একটি খারাপ মেয়ের মৃত্যু
আমি রাঁচির প্রবাসী বাঙালি। নাম শঙ্খদ্বীপ বসু। ছোটো করে শঙ্খ। আমার দাদু স্বর্গত যোগেশ্বর বসু ছিলেন রাঁচির একনম্বর উকিল। বাবা দেবব্রত বসু ডাক্তার। দু’জনেরই ফাটাফাটি পসার। আমি ওদের অধম উত্তরপুরুষ। ডাক্তার-মোক্তার হওয়ার ইচ্ছে ছিল না কোনওদিন, হই নি। আমার ইচ্ছে নামকরা সাহিত্যিক হব, ইংরিজিতে গল্প-উপন্যাস লিখব… রাসকিন বন্ডের মতন, চেতন ভগতের মতন, অরবিন্দ আদিগার মতন।
আপাতত হাত পাকানোর জন্য পাড়ার দুর্গাপুজোর স্যুভেনিরে ইংরিজিতে গল্প-কবিতা লিখি আর ‘অস্মিতা’ নামে এক হিন্দি পাক্ষিক ফ্যামিলি ম্যাগাজিনে কপিরাইটারের কাজ করি। বুঝতেই পারছেন, সেখানেও রাজনৈতিক প্রবন্ধের চেয়ে ফিচার লেখাতেই আমার ঝোঁক বেশি, যেহেতু তাতে সাহিত্যচর্চা হয়। কর্তৃপক্ষ বলেন, ভালোই হয় লেখাগুলো।
বিয়ে-থা করিনি এখনও। তবে কলেজের এক বান্ধবীর সঙ্গে স্টেডি প্রেম আছে। বিয়ে করলে ওকেই করব।
পৌষ সংক্রান্তির দু’দিন আগে আমাদের কাগজের সাব-এডিটর অরুণ মিশ্র আমাকে চেম্বারে ডেকে বললেন, ‘জহিরাবাদের সংক্রান্তি মেলায় চলে যাও। বিরাট মেলা হয়। সারা বিহার, ইউ পি থেকে গরিব মানুষেরা বিকিকিনি করতে আসে। যতদূর শুনেছি, সেই ব্রিটিশরা আসার আগে মেলার চেহারা যা ছিল এখনও তার থেকে খুব বেশি বদলায়নি। কেন বদলায়নি বুঝতে পারছ তো?’
আমি বললাম, ‘যেহেতু গরিব মানুষরা বদলায়নি।’
‘গুড। একদম ঠিক বলেছ। এখনও ওখানে একটা লোকের হাতেও তুমি ব্যাগ কিংবা স্যুটকেস দেখবে না, পায়ে জুতো দেখবে না। সবাই চটের বস্তায় ছাতু, গুড়, আটা, কম্বল নিয়ে মেলা দেখতে আসে। পায়ে টায়ার-কাটা চটি কিংবা খালি-পা। তুমি এই পরিবর্তনহীনতা নিয়েই লিখবে, ঠিক আছে?’
হাতের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘গুগল বলছে, রাঁচি থেকে ডালটনগঞ্জ যাওয়ার বাসগুলো জহিরাবাদ হয়ে যায়। সময় লাগে ছ’ঘণ্টা। কিন্তু ওটা একটা গ্রাম। হোটেল-টোটেল নেই। থাকব কোথায়?’
অরুণ মিশ্র মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললেন, ‘মেলার এক লাখ লোক থাকার জায়গা পাচ্ছে আর তুমি পাবে না? আজব কথা বলো তো! যাও, যাও। গেলেই একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
কাজেই চলেই এলাম। বাসে অকথ্য ভিড় ছিল। মেলারই প্যাসেঞ্জার সব। ওই অরুণ মিশ্র যেমন বলেছিলেন, মাথায় বস্তা, খালি-পা, মুখে অজস্র দারিদ্র্যরেখা। তবু তাদের চোখগুলো মেলা দেখার আর পুণ্যস্নান করবার আনন্দে জ্বলজ্বল করছে।
পুণ্যস্নানের ব্যাপারটা আগে বলিনি বোধহয়, তা-ই না? তা হলে বলি, শুনুন। জহিরাবাদের পাশ দিয়েই ফল্গু নদী বয়ে চলেছে। সীতামাইয়ার অভিশাপে ফল্গু নদীর জলধারা পাতালে ঢুকে গিয়েছিল সে তো সবাই জানেন। জহিরাবাদই নাকি সেই পাতাল-প্রবেশের জায়গা। ওখানে ফল্গুর বুকে জল রয়েছে। নদীর তীরে পাথরের ওপর সীতামাইয়ার পায়ের ছাপ রয়েছে। তাই ওখানে সংক্রান্তির দিনে লক্ষ লক্ষ মানুষ পুণ্যস্নান করতে আসে। আর যেখানে এত মানুষের জমায়েত সেখানে মেলা তো বসবেই।
সংক্রান্তির আগের দিন বিকেলে বাস থেকে জহিরাবাদ বাসস্টপে নামলাম। আকাশটা ছিল মেঘলা, কুয়াশা ছিল জমাট। সময়টা বিকেল হলেও দৃশ্যমানতা ছিল প্রায় শূন্য। তার মধ্যে দিয়েই কিছুটা দূরে ক্ষীণ আলোর মালা দেখে বুঝলাম, ওদিকেই নদী আর নদীতীরের মেলা। কিন্তু শহরটা কোনদিকে?
মানুষজনকে প্রশ্ন করে জানলাম, শহর হচ্ছে রাস্তার যেদিকে নদী তার অন্যপাশে। আগে শহরেই গেলাম। বিহারের অন্য যে-কোনও দেহাতি শহরের মতনই জহিরাবাদও একটা কুদর্শন, নোংরা শহর। গুগলে যেটা লেখেনি সেটা হল, মেলার সময় শহরের বেশ কিছু মানুষ বাড়িতে বিদেশি লোকদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে দু’পয়সা রোজগার করেন। সেরকমই একজন মানুষ ব্রিজনাথ ঝা। স্থানীয় স্কুলের মাস্টারমশাই। ঝাজি খুশিমনে আমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে।
মূল বাড়ি থেকে একটু আলাদা আমার সেই ঘরটির মাটির মেঝে, খাপরার চাল। মেঝের কোনায় দু’-চারটে গর্ত দেখে মনে হল সাপের গর্ত হলেও হতে পারে। শীতকাল তাদের ঘুমোনোর সময়; তবু ব্রিজনাথবাবুকে বলে একটু কার্বলিক অ্যাসিড ছেটানোর ব্যবস্থা করলাম। তারপর ভাবিজির হাতে বানানো গরম গরম পরাঠা আর আলুচোখা আর অদ্রক-চায়ে খেয়ে ব্রিজনাথবাবুকে বললাম, ‘একটু ঘুরে আসি।’
তিনি বললেন, ‘আজ আর মেলার দিকে গিয়ে কী করবেন? মেলা তো বসবে কাল। আজ বরং একটু আমাদের জহিরাবাদ শহরটাই ঘুরে- ফিরে দেখে আসুন।’
তা-ই গেলাম। ঘড়িতে তখন মাত্র সন্ধে সাতটা অথচ মনে হচ্ছে যেন কত রাত। আর তেমনই ঠান্ডা। নদীর দিক থেকে গলগল করে মেঘের মতন কুয়াশা ঢুকছে শহরে। ক্রমশ ঢেকে ফেলছে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে বাল্ব। এরকম পরিবেশে ঘুরতেও ভালো লাগে না, একটা বিষাদ বুকের মধ্যে চাপ হয়ে বাসা বাঁধে। তাই ঘণ্টাখানেক বাদেই আবার ব্রিজনাথবাবুর বাড়িতে আমার জন্য নির্দিষ্ট ঘরটায় ঢুকে পড়লাম।
পরের দিন মেলায় গেলাম।
মেলার বর্ণনা দেব না, কারণ, সেখানে যে কী কী থাকতে পারে তা আপনারা সকলেই জানেন। সেই ঘোরদোলনা, নাগরদোলা, মরণকূপের খেলা, কথাবলা পুতুল। যথেচ্ছ রঙিন সব মিঠাইয়ের দোকান; কোনও শহুরে, শিক্ষিত লোক মরে গেলেও অমন লাল-নীল মিষ্টি মুখে তুলবে না। ক্যানসারের ভয় নেই! তবে গ্রাম থেকে আসা গরিবগুরবোরা মহা উৎসাহে ওগুলোই কিনে খাচ্ছিল। তাছাড়া ছিল চাকি বেলন, কাটারি- কুডুল, চিনেমাটির কাপ-ডিশ আর বাচ্চাদের সস্তার খেলনার দোকান।
আমি ঘুরে ঘুরে এর-ওর সঙ্গে কথা বলছিলাম। কোথা থেকে এসেছেন ভাই? কী করেন আপনি? কতবছর ধরে আসছেন এই মেলায়?— এরকমই সব প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে যে কথাগুলো বেরিয়ে আসছিল, সেগুলোও সবারই জানা। ওরা সবাই দেহাতি লোক, চাষবাস করে। ওরা কেউ নিজে জমির মালিক নয়। জন খাটে। ওরা সকলেই বিশ্বাস করে, সংক্রান্তির ভোরে ফল্গু নদীতে স্নান করলে ওদের এই দুঃখের জীবনে সুখ ফিরবে। অপুত্রকের পুত্র হবে, নির্ধনের ধন। এ জন্মে না হলেও পরের জন্মে নিশ্চয়ই আরও একটু ভালো কপাল নিয়ে জন্মাবে অন্য কোথাও, অন্য কারুর ঘরে।
সেসব কথার মধ্যে দুঃখ থাকতে পারে কিন্তু আমাদের পত্রিকায় স্টোরি হওয়ার মতন গল্প ছিল না। এদিকে আমার হাতে সময় মাত্র তিনটে দিন। মেলা যদিও থাকবে এক সপ্তাহ, কিন্তু আমাকে অরুণ মিশ্র বলে দিয়েছেন তিনদিনের মধ্যেই লেখা জমা দিতে। না হলে পরের ইস্যুতে সেটা ছাপা যাবে না।
প্রথম রাতেই মূল মেলার থেকে বেশ খানিকটা দূরে নদীর বুকে একটা আলোর মালা দেখে কৌতূহল জেগেছিল। মাটির উঁচু বাঁধ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সেদিকেও চলে গিয়েছিলাম। তখন বাজে রাত ন’টা। খেয়াল করে দেখলাম, আমার সঙ্গে মোটা চাদরে মাথা মুখ জড়িয়ে যারা ওদিকে যাচ্ছে, তারা সকলেই পুরুষমানুষ। তাদের টুকরো-টাকরা কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারলাম, ওই আলোর মালা আসলে জলবেশ্যাদের নৌবহরের আলো।
জন্ম থেকে বিহারে মানুষ হয়েও এই জলবেশ্যাদের ব্যাপারটা জানতাম না। বহু যুগ ধরেই এই দেহোপজীবিনীরা নাকি এইভাবেই ছোটো ছোটো নৌকায় চেপে মেলা থেকে মেলায় ঘুরে বেড়ায়। নৌকার ছইয়ের নীচেই তারা শরীর বিক্রি করে।
আসলে কোনও মেলা-কমিটিই গণিকাদের তাঁবু বসানোর পারমিশন দেয় না। তাই ওরা এই ব্যবস্থা করে নিয়েছে। মেলার জমিতে পা না দিয়েও মেলার খরিদ্দারদের দিব্যি কাছে টেনে নিতে পারছে।
প্রথম রাতে পাড়ে দাঁড়িয়েই নৌকাগুলোকে দেখলাম। মোট আটটা নৌকা পাশাপাশি নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে ছিল। পাটাতনের ওপরে হ্যাজাকবাতি জ্বলছিল। ছইয়ের নীচে সম্ভবত হ্যারিকেন। বাঁধের গা থেকে প্রতিটি নৌকার গলুই অবধি চওড়া কাঠের পাটাতন ফেলা ছিল। সেই পাটাতন পেরিয়েই খদ্দেররা যাতায়াত করছিল।
ডাঙার বেশ্যাপাড়ায় যা যা থাকে এখানেও তার সবই ছিল; তবে নৌকায় নয়, বাঁধের জমিতে। এ যেন এক প্রাকৃতিক শৃঙ্খল। বেশ্যা থাকলেই দেশি মদের দোকান থাকবে। মদ থাকলেই তেলেভাজা থাকবে, রগরগে করে রান্না করা মাংসের ঝোলের ডেকচি নিয়ে বসবে কয়েকজন বিক্রেতা। দালাল থাকবে, মাস্তান থাকবে। এখানেও তারা সকলেই ছিল। দালালরা পাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে লাইন ম্যানেজ করছিল। কখন কোন নৌকার মেয়েটি খালি হচ্ছে সেদিকে খেয়াল রেখে তার কাছে গ্রাহক পাঠিয়ে দিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ দেখার পরে ঠিক করলাম, এখন ব্যাবসার সময়ে ওদের বিরক্ত না করে কাল দুপুরের দিকে আসব। গল্প যদি থাকে তা হলে এখানেই থাকবে— এই পরিবর্তনহীন জলবেশ্যাদের জগতে।
ততক্ষণে রাত দশটা বেজে গেছে। নদীর দিক থেকে নতুন ব্লেডের মতন ধারালো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তার মধ্যেই জলবেশ্যাদের পাড়ায় ভিড়ও কিন্তু বেড়েই চলেছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, কী জোরালো জিনিস এই কামপোকার কামড়! একবার যাকে কামপোকা কামড়ায়, কোথায় যায় তার শীত-গ্রীষ্মের বোধ, কোথায় পালায় তার পাপ-পুণ্যের ধারণা?
এই মকর সংক্রান্তির পুণ্যতিথিতে, যখন লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ সূর্যোদয়ের মুহূর্তে ফল্গুতে ডুব গালবে বলে অপেক্ষা করছে, তখনই এই জ্যাকেটে চাদরে কান মাথা ঢাকা লোকগুলো খোলা বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে অপেক্ষা করছে কখন একবার ওই নৌকায় উঠবার সুযোগ পায়, তার জন্য।
ওখান থেকে আবার মেলায় ফিরেছিলাম। ফেরার পথে একটা অদ্ভূত দৃশ্য দেখলাম। নদীর বাঁধ ছেড়ে যে জায়গাটা দিয়ে মেলায় ঢুকতে হয়, সেই জায়গাটা স্বাভাবিকভাবেই বেশ নির্জন। ওদিকটা তো মেলায় ঢুকবার প্রধান রাস্তা নয়। নদীর দিক থেকে ক’জনই বা আসে? বেশিরভাগ মানুষ তো আসে শহরের দিক থেকে। সেটা একেবারে অন্য একটা প্রান্তে।
পায়ের দিকে দৃষ্টি রেখে সাবধানে হাঁটছিলাম। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছিল। মূল মেলার আলোর রোশনাইয়ের ছিটেফোঁটা ওখানে ও এসে পৌঁছেছিল, সেটুকুই যা ভরসা। হঠাৎ কানে এল চাপা গলার আওয়াজ। আওয়াজটা যেদিক থেকে এল সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম জুয়ার আসর বসেছে— তাসের জুয়া। একটা নয়, বেশ কয়েকটা।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেশ কয়েকটা মানুষের দঙ্গল এবং সবক’টাতেই যে শুধু তাসের জুয়াই খেলা হচ্ছিল, তা নয়। নম্বর লেখা চরকিবাজি, খুঁটি চালা সবই চোখে পড়ছিল। মোটামুটি নিঃশব্দেই খেলে যাচ্ছিল জুয়াড়িরা। আমি পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলাম। ঠিক তখনই একটা অশ্রাব্য গালির আওয়াজে পিছন ফিরে তাকালাম এবং যা দেখলাম তাতে বুকে বেশ ধাক্কা লাগল।
দেখলাম আমার বাড়িওলা ব্রিজনাথ ঝা একটা আসর ছেড়ে তেড়েফুঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। গালাগালগুলো তিনিই করছিলেন। বক্তব্য বুঝতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না; হেরে যাওয়ার পরে সমস্ত জুয়াড়ির যা বক্তব্য থাকে, এঁরও তা-ই— ‘শালারা আমাকে ঠকিয়েছে! জোচ্চুরি করেছে মাদারচোদরা!’
মাস্টারমশাই শুধু যে জুয়াই খেলছেন তা-ই নয়, তিনি মত্ত অবস্থাতেও রয়েছেন। অল্প একটু দেখেই বুঝতে পারলাম তাঁর পা টলছে, ধুতির কোঁচা খুলে এসেছে।
ঘরে ফেরার পর ভাবিজি যখন রসুইঘরের ভেতরে আমাকে যত্ন করে খাওয়াতে বসলেন, তখন মনটা একটু খারাপ না হয়ে পারল না। আড়চোখে ওঁর ঢলঢলে মুখটার দিকে দেখছিলাম আর জুয়ার আসরে মাতাল মাস্টারজির মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ভাবিজির বয়স মাস্টারজির তুলনায় অনেক কম। কত হবে? ত্রিশ-বত্রিশ। সেখানে মাস্টারজির বয়স পঞ্চাশের থেকে একটুও কম নয়।
আড়চোখে তাকালেও মেয়েরা ঠিক বুঝতে পারে। ভাবিজি তাঁর ভারী বুকের ওপরে আঁচলটা টেনে নিয়ে আমাকে বললেন, ‘তোমার শাদি হয়েছে?’
‘উহু।’
ঠিক তার পরেই যে প্রশ্নটা উনি করলেন, সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। উনি বললেন, ‘তিনদিনের জন্য মানুষটা তোমার কাছে কত ভাড়া চেয়েছেন?’
আমি বললাম, ‘থাকা-খাওয়া নিয়ে পনেরোশো টাকা। আমি তো সে টাকা পুরোটাই ওঁর হাতে আগাম দিয়ে দিয়েছি, ভাবিজি।’
উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ও টাকা আর সংসারে ঢুকবে না। কী যে করি! মেয়েটা আমার ডালটনগঞ্জের বড়ো স্কুলে পড়াশোনা করে। ওঁর ইচ্ছে ছিল না, মেয়ের পিছনে অত খরচা করার। আমিই জোর করে পাঠিয়েছিলাম। নিজের গয়না ভাঙিয়ে এই অতিথির ঘর বানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আপনাকে টাকা দিতে হবে না। ঘর ভাড়ার টাকায় মেয়েকে পড়াব।’
***
পরের দিন দুপুরের দিকে মেলায় গেলাম। যে-কোনও মেলার রাতের চেহারা আর দিনের চেহারার মধ্যে বিশাল তফাত থাকে। আমি গিয়ে দেখলাম, বেশিরভাগ স্টলের সামনে দরমার ঝাঁপ টানা। দোকানদাররা দোকানের পিছনদিকে স্টোভ জ্বালিয়ে রান্নাবান্না করছে। নাগরদোলাটাকে এমনভাবে লোহার চেন দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে যে, দেখলে মনে হচ্ছিল এক উন্মাদকে যেন কেউ বেঁধে রেখেছে, না হলে সে তাণ্ডব করবে।
অবশ্য এবেলা মেলা আমার গন্তব্য ছিল না। মেলার পাশ কাটিয়ে নদীর বাঁধ ধরে সেই নৌকাগুলোর কাছেই ফিরে গেলাম। আমার মামার বাড়ি কলকাতার বড়তলা স্ট্রিটে। পাশেই সোনাগাছির বিখ্যাত রেডলাইট এরিয়া। তাই দিনের বেলায় বেশ্যাপাড়ার চেহারা কেমন হয় সেটা আমার অজানা ছিল না। এখানেও দেখি হুবহু সেই একই চেহারা। আটখানা নৌকার গলুইয়ের গায়ে আঁকা ষোলোটা বড়ো বড়ো চোখও যেন ঘুমে জড়িয়ে আসছে, এমনই ক্লান্তির আবহ চারিদিকে।
আমাকে নৌকার দিকে এগোতে দেখে পাহারাদার টাইপের একজন ধমকে উঠল— ‘আব কেয়া মাঙতা? ভাগো হিয়াসে!’
আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘ভাইয়া, ম্যায় পত্রকার হুঁ। মেহেরবানি করকে ইস মহল্লেকে মালিক ইয়া মালকিনসে ইকবার মুলাকাত করা দিজিয়ে।’
‘পত্রকার’ শব্দটা এখনও বিহারের গ্রামেগঞ্জে ভালোই সম্ভ্রম আদায় করে। অসুরের মতো দেখতে লোকটা লুঙ্গির কষি আঁটিতে অটিতে আমাকে নরম গলায় বলল, ‘ইধারহি ঠাহরিয়ে, সাব। দেখতা হুঁ রাকেশজিকা ফুরসত হ্যায় ইয়া নেহি।’
লোকটা কোথায় যেন চলে গেল। মিনিট পাঁচেক বাদে ফিরে এসে বলল, ‘চলিয়ে।’
আটটা ছোটো নৌকা থেকে একটু দূরে একটা বজরা ধরনের বড়ো নৌকা নোঙর করা ছিল। কাল রাতে এই বজরাটাকে খেয়াল করিনি। তার মানে নৌকাগুলোতে আলো জ্বললেও এটায় আলো ছিল না।
এখন দেখলাম, ওটাই এই বেশ্যাপাড়ার অফিস কাম কিচেন কাম অ্যাসোশিয়েসন-রুম কাম দাবাখানা— এককথায় ভাসমান পাড়াটির অব্যাবসায়িক সমস্ত প্রয়োজন মেটানোর জায়গা। যখন আমি পাটাতন বেয়ে বজরার চওড়া ডেকে পা দিলাম, তখনও তিনজন গণিকা আলুথালু পোশাকে, ঘুম ঘুম চোখে ওই ডেকের একধারে বসে নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল আর এ ওর চুলে তেল মাখিয়ে দিচ্ছিল। স্নানের প্রস্তুতি চলছিল, বোঝাই যায়। অন্যদিকে লোয়ার ডেকের রান্নাঘর থেকে ভুরভুর করে ভেসে আসছিল খাঁটি ঘি দিয়ে কষিয়ে কোনও সবজি রান্নার সুবাস।
এইসবের মধ্যে দিয়ে, সারেং-এর কেবিনের পাশ কাটিয়ে, লোকটি আমাকে একটা পর্দা-টানা ঘরের সামনে নিয়ে গেল; তারপর ইশারায় ভেতরে ঢুকতে বলে চলে গেল।
মালকিন নন, মালিক। জলবেশ্যাদের নৌবহরের মালিক রাকেশ মর্দানা ওই ঘরেই একটা চেয়ারে বসেছিলেন। তাঁর বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে হবে। গায়ের রং মিশমিশে কালো, মাথাজোড়া টাক। ঘাড়ে- গর্দানে চেহারা। কথাবার্তাতেও শিক্ষাদীক্ষার পালিশ নেই কিন্তু যথেষ্ট ভদ্রতা আছে। হতে পারে সেটা নকল।
তাছাড়া ওঁদের আদিবাড়ি পুরুলিয়ার বলরামপুরে। দিব্যি বাংলা বলেন। আমার উদ্দেশ্য শুনে ওঁর এই ব্যাবসার ইতিহাস-ভূগোল হাট করে খুলে ধরলেন আমার সামনে। মর্দানারা কত পুরুষ ধরে যে এই ব্যাবসা চালাচ্ছে তা উনিও সঠিক বলতে পারলেন না। তবে সুলতানি আমলেও যে ওঁর পূর্বপুরুষেরা এইভাবেই জলবেশ্যাদের নিয়ে বিহার আর উত্তর প্রদেশের নদীনালায় হাটে-মেলায় ঘুরে বেড়াতেন সেটা নিশ্চিত।
অসংকোচে বললেন, ‘দু’জেনারেশন আগে অবধি ওদের নিজেদের বাড়ির মেয়েরাই দেহব্যাবসা করত। তবে এখন আর সেটা হয় না।’
‘এখন মেয়েগুলোকে পান কোত্থেকে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
উনি হাতজোড় করলেন। বললেন, ‘এইটা, স্যার, ট্রেড সিক্রেট। বলতে পারব না। তবে আমার মেয়েগুলো যে নর্মাল বাজারের মেয়েদের থেকে অন্যরকম সেটা নিশ্চয়ই আপনি লক্ষ করেছেন?’
একটু আগে ডেকের ওপরে যে তিনটে মেয়েকে দেখেছিলাম, তাদের কথা মনে পড়ল। সোনাগাছির মেয়েদের তো ছোটোবেলা থেকেই দেখছি। তাছাড়াও আসা-যাওয়ার পথে সস্তা দামি কত বেশ্যাপাড়ার কত মেয়েকেই রাস্তার ধারে খদ্দের ধরার জন্য অপেক্ষা করতে দেখেছি। ওই তিনটি মেয়েকেও তাদের থেকে কিছুই আলাদা মনে হয়নি। চেহারায় এবং চোখে-মুখে সেই একই রাতজাগা এবং অন্যান্য নানান অত্যাচারের চিহ্ন
তাছাড়া, যে-কোনও দেহোপজীবিনীর চোখেই আমি পৃথিবীর প্রতি একটা স্থায়ী বিদ্রুপের দৃষ্টি দেখেছি— কী জানি সেটা আমার কল্পনা কি না। ওই মেয়ে তিনটেরও চোখে-মুখে এবং শরীরে সেই একই ক্লান্তি এবং ক্ষোভ দেখেছিলাম। আলাদা কিছু মনে হয়নি ওদের।
রাকেশ মর্দানার সঙ্গে ঘণ্টাখানেক কথা বললাম। বেশ পরিষ্কার প্লেটে করে ডিমের ওমলেট আর চিনেমাটির দামি কাপে চা দিয়ে গেল একটি কমবয়সি ছেলে। সেগুলোর সদ্বব্যবহার করতে আমার একটুও বাধল না। সংস্কার জিনিসটা আমার বরাবরই কম। খাওয়াদাওয়ার সময় স্বাদ আর পরিচ্ছন্নতা ছাড়া অন্য কিছু খুঁজি না। তা দেখে রাকেশ মর্দানা নিশ্চয়ই প্রীত হয়েছিলেন। তাই তাঁকে যখন অনুরোধ করলাম, একবার যে-কোনও একটি মেয়ের সঙ্গে আমার কথা বলিয়ে দিতে, তখন তিনি একটু ভেবে রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, ‘চলুন। মঙ্গলার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি। তবে নতুন কী আর শুনবেন? এদের সবার গল্পই তো এক। সেই দারিদ্র্যের জ্বালায় মেয়ে বিক্রি করার গল্প!’
‘একটা জিনিস আপনাকে জোর দিয়ে বলতে পারি, পত্রকার সাব আমার কাছে ওরা যেরকম আদর-যত্ন পায়, এরকমটা কোনও কোঠিবালি মৌসির কাছে পেত না।’
বজরা থেকে বেরিয়ে আমরা দু’জনে নদীর পাড়ে পা দিলাম। সেখান থেকে এক-দুই-তিন করে তিনটে নৌকা পেরিয়ে চতুর্থ নৌকাটায় উঠলাম। দু’জন লোক নৌকার মুখটা আটকে বসেছিল। তারা মর্দানাকে দেখে সসম্ভ্রমে সেলাম করে উঠে দাঁড়াল। মর্দানা জিজ্ঞেস করলেন, ‘মঙ্গলা কোথায়?’
ওদের মধ্যে একজন বলল, ‘এখনও তো ঘরের দরজা বন্ধ। ঘুমোচ্ছে বোধহয়।’
‘এক-একটা নৌকায় দু’জন করে মেয়ের ঘর আছে, বুঝলেন?’ বললেন রাকেশ মর্দানা। মানে, মোট ষোলোটা মেয়ে। তাদের মধ্যে মঙ্গলাই সবচেয়ে পুরোনো। তাছাড়া ও এই লাইনে আসার আগে ক্লাস নাইন অবধি লেখাপড়া করেছিল। তাই ওর কাছেই আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।’ এই বলে ছইয়ের নীচে ঢুকে উনি নৌকার পিছনদিকে এগিয়ে গেলেন। পিছু পিছু আমি। একটা খুব নিচু কাঠের দরজায় টোকা মেরে উনি ডাকলেন, ‘মঙ্গলা, এই মঙ্গলা। দরজা খোল। একজন শরিফ আদমি তোর সঙ্গে কথা বলবেন। মঙ্গলা!’
দরজায় নক করে কিছুক্ষণ উনি অপেক্ষা করলেন। তারপর আবার নক করলেন। এবার বেশ জোরে। কেউ দরজা খুলল না। তখন উনি একটা পাল্লায় হাত রেখে চাপ দিলেন। দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল।
মর্দানাজী অবাক হয়ে বললেন, ‘এ কী! দরজা খোলা, তবু মেয়েটা সাড়া দিচ্ছে না কেন? শরীর খারাপ নাকি? একটু দাঁড়ান, সাহেব। আমি আগে দেখে আসি।’
উনি ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন। বাইরে দাঁড়িয়েই বুঝতে পারলাম, উনি ঘরের দেওয়ালে ছোটো জানালাটা খুলে দিলেন। আলো ঢুকল অন্ধকার ঘরটায়। পরক্ষণেই আর্তস্বরে উনি চিৎকার করে উঠলেন—
‘হায় ভগবান! সর্বনাশ হয়ে গেছে! এই জামাল, এই ছোটেলাল! জলদি এদিকে আয়। দেখ কী অবস্থা।’
জামাল বা ছোটেলাল আসার আগে আমিই ঢুকে পড়লাম। এবং যে-দৃশ্য দেখলাম তাতে মাথাটা ঘুরে গেল। দেখলাম, ঘরের একপাশে একটা ছোটো চৌকির ওপরে এক নারীদেহ পড়ে আছে। তার মুন্ডুটা নেই। ঘাড়ের ওপরে যেখানে মাথাটা থাকার কথা ছিল সেখানে থকথকে হয়ে জমে আছে কালচে রক্তের সর। মাছি উড়ছে।
আমার মুখ দিয়ে একটাই কথা বেরিয়ে এল।
‘কে এরকম করল?’
মর্দানা বললেন, ‘কাল রাতে শেষ যে খদ্দের ঘরে ঢুকেছিল, সে-ই নিশ্চয়ই। কিন্তু সে কে জানব কেমন করে? আমাদের নৌকায় তো আর সিসিটিভি থাকে না।’
‘কিন্তু খুন করল কেন? তাছাড়া মাথাটাই বা কোথায়?’
‘কেমন করে জানব বলুন! কতরকমের পারভারসন থাকে মানুষের। বন্ধ ঘরের মধ্যে বেচারি মেয়েগুলোকে কত রকমের অত্যাচার সহ্য করতে হয়। মঙ্গলা নিশ্চয়ই সেরকমই কোনও জানোয়ারের খোওয়াইশ মেটাতে রাজি হয়নি। তাই ওকে খুন করে পালিয়েছে সেই হারামি। এই জামাল, ছোটেলাল, তোরা একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়া তো।’
শেষ কথাটা উনি বললেন নৌকার দুই পাহারাদারকে। ওরা ঘর থেকে বেরোনো মাত্রই রাকেশ মর্দানা একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। ট্রাউজারের পকেটে হাত ভরে দু’মুঠো ক্যাশ টাকা বার করে এনে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘পত্রকার সাব, আপনাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি, যা দেখলেন তা কাউকে বলবেন না। তা হলে আমি বরবাদ হয়ে যাব। শুধু আমি বা আমার ফ্যামিলি বরবাদ হয়ে যাব তা-ই নয়, এই বাকি পনেরোটা মেয়ে আর ওদের ফ্যামিলিও বরবাদ হয়ে যাবে।’
আমি টাকাগুলো আবার ওঁর পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তার মানে! পুলিশে জানাবেন না?’
‘পাগল হয়েছেন নাকি? বিনা লাইসেন্সের ব্যাবসা আমার। পনেরোটা মেয়ের মধ্যে ছ’টা মেয়ের বয়স আঠারো পেরোয়নি।’
‘আর বডিটা?’
সৎকার করে দেব। মা কালীর দিব্যি যথাযোগ্য সৎকার করে দেব। মঙ্গলার তো আর পরিবার বলে কিছু ছিল না। আমরাই ছিলাম ওর বাপ- দাদা-বোন। আমরাই করব যা করার।
মাথা ছাড়া সৎকার? মাথাটা খুঁজবেন না?’
রাকেশ মর্দানা হতভম্বভাবে এদিক-ওদিক তাকালেন। আমার এই প্রশ্নের কোনও উত্তর ছিল না ওঁর কাছে। বিড়বিড় করে বললেন, ‘সে এতক্ষণে স্রোতের টানে কোথায় চলে গেছে কেমন করে বলব? কাছিমে খেয়েও নিতে পারে। যা-ই হোক, আপনি এই টাকাটা নেবেন না?’
আমি বললাম, ‘না। পুলিশে খবর দেব। আমি যাচ্ছি।’
রাকেশ মর্দানার সুভদ্র মুখটা এক লহমায় কেমন যেন বদলে গেল। একটা কাঁচা খিস্তি দিয়ে বললেন, ‘যা বে, যা! তোর কোন পুলিশ বাপ আছে গিয়ে বলে আয় তাকে! এই ছোটেলাল! শুয়ারটাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নাবিয়ে দে।’
ঘাড়ধাক্কা দিতে হল না। আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজেই নেমে গেলাম। তারপর ওই ভিড়ের বাজারে কোনওরকমে একটা অটোরিকশাকে ছকিলোমিটার দূরের শাহিসরাই থানায় যেতে রাজি করালাম। মেলামুখী জনতার ভিড়কে উলটো দিক থেকে কাটিয়ে সেই অটো থানায় পৌঁছোতে ঠিক আড়াই ঘণ্টা সময় নিল। থানার বড়োবাবু বিনোদ সিং আমার মুখে খুনের কথা শুনে নির্বিকার মুখে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে বললেন, ‘কওনসা রেন্ডিখানা?’
আমি বললাম, ‘ওই যে ফল্গুর বাঁধে নৌকার ওপরে…’
‘অ্যায়সা কুছ নেহি হ্যায় উধার।’
অফিসারের কথা শুনে ঝাড়া আধমিনিট ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, ‘আমি এখন ওখান থেকেই আসছি। আমি একজন পত্রকার, এই দেখুন আমার আইডেন্টিটি কার্ড।
আড়চোখে কার্ডটার দিকে তাকিয়ে বড়োবাবু বললেন, ‘আপ দারু পিয়ে হ্যায় অওর দুসরা কোই রেন্ডিখানাসে মস্তি বানাকে আয়ে হ্যায়। রিভারবেডমে কোই রেন্ডিখানা না তো থা অওর না হ্যায়।’
মাথার মধ্যে তখনও মুণ্ডহীন মেয়েটার লাশ ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই গোঁয়ারের মতন বললাম, ‘আপনি চলুন আমার সঙ্গে। দেখিয়ে দিচ্ছি ওরা আছে কি নেই। লাশটাও দেখিয়ে দেব।’
এবার উনি হাসলেন। কুমিরের মতন দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘শুনিয়ে, সাব। টৌন জহিরাবাদ মেরা থানেকা ইলাকা হ্যায়। এক মচ্ছর ভি মরেগা না উধার, উসি ওয়াক্ত ইধার খবর হো যায়েগা। আমাকে গিয়ে দেখতে হবে না। আপনি নিজে গিয়ে দেখুন।’
শেষ কথাটা শুনে মনের মধ্যে একটা সন্দেহ দানা পাকিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি থানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার সেই অটোটায় উঠে বাঁধের সেই জায়গাটায় ফিরে গেলাম। দেখলাম, ভাসমান বেশ্যাপল্লির কোনও চিহ্নই নেই কোথাও। না সেই আটটা ছোটো নৌকা, না সেই বজরা। তবে তারা যে কিছুক্ষণ আগেও ছিল, তার সাক্ষী হিসেবে জলের ওপরে অন্যান্য ময়লার সঙ্গে ক’টা বাসি বেলফুলের মালা ভাসছিল।
ওখানে দাঁড়িয়েই সাব এডিটর অরুণ শর্মাকে ফোনে ধরবার অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই লাইন পেলাম না। এদিককার টাওয়ারের হাল খুব খারাপ।
রাকেশ মর্দানা যে পুলিশকে টাকা খাইয়েছে, সেই ব্যাপারে তো কোনও সন্দেহই নেই। ভালো পরিমাণ টাকাই গুঁজে দিয়ে এসেছে ওই ওসির হাতে। তার জন্য যে ওকে জহিরাবাদে বসে থাকতে হবে তা-ও নয়। ও নৌকার বহর নিয়ে চলে গেছে; ওর কোনও বিশ্বস্ত লোক থানায় গিয়ে কাজ সেরেছে।
মঙ্গলার মৃতদেহের কী গতি হবে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল না। এখানে নদীর বুকে অজস্র চর। জনহীন, ধু ধু বালিয়াড়ি। তারই মধ্যে কোথাও ওরা লাশটাকে পুঁতে দেবে। এতক্ষণে দিয়েছেও হয়তো।
কিন্তু মুন্ডুটার কী হল? সেটা তো নৌকায় ছিল না।
ফল্গুর জলের দিকে তাকালাম। যেখানে আজ দুপুরে মঙ্গলার নৌকাটা দাঁড়িয়েছিল, দেখলাম কখন যেন সেখানে একটা ছোটো ঘূর্ণি তৈরি হয়েছে। সন্ধে হয়ে আসছিল। সূর্যাস্তের আলো পড়ে জলের রংটাকে লাগছিল কাঁচা মাংসের মতন। তারই মধ্যে ওই ঘূর্ণি। এমনিই অন্যমনস্কভাবে ওটার দিকে তাকিয়েছিলাম। দেখছিলাম, দু’-একটা বাসি ফুলের মালা, প্লাস্টিকের প্যাকেট, পোড়া কাঠের টুকরো— এইসব ঘূর্ণির কিনারা বরাবর বাঁই বাঁই করে পাক খাচ্ছে।
হঠাৎই ঘূর্ণির মাঝখানে একটা মাথা ভেসে উঠল। একটা মেয়ের মাথা। চোখ দুটো আধবোজা। জিভটা ঠোঁটের বাইরে প্রায় আধখানা বেরিয়ে রয়েছে। ফুলে নীল হয়ে ওঠা একটা জিভ। মুখের চামড়া কাগজের মতন সাদা।
পাগলের মতন এদিক-ওদিক চাইলাম। দেখলাম তিন-চারটে ছেলে মেলার দিক থেকে হেঁটে আসছে। আমি ওদের দিকে হাত তুলে পাগলের মতন চিৎকার করতে শুরু করলাম, ‘শিগগির এসো। দেখো, যে মেয়েটা খুন হয়েছিল তার মুন্ডুটা ভেসে উঠেছে।’
আমার চিৎকার শুনে আর উত্তেজিত ভঙ্গি দেখে ওরা ছুটে এল।
‘কী হয়েছে দাদা?’ জিজ্ঞেস করল ওরা।
বললাম, ‘মাথাটা… মঙ্গলা বলে ওই প্রসের মাথাটা ভেসে উঠেছে। ওটাকে যদি তুলে আনা যায়… আমি যাচ্ছি… তোমরা একটু আমার হাতটা ধরো।’
প্যান্টটা হাঁটুর ওপরে গুটিয়ে জলে নামবার জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা হাত তো ধরলই না, বরং অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদের সেই অদ্ভুত চাহনি দেখে আবার নদীর দিকে তাকালাম। কোথাও ঘূর্ণি নেই। কোথাও কোনও কাটা মুণ্ডু জলের ওপর পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে না। ফল্গুর শান্ত জলের ধারা পশ্চিম থেকে পুবে বয়ে যাচ্ছে।
ঠিকই তো। মানুষের মাথার ওজন মারাত্মক। ওই ভারী মাথার জন্যই মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতন নিজে থেকে জলে ভাসতে পারে না, তাকে হাত-পা ছুড়ে সাঁতার কাটতে হয়। একটা অত ভারী মাথা তো কিছুতেই জলে ভাসতে পারে না। ভাবতে ভাবতে আমার নিজের মাথাটাই ঘুরতে শুরু করেছিল।
ভুল দেখলাম? এতটা ভুল?
কিন্তু তা কেমন করে হয়? আমি যে এখনও অনায়াসেই ওই মাথাটার সমস্ত ফিচার মনে করতে পারছি। কুরূপা একটি মেয়ের মাথা। চুল উঠে গিয়ে চওড়া হয়ে-যাওয়া কপাল। সেই কপালের মাঝ বরাবর গুটিবসন্তের তিনটে পুরোনো ক্ষত ‘অতএব’ চিহ্নের মতন একটু ওপর- নীচে করে সাজানো। কপালের নীচে বসে-যাওয়া গাল, উঁচু গালের হাড়, থ্যাবড়া নাক। আধবোজা চোখদুটো মৃত হলেও, সেই চোখে আমি বেশ্যাদের বিদ্রূপদৃষ্টি দেখেছিলাম।
***
মন থেকে ওই অলীক দৃশ্যটাকে মুছে ফেলার চেষ্টায় আমি আবার মেলার মাঠেই ঢুকে পড়লাম। আজ মেলা একেবারে জমজমাট, কারণ, ভোরবেলাতেই দেহাতি মানুষজনের পুণ্যস্নান সারা হয়ে গেছে। অবশ্য এখনও কয়েকদিন ধরে স্নান চলবে, তবে আসলটা ছিল আজ সকালেই। এবার সবার ঘরে ফেরার পালা। তার আগে যতটা সম্ভব মেলার মজা লুটে নেওয়া, নানারকমের শো দেখা, শহুরে সুখাদ্য যথা মোগলাই, চাউমিন, রোল, তবক দেওয়া পান, সিদ্ধির মিঠাই আর সিরাপের সরবত এইসব খাওয়া। তাতেই মেলা জমজমাট।
অস্বীকার করব না, ঘণ্টাখানেক ওই মেলার ভিড়ের মধ্যে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করতে করতেই আমার মাথাটা অনেক হালকা হয়ে এল। মনে হল, সারাদিন ধরে পুলিশের পিছনে যে দৌড়াদৌড়িটা করেছি সেটা বেকার। হঠকারিতা। মঙ্গলা নামে এক গাঁ-গোত্রহীন গণিকার মৃত্যু নিয়ে আমি কেন ভেবে মরছিলাম? আমার সঙ্গে তার তো কোনও সম্পর্ক ছিল না। আমার কি এই হতভাগাদের দেশে ছোটোলোকদের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করা মানায়? আমার কি সেই স্ট্যাটাস?
বরং চেষ্টা করা যাক আরও কিছু লিখবার মতন ম্যাটার জোগাড় করতে পারি কি না।
এই ভেবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম।
সব দেখে-টেখে মনে হচ্ছিল, সাব-এডিটর অরুণ শৰ্মা যতটা কনফিডেন্স নিয়ে বলেছিলেন যে, কিছুই বদলায়নি, বাস্তব কিন্তু ঠিক তেমনটা নয়। মেলার বড়ো বড়ো শোগুলোর গায়ে দিব্যি রাইস-লাইটের মালা, লেজার-বিমের খেলা। হাত দিয়ে ঘোরানো নাগরদোলার পাশাপাশি দু’খানা ইলেকট্রিক নাগরদোলা রয়েছে। তাছাড়া আরও চোদ্দোরকমের রাইড, টয়ট্রেন— মোট কথা, রাঁচি কিংবা পাটনার অনেক প্রমোদ উপকরণই এই গ্রামীণ মেলাতেও ঢুকে পড়েছে দেখছি।
কিন্তু এসব দিয়ে তো আমার কাজ হবে না। আমার তো চাই প্রাচীনতা। আচ্ছা, আজকাল মেলায় সাপুড়ে আসে না? মহুয়া কিংবা হাড়িয়ার পাত্র নিয়ে আদিবাসী মেয়েরা বসে না মেলার একদিকে? পুতুলনাচ হয় না?
না, ওসব কিছুই খুঁজে পেলাম না। তবে তার বদলে যা পেলাম, সেটাও মন্দ নয়। মেলার এককোণে একটা শো-এর তাঁবু আর তার সামনের রঙিন ফেস্টুনটাই এক মুহূর্তে আমার ছোটোবেলার স্মৃতি ফিরিয়ে আনল।
ছেঁড়া তাবু, রং জ্বলে যাওয়া ফেস্টুন, তোবড়ানো চোঙাওলা মাইক্রোফোন— তবু ওগুলো আমার খুব চেনা। ছোটোবেলায় রাঁচিই হোক কিংবা কলকাতায় মামার বাড়ির পাড়ায়, ওই শো আমি অনেকবার দেখেছি। ফেস্টুনের ওপরে হিন্দিতে যা লেখা তার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘আতঙ্কের দুনিয়া’। নীচে ইংরিজিতে আবার ‘হরর ওয়ার্ল্ড’ কথাদুটোও লেখা আছে। যদিও ঝাড়খন্ড-বিহারের যে অঞ্চলে ওরা ঘুরে বেড়ায় সেখানকার ক’টা লোক ইংরিজি পড়তে পারে সন্দেহ। তবু ইংরিজি লিখলে শো-এর ইজ্জত বাড়ে, তাই লেখা। সে যা-ই হোক, ওই আতঙ্কের দুনিয়ার মালিক আর মালকিন হল বুধন আর মুস্কানি।
ওদের শো-এর ব্যাপারটা একটু বলে নিই আগে। তারপর মালিক- মালকিনের সঙ্গে কী করে আলাপ হল বলছি।
ছোটোবেলায় মেলায় ঘুরতে গিয়ে নিশ্চয়ই এরকম ঢপের হরর শো আপনারাও দেখেছেন। ওগুলো আসলে বড়োদের দেখার যোগ্যই নয়। একদম এন্ডিগেন্ডি নাকে-সিকনি বাচ্চারাই শুধু ওরকম হরর শো দেখে ইমপ্রেস্ড হতে পারে। বুধন আর মুস্কানির তাঁবুর ভেতরে ঢুকতে গেলে প্রথমে আপনাকে দশ টাকার টিকিট কাটতে হবে।
তাঁবুর দরজায় বসে টিকিট বিক্রির কাজটা মুস্কানিই করে থাকে। ‘মুস্কানি’ নামটা একটু অদ্ভুত না? কী অর্থ ওর কে জানে! হিন্দিতে ‘মুস্কুরাহট’ মানে তো হাসি। তা হলে মুস্কানি মানে কি হাস্যময়ী? যদি তা-ই হয় তা হলে বলতেই হবে মুস্কানি এক সার্থকনাম্নী রমণী। সে একাধারে হাস্যময়ী এবং লাস্যময়ী।
মাটি থেকে ফুট চারেক উঁচু একটা তক্তার মাচায় বসে সে টিকিট বিক্রি করে। তার গমের মতো গায়ের রং, একটু খয়েরি চোখের মণি, ঠোঁট আর নাক দুটোই এত পাতলা যেন জোরে হাওয়া বইলে কাঁপে।
তার আয়না বসানো ঘাঘরার ওপরে উপচে ওঠে তুঙ্গ দুই স্তন, নীচে গড়িয়ে যায় মসৃণ চিকন ঊরু। নিটোল দুই হাতে লাল কাচের চুড়ির গোছা … দেখলে মনে হয় চুড়ি নয়, রক্তবাহী ধমনি… ভেতরে রক্ত টলটল করছে।
বাচ্চাদের কথা বলতে পারব না, তবে বয়স্ক পুরুষেরা যে স্রেফ মুস্কানির রূপ দেখার জন্যই টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল, তাতে আমার সন্দেহ ছিল না।
টিকিট কাটার পরে লোকজনকে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে একটা ছাগলের খোঁয়াড়ের মতন জায়গায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। রহস্য ঘনীভূত করার জন্যই বোধহয় এককালে বেশ কিছু নরকের দৃশ্য আঁকা থিয়েটারের স্ক্রিন দিয়ে জায়গাটাকে ঘেরার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দু’- চারটে বড়ো বড়ো দাঁতগুলা মুণ্ডু আর কাঁটাগুলা মুগুর বাদে বাকি সব ছবি-টবি এখন আবছা হয়ে গেছে। তবে নরকের ছবি না থাকলেও ধুলোর গন্ধে, গ্রামীণ দর্শকদের ঘামের গন্ধে আর অন্তত বিশ বছর না- কাচা পর্দার গন্ধে জায়গাটা চমৎকারভাবে নারকীয় হয়ে থাকে।
দশ-বারোজন দর্শক এককাট্টা হলে, তাঁবুর ভেতর থেকে যে সিড়িঙ্গেমতন লোকটা বেরিয়ে এসে আপনাদের ভেতরে নিয়ে যাবে, সে-ই হল এই শো-এর মালিক।
সেদিন আমি যখন ওখানে পৌঁছেছিলাম, তখনও ভালো করে সন্ধে নামেনি। তাঁবুর সামনের চটের পর্দাটা সরিয়ে ভেতরে উঁকি মেরে দেখলাম একটা ক্ষয়াখÍটে লোক খালি গায়ে হাফ লুঙ্গি পরে তাঁবুর ভেতরের মেঝেটা ঝটি দিচ্ছে। আমাকে দেখে বিরক্ত মুখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী চাই?’ পরে জানলাম, তার নাম বুধন।
বললাম, একটা ইন্টারভিউ চাই। পাত্তাই দিল না। বলল, ‘না না। ওসব হবে না। ব্যস্ত আছি।’ পার্স খুলে একটা দুশো টাকার নোট হাতে গুঁজে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে লোকটার হাবভাব বদলে গেল। লুঙ্গিটা পা অবধি নামিয়ে নিল। কোথা থেকে যেন একটা কোঁচকানো মোচকানো শার্টও গলিয়ে নিল গায়ে। বলল, ‘আসুন, বাবু। ভেতরে আসুন।’
তাঁবুটা চওড়ায় ছোটো হলেও লম্বায় অনেকখানি। নানান পর্দা-ঢাকা ঘরের পাশ কাটিয়ে একদম পিছনদিকে যেখানে আমাকে নিয়ে গেল, বুঝলাম সেটাই ওদের লিভিং-কোয়ার্টার। থাকার জায়গা। ওখানেই আলাপ হল মুস্কানির সঙ্গে।
মুস্কানি ছিল, আর ছিল বারো-তেরো বছরের দুটো ছেলেমেয়ে দুটোই রোগা টিংটিঙে। ওরা কিন্তু মুস্কানি আর বুধনের নিজের ছেলেমেয়ে নয়। ওরা এই শো’র ভাড়াটে খেলোয়াড়।
কী খেলা দেখায় ওরা?
বুধন আমার হাতে একটা পুরোনো হ্যান্ডবিল ধরিয়ে দিল। পাতলা সবুজ কাগজের ওপরে সেইসব ছবি আর লেখাগুলোই ছাপা আছে যেগুলো বাইরে ফেস্টুনের ওপরেও আঁকা ছিল। হ্যান্ডবিলের ওপরে আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে বুধন আমাকে বোঝাল, ‘এই দেখুন, স্যার, এই হচ্ছে বিজলি- কুমারী। এর হাতে-পায়ে নাকে-কানে যেখানেই আপনি বিজলির বাল্ব ছোঁয়াবেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই বাবে আলো জ্বলে উঠবে। মতলব, এর সারা শরীরেই বিজলির লহর খেলা করে।’
তারপর চোখের ইশারায় সেই বাচ্চামেয়েটার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ও-ই হচ্ছে বিজলি-কুমারী।’
এর মধ্যেই ঘরের কোণে স্টোভ জ্বালিয়ে মুস্কানি আমার জন্য চা বানিয়ে ফেলেছিল। একটা চটা-ওঠা কাপে করে সেই তীব্র মিষ্টি চা হাতে ধরিয়েই দিয়ে গিয়েছিল। বুধনের কথা শুনে গলায় চা আটকে বিষম খেলাম। মেয়েটির সারা শরীরে বিজলির লহর নিশ্চয়ই খেলে। না হলে দশ টাকার টিকিট কিনে যারা তাঁবুতে ঢুকছে, সেই গাঁওয়ার লোকেরা বুধনের লাশ ফেলে দিত।
কীভাবে লুকোনো ইলেকট্রিকের জীবন্ত তার গায়ে জড়িয়ে ওই বাচ্চা মেয়ে সেই দুরূহ রোশে অভিনয় করে সে কথা ভাবতে গেলেও আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। তবে আপাতত মেয়েটা পৃথিবীর যে-কোনও বাচ্চা মেয়ের মতোই একটা ছোটো পারা-চটা আয়না সামনে ধরে, মুখে সপ্তার পাউডার ঘষে যাচ্ছে তো ঘষেই যাচ্ছে। ঠোঁটে ইতোমধ্যেই দগদগে লাল লিপস্টিক মেখে নিয়েছে আর চোখে মোটা করে কাজল।
আমার দিকে পিছন ফিরে বসে আছে বলে আমি আয়নায় মেয়েটার লাল-সাদা মুখের কিছুটা অংশ দেখতে পাচ্ছি আর দেখতে পাচ্ছি ওর টিপকল-ছেঁড়া ফ্রকের বাইরে বেরিয়ে থাকা শিরদাঁড়া— পিঠের খসখসে চামড়ার মাঝখানে বাঁদরলাঠি ফলের মতন গিঁট গিঁট হয়ে জেগে রয়েছে যে ভুখা হাড়ের মালা।
‘এদিকে দেখুন, বাবু।’ বুধনের ডাকে সংবিৎ ফিরে পেলাম। ও হ্যান্ডবিলে পরের ছবিটার ওপরে আঙুল রেখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ছবিটার দিকে তাকাতেই বলল, ‘এই হচ্ছে নরকের পাহারাদার। শরীরে হাড় নেই। প্রত্যেকটা জয়েন্ট উলটোদিকে বাঁকাতে পারে। শোঁ-এর মধ্যে ছোটু ওইভাবেই শরীরটাকে দুমড়ে-মুচড়ে বসে থাকে। এই ছোটু, সাহেবকে একবার দেখিয়ে দে তো তোর কারিশ্মা।’
বলতেই সেই হাফপ্যান্ট পরা বালকটি পা-দুটোকে পিঠের পিছনে নিয়ে গিয়ে, হাত দিয়ে ঘাড়ের পিছনে সেগুলোকে টেনে ধরে, তার মধ্যে দিয়ে মুন্ডুটাকে গলিয়ে একটা পিন্ডি পাকিয়ে ফেলল। আমি দ্বিতীয়বার শিহরিত হলাম। বললাম, ‘থাক, থাক। আর দেখাতে হবে না।’ শোনামাত্রই ছোটুও বিজলি-কুমারীর হাত থেকে আয়নাটা কেড়ে নিয়ে নিজের মুখটাকে সিঁদুর, কাজল এইসব দিয়ে যথাসম্ভব নরকের প্রহরী বানিয়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বুধন বলল, ‘আর লাস্ট আইটেম, স্যার, ‘কাটা মুন্ডু কথা বলে’। এই যে ছবিটা দেখুন। একদম এই ছবির মতন স্যার। টেবিলের নীচে কিন্তু নেই। চারপাশেও কিছু নেই। শুধু টেবিলের ওপরে রক্তমাখা তুলোর বান্ডিলের ওপরে কাটা মাথাটা বসানো রয়েছে। আপনি যা ইচ্ছে সওয়াল করুন। কাটা মুণ্ডু আপনার কথার জবাব দেবে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাটা মুণ্ডু কে সাজে?’
বুধন হেঁ হেঁ করে হাসল। বলল, ‘সাজে’ বলছেন, স্যার! কেন? আপনার কি অলৌকিকে বিশ্বাস নেই?
বললাম, ‘বুধন, অলৌকিকে বিশ্বাস থাকলেও তোমার এই শো-এর মধ্যে যে অলৌকিক কিছু নেই সেটা আমি জানি। যে টেবিলের ওপরে তোমার ওই কাটা মুণ্ডুটা থাকে সেটা পুরো টেবিল নয়। আধখানা টেবিল আর আধখানা পার্টিশন। পার্টিশনের পিছনে লুকিয়ে থাকে বাকি শরীর। আয়নার রিফ্লেকশনে মনে হয় যেন পুরো টেবিলটাই দেখতে পাচ্ছি। বড়ো বড়ো শহরে সায়েন্স মিউজিয়মে আজকাল এসব খেলা দেখানো হয়। পিছনের বুজরুকিটাও বুঝিয়ে বলে দেওয়া হয়।’
বুধনের মুখটা ম্লান হয়ে গেল। বলল, ‘আমাদের আর বাঁচতে দেবে না বাবু। বুজরুকির ভরসায় এই গরিব দেশের কত মানুষের পেট চলে সেটা কি সাইন্স মুজিয়ামের সাহেবরা জানেন? ‘
আমি বললাম, ‘যাক গে। তোমার মেলার দর্শকরা তো আর শহরের লোক নয়। তারা কাটা মুণ্ডুকে কাটা মুন্ডুই দেখবে। কে সাজে কাটা মুন্ডু?’
ওদিক থেকে মুস্কানি একগাল হেসে উত্তর দিল, ‘সাজব কেন, বাবু? ঘাড়ের ওপর থেকে মাথাটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে রাখি। এই দেখুন… দেখুন এইদিকে।’
তাকিয়ে দেখি মুস্কানি অসম্ভব ইঙ্গিতপূর্ণ একটা হাসি হেসে, ঘাড়টা একদিকে অল্প বাঁকিয়ে, আমাকে কী যেন দেখাচ্ছে। ও কী দেখাতে চাইছিল জানি না। আমি দেখলাম ওর আঁচলের বাইরে বেরিয়ে থাকা আয়না- বসানো ব্লাউজের আড়ালে সোনার বাটির মতন দুই স্তন। ওর নেমে-যাওয়া শাড়ির কষির ওপরে মাখনের মতন কোমরের ভাঁজ। জোড়া ডলফিনের মতন ভারী দুই ঊরু। মুস্কানির যৌন আবেদন অসম্ভব তীব্র। অস্বীকার করে লাভ নেই, সেই মুহূর্তে ওর চিবুকের উল্কিগুলো দেখতে দেখতে আমি বুধন নামে ওই গিরগিটিমার্কা পুরুষটার প্রতি ঈর্ষা অনুভব করেছিলাম।
মুস্কানি আমার চোখের অসভ্যতা বুঝতে পেরে আঁচলটা একটু তুলে নেওয়ার ভঙ্গি করল, কিন্তু আসলে তুলল না, বরং আর-একটু খসিয়েই দিল। তারপর আবার সেই দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, ‘ওদিকে নয়, এদিকে দেখুন।’ এই বলে নিজের গলার দিকে দেখাল।
দেখলাম ওর গলায় ঝুটো রুপো দিয়ে তৈরি একটা গয়না। ওটাকে কি ঝাপটা বলে? তা-ই হবে। গয়নাটা বেশ চওড়া, চোয়ালের নীচ থেকে কণ্ঠমণি অবধি পুরো গলাটাই ঢেকে রেখেছিল। ও বলল, ‘এর নীচে মাথাটা ঘাড়ের সঙ্গে জোড়া রয়েছে। ইচ্ছে করলেই খোলা যায়। খুলে অন্যের মাথা বসিয়ে নেওয়া যায়।’
বুধন ওদিক থেকে ওকে ধমক দিল, ‘খামোশ, বত্তমিজ! বাবুকে মিথ্যে বলে লাভ আছে কিছু? শুনলি তো, বাবু আমাদের আয়নার কারিকুরি জানেন।’
তারপরে বুধন ওর তিন খেলোয়াড়কেই তাড়া লাগাল— ‘নে নে! চটপট তৈরি হয়ে নে। সাতটা বাজতে চলল।’ তারপর আমাকে বলল, ‘কোথায় উঠেছেন, বাবু?’
আমি বললাম, ‘শহরে, এক মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে।’
‘তা হলে তো কাছেই আছেন। বাড়ি ফেরার আগে যে-কোনও শো- এর সময় একবার চলে আসুন। দেখে যান আমাদের হরর ওয়ার্ল্ড।’
বললাম, ‘আজ শরীরটা খারাপ লাগছে, বুধন। কাল আসব।’
শরীরটা সত্যিই খারাপ লাগছিল। দুপুরে ধুলো আর রোদ্দুরের মধ্যে ওই অটো নিয়ে ছোটোছুটি, সারাদিনের যত রাগ, উদ্বেগ— সব তখন শোধ নিচ্ছিল। মাথার ভেতরটা দপদপ করছিল। তাই আর বেশি ঘোরাঘুরি না করে ব্রিজনাথ ঝা মশায়ের উঠোনের ওই একানে ঘরটায় ফিরে গেলাম। তার আগে অবশ্য উঠোনের ইঁদারার জলে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। যখন হাতমুখ ধুচ্ছি তখনই ভাবিজি নিজেদের ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘চা খাবে, শঙ্খ?’
‘দিন, ভাবিজি। খুব উপকার হয়। একটু আদা দিয়ে দেবেন। ‘
চা আর গাঠিয়ার প্লেট নিয়ে ভাবি যখন ঘরে ঢুকলেন তখন আমি শুয়ে ছিলাম। ওঁকে দেখে উঠে আধশোয়া হলাম। উনি বিছানার ওপরেই একটা পুরোনো খবরের কাগজ পেতে তার ওপরে চা আর গাঠিয়ার প্লেট নামিয়ে রেখে বললেন, ‘তোমার কি শরীর খারাপ?’
‘ওই একটু মাথাটা ধরেছে আর কী! মাস্টারমশাই কোথায়?’
ভাবির মুখে মেঘ ঘনাল। বললেন, ‘যেখানে থাকার। জুয়ার আড্ডায়। যাক গে, তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। আমি দশটার সময় রাতের খাবার দিয়ে ডেকে দেব। তার মধ্যে নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে যাবে।’ এই বলে ভাবি টিউবলাইটের স্যুইচটা অফ করে, নীল বেডল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি চা শেষ করে সত্যিই গায়ে চাদর ঢাকা নিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু যত সহজে ঘুম আসবে ভেবেছিলাম অত সহজে এল না।
আমি যদি মঙ্গলার মুণ্ডহীন শরীরের কথা ভাবতাম, তা হলে নিজেকে দোষ দিতে পারতাম না। আমি যদি রাকেশ মর্দানার মস্তানির কথা ভাবতাম, যদি থানার বড়োবাবুর বদমাইশি মাখানো মুখটার কথা ভাবতাম, ভেবে যদি ঘুম নষ্ট করতাম, তা হলেও নিজেকে দোষ দিতে পারতাম না। কুকুরের জিভ যেমন বারবার নিজের গায়ের ঘা’র দিকেই চলে যায় মানুষের মনও তেমনই আঘাতের দিকেই ফিরে যায়। কষ্টকর হলেও সেটাই তো স্বাভাবিক।
না, ওসব নয়। আমি আধো-ঘুমের মধ্যে মুস্কানির কথা ভাবছিলাম। এত তীব্রভাবে ভাবছিলাম যে, মনে হচ্ছিল ও যেন সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আমার পাশে শুয়ে আছে। আমি হাত বাড়িয়ে ওর উরু ছুঁলাম। সিঙ্কের মসৃণতায় শিউরে উঠল আমার আঙুল।
তারপরেই চমকে উঠলাম। ঘুমের ঘোর এক নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল। স্বপ্ন নয় তো? সত্যিই তো আমার পাশে শুয়ে রয়েছে এক নগ্ন নারী। সত্যিই আমি তার ঊরুতে হাত বোলাচ্ছি।
চোখ খুলে দেখলাম, ভাবিজি। শরীরে একটাও সুতো নেই। তার শুভ্র মৈথিলি ত্বকের ওপরে বেডল্যাম্পের নীল আলো সমুদ্রের নীল জলের মতন খেলা করছে।
আমাকে চোখ খুলতে দেখে ভাবিজি উপুড় হয়ে আমার শরীরের ওপরে উঠে এলেন। মুখটা আমার কানের পাশে নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললেন, ‘বেশি না, তুমি আমাকে পনেরোশো টাকাই দিয়ো। আমি তোমাকে সুখ দেবো, দেখো!’
আমার শরীর ইতোমধ্যেই গরম হয়েছিল। নারী-শরীরের ছোঁয়ায় এবার তাতে আগুন ধরে গেল। দু’হাতের মধ্যে ভাবিজিকে জড়িয়ে, বিছানায় চিত করে ফেলে ওর ওপরে উঠে পড়লাম আর ঠিক তখনই কে যেন আমার শরীরের সমস্ত আগুন একটা হিম-ঠান্ডা ফুঁ মেরে নিভিয়ে দিল।
দেখলাম, যার দুই ঊরুর মধ্যে আমি নিজেকে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছি তার মতন কুৎসিত মেয়ে বিরল। চুল উঠে গিয়ে চওড়া হয়ে গেছে তার কপাল; আর সেই কপালের মাঝ বরাবর গুটিবসন্তের তিনটে পুরোনো ক্ষত, ‘অতএব’ চিহ্নের মতন একটু ওপর নীচে করে সাজানো। গালদুটো বসে গেছে বলেই গালের হাড়দুটো মনে হচ্ছে পাহাড়ের মতন ঠেলে উঠেছে। থ্যাবড়া নাক। আধবোজা চোখদুটোয় কোনও নড়াচড়া নেই। কাচের চোখের মতন মৃত দুই চোখে কিন্তু তখনও নির্ভুলভাবে এক বেশ্যার বিদ্রূপদৃষ্টি লেগে ছিল। সেই দৃষ্টি আমার মুখের ওপরে স্থির।
এই মুখ ভাবিজির নয়, মঙ্গলার!
আমি চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলাম। দৌড়ে গিয়ে জ্বালিয়ে দিলাম টিউবলাইটের স্যুইচ। বিছানার মেয়েটা কোনওরকমে শাড়িটা তুলে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে শেয়ালের মতন একদৌড়ে উঠোন পেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। দেখতেও পেলাম না, সে কি সত্যিই মঙ্গলা না ভাবিজি।
ওই রাতে খাওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কেউ খেতে ডাকেওনি। ঘুমও ছিল না আমার চোখে। অনেক রাতে একবার শুধু মাস্টার ব্রিজনাথ ঝা’র মদ্যপ গলার চিৎকার শুনেছিলাম— ‘রান্ডি! রান্ডি কাঁহিকি! নিকাল যা হিঁয়াসে।’
কোনও মহিলার কান্নার আওয়াজ পাইনি।
***
পরদিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই জ্যাকেটের হুডিতে কান-মাথা ঢেকে, ব্যাকপ্যাকটা পিঠে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পাখির ডাক শুনে ভেবেছিলাম, ভোর হয়ে গেছে। ঘড়িতেও দেখাচ্ছিল ছ’টা বাজে। কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে বুঝতে পারলাম, শীতের বেলা আর কুয়াশার চাদর এই দুইয়ে মিলে ভোরের রাস্তা আটকে রেখেছে। রাস্তাঘাট তখনও অন্ধকার। দূরে দূরে অন্ধের চোখের মতন স্ট্রিট-ল্যাম্পের আলো জ্বলছে।
রাস্তা থেকে একটা বাঁশের টুকরো কুড়িয়ে নিলাম। নেড়ি কুকুরগুলো যেভাবে দাঁত বার করে তেড়ে আসছে তাতে এটা হাতে রাখা ভালো। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, আমাদের পত্রিকার জন্য লেখাটা তৈরি করতে আমার আর কষ্ট করতে হবে না। অরুণ মিশ্র মেলার মধ্যে পরিবর্তনহীনতাকে ধরতে বলেছিলেন। ধরব, তা-ই ধরব। ধরব জহিরাবাদের সংক্রান্তির মেলার নারী-মাংসের ব্যাবসাকে। ওখানকার জলবেশ্যাদের কথা লিখব। ঝাজির ঘরের মতন আরও অনেক ঘরে ছড়িয়ে পড়া সেক্স-ট্যুরিজমকে ও বাদ দেব না।
হঠাৎই পিছন থেকে কে যেন ডাকল, ‘বাবুজি!’
চমকে ঘুরে তাকালাম। দেখলাম, বুধন আমাকে ডাকছে।
খেয়াল করিনি, হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন মেলার একপ্রান্তে ওদের আতঙ্কের দুনিয়ার তাঁবুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। কেন গিয়েছিলাম? আমার অবচেতন কি চাইছিল চলে যাওয়ার আগে একবার শেষবার মুস্কানির মুখটা দেখে আসতে? জানি না। নিজের মনের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না।
বুধন বসে ছিল একটা ছাউনির নীচে। ওদের তাঁবুর উলটোদিকেই রাস্তার ধারে ওই ছাউনিটা, সম্ভবত সন্ধেবেলায় ওখানে কোনও খাবারের দোকান বসে। তখন চালাটা ছিল ফাঁকা। ছাউনিটার চারিদিকে ত্রিপলের দেওয়াল ছিল। তার চেয়েও বড়ো কথা, একটা বিশাল মাটির উনুন ছিল, আঁচ নিভে গেলেও যেটার ভেতর থেকে তখনও উত্তাপ বেরিয়ে চালাঘরের ভেতরটাকে গরম করে রেখেছিল। তা না হলে এই ভোরের তীব্র হাওয়ায় বুধন ওই দুটো বাচ্চাকে নিয়ে খোলা জায়গায় শুয়ে থাকতে পারত না। মনে হয় ও দেখেছে যে, ওদের তাঁবুর চেয়েও এই জায়গাটা বেশি আরামদায়ক; তাই এখানে এসে শুয়েছিল। বাচ্চাগুলোকেও এখানেই এনে ওইয়েছিল।
হ্যাঁ, বিজলি-কুমারী আর নরকের পাহারাদার, দুই বালক-বালিকা ওর পাশেই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছিল।
বুধন উনুনটার পাশে একটা ইটের স্তূপের ওপরে বসে বিড়ি টানছিল। আমি পায়ে পায়ে কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় চললেন, স্যার?’
বললাম, ‘চলে যাচ্ছি, বুধন। আমার এখানকার কাজ শেষ। আজকেই অফিসে জয়েন করতে হবে।’
‘তা এদিকে কেন, স্যার? বাসস্ট্যান্ড তো উলটোদিকে।’ স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, বুধন ওর ধূর্ত চোখদুটো সরু করে আমাকে মাপছে। ওর এই ধূর্তামিতে ভরা মুখটা দেখেই হঠাৎ আমার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব চলে এল। মনে হল, ওকে আঘাত করি। তাই বললাম, ‘চলে যাওয়ার আগে একবার মুস্কানির হাতে কিছু টাকা দিয়ে যেতে চাই, বুধন। তোমার আপত্তি আছে?’
বুধনের মুখে খুশির আলো ছড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘না না! এ তো আমার সৌভাগ্য, বাবু। তবে আপনাকে একটু বসতে হবে। আসুন, এখানেই বসুন। ভালো লালসুতোর বিড়ি আছে। ধরাবেন একটা? শীত লাগবে না।’
বুধন ইঙ্গিতে ওর পাশে একটা জায়গা দেখাল। আমি বললাম, ‘কেন? বসতে হবে কেন?’
মুস্কানির ঘরে খদ্দের আছে।
বাচ্চাদের নিয়ে বুধন কেন যে বাইরে বসে আছে সেটা যেমন বুঝতে পারলাম, তেমনই একইসঙ্গে গা-টাও গুলিয়ে উঠল। মনে হল, মুস্কানির সুন্দর মুখ, বুক, ঊরু থেকে দলা দলা দুর্গন্ধময় পাঁক ঝরে পড়ছে।
মুস্কানি। মুস্কানিও তা হলে মেলার বেশ্যা!
এই ঘৃণা নিয়ে ওকে যে ছুঁতে পারব না সে ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তবু ঠিক করলাম তাঁবুতে ঢুকব। এই সুযোগ হাতছাড়া করা চলে না। চলে যাওয়ার আগে মুস্কানির কাছ থেকে ওর এই ব্যাবসা প্রসঙ্গে দুটো কথা আমাকে জেনে যেতেই হবে, না হলে লিখব কী?
একটু বাদেই একজন খেঁকুরে, খালাসি টাইপের লোক তাঁবুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। বুধন বলল, ‘আপনি এবার যান, স্যার। কেউ ডিস্টাপ করবে না। আমি পাহারায় আছি।’
তাঁবুর ভেতরে তখনও আবছা অন্ধকার। ভাগ্যিস হাতে কুকুর- তাড়ানো লাঠিটা ছিল। সেটা ঠুকতে ঠুকতে যে ঘরটায় ঢুকে পড়লাম, ঢুকেই বুঝতে পারলাম, সেটা ওদের থাকার ঘরটা নয়। সন্ধেবেলায় যে ঘরে বসে চা খেয়ে গিয়েছিলাম, এটা সেটা নয়। এই ঘরটা হল ওদের শো-এর ঘর। এখানেই দর্শকদের জন্য টেবিলের ওপরে পরপর সাজানো থাকে নরকের পাহারাদার, বিজলি-কুমারী আর কাটা মুন্ডু, যে কথা বলে।
চোখটা একটু সয়ে যেতেই দেখলাম তখনও একটা মুন্ডু টেবিলের ওপরে বসানো রয়েছে। মুস্কানির মাথা। আমার চোখে চোখ পড়তেই মাথাটা হাসল। বলল, ‘বলুন বাবু, কী চান? কথা শুনতে, না শুতে? যদি কথা শুনতে চান তা হলে আমিই বলতে পারি। আর যদি শুতে চান, তা হলে ওর সঙ্গে শোন।’
চোখের ইশারায় ও যেদিকে দেখাল সেদিকে তাকিয়ে দেখি, মেঝের ওপরে দুই পা ফাঁক করে একটি মেয়ে শুয়ে রয়েছে। তার সঙ্গে আমি মুস্কানির কোনও ফারাক খুঁজে পেলাম না। সেই একই মারকাটারি ফিগার, আয়না-বসানো ব্লাউজ আর রঙিন ঘাঘরা।
আমি বললাম, ‘ও কে? ওর সঙ্গে আমার কোনও প্রয়োজন নেই। তুমিই বেরিয়ে এসো না! এসব চালাকির দরকার কী?’
‘বেরিয়ে আসব মানে? টেবিলের পিছনে শরীরটাকে লুকিয়ে মুস্কানি হেসে উঠল। বেরিয়েই তো আছি। এই তো আমার মাথা, আর ওই তো মেঝেতে আমার শরীর।’
আমি প্রায় চিৎকারই করে উঠলাম, ‘মানে কী এর?’
‘বুঝলেন না?’ টেবিলের ওপর থেকে মুস্কানি বলল, ‘সুন্দর মুখটাকে নষ্ট করতে চাই না। খদ্দেররা বড়ো নিষ্ঠুর হয়, বুঝলেন? পুরো স্যাটিসফায়েড হওয়ার জন্য গালে কামড়ে দেয়, চড়-থাপ্পড় মারে। এমনকি সিগ্রেটের ছ্যাঁকাও দিয়ে দেয় কেউ কেউ।
তাই কাজের সময় আমি নিজের মাথাটা খুলে রেখে ওই বেশ্যাটার মুখ পরে নিই। দেখুন… ওইদিকে দেখুন। ওই মুখটা।’
আমি মেঝেয় শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালাম। সে আস্তে আস্তে উঠে বসছে আর তার মুখটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। হ্যাঁ, কোনও ভুল নেই। মেয়েটার শরীর মুস্কানির… মুখ মঙ্গলার। সেই ফ্যাকাশে চামড়া, কপালে তিনটে বসন্তের ক্ষত। আধবোজা মড়া-চোখ আর বসে-যাওয়া গাল। চোখে বেশ্যাদের মার্কামারা বিদ্রুপের দৃষ্টি।
মেঝের মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতেই দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আমি হাতের লাঠিটা চালালাম। লাঠির ঘায়ে মুস্কানির শরীর থেকে মঙ্গলার মাথাটা মেঝের ওপরে গড়িয়ে পড়ল।
‘আহাহাহা হা! আহাহাহা হা!’
আক্ষেপ করে উঠল টেবিলের ওপর থেকে মুস্কানির মাথা। তারপরে সেই মাথাটাও গড়িয়ে পড়ল মেঝের ওপরে। গড়িয়ে গড়িয়ে চলল তার ফেলে যাওয়া ধড়ের দিকে।
আমি দৌড়ে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে দেখলাম, বুধন দাঁতে একটা বিড়ি চেপে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ও আমাকে আটকাল না। শুধু পিছন থেকে বলল, ‘যারা শরীর বেচে তাদের সবার ওই একটাই মাথা, বুঝলেন, বাবু। এখন থেকে কত জায়গায় যে বেচারি মঙ্গলাকে দেখতে পাবেন।’
