ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

ডালিয়া শীতের ফুল – সৈকত মুখোপাধ্যায়

ডালিয়া শীতের ফুল

বৈঠকখানা বাজারের রাস্তার ধারে একটা বুড়ি নীল পলিথিন শিট বিছিয়ে তার ওপরে বিক্রির জন্য কয়েক আঁটি সবুজ কাটোয়া ডাঁটা সাজিয়ে রেখেছিল। বুড়ির সামনে দিয়ে সকাল থেকে কয়েক হাজার লোক চলে গেল। কেউ তাকে দেখল, কেউ দেখল না। যারা দেখল, তারাও ডাঁটাকে ডাঁটার বেশি কিছু ভাবল না, পলিথিনকে পলিথিন। শুধু সার্পেন্টাইন লেনের বাসিন্দা জয়দেব সরকারের ভালো লেগে গেল। তার মনে পড়ে গেল, একবার হাজারিবাগের একটা বনবাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি অমনই নীল পলিথিনের মতো আকাশের গায়ে কাটোয়া ডাঁটার মতো সবুজ শালগাছের সারি দেখেছিলেন।

ঘোর কাটিয়ে আবার চলতে শুরু করলেন জয়দেববাবু। আপনমনে দু’দিকে মাথা নাড়লেন। ভাবলেন, এইজন্যই আমার জীবনে কিছু হল না। এই যে চারিদিকে যারা হেঁটে চলেছে, এরা কি কেউ আকাশের কথা ভাবছে? ভাদ্রের ভ্যাপসা কলকাতায় দাঁড়িয়ে চৈত্রের শালবনের কথা ভাবছে?

জয়দেব সরকার নিজে যা-ই ভাবুন, তিনি যে একেবারেই ব্যর্থ মানুষ এমনটা বলা যায় না। এ. জি. বেঙ্গলের চাকরিতে গত কুড়ি বছরে লোয়ার-ডিভিশন ক্লার্ক থেকে প্রোমোশন পেয়ে হেড-অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়েছেন, মানে বড়োবাবু। মাইনে খারাপ নয়। সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িটা পৈতৃক। একমাত্র মেয়ে শাঁওলি ভয়ংকর মেধাবী। প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে পড়ছে। ও ঠিকই মানুষ হয়ে যাবে।

হয়তো ব্যাবসা কিম্বা আরও বড়ো একটা চাকরি করলে বাইপাসের ধারে ফ্ল্যাট হত, একটা গাড়ি হত, ঘরের টেলিভিশনটা পাঁচ বছর অন্তর পালটানো যেত, কিন্তু নাটকটা হত না।

হ্যাঁ, জয়দেব সরকারের একটা নাটকের দল আছে। অন্যধারার থিয়েটারের দল, নাম ধানসিঁড়ি। সেই দলের তিনিই নাট্যকার, তিনিই পরিচালক। প্রয়োজন পড়লে অভিনয়ও করেন। বিশেষ ধরনের কস্টিউম- টস্টিউমের প্রয়োজন হলে সেসব তাঁর বউ কাবেরী বাড়িতেই একটা পা- মেশিনে সেলাই করে বানিয়ে দেয়। এর আগের নাটকটায় পোস্টার লিখে দিয়েছিল শাঁওলি। ওর হাতের লেখা মুক্তোর মতো।

বাকি কাজ করে দলের ছেলেমেয়েরা। ওদের কথা ভেবেই একটা আলাদা মহলা-ঘর ভাড়া নিয়েছেন জয়দেববাবু।

নাটক করতে করতে কয়েকটা অভ্যেস কেমন করে যেন আপনা থেকেই জয়দেববাবুর মাথার ভেতরে গেড়ে বসেছে। একটু অন্যরকমের মানুষ দেখলেই তিনি মনের মোবাইলে তার ছবি তুলে নেন। ঘুরিয়ে- ফিরিয়ে ভাবেন, এর মধ্যে কি নাটকের চরিত্র হওয়ার মতো কিছু রয়েছে?

রাস্তা চলতে চলতে একটু অফবিট কথা কানে এলেই পকেটের ছোটো নোটবুক খুলে টুকে রাখেন। তাকমতো নাটকের ডায়ালগে লাগিয়ে দেন।

সারা দুনিয়াটাকেই মনে হয় ধানসিঁড়ির নাটকের সেট। কোথাও একটু বেখাপ্পা কিছু চোখে পড়লেই খট করে সেটা চোখে এসে লাগে।

নাটকের দুনিয়ার বাইরে এসব গুণ যে আর কোনও কাজে লাগতে পারে জয়দেব সরকার নিজে তা কখনও ভাবেননি। ভেবেছিলেন লেবুতলা থানার ও.সি. কল্যাণ বোস।

বছর দুয়েক আগে জয়দেববাবুদের পাড়ায় একটি দম্পতি খুনের তদন্ত করতে এসে কল্যাণ বোস বুঝেছিলেন, এই অতি-সাধারণ চেহারার মানুষটির মধ্যে যে ক’টা গুণ রয়েছে, ঠিক সেই ক’টা গুণ থাকলেই ভালো গোয়েন্দা হওয়া যায়।

কল্যাণ বোসের সঙ্গে গত দু’বছরে জয়দেববাবুর বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। জয়দেববাবু যেমন ক্রাইমের মধ্যে জীবনের সেরা নাটকগুলো খুঁজে পান তেমনই কল্যাণ বোস আবার নাটকের মধ্যে খুঁজে পান এক সুস্থ পৃথিবীর ছবি। ফলে দু’জনকে প্রায়ই একসঙ্গে মর্গে কিম্বা রবীন্দ্রসদনে ঢুকতে দেখা যায়। তবে যেহেতু বয়সে কিছুটা বড়ো, তাই কল্যাণ বোস জয়দেব সরকারকে ‘দাদা’, ‘আপনি’ বলে কথা বলেন। জয়দেববাবুও কল্যাণ বোসকে ‘কল্যাণবাবু’, ‘আপনি’ বলেন।

বাজার করে বাড়ি ফিরে ফ্যানের তলায় বসে কাগজ পড়ছিলেন জয়দেব সরকার। দুপুর দুটো বাজে। ভাবছিলেন এবার স্নানে যাবেন। এমন সময় জয়দেববাবুর পকেটের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। কল্যাণ বোস ফোন করেছেন।

ফোনটা বেশ খুশি মনেই রিসিভ করলেন জয়দেব সরকার। উলটো দিক থেকে কল্যাণ বোস ব্যস্তসমস্তভাবে বললেন, ‘শুনুন, জয়দেবদা! আমার ব্যাচমেট চৈতন্য শাসমল, এয়ারপোর্ট থানার ও. সি. সে একটা বিপদে পড়েছে। আপনাকে উদ্ধার করতে হবে। আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে গাড়ি নিয়ে আপনার বাড়িতে পৌঁছোচ্ছি। আপনি আমার সঙ্গে যাবেন।’

জয়দেববাবু চট করে দেওয়ালঘড়িটা দেখে নিয়ে ব্যাজার গলায় বললেন, ‘বড়া খাওয়ার জন্য দুশো গ্রাম ঘুসো চিংড়ি কিনেছিলাম। সেটা বোধহয় আজকে আর…’

তার বদলে আপনাকে যশোর রোডের ঢাকাই বিরিয়ানি খাইয়ে দিচ্ছি। রাতে খাবেন যত ইচ্ছে চিংড়ির বড়া। বউদিকে বরং বলবেন আমার জন্যও দুটো তুলে রাখতে।’

জয়দেব সরকার বললেন, ‘আচ্ছা, চলে আসুন।’

***

গাড়িতে উঠেই জয়দেববাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেসটা কী? মার্ডার?’

কল্যাণ বোস উত্তর দিলেন, ‘উহুঁ। ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স। একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরোটাই বলছি, মন দিয়ে শুনুন।

আজাদ কলোনিটা এয়ারপোর্ট এরিয়ার ক্রিমিনালদের খুব ফেভারিট ডেন; কাজেই ওখানে একজন ইনফর্মার থাকা খুব জরুরি। চৈতন্যর এরকম একটি রিলায়েবল ইনফর্মার আছে। লেডি-ইনফর্মার, নাম ডালিয়া। কোন একটা শপিং মলের সেল্সগার্লের চাকরি করে। ওই বস্তিতেই থাকে।

এবার আপনাকে কলোনির জিয়োগ্রাফিটা একটু বলে নিই, না হলে ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারবেন না।

যে ট্র্যায়াংগুলার জমিটার ওপরে বস্তিটা গজিয়ে উঠেছে, সেটার একদিকে খাল, একদিকে এয়ারপোর্টের কুড়ি ফুট উঁচু পাঁচিল, আর তিন নম্বর দিকটায় একটা মসজিদের বাউন্ডারি ওয়াল— সে-ও নাকি কুড়ি ফুট উঁচু। এয়ারপোর্টের পাঁচিল আর মসজিদের পাঁচিলের মাঝখানটায় একটা দশ ফুট চওড়া রাস্তা আছে। দ্যাট ইজ দি ওনলি রোড, কানেকটিং দ্যাট বস্তি উইথ দ্য বাইরের জগৎ।’

জয়দেববাবু বললেন, ‘ইন্টারেস্টিং। তারপর?’

‘কাল সকালের দিকে সেই ইনফর্মার মেয়েটি— ডালিয়া— সে চৈতন্যকে ফোন করে। তীরথ জয়সোয়াল নামে একটা ড্রাগ স্মাগলারকে চৈতন্য অনেকদিন ধরে খুঁজছিল, পাচ্ছিল না। ডালিয়া, চৈতন্যকে ফোন করে বলে, গত ছ’মাস ধরে তীরথ আজাদ বস্তিতেই রয়েছে। চৈতন্য দলবল নিয়ে পৌঁছোলেই সে চৈতন্যের হাতে তীরথকে তুলে দেবে।’

জয়দেববাবু বললেন, ‘আগে নয় কেন? ফোনে স্মাগলারটার নাম-ঠিকানা বলে দিলেই তো হত।’

কল্যাণ বোস বিরক্ত মুখে বললেন, ‘জিজ্ঞেস করেছিলাম, শালা ঝেড়ে কাশল না। গিয়ে জানতে পারব। প্রবলেম হচ্ছে, ডালিয়ার ফোন পেয়েই চৈতন্য তো দলবল নিয়ে ছুটে গেছে ওখানে। কিন্তু গিয়ে দেখছে ডালিয়া বেপাত্তা। তার মোবাইলও স্যুইচড অফ।

এয়ারপোর্ট থানার টিম আজাদ কলোনির কোনায় কোনায় ছাপ্পা মেরে ফেলেছে, কোথাও মেয়েটিকে খুঁজে পায়নি। তার নিজের ঘরে বাইরে থেকে তালা মারা। বাড়িওলাকে ডেকে পাঠিয়েছে চাবি নিয়ে আসার জন্য। এর মধ্যেই আমাকে কল করেছে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

‘আর তীরথ জয়সোয়ালের কী হল?’

‘সে যদি ওখানে থাকে তা হলে ওখানেই রয়েছে। পালানোর উপায় রাখেনি চৈতন্য। একমাত্র যাতায়াতের রাস্তাটা বারোটার পর থেকে কর্ডন করে রেখেছে। কিন্তু মুশকিল কী জানেন, সে যদি ওখানে থেকেও থাকে তা হলেও তো তাকে আমরা কেউ ব্যাটাকে চিনতে পারব না, যতক্ষণ না ডালিয়া চিনিয়ে দিচ্ছে।’

জয়দেব সরকার বললেন, ‘পুলিশ ফাইলে তীরথ জয়সোয়ালের ফটো কিম্বা ডেসক্রিপশন নেই? নিজেরা ওকে চিনে নিতে পারবেন না?

‘আছে। কিন্তু ছবিটা অনেক পুরোনো। বারো বছর আগের পাসপোর্ট থেকে নেওয়া। তাছাড়া তীরথের চেহারাটা এমনই যে, আলাদা করে চোখে পড়ার মতো কিছুই নেই। অনেকটা… ইয়ে… আপনার মতো।’

হো হো করে বেশ কিছুক্ষণ পাগল ঔরঙ্গজেবের হাসিটা হেসে নিলেন জয়দেব সরকার। বললেন, ‘এটা ভালোই বলেছেন। এইজন্যই আমি সামান্য মেকআপ নিয়েই সাধু থেকে শয়তান যা ইচ্ছে সেজে ফেলতে পারি। অ্যাকচুয়ালি, ভালো ক্রিমিনালরা সকলেই ভালো অ্যাক্টর। তবে ভালো অ্যাক্টররা সবাই ক্রিমিনাল নয়।’

***

কল্যাণ বোস আর জয়দেব সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে ও. সি. চৈতন্য শাসমল একেবারে খোলাখুলি কনফেশন করলেন, ‘এরকম গ্যাঁড়াকলে কখনও পড়িনি মাইরি!’

বসের পাশে দাঁড়িয়ে কপালের ঘাম মুছছিল শ্যামল মাইতি, সেকেন্ড অফিসার, এয়ারপোর্ট পি. এস.। সে-ও ঘাড় নেড়ে বসের কথায় সায় দিল।

ওঁরা চারজন বস্তির মুখ আটকে দাঁড়িয়ে থাকা চারটে কালো ভ্যানের একটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। জয়দেববাবু জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের সার্চ শেষ?’

চৈতন্য শাসমল জবাব দিলেন, ‘বিলকুল।’

‘মেয়েটাকে পাননি?’

‘না।’

‘বস্তি ছেড়ে পালায়নি যে, সেটা কেমন করে বুঝছেন?’

‘কে পালাবে?’ গম্ভীর গলায় প্রতিপ্রশ্ন ছুড়ে দিলেন চৈতন্য।

‘ইয়ে, মানে আপনার ইনফর্মার।’

চৈতন্য শাসমল নিজের মোবাইলের কল-লগ খুলে একটা কলের ডিটেইলস জয়দেববাবুর নাকের সামনে ধরলেন। বললেন, ‘ভালো করে দেখে নিন। ডালিয়ার লাস্ট কল। আজ সকাল দশটা পনেরোয় পাঠিয়েছিল। তখনও মেয়েটা আমাকে বলেছিল, সব ঠিক আছে। আমি নিজের ঘরেই রয়েছি। তীরথ জয়সোয়ালও কাছাকাছিই রয়েছে। আপনারা এলেই লোকটাকে দেখিয়ে দেব।

ও যখন কলটা করেছিল, আমরা তখন অলরেডি অন দ্য মুভ। ঠিক দশটা পঁয়ত্রিশে আমরা আজাদ বস্তি কর্ডন করে ফেলেছি। এই কুড়ি মিনিটের মধ্যে একটা মেয়ে বস্তি থেকে আমাদের চোখে এড়িয়ে পালাবে কেমন করে? আমরা তো এখান থেকে ভি. আই. পি রোডে ওঠার একমাত্র যে রাস্তা, সেটা ধরেই আসছিলাম।

আর ডালিয়ার মুখ আমার খুব ভালোভাবে চেনা। আসবার পথে ওকে দেখলে আমি ঠিক ধরে নিতাম। না, দাদা, আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট শিশুর — ও আর তীরথ জয়সোয়াল, দু’জনেই এখনও এই বস্তিতেই রয়েছে। আর তীরথকে যতক্ষণ না পাচ্ছি, আমি কর্ডন ওঠাব না। তাতে আমার চাকরি থাকলে থাকবে, গেলে যাবে।’

একটা আইসক্রিমওলা তার তিনচাকার বাক্সগাড়ির প্যাডেল মেরে ওদের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল। শ্যামল মাইতি হাত দেখিয়ে তাকে ডাকল। লোকটা গাড়ি ঘুরিয়ে ওদের সামনে এসে বিগলিত ভঙ্গিতে স্যালুট করে নেমে দাঁড়াল।

চারটে চকোবার দে,’ শ্যামল বলল।

‘চকোবার নেই, স্যার।’

তা হলে করনেটো দে। কী হল? তা-ও নেই? কী আছে বাল তোর কাছে! কাপ আইসক্রিম আছে তো?’

আইসক্রিমগুলা বলল, ‘শুধু পেপসি আছে, স্যার।’

‘পেপসি মানে? ওই কন্ডোমের মধ্যে রঙিন জল? কেন বোকাচো…? এরকম বুড়ি রেন্ডির দশা কেন তোর?’

শ্যামলের খিস্তির তোড়ের সামনে পড়ে লোকটা কাঁদো কাঁদো গলায় হড়বড় করে বলে উঠল, ‘কেমন করে থাকবে, স্যার? আজই তো মাল আনতে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই আপনারা এসে পুরো বস্তি নাকাবন্দি করে দিলেন। ক’দিন থাকবেন, স্যার, আপনারা এখানে?’

‘চিরকাল থাকব! আপত্তি আছে তোর? ভাগ শালা, ভাগ এখান থেকে!’ শ্যামল হাতের ব্যাটন তুলতেই রোগা লোকটা হাঁইফাঁই করে প্যাডেল দাবিয়ে পালাল। শ্যামল জিপের সামনের সিট থেকে একটা ঠান্ডা জলের বোতল এনে বস আর দু’জন অতিথিকে খাওয়াল। নিজেও একঢোক খেল। তারপর বলল, ‘একটা কথা মাথায় ঢুকছে না। ডালিয়া এত ন্যাকড়া না জড়িয়ে লোকটার নামধাম বলে দিলেই তো পারত!’

জয়দেববাবুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চৈতন্য শাসমল ধমকে উঠলেন, ‘ওহ্, শ্যামল! তোমার ল্যাংগুয়েজ বড্ড খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তুমি যে বীরসিংহ গ্রামের ছেলে, সেটা কি সাত বছরের চাকরিতেই ভুলে গেলে?’

শ্যামল জিভ কেটে বলল, ‘আর হবে না, স্যার।’

চৈতন্য শাসমল একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘ডালিয়া আমাকে কেন স্পেসিফিক ইনফর্মেশন দেয়নি সেটা তো সবচেয়ে ভালো জানার কথা তোমার। আগে তিনবার তিনটে সুপার্ব ইনফর্মেশন দিয়েছিল মেয়েটা। কোনওবারই তুমি ওকে টাকাপয়সা দাওনি। মনে পড়ছে?’

শ্যামল মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল, ‘কী করব, স্যার? কন্টিনজেনসির যে কী অবস্থা সে তো আপনি জানেন। ইনফর্মারদের অ্যাওয়ার্ডের টাকায় অফিসের আলমারি কিনেছি।’

‘বেশ করেছ। সেইজন্যই ও এবার বলে দিয়েছিল, একহাতে টাকা নেবে আর অন্যহাতে লোকটাকে দেখিয়ে দেবে। চলো, এবার মেয়েটার ঘরে ঢুকে দেখি, কোনও ব্লু পাওয়া যায় কি না।’

***

দলবল নিয়ে বস্তির রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরে চৈতন্য শাসমল হঠাৎ খেয়াল করলেন, জয়দেব সরকার সঙ্গে নেই। তিনি পিছন ফিরে দেখলেন, ভদ্রলোক একটা ছোটো নোটবুকে ঝড়ের বেগে কীসব যেন লিখে চলেছেন। শাসমল অবাক হয়ে বললেন, ‘আরে! উনি কীসের নোট নিচ্ছেন?’

কল্যাণ বোস মুচকি হেসে বললেন, ‘শ্যামলের খিস্তিগুলো লিখে রাখছেন। নাটকের ডায়ালগে বসাবেন।’

.

তিন

ডালিয়া যে ঘরটায় থাকে, সেই ঘরের বাড়িওলা থাকে বাগুইআটিতে। ফোন করে তাকে ডাকিয়ে এনেছিলেন চৈতন্য শাসমল। বছর চল্লিশের লোকটার নাম বাবলু মণ্ডল। এই বস্তিতে বেশ ক’টা ঘরের সে-ই মাসিক তাছাড়া বাগুইআটির মোড়ে তার একটা মোটর গ্যারেজ আছে।

ডালিয়ার ঘরের দরজায় দুটো তালা ঝুলছিল। একটা নিশ্চয়ই ডালিয়াই লাগিয়ে গিয়েছে। বাধ্য হয়েই পুলিশকে তার ওপরেই লাগাতে হয়েছিল অন্য আর-একটা তালা। এখন বাবলু মণ্ডল ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ডালিয়ার তালাটা খুলে দিতেই শ্যামল মাইতি তার ওপরে লাগানো পুলিশের তালাটা খুলে ফেলল। বাবলু মণ্ডলকে মাঝখানে রেখে ঘরে ঢুকে পড়লেন চৈতন্য শাসমল, কল্যাণ বোস আর শ্যামল মাইতি। কল্যাণ বোস হঠাৎ খেয়াল করলেন, জয়দেববাবু তাঁদের সঙ্গে ঘরে ঢোকেননি। তিনি ভেতর থেকেই গলা তুলে হাঁক দিলেন, ‘ও জয়দেবদা, কোথায় গেলেন?’

‘এই যে,’ রুমালে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলেন জয়দেববাবু ‘একা একা বাইরে দাঁড়িয়ে কী করছিলেন?’ জিজ্ঞেস করলেন কল্যাণ বোস।

‘কিছু না। ডালিয়াদেবী এই ঘরের দরজায় যে তালাটা লাগিয়ে বেরিয়েছেন, সেটা একটু নেড়েচেড়ে দেখছিলাম।’

‘কী দেখলেন?’ এই প্রথম এয়ারপোর্ট থানার ও. সি. চৈতন্য শাসমলের গলায় জয়দেববাবুর সম্বন্ধে একটু সম্ভ্রম দেখা গেল। তার কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছেন, যে কাজটা তাঁর প্রথমেই করার কথা ছিল, যে কাজটা তিনি করতে ভুলে গিয়েছিলেন, সেটা এই ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালিটি কোনওরকম পুলিশ ট্রেনিং ছাড়াই করে ফেললেন।

জয়দেববাবু বিনীত ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, ‘দেখলাম ওটা টিপ- তালাই বটে।’ এই বলে তিনি ঘরে ঢুকলেন।

ঘরে ঢোকার পরেও জয়দেববাবু নিজের মনেই কথা বলে চলেছিলেন। উনি বলছিলেন- ‘কোনও লোক, সে পুরুষই হোক বা মহিলা, যখন চাবি খুলে ঘরে ঢোকে, তখন সে প্রথম কাজ কী করে? প্রথমেই সে চাবিটাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেয়। জায়গাটা দরজার কাছাকাছি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। না হলে তালেগোলে ভুলে যাবে।

আমি যেমন রাখি দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁ-দিকে যে স্যুইচবোর্ড, তার মাথায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ডালিয়াদেবী তা রাখেননি।’

কথা বলতে-বলতেই জয়দেব সরকার হাত বাড়িয়ে ডালিয়ার ঘরের সুইচবোর্ডের মাথাটা খুঁজলেন। চাবি পেলেন না।

‘না হলে দেওয়ালের কোনও পেরেকে…’ তিনি দরজার লাগোয়া দেওয়ালের দিকে ঘাড় তুলে চাইলেন। বললেন, ‘নাহ্, পেরেক-টেরেক কিছু তো দেখছি না।’

চৈতন্য শাসমল আর না পেরে রাগতস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘চাবি খুঁজছেন কেন বলুন তো? ডালিয়া তো চাবি সঙ্গে নিয়েই বেরোবে, নাকি?’ তাঁর কথার উত্তর দিলেন না জয়দেব সরকার। নিজের মনেই বলে চললেন, কিম্বা এইরকম কোনও কৌটোর মধ্যে…’

একটা কৌটো ছিল ঠিকই। দরজার ডানদিকে ছোটো জলের বেসিন। তার ওপরেই ছিল টুথব্রাশ আর টুথপেস্ট রাখার একটা লম্বাটে কৌটো উনি সেটাকে উলটে ঝাড়া দিলেন। চাবি বেরোল না।

‘আর তা-ও যদি না হয় তবে টেবিলক্লথ কিম্বা এইরকম ভাঁজ করা কাগজের নীচে…’

দরজার ঠিক পাশে একটা ছোটো টুলের ওপর একটা প্লাস্টিক-বডির ওয়াটার পিউরিফায়ার রাখা ছিল। টুলের ওপর পাতা ছিল ভাঁজ করা খবরের কাগজ। সেটার একটা কোনা অল্প তুলে জয়দেববাবু খুব নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে একটা চাবি বার করে আনলেন।

তিনজন পুলিশ অফিসারই অবাক চোখে জয়দেব সরকারের কার্যকলাপ যাকে বলে ‘নিরীক্ষণ’ করছিলেন। তাদের মধ্যে শ্যামল মাইতিই প্রথম ঘোর কাটিয়ে জয়দেববাবুর হাত থেকে চাবিটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। জয়দেববাবু তার হাতে চাবিটা দিলেন ঠিকই, তবে সঙ্গে এটাও বলে দিলেন, ‘তালার গায়ে লাগিয়ে দেখার দরকার নেই। কোম্পানির নাম আর নম্বর মিলে গেছে। তালার গায়েও জেমিনি ওয়ান জিরো টু ফাইভ, চাবির গায়েও তা-ই। সস্তার টিপ-তালা। আমাদের শেয়ালদার ফুটপাথে ঢেলে বিক্রি হয়।’

পুলিশের তিন অফিসার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। জয়দেব সরকার এইমাত্র যে হিন্টটা দিলেন, সেটা বুঝতে তাঁদের অসুবিধে হয়নি। তালাটা টিপ-তালা। চাবিটা ঘরের ভেতরে। মেয়েটা নিখোঁজ; তার ফোন স্যুইড অফ। তার মানে… তবে কি এই ঘরে ডালিয়ার লাশ লুকিয়ে রেখে, বাইরে থেকে কেউ তালা দিয়ে পালিয়েছে?

বাবলু মণ্ডলকে ধাক্কা মেরে একপাশে সরিয়ে তিন অফিসার ঘরের তিনদিকে দৌড়ে গেলেন। কল্যাণ বোস এক লাথি মেরে লাগোয়া বাথরুমটার টিনের দরজা খুলে ফেললেন।

না, বাথরুমের ভেতরে কিছু নেই।

শ্যামল মাইতি ঘরের একমাত্র চৌকিটার নীচে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে আবার বেরিয়ে এল। ঘাড় নাড়াল দু’দিকে। চৌকির নীচেও কিছু নেই।

চৈতন্য শাসমল ওয়াটার পিউরিফায়ারটা নামিয়ে রেখে ওই টুলটার ওপরে দাঁড়িয়েই উঁকি মারলেন প্লাইউডের ফলস সিলিং-এর ওপরে। সবাই নিশ্চিত ছিলেন, ওখানেই ডালিয়ার লাশ থাকবে। কিন্তু, না, ওখানেও কিছু ছিল না।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে আট ফুট বাই দশ ফুট ঘরটার সার্চ শেষ হয়ে গেল। দম নিতে নিতে চৈতন্য শাসমল বাড়িওলাকে বললেন, ‘যান তো ভাই, আপনি বাইরে গিয়ে দাঁড়ান। আমাদের কিছু প্রাইভেট কথা আছে।’

বাবলু মণ্ডল তড়িঘড়ি ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।

.

চার

‘তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল?’ বাবলু বেরিয়ে যাওয়ার পর অন্যদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন চৈতন্য শাসমল।

শ্যামল মাইতি বলল, ‘মেয়েটাকে জোর করে কেউ বার করে নিয়ে গেছে। মুখে গ্যাগ লাগিয়েছিল নিশ্চয়ই। নিজে যদি বেরোত তা হলে চাবি নিতে ভুলত না।’

কল্যাণ বোস ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিলেন। হঠাৎ বললেন, ‘আচ্ছা, আমরা ট্রিপ্লিকেট চাবিটার কথা ভাবছি না কেন? এই ধরনের সস্তার তালার সঙ্গে তিনটে করে চাবি থাকে। ডুপ্লিকেট চাবি বাড়িওলা বাবলু মণ্ডলের কাছে। অরিজিনালটা জয়দেববাবু খুঁজে বার করলেন। আর-একটা তো থাকবে। সেই চাবিটা নিশ্চয়ই ডালিয়ার হ্যান্ডব্যাগের মধ্যে থাকে। এরকম তো হতে পারে, ডালিয়া সেটা নিয়েই বেরিয়েছে আর আমরা তিলকে তাল ভাবছি?’

দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জয়দেব সরকার। চুপ করে অন্যদের কথা শুনছিলেন। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘কিন্তু ডালিয়া তো হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে বেরোয়নি।’

তাই শুনে বাকি তিনজনেই জয়দেববাবুর দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।

জয়দেববাবু গল্প বলার মতো করে বলে চললেন, ‘বাথরুমে একটা বালতির মধ্যে ছাড়া জামাকাপড় ভেজানো রয়েছে। আমি মেয়েটার চেহারার একটা আন্দাজ পাওয়ার জন্য দু’-একটা জামাকাপড় তুলে দেখছিলাম। দেখলাম একটা ব্রেসিয়ার, কাপের সাইজ বেশ ছোটো। নামী কোম্পানির তৈরি। প্যান্টিও তা-ই। বেশ দামি জিনিস এবং নতুন। কিন্তু জিন্‌সটা হাওড়ার হাটের সস্তা মাল। বুঝলাম, ডালিয়ার চেহারাটা ছোটোখাটো, আর…’

‘আপনি ভ্যানিটি ব্যাগের কথা কী বলছিলেন?’ জয়দেববাবুকে তাঁর কথার মধ্যে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন চৈতন্য শাসমল।

‘ও, হ্যাঁ। ওই বালতিরই একদম নীচে, সাবান জলের মধ্যে ব্যাগটা ডোবানো আছে।’

‘বলেন কী!’ শ্যামল মাইতি লাফিয়ে উঠল।

এই ছোট্ট ঘরটার একদিকে ডালিয়ার রান্নার বন্দোবস্ত। পরিপাটি করে সাজানো স্টোভ, ছোটো ছোটো হাঁড়িকুড়ি। প্লাস্টিকের তৈরি লাল- নীল বাটিতে হলুদ, নুন, জিরে, ধনে আর অন্য সব মশলা আলাদা আলাদা করে সাজানো। প্রত্যেকটা বাটির মধ্যে আবার একটা করে আইসক্রিমের চামচ ডোবানো— যাতে হাতে মশলার দাগ না লাগে। সেখান থেকে একটা অ্যালুমিনিয়ামের খুন্তি তুলে নিয়ে শ্যামল বাথরুমে ঢুকল। ফিরে এল খুন্তির ডগায় ভিজে ধসধসে ব্যাগটাকে নিয়ে। মেঝেয় একটা পুরোনো কাগজ পেতে তার ওপরে ব্যাগটাকে খুলবার উদ্যোগ করতেই জয়দেব বসু বলে উঠলেন, ‘আমার ধারণা, ভেতরে দু’-এক প্যাকেট কনডোম পাবেন। অ্যান্টি প্রেগন্যান্সি পিলও পেতে পারেন। মোবাইলটা তো থাকবেই।’

তিনটে জিনিসই পাওয়া গেল।

চৈতন্য শাসমল বললেন, ‘আপনার চোখে কি এক্স-রে আছে নাকি, স্যার? আমিও তো জানতাম না মেয়েটা আসলে কল-গার্ল।’

জয়দেব সরকার বললেন, ‘সেটাই তো বলছিলাম তখন। একেবারে চিপ আউটার ড্রেস, অথচ দামি ইনার গারমেন্টস… তারপর দেখুন না, সস্তার কাঠের তাকের ওপরে দামি ডিয়ো আর হেয়ার রিমুভার। যে মেয়েরা শরীর বিক্রি করে, তাদের কষ্ট করে হলেও এগুলো মেইনটেন করতে হয়, বুঝলেন? আমার নাটকের দলে এরকম একটি মেয়ে আছে, স্ট্রাগলার। বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ওর কাছেই এসব শুনেছি।’

কল্যাণ বোস ব্যাচমেটের চোখে চোখ রেখে যেন বলতে চাইলেন, কী রে? বলেছিলাম না, লোকটার মধ্যে একটা অন্যরকম ব্যাপার আছে? ওদিকে ততক্ষণে ডালিয়ার ব্যাগের মধ্যে ট্রিপ্লিকেট চাবিটাও পাওয়া গেছে। এটার এনামেল চটে গেছে, তার মানে ডালিয়া এটাই ব্যবহার করত।

মোট কথা, তিনটে চাবিই এখন এই ঘরের মধ্যে। অর্থাৎ, ডালিয়া যে অবস্থাতেই ঘর থেকে বেরোক— মৃত, অচৈতন্য অথবা মুখে পট্টি বাঁধা- তার সঙ্গে এমন কেউ ছিল, যে যাওয়ার সময়ে ওর ব্যাগ বালতিতে চুবিয়ে, টিপতালা লাগিয়ে দিয়ে, তবে গেছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। পুলিশকে ধোঁকা খাওয়ানো। পুলিশকে ভাবানো যে, মেয়েটা নিজেই তালা লাগিয়ে বাইরে কোথাও ঘুরতে গেছে। জয়দেববাবু ব্যাপারটা এইভাবে ব্যাখ্যা করে, ওদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ভুল বললাম?’

তিনজনেই তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ালেন।

***

বেলা বাড়ছিল। সঙ্গে বাড়ছিল ঘরের বাইরে উত্তেজিত জনতার চিৎকার এই বস্তির বাসিন্দারা সব ‘দিন আনি দিন খাই’ টাইপের লোকজন। পুলিশ তাদের অনেকক্ষণ নাকাবন্দি করে রেখেছে। আর বেশিক্ষণ আটকানো যাবে না। ইটবৃষ্টি শুরু হল বলে।

ও. সি. শাসমল করুণ গলায় বললেন, ‘জয়দেববাবু, ডালিয়া যে নিজের ইচ্ছেয় ঘর ছাড়েনি তা তো বুঝলাম। তীরথ নিশ্চয়ই কোনওভাবে টের পেয়ে গিয়েছিল যে, ও আমাদের ইনফর্মার এবং তারপর মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যে ওকে এই ঘর থেকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে। জীবিত না মৃত, কোন অবস্থায় নিয়ে গেছে জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে যেটা জানা দরকার, সেটা হল, কোথায় নিয়ে গেছে? ডালিয়া তো এই বস্তি ছাড়তে পারেনি। তা হলে গেল কোথায়? ওকে খুঁজে না পেলে তো কর্ডন তুলতে পারব না।’

সে কথার উত্তর না দিয়ে জয়দেববাবু হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘ওটা কী?’

‘কোনটা?’ ও. সি. শাসমল একটু বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলেন।

‘বেডকাভারের তলায় উঁচু হয়ে রয়েছে ওটা কী? হাতপাখা? আশ্চর্য তো। পাখাটা না সরিয়েই তার ওপরে চাদর পেতে দিয়েছে! কেন? এত তাড়াহুড়ো কীসের?’

জয়দেব সরকার আস্তে করে বেডকাভারের একটা কোনা তুলে ধরলেন। দেখা গেল, উনি ঠিকই বলেছিলেন। বেডশিট আর বেডকাভারের মধ্যে একটা তালপাতার পাখা পড়ে ছিল। কিন্তু তাছাড়াও আরও কিছু ছিল— সাদা বেডশিটের মাঝামাঝি জায়গায় একটা কমলা রঙের ছোপ। বেশি বড়ো নয়, একটা ভাতের থালার মাপের।

জয়দেববাবু কমলা ছোপটার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, ‘জানালাটা কেউ খুলে দিন তো। একটু আলো আসুক। থ্যাংক ইউ।’

তারপর তিনি দাগটার সঙ্গে নিজের নাকটাকে প্রায় ঠেকিয়ে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস টানলেন। যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন তার চোখ- মুখের চেহারা পালটে গিয়েছে। একবার খোলা জানালাটার কাছে দাঁড়িয়ে উকি মেরে বাইরের রাস্তার দিকে তাকালেন। তারপর কল্যাণ বোসের হাতে টান দিয়ে বললেন, ‘জলদি আসুন! আরে, প্রশ্ন-টশ্ন পরে করবেন। সময় নেই… একদম সময় নেই!’

ডালিয়ার ঘরের পাহারায় দু’জন কনস্টেবলকে রেখে, জয়দেববাবুর

পিছন পিছন কল্যাণ বোস, চৈতন্য শাসমল আর শ্যামল মাইতি একরকম দৌড়োতে দৌড়োতেই বাইরে বেরোলেন। কল্যাণবাবু একবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় চললেন, ও জয়দেববাবু?’

‘কাছে… কাছেই। দূরে কেন যাব? ডালিয়া তো এই ঘরে বসেই আপনাকে মেসেজ পাঠিয়েছিল— তীরথ জয়সোয়াল কাছাকাছিই আছে। তাই একদম কাছেই যাচ্ছি। জাস্ট দেওয়ালের ওপাশে।’

বলতে বলতেই ওঁরা ডালিয়ার ঘরের পিঠোপিঠি অন্য একটা ঘরের তালাবদ্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। জয়দেববাবুর মুখ-চোখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে গেছেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘বাবলু মণ্ডল বাইরে দাঁড়িয়ে আছে না? ওকে ডাকুন। জিজ্ঞেস করুন, এ ঘরে কে থাকে।’

তা-ই করা হল।

বাবলু মণ্ডল বলল, লোকটার নাম ধরতী দুসাদ। আইসক্রিম বেচে। ‘তীরথ ওলটালে থরতী, তার থেকে ধরতী। বাহ্ বাহ্!’ বলতে বলতেই জয়দেববাবু রোগা শরীর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দরজার পাল্লার ওপরে।

শ্যামল ছুটে এসে তাকে একদিকে সরিয়ে দিল। বলল, ‘আপনি সরুন, স্যার। লেগে যাবে। আমি খুলে দিচ্ছি।’ তারপর ঠিক দুই-লাথিতে পাল্লাটা ভেঙে নামিয়ে দিল।

জয়দেবাবু দৌড়ে ঢুকে পড়লেন ঘরটার মধ্যে। চৈতন্য শাসমল অন্ধকার ঘরটায় ঢুকেই হাতের জোরালো টর্চটা জ্বালিয়ে ফেলেছিলেন। জয়দেববাবু তাঁর হাত থেকে টর্চটা কেড়ে নিয়ে দেওয়ালের কোণে একটা জায়গায় আলো ফেললেন। সেখানে করাতকলের কাঠের গুঁড়ো দিয়ে ঢাকা ভিজে ভিজে একটা স্তূপ। অল্প অল্প জল গড়িয়ে যাচ্ছে মেঝের ওপর দিয়ে। টর্চের আলোর বিমের সামনে দিয়ে হিমেল বাষ্প উড়ে যাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ চারজনেই একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। চারজনেই জানতেন, কাঠের গুঁড়ো সরালেই দেখতে পাবেন বরফের চাঁই আর তার আড়ালে একটা ছোটোখাটো মেয়ের মৃতদেহ।

খুব আলতো হাতে কাঠের গুঁড়ো সরিয়ে দিল শ্যামল। তারপর কেমন যেন ভ্যাবলামুখে সঙ্গীদের দিকে তাকাল। বরফের ভাঙাচোরা কটা ব্লক রয়েছে ঠিকই। নুনের আধখালি বস্তাও একটা রয়েছে। আর রয়েছে নতুন আইসক্রিমের স্তূপ— চকোবার, করনেটো, কাপ।

সবার চোখ ঘুরে গেল জয়দেব সরকারের দিকে। তিনি হাতের মুঠোয় মাথার চুলগুলো ধরে নিজের মনেই তখন বলছিলেন, ‘কী বোকা! ওহ্, আমি কী বোকা! লোকটা গাড়ি খালি করে বেরিয়েছিল।’

তাঁর খেদোক্তিকে ডুবিয়ে দিয়ে, খুব কাছ থেকে ভেসে এল আইসক্রিমওলার ডাক- ‘আইসক্রি-ই-ই-ম!’

জয়দেববাবু ক্লান্ত ভঙ্গিতে ওই ঘরেরই রোয়াকে বসে পড়লেন। তারপর চৈতন্য শাসমলকে বললেন, ‘আমি ঘরের মধ্যে বরফের চাঁইয়ের কথা ভেবেছিলাম। আইসক্রিমের গাড়িটার কথা ভাবিনি। যান, চলন্ত শবাগারটাকে নিয়ে আসুন। সাবধানে যাবেন। তীরথ কিন্তু পালাবার জন্য একটা মরিয়া চেষ্টা করবে।’

.

পাঁচ

আজাদ বস্তির কর্ডন উঠে গেছে। জয়দেববাবুর হাত ধরে তাকে খুব যত্ন করে নিজের গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন কল্যাণ বোস। ইতোমধ্যেই ওঁর কাছে বেশ কয়েকবার কাবেরীবউদির ফোন এসে গেছে। স্বাভাবিক। দুটো বাজে।

যেতে যেতে কল্যাণবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কমলা দাগটা কীসের ছিল একটু বলবেন?’

জয়দেববাবু বললেন, ‘গলে যাওয়া অরেঞ্জ-আইসক্রিমের। ডালিয়াকে আইসক্রিম দেওয়ার ছল করেই ঘরে ঢুকেছিল তীরথ। মেয়েটা যখন আইসক্রিম চুষছে তখনই পিছন থেকে হয় গলায় ফাঁস পরিয়েছিল আর না হলে ঘাড় মটকে দিয়েছিল।

আমার ধারণা, তীরথের সঙ্গে ডালিয়ার বেশ পুরোনো আশনাই ছিল। লোকটা ডালিয়ার পাশের ঘরে থাকত। খেয়াল করেছেন বোধহয়, ডালিয়াকে মশলা তোলার জন্য নতুন চামচ দিত। মাঝে মাঝেই আইসক্রিমও খাওয়াত নিশ্চয়ই। আর স্মাগলারদের কাছে পয়সা তো হাতের ময়লা। ধরে নিচ্ছি, ওই ব্যাপারেও সে কার্পণ্য করত না। এই সবই করত ডালিয়ার সঙ্গে শোবার জন্য। তীরথ জানত না, ও পুলিশের ইনফর্মার। কাল নিতান্তই কাকতালীয়ভাবে চৈতন্য শাসমলের সঙ্গে ডালিয়ার শেষ কথোপকথনটা ও শুনে ফেলে। শোনাটা এমন কিছু কঠিন নয়। পাতলা ইটের ফাটাফুটা দেওয়াল। ডালিয়া নিজেও তো ওই দেওয়ালে কান পেতেই তীরথের কথাবার্তা শুনত আর আপনাদের খবর দিত।

চৈতন্যবাবুর সঙ্গে ডালিয়ার শেষ কথোপকথন শোনার পরেই তীরথ বুঝতে পারে, এইটুকু সময়ের মধ্যে ও পালাতে পারবে না। পালাতে গেলেই ডালিয়া পুলিশকে অ্যালার্ট করে দেবে। তার বাঁচার একমাত্র উপায় ডালিয়াকে গুমখুন করা। ডালিয়া না থাকলে সে সামনে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাকে চিনতে পারবে না।

খুন করা তো সহজ। কিন্তু এই গরমে লাশ কোথায় গায়েব করবে? পচা গন্ধেই ধরা পড়ে যাবে তো।

ন্যাচারালি ওর মনে পড়ে গেল সেই জায়গাটার কথা, যেখানে ও ব্রাউন সুগারের প্যাকেট লুকিয়ে রাখে। আইসক্রিম ভ্যানের কথাই মনে পড়ল ওর। তারপর তীরথ একটা আইসক্রিম নিয়ে ডালিয়ার দরজায় টোকা মারল- যেন চিরকালের প্রতিবেশী সেই প্রেমিক। ডালিয়া ও নিশ্চয়ই হাসিমুখেই দরজা খুলে দিয়েছিল, যেমন প্রায়ই দিত।

তীরথ ডালিয়াকে খুন করল। ওই অল্প সময়ের মধ্যেই যতটা পারে ঘর পরিষ্কার করে রাখল। পরিষ্কার করতে গিয়ে চোখে পড়ল, ডালিয়ার না খাওয়া আইসক্রিমটা ততক্ষণে অনেকটাই গলে গেছে। দাগ লেগেছে বেডশিটে। তীরথ তাড়াতাড়ি বেডশিটের ওপরে বেড-কাভারটা পেতে দিল; খেয়াল করল না, মাঝখানে পড়ে রইল হাতপাখাটা। আর আইসক্রিমের কাঠিটা ছুড়ে ফেলে দিল জানালার বাইরে। আপনার মনে আছে, আইসক্রিমের দাগটা দেখার পরেই আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম, অত তাড়াহুড়োর মধ্যে তীরথ ওটাকে বাইরেই ছুড়ে ফেলবে।

তারপর আর কী! বলতে ভালো লাগছে না। ছোটোখাটো মেয়েটার শরীরটাকে দুমড়ে ভাঁজ করে আইসক্রিমের গাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটা তীরথ নিশ্চয়ই ঘরের মধ্যে গাড়িটাকে নিয়ে এসেই করেছিল। তারপর টায়ারের দাগ মুছে বাক্সগাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। ও জানত, এক-দুটো দিন যদি পুলিশ কর্ডন করেও থাকে, তার মধ্যে ডালিয়ার শরীরের পচন ধরবে না।’

***

কল্যাণ বোসের গাড়ির দিকে যেতে যেতে জয়দেববাবু দেখলেন একটা কালো ভ্যানের জালের খাঁচার আড়াল থেকে দুটো সাপের চোখ তাঁকে ফলো করছে। চোখদুটো বসানো রয়েছে সেই গোবেচারা আইসক্রিমওলাটার মুখের ফ্রেমে। জয়দেববাবু অবাক হলেন না। তিনি নিজেও মুহূর্তের মধ্যে মুখের চেহারা বদলাতে পারেন। তখন বুকের ভেতরটাকেও বদলে নিতে হয়। কিছু কঠিন কাজ নয়।

কিন্তু একটু দূরে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আইসক্রিমের গাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কল্যাণবাবুকে বললেন, ‘একবার দেখে আসি?’

‘দেখবেন? চলুন

কল্যাণবাবু ওঁকে সঙ্গে নিয়ে আইসক্রিমের গাড়িটার সামনে গিয়ে আস্তে করে ঢাকনাটা তুলে ধরলেন। সঙ্গে সঙ্গেই চড়া রোদের ফোকাস আইস-বক্সের ভেতরে গিয়ে পড়ল। জয়দেববাবু দেখলেন রাশি রাশি সাদা বরফের টুকরো আর পেপসির প্লাস্টিক-পাউচের মধ্যে থেকে একটা ছোট্ট মিষ্টি মুখ তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সেই মুখে পচনের কোনও ছাপ নেই।

জয়দেববাবু ধরাগলায় বললেন, ‘ডালিয়া শীতের ফুল। ঠান্ডায় তাজা থাকে।’

1 Comment

বেশ ভালো লাগল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *