বুল্টি নামে এক জাদুকরী
আজকাল সকালের দিকে সোমুর বড়ো ক্লান্ত লাগে। ডাক্তার চ্যাটার্জি বলেছিলেন, মর্নিং সিকনেস। কিছু ওষুধপত্র দিয়েছিলেন, উপকার হয়নি। আর সোমু নিজেও যে এই অসুখটা নিয়ে খুব অসুখী তা নয়। কাজেই ও আর গা করেনি।
সকালে ও যতক্ষণ পারে বালিশ আঁকড়ে বিছানায় পড়ে থাকে। জেগে শুয়ে থাকে এমন নয়; যতক্ষণ শুয়ে থাকে ততক্ষণই দু’চোখে পাতলা ঘুমের একটা সর লেগে থাকে। আটটা বাজে, ন’টা বাজে… একসময় সাড়ে ন’টাও বেজে যায়। মাঝে মাঝে রাস্তা থেকে কোনও ফেরিওলার বীভৎস চিৎকার কানে এসে ঘুমের সরটাকে ছিঁড়ে দিয়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার জোড়াও লেগে যায়।
তবে সাড়ে ন’টার পরে আর শুয়ে থাকা যায় না। ওর একটা চাকরি আছে— পাড়ার গার্লস স্কুলেই অশিক্ষক কর্মচারীর চাকরি। এগারোটার মধ্যে স্কুলে পৌঁছোতে পারলে হেডমিস্ট্রেস কিছু বলেন না। আসলে সোমুর আসা না-আসাতে স্কুলের কোনও কাজই থেমে থাকে না; ওর সেরকম কোনও কাজ নেই।
মানুষ বোঝে কার দ্বারা কাজ হবে আর কার দ্বারা হবে না। সোমুকে দেখলেই সবাই অকর্মা বলে চিনে নেয়। হেডমিস্ট্রেস আর অন্য দিদিমণিরা প্রথমদিকে কাজের জন্য তাড়া লাগাতেন, এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। আর সত্যি কথা বলতে কী, সোমু যে বেতনটা পায়, সেটার পরিমাণ এতই সামান্য যে, ওটা কাউকে দান-খয়রাতি হিসেবেও দিয়ে দেওয়া যায়। ওর জন্য কাজের খোঁটা দেওয়া যায় না। সেটা দিদিমণিরাও বোঝেন। সোমু তাই আসে, যায়, মাইনে পায়।
তবু সোমু সাড়ে ন’টায় বিছানা থেকে উঠে নিড়বিড় করে মুখ ধোয়, নিজেই চা করে খায়। খবরের কাগজ নেয় না, পড়েও না। বাজারও করে না। কিছু না করেও এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট সময় কেমন করে কেটে যায় ও বুঝতে পারে না। পৌনে এগারোটায় ও টুকটুক করে স্কুলের দিকে হাঁটা লাগায়। বেরোবার আগে চানটা করে বেরোয়। দুপুরে স্কুলেই মিড-ডে মিলের ভাত খেয়ে নেয়। বিকেলে বাড়ি ফিরে আবার মাথার নীচে দু’হাত ভাঁজ করে রেখে নোংরা তেলচিটে বিছানার ওপর শুয়ে পড়ে।
শ্রীরামপুরে সুধন্য মুস্তাফি লেনে সোমুর একটা খুব জরাজীর্ণ একতলা বাড়ি আছে। বাড়িটা ওর বাবা বানিয়েছিলেন। বাবা মারা গেছেন দু’বছর আগে। মা আরও আগে।
বাড়িটা একটু বড়ো হলে সোমুর জীবনটা হয়তো অন্যরকম হত। হয়তো বাড়িটা প্রোমোটারেরা কিনে নিত, যেভাবে সুধন্য মুস্তাফি লেনের বাকি বাড়িগুলো কিনে নিয়েছে। হয়তো তার ফলে সোমুর হাতে অনেক টাকা আসত। টাকা এলে ওর কাজের উদ্যম ফিরত। ও তখন পাড়ার অন্যান্য বাড়ি-বিক্রি-করা ছেলেদের মতন টু-হুইলার হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়াত, দুমাসে একবার মন্দারমণি যেত মাল খেতে। কিন্তু মাত্র সোয়া কাঠার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা কিনতে আজ অবধি কোনও প্রোমোটার আসেনি।
রাস্তার গায়ে একতলা বাড়ি বলেই সকালে ফেরিওলাদের ডাকগুলো কানে বড়ো বেশি করে আঘাত করে। একটা সময় ছিল যখন ফেরিওলাদের ডাক ছিল অনুচ্চ, অনুগ্র, সুরেলা; ডাকঘর নাটকের দইওলার ডাকের মতন… যে-ডাকে চোখের সামনে পাঁচমুড়া পাহাড়ের ছবি ভেসে ওঠে। এখনকার ফেরিওলারা ডাকে না, চিৎকার করে। আর্তনাদ করে বলেও মনে হয় সোমুর। কিংবা চ্যালেঞ্জ জানায়।
সোমু বোঝে ওরা বাধ্য হয়েই এরকম করে। রাস্তার দু’ধারে যত জি-প্লাস ফ্লোর ফ্ল্যাটবাড়ি, তাদের তিনতলা-চারতলার বাসিন্দাদের কানে প্লাস্টিকের তৈজসপত্র, আপেল-আঙুর-আম, ফুলঝাড়ু, ডাব ইত্যাদি যে- কোনও সামগ্রীর কথা পৌঁছে দিতে গেলেই চিৎকার করতে হয়। না করলে কেউ শুনতে পাবে না।
সুধন্য মুস্তাফি লেন যতদিন শান্ত একটা রাস্তা ছিল ততদিন এখানকার শালিখগুলোও নিচু গলায় ডাকত। এখন অটো-টোটো-রিকশার আওয়াজ এত বেড়েছে যে, শালিখগুলোও ডাকে না, চিৎকার করে।
ছেলে-শালিখগুলো মেয়ে-শালিখদের কড়াং কড়াং করে ডেকে বলে, ‘ও মাসিমা, ও বউদি, ও দিদিভাই! দূরে দাঁড়িয়ে কেন? আমাদের এই প্রচার-গাড়ির সামনে আসুন।’
সোমুর বউ বুল্টি খুব নিচু গলায় কথা বলত। কারণ, ওদের দুটো ঘর আর রান্নাঘরের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বললেও দিব্যি পরস্পরের কথা শুনতে পেত। ঘরে এমন কিছুই ছিল না যাতে গলার আওয়াজ চাপা পড়ে যায়। ফ্রিজের ঘড়ঘড়ানি ছিল না, টিভির আওয়াজ ছিল না। এয়ার কন্ডিশন মেশিনের গুঞ্জন তো ওদের কাছে স্বপ্ন। একটা বাচ্চা-টাচ্চা হলে নিশ্চয়ই বুল্টি চেঁচিয়ে কথা বলা শিখত। কিন্তু যে তিন বছর ওরা একসঙ্গে কাটিয়েছিল, তার মধ্যে ওদের সন্তান হয়নি।
সোমুর বদ্ধমূল ধারণা, তাদের সন্তান না হওয়ার কারণ, বৃষ্টির মা হওয়ার ইচ্ছে ছিল না। অনেকদিন আগে একদিন ওদের ইস্কুলের বায়োলজির দিদিমণি গায়ত্রী সেনগুপ্ত টিচার্স-রুমে বসে অন্য কোনও এক দিদিমণির সঙ্গে নিচু গলায় গল্প করছিলেন। যে জানালাটার ধারে ওরা দু’জনে বসে ছিলেন, তার ঠিক বাইরে, দালানের বেঞ্চিতে বসে সোমু ঝিমোচ্ছিল। সেদিন গায়ত্রী দিদিমণি এমন একটা কথা বলেছিলেন যা শুনে সোমুর ঝিমুনি কেটে গিয়েছিল।
উনি বলেছিলেন, মনুষ্যেতর জীব, কীটপতঙ্গ, পাখপাখালিরা নাকি প্রতিকূল পরিবেশে গর্ভ সংবরণ করতে পারে। সোজা কথায়, খাদ্য- পানীয়ের অভাব ঘটলে, হাজার সংগমেও তাদের পেটে ডিম বা বাচ্চা আসে না। আবার পরিবেশ অনুকূল হলে তখন মেয়ে-প্রাণীরা বাসা বাঁধার উদ্যোগ নেয়।
সোমু এখন ভাবে, বুল্টি ওইজন্যই মা হয়নি। ও জানত, বারোর দুই সুধন্য মুস্তাফি লেনের এই এঁদো বাড়িটায় বাচ্চা মানায় না। বাড়িটায় খুব ড্যাম্প। মেঝেতে ঘামের মতন জলের ফোঁটা ফুটে ওঠে। দেওয়াল থেকে ক্রমাগত আকাশি রঙের চুনের চাবড়া খসে পড়ে। মানুষের বুকেও সেই হিমকণা ঢুকে পড়ে। সোমুর বাবা-মা দু’জনেই মারা গিয়েছিলেন নিউমোনিয়ায়। বাচ্চা এলে সম্ভবত সে-ও নিউমোনিয়ায় মারা যেত।
কিন্তু সেটা কথা নয়। কথা হচ্ছে, বুষ্টি তো আর মাদি খরগোশ নয়; মরুভূমির মুনিয়া পাখিও নয় যে, ইচ্ছেমতন নিজের জননতন্ত্রে ধর্মঘট ডাকবে। তা হলে সে এটা পারত কেমন করে?
সোমু জানে বুষ্টির কিছু আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। ও ছিল এক কল্যাণময়ী … এইখানে এসে সোমুর ভাবনা একটু থমকায়। ‘কল্যাণময়ী দেবী’ ভাবতে আটকায়, কারণ এখনও ওর মনে আছে যে, বুষ্টির বাম স্তনটা ছিল ডান স্তনের চেয়ে একটু বড়ো। বুষ্টির শীৎকারের শব্দও ওর কানে ভাসে। যার সঙ্গে এককালে নিয়মিত সংগত হয়েছে, তাকে আচমকা ‘দেবী’ বলে দিতে সোমুর চেতনায় বাধে। তাই সোমু বুল্টিকে ভাবে এক কল্যাণময়ী জাদুকরী।
হয় নাকি এরকম?
হয়।
এই তত্ত্বটা আবার ও শুনেছিল রামসীতা ঘাটের ছোটোসাধুর মুখে। তিনি বলেছিলেন, কিছু কিছু মেয়ের জন্মগত নানারকমের সিদ্ধাই থাকে। ছোটোসাধু কীসব যেন জন্মক্ষণের কথা বলেছিলেন। কোন রাশিতে কী নক্ষত্রে যেন কোনও মেয়ের জন্ম হলে, সেই মেয়ের রোদ-বৃষ্টি-বজ্রপাতকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে। শুনেই সোমুর মনে হয়েছিল, এ তো তার ঘরের নারীটি। বুল্টি। বুল্টির এরকম অনেক অলৌকিক ক্ষমতা আছে।
ওদের বাড়িতে হরদম এটা-ওটা খারাপ হয়ে যায়। বুষ্টি যখন ছিল, তখন ও ফিসফিস করে সোমুকে বলত, ‘শুনছ, বাথরুমের কলটার আবার প্যাঁচ কেটে গেছে’, কিংবা বলত, ‘রান্নাঘরের বাল্বটা জ্বলছে না’।
এইসব শুনেই সোমু অস্থির হয়ে উঠত। কী করবে, কী যে করা উচিত, তার তাল পেত না। চেনাশোনার মধ্যে যারা তার মতন গরিব, তারা এসব ক্ষেত্রে নিজেরাই কলটা কিংবা স্যুইচটা সারিয়ে নেয়। বাল্ব বদলানো তো সবার কাছেই ছেলেখেলা। স্কুলের ফরাস বাসুদেবদা তো বালি-সিমেন্ট মেখে নিজেই কর্নিক হাতে বাড়ির দেওয়ালের ফাটল-টাটল অবধি সারিয়ে নেন।
কিন্তু সোমু ওসব পারে না। বাল্ব বদলানোর জন্য ওপরের দিকে তাকালে তার মাথায় চক্কর লাগে। কলের প্যাঁচ ঘোরাতে গেলে হাতে জোর পায় না। ওদিকে আবার মিস্ত্রি ডাকতে গেলেও একগাদা পয়সা খরচ। কিন্তু বুল্টি যতদিন ছিল, ততদিন কী আশ্চর্যভাবে দু’-একদিন বাদে নিজে থেকেই কাটা বাল্বের ফিলামেন্ট জুড়ে যেত। কলের মুখ থেকে জল টোপানো বন্ধ হয়ে যেত। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সোমু দেখত সব ঠিক হয়ে গেছে। বুল্টিকে জিজ্ঞেস করলে ও ঠোঁট টিপে হাসত। ফিসফিস করে বলত, ‘কী জানি, কেমন করে ঠিক হয়ে গেল!’
সোমুর দৃঢ় ধারণা, ওই সবই হত বুল্টির মন্ত্রশক্তির জোরে।
বুল্টি যতদিন এই বাড়িতে ছিল, ও বাড়িটার সমস্ত ক্ষতচিহ্ন নানান কৌশলে ঢেকে রাখত। পুরোনো শাড়ি ছিল এই কাজে ওর বড়ো সহায়। জানালার ভাঙা শার্সি, দেওয়ালের ড্যাম্প-লাগা কুলুঙ্গি— এইসব ও পুরোনো শাড়ির পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখত।
তাছাড়া বুষ্টি যখনই কোথাও বেরোত, ফিরবার সময় এর-ওর বাগান থেকে কিছু পাতাবাহার, গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে আসত। হাতের কাছে যে পাত্র পেত, সে ডাঁটি-ভাঙা প্লাস্টিকের মগ হোক, ঠান্ডা পানীয়ের বোতল হোক, কিংবা ফুটো অ্যালুমিনিয়ামের বাটি— তার মধ্যেই একটু মাটি দিয়ে সেই ডালগুলোকে বসিয়ে দিত। আর কী আশ্চর্য! মাসখানেকের মধ্যে দিব্যি সেইসব ডাল মাটির নীচে শেকড় ছেড়ে দিত আর মাটির ওপরে কচিপাতায় ভরা নতুন শাখা প্রশাখা।
এইসব শাখাপল্লব ছিল বৃষ্টির দ্বিতীয় সহায়। ও এমন সুন্দর করে গাছগুলোকে সারা বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে রাখত যে, দেওয়ালের যত ফাটল, যত ভেঙে পড়া চাঙড়, সবকিছুই সেইসব ইন্ডোর প্ল্যান্টসের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত।
এইভাবে বুল্টি তিন-তিনটে বছর তার শুভ জাদুবিদ্যার দ্বারা সোমুর সংসার সামলেছিল। এরমধ্যে দু’বার সোমুর এরকম অবস্থা হয়েছিল, যখন ওর হাতে একটাও পয়সা ছিল না, অথচ সামনে বড়ো খরচ ছিল একবার মাসতুতো ভাইয়ের বিয়ে ছিল, কিছু তো হাতে করে নিয়ে যেতেই হয়। আর একবার অনেকগুলো টাকা ইলেকট্রিকের বিল বাকি পড়ে গিয়েছিল বলে ইলেকট্রিক অফিস থেকে লাইন কাটতে এসেছিল। সোমু তাদের হাতে-পায়ে ধরে একটা দিন সময় চেয়েছিল।
দু’বারই সোমুকে বুল্টি ওর সেই ক্ষীণ মৃদুস্বরে বলেছিল, ‘একটু ঘরের এদিক-ওদিক খুঁজে দেখো না, যদি কোথাও কিছু টাকা পড়ে থাকে।’ সোমু একটু অবাক হয়ে বুষ্টির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল, ওর বড়ো বড়ো চোখদুটো ইঙ্গিতময় হয়ে উঠেছে। নাকের নীচে অল্প অল্প ঘাম, চিবুকের খাঁজটা দেবীমূর্তির ঘামতেল মাখানো চিবুকের মতনই জ্বলজ্বল করছে। যেন ও বলতে চাইছে, ওসব যদি-টদি নয়, আমি জানি, আছে।
অগত্যা সোমু তোষক, বালিশ সব উলটে, ড্রয়ারের দূরতম প্রান্তে হাত ঢুকিয়ে টাকা খুঁজেছিল এবং দু’দিনই গার্ডারে মোড়া হাজার টাকার একটা করে বান্ডিল পেয়ে গিয়েছিল। একবার বিছানার জাজিমের নীচ থেকে, আর একবার বাতিল হারমোনিয়ামের বাক্সের ভেতরে।
টাকাগুলো হাতে নিয়ে ও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোথা থেকে এল বলো তো? আমি তো রাখিনি।’
বুল্টি বলেছিল, ‘তোমার বাবার স্বভাব ছিল এখানে-ওখানে টাকা লুকিয়ে রেখে তারপরে ভুলে যাওয়া। সেইজন্যই তো দেখতে বললাম।’
এমন লৌকিক ব্যাখ্যায় সোমুর মন ওঠেনি। সে জানে, তার বাবা এমন আমির ছিলেন না যে, হাজার টাকার কথা ভুলে যাবেন। তিনিও তার মতই ছাপোষা ছিলেন।
আর তাছাড়া, বাবা জাজিমের নীচে টাকা রাখতে পারেন। কিন্তু টাকা খুঁজতে গিয়ে সে যে আলমারির মাথায় মহার্ঘ এক বক্ষবন্ধনীর না-খোলা প্যাকেট খুঁজে পেয়েছিল, সেটার ব্যাখ্যা কী? সেটার ব্যাখ্যা একমাত্র এটাই হতে পারে যে, বুষ্টি নামের জাদুকরী মনে মনে ভেবেছিল সে অমন একটি ক্রিমের ওপরে চকো-চিপ্স প্রিন্টের ব্রা পরে বিয়েবাড়িতে যাবে। গিয়েওছিল।
সে যা-ই হোক, সোমু জানত এই সবই জাদুকরী বৃষ্টির নানান করিশ্মা। সে আর কথা বাড়ায়নি। ম্যাজিকের কৌশল জিজ্ঞেস করাটা যে অসভ্যতা, এটাও সে জানত।
সেইজন্যই গত বছরে যখন সে একদিন বুকের ব্যথায় কলতলায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল আর তার জ্ঞান ফিরল উত্তরপাড়ার এক নার্সিং- হোমে, তখনও সে বুল্টিকে জিজ্ঞেস করেনি তাকে এখানে আনার টাকা কোথায় পেল ও। এই যে সত্তর হাজার টাকা খরচা হল, কোথায় পেল এই টাকা?
অবশ্য বাড়ি ফিরে আসার পরে বুল্টিই ওকে একদিন বলেছিল, নাকি লটারির টিকিট কেটে এক লাখ টাকা পেয়েছিল।
তারপর লটারির টিকিট কাটাটা বুল্টির নেশার মতন হয়ে দাঁড়াল। লটারির টিকিট কাটার জন্য বুল্টিকে প্রায়ই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হচ্ছিল। এমনকি রাতে বাইরে থাকতেও হচ্ছিল মাঝে মাঝে। একটাই সান্ত্বনা। ও কোনওদিন প্রাইজ পায়নি এমন ঘটনা ঘটেনি। বাইরে রাত কাটিয়ে যখনই বাড়ি ফিরেছে, ব্যাগে ক্যাশ টাকার তাড়া নিয়ে ফিরেছে। সোমু ভেবেছে, সেটাই তো স্বাভাবিক। যে মেয়ে ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সামান্য একটা ফার্স্ট-প্রাইজ পাওয়া টিকিটের সাত সংখ্যার ক্রমিক নম্বর জানবে না?
তারপর একদিন বুল্টি সোমুকে ছেড়ে চলে গেল। সে-ও হয়ে গেল প্রায় তিন মাস। নাকি আর-একটু বেশি? সোমু বুল্টির খোঁজ নেয়নি, কারণ, ওর অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল, বুল্টি এই বাড়িতে থাকতে আসেনি। দেবী চণ্ডী যেমন স্বর্ণগোধিকার রূপ ধরে কালকেতুর দুঃখ হরণ করতে এসেছিলেন, তেমনই বুল্টি নামে এক জাদুকরী নিতান্ত কৌতূকের ছলে কিছুদিন তার ঘরে কাটিয়ে গেল।
***
বুল্টি চলে যাওয়ার পর থেকেই ওর ইনডোর প্ল্যান্টগুলো ইচ্ছেমতন বাড়তে শুরু করেছে। বাড়তে বাড়তে ঘরদোরগুলোর চেহারা করে দিয়েছে জঙ্গলের মতন। তার মধ্যেই সোমু শুয়ে থাকে। শুয়ে শুয়ে দেখে একজোড়া ঘুঘুপাখি জানালার প্যারাপেটে ক্রোটন গাছের টবে বাসা বেঁধেছে। মানিপ্ল্যান্টের গায়ে যে বেতআছড়া সাপটা রং মিলিয়ে শুয়ে থাকে, সে একটা টিকটিকিকে মসৃণভাবে পেটে ঢুকিয়ে নিচ্ছে।
সোমু বুঝতে পারে, জাদুকরী বুল্টি চলে গেলেও তার জাদুর প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। প্রভাব আছে বলেই এই বাড়ির চৌহদ্দিতে পাখি, পোকা, সরীসৃপদের সঙ্গে সে, একজন মানুষ, সে-ও বেশ ভালো আছে। সুখে আছে।
ক্রমশ সোমুর কানে ফেরিওলাদের আগ্রাসী চিৎকার স্তিমিত হয়ে আসে। সাড়ে ন’টা, দশটা, এগারোটা বেজে গেলেও বিছানা ছাড়ে না সোমু। বুল্টির পুরোনো শাড়ির ভেতর দিয়ে বাইরের খর রোদ ও উত্তাপ নীল ও শীতল হয়ে ঘরে ঢোকে।
সোমু বিছানায় পাশ ফিরে আরামের শব্দ করে, ‘আঃ!’
