমি, টিনা, জোকার আর শ্যামু মানে শ্যামলী— আমরা একবয়সি সবারই তেইশ। ইন ফ্যাক্ট আমরা সেই নার্সারি থেকে ক্লাস টেন অবধি এক স্কুলে, এক ক্লাসে পড়েছি। থাকিও সবাই ঢাকুরিয়ার আশেপাশে। তাই বন্ধুত্বটা একইরকম রয়ে গেছে।

আমি আর শ্যামলী আই. টি. সেক্টরে চাকরি পেয়ে গেছি। এখন হাইব্রিড সিস্টেমে কাজ চলছে, তাই প্রতিদিন অফিসে যেতে হয় না। দু’দিন গেলেই চলে। বাকি দিনগুলো ওয়ার্ক ফ্রম হোম। জোকার মেডিকাল রিপ্রেজেন্টেটিভ। হিসেবমতন প্রতিদিনই তারকেশ্বর, আরামবাগ ওইসব সাইডে হাতে ব্যাগ নিয়ে ডাক্তারদের চেম্বার ভিজিট করার কথা; তবে করে না। বলে, সপ্তাহে দু’দিন গিয়েই নাকি সেল্সের টার্গেট তুলে দেয়। হতেও পারে। শালার যা কথার তোড়! শ্যামলী বলে, ও নাকি অন্ধদের দেশে আয়না বেচে দিয়ে আসতে পারে!

আমাদের মধ্যে টিনাটাই এখনও বেকার। ওর জন্য একটু চিন্তাই হয়। আসলে ছোটোবেলা থেকে মেয়েটা একইসঙ্গে আঁতেল এবং মস্তিবাজ। অদ্ভুত কম্বিনেশন মাইরি। এরকম আমি আর দেখিনি। সারাদিন বাড়িতে বসে ভারী ভারী প্রবন্ধের বই পড়ছে। তারপর পার্টিতে গিয়ে সারারাত উদোম নাচছে, ড্রিঙ্ক করছে। একটু হ্যান্ড্রু মাল দেখতে পেলেই ঝাড়ি করে তাকে পটিয়ে কটাদিন প্রেম প্রেম খেলছে। ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড নিয়েও শুচিবাই নেই।

আগে ওকে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করতাম, ‘তোর প্ল্যানটা কী? কী করবি বলে ঠিক করেছিস?’

কখনও উত্তর দিত, ‘এসকর্ট সার্ভিসে নাম লেখাব। হেব্বি ডিম্যান্ড।’ কখনও বলত, ‘একটা বড়োলোকের ল্যালা ছেলেকে বিয়ে করে তার পয়সায় দেশ-বিদেশ ঘুরব।’ আবার কখনও বলত, ‘এই তো পরশুই পার্বতী বাউলের আখড়ায় যাচ্ছি। বাকি জীবনটা গান বেঁধে কাটিয়ে দেব।’

এইসব ঝটি-জ্বালানো রিপ্লাই শুনতে শুনতে একদিন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করাই ছেড়ে দিলাম

তাছাড়া আমাদের সবারই একজন করে স্টেডি পার্টনার আছে। একমাত্র টিনারই কেউ নেই। অথচ প্রতি মাসে একটা করে হেক্কোড় দেখতে ছেলের সঙ্গে লাইন মারছে। তার পয়সায় আমাদের বারে নিয়ে গিয়ে ভরপেট্টা মাল খাওয়াচ্ছে। আবার মাস গেলে তাকে ফুটিয়ে দিয়ে নতুন ছেলে আনছে।

এমন অবস্থা হয়েছে, আজকাল ওর এক্সদের সঙ্গে রাস্তাঘাটে দেখা হয়ে গেলে আমরা… মানে আমি, জোকার কিংবা শ্যামলী লজ্জায় পড়ে যাই। আফটার অল, এদের পয়সাতেই বারে বসে বিলিতি দারু খেয়েছি। কিন্তু টিনার কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই।

একদিন খচে গিয়ে বললাম, ‘তোর নাঙদের পার্টিতে আমাকে ডাকবি না, বলে দিলাম!’

টিনা অবাক হয়ে বলল, ‘কেন? প্রবলেমটা কী?’

আমি বললাম, ‘আগে বল, তোর প্রবলেমটা কী? এখনও টিনএজার আছিস নাকি, এইভাবে ছেলে নাচিয়ে বেড়াচ্ছিস?’

টিনা খুব গম্ভীর হয়ে বলেছিল, ‘মনের মতন একজন পার্টনার খুঁজে বেড়াচ্ছি। খুঁজে না পেলে কী করব?’

আমি বললাম, ‘কাউকে পছন্দ হচ্ছে না? কেন? সকলেই তো যাকে বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলে সুপুরুষ, সুউপায়ী। ডিগ্রি-ফিগ্রি কার কেমন জানি না, কিন্তু টকাটক ইংরিজি সবাই বলতে পারে। দেন হোয়াট ডু ইউ ফাইন্ড ল্যাকিং ইন দেম?’

টিনা নিজের রগে আঙুলের টোকা মারতে মারতে বলল, ‘এইটা। খোপরির ভেতরে মগজ বলে যে জিনিসটা থাকে, সেইটার অভাব। জ্ঞানী এবং চিরজিজ্ঞাসু পুরুষ ছাড়া আমি আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না। এদের মধ্যে আমি সেরকম কাউকে পাইনি।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘জ্ঞানী এবং চিরজিজ্ঞাসু পুরুষরা সাধারণত কবি, অধ্যাপক কিংবা ফিল্মের ডিরেক্টর হন। কবিরা তাঁদের মহিলা ফ্যানেদের কাছ থেকে আর অধ্যাপকেরা তাঁদের আন্ডারে পি. এইচ. ডি. করতে আসা মেয়েদের কাছ থেকে অঢেল ভালোবাসা পান… সবরকমের ভালোবাসা। ফিল্মের ডিরেক্টররা হবু হিরোইনদের সঙ্গে নিয়মিত শুয়ে থাকেন। কাজেই তুই সেরকম কাউকে ভালোবাসতেই পারিস, কিন্তু ভালোবাসার প্রতিদান পাবি, এমন আশা কম।’

কথাটা যখন বলেছিলাম তখন শুধু আমি আর টিনাই যোধপুর পার্কের পাশের রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ঢাকুরিয়ার দিকে আসছিলাম। সঙ্গে আর কেউ ছিল না। আমার কথা শুনে টিনা মুখটা নামিয়ে কেমন যেন তদ্‌গতভাবে বলল, ‘না রে, রাতুল। অন্যরকম মানুষও আছে। ধান্দাবাজ হারামি নয়, রিয়েল জ্ঞানতপস্বী। তার আর কিচ্ছু নেই, শুধু একটা খোঁজ আছে, যাকে বলে কোয়েস্ট।’

কথাগুলো বলার সময় টিনা নিজের ভাবনার মধ্যে এতটাই ডুবে গিয়েছিল যে, আমি যে ওর দিকে তাকিয়ে আছি, সেটাও ও খেয়াল করেনি। অবাক হয়ে দেখছিলাম, আমার হাড়ে হাড়ে চেনা বান্ধবীটি হঠাৎ কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে ওকে আমার ভীষণ অসহায় লাগছিল। দূরবর্তী এক বাঁশির সুরে জড়িয়ে পড়া রাধিকার মতন অসহায়।

আমি হাঁটা থামিয়ে খপ করে ওর হাতটা চেপে ধরলাম। বললাম, ‘কী রে! তার মানে কাউকে ভালোবেসেছিস। বল কাকে?’

টিনা মনে হয় বলতেই চাইছিল। বলল, ‘বলব রে রাতুল। তবে এখনই নয়। তোকে একদিন ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাব। মুখোমুখি আলাপ করিয়ে দেব। কাল যাবি?’

আমি বললাম, ‘হারগিস যাব।’

***

পরদিন সন্ধেবেলায় টিনা আমাকে ওর প্রেমিকের বাসায় নিয়ে গেল। তার কথাই শুরুতে বলেছিলাম, সেই হিল্লোল ঘোষ।

‘বাসা’ শব্দটা ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম। ইংরিজিতে বললে বলা উচিত ‘ডেন’। হালতুর ভেতরদিকে একটা ফ্ল্যাটবাড়ির তিনতলায় এক- কামরার ফ্ল্যাট। আমরা নিজেরাও খুব একটা ঘরদোর সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখি না। তবু হিল্লোলের ঘরটা দেখার পরে আমাদের ঘরগুলোকে মনে হচ্ছিল ফাইভ-স্টার হোটেলের দামি রুম।

কত জন্ম সাধনার পরে খাটের ওপরে একটা প্লাস্টিকের বালতি ভরতি করে এঁটো কাগজের প্লেট রেখে দেওয়ার মতন নির্লিপ্ততায় পৌঁছোনো যায় কে জানে। টিনা আমার মুখ-চোখের অবস্থা দেখে ফিসফিস করে বলল, ‘আমারই দোষ। মাঝখানে এক সপ্তাহ আসতে পারিনি তো, তাই এরকম হাল হয়ে রয়েছে।’ এই বলে বিছানার তলা থেকে একটা ঝাঁটা বার করে ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করল।

খাটটা দেওয়ালের সঙ্গে লাগানো ছিল। আমাদের জন্য দরজা খুলে দিয়ে হিল্লোল আবার খাটে উঠে ওই দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়েছিল। দুটো পা সামনের দিকে লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে কোলের ওপরে ল্যাপটপটা তুলে নিয়েছিল। টিনা ঘর ঝাঁট দেওয়া শেষ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে রাখা বইখাতাগুলোকে টেবিলের ওপরে গুছিয়ে রাখতে শুরু করেছিল। হিল্লোল কিছুক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে খুটখাট করে তারপর বিরক্তমুখে সেটাকে নামিয়ে রেখে বলল, ‘ওগুলোকে সরানোর কী দরকার? যেমন আছে থাকতে দাও না!’

বুঝলাম ওর কনসেনট্রেশনে ব্যাঘাত ঘটছে বলে বিরক্ত হচ্ছে।

টিনা খুব নম্রভঙ্গিতে বলল, ‘এরকম পরিবেশে মানুষ থাকতে পারে? এইজন্যই বারবার অসুখে পড়ছ। তুমি তোমার কাজ করো না। আমি তো তোমাকে ডিস্টার্ব করছি না।’ এই বলে ফ্রিজের দরজাটা খুলে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। ওর অবাক হওয়ার কারণটা বুঝতে পারছিলাম। ফ্রিজের ভেতরটা একেবারে ল্যাপাপৌঁছা… খালি। একটা শুকনো ঢ্যাঁড়স অবধি পড়ে নেই।

টিনার শুধু কাঁদতেই বাকি ছিল। হিল্লোলের কাঁধে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘তুমি কী খাচ্ছ তা হলে? আদৌ কিছু খাচ্ছ? না উপোস দিয়ে রয়েছ?’

হিল্লোল অসহায়ের মতন বলল, ‘মনে নেই। কিছু তো খেয়েছি নিশ্চয়ই। না হলে বেঁচে আছি কেমন করে?’

টিনা পাগলের মতন দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বুঝলাম খাবার আনতে গেল। আমি সেই সুযোগে হিলির কাছাকাছি চৌকির ওপরে পিছনটা ঠেকিয়ে বসে ওকে বললাম, ‘হাই! আমি রাতুল চ্যাটার্জি। টি. সি. এস. এ আছি।’

ও বোধহয় ততক্ষণে মনের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে নিয়েছিল। মেনে নিয়েছিল যে, সেদিন সন্ধের মতন কাজটা মা’র ভোগেই গেল। তাই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। খেয়াল করলাম, ওর ঘরদোর এবং খাওয়া-শোওয়া নেশাখোরের মতন হলেও চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার ঝকঝকে। তার মধ্যে কোনও নেশাচ্ছন্নতা নেই। সম্ভবত ওর নেশাটা কাজের নেশা।

কিন্তু কাজটা কী?

উত্তরটাও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে গেলাম। হিলি বলল, ‘আমি হিল্লোল ঘোষ। সার্কিটে সবাই আমাকে ‘হিলি হ্যাকার’ বলে ডাকে।’

সার্কিটে! অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন সার্কিটে?’

হিলি রোগা হাঁটুদুটো দু’হাতে জড়িয়ে ধরে উদাস চোখে সিলিং-এর দিকে চেয়ে বলল, ‘হ্যাকারদের সার্কিটে, আবার কোথায়? সতেরো- বছর বয়সে একটা ন্যাশনালাইজ্‌ড ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করেছিলাম। টাকাপয়সা গাপ করিনি। ওসব পাপকাজ কোনওদিনই করিনি, করবও না। শুধু একটা মেসেজ রেখে এসেছিলাম- সিকিউরিটির এই এই জায়গাগুলোয় গলতা আছে, ঠিক করে নিন। তলায় নাম সই করে এসেছিলাম– হিলি হ্যাকার।

তারপর থেকে বহু এরকম কাজ করেছি। কখনওই ধরা পড়িনি। আমি যে লেভেলে কাজ করি তাতে আমাকে এমনিতে ধরা সম্ভবও নয়। শুধু আই. এস. আই.-তে যখন মাস্টার্স করছি তখন আমার হোস্টেলের এক রুমমেট গদ্দারি করল। মালটা আমার নামে অথরিটির কাছে চুকলি করল। তাতে ওরা একটা বড়ো কাজের একদম প্রাইমারি স্টেজে আমার প্রেজেন্স ট্রেস করতে পারল। কাজের শেষ অবধি পৌঁছোতেই পারল না। যা-ই হোক, ওই প্রাইমারি লেভেলের হ্যাকিং-এর জন্যই আমাকে ইনস্টিটিউট থেকে স্যাক করল। দ্যাট ইজ ইন দ্য ইয়ার টু থাউজ্যান্ড সেভেন।’

শুনে ভারি আফসোস হল। এই আমার প্রিয় বান্ধবীর প্রেমিক! এই নাকি বালের জ্ঞানতাপস! এ তো একটা পাতি হ্যাকার! ইচ্ছে করছিল তখনই নীচে নেমে টিনার ঘেঁটি চেপে ধরে পায়ের স্নিকার খুলে আগাপাশতলা ক্যালাই!

‘ঘেন্না হচ্ছে?’

প্রশ্নটা শুনে চমকে হিলির মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম, ওর তীব্র দুটো চোখের চাউনি আমার থোবড়াটাকে স্ক্যান করছে। মন পড়ে নিচ্ছে শালা!

আমাকে তাকাতে দেখে হিলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘ঘেন্না হচ্ছে? ভাবছ, টিনা এ কাকে ভালোবাসল? আমিও ওকে বারণ করেছিলাম, জানো? বলেছিলাম, আমার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ো না। নিয়মিত রোজগার নেই বলে নয়, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না বলে।’

শুনে আমি চমকে চোদ্দো! বললাম, ‘ইয়ে, মানে কোনও সিভিয়ার ডিজিজ-টিজিজ… মানে আমার বড়োমামা চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হসপিটালে …’

হিলি আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মুচকি হেসে আমার পিঠটা চাপড়ে দিয়ে বলল, ‘আরে না, ব্রাদার। ওসব কিছু নয়। আসলে আমি ওদের প্রোগ্রামটা হ্যাক করতে চাইছি তো। সেইজন্যই ওরা আমাকে মারবে। মারবেই। আজ না হলে কাল।’

আমি বললাম, ‘ওরা? মানে কোনও গ্যাং? একবার নামটা বলো, দাদা। আমার ছোটোমামা ক্যালকাটা পুলিশে…’

হিলি তড়াক করে বিছানা ছেড়ে নেমে জানালার ধারে গিয়ে একটা বিড়ি ধরাল। দাঁড়ানো অবস্থায় সেই ওকে প্রথম দেখলাম। প্রায় সাড়ে ছ’ফুট লম্বা, রোগা। ঢোলা পাজামাটা পায়ের গোছের নীচে আর নামেনি। বত্রিশ সাইজের স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে ঢলঢল করছে। পিঠের দিকের তিনকোনা হাড়দুটো মনে হচ্ছে গেঞ্জি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে। গায়ের রংটা ঠিক ফরসা নয়, অনেকটা ইটচাপা ঘাসের মতন ফ্যাকাশে। ঘরে বসে থেকে থেকেই এরকম হয়ে গেছে হয়তো।

বিড়িতে প্রথম টানটা দিয়ে ব্যথায় মুখ কোঁচকাল হিলি। বলল, ‘পেটে শালা আলসার-ফালসার কিছু একটা হয়েছে। বিড়ি-সিগ্রেট খেলেই চিনিক মারছে। ও হ্যাঁ, কোন গ্যাং জিজ্ঞেস করছিলে। কী করে উত্তর দিই বলো তো? মানুষ হলে গ্যাং বলতে পারতাম। ওরা তো মানুষ নয়। ওরা… ওরা… কী বলব? ওরা হচ্ছে প্রেজেন্স, উপস্থিতি। জাস্ট আছে, এই আর কী! আমি হিলি হ্যাকার, আপাতত তাদের পোঙায় কাঠি করছি, বুঝলে রাতুলভাই? ওদের সিস্টেম হ্যাক করছি।’

ভাবলাম, ওকে বলি, আমার জ্যাঠতুতো দিদির বর একজন নামকরা সাইকায়াট্রিস্ট। প্রয়োজন পড়লে তাকে… তারপর ভাবলাম, নাহ্, পাগলকে মুখের ওপর পাগল বলা ঠিক নয়। যা বলার টিনাকেই বলব।

ভাবতেই ভাবতেই টিনা হাসিমুখে ঘরে ঢুকল। দেখলাম ইতোমধ্যেই ওর মুড অনেক ভালো হয়ে গেছে। একটু আগের সেই আতঙ্ক আর নেই। প্রচুর বাজার করে এনেছে। তার মধ্যে আমাদের রাতের খাবারও ছিল।

তিনটে কাগজের প্লেটে ধাবার রুটি, ডাল-মাখানি আর চিকেন ভর্তা ভাগ করতে করতে বলল, ‘রাতুল, তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি হিলি তোকে নিজের সম্বন্ধে নানান আলফাল ইনফরমেশন খাইয়েছে। ওগুলো বিশ্বাস করিস না। যেটা ফ্যাক্ট সেটা হল, এথিকাল হ্যাকারদের জগতে এখন হিল্লোল ঘোষ একটা রিনাওল্ড নেম। এই মুহূর্তে ও সেন্ট্রাল জি. এস. টি.-র হয়ে পারমিট জাল করার একটা বড়ো নেটওয়ার্ককে বার্স্ট করছে। এইসব করে ও ভালোই ইনকাম করে। তবে নামটা গোপন রাখতে হয়, না হলে কেউ রিভেঞ্জ নিয়ে নেবে।’

মনে মনে বললাম, সেন্ট্রাল জি.এস.টি. মাই ফুট! আমি নিজে আই. টি.-তে আছি, ভালো করেই জানি, মিনিস্ট্রি অফ রেভিনিউ ওরকম রাস্তা থেকে ফ্লাইং হ্যাকার ভাড়া করে না। আলফাল ইনফরমেশন যদি খাইয়ে থাকে তা হলে তোকে খাইয়েছে, আমাকে নয়।

যা-ই হোক, খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমি বাইরের প্যাসেজে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট শেষ করলাম। আসলে টিনা যদি হিলিকে একটু হামি- টামি খেয়ে আসতে চায়, সেই সুযোগটা দিলাম। তারপর ফেরার পথে টিনাকে বললাম, ‘হিলি যে ব্রাইট সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তুই একটা কী যেন খোঁজ, কী যেন একটা কোয়েস্টের কথা বলেছিলিস না? হ্যাকিং জিনিসটাও কিন্তু দিনের শেষে একটা গতে বাঁধা কাজ। ওর মধ্যে কোয়েস্ট নেই।’

টিনা গর্বিত মুখে বলল, ‘জানি। কিন্তু এখন ও এথিকাল হ্যাকিং ছাড়িয়ে আরও অনেক ওপরের স্টেজে চলে গেছে। ও এটার নাম দিয়েছে কসমিক হ্যাকিং। এই মহাবিশ্ব, মানে কসমস একটা নিখুঁত প্রোগ্রামিং-এর ওপর বেস করে চলছে তো। ও সেই প্রোগ্রামটার মধ্যে হ্যাক করে ঢুকতে চায়। খুঁজে দেখতে চায় কোথায় তার ড্রাইভ, কোথায় সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট। কে বা কারা এই প্রোগ্রামটা বানিয়েছে এবং কেন। সেইজন্যই বলেছিলাম কোয়েস্ট।’

হাসি চাপতে পারলাম না। হাসতে হাসতেই টিনাকে বললাম, ‘যুগ যুগ ধরে সন্ন্যাসী আর বাউল-মিসকিনরা তো তাঁকেই খুঁজছে রে পাগলা- সেই দিনদুনিয়ার প্রোগ্রামারকে! কিন্তু সেই খোঁজটা তো এই হালতুর ফ্ল্যাটে, কোলে ল্যাপটপ নিয়ে বসে হবে না। তার জন্য ধ্যান চাই, ধ্যান। এক কাজ কর না? তুই আর হিলি গেরুয়া পরে বেরিয়ে পড়। কনখলের দিকে কোনও একটা গুহা-টুহা দেখে…’

টিনা আমার পিঠে একটা কিল বসাল। তারপর কান্না কান্না গলায় বলল, ‘তুই ইয়ার্কির ছলে একটা সত্যি কথা বলে ফেলেছিস কিন্তু, রাতুল। ওর খোঁজটার মধ্যে একটা প্রাণপাত সাধনা রয়েছে। দেখলি না, না খেয়ে বসে ছিল। কোনও বিকার নেই। আমি জানি রাতেও ঘুমোয় না। কিন্তু ও কখনও ঈশ্বর-আল্লার কথা বলে না।’

বললাম, ‘জানি। ও বলে প্রেজেন্স, অস্তিত্ব। তা-ই তো?’

‘তুই কেমন করে জানলি?’

‘হিলিই একটু আগে বলছিল। তুই তখন রুটি কিনতে গিয়েছিলিস।’

টিনা মোবাইলে একটা অ্যাপ-ক্যাব বুক করতে করতে খুব করুণ গলায় আমাকে বলল, ‘রাতুল, এখন প্লিজ এসব কথা ওদের দু’জনকে বলিস না, মানে শ্যামুকে আর জোকারকে। তবে তুই আমার সঙ্গে থাকিস। তোকে আমাদের দরকার পড়বে। হিলি খুব বিপদের মধ্যে আছে।’

***

সেদিন চলে এলাম ঠিকই, কিন্তু হিলি আমাকে ক্রমাগত টানছিল। সে এক অদ্ভুত টান, আমি ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। এর সঙ্গে টিনার কোনও সম্পর্ক নেই।

ওখান থেকে চলে আসার পরে পরপর তিন রাত আমি ওকে স্বপ্ন দেখলাম। প্রতিবারই এক স্বপ্ন। এক অতল খাদের ধারে হিলি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি ওকে পিছন থেকে দেখতে পাচ্ছি। আমি আস্তে আস্তে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। খাদের নীচের দিকে তাকিয়ে বুঝবার চেষ্টা করলাম, হিলি এত মন দিয়ে কে দেখছে। এবং যা দেখলাম তাতে চমকে উঠলাম।

চমকটাই মনে পড়ছে শুধু। একটা প্রবল ঝাঁকুনি, যার ফলে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলাম। কিন্তু কী দেখে যে অত অবাক হয়েছিলাম তা আর মনে পড়ছিল না।

অগত্যা আমাকে আবার একবার হালতুর সেই ফ্ল্যাটে যেতে হল। এবার একাই গেলাম। টিনাকে কিছু জানালাম না।

কলিং-বেলের আওয়াজে হিলি দরজা খুলে দিল।

আমরা আগে যেদিন এসেছিলাম তারপর তিনটে দিন কেটে গিয়েছে। ঘরটার মধ্যে আবার বাসি খাবারের গন্ধ জমে উঠেছিল। হিলির পরনে সেই একই পোশাক ঢোলা পায়জামা আর গেঞ্জি। ওর দাড়ির একজায়গায় শুকনো তরকারির দাগ। হাতে বড়ো বড়ো নখ। এই মুহূর্তে যদি ও রাস্তায় বেরোয়, ওকে লোকে পাগল বলে দাগিয়ে দেবে।

কিন্তু চোখ। না, ওর চোখ দেখে কেউ ওকে পাগল বলবে না। ওই দৃষ্টি আমি চিনি। আমার পরিচিত কিছু হ্যাকারের চোখে ওই দৃষ্টি আমি দেখেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শামুকের গতিতে একটা সূত্র ধরে এগিয়ে যেতে যেতে চোখগুলো ওইরকম কাচের লেন্সের মতন কঠিন আর উজ্জ্বল হয়ে যায়। অশ্রুগ্রন্থি শুকিয়ে যায় কি? তা-ই হবে।

সেদিন হিলি কিন্তু আমাকে দেখে একটুও বিরক্ত হল না। বরং খুব আন্তরিকভাবে আমার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘এসো, ব্রাদার। ভালো সময়েই এসেছ। একটু খিদে খিদে পাচ্ছিল। চলো একসঙ্গেই বসি।’

আমি আড়চোখে ঘড়ি দেখলাম। সন্ধে সাতটা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘লাঞ্চ করেছ?’

‘না, মানে ওই আর কী! এইবার করব।’

এই বলে হিলি ফ্রিজের দরজা খুলে দু’পিস কাঁচা পাউরুটি বার করে সেগুলোর ওপরে একটু টমেটো সস ঢেলে চিবোতে শুরু করল। আগের দিনই টিনা ফ্রিজ ভরতি করে নানারকমের ক্যান্ড ফুড রেখে গিয়েছিল। দেখে স্বস্তি পেলাম, তার অনেকটাই খরচ হয়েছে। টিনা হয়তো আবার তিনদিন বাদে আসবে। ততদিন ওর বাকি খাবারে চলে যাওয়া উচিত।

হিলি আমাকেও দু’পিস পাউরুটি অফার করেছিল। আমি বললাম, ‘না, খেয়ে এসেছি।’

তারপর ওকে আমার রেকারিং স্বপ্নের কথা বললাম। ও বিশেষ অবাক হল না। বলল, তুমি ‘যেটাকে খাদ বলছ, আমি সেটাকে বলি অ্যাবিস — অতল গহ্বর। ওই গহ্বরটা আমার চেনা। ইন ফ্যাক্ট, আমিই ওটার জন্ম দিয়েছি। ওই গহ্বরের মধ্যে দিয়ে আমি ওদের স্বরূপ দেখতে পাব। এখনও পাই, তবে সেই দেখাটা ইনকমপ্লিট। একদিন না একদিন মালগুলো ঠিক ওই গর্ত দিয়ে ওপরে উঠে আসবে।’

বললাম, ‘হিলি! আমার কিন্তু পুরো ব্যাপারটা ঘেঁটে যাচ্ছে। আগের দিনও তুমি কাদের প্রেজেন্সের কথা বলছিলে। এখন আবার বলছ তারা গর্ত দিয়ে উঠে আসবে। তুমি কি ভূত-টুতে বিশ্বাস করো নাকি?’

হিলি আমার কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে সেটা ধরিয়ে বলল, ‘দাঁড়াও। তোমাকে একটু ডিটেলে বলি। তুমি স্বপ্নে অ্যাবিসটা দেখেছ মানে ওরা তোমাকে ওয়াচ করছে। তাই তোমারও সবটা জানা দরকার। তবে তার জন্য শুরুতেই তোমাকে একটা জিনিস বুঝতে হবে। সেটা হচ্ছে, এই যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং এর কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র, সেইসব গ্রহের মধ্যে আবার না জানি কতগুলো গ্রহে কত বিলিয়ন- ট্রিলিয়ন প্রাণী এবং উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস— এই সবই আসলে এক বিশাল কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ছবি।’

আমি একটু ব্যঙ্গের সুরেই বললাম, ‘তার মানে, তুমি আমি আমরা সবাই ভার্চুয়াল ছায়াবাজি, তা-ই তো?’

হিলি কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ভার্চুয়াল এবং রিয়েলের তফাত কতখানি, রাতুল? আদৌ কি কোনও তফাত আছে? কোয়ান্টাম ফিজিক্সের বেসিক কয়েকটা কনসেপ্ট তো তুমি নিশ্চয়ই জানো। একই বস্তুকে তুমি কণা বলতে পারো আবার তরঙ্গও বলতে পারো। তুমি যদি তাকে কণা হিসেবে ট্রিট করো তা হলে সে কণার মতন ব্যবহার করবে, যদি তরঙ্গ হিসেবে ট্রিট করো তা হলে তরঙ্গের মতন। একটা কণা তখনই অস্তিত্ব পাবে যখন তুমি তাকে দেখবে। তা হলে তোমার দেখার ওপরে, তোমার অনুভূতির ওপরে কি বস্তুজগৎ নির্ভর করছে না? তুমি রিয়েল ভাবছ বলেই চারিদিকের এই মহাবিশ্ব রিয়েল, না হলে এরা সবই কম্পিউটার স্ক্রিনের ওপরে প্রোজেক্টেড ছবি।

যা-ই হোক, পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে প্রোটেকটেড কয়েকটা সিস্টেম হ্যাক করার পরে একদিন আমার মনে হল, আমি কেন এই কসমিক সিস্টেমটাকে হ্যাক করব না? কেন বোঝার চেষ্টা করব না কোথায় তার ডেটাব্যাংক, কে তার প্রোগ্রামার…

তবে আজকাল মনে হয়, এই যে বলছি আমার মনে হল, এই কথাটা ঠিক নয়। এমন আপাত-অসম্ভব একটা প্রোজেক্ট আচানক আমার মতন একজন সাধারণ ছেলের মাথায় আসতে পারে না। আসলে আমার মাথায় অন্য কেউ চিন্তাটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কে, সেটা পরে বলছি।’

আমি আবার হিলির কথার স্রোতে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই কসমিক হ্যাকিং-এর কাজ কি তোমার ওই ল্যাপটপের সাহায্যে করা সম্ভব হচ্ছে?’

হিলি বলল, ‘না তো। ওই যে অত খাতা, কাগজ, পেনসিল, ইরেজার আর শার্পনার, ওসব তা হলে কী জন্য? পুরোটাই তো অঙ্ক। অঙ্কের ওই আনসলভড্ড পাজলগুলোর কথা আমি স্টুডেন্ট-লাইফেই জানতাম। সবাই জানে। যুগ যুগ ধরে ম্যাথামেটিশিয়ানরা চেষ্টা করে যাচ্ছে ধাঁধাগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়ার, কিন্তু পারছে না। কেন পারছে না?’

প্রশ্নটা করে হিলি বিছানা ছেড়ে উঠে জানালা দিয়ে সিগারেটের শেষটুকু বাইরে ফেলে এল। তারপর আবার নিজের জায়গায় ফিরে এসে বলল, ‘আসলে ওই ধাঁধাগুলোর পিছনেই ওরা নিজেদের এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল। ওরা নিশ্চিন্ত ছিল, কারণ ওরা জানত মানুষ সব অঙ্কই লজিকাল স্টেপ দিয়ে সমাধান করতে চায়। আমার সিস্টেমের বিউটিটা কী জানো? আমিই প্রথম স্টেপ জাম্প করলাম। আমি উত্তরটাকে প্রথমে আমার ধ্যানে, আমার অনুভূতিতে নিয়ে এলাম। এর ফলে অঙ্কের স্টেপগুলো অনেকদূর অবধি এগিয়ে গেল। কিন্তু …’

‘কিন্তু কী?’ আমি প্রশ্ন করলাম।

‘কিন্তু শেষ সমীকরণে পৌঁছে দেখলাম, ইক্যুয়েশনের একটা দিকে জন্ম নিয়েছে, ওই তোমাকে যার কথা বলছিলাম, তুমি পরপর তিন রাত যাকে স্বপ্ন দেখেছ, সেই ‘অ্যাবিস’– বিশ্বাস হচ্ছে না? এসো, তোমাকে দেখাচ্ছি।’

হিলি হঠাৎ আমার ঘাড়টা চেপে ধরে ওর সামনে খুলে রাখা একটা ফুলস্ক্যাপ খাতার দিকে আমার মাথাটাকে নামিয়ে দিল। বলল, ‘এই যে ইনকমপ্লিট ইক্যুয়েশনটা দেখছ, এটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকো।’

দেখলাম, হিলি খাতার প্রায় শেষের দিকে একটা পাতা খুলে রেখেছে। হাজার হাজার এক্স-ওয়াই সাইন, কস-আলফা-বিটা-গামা- পাইয়ের পাকদন্ডী রাস্তা যেন ঠিক ওইখানটায় এসে একটা সাদামাটা সমীকরণ চিহ্নে শেষ হয়ে গেছে। চিহ্নটার অন্যপাশে আর কিছু নেই। শুধুই সাদা কাগজ।

হিলি ওর তর্জনীর নোংরা নখটা ওই সাদা কাগজে ঘষতে ঘষতে বলল, ‘এই… এই ফাঁকা অংশটুকুই আমার অ্যাচিভমেন্ট। এখানেই হিলি হ্যাকারের প্রতিভা। রাতুল, তুমি এই সাদা অংশটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকো। এটাই তোমার স্বপ্নের সেই খাদ। আচ্ছা এসো, বরং আমরা দু’জনেই তাকিয়ে থাকি, ঠিক যেমনটা তুমি স্বপ্নে দেখেছিলে। দেখো তো, এবার খাদের নীচে কিছু দেখতে পাও কি না।’

আমি তাকিয়ে থাকলাম। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার চোখের সামনে থেকে খাতা মুছে গেল, হিলির এক-কামরার ফ্ল্যাট মুছে গেল। কলকাতার সমস্ত শব্দ, সমস্ত কোলাহল ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে এক মহাজাগতিক স্তব্ধতায় মিলিয়ে গেল। আমি দেখলাম আমার সামনে এক বিপুল অন্ধকার গহ্বর। আর তার নীচে কিছু দানবিক শরীর ঘুরে বেড়াচ্ছে।

শরীরগুলোকে আমি ঠিক বর্ণনা করতে পারব না। মানুষের মতন। আবার মানুষের মতন নয়ও। আসলে ক্রমশ সেগুলোর আকার পালটে যাচ্ছিল। যেন সমুদ্রের বুক থেকে উঠে আসা কয়েকটা জলস্তম্ভ। খাদের নীচের কোনও কালো জলতল থেকে জন্ম নিয়ে ক্রমশ তারা উঁচু হতে হতে আকাশ ছুঁচ্ছে। জলস্তম্ভের দু’দিক থেকে হাত গজাচ্ছে, পা গজাচ্ছে। জোড়ায় জোড়ায় হিংস্র চোখের দৃষ্টি সেই গভীর খাদের নীচ থেকে আমাদের পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

হঠাৎই একটা বিরাট হাত সেই খাদের নীচ থেকে আমার গলার কাছে উঠে এল। আমি প্রাণ বাঁচানোর জন্য পিছনদিকে শরীরটাকে ছুড়ে দিতেই খাট থেকে মেঝেয় পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম নিশ্চয়ই। হুঁশ ফিরে আসতেই আমি উঠে বসলাম। দেখলাম, হিলি চোখের ওপরে হাত চাপা দিয়ে বিছানায় শুয়ে রয়েছে। অবশ্য কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ও উঠে বসল। প্রথমেই হাঁকপাঁক করে খুঁজে দেখল ওর সেই খাতাটা যথাস্থানে রয়েছে কি না।

ছিল। ওইভাবেই খাটের ওপরে খোলা পড়েছিল খাতাটা। পাতাভরতি খুদে খুদে রাশিমালারও কোনও বদল ঘটেনি। হিলি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ওটাকে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একটা এক্সপিরিয়েন্স হল, বলো?’

বললাম, ‘তোমার আগে এরকম হয়েছে?’

‘এতটা নয়। কয়েক ঝলক দেখতে পেয়েছিলাম শুধু। মনে হয় আজ দু’জনের কম্বাইন্ড এফর্টে ওরা অনেকটাই সারফেসে উঠে আসতে বাধ্য হয়েছিল। বুঝলে না? যেভাবে পুকুরের জলকে আচ্ছা করে ঘোলালে মাছগুলো ওপরে ভেসে ওঠে, সেইরকম।’

আমি ভাবতে পারতাম পুরোটাই একটা হ্যালুসিনেশন, হিপনোটিজম, ড্রাগের ঘোর। যদিও ওসব কেন হতে যাবে সেটাও একটা প্রশ্ন। তবু শুধু অলৌকিককে অস্বীকার করার জন্যই আমি এরকম কোনও একটা লৌকিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে পারতাম, যদি না…

যদি না আমার শার্টের পুরো বুকটা জুড়ে একটা কাদামাখা পাঞ্জার ছাপ থাকত। কালো জলে ভেজা একটা বিশাল হাতের তালুর ছাপ, যেটা একটু আগে আমার গলা টিপে ধরতে গিয়ে ধরতে পারেনি, আছড়ে পড়েছিল বুকের ওপরে আর সেই ধাক্কায় আমি মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম।

শার্টটাকে দলা পাকিয়ে হিলির কিচেনের লিটার-বিনে ঢুকিয়ে দিয়ে আমি ওর একটা পাঞ্জাবি ধার করে পরে সেদিন বাড়ি ফিরলাম।

***

পরদিন কাজের মধ্যে একটু ফাঁক পেতেই হিলিকে ফোন করলাম। বললাম, ‘কী দরকার ওদের জাগিয়ে? কেন এত রিস্ক নিচ্ছ? কী লাভ?’ উলটো দিক থেকে হিলির ক্লান্ত গলার উত্তর ভেসে এল। ‘কেন বুঝতে পারছ না, রাতুল? যা করছি সেটা করতে আমি বাধ্য।’

‘মানে?’

‘আমাকে দিয়ে কেউ কাজগুলো করাচ্ছে। তোমাকে আগেও বোধহয় একবার বলেছিলাম, এই কসমিক-হ্যাকিং-এর চিন্তাটা আমার মাথার মধ্যে কেউ ঢুকিয়ে দিয়েছে। না হলে যত ওস্তাদই আমি হই না কেন, দু’শো বছরের পুরোনো ম্যাথামেটিকাল রিডলগুলোকে সল্ভ করার সাধ্য কি আমার ছিল? সেই অপর অস্তিত্বই আসলে আমাকে দিয়ে কাজগুলো করাচ্ছে। আমি যা করছি সবই একটা হিপনোটিক-ট্রান্সের মধ্যে দিয়ে করে যাচ্ছি।’

বললাম, ‘তুমি আগে অস্তিত্বের কথা বলেছিলে। এখন বলছ অপর অস্তিত্বের কথা। এরা কি দুই প্রতিপক্ষ?’

‘এগজ্যাক্টলি!’ হিলি হঠাৎ খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল। বলল, ‘বিশ্বনিয়মের প্রোগ্রাম যারা করেছে, তাদের প্রতিপক্ষ আমাকে দিয়ে কাজগুলো করাচ্ছে।’

কথাগুলো শুনতে মোটেই ভালো লাগল না। মাথার মধ্যে একটা অশুভ পূর্বাভাস ছড়িয়ে পড়ল। তাই হিলিকে বললাম, ‘এতদিন তো আমরা এই ব্রহ্মাণ্ডের পরিচালককে ঈশ্বর বলেই জানতাম। এবং তাঁর প্রতিপক্ষ শয়তান। তুমি কি তা হলে শয়তানের খপ্পরে পড়ে গেছ?’

বুঝতে পারলাম, এই প্রশ্ন ওর নিজের মাথাতেও ঘুরছে এবং সেটাকে অস্বীকার করার জন্যই ও অনাবশ্যক উঁচুতে গলা তুলে বলল, ‘শোনো, আমার কাছে ওসব ঈশ্বর-শয়তান-গড়-মেফিস্টো বলে কিছু নেই। আমি প্রোগ্রাম বুঝি… প্রোগ্রাম! দুটো কন্ট্রাডিকটরি প্রোগ্রাম একে অন্যের এগেইনস্টে কাজ করছে আর তার মধ্যে আমরা জড়িয়ে গেছি।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আমরা! আমরা মানে?’

‘মানে আমি এবং টিনা।’

‘কী আজেবাজে বকছ?’

‘না, রাতুল, আজেবাজে নয়। টিনা একদিন হঠাৎই এসেছিল আমার জীবনে। হঠাৎই আমাকে ভালোবেসেছিল। আজ বুঝি, ও না এলে আমি কাজটা করতেই পারতাম না। টিনার এই অহৈতুক প্রেমটাও আসলে একটা অ্যাসাইনমেন্ট। ও বুঝতে পারছে না, ওকেও কেউ কাজে লাগিয়েছে।’

এবার সত্যিই মেজাজটা গরম হয়ে গেল। বললাম, ‘তুমি তো না-হয় হ্যাকার। টিনা কে? টিনার রোলটা কী?’

হিলি আবার ক্লান্তভাবে হাসল। বলল, ‘এখন আমরা কেউই হ্যাকার নই। ও চ্যাপটার ক্লোড। যা হ্যাক করার ছিল, সেটুকু করে দিয়েছি। এখন আমরা দু’জনেই ভাইরাস। আমি আর টিনা এবার ওদের সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে যাব। সিস্টেমকে করাপ্ট করব।’

এই অবধি বলে হিলি হঠাৎই ফোনটা কেটে দিল। সঙ্গেসঙ্গে কলব্যাক করে দেখলাম, শালা ফোন অফ করে দিয়েছে।

***

পরের তিনদিন আর হিলির বাড়ি যাওয়ার কথা মাথাতেই আনিনি ভেবেছিলাম শনি-রবির মধ্যে একদিন তো টিনা নিশ্চয়ই ওর ঘর গোছাতে, খাবার কিনে দিতে যাবেই। ওর কাছ থেকেই হিলি কেমন আছে জেনে নেব।

হিলিকে নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু তখনও ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি যে চিন্তার অভিমুখটা টিনার দিকে সরে যাবে।

শনিবার রাত একটায়, ইংরিজি টাইম ধরলে অবশ্য রবিবার, টিনা আমাকে ফোন করল। কোনও ভূমিকা ছাড়াই বলল, ‘আমি জড়িয়ে গেছি।’

কীসে জড়িয়েছে জিজ্ঞেস করলাম না। সেটা ন্যাকামো হয়ে যেত। হিলি তো আগেই বলে দিয়েছে ওরা দু’জনেই এখন ভাইরাস। তাই শুধু জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’

টিনা বলল, আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছি। ওরাই পাগল করে দিচ্ছে।’

বললাম, ‘হিলি কী বলছে? ওকে জানিয়েছিলিস?’

‘হ্যাঁ। ও বলছে এটাই স্বাভাবিক। যাদের হাতে সিস্টেম, যাদের সিস্টেমের মধ্যে আমরা ঢুকতে চলেছি, তারা অ্যান্টি-ভাইরাস ইনস্টল করবে না? এটা নাকি সেই অ্যান্টি-ভাইরাসের এফেক্ট।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে টিনা বলল, ‘রাতুল, আমার চেনা রাস্তা ভুল হয়ে যাচ্ছে। কথা বললে মনে হচ্ছে অন্য কেউ মাথার মধ্যে বসে কথাগুলো বলে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে পোশাক-টোশাক খুলে ন্যুড হয়ে রাস্তায় ঘুরলে আরাম পেতাম।’

টিনার গলার স্বরে এমন একটা কিছু ছিল যে, আমার মন বলল, হাতে আর একটুও নষ্ট করার মতন সময় নেই। বললাম, ‘টিনা, তুই তৈরি হয়ে নে। বেরো। আমি গাড়ি নিয়ে তোর বাড়ি যাচ্ছি। ইউ নিড মেডিকাল অ্যাসিস্টেন্স।’

গ্যারেজ থেকে গাড়িটা বার করতে একটু সময় লাগল। তবু ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে ঢাকুরিয়ার জনশূন্য অলিগলি ধরে টিনার বাড়ির দরজায় পৌঁছে গেলাম। টিনা দেখলাম বাড়ির বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের সামান্য আলো ওর গায়ে এসে পড়েছিল; সেই আলোতেই দেখলাম ও রাতপোশাক পরে বেরিয়ে এসেছে। ওকে দেখে সত্যিই এক রাস্তার পাগলি ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছিল না।

ঠিক তখনই আমার ফোনে রিং হল। দেখলাম, হিলি ফোন করেছে। হ্যালো বলতেই ও বলল, ‘তুমি আর টিনা বেরিয়ে পড়েছ তো?’

‘তুমি জানলে কেমন করে?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘অপর অস্তিত্ব জানাল। এখন আমি যা করছি সব ওর কথাতেই করছি। শোনো, তোমরা দু’জনে আমার এখানে চলে এসো।’

বললাম, ‘তুমি তোমার অপর অস্তিত্বের সঙ্গে জাহান্নামে যাও! আমি এখন টিনাকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি।’

হিলি কাতর গলায় বলল, ‘কেন বুঝছ না, রাতুল, ওর যা হয়েছে আমারও ঠিক তা-ই হয়েছে। আমিও পাগল হয়ে যাচ্ছি। পৃথিবীর কোনও ডাক্তার আমাদের এই পাগলামি সারাতে পারবে না। যাতে সারবে, সেটা আমি জানি। অপর অস্তিত্ব আমাকে জানিয়েছে। তোমরা এসো, আমি সব বলছি। চিন্তা কোরো না, এভরিথিং উইল বি অলরাইট।’

টিনা ইতোমধ্যে গাড়িতে আমার পাশে এসে বসেছিল। মাঝে মাঝে কেমন অদ্ভুতভাবে যেন মাথাটা ঘোরাচ্ছিল। যেন ওর বুকের কাছে, দুই কাঁধে আর পিঠে কোনও পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ও মাথা নিচু করে সেটাকে দেখবার চেষ্টা করছে। আমি বললাম, ‘ওরকম করছিস কেন?’

টিনা বলল, ‘জানি না। ইচ্ছে করে করছি না।’

বললাম, ‘হিলি বলছে ওর ওখানে যেতে। যাওয়াটা কি উচিত হবে?’

টিনা বলল, ‘চল, চল। দেরি করিস না।’

অগত্যা হালতুর দিকে গাড়ি ঘোরালাম।

ড্রাইভ করার সময় মাঝে মাঝেই মাকড়শার জালের মতন কী যেন উড়ে এসে চোখেমুখে জড়িয়ে যাচ্ছিল। এসি চলছে বলে জানালার কাচ- টাচ সব তোলা, তবু কোথা থেকে এসব ঢুকছে কে জানে। টিনা ক্রমাগত ওইভাবে মুখ নিচু করে মাথাটা এপাশ-ওপাশ করে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে খুবই অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে গাড়ি চালাচ্ছিলাম।

হিলির ফ্ল্যাটের নীচে যখন পৌঁছোলাম তখন রাত পৌনে দুটো। হিলিও আমাদের জন্য ফ্ল্যাটের সামনে, রাস্তায় অপেক্ষা করছিল। আমি গাড়িটা দাঁড় করানো মাত্র ও পিছনের সিটে উঠে বসল। তারপর বলল, ‘তোমাকে একটা লোকেশন পাঠিয়েছি দেখো। ওখানে চলো।’

তা-ই চললাম। মাঝখানে একবার হিলিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় যাচ্ছি? সেখানে টিনার চিকিৎসা হবে তো?’

হিলি বলল, ‘চিকিৎসার চেয়ে বেশি কিছু হবে। আমরা দু’জনেই একটা করে ছদ্মবেশ পাব।’

‘মানে?’

‘মানে, ছদ্মবেশ। যাতে অ্যান্টি-ভাইরাস ঠকে যায়; আমাদের ভাইরাস বলে চিনতে না পারে। তুমি তো আই.টি.-র ছেলে। অ্যাকচুয়ালি হ্যাকাররা তো সেটাই অনেক সময় করে, তা-ই না? এমন একটা অ্যাপের মধ্যে দিয়ে তোমার সিস্টেমে ভাইরাস ঢুকিয়ে দেয় যে তোমার সিস্টেমের অ্যান্টি- -ম্যালওয়ার সেটাকে ভাইরাস বলে ধরতেই পারবে না।’

এত টেনশনের মধ্যেও হেসে ফেললাম। বললাম, ‘এটা ভালো বলেছ। তা হলে এত ঝঞ্ঝাট না করে দুটো বোরখা কিনে গায়ে চড়িয়ে নিলে ভালো হত না?’

হিলি কিন্তু চটল না। শান্তভাবেই উত্তর দিল, ‘তাতেও তো আমরা মানুষই থাকতাম।’

‘এখন আর মানুষ থাকবে না?’

‘অন্তত কিছুদিনের জন্য থাকব না।’

আমি আর কিছু না বলে লোকেশনের দিকে চোখ রেখে ড্রাইভ করতে থাকলাম। ঘণ্টাখানেক বাদে বোম্বে রোড ছেড়ে একটা জঙ্গলে ঢাকা সরু রাস্তা ধরতে হল। সরু এবং ভাঙা।

রাস্তার দিকে চোখ রেখে সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করতে হচ্ছিল। তবু তার মধ্যেই একবার রিয়ারভিউ মিররে চোখ পড়তেই মনে হল, হিলিকেও ওই মাথা চালার রোগে ধরেছে। এখন ও আর টিনা দু’জনেই ক্রমাগত এদিক-ওদিক মাথা নাড়িয়ে যাচ্ছে। পারলে যেন পিঠটাকেও ওইভাবে দেখে নেয়। তার সঙ্গে অব্যহত ছিল সেই মাকড়শার জালের ওড়াউড়ি। এখন সংখ্যায় আরও বেশি। মুখে-চোখে এমন জড়িয়ে যাচ্ছিল যে, ভয় হচ্ছিল অ্যাকসিডেন্ট করে না বসি।

ভগবানের দয়ায় এই দুর্ভোগ অবশ্য বেশিক্ষণ পোহাতে হল না। মিনিট সাতেকের মধ্যে সরু রাস্তাটা একটা একতলা গুদোম টাইপের বাড়ির দরজায় গিয়ে শেষ হয়ে গেল। হিলি বলল, ব্যস, এইখানেই। এইখানেই আমাদের রেখে দিয়ে তুমি চলে যাও। এই জায়গাটা ওদের নির্বাচিত, বাকি পৃথিবীর চোখে অদৃশ্য। এখানে আমরা ইচ্ছে করলে অনন্তকাল থেকে যেতে পারি। এই বলে গাড়ি থেকে নেমে গোডাউনটার দিকে পা চালাল।’

অবাক হয়ে দেখলাম, টিনাকে কিছু বলতে হল না। ও হিলির সঙ্গেই টলতে টলতে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঢোকার অসুবিধে ছিল না, কারণ, বাড়িটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল পরিত্যক্ত। গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে ঢাকা। দরজা-জানালা ভাঙা। আমিও ওদের পিছন পিছন ঢুকে পড়লাম।

এরপর যেটা হল সেটাকে এখনও একটা দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হয়।

ঘরে ঢোকামাত্রই টিনা আর হিলির মাথা চালা বেড়ে গেল। এখন ওদের মুন্ডুদুটো সকেটের ওপরে বসানো বলের মতন পুরো তিনশো ষাট ডিগ্রিতে ঘুরছিল। আমি ওদের পিছনদিকে দাঁড়িয়েছিলাম, তবু দু’সেকেন্ড অন্তর একবার করে ওদের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হচ্ছিল। অবশ্য ওদের চোখে দৃষ্টি ছিল না। চোখগুলো কালো বোতামের মতন একটা আবরণে ঢেকে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল শুঁয়োপোকার চোখ।

মনে হচ্ছিল বলা ভুল। ওরা তো এখন শুঁয়োপোকাই। দুটো প্রমাণ সাইজের শুঁয়োপোকা আস্তে আস্তে দেওয়াল বেয়ে ঘরের সিলিং-এর দিকে উঠে গেল। তখনও ওরা মাথা নাড়ছিল আর ওদের মুখ থেকে অনর্গল রেশমসুতো বেরিয়ে ওদের শরীরদুটোকে জড়িয়ে নিচ্ছিল।

সোজা কথায় হিলি আর টিনা তখন নিজেদের শরীর ঘিরে কোকুন বানাচ্ছিল। ছদ্মবেশ ধরছিল, যাতে ওদের আর মানুষ বলে চেনা না যায়।

এইভাবে কতক্ষণ সময় কেটে গেল জানি না। একটা সময় ওদের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। পরিত্যক্ত গুদামঘরের ছাদে পাশাপাশি আটকে রইল সবুজ, সিল্কি, অতিকায় পটলের মতন দুটো মথের গুটি।

টিনা এবং তার প্রেমিক, হিলি হ্যাকার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *