ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম – সৈকত মুখোপাধ্যায়

একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম

সুপ্রিয় যেদিন সুইসাইড করল, সেদিনও কেউ জানত না যে কণার পেটে ওর বাচ্চা আছে, মানে সুপ্রিয়র। এমনকি কণা নিজেও বোঝেনি। সুপ্রিয় মারা যাওয়ার পরে ও পরপর দুটো পিরিয়ড মিস করল। প্রথমটা করেছিল যখন, তখন আমল দেয়নি। এমনটা তো এমনিতেই কত হয়। দ্বিতীয়টা মিস করার পরে ডাক্তার দেখাল এবং বুঝল যা হওয়ার হয়ে গেছে।

একটা সন্ধের ভুল থেকে কণার পেটে বাচ্চাটা এসে গিয়েছিল। তার আগেও কণা অনেকবার সুপ্রিয়র সঙ্গে শুয়েছে। কিন্তু কোনওবারই প্রোটেকশন নিতে ভোলেনি। সেদিন ভুল হয়ে গিয়েছিল। আসলে সেদিন কণার ফ্ল্যাটে ওদের সংগমটা হয়েছিল তীব্র অশান্তির মধ্যে।

ঠিক তার আগে দু’জনের মধ্যে প্রবল ঝগড়া হয়েছিল। মারপিটও বাদ যায়নি। সুপ্রিয় কণার গালে একটা থাপ্পড় মেরেছিল। কণাও ওর হাতে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল। তারপর ঠিক প্রেম নয়, ক্রোধের বশেই ওরা দু’জনে দু’জনকে আঁকড়ে ধরেছিল।

কিন্তু একটা উনত্রিশ বছরের ছেলে যদি একটা পঁচিশ বছরের মেয়েকে জড়িয়ে ধরে, প্রেমেই হোক কিংবা প্রতিহিংসায়, তা হলে একটু বাদে দুটো শরীর শরীরের নিয়মেই একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়। সেদিনও তা-ই হয়েছিল। সংগমের পরে কণা মানসিক দিক থেকে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে, সন্তানসম্ভাবনার কথা ওর মাথাতেও আসেনি।

কণা সেদিন বুঝতে পেরেছিল, সুপ্রিয়র সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়। সুপ্রিয় চিরদিন গ্রুপ থিয়েটারে বিনা পয়সায় অ্যাকটিং করবে, ছেড়ে-আসা ইউনিভার্সিটির হোস্টেলের সিট দখল করে রেখে ছাত্র- রাজনীতি করবে, লিটল-ম্যাগে কবিতা লিখবে; কিন্তু চাকরির পরীক্ষা দেবে না।

তারপরেও কণা হয়তো ওকে মেনে নিত; হয়তো বাড়ির তীব্র অমত থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিয়কেই বিয়ে করত, যদি না হঠাৎ ওর জীবনে আলেখ চলে আসত। আলেখকে দেখে ওর মনে হল, একটাই তো নারীজন্ম; সুপ্রিয়র মতন একটা বেকার ভ্যাগাবন্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সেটাকে এইভাবে নষ্ট করব? বড়ো ফ্ল্যাটে থাকব না? দামি গাড়ি কিনব না? ইউরোপে বেড়াতে যাব না?

এমনকি আলেখ যেদিন ওকে প্রথম বুকে জড়িয়ে ধরল সেদিন কণার মনে হল, সেই প্রথম ও সত্যিকারের কোনও পুরুষের শরীর ছুঁল। কী রূপবান ওই আলেখ! কী কঠিন বুকের পেশি! তার কাছে ওই শালিখের বাচ্চার মতন চেহারা নিয়ে সুপ্রিয় হালদার দাঁড়াতে পারে! ছোঃ!

অতএব তারপর যেদিন সুপ্রিয় আর-একবার ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল, সেদিনই কণা ওকে বলে দিল, ‘তুমি সরে যাও। আমার জীবন এখন আলেখ-কেন্দ্রিক।’

কথাটা শুনে খুব অদ্ভুতভাবে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিল সুপ্রিয়। প্রায় চার বছরের সম্পর্ক ওর সঙ্গে; কিন্তু তার আগে কোনওদিন সুপ্রিয়র চোখে এতটা আহত দৃষ্টি দেখেনি কণা। ওর যাদবপুরের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গিয়ে সেই সন্ধেতেই রেললাইনে গলা দিল সুপ্রিয়। অবশ্য শুধু কণাই তার কারণ নয়। সুপ্রিয় নিজেও বুঝতে পারছিল না জীবনটাকে নিয়ে কী করবে। বেশ কিছুদিন ধরেই তাই চরম ডিপ্রেশনে ভুগছিল এবং তারই ফলশ্রুতিতে ওই হঠকারী সিদ্ধান্ত।

পরের পিরিয়ডটাই মিস করল কণা। তার পরেরটাও। তখনই ওর সন্দেহ হল, কিছু গন্ডগোল হয়ে গেছে।

কলকাতায় কণা একাই থাকে। পরিবার থাকে বর্ধমানে, গ্রামের বাড়িতে। এখানে ও একটা আই. টি. কোম্পানিতে চাকরি করে। অতএব কাউকে কিছু না জানিয়েই কণা এক গাইনোকোলজিস্টের কাছে গেল এবং অ্যাবরশনের ব্যবস্থা করে ফিরল। তবে কণা চেয়েছিল যাতে কোথাও সেই অ্যাবরশনের কোনও রেকর্ড না থাকে। স্বাভাবিক। আলেখের ব্যাপারটা ওর মাথায় ছিল।

গায়নোকোলজিস্ট ডক্টর শ্রবণা মিত্র বেশ চড়া একটা ফি-এর পরিবর্তে সেই ব্যবস্থা করে দিলেন। অ্যাবরশনটা হল মফস্সলের এক ছোটো নার্সিং হোমে। হাওড়া-খড়গপুর লাইনে মৌরিগ্রাম স্টেশনে নেমে আরও প্রায় দশ কিলোমিটার ভেতরে একটা গ্রামের মতন জায়গায় যেতে হল ওকে। ডক্টর মিত্রই স্টেশনে গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

পুরো একটা দিন সেই নার্সিং হোমে থাকতে হয়েছিল ওকে। সেই একদিনের মধ্যেই ওর কেবিনের জানালা দিয়ে কণা দেখেছিল নার্সিং হোমের ঠিক পিছন দিয়ে একটা সরু খাল বয়ে গেছে। বয়ে গেছে বললে ভুল বলা হবে। জলের স্রোতকে আটকে কারা যেন মশারির নেট দিয়ে পরপর চৌকোনা খাঁচা বানিয়ে রেখেছে। যে মধ্যবয়সি মহিলা ওর গা স্পঞ্জ করে দিচ্ছিলেন, ওকে খাওয়াচ্ছিলেন, তাকে সবাই ‘মায়াদি’ বলে ডাকছিল। তাকেই কণা জিজ্ঞেস করল, ‘ওগুলো কী গো,

মায়াদি?’ মায়াদি একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘কোনগুলো? ওই জলের মধ্যে ঘেরাগুলো?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওগুলোকে বলে হাপা। গ্রামের ছেলেরা কয়েক বছর হল একটা নতুন ব্যাবসা শুরু করেছে। অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছের চাষ। ওই জাল দিয়ে ঘেরা জলের মধ্যে ওরা রঙিন মাছ ব্রিড করে। সিঙ্গাপুর, জাপান আরও কোথা কোথা থেকে রঙিন মাছ আনিয়ে তাদের বাচ্চা ফোটায় ওই ঘেরা জলের মধ্যে। তারপর কলকাতার পাইকাররা এসে সেই বাচ্চা কিনে নিয়ে যায়। আপনার ঘরে অ্যাকোয়ারিয়াম আছে?’

কণার ঘরে সত্যিই একটা অ্যাকোয়ারিয়াম ছিল। প্রথমে ও একটা কুকুর পোষার কথাই ভেবেছিল। কিন্তু যে মেয়ে দিনের মধ্যে ন’-দশ ঘণ্টা অফিসে কাটায় সে আর কুকুর পুষবে কেমন করে? তাই শেষ অবধি এক রোববার সুপ্রিয়র সঙ্গে গ্যালিফ স্ট্রিটে গিয়ে কণা একটা ছোটো অ্যাকোয়ারিয়াম আর চারটে মাছ কিনে নিয়ে এসেছিল। দুটো মলি আর দুটো এঞ্জেল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে আর অফিস থেকে ফিরে কিছুক্ষণ কণা ওর ঘরের কোণায় রাখা অ্যাকোয়ারিয়ামটার সামনে গালে হাত দিয়ে বসে চারটে মাছের খেলা দেখত। দেখতে দেখতে ওর মন শান্ত হয়ে আসত।

কখনও বা হত না। না হলেও ও মাছগুলোকে দোষ দিত না। ও জানত, ওর জীবনটাই বড়ো জটিল হয়ে গিয়েছে। চারটে নিরীহ মাছের ক্ষমতা কী সেই জট খুলে আবার মসৃণ করে দেয়! তাই ওদের ভালোই বাসত কণা।

কিন্তু গত তিনমাসের নানান অশান্তি, সুপ্রিয়র আত্মহত্যার পরবর্তী বিষাদ, গর্ভদশার ক্লান্তি এসব কারণে মাছেদের প্রতি কিছু অযত্ন হয়ে থাকবে। তিন মাস ধরে কণা অ্যাকোয়ারিয়ামের জল পালটায়নি, এয়ার- পাম্প চালায়নি। তাই চারটে মাছই মরে গেছে। অ্যাকোয়ারিয়ামটা এখন ফাঁকাই পড়ে আছে।

মায়াদির প্রশ্নের উত্তরে কণা ঘাড় নেড়ে জানাল, আছে

মায়াদি বলল, ‘তা হলে এখান থেকে ক’টা মাছ কিনে নিয়ে যান। এসব মাছ এখান থেকে বোম্বে-টোম্বেতে চলে যায়। কলকাতার বাজারে পাবেন না।’

কণা বলল, ‘আচ্ছা। কাল তো বেলা এগারোটায় আমাকে রিলিজ করে দেবে বলেছে। তারপরে তুমি আমাকে একটু ওদের দোকানে নিয়ে যেয়ো।’

‘যাব, দিদি,’ মায়াদি বলল।

***

বেশি দূরে যেতে হল না। নার্সিং হোমের সামনের গেটে ওকে স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। কণাকে নিয়ে মায়াদি পিছনের একটা গেট দিয়ে বেরিয়ে সেই খালটার পাশে একটা কাঁচা ঘরে ঢুকল। ঘরটার দরমার দেওয়াল, টালির চাল।

ঘরের মধ্যে একজন বুড়োমানুষ একটা চৌকির ওপরে বসে বিড়ি টানছিল। ওদের ঢুকতে দেখে ঘড়ঘড়ে গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী চাই?’

মায়াদি বলল, ‘রমেনদা, এই দিদিমণিকে কটা মাছ বেছে দাও না।’

বুড়ো অবহেলায় ঘরের একদিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘ওই তো, যা আছে সব ওখানেই রয়েছে। আগে পছন্দ করো, তারপর আমি প্লাস্টিকে ভরে দিচ্ছি।’

কণা দেখল, ওদিকে মেঝের লেভেলে একটা অগভীর চৌবাচ্চা। তার মধ্যে নানারঙের মাছ খেলা করছে। আরও একটা জিনিস তার চোখে পড়ল। ওই চৌবাচ্চার পিছনেই ঘরের দরমার দেওয়ালের কিছুটা অংশ পচে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সেই ভাঙা দেওয়ালের ঠিক ওপাশে খালের স্বচ্ছ জল ছলছল করছে। তার মধ্যে ভাসছে নার্সিং হোমের বর্জ্য— তুলো, ব্যান্ডেজ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ইত্যাদি।

কণার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘ওই নোংরাগুলো মাছের চৌবাচ্চায় মিশে যায় না?’

বুড়ো একবার চোখ তুলে দেখল, কণা কোন নোংরার কথা বলছে। তারপর বিড়ির শেষ টুকরোটা দরজা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, ‘কেমন করে মিশবে? নোংরা কি লাফাতে পারে?’

কণা আর কথা না বাড়িয়ে, চৌবাচ্চার ধারে দাঁড়িয়ে নিজের সেলফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা জলের দিকে তাক করে মাছ দেখতে শুরু করল। মনস্থির করা মুশকিল ছিল। যে মাছই দেখে, মনে হয় কিনে নিয়ে যায়, এমনই সুন্দর তারা। কিন্তু তার তো দেড়ফুট বাই একফুটের ছোট্ট অ্যাকোয়ারিয়াম। তাই শেষ অবধি দুটো গোল্ডফিশ আর ছ’টা টাইগার ফিশ প্যাক করে দিতে বলল।

বুড়ো চৌকি ছেড়ে নেমে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট আর ছাঁকনি নিয়ে চৌবাচ্চার ধারে গিয়ে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই অন্য একটা মাছের দিকে কণার চোখে পড়ল। সেটা চৌবাচ্চায় ছিল না। ছিল ওই খালের জলে, হাসপাতালের বর্জ্যের মধ্যে। ওখানেই মাছটা স্থির হয়ে ভাসছিল এবং একদৃষ্টিতে কণার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।

মাছটা একটা কড়ে আঙুলের চেয়েও ছোটো। ফ্যাকাশে সাদা রং। শরীরের তুলনায় মাথাটা অনেক বড়ো। গায়ে আঁশ আছে বলে মনে হল না। অসম্ভব কুৎসিত দেখতে। লোটে মাছের চেয়েও কুৎসিত। কিন্তু মাছটার চোখদুটো বড়ো আশ্চর্য। কণা জানত, মাছের চোখে পাতা থাকে না। কিন্তু এই মাছটার চোখে পাতা ছিল। শিশুর চোখের মতন অবোধ দুটো চোখের চোখের দৃষ্টি দিয়ে মাছটা যেন কণাকে বলছিল, ও মা! আমাকে ফেলে যেয়ো না! আমাকে নিয়ে চলো।

কণা বুড়োকে বলল, ‘ওই মাছটাও দিয়ে দিন।’

‘কোন মাছটা?’ বুড়োর বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। তারপর যখন বুঝতে পারল যে, কণা খালের জলে ভাসতে থাকা ওই মাছটার কথা বলছে তখন বুড়ো রীতিমতন ফিউরিয়াস হয়ে উঠল। বলল, ‘এহ্! এটা আবার কী? ব্যাঙাচি নাকি? না, দিদি। ওসব জিনিস আমি ধরতে পারব না। আপনি আসুন এখন।

কণা একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে বুড়োর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘ওটা আমার চাই, দাদু। দেখো, যেন পালিয়ে না যায়।

পালিয়ে তো গেলই না, বরং ওদের তিনজনেরই মনে হল, বুড়ো দরমার দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে হাতের ছাঁকনিটা খালের জলে পেতে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছটা যেন নিজে থেকেই ছাঁকনির মধ্যে উঠে এল।

শেষ অবধি গোল্ডফিশ, টাইগার ফিশের সঙ্গে ওই নাম-না-জানা মাছটাকেও প্যাকেটে ভরে কণা নিজের ফ্ল্যাটে পৌঁছোল।

ফ্ল্যাটে ফিরেই কণা ওর সাইডব্যাগ থেকে মাছের প্লাস্টিকটা বার করে ওগুলোকে অ্যাকোয়ারিয়ামে ছাড়ার উদ্যোগ নিল। কিন্তু ঘরের জোরালো এল. ই. ডি. ল্যাম্পের আলোয় ও যা দেখল তাতে ওর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। ও দেখল, প্যাকেটের জলে গোল্ডফিশ আর সেই নাম-না-জানা মাছটা ঠিকই আছে। কিন্তু ছ’টা টাইগারের মধ্যে রয়েছে মাত্র তিনটে।

বাকিগুলোর ছিন্নভিন্ন শরীর প্যাকেটের নীচে পড়েছিল। কণা বুঝতে পারল নাম-না-জানা মাছটা ওদের মেরে ফেলেছে, কিন্তু খায়নি।

***

ঠিক দু’দিনের মধ্যে দুটো এঞ্জেল আর বাকি তিনটে টাইগারকেও মেরে ফেলল সেই নাম-না-জানা মাছটা। ওদের রক্তমাংসে অ্যাকোয়ারিয়ামের জল ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল। সেই জল পালটাতে পালটাতে কণা ভাবল, মারছে তো ঠিকই কিন্তু খাচ্ছে না কিছুই। কী খায় তা হলে ও?

পরদিন অফিস থেকে ফিরবার পথে কণা যাদবপুর বাজারের একটা রঙিন মাছের দোকান থেকে তিন-চার রকমের ফিশ-মিল আর একটা জলজ গাছ কিনল। তারপর কী ভেবে পাশের একটা খেলনার দোকান থেকে একটা প্লাস্টিকের ঝুমঝুমি আর ছোটো পুতুলও কিনে নিল। বাড়ি ফিরে সে দেখল অ্যাকোয়ারিয়ামের নীচে নুড়িপাথরের স্তূপের ওপরে মাথা রেখে মাছটা ঘুমোচ্ছে।

কণার কাছে ব্যাপারটা একটুও অদ্ভুত লাগল না। বাচ্চারা তো এইরকম ভঙ্গিতেই ঘুমোয়। ও কাচের দেওয়ালে মুখ ঠেকিয়ে দেখল, মাছটার চোখের পাতা বুজে আছে।

কণা কাচের গায়ে টোকা দিয়ে ডাকল, ‘এই দুষ্টু। ওঠ, ওঠ।’

মাছটা একবার ঢুলুঢুলু চোখদুটো খুলে ওকে দেখল। তারপর আবার অন্যপাশে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।

কণা হাত-মুখ ধুয়ে, অফিসের পোশাক চেঞ্জ করে, অ্যাকোয়ারিয়ামের কাছে ফিরে এল। তারপর সবকটা ফিশ-মিলের ক’টা করে দানা জলে ফেলে দিয়ে বলল, ‘নে, খেয়ে নে।’

মাছটা গা মুচড়ে জলের ওপরের দিকে উঠে এল। খাবারের দানাগুলোর গায়ে একবার ঠোকর মেরে আবার অন্যদিকে চলে গেল।

‘কী হল? খাবি না? কী খাবি তা হলে?’

কণা কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে ভাবল। তারপর ওর নিজের খাবার থেকে একটু ভাত, একটু চিকেনের টুকরো সব এনে এক এক করে অ্যাকোয়ারিয়ামের জলে ভাসিয়ে দিল। কিন্তু অদ্ভুত, মাছটা কিছুই মুখে তুলল না।

এবার কণার মুখে দুশ্চিন্তা ফুটে উঠল। বলল, ‘এ কী রে! এসবও খাবি না! না খেলে বাঁচবি নাকি?’

নরম গলায় অনেকক্ষণ ধরে সে মাছটাকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ উপরোধ করল। ইতোমধ্যে সে মাছটাকে ‘দুষ্টু’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল। সে বারবার বলছিল, ‘খেয়ে নাও, দুষ্টু। না খেলে তোমার ঘুম আসবে না যে। খাও! খেয়ে নাও!

কিন্তু ওর দুষ্টু কিছুতেই খাবার মুখে তুলল না।

একটু বাদে কণার সেই খেলনাগুলোর কথা মনে পড়ল। বাজারের ব্যাগ থেকে ঝুমঝুমি আর পুতুলটা বার করে সে বলল, ‘এই দেখো, তোমার জন্য কী নিয়ে এসেছি। এগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে খেয়ে নাও তো বাবু!’ খেলনাগুলোকে রাখার জন্য অ্যাকোয়ারিয়ামের ঢাকনা সরিয়ে জলের মধ্যে হাতটা ডোবানো মাত্রই মাছটা ছুটে এসে ওর তর্জনীর গায়ে আটকে গেল।

এক মুহূর্তের জন্য কণার চোখদুটো বিস্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে উঠল। ও পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, মাছটা নরম ঠোঁট দিয়ে ওর আঙুলের ডগাটা প্রাণপণে চুষছে। সেটা বুঝতে পেরে ও শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল। প্ৰায় মিনিট তিনেক ওইভাবে আঙুলটাকে চুষবার পরে মাছটা নিজে থেকেই খসে পড়ল। মাধ্যাকর্ষণের টানে নেমে গেল নুড়িপাথরের বিছানায়। মনে হল আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।

হাতটা আস্তে আস্তে অ্যাকোয়ারিয়ামের বাইরে বার করে আনল কণা। দুটো জিনিস দেখল। এক, দুষ্টুর ফ্যাকাশে সাদা পেটটা এর মধ্যেই বেশ লালচে হয়ে উঠেছে আর দুই, ওর নিজের তর্জনীর ডগায় দুটো লাল রক্তের ফোঁটা।

কণা একটা নিশ্বাস ফেলে ভাবল, যাক। ওকে খাওয়ানোর সমস্যাটা মিটল।

এর মধ্যে একদিন আলেখ ওর ফ্ল্যাটে এসেছিল এবং পুরুষমানুষের স্বভাবে ওকে বিছানার দিকে টানতে চাইছিল। কণা গায়ের জোরে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল।

আলেখ খুব অবাক হয়ে বলেছিল, ‘কী হল? আমাকে ভালোবাসো না?’

‘বাসি,’ উদাস গলায় উত্তর দিয়েছিল কণা।

‘তা হলে?’

কণা অ্যাকোয়ারিয়ামের দিকে মুখ করেই বসে ছিল। দেখছিল, দুষ্টু কাচের গায়ে মুখ ঠেকিয়ে আলেখকে দেখছে। ইতোমধ্যে ও আরও একটু বড়ো হয়েছে… প্রায় একটা চাঁপাকলার মতন বড়ো। গায়ের ফ্যাকাশে রংটাও পালটে গেছে। সুপ্রিয়র গায়ের রং ছিল অনেকটা এইরকম- শালিখ পাখির পালকের মতন বাদামি আর কালো মেশানো।

দুষ্টুর চোখের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই কণা উত্তর দিল, ‘তা হলে কী? ভালোবাসলেই ওইসব করতে হবে নাকি?’

আলেখ অত্যন্ত ভদ্র এবং বুদ্ধিমান। আর জোরজার করেনি। শুধু যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোমাকে খুব সিক লাগছে, চোখের নীচে কালি পড়েছে। কী হয়েছে আমাকে একটু বলবে? যদি সাহায্য করতে পারি।’

কণা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। হাসতে হাসতেই বলেছিল, ‘কী আবার হবে? অফিসে কাজের চাপ যাচ্ছে, ঘুমটাও কম হচ্ছে। তাই হয়তো ওরকম মনে হচ্ছে।’

আলেখ আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ও বেরিয়ে যাওয়ার পর দুষ্টুও কাচের পাশ থেকে সরে গেল গাছের আড়ালে। এমনিতে ওই জলজ গাছের ছায়াতেই ও অনেকটা সময় কাটায়। যাওয়ার সময় প্লাস্টিকের পুতুলটাকে দাঁতে করে কামড়ে নিয়ে গেল। হ্যাঁ, শুর চোয়ালে পিরানহা মাছের মতন দু’সারি ঝকঝকে দাঁত গজিয়েছে। তার মধ্যে দুটো দাঁতের গড়ন সাপের বিষদাঁতের মতন— লম্বা, বাঁকানো এবং ফাঁপা। ওই দাঁতদুটো দিয়ে ও কণার আঙুল থেকে রক্ত চুষে খায়। অন্য কিছু খায় না।

***

দুষ্টুর খাওয়া, দুষ্টুর বেড়ে ওঠা এসব কেউ দেখতে পাচ্ছিল না। কণার ফ্ল্যাটে তো কারুর তেমন আসা-যাওয়া ছিল না। এক আলেখ আসত মাঝে মাঝে। তবে তিন-চারমাস কণার কাছ থেকে খুব ঠান্ডা ব্যবহার পাওয়ার পর সে-ও আসা ছেড়ে দিয়েছে। ফোনও করে না, মেসেজও না। একজন কাজের মাসি ছিল। সে দুষ্টুকে দেখে ভয় পেত। তার নাকি বমি পেত দুষ্টুকে দেখে। তাই কণা তাকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল 1

এখন কণার এক-কামরার ফ্ল্যাটে যথেচ্ছ নোংরা জমে। বেসিনের ঝাঁঝরিতে চুল, রান্নাঘরের সিংকের মুখটা বাসি চা-পাতা জমে বন্ধ, হাঁটতে গেলে মেঝের ধুলোয় পায়ের ছাপ পড়ে। শুধু এত নোংরার মধ্যে ওই দেড় ফুট বাই এক ফুটের অ্যাকোয়ারিয়ামটা পরিষ্কার ঝকঝক করে। প্রতিদিন নিয়ম করে কণা তার জল পালটায়, কাচ পরিষ্কার করে আর…

আর দু’বেলা জলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দাঁড়িয়ে থাকার সময়টা ক্রমশ বাড়ছে। পনেরো মিনিট… আধঘণ্টা… এক ঘণ্টা।

বাড়ছে সেই নাম-না-জানা মাছটাও। এখন ওটা প্রায় আট ইঞ্চি লম্বা হয়েছে। ওর মুখে কণা দু’জনের আদল দেখতে পায়। ছোটো কপাল আর বড়ো বড়ো চোখের মধ্যে ও নিজের আদল খুঁজে পায় আর একটু থ্যাবড়া নাক আর মুখের চৌকোনা ফ্রেমের মধ্যে খুঁজে পায় সুপ্রিয়কে।

আরও মাসখানেক বাদে কণা অফিসে একটা মেল করল, ‘আমাকে একমাসের ছুটি দিতে হবে, ফর আর্জেন্ট রিজন।’

ওদের টিম ম্যানেজার মেলটা দেখে ওকে ফোন করে বললেন, ‘মামার বাড়ি নাকি? একমাসের ছুটি মানে? এমনিতেই তো কাজের যা হাল করে রেখেছ, তোমার কাজগুলো অন্যদের দিয়ে তোলাতে হয়!’

কণা কিছুক্ষণ ভাবল। দুষ্টু এখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় খেতে চায়। সে অফিস যাবে কেমন করে? তাই বলল, ‘ঠিক আছে, আমি রেজিগণেশন লেটার পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

এরপর আর কেউ কণার গলার স্বর শোনেনি।

যেদিন ওর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশকে খবর দিল এবং পুলিশ দরজা ভেঙে দেখল অ্যাকোয়ারিয়ামের পাশে মেঝের ওপরে কণার মৃতদেহ পড়ে আছে, সেদিনই ওর উলটোদিকের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলা পুলিশকে বলেছিলেন তিনি দিন সাতেক আগে কণাকে দরজার বাইরে ময়লার বালতি নামিয়ে রাখতে দেখেছিলেন। তখন ওকে অসম্ভব ফ্যাকাশে দেখতে লাগছিল। তাছাড়া ওর দু’হাতের পাতায় ন্যাকড়ার ব্যান্ডেজ জড়ানো ছিল।

পোস্টমর্টেমেও একই বক্তব্য উঠে এল। মৃত্যু হয়েছে অ্যাকিউট অ্যানিমিয়ায়, রক্তশূন্যতায়। রক্তশূন্যতার কারণ? সে তো ঘরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়— অনাহার। দারিদ্র্য। চাকরি ছিল না তো মেয়েটার। ফ্ল্যাটের দরজা যখন ভেতর থেকে বন্ধ ছিল তখন বাইরের কেউ এসে তো আর খুন করে যেতে পারে না।

শুধু যাদবপুর থানার ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের মনটা একটা ব্যাপারেই খুঁতখুঁত করছিল। এত নোংরার মধ্যে অ্যাকোয়ারিয়ামটা অমন সুন্দর করে পুতুল দিয়ে, ঝুমঝুমি দিয়ে সাজানো কেন? ওর মধ্যে কি মাছ ছিল? থাকলে সেগুলো গেল কোথায়?

উনি যদি আর-একটু মন দিয়ে ঘরটা দেখতেন, তা হলে দেখতে পেতেন অ্যাকোয়ারিয়ামের নীচ থেকে রান্নাঘরের নর্দমা অবধি একটা আঁশটে জলের দাগ।

মাকে মারা যেতে দেখে ওই নর্দমাটা দিয়েই দুষ্টু বেরিয়ে গিয়েছিল। কোথায় কে জানে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *