ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

বোবা রাজপুত্র – সৈকত মুখোপাধ্যায়

বোবা রাজপুত্র

জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মুনিয়া। ঘরে এখন সে একা। কৌশিক বিকেল হতেই সেই যে কোথায় টহল মারতে বেরিয়েছে, এখনও ফেরার নাম নেই। অবশ্য বিয়ের পর থেকে গত চার বছরে একা থাকতেই সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। রাতে শোবার সময়টুকু ছাড়া কৌশিক তাকে কখনওই সঙ্গ দেয় না, তা সে আসানসোলেই হোক বা এই তুষকাঠি গ্রামে। শুরু থেকেই মানুষটাকে ও এইরকমই দেখছে। নির্মম। ধান্দাবাজ।

হেমন্তের গৈরিক জ্যোৎস্নায় একটু দূরে অজয় নদের বালির চর দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। রাত বেশি হয়নি, হয়তো সন্ধে সাতটা হবে। তবু এর মধ্যেই নদীর বুকে ঘন হয়ে উঠেছিল কুয়াশার চাদর। এই সবই মুনিয়ার ভীষণ চেনা দৃশ্য। এই তুষকাঠি গ্রাম তার জন্মভূমি। জন্ম থেকেই সে বাড়ির জানালা দিয়ে চোখ মেলে অজয় নদকে এইভাবে দেখছে। নানান ঋতুতে তার নানান রূপ। মুনিয়া অস্ফুটে উচ্চারণ করল— ‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে, সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে…’

হঠাৎই কানের কাছে বীভৎস এক চিৎকারে মুনিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল। ‘উহ্! বাবা গো,’ বলে সে তাড়াতাড়ি পিছিয়ে এল জানালার সামনে থেকে। খুব কাছেই কোথাও ডাকছে শেয়ালগুলো। এখন জন্তুগুলোকে দেখা যাচ্ছে না, তবে কাল ওদের দেখেছিল মুনিয়া। কাল গভীর রাতে।

সেই কথা মনে পড়তেই আবার একটা তীব্র অস্বস্তি তার বুকে পাথরের মতন চেপে বসল। কাল রঞ্জন শিবাভোগ দিচ্ছিল। এই জানালায় দাঁড়িয়েই মুনিয়া চাঁদের আলোয় ওকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল। বাগানের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে রঞ্জুদা প্রসাদের মণ্ড ছুড়ে দিচ্ছিল অন্ধকারে অপেক্ষারত শেয়ালগুলোর দিকে। হুটোপাটি লেগে গিয়েছিল জন্তুগুলোর মধ্যে। জোড়ায় জোড়ায় জ্বলন্ত চোখ ছুটে বেড়াচ্ছিল রঞ্জনকে ঘিরে আজকেও ও শিবাভোগ দেবে নিশ্চয়ই। নিশাচর জন্তুগুলো ওর সেই আপ্যায়নের প্রতীক্ষাতেই ঘোরাফেরা করছে ওদের বাড়ির আশেপাশে, আর মুনিয়ার বুক কাঁপিয়ে দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ডেকে উঠছে উল্লাসে।

জানালার ধার থেকে সরে গিয়ে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল মুনিয়া। চোখটা বার বার জলে ভরে উঠছিল তার। মনে মনে সে ভাবছিল— এ কী হল, ঠাকুর! এ কী হল! সেই রঞ্জন, তার রঞ্জুদা- সে এখন সন্ন্যাসী? সে এখন উদাসীন? কাল মুনিয়া স্বকর্ণে শুনেছে, এখানকার লোকজন ওকে ‘খ্যাপাঠাকুর’ বলে ডাকছে। ও কি তা হলে পাগল হয়ে গেছে?

মুনিয়ার মনে পড়ল, ছোটোবেলায় তার ঠাকুমাকে প্রায়ই একটা কথা বলতে শুনত। মেয়েরা বিয়ের পর প্রথমবার বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় যে আকুল কান্নাটা কাঁদে, তার মধ্যে নাকি আসলে অনেকগুলো কান্না আলাদা আলাদাভাবে মিশে থাকে। একদম ঠিক। মুনিয়া যখন এই তুষকাঠি ছেড়ে কৌশিকের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আসানসোলের দিকে রওনা হয়েছিল, তখন সে-ও কেঁদেছিল। মা’র বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ফুলে ফুলে কেঁদেছিল অনেকক্ষণ ধরে। আর কেউ না জানুক, সে নিজে তো জানে, সেই কান্নার মধ্যে অনেকটাই ছিল রাস্তার উলটোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মুখচোরা ছেলের জন্য, যে কোনওদিন তাকে সাহস করে বলে উঠতে পারল না, ভালোবাসি। সেই ছেলেটার নাম রঞ্জন ভট্টাচার্য।

অথচ কত সুযোগ ছিল ওর। পাশের বাড়ির প্রতিবেশী। তাই ওদের বাড়িতে রঞ্জনের অবাধ যাতায়াত ছিল। গ্রামদেশে একটা যুবতি মেয়ের কাছাকাছি পৌঁছোনোর মধ্যে সাধারণত যে দুরূহতা লুকিয়ে থাকে রঞ্জনের ক্ষেত্রে তা তো একবারেই ছিল না। তবু ও কেন বলতে পারল না?

এত কেয়ারিং ছিল রঞ্জুদা। এত আগলে আগলে রাখত ওকে ছোটোবেলা থেকে।

আর তার বদলে ও কী করেছে?

এত দুঃখের মধ্যেও ছোটোবেলার সেই সব বদমায়েশির কথা ভেবে মুনিয়ার ঠোঁটে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। রঞ্জুদার সঙ্গে তার মেলামেশার ইতিহাস আসলে এক নিরন্তর অ্যাডাম-টিজিং-এর ইতিহাস। খুব ছোটোবেলায় পিঠে কালি ছিটিয়ে দেওয়া, চুলে বাঘনখ ফল কিম্বা চুইংগাম চিপকে দেওয়া। আর একটু বড়ো হলে, গ্রামের অন্য মেয়েদের সামনে ওকে আজেবাজে নাম ধরে ডাকা, কিম্বা সাইকেলের পাম্প খুলে দেওয়া। ও কিন্তু কোনওদিন মুনিয়ার নামে কাউকে নালিশ করেনি। বরং মুনিয়াই করেছিল ওর নামে নালিশ। অতিচালাকের ছদ্মবেশের আড়ালে সে নিজে যে আসলে কী ভীষণ কী ভীষণ বোকা, সে কথা ভেবে আজ এতদিন বাদেও কানদুটো লাল হয়ে উঠল মুনিয়ার।

নালিশ করেছিল কেন? রঞ্জুদা তার ফটো চুরি করেছিল বলে। একটা গ্রুপ-ফটো। বন্ধুদের সঙ্গে কলেজের পিকনিকে গিয়ে তোলা। খাটের ওপর রেখে গিয়েছিল, তারপর থেকে আর খুঁজে পাচ্ছিল না। প্রায় ভুলেই গিয়েছিল ফটোটার কথা। হঠাৎই একদিন রঞ্জুদার পড়ার ঘরে ঢুকে দেখে সেই ছেলে টেবিলে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে মন দিয়ে কী যেন দেখছে। পিছন থেকে পা টিপে টিপে গিয়ে উঁকি মেরে মুনিয়া দেখে তাদের সেই গ্রুপ-ফটোটা। মুনিয়া তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে দুটো বাড়িই মাথায় তুলেছিল— তাদেরটা এবং রঞ্জনদেরটা।

রঞ্জন সেদিন ওর হাতেপায়ে ধরতে বাকি রেখেছিল। কিন্তু মুনিয়া ছাড়বে কেন? সে অনেকদিন ধরেই সন্দেহ করছিল রঞ্জুদার ওর বন্ধু তপতীর প্রতি বেশ একটু দুর্বলতা আছে। এইবার হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই গ্রুপ-ফটোর একদম মাঝখানেই তো তপতী দাঁড়িয়ে আছে, তা-ই না? ইস! কী ধিকৃত আর অপমানিতই যে সেদিন হতে হয়েছিল রঞ্জুদাকে!

অনেকদিন বাদে মুনিয়ার মনে হয়েছিল, শুধু তপতী কেন, সে নিজেও তো ছিল ওই ফটোটার মধ্যে। তখনই জীবনে প্রথমবার সে রঞ্জনের চোখের দিকে সত্যিকারের চোখ মেলে তাকিয়েছিল, আর সেখানে যা দেখেছিল তাতে তার মন অসাড় হয়ে গিয়েছিল। কোনও মানুষের চোখে এতটা কষ্ট জমে পাথর হয়ে থাকতে পারে?

কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। বাবা আসানসোলের ব্যবসায়ী পাত্র কৌশিকের সঙ্গে তার বিয়ের কথা পাকা করে ফেলেছেন। অন্যদিকে রঞ্জন এক অল্পশিক্ষিত বেকার।

স্মৃতি থেকে হঠাৎই মুনিয়াকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনল অদ্ভুত এক আওয়াজ। চিৎকার নয়, শেয়ালগুলো এখন খুশিতে মুখ দিয়ে কেমন একটা কুঁক কুঁক শব্দ করছে। মুনিয়া বিছানা ছেড়ে আবার জানালার কাছে গিয়ে দেখল যা ভেবেছিল, ঠিক তা-ই। রঞ্জন শিবাভোগ দিচ্ছে। কী ভীষণ রোগা হয়ে গেছে মানুষটা। সাদা ধুতি আর সাদা উড়নিতে একটুকরো জমাট-বাঁধা জ্যোৎস্নার মতনই মনে হচ্ছিল ওকে।

কাজ শেষ করে রঞ্জন ফিরে যাচ্ছিল বাড়ির দিকে। হঠাৎ‍ কী মনে হতে চোখ তুলে তাকাল পাশের বাড়ির দোতলার জানালার দিকে। দেখল মুনিয়া দাঁড়িয়ে রয়েছে। অনেকক্ষণ নড়তে পারল না রঞ্জন। তার পা- দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেল। মুনিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। এ তো সন্ন্যাসীর দৃষ্টি নয়। উম্মাদের তো নয়ই। এই যে রঞ্জনের দুটো চোখের কাজলকালো মণি ওকে আদর করে যাচ্ছে, এটাই কি গার্হস্থ্য নয়?

মুনিয়া মনে মনে বলল, বুঝতে পারছি গো রঞ্জুদা, কত যন্ত্রণায় সন্ন্যাসীর বেশ ধরেছ। তুমি কি জানো রঞ্জুদা, আমিও এক সন্ন্যাসিনী? আমার ঘর আছে, কিন্তু সংসার নেই। আমার বর আছে, কিন্তু সে মানুষ নয়।  

কত ভালো হত, যদি আবার দু’জনে মিলতে পারতাম? সে কি আর হয় না, রঞ্জুদা?

না, কিছুই বলা হল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রঞ্জন তাদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। মুনিয়া শুনল কাজের মাসি কমল তাকে নীচ থেকে ঢাকছে— ‘ও দিদি, রাতে কী রান্না হবে একটু বলে দিয়ে যাও না।’

আঁচল দিয়ে ভালো করে চোখদুটো মুছে নিয়ে মুনিয়া সিঁড়ি দিয়ে মতে শুরু করল।

***

কৌশিক হালদারের স্নায়ুগুলো যেন অবশ হয়ে আসছিল। মাথার মধ্যে নানান চিন্তা তালগোল পাকিয়ে একাকার। এখানে খবরের কাগজ পৌঁছোয় বিকেলে। সেই কাগজ পড়বার জন্যই দেড় কিলোমিটার হেঁটে সে পাণ্ডবেশ্বরের বাসরাস্তায় গিয়েছিল। সেখানে একটা ঝুপড়ি চায়ের দোকানে বসে চায়ের ভাঁড়টা সামনে রেখে কাগজের দ্বিতীয় পাতাটা ওলটাতেই তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। কেসটা রাজ্য পুলিশ ট্রান্সফার করেছে সি. আই. ডি.-কে।

তার মানে মেয়েটার সেই পলিটিশিয়ান জ্যাঠা আসরে নেমে পড়েছেন। সুতো টানছেন পিছন থেকে। ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল কৌশিক।

এমনিতে ব্যাপারটা যে বেশিদূর গড়াত না, সে ব্যাপারে কৌশিক নিশ্চিত ছিল। জেট-এজের এই একটা সুবিধে। কেউ বেশিদিন কিছু মনে রাখে না। মিডিয়া মনে না রাখলে পুলিশের কী দায় পড়েছে ব্যাপারটা নিয়ে বেশি নাড়াঘাটা করার! আর এক্ষেত্রে দেবযানীর বাবা-মাও বোধহয় চাইত স্ক্যান্ডালটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধামাচাপা পড়ুক, কারণ ওদের আর-একটা মেয়ে আছে। কিন্তু এখন ব্যাপারটা সহজে মিটবে না।

যদিও কৌশিক যতটা সম্ভব পিছনের সমস্ত প্রমাণ লোপাট করতে করতে এগিয়েছে, তবু, কোথাও কি সে কোনও সূত্র ফেলে আসেনি?

বেকার এই টেনশন নিতে গেল সে। শালা, শয়তান ভর করেছিল মাথায়। চায়ের খালি ভাঁড়টাকে এক লাথিতে ছিটকে দিয়ে রাস্তায় নামল কৌশিক। কোনও ক্ষতি তো করেনি তার দেবযানী। কেন যে শুধু শুধু ওকে…

দেবযানীর কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর একটা ছোট্ট কাঁটার খোঁচা টের পায় কৌশিক। ও ছিল মেয়েটার প্রথম প্রেম। ওহ্! ভাবা যায়? আকুলতা, কী তীব্র প্যাশন সেই আঠারো বছরের হৃদয়ের। কৌশিককে দেখলেই ওর মুখে যেন একশো আট প্রদীপের আলো জ্বলে উঠত।

কৌশিক আবার ভাবল, কেন অমন পাপ সে করল? সে কি রাগের মাথায়?

নাহ্। দালালি করে যাকে পয়সা রোজগার করতে হয় তার রাগলে চলে না। যে তাকে শুয়োরের বাচ্চা বলে, তাকেও কৌশিক সেলাম বাজায়, যদি সে তার ক্লায়েন্ট হয়। কাজেই রাগের অনুভূতিটা তার অনেকদিন আগেই ভোঁতা হয়ে গেছে।

তা হলে?

এই ‘তা হলে’-র জবাবটা নিজের মধ্যে খুঁজতে গেলেই কৌশিক এমন এক সত্যের মুখোমুখি হচ্ছে যে, তার অভিঘাতে তার সমস্ত অন্তরাত্মা উঠছে কেঁপে। সত্যটা এই যে, সে সেদিন যা করেছে নেশার ঝোঁকে করেছে। খুব বেশিদিন কোডেনের শট নিলে যে নিজের আবেগের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এই কথাটা সে এতদিন কানে শুনেছিল। ইদানীং নিজের শরীরের ভেতর অল্প অল্প করে লক্ষণগুলোকে ফুটে উঠতে দেখছে সে। কৌশিক জানে আর কিছুদিন পরে নিজের অস্বাভাবিকতাগুলোকে অস্বাভাবিকতা বলে চেনার ক্ষমতাটুকুও তার চলে যাবে। তারপর? তারপর সে একটা চলমান মৃতদেহ হয়ে যাবে, যেরকম মৃতদেহ মাঝে মাঝে দেখা যায় পার্কস্ট্রিট কবরখানার সামনে কিম্বা ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাথে— আকাশের দিকে শূন্যদৃষ্টি মেলে বসে আছে।

আপাতত চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে কৌশিক দেখল তার হাতের আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। কিছুতেই সে সেই কাঁপুনি থামাতে পারছে না। কৌশিক নিজের মনেই হাসল। সে জ্ঞানপাপী, তাই সে জানে যে এই কাঁপুনিকে নেশাড়দের পরিভাষায় বলে ‘টারকি’। বেশিক্ষণ ড্রাগ না পেলে স্নায়ুতন্ত্রের এই আক্ষেপ শুরু হয়ে যায়।

আর যদি বেশ কয়েকদিন নেশাড়ুর শরীরকে বঞ্চিত রাখা হয় ওই অমৃতে?

কৌশিক শুনেছে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের দেওয়াল নখ দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে দশটা আঙুল রক্তাক্ত করে ফেলে সেখানকার অধিবাসীরা। দেওয়ালে মাথা খুঁড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলে, একপুরিয়া চরস কিম্বা হেরোইনের একটা শটের জন্য।

কৌশিক বুঝতে পারে তার জন্যও সেই দিন আর খুব বেশি দূরে নেই। কিন্তু আপাতত মাথার ভেতরের ধোঁয়াটে ভাবটা কাটাবার জন্য চাই…

কৌশিক পথের ধারে একটা রাঙচিতার ঝোপের পিছনে গিয়ে বসল। তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে একে একে বার করল ট্যাবলেট, জলের বোতল, তুলোর টুকরো। ট্যাবলেটটা অল্প জলে গুলে তুলোর টুকরোর মধ্যে দিয়ে হেঁকে নিল। সবশেষে বার করল ছোটো একটা ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ। অভ্যস্ত হাতে দ্রবণটাকে কনুইয়ের একটু ওপরে পেশির মধ্যে ইনজেক্ট করে দিল।

আহ্‌হ্‌!

আস্তে আস্তে কৌশিকের হাতের কাঁপুনি থেমে গেল। কিন্তু বুকের কাঁপুনিটা তখনই থামল না। খবরের কাগজে যা পড়ল, তাতে সে বেশ বুঝতে পারছে, এখন অনির্দিষ্টকাল তাকে এখানেই থাকতে হবে। শ্বশুর যতক্ষণ আছে খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে হবে না। কিন্তু খাওয়াদাওয়ার চিন্তা সে করেও না। যত দিন যাচ্ছে তার খিদে কমে আসছে। সবরকমের খিদে। ভাত দেখলে গা গুলোয়। মেয়েমানুষ দেখলেও গা গুলোয়। শুধু একটা জিনিসের জন্যই মনপ্রাণ আকুল হয়ে থাকে। ট্যাবলেট। কিন্তু বড়ো দাম শালা ট্যাবলেটের। পয়সা থাকলে এই অজগ্রামেও সাপ্লাই ঠিক চলে আসবে। ওই পাণ্ডবেশ্বর মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালে আসানসোল থেকে হকার এসে মাল দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু পয়সাটাই তো ফুরিয়ে আসছে। মুনিয়ার কাছে চাইবে? বলবে, তোমার বাবাকে বলো ধার দিতে? হারগিস দেবে না মুনিয়া। মহা ঠ্যাটা মেয়েছেলে! তার ওপর এখন নিজের জায়গায় আছে।

কিন্তু আর বেশিক্ষণ এসব জাগতিক ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাতে পারল না কৌশিক। তার মাথার ভেতর রঙিন আলোর নাচানাচি শুরু হয়ে গেল।

বেসামাল পায়ে কৌশিক উঠে দাঁড়াল, তারপর ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পা দিল রাস্তায়। আকাশে এখনও আলো আছে। এখনই বাড়ি ফেরার কোনও মানেই হয় না। বাড়ি ফেরা মানেই তো সেই মুনিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ানো।

নিজের বউ হলেও এই মেয়েটাকে দেখলে কেমন যেন অস্বস্তি হয় কৌশিকের। ও পরিষ্কার বুঝতে পারে, মুনিয়া তাকে ঘৃণা করে, প্রবল ঘৃণা। মুশকিল হচ্ছে, মুনিয়া ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই করে না। ও যদি চিৎকার করত, ঝগড়া করত, গড়পড়তা মেয়েরা যেমন করে, তা হলে কৌশিকও একটা প্রতিক্রিয়া দেখাবার সুযোগ পেত। সে মুনিয়ার কবজি মুচড়ে দিতে পারত, চুলের গোছা টেনে ছিঁড়ে দিতে পারত, এমনকি তার পিঠে সিগারেটের ছ্যাঁকাও দিয়ে দিতে পারত। কিন্তু কৌশিক কিছুই করতে পারে না। মুনিয়ার নীরব ঘৃণা তাকে কোনও সুযোগ দেয় না।

কৌশিক শুধু ভেতরে ভেতরে মুনিয়াকে খুন করার বাসনা পোষণ করে।

বাড়ি ফিরল না কৌশিক। সে হাঁটা লাগাল নদীর দিকে। কিছুটা যাওয়ার পর তার চোখে পড়ল সারি সারি হোগলা আর পরমার ছোটো ছোটো ঝুপড়ি। পুরো ব্যাপারটাই তার একটা স্বপ্নের মতন মনে হচ্ছিল, যেন একটা রূপকথায় পড়া বামনের দেশ। ওটা কী? কারা থাকে ওখানে?

কিছু না বুঝেই মেলার দিকে হাঁটা লাগাল কৌশিক।

***

কৌশিক বাড়ি ফিরল রাত বারোটায়। নেশা করে এসেছে। সেটা নতুন কিছু নয়। আসানসোলেও ও প্রতিদিন ড্রাগ নিয়েই বাড়ি ফিরত। মাঝে মাঝে কাঁদত, মাঝে মাঝে হাসত, তবে ঘুমিয়ে পড়ত খুব তাড়াতাড়ি।

এসব নোংরা ব্যাপার নিয়ে খুব বেশিক্ষণ মাথা ঘামাতে চাইল না মুনিয়া। সত্যি কথা বলতে কী, কৌশিক নামে ওই লোকটার অস্তিত্বই সে ভুলে যেতে চাইছে আস্তে আস্তে।

এমনিতে তাতে খুব একটা অসুবিধে ছিল না, কারণ, কৌশিকের সঙ্গে তার সারাদিনে কতবার দেখা হয়, ক’টা কথা হয়, তা হয়তো হাতের একটা আঙুলে গুনেই বলে দেওয়া যায়। কিন্তু কৌশিকের অস্তিত্ব ভুলতে দেয় না তার পাওনাদারেরা। সারাদিনের মধ্যে চোদ্দোবার তাদের ফ্ল্যাটের কলিং-বেল বাজে আর মুনিয়া দরজা খুলে পাওনাদারদের গালাগাল শোনে। রান্না নয়, খাওয়া নয়, সেলাই নয়, ফোঁড়াই নয়, সংসারের কোনও কাজই নয়— এক-একদিন নির্জন দুপুরে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে মুনিয়া ভাবে, তার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাওনাদার ঠেকানো। কী বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা যে বলে যায় গুন্ডার মতন লোকগুলো সে বলার মতন নয়। যাওয়ার সময় তারা প্রায় সকলেই দেওয়ালকে শুনিয়ে বলে যায়, কৌশিক যদি এমনিতে টাকার জোগাড় না করতে পারে তো এমন সোমত্ত বউটাকে বাজারে নামিয়ে দিক না। দু’দিনে ধার শোধ হয়ে যাবে!

বিয়ের আগে শুনেছিল, কৌশিক ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ের পরে শুনল ঠিকাদার। আরও পরে জানল, জমি-বাড়ির দালাল। কিন্তু আসলে কৌশিক হালদার নামে লোকটা যে কী, তা মুনিয়া এই চার বছরেও বুঝতে পারল না। যেটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় তা হল সে ড্রাগ অ্যাডিক্ট, জুয়াড়ি এবং বেশ্যাসক্ত। শেষের ব্যাপারটা ক্রমশ কমে আসছে অবশ্য। আরও একটা ব্যাপার জানত মুনিয়া। এইসব কাজে যে টাকার দরকার হয় তা জোগাড় করবার জন্য কৌশিক ভিক্ষে থেকে শুরু করে অনেক পথই বেছে নিতে পারে। তার একটা হল ব্ল্যাকমেলিং।

মুনিয়া নিজের এই হীন জীবন নিয়ে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গিয়েছিল। কাউকে কিছু বলত না, কোথাও যেত না। বিয়ের এক বছরের মধ্যে মা মারা গেল। তাতে একদিক দিয়ে সুবিধেই হল। মা যতটা খুঁটিয়ে সন্তানের খোঁজ নেয়, তার মুখের রেখা থেকে খুঁজে বার করে সুখ-দুঃখের কথা, তেমনটা তো আর কেউ পারে না। অতএব মুনিয়া আসানসোলের সেই দু’কামরার ফ্ল্যাটেই বন্দিজীবন বেছে নিয়েছিল। তুষকাঠি যেত বছরে একবার, পুজোর পরে। যেদিন যেত সেদিনই ফিরে আসত। বাবা হাজার বললেও থাকত না বেশিক্ষণ। আর কৌশিক তো বিয়ের পর থেকে কোনওদিনই শ্বশুরবাড়ির রাস্তা মাড়ায়নি।

তাই দু’দিন আগে কৌশিক নিজেই যখন তুষকাঠি যাওয়ার কথা বলল, তখন মুনিয়া দারুণ অবাক হয়েছিল। সাধারণত যে সময়ে ও বাড়ি ফেরে সেদিন তার থেকে অনেক আগেই কৌশিক বাড়ি ফিরে এল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল অসম্ভব টেনশনের মধ্যে রয়েছে। ঘরে ঢুকেই মুনিয়ার পা-দুটো জড়িয়ে ধরে আর কী! খালি বলে, ‘তুষকাঠি যেতে হবে। চলো, এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি।’

‘ব্যাপারটা কী?’ ভারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মুনিয়া। ‘শ্বশুরবাড়ির ওপর হঠাৎ এত টান?’

‘এখানে থাকলে মারা পড়ে যাব!’

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করল মুনিয়া।

‘ন্যাটা গোমেসকে অনেকদিন ধরে ঘোরাচ্ছি। এইমাত্র শুনলাম ও সুপারি কিলার ফিট করেছে আমাকে মারার জন্য। পালাই! চলো, পালাই!’ হাঁফাচ্ছিল কৌশিক।

ওর কথাটা বিশ্বাস করেছিল মুনিয়া।

আধঘণ্টার মধ্যে ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দিয়ে, স্টেশন থেকে একটা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে বর্ধমান আর বীরভূম জেলার সীমানায় গাছপালার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই গ্রামে পৌঁছেছিল ওরা।

তুষকাঠি পৃথিবীর সেই বিরল কয়েকটা জায়গার মধ্যে একটা, যেখানে মোবাইলের টাওয়ার নেই। আসলে মাইল মাইল বালিয়াড়ির মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাত্র দু’-তিনটে গ্রামের কয়েকশো মানুষের জন্য অত হাঙ্গামা করে টাওয়ার বসানোর ব্যাপারটা কোনও সার্ভিস প্রোভাইডারই বাণিজ্যসফল বলে মনে করেনি।

বলাই বাহুল্য, তুষকাঠিতে বিদ্যুতও পৌঁছোয়নি।

বছরের মধ্যে তিনশো পঞ্চান্ন দিন তুষকাঠি তার নিজের অন্ধকার একাকিত্বে ডুবে থাকে, আর দশদিন অদ্ভুত আদিম এক জনসমাগম ঘটে এখানে। সময়টা হেমন্ত মাসের শুক্লপক্ষের শেষ দশদিন। তুষকাঠির ধর্মবাবার থানে সেই ক’দিন এক মেলা বসে, ধর্মরাজের মেলা।

ধর্মরাজ অনার্য দেবতা। তাঁর ভক্তরাও হাজার হাজার বছর ধরে রাঢ়বঙ্গের এই ভূখণ্ডে অন্ত্যজ জীবন যাপন করছে। সে জীবনকে কখনও হয়তো বৌদ্ধ হীনযান কিম্বা চর্যাপদের কবিদের কায়াসাধনা ছুঁয়ে গেছে, কিন্তু বৈদিক দেবতারা কখনওই নয়। যতই উচ্চবর্ণের মানুষেরা নিজেদের ধর্মাচরণে তাদের ব্রাত্য করেছে ততই এই মানুষগুলো নিজেদের জন্য রচনা করে নিয়েছে নিগুঢ় এক সাধন পদ্ধতি। ফলত দেখা যায়, যে মানুষটা সারাবছর অজয়ের ধু ধু বালুর চরে একা একা চাষ করে, তারও রয়েছে এক বীজমন্ত্র। যে অল্পবয়সি বিধবাটি নদীর স্রোতে সারাদিন মাছ খোঁজে, রাত হলে সে-ই এলোচুলে শ্মশানচারিণী। আর এরকম হাজার হাজার তান্ত্রিক, উদাসী, অবধূতের জন্য তীর্থের সার তীর্থ হল তুষকাঠি নামে এই গ্রাম, যা নাকি আসলে এক কূর্মপীঠ। গোপন সাধকদের গোপন তীর্থ

I

হেমন্তের শুক্লপক্ষের ওই ক’দিন সারা রাত ধর্মরাজের থানে পুজো- আচ্চা চলে। কুয়াশা এবং তারার আলোর নীচে কিছু ছায়াশরীর অজয়ের ক্ষীণ জলধারায় অবগাহন সেরে নিয়ে মিলিয়ে যায় তীরভূমির জঙ্গলে। কে জানে, সেখানে কেমন তাদের হঠযোগ?

ওই ধর্মরাজের থানকে ঘিরেই মেলাটা বসে। একেবারেই গ্রামীণ মেলা। চারিপাশে চোদ্দো মাইলের মধ্যে তেমন পয়সাওলা লোকজন নেই বলে বড়ো বড়ো দোকানিরা কোনওদিনই এই মেলায় আসতে আগ্রহ বোধ করেনি, আজও করে না। বিদ্যুত নেই বলে বৈদ্যুতিক নাগরদোলা বসে না, আলো-ঝলমল সার্কাসের তাঁবুও দেখা যায় না। আসে কেবল কাঠ আর লোহার গেরস্থালি জিনিস, খাজা আর কদমার হালুইকর, মাটির বেহালা, তালপাতার পাখা, জলভরা রঙিন হাঁস, মাটির পুতুল, টিনের কামান— বছর বছর বাংলার অতীত ফিরে আসে এই মেলায়।

কাকতালীয়ভাবে মুনিয়ারা এখানে এসে পৌঁছেছে সেই মেলার মাঝখানে।

এসব দু’দিন আগের কথা।

আজ কৌশিক রাতদুপুরে বাড়ি ফিরে আসার পর মুনিয়া ওকে জিজ্ঞেস করেছিল কিছু খাবে কি না। ও মাথা নেড়েছিল। আসানসোল হলে মুনিয়া হয়তো কিছু বলত না। কিন্তু এটা তুষকাঠি বলেই সে আর দু’-একবার কৌশিককে খাওয়ার জন্য সাধাসাধি করল। কৌশিক সেসবের উত্তর না দিয়েই বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। পাশে শুয়ে মুনিয়ার ঘুম আসছিল না। বিছানায় শুয়ে শুয়েই সে পায়ের কাছের জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিল নদীর তীরে মেলার সারি সারি গ্যাসের আলো টিপ টিপ করে জ্বলছে। পৃথিবীটা এখন কেমন মায়াময় হয়ে আছে। অনেকদিন বাদে আবার তার মনে হচ্ছে কী সুন্দর এই বেঁচে থাকা। সে কি ওই সাদা ধুতি আর উড়নি গায়ে দেওয়া মানুষটার জন্য, লোকে যাকে ইদানীং সাধু বলে?

বহুক্ষণ ধরে একটা কথা মুনিয়া মনে মনেও উচ্চারণ করতে পারছিল না। এখন তার বুক ভেঙে সেই কথাটা বেরিয়ে এল, ‘ভগবান, ও কি আমার জন্যই সন্ন্যাসী হয়ে গেল?’

***

আসানসোল সদর থানার পিছনদিকের একটা নির্জন ঘর। ঘরটার সবক’টা জানালার পাল্লা শক্ত করে আঁটা। দরজার সামনেও সজাগ পাহারায় একজন কনস্টেবল।

ঘরের মধ্যে একটা ছোটো টেবিল। তার ওপরে ফাইলপত্র বিশেষ কিছু নেই, কেবল একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার। সি. আই. ডি.-র সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার মৃদুল মুস্তাফি সেই কম্পিউটারটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গুম হয়ে বসে ছিলেন। তার দুই হাতের মুঠো শক্ত, কপালে বিনবিনে ঘাম জমেছে।

মৃদুলবাবুর বয়স সাতান্ন। পুলিশের চাকরিতে বেশ নিচুতলা থেকে ঘষটে ঘষটে এতদূর উঠেছেন। স্বাভাবিকভাবেই মানবশরীর নিয়ে বীভৎসতা তিনি কম দেখেননি। বোমা বিস্ফোরণে হাত-পা উড়ে যাওয়া মৃতদেহ দেখেছেন, রেপ-ভিকটিমের ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখেছেন, অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ মৃতদেহের সারি দেখেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনে যা দেখছেন, তা বোধহয় বীভৎসতায় ওই সমস্ত দৃশ্যকে হার মানায়।

অথচ তা কোনও মৃত্যুদৃশ্য নয়, বরং নিরপেক্ষ বিচারে তাকে জীবনের উৎসবই বলা যায়। একটি অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল কিশোরীর নগ্ন শরীর ভিডিয়ো ক্যামেরা নানান অ্যাঙ্গেল থেকে ঘুরে ঘুরে সেই শরীরের ছবি দেখাচ্ছে।

এই ছবি দেখে যে মৃদুলবাবুর মতন দুদে পুলিশ অফিসারেরও গা গুলোচ্ছে তার কারণ, এটা কোনও সাধারণ ব্লু ফিল্ম নয়। ওই মেয়েটিও নয় কোনও গণিকা।

মেয়েটার বাড়ি এই আসানসোলেরই মহিশীলা পার্কে। ওর নাম দেবযানী মিত্র। বয়স আঠারো বছর সাত মাস। সবেমাত্র বি. এ. ফার্স্ট ইয়ারে অ্যাডমিশন নিয়েছিল।

দেবযানী তিনদিন আগে সুইসাইড করেছে। কারণ ওর ওই ছবিগুলো কেউ একটা জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কে অ্যাটাচ করে দিয়েছিল।

দেবযানী কোনও সুইসাইড নোট লিখে যায়নি। সেটাই স্বাভাবিক। সম্ভবত কোনও বান্ধবীর কাছ থেকে নেটে ছবি চালাচালির খবর পাওয়ামাত্রই সে আগে নিজের ল্যাপটপে খবরটার সত্যতা যাচাই করেছিল। ওর সার্চ হিস্ট্রির মেনুতে এখনও স্ক্রল করলে দেখা যাবে সেই ছবি। নিজের গোপনতম গোপন মুহূর্তগুলোকে এইভাবে বাজারের পণ্য হয়ে যেতে দেখে মেয়েটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। যে-ই এ কাজটা করে থাকুক, সে যে কত বড়ো শয়তান তার একটা প্রমাণ যে, সে শুধু ভিডিয়োগুলো অ্যাটাচ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার সঙ্গে দেবযানীর পুরো প্রোফাইল দিয়ে দিয়েছিল— ওর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর স-অ- অ-ব। ফলে পনেরো মিনিটের মধ্যে দেবযানীর মোবাইলে ফোন আসতে শুরু করেছিল। ভাষা বিভিন্ন হলেও কলগুলোর বক্তব্য মোটামুটি এক- ‘তোমার শরীর খুব সুন্দর। তোমাকে বিছানায় পেতে চাই। রেট কত?’

এরপরেই মেয়েটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওদের ফ্ল্যাটের সাততলার ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরেছিল। এক্ষেত্রে গুছিয়ে লেখা সুইসাইড নোট আশাই করা যায় না। তাছাড়া এটা কি নিছক সুইসাইড? এর চেয়ে নিষ্ঠুরভাবে কোনও মেয়েকে হত্যা করা যায় কি?

অতএব প্রশ্ন থেকেই যায়? কে সেই প্ররোচক? কী ছিল তার মোটিভ?

মৃদুলবাবু শখের গোয়েন্দা নন, পুলিশ। তাই তিনি খুব প্রথাগত পথে তদন্ত শুরু করলেন। প্রথমে জানবার চেষ্টা করলেন, কোন মেইল অ্যাড্রেস থেকে ওই নগ্ন ছবিগুলো নেটে ছড়ানো হয়েছে। উত্তর এল, আসানসোলেরই একটা সরকারি অফিসের ইমেইল অ্যাড্রেস থেকে। সময়টা সন্ধ্যা সাতটার পর, যখন ওই অফিস তালাবন্ধ থাকে। স্পষ্টতই অ্যাড্রেসটা হ্যাক করে বার করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল পাসওয়ার্ডটাও ওই অফিসের। অতএব ওইদিকে তদন্তের পথ বন্ধ হয়ে গেল।

এরপর মৃদুল মুস্তাফি, দেবযানীর বাবা, মা এবং দিদির সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁদের যা যা প্রশ্ন করলেন, এবং যা উত্তর পেলেন তার সারমর্ম হচ্ছে, পরিবারটার মধ্যে কোনও বাঁধন বা শৃঙ্খলা কিছুই নেই। দেবযানীর বাবা, মা আর দিদি তিনজনেই চাকরি করেন। তাই দুপুরে দেবযানী কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তার ওপরে ওঁদের নজর রাখা সম্ভব ছিল না। ভিডিয়োতে যে ঘর, যে বিছানা দেখা যাচ্ছে তা দেবযানীর নিজের ঘর, নিজের বিছানা। এই কথাটা জানার পর মৃদুলবাবু লুকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হোটেল হলে খোঁজখবর নেওয়া যেত। হোটেলের কর্মচারীদের কাছে মেয়েটার ছবি দেখিয়ে পুরুষসঙ্গীটির একটা ডেসক্রিপশন বার করে নেওয়া যেত। কিন্তু আপাতত সে আশাতেও চিটেগুড়।

দেবযানীর মোবাইলের কলবুকে একটা নম্বর থেকে প্রচুর কল এস‍ এস. এম. এস. এসেছে। সেই নম্বরটাতেই দেবযানীও অনেক কল করেছে। স্পষ্টতই এই সেই প্রেমিকের নম্বর। সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, নম্বরটা সিকিমের। সেস্তূপ সামা নামে জনৈক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর নামে সিমকার্ডটা কেনা হয়েছিল। শিলিগুড়ির পানের দোকানগুলোতে পয়সা দিলে যে এরকম জাল নাম-ঠিকানার সিমকার্ড পাওয়া যায়, সে কথা মৃদুলবাবুর জানা ছিল। অতএব ওদিকেও তিনি আর পণ্ডশ্রম করলেন না। আরও একটা জিনিস জানা গেল- কলগুলো সব এই আসানসোলের টাওয়ার থেকেই করা। তবে এটা তো আন্দাজ করাই যাচ্ছিল। এমন শারীরিক প্রেম তো দূরে বসে করা যায় না। অতএব সেই গোপন প্রেমিক এই আসানসোলেরই বাসিন্দা, পার্মানেন্ট অথবা টেম্পোরারি।

দেবযানীর মা একটা তথ্য দিলেন। যেদিন দুর্ঘটনাটা ঘটেছে, তার থেকে ঠিক এক সপ্তাহ আগে দেবযানী কলেজ-এক্সকার্শনের নাম করে ওঁর কাছ থেকে চার হাজার টাকা নিয়েছিল। দেবযানীর নিজস্ব একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন ওর বাবা, যাতে ওঁদের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ কোনও প্রয়োজনে দেবযানী ডেবিট কার্ডে টাকা তুলে নিতে পারে। সেখানে প্রায় হাজার পঁচিশেক টাকার ব্যালেন্স সবসময়েই থাকে। তবু মেয়ে তাঁর কাছে টাকা চাইছে কেন ভেবে ওর মা একটু অবাক হয়েছিলেন। মেয়েকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন সে কথা। তাতে দেবযানী নাকি উত্তর দেয়, এ. টি. এম.-এ বড়ো নোট, মানে পাঁচশো-হাজার টাকার নোটে পেমেন্ট দেয়। অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষ ওদের বলেছে একশো টাকার নোটে ফি জমা দিতে। ওর মা আর কিছু না বলে টাকাটা দিয়ে দিয়েছিলেন।

দেবযানীর কথাটা যে একটা তাড়াতাড়িতে বানানো হাস্যকর মিথ্যে অজুহাত সেটা বুঝতে মৃদুলবাবুর অসুবিধে হল না। তিনি দেবযানীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে খোঁজ নিলেন এবং যখন দেখলেন যে সেখানে এক পয়সাও ব্যালেন্স নেই তখন একটু নিশ্চিন্তই হলেন। তা হলে ব্ল্যাকমেইল্ড হচ্ছিল মেয়েটা। এবং যে মুহূর্তে ছেলেটাকে আর টাকা জোগাতে পারেনি, সেই মুহূর্তেই ছেলেটা ওর সর্বনাশ করে দিয়েছে। মোটিভটা পাওয়া গেল। কিন্তু কালপ্রিটকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে তো এখনও হাতে রইল পেনসিল… থুড়ি, কিবোর্ড।

থানার বাইরের চায়ের দোকানের ছেলেটা গ্লাসে চা দিয়ে গিয়েছিল। সেই চায়ে একটা চুমুক দিয়ে মৃদুলবাবু আবার নতুন করে ভিডিয়োটা দেখতে বসলেন। একবার না ভেবে পারলেন না যে, মানুষের যৌনতা ব্যাপারটা কী ভীষণ মনের সঙ্গে জড়িত। শুধু এই তথ্যটুকু যে, মনিটরের ওই নগ্নিকা আত্মহত্যা করেছে, ছবিগুলো থেকে সমস্ত উত্তাপ হরণ করে নিয়েছে। তাঁর নিজের পুরুষত্বকে একটুও উত্তেজিত করছে না ওই সদ্যযুবতির শরীর। যেন হাতে উঠে আসা তেরোটা তাসকে দেখছে এক জুয়াড়ি, এমন শীতল মনোযোগেই দেবযানীর ছবির ফ্রেমগুলোকে দেখছিলেন মৃদুলবাবু।

কম্পিউটারে কিছু অ্যাডজাস্টমেন্টের ফলে ছবিগুলো এখন খুব ধীরগতিতে একটার পর একটা ফ্রেম হিসেবে তার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। প্রত্যেকটি ফ্রেমকে তিনি খুঁটিয়ে দেখছেন, যদি কোনও তথ্য পাওয়া যায় ব্ল্যাকমেইলারটার সম্বন্ধে। নাহ্। অত্যন্ত ধূর্ত এই ফটোগ্রাফার। কোত্থাও সে নিজে ধরা দেয়নি। একটা রুমাল, একটা সানগ্লাস, ছেড়ে রাখা জামা, এমন কিচ্ছু নেই কোনও ফ্রেমের মধ্যে যার থেকে তাকে কোনওভাবে আইডেন্টিফাই করা যায়।। ক্রমশ হতাশা গ্রাস করছিল সি. আই. ডি.-র পোক্ত অফিসারটিকে। হঠাৎ একটা ফ্রেম তাঁর চোখের সামনে দিয়ে চলে যেতেই খাড়া হয়ে বসলেন মৃদুলবাবু। মাউসের একটা ক্লিকে আবার ফ্রেমটাকে ফিরিয়ে আনলেন মনিটরে। তারপরে ফ্রিজ করে দিলেন সেটাকে।

আহ্, এই তো! এই তো তিনি যা চাইছিলেন। একটা হাত। পুরো হাতও নয়, কবজির ওপর থেকে বাহু অবধি সামান্য অংশ। ডানহাতে ভিডিয়ো ক্যামেরাটা ধরে বাঁ-হাত দিয়ে লোকটা নিশ্চয়ই মেয়েটার অবস্থান ঠিক করতে গিয়েছিল। সেই সময়েই বাড়িয়ে ধরা বাঁ-হাতের কিছুটা অংশ এই ফ্রেমটার মধ্যে চলে এসেছিল। মৃদুলবাবু মনিটরের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। পাওয়া যাবে না? কোনও সূত্রই কি পাওয়া যাবে না এই ছবিটা থেকে? কোনও আইডেন্টিফিকেশন মার্ক? কোনও ক্ষতচিহ্ন? জরুল?

নাহ্। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। মৃদুলবাবু ফ্রেমটাকে জুম করে শুধু হাতটাকে অনেকগুণ বর্ধিত করে তুললেন। আরে! ওই দাগগুলো কীসের? কনুইয়ের একটু ওপরে খুব ছোটো ছোটো লালচে ফোঁটাগুলো? আশেপাশে একইরকম ছোটো ছোটো দাগ, একটু কালো হয়ে এসেছে। সিরিঞ্জের পাংচার-মার্ক। কোনও ভুল নেই এতে। বার বার ছুঁচ ফোটানোর ক্ষতচিহ্ন ওগুলো। কোনওটা টাটকা, আবার কোনওটা শুকিয়ে এসেছে। ছেলেটা ড্রাগ-অ্যাডিক্ট।

মৃদুলবাবু টেবিল থেকে ফোনটা তুলে এক্সটেনশন নাম্বার ডায়াল করে সদর থানার ও. সি. বিপুল সরকারকে ডাকলেন, ‘একটা জিনিস দেখে যান, মিস্টার সরকার। মজার জিনিস।’ তাঁর গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছিল এখন তিনি অনেক রিল্যাক্সড।

সন্ধের মধ্যে সদর থানার লকআপে শহরের ন’জন ড্রাগ পেডলারকে ঘাড় ধরে বসিয়ে দিলেন বিপুল সরকার। হাতে দেবযানীর একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে সেখানে ঢুকলেন মৃদুল মুস্তাফি।

ন’জনের মধ্যে তিনজন পেডলার ফটো দেখে দেবযানীকে চিনতে পারল। বলল, মেয়েটাকে একজন খরিদ্দারের সঙ্গে ঠেকে আসতে দেখেছে। সেই তিনজনের কাছ থেকে যা ডেসক্রিপশন পাওয়া গেল তাতে খরিদ্দারটি লম্বা, রোগা, গায়ের রং ফরসা। বয়স চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হবে। তবে তাকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় মাথার চুল। একদম স্প্রিং-এর মতন কোঁকড়া চুল ছিল ছেলেটার।

আরও জানা গেল, গত তিন দিন ছেলেটা মালের সাপ্লাই নিতে আসেনি।

মৃদুল মুস্তাফি পেডলারদের থেকে যা জানবার জেনে নিয়ে বিপুলবাবুকে বললেন, ‘এদের ছেড়ে দিন। মিস্টার সরকার। তারপর একটু আমার সঙ্গে বেরোবেন।’

জিপটাকে থানার বাইরে বার করে ও. সি. বিপুল সরকার বললেন, ‘কোনদিকে যাবেন, স্যার?’

‘ছেলেটা যদি ট্রেনে বা বাসে করে কোথাও পালিয়ে গিয়ে থাকে তা হলে লোকেট করতে সময় লাগবে। তবে যদি গাড়ি ভাড়া করে গিয়ে থাকে… আচ্ছা, এখানকার ট্যাক্সিস্ট্যান্ডটা কোথায়?’

‘স্টেশনেই ম্যাক্সিমাম গাড়ি দাঁড়ায়।’

‘তা হলে চলুন, স্টেশনের দিকেই যাই।’

ট্যাক্সি অ্যাসোসিয়েশনের ঘরে অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি রতন কোঙার দুই পুলিশ অফিসারকে মহা সমাদর করে ডাবের জল-টল খাওয়ালেন। মেম্বারদের কাছে কোঁকড়া চুল, ফরসামতন প্যাসেঞ্জারের খোঁজটাও তিনিই করে দিলেন। পনেরো মিনিটের মধ্যে বছর পঁচিশের একজন ড্রাইভারকে নিয়ে মৃদুলবাবুদের সামনে হাজির করলেন সেক্রেটারিসাহেব। মুখে সাফল্যের হাসি। বললেন, ‘এই যে, স্যার, শ্যামল। উনচল্লিশ শূন্য ছয় গাড়িটা চালায়। ও-ই নিয়ে গিয়েছিল। কী জিজ্ঞেস করবেন ওকে জিজ্ঞেস করুন… না, না, কিচ্ছু লুকোবে না, স্যার। ওর কী স্বার্থ, বলুন?’

একটু পরে থানার দিকে ফিরতে ফিরতে মৃদুলবাবু বললে, ‘আজ রাত হয়ে গেছে। কাল সকালেই তা হলে আমরা রওনা হয়ে যাব তুষকাঠি। শ্যামল, তুমি আজ তোমার গাড়ি নিয়ে থানা কম্পাউন্ডেই থাকো। আর তোমার মোবাইল ফোনটাও আমাকে দিয়ে দাও। কিছু মনে কোরো না, সামান্য সাবধানতা আর কী!’

***

হেমন্তের পূর্ণিমা আজ। মেলার শেষদিন।

মুনিয়া দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পরে কিছুক্ষণ নীচে বাবার কাছে বসেছিল। বাবা ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘তুই ভালো আছিস তো, মা? এত রোগা হয়ে গেছিস কেন বল তো?’ তারপরে একটু ইতস্তত করে একেবারেই অপৌরুষেয় একটা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কৌশিকের সঙ্গে তোর মিলমিশ আছে তো?’

মনের দুঃখ মনে লুকিয়ে রেখে মুনিয়া বাবার হাঁটুতে চিবুক রেখে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘হঠাৎ এই কথা?’

‘না… দু’জনে কীরকম যেন ছাড়া ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছিস।’

‘ওসব কিছু না, স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে মাঝে মাঝে মন-কষাকষি তো হবেই। তোমাকে অত ভাবতে হবে না।’

বিপত্নীক, হৃরোগে জর্জরিত মানুষটাকে কোনও দুঃখের কথাই জানাবে না মুনিয়া। এ ব্যাপারে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জানালে মানুষটা বাঁচবে না।

একটু বাদে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে মুনিয়া দোতলায় নিজের ঘরে উঠে এসেছিল। কৌশিক যথারীতি কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার ফিরেছিল। স্নান করল না। ভাতের থালার সামনে নাম-কা- ওয়াস্তে একবার বসল। মুখে প্রায় কিছুই তুলল না। মুনিয়ার বুক ভেঙে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এই মানুষটাকে সে কিন্তু ভালোবাসার কম চেষ্টা করেনি। একে জড়িয়ে ধরেই রঞ্জনের শোক ভুলতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছুই হল না। বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজে মুনিয়া ভাবছিল, তার মতন কপাল ক’টা মেয়ের হয়? একদিকে এক সন্ন্যাসী, আর-একদিকে মাদকাসক্ত। দু’জনের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত অস্তিত্ব।

বালিশের নীচে কী যেন গোঁজা আছে, শক্ত জিনিসটা মুনিয়ার গালে বিধছিল। সে হাত গলিয়ে বুঝল, কৌশিকের সেলফোন। মুনিয়া ওটাকে বালিশের নীচ থেকে বার করে আনল। এই তুষকাঠি গ্রামে জিনিসটার কোনও উপযোগিতা নেই। সেইজন্যই কৌশিক এটা ফেলে গেছে। বালিশে মাথা রেখে মুনিয়া অন্যমনস্ক ভাবেই ফোনটার মেনু বাটনে হাত দিল। সে অন্যমনস্কভাবেই ক্লিক করল ক্যামেরা অপশনে। সেখান থেকে আর এক ক্লিকে পৌঁছে গেল ফটো অ্যালবামে। মোবাইলে স্টোর করে রাখা ছবিগুলো এক এক করে দেখতে লাগল।

বেশিরভাগ ছবিই নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটের ছবি। ক্লায়েন্টদের দেখাবার জন্য বোধহয় তুলে রেখেছে কৌশিক। একটা ছোটো হাই তুলে ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল মুনিয়া। হঠাৎ শেষ ছবিটায় চোখ পড়তেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল। মনে হল তাকে যেন সাপে ছোবল মেরেছে। আরে! এই মেয়েটার মুখটা তো চেনা। কে যেন? কে যেন?

দেবযানী। দেবযানী মিত্র। সেদিন দুপুরে কৌশিক যখন ঝড়ের মতন ঘরে ঢুকেছিল, বলেছিল প্রাণ বাঁচাতে ও তুষকাঠিতে গিয়ে লুকোবে, সেই মুহূর্তে টেলিভিশনের প্রত্যেকটা চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে এই মেয়েটার আত্মহত্যার খবর দেখাচ্ছিল।

হ্যাঁ, কোনও ভুল নেই। সেদিন আরও লক্ষ লক্ষ মানুষের মতন শোকে, আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ ধরে এই মুখ দেখেছে মুনিয়া। মনে মনে ভেবেছে, কী ভুল যে করতে পারে এই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছোনো মেয়েগুলো! এত হিংস্রই বা কেমন করে হতে পারে কোনও পুরুষ? অনেকক্ষণ ধরে অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখেছিল বলেই মুনিয়ার বুকের মধ্যে মেয়েটার ছবি আর তার করুণ পরিণতি গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে সেই মেয়েটারই অন্য একটা ছবি, একটু পাশ থেকে তোলা। উজ্জ্বল হাসিতে ভরে আছে দেবযানীর মুখ। প্রাণশক্তি যেন উপচে পড়ছে মুখের প্রত্যেকটা রেখা থেকে। ও জানত না, ওই প্রাণশক্তিই তাকে মৃত্যুর দিকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে যাবে। মানে, কৌশিক হালদারের দিকে।

দেবযানীর মৃত্যু আর কৌশিকের পলায়ন— এই দুটো ঘটনাকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলতে খুব বেশি সময় লাগল না মুনিয়ার। কৌশিক… কৌশিকই তার মানে হত্যাকারী!

মুনিয়া অনেকক্ষণ ধরে ভাবল, এরপর সে কী করবে? সে কি সকলকে জানিয়ে দেবে ওই খুনিটার স্বরূপ? এইভাবে তার নিজের জীবনটাকে, তার অসুস্থ বাবার জীবনটাকে শেষ করে দেবে?

না কি সে গোপন করে যাবে পুরো ব্যাপারটাই? তার বদলে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত এক কামুক বদমাশের সঙ্গে দিনযাপনের যন্ত্রণা সহ্য করবে?

কে তাকে বলে দেবে কোনটা ঠিক রাস্তা?

***

মুনিয়া রঞ্জনের বুকের ওপর মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদছিল। ঘুঘু ডাকছিল বাইরের বাগানে।

রঞ্জন শূন্যদৃষ্টিতে চেয়েছিল তার বুকের ওপর রাখা এলোমেলো চুলে ভরা মাথাটার দিকে। সে মুনিয়ার মুখ দেখতে পাচ্ছিল না। দেখতে পাচ্ছিল ওর সিঁথিটা। সেই সিঁথিতে বাসি সিঁদুর; না কি আগুনের রেখা, যাতে হাত রাখলেই হাত পুড়ে যাবে?

মুনিয়া যতক্ষণ কাঁদছিল, ততক্ষণ রঞ্জন শরীরের দু’পাশে দুই হাত ঝুলিয়ে পাথরের মতন দাঁড়িয়েছিল। আজকাল তার চৈতন্য বেশিরভাগ সময়েই কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে থাকে। খুব চেনা মুখকেও মাঝে মাঝে অচেনা লাগে, আবার অচেনা মুখকে চেনা। এই মেয়েটা, যে এখন তার বুকের ওপর মাথা রেখে কাঁদছে, এ কে? কাঁদছে কেন ও?

কিছুক্ষণ বাদে মুনিয়া একটু শান্ত হলে রঞ্জন তার মুখটা দু’হাতের মধ্যে তুলে ধরল। তারপর তীব্র অভিনিবেশে তাকিয়ে রইল সেই মুখের দিকে। তার বুকের ভেতর কোথায় যেন শুকনো বালির কুণ্ডে ঝিরঝির করে জল জমতে শুরু করল। কেন এমন হচ্ছে? এ কে?

রঞ্জন আজকাল খুব শান্তি খোঁজে, কিন্তু পায় না। তার মাথার ভেতরটা সবসময়ে কেমন যেন জ্বালা করে। রঞ্জন তুষকাঠি গ্রাম পেরিয়ে চলে যায় অজয়ের তীরে। সেখানে গভীর রাতে যারা আসে তারা কেউ মুনিয়াকে চেনে না। তারা কেউ মানুষি ভালোবাসার কথা বলে না। বলে অনেক দূরের রহস্যময় জগতের কথা। তারা রঞ্জনকে নিয়ে তন্ত্রের মণ্ডলের ধারে বসিয়ে রাখে। সেখান থেকে রঞ্জন আবার উঠে যায় অন্য কোনও ছায়াশরীরের কাছে, সেখান থেকে আবার আর-এক জায়গায়। কেউ একা বসে থাকে, আবার কোথাও দু’জন নারীপুরুষ। দলবদ্ধভাবেও সাধকেরা দাঁড়িয়ে থাকে কোথাও কোথাও। কেউ নারী নিয়ে সাধনা করে, কেউ শবদেহ নিয়ে। নিভন্ত হোমের কুণ্ডের মধ্যে ফটাস শব্দ করে ফেটে যায় শ্মশান থেকে তুলে আনা করোটি। কোথাও আগুনে দেশি মদের আহুতি পড়লে পড়লে দপ দপ করে জ্বলে ওঠে নীল শিখা।

এই সবই রঞ্জনের ভারী পছন্দ। তার মাথার মধ্যে নিরন্তর যে অর্থহীন যে ছবিগুলো ভেসে যায়, তাদের সঙ্গে অজয়ের তীরের এই কায়াসাধকদের সাধনপদ্ধতির ভারী মিল। এদের মনের ভেতরেও তার মতন একটা জ্বালা আছে। এরাও মনে হয় শান্তির খোঁজেই এত সব করে বেড়াচ্ছে। এরাই তা হলে তার আত্মীয়— ভাবে রঞ্জন।

সে খুব একটা ভুল ভাবে না। ভালোবাসাটা বোধহয় পারস্পরিক। ওইসব হঠযোগীরাও রঞ্জনকে ভালোবাসে, কাছে ডাকে। কেউ কেউ বলে, ‘তুমি বাবা আমাদের থেকে অনেকটা এগিয়ে গেছ।’ তারাই কেউ কেউ রঞ্জনকে নানারকম ক্রিয়াকরণের কথা বলে। রঞ্জন ঘরে বসে হোম করে, শিবাভোগ দেয়। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে থেকে থেকে তার মনকে প্লাবিত করের দিয়ে চলে যায় দুটো পানের পাতায় ঢাকা মিষ্টি একটা মুখ— মুনিয়ার মুখ।

সেই মুখ আজ স্বপ্ন থেকে বাস্তবে, তার বুকের ওপরে। মনে হচ্ছে ও কোনও কারণে খুব ভয় পেয়েছে। ওকে আগলে রাখা দরকার। রঞ্জন প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন?’

মুনিয়া তার আঁচলের আড়াল থেকে কৌশিকের সেলফোনটা বার করে। তারপর দেবযানীর ছবিটা রঞ্জনকে দেখায়। বলে যায় কৌশিক নামে এক অমানুষের কাহিনি।

শুনতে শুনতে রঞ্জনের মাথার মধ্যে মেঘটা আবার ফিরে আসে। তার চিন্তাশক্তি আবিল হয়ে যায়। এত জটিলতা তার ভালো লাগে না। তার ভালো লাগে অজয়ের বিস্তীর্ণ বালুচরে দুটো কাদাখোঁচা পাখির ভালোবাসাবাসি দেখে দুপুর কাটাতে। তার ভালো লাগে রাতের অন্ধকারে তুষকাঠির কূর্মপীঠে ঘুরে ঘুরে হঠযোগীদের ক্রিয়াকলাপ দেখতে। কিন্তু এসব কোন পৃথিবীর কথা বলে যাচ্ছে এই মেয়েটা? নগ্ন ছবি! আত্মহত্যা! রঞ্জনের মাথার মধ্যে এক জ্বলন শুরু হয়। সে বেশ জোরেই বলে ওঠে, ‘মুক্তি চাস? মুনিয়া, তুই কি কৌশিকের হাত থেকে মুক্তি চাস?’

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য মুনিয়াকে এক মুহূর্তও ভাবতে হল না। সে অনুচ্চ কিন্তু দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল।

‘চাই।’

***

রাতের মেলার সঙ্গে দুপুরবেলার মেলাতলার চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

আলোয়, গানে, হাজার গলার চিৎকারে, নাগরদোলার ক্যাঁচকোঁচ শব্দে, ভেঁপুর পোঁয়ে, জিলিপির কড়াই থেকে ওঠা সস্তা তেলের গন্ধে, কার্বাইড ল্যাম্পের গ্যাসের গন্ধে, আর সর্বোপরি মানুষের পায়ে পায়ে গুড়া ধুলোয় সন্ধে থেকে রাত যে মেলা ভরে থাকে, এখন এই সকালে তার কিছুই নেই।

মুনিয়ার শেষ কথাটা মাথায় নিয়ে দুপুরের সেই নিদ্রাচ্ছন্ন মেলার মাঠ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল রঞ্জন— একাই।

একটা উন্মাদ ক্রোধ তাকে একরকম ছুটিয়ে নিয়ে চলেছিল। মনে মনে সে জপছিল— খারাপ লোক, খারাপ লোক ওই কৌশিক হালদার। সে আমার মুনিয়াকে কষ্ট দিচ্ছে। ও মুনিয়াকে মেরে ফেলবে।

কীভাবে সে কৌশিকের হাত থেকে মুনিয়াকে রক্ষা করবে, তার কোনও ধারণা রঞ্জনের ছিল না। তবে যে-কোনও সংকটে সে যার কাছে যায়, এখনও সে তার কাছেই চলেছিল। তার হয়ে যা কিছু করার বেদেবুড়োই করবে। সে-ই মুনিয়াকে রক্ষা করবে, মুক্তি দেবে সব অপমান আর কষ্টের হাত থেকে।

রঞ্জনের হেঁটে যাওয়াটা তাই দিশাহীন ছিল না। দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল, লক্ষ্য স্থির রেখেই সে হাঁটছে।

কোনও এক সিদ্ধপুরুষের পত্তন করা এই মেলার বয়স নাকি দেড়শো বছরের কাছাকাছি। ক্রেতা এবং বিক্রেতা সকলেই বহু বছর ধরে বংশপরম্পরায় এখানে আসছে। আজ যে ছেলেটা নাগরদোলার বাঁ- পাশে বসে মাটির বেহালা বিক্রি করছে, পঁচিশ বছর আগে ওর বাবা ঠিক ওইখানটাতেই বসে মাটির বেহালা বিক্রি করেছিল। আজ যে বাচ্চাটা ছেঁড়া প্যান্টলুনের পকেট থেকে পয়সা বার করে ওর কাছ থেকে বেহালা কিনল, পঁচিশ বছর আগে তার বাবা ওইখানে দাঁড়িয়ে, ঠিক ওইভাবে বেহালা কিনেছিল।

কোন দোকানটা কোথায় বসবে, কোন ম্যাজিকওলা কোথায় তাঁবু খাটাবে— সব পূর্বনির্দিষ্ট। আর আজন্ম দেখছে বলে রঞ্জনের মস্তিষ্কের ভেতরেও তার গভীর ছাপ। শত উন্মাদনার মধ্যেও সে যেমন তৃষ্ণার জল কিম্বা ক্ষুধার অন্নকে ভোলে না, তেমনই ভোলে না এই হৈমন্তী মেলার অমুদ্রিত মানচিত্র।

অতএব নির্ভুলভাবে সে হেঁটে চলল মেলার পূর্বসীমানার দিকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল অদ্ভুত এক তাঁবুর সামনে।

তাঁবুটা অদ্ভুত অনেকগুলো কারণে।

প্রথমত, এত বিচিত্র বর্ণের তাঁবু গোটা মেলায় আর একটাও নেই। যদিও বয়সের ভারে রংগুলো জ্বলে গেছে।

আর দ্বিতীয়ত, তাঁবুর সামনের দিকটায় একটা উঁচু মঞ্চ বাঁধা রয়েছে। এরকমটাও সচরাচর দেখা যায় না। সার্কাসই হোক আর ম্যাজিক, মরণকূপই হোক আর মাকড়শা-মেয়ে— সকলেই খেলা দেখায় তাঁবুর ভেতরে। এরা তা হলে কারা, যারা তাঁবুর বাইরে খোলা আকাশের নীচে খেলা দেখায়?

রঞ্জনের ডাকে দু’জন মানুষ নিচু দরজার পর্দা সরিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে এল। একজন বুড়ো, মুখের চামড়ায় তার অজস্র ভাঁজ, চুলগুলো তুলোর মতন সাদা, কিন্তু শরীরটা পাকা বাঁশের মতন ছিপছিপে আর সটান।

আর-একজন বুড়ি। বুড়োর সম্বন্ধে যা যা বলা হল, সেই সবই এর সম্বন্ধেও বলা যায়। অর্থাৎ বয়স হয়েছে প্রচুর, কিন্তু বয়সের ভার কাবু করতে পারেনি।

দু’জনেরই জামাকাপড় বহুবর্ণে রঞ্জিত। বুড়ির পরনে ঘাঘরাজাতীয় পোশাক, বুড়োর লুঙ্গি আর ফতুয়া। দু’জনেরই গলায় ছড়ার পর ছড়া রঙিন পাথরের আর পুঁতির মালা, বুড়োর কানে মাকড়ি, বুড়ির হাতে পায়ে মোটা মোটা রুপোর গয়না। উপরন্তু বুড়ির হাতে, পায়ে এমনকি পালে অবধি অজস্র উল্কির ছাপ।

ওরা বেদে আর বেদেনি। বেদেদের তাঁবু এটা।

বুড়ো আর বুড়ি ওদের দলের প্রধান। রঞ্জনকে যেমন সমাদর করে ওরা তাঁবুর ভেতরে নিয়ে গেল, তাতে বেশ বোঝা গেল ওদের আলাপ এক-আধ বছরের নয়।

বাইরের উজ্জ্বল আলো থেকে তাঁবুর ভেতরে অন্ধকারে ঢুকেই রঞ্জনের চোখে ধাঁধা লেগে গেল। কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে দৃষ্টিকে সইয়ে নেওয়ার পর সে দেখতে পেল ভেতরের সুপরিসর মাটির মেঝেয় ছেঁড়া কার্পেটের ওপর শুয়ে আছে আরও আটজন নারী-পুরুষ। সকলেই নিদ্রাতুর।

দৃশ্যটা দেখে আপনমনে হাসল রঞ্জন। এদের পক্ষে এত বেলা অবধি ঘুমোনোটা অস্বাভাবিক নয়। ওরা পেশাগত কারণেই অনেক রাতে ঘুমোয়। রাত একটা দেড়টা অবধি এই তাঁবুর বাইরের মঞ্চে ওরা পুতুলনাচ দেখায়।

ছোটোবেলা থেকেই রঞ্জন ওই পুতুলনাচ দেখে আসছে। প্রচলিত পুতুলনাচ থেকে একটু অন্যরকমের এই নাচ। এরা ওপর থেকে সুতোর সাহায্যে ছোটো ছোটো পুতুলকে নাচায় না; মানুষ প্রমাণ বড়ো বড়ো পুতুলকে কোমরের নীচ থেকে তুলে ধরে ঘোরায়-ফেরায়। নিজেরা থাকে মঞ্চের নীচে টিনের শিট দিয়ে আড়াল করা অংশে। সেখান থেকে পুতুলগুলোকে মাথার ওপর তুলে ধরে নাচায়।

পুতুলগুলো হালকা পেপার ম্যাশে জাতীয় জিনিস দিয়ে তৈরি অনেকটা পোশাকের দোকানের প্লাস্টিকের ম্যানিকিনের মতন করে বানানো। চরিত্র অনুযায়ী সেইসব ন্যাড়া বোঁচা পুতুলের মুখে চুলদাড়ি লাগানো হয়। রাজা সাজালে বাবরি চুল আর পাকানো মোচ; ঝলমলে শেরোয়ানি চুড়িদার। একই পুতুলকে অন্য পালায় প্রয়োজনমতো জটাজুট লাগিয়ে গেরুয়া পোশাক পরিয়ে সন্ন্যাসী বানিয়ে দেওয়া যায়, এমনকি শাড়ি, লম্বা কেশদাম এবং নকল স্তনের সাহায্যে রানি।

পুতুলের কোমরের নীচে একটা বাঁশের লাঠির মতন কিছু গোঁজা থাকে, যেটা ধরে তাদের নাচানো যায়। দর্শকরা সামনে থেকে দেখতে পার টিনের শিটের ওপরে জেগে থাকা কোমরের ওপরে অংশটুকু।

পুতুলদের হয়ে কথাবার্তা, গান-টান যা কিছু, সেসব ওই বেদেরাই আড়াল থেকে চালিয়ে যায়।

নিতান্তই গ্রাম্য বিনোদন। এককালে যখন টিভি, সিনেমা এইসব ছিল না তখন এই পুতুলনাচ লোক টানত। এখন শহরাঞ্চলে নিশ্চয়ই পাত্তা পায় না। তবে তুষকাঠির মতন অজগ্রামে এখনও কিছুটা চাহিদা আছে এই সমস্ত বিনোদনের।

এই পুতুলনাচ দেখানোটা বেদেদের জীবিকা না ধর্ম বলা মুশকিল। ধর্মীয় নিষ্ঠায় ওরা এই কাজ করে।

হাজার জমিজিরেত দিলেও ওরা চাষ করবে না, স্থায়ী ঘর বাঁধবে না। ওরা যাযাবরের জীবনই যাপন করবে। মেলা থেকে মেলায় ঘুরে ঘুরে খেলা দেখিয়ে বেড়াবে। বছরের পর পছর কেটে যায়, যুগের পরে যুগ। কত লোকশিল্পে কতরকমের বেনোজল ঢুকে যায়। কিন্তু ওদের পুতুলের পালাগানে কোনও বদল আসে না। বদল আসে না পুতুলগুলোর চেহারায় কিম্বা সাজপোশাকেও। অদ্ভুত কিছু প্রেম, প্রতিহিংসা আর পুনর্মিলনের গল্প। নায়ক-নায়িকাদের নামগুলো হিন্দু পুরাণ বা রূপকথার কোনও চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। যাঁদের পড়াশোনা বেশি, তাঁরা বলেন ইরানি- তুরানি লোককথার গল্প ওসব। এই বেদেরাও আদিতে ইরানি। মনে হয় কথাটা সত্যি। এত দারিদ্র্যের মধ্যেও এই বেদে নারী-পুরুষদের শরীরের সৌন্দর্য দেখবার মতন। ওদের পাকা গমের মতন গায়ের রং, টানা টানা নাক চোখ, আর ঈষৎ বাদামি চুলের মধ্যে মধ্য-এশীয় লক্ষণাবলি ভারী স্পষ্ট। অবশ্য ওদের এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলে ওরা বলে, ওরা নাকি রাজা ভোজের বংশধর— সেই রাজা ভোজ, যাঁর নাম থেকে ম্যাজিকের আর-এক নাম ‘ভোজবাজি’। সেই অর্থে পুতুলনাচ দেখানোটা ওদের ধর্ম। ওরাও একধরনের সাধক। এবং তুষকাঠিতে আগত অন্যান্য গৌণ ধর্মের লোকেদের মতন ওরাও ভারী রহস্যময়।

যেমন ধরা যাক এই ব্যাপারটাই যে, শরীর নিয়ে ওদের কোনও ছুঁৎমার্গ নেই।

বেদে পরিবারের যুবতিরা মেলায় আগত রসিক পুরুষদের কাছে বহুদিন ধরেই আনন্দের উৎস। অবশ্য শুধু রসিক হলেই হবে না, অর্থবানও হতে হবে। সুন্দরী এবং কামকলায় নিপুণা ওই মেয়েদের একধরনের স্বর্গবেশ্যা বলা চলে। ওদের জন্য বিগত যুগে বহু শ্রেষ্ঠী এবং সামন্তরাজা রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে মেলায় এসেছে বলে শোনা যায়। যারা সোনার মোহরে তাদের মূল্য চোকাতে পারে তেমন কেউ কেউ আজও আসে।

রঞ্জন অবশ্য শরীরের টানে আসে না, আসে মনের টানে। তার ভালো লাগে, বসে বসে বেদেবুড়োর মুখে অস্পষ্ট ভাষার নানান অলৌকিকের কথা শুনতে। শুনতে শুনতে তার মনে হয় এই দৃশ্যমান জগতের বাইরে সমান্তরাল অন্য এক জগৎ আছে। এই দুই জগতের মধ্যে বেদেদের হামেশাই যাতায়াত। মাঝে মাঝে রঞ্জন সন্ধেবেলা অবধি থেকে যায় বেদেদের তাঁবুতে। পালা শুরু হলে সে-ও বেদে-পুরুষদের সঙ্গে পুতুলগুলোকে মাথার ওপর চাগিয়ে তুলে এদিক-ওদিক ছুটে ছুটে তাদের নাচিয়ে বেড়ায়। তখন তার মধ্যে পাগলামির কোনও লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এইসব কারণে রঞ্জন বেদেদের দলের দারুণ প্রিয়। সাধারণত ওরা গৃহী সমাজকে এড়িয়ে চলে। তবে রঞ্জনকে দেখেই ওরা বোঝে যে এ ঘরে থাকলেও গৃহী নয়। এর ঘর পুড়ে গেছে। নেহাত দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের টানে বাঁধা পড়ে আছে তুষকাঠিতে। না হলে এই ছেলেটাও মনে মনে তাদেরই মতন যাযাবর।

তাই সেই দুপুরে যখন রঞ্জন বেদেবুড়োর কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ল, তখন তারা সবাই আন্তরিক সমবেদনায় রঞ্জনকে ঘিরে ধরল। তার গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করে, তার কাছ থেকে মুনিয়ার বরের সব কথা শুনল, এবং শুনে তারা কেঁপে উঠল। এই ধরনের শয়তানি ওই সরল, সোজা মানুষগুলোর কল্পনার বাইরে।

বেদেবুড়ি রঞ্জনকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি আজও মুনিয়াকে চাও?’ রঞ্জন সংক্ষেপে সম্মতি জানাল।

বেদেবুড়ির মুখ হাসিতে ভরে উঠল। সে বলল, ‘চিন্তা কোরো না। কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

***

রঞ্জন বেদেদের তাঁবুতেই রয়ে গেল। সন্ধে নামল। আগামী তিনশো পঞ্চান্নখানা অন্ধকার একঘেয়ে রাত্রির কথা ভেবেই যেন মেলার শেষ সন্ধ্যায় দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠল হ্যাজাক বাতি, গ্যাসের আলো, কুপি আর লন্ঠন। তবু হেমন্তের কুয়াশা আর পাণ্ডুর জ্যোৎস্না সমস্ত আলোকেই কেমন যেন নিষ্প্রভ করে দিল। আলোর চেয়ে অনেক বেশি ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল মেলার মাঠ জুড়ে— মানুষের ছায়া, গাছের ছায়া, দোকানঘরের চতুষ্কোণ ছায়া, নাগরদোলার ঘূর্ণমান ছায়া।

সেই অগণিত ছায়ার মধ্যে ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কৌশিক। সে খুঁজছিল রঞ্জন নামে ওই গাধাটাকে, যে তার বউয়ের সঙ্গে আজ দুপুরে আশনাই করছিল। দু’হাতে মুনিয়ার মুখটা ধরে নিজের মুখটাকে নামিয়ে এনেছিল একদম ওর ঠোঁটের কাছে। শালা চুমুটা খেল না কেন? সাহস পেল না নাকি? কৌশিক পকেট থেকে হাতের মুঠোর মাপের ছোট্ট ভিডিয়ো ক্যামেরাটা বার করল। তারপর চোখ রাখল স্ক্রিনে। আহ্, চুমুটা খেলে কত চমৎকার হত গল্পটা! কপালই খারাপ।

মেলার এককোণে একটা নিরিবিলি গাছের তলায় লণ্ঠন জ্বালিয়ে ক’টা লোক মন দিয়ে তাসের জুয়া খেলছিল। কৌশিক তাদের একপাশে বসে ভিডিয়ো রেকর্ডিং-এর সাউন্ডটা একটু বাড়িয়ে কানের সঙ্গে স্পিকারটা সেঁটে ধরল। পরিষ্কার শুনতে পেল কথোপকথন-

মুনিয়া, তুই কি কৌশিকের হাত থেকে মুক্তি চাস?’

‘চাই।’

খ্যাঁক খ্যাঁক করে কিছুক্ষণ আপনমনে হাসল কৌশিক হালদার। আরে বাবা, মুক্তিপণ না দিয়েই মুক্তি চাইবি? তা কি হয়!

এই কথাটাই ওই রঞ্জনকে জিজ্ঞেস করবে বলে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কৌশিক। তার বউয়ের প্রেমিককে। সে একটা প্রস্তাব দেবে রঞ্জনকে…

কিছুক্ষণের মধ্যেই কৌশিক, রঞ্জনকে দেখতে পেল। একটা বড়ো তাঁবুর পিছনদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে ব্যাটা। সঙ্গে অবিকল আরব্যরজনীর বইয়ের অলংকরণ থেকে উঠে আসা একটা হুরি। সেইরকমই ঢোলা পাজামা, যার পায়ের গোছের কাছটা চাপা; সেইরকমই খাটো কামিজের নীচে বেরিয়ে থাকা সরল তলপেট আর গভীর নাভি; সর্বোপরি সেইরকমই ছুরির ফলার মতন ঝিকমিকে দুই চোখের মণি। ওরে বাবা! গুরুদেব তো দেখছি আস্ত একটি উয়োম্যানাইজার!

বলতে-না-বলতেই রঞ্জনের চোখে চোখ পড়ল কৌশিকের। আরে, গুরুদেব নিজেই তো হাতছানি দিয়ে ডাকছেন দেখছি। সঙ্গের মেয়েটার ঠোঁটেও আমন্ত্রণের হাসি। জয় গুরু! দেখা যাক ভাগ্য কোথায় নিয়ে যায়। কৌশিক, রঞ্জন আর ওই বেদে মেয়েটার পিছন পিছন মাথা নিচু করে তাঁবুর ভেতরে ঢুকল।

তাঁবুতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র এক গন্ধ যেন হিংস্র জন্তুর মতন কৌশিকের ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এযাবৎ চেনা সমস্ত গন্ধের থেকে আলাদা সেই গন্ধ। কীসের গন্ধ এটা? কোনও ফুল? আতর? যা-ই হোক, সেই গন্ধের দাপটে কৌশিক কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ল। যেভাবে রঞ্জনকে খেলিয়ে ডাঙায় তুলবে বলে ভেবেছিল, কৌশিক সেভাবে কথা শুরু করতেই পারল না। সে সরাসরি ভিডিয়ো ক্যামেরার স্ক্রিনে রঞ্জন আর মুনিয়ার ছবিটা দেখিয়ে রঞ্জনকে প্রশ্ন করল, ‘এই ছবিটা তুষকাঠির লোকেরা দেখলে তোমাকে আর সাধক বলে ভক্তি করবে?’

‘না।’ নির্বিকার মুখে ঘাড় নাড়াল রঞ্জন।

কৌশিক বুঝতে পারল কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে। রঞ্জনের তো এতটা নির্বিকার থাকার তো কথা নয়। তার তো ভয় পাওয়ার কথা ছিল। তার জায়গায় ওর চোখে-মুখে যে ভাবটা ফুটে উঠেছে সেটা ঘৃণার তীব্র ঘৃণার।

তবু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতেই কৌশিক রঞ্জনকে ফের প্রশ্ন করল, ‘কিনতে চাও এই ভিডিয়ো ক্লিপটা?’

কৌশিকের এই কথার উত্তর না দিয়ে রঞ্জন তার দিকে আচমকা প্রতিপ্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘ওই ক্যামেরাতেই আরও একটা ক্লিপ রয়েছে, তা-ই না, কৌশিকবাবু?’

রঞ্জনের আচমকা প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল কৌশিক। রঞ্জন একই সুরে বলল, ‘দেবযানী বলে একটা বাচ্চা মেয়ের নগ্ন শরীরের ছবি? রয়েছে না ওই ক্যামেরার মেমোরিতে?’

কৌশিকের কান থেকে সহসাই মেলার সমস্ত চিৎকার মুছে গেল। মনে হল আকাশ ফাটিয়ে রঞ্জন তাকে প্রশ্ন করছে— সুযোগ পেলে নিজের স্ত্রী’র নগ্ন শরীরের ছবিও তুমি বিক্রি করতে পারো, তা-ই না?

একটা সরু ফিতে সহসা পিছন থেকে কৌশিকের গলাকে ঘিরে ধরল। একটা ফাঁস পড়ল সেই রেশমি ফিতেটায়। কৌশিক চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল সেই আরব্যরজনীর হুরি তার চুলের ফিতের দুটো প্রান্ত দু’হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এরপরেই ক্রমশ দড়ির দু’প্রান্তে টান বাড়তে লাগল।

এরপর পৃথিবীতে কৌশিকের শেষ মুহূর্তগুলো ভালো কাটেনি।

***

মুনিয়া দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঠোঁটের কোণে একটা তেতো হাসি।

কে তাকে মুক্তির কথা জিজ্ঞেস করল?

না, রঞ্জন ভট্টাচার্য। যার নিজেরই আচার-আচরণের কোনও স্থিরতা নেই।

কিন্তু কত ভালো হত যদি সত্যিই ওই কৌশিক হালদার নামের ঘৃণ্য লোকটা এই পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যেত। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মুনিয়ার চোখে পড়ল একটা কনভয় তুষকাঠি গ্রামে ঢুকছে। খড়ের বাড়িগুলোর মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা ধুলোর রাস্তা ধরে নিশ্চিত ভঙ্গিতে চারটে গাড়ি সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে তাদেরই বাড়ির দিকে। একদম প্রথমে যে নীল অ্যাম্বাসাডরটা, সেটায় চেপেই সেদিন তারা আসানসোল থেকে তুষকাঠিতে এসেছিল। পরের তিনটে গাড়িই পুলিশের জিপ। প্রত্যেকটাতেই কয়েকজন করে খাকি পোশাকের মানুষ বসে আছে।

মুনিয়ার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। সে প্রায় পাখির মতন উড়ে নীচে নামল, এবং তাদের উঠোনে ঢুকবার আগেই দু’দিকে দু’হাত ছড়িয়ে কনভয়ের গতি রোধ করল।

অ্যাম্বাসাডরের ড্রাইভারের পাশেই বসেছিলেন মৃদুল মুস্তাফি। তিনি গাড়ি থেকে নেমে এলেন। মুনিয়া তাঁর সামনে গিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘আমি সব জানি। আগে জানতাম না। আজ একটু আগেই জেনেছি। আপনারা ওকে ধরুন, যা ইচ্ছে তা-ই করুন। কিন্তু দোহাই আপনাদের, আমার বাবা যেন কিছু জানতে না পারেন।’ মুনিয়া, মৃদুলবাবুকে তার বাবার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল।

মৃদুল মুস্তাফির চোখের দৃষ্টি সমবেদনায় নরম হয়ে এল। তিনি বললেন, ‘তা হলে আপনার হাজব্যান্ডকে চুপচাপ বেরিয়ে আসতে বলুন। ও না গন্ডগোল করলে আমরাও করব না।’

কিন্তু ও তো এখন বাড়িতে নেই।’

মৃদুল মুস্তাফি এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ও. সি. বিপুল সরকার দু’জনেই মুনিয়ার এই কথায় সচকিত হয়ে উঠলেন। প্রশ্ন করলেন, ‘বাড়িতে নেই? কোথায় পালাল?’

‘খুব সম্ভবত মেলার দিকে গেছে। সন্ধের পর ওখানেই ঘোরাঘুরি করে তো।’

দ্রুত পায়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে মৃদুল মুস্তাফি, ও. সি.-কে বললেন, ‘কাজটা ডিফিকাল্ট হয়ে গেল, মিস্টার সরকার। একটা মেলার মধ্যে থেকে একটা মানুষকে খোঁজা এবং পাকড়াও করা… এর চেয়ে তো খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা সহজ ছিল!’

বিপুল সরকার একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘কাজটা অতটা কঠিন হবে না, স্যার।’

‘কেন?’ একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন মৃদুলবাবু।

আমি আপনাকে জিজ্ঞেস না করেই একটা কাজ করে ফেলেছিলাম। গতকালই দু’জন প্লেন-ড্রেসের ইনফর্মারকে তুষকাঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কৌশিক হালদারকে শ্যাডো করবার জন্য। আসলে আমি ভেবেছিলাম আমরা আসার আগেই যদি স্কাউন্ডেলটা এখান থেকে ভাগবার চেষ্টা করে…’

মৃদুল মুস্তাফি নিজের বিরাট হাতের মুঠোর মধ্যে বিপুল সরকারের হাতটা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ওহ্, বাঁচালেন ভাই! কীভাবে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব।’

মুনিয়াদের বাড়ির সামনে থেকে রওনা হয়ে পুলিশের গাড়িগুলো মেলার পরিধি ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। চলতে চলতে হঠাৎ একজায়গায় এসে নীল অ্যাম্বাসাডরের পিছনের সিট থেকে বিপুল সরকার বললেন, ‘দাঁড়ান, স্যার। গোষ্ঠ আর শিবু আমাদের দেখতে পেয়েছে। ওই যে হাত নেড়ে ডাকছে।’ তারপরে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে তিনি দৌড়োলেন বেদেদের তাঁবুর দিকে। পিছন পিছন বাকি আটজন পুলিশ এবং মৃদুল মুস্তাফি। একজন রোগামতন লোক উলটো দিক থেকে দৌড়ে এসে বিপুল সরকারকে স্যালুট করে কিছু বলবার জন্য মুখ খুলেও থেমে গেল। তারপর জিজ্ঞাসু চোখে মৃদুলবাবুর দিকে তাকাল।

বিপুল সরকার তার ইশারা বুঝে বললেন, ‘আরে গোষ্ঠ, উনিই সি আই. ডি.-র অফিসার। যা বলবে ওঁর সামনেই বলো।’

‘স্যার, অদ্ভুত ব্যাপার। সেই সন্ধের মুখে আমাদের পাখি ওই তাঁবুতে ঢুকেছে। তা প্রায় তিন ঘণ্টা হয়ে গেল। তখন থেকে আমি এই সামনে আর শিবু পিছনে পাহারা দিয়ে বসে আছি। পাখির কিন্তু বেরোবার নামটি নেই।’

‘এই রে! তাঁবুর পিছনের ফাঁকফোকর দিয়ে পালাল না তো?’

‘কী যে বলেন, স্যার! পিছনে তো ধু ধু মাঠ। ওই মাঠ পেরিয়ে মানুষ কেন, একটা ছাগল হেঁটে গেলেও নজরে পড়ে যাবে। আর শিবু তো ঠায় ওই পিছনের মাঠের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।’

বিপুল সরকারের ইশারায় আটজন কনস্টেবল তাঁবুর চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল। বিপুল আর মৃদুল ঢুকলেন তাঁবুর ভেতরে। দেখা গেল বুড়ো আর বুড়িই কেবল বসে বসে তামাক টানছে। বাকি সবাই পুতুল নাচাতে ব্যস্ত। বুড়ো আর বুড়ি বহুদর্শী। দুই প্লেন-ড্রেসের অফিসারকে দেখে চিনতে পারল এবং সম্মান জানিয়ে বসতেও বলল। তবে খুব একটা যে ভয় পেয়েছে এমন ভাব দেখাল না।

‘কৌশিক হালদার বলে একটা ছেলে এই তাঁবুতে ঢুকেছিল। সে গেল কোথায়?’ সরাসরি প্রশ্ন করলেন মৃদুল মুস্তাফি।

বেদেবুড়ো শান্তভাবে জবাব দিল, ‘আমাদের দলের বাইরে আর একজন লোকই এখানে আছে। তার নাম কৌশিক নয়, রঞ্জন। ওই যে, বোবা রাজপুত্রের পুতুল নিয়ে খেলা দেখাচ্ছে। এছাড়া আর কোনও বাইরের লোক এই তাঁবুতে ঢোকেনি। আপনি ইচ্ছে করলে সার্চ করে দেখে নিতে পারেন।’

অগত্যা তা-ই করতে হল দুই পুলিশ অফিসারকে। তাঁরা দু’জনে মিলে তন্ন তন্ন করে তাঁবুর প্রতিটি কোনা, প্রতিটি প্যাকিং বাক্সের অভ্যন্তর, পর্দার আড়াল খুঁজে দেখলেন। কোথাও নেই কৌশিক হালদার।

মৃদুল মুস্তাফি বাইরে বেরিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ গভীর অভিনিবেশে দেখলেন পুতুলনাচ। অদ্ভুত এক জাদুবাস্তবতার আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে এই মঞ্চের সামনে। হেমন্তের মাঠের মধ্যে থেকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে ঘন কুয়াশা। সেই কুয়াশা দর্শকদের মাথার ওপর দিয়ে অল্প অল্প করে উঠে যাচ্ছে মঞ্চের ওপরে। হ্যাজাকের সবুজাভ আলোর ওপরে সেই কুয়াশা এক অতল দিঘির সবুজ জলের মতন নড়াচড়া করছে, আর সেই জলের মধ্যেই যেন অভিনীত হচ্ছে ইরানি রাজকুমারীর দুঃখের পালা।

সবথেকে আশ্চর্য লাগছে পুতুলগুলোকে। বার্নিশ দিয়ে পালিশ করা তাদের মুখ হ্যাজাকের আলোয় চকচক করছে। নিষ্পলক চোখগুলো সুখে-দুঃখে-হর্ষে-বিষাদে সমান বিস্ফারিত। যেহেতু বেদেদের তেমন কারিগরি দক্ষতা নেই, তাই পুতুলদের হাত পায়ের জোড়ও বানাতে পারেনি ওরা। অতএব তাদের মুভমেন্ট বলতে কেবল দেহকাণ্ডের ঝটকা মেরে ঘুরে যাওয়া যেভাবে নীচ থেকে তাদের ঘোরানো হচ্ছে আর কী! তারা ঠোঁট না নাড়িয়েই কথা বলে। টিনের আড়াল থেকে তাদের হয়ে কথা বলছে বেদে নারী-পুরুষেরা। শুধু বোবা রাজপুত্রের কোনও ডায়ালগ নেই। আড়ষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে, বিস্ফারিত চোখের দৃষ্টি নিয়ে, ঝলমলে আলখাল্লা নিয়ে আর একমাথা কোঁকড়া চুলের বোঝা নিয়ে সে কেমন করুণভাবে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে মঞ্চের একটা কোনায়। তার মানে, দাঁড়িয়ে রয়েছে রঞ্জন নামে সেই ছেলেটাও, যার হাতে ওই পুতুলের শরীর। মৃদুল মুস্তাফি তার লোকেদের হাতের ইশারায় গাড়িতে ফিরতে বললেন। মুখে বললেন, ‘চলো, গোষ্ঠ। এখানে কেউ নেই। তোমরা ভুল লোককে দেখেছ।’

***

দু’দিন বাদে দুপুরবেলায় মুনিয়ার আসানসোলের ফ্ল্যাটের দরজায় কলিং- বেল বেজে উঠল। দরজা খুলে মুনিয়া দেখল, মৃদুল মুস্তাফি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সে তাঁকে ভেতরে এনে বসাল।

রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে, মৃদুলবাবু একবার ছন্নছাড়া ঘরটাকে চোখ দিয়ে জরিপ করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কৌশিক হালদার কোথায় গিয়েছে আপনি জানেন?’

মুনিয়া ঘাড় নাড়াল।

‘সত্যিই জানেন না? রঞ্জনবাবু আপনাকে কিছু বলেননি?’

মুনিয়া সচকিত হয়ে তাকাল মৃদুল মুস্তাফির দিকে। তারপর আবার ঘাড় নাড়াল।

মৃদুলবাবু তাঁর অ্যাটাচির মধ্যে থেকে একটা ছোটো ভিডিয়ো ক্যামেরা বার করলেন। বললেন, সেদিন বেদেদের তাঁবুর ভেতর থেকে এটা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। কাউকে জানাইনি। তবে এখান থেকেই জানালাম, আপনি রঞ্জনবাবুর কাছে মুক্তি চেয়েছিলেন। তিনি আপনাকে প্রতিশ্রুত মুক্তি এনে দিয়েছেন। কৌশিক হালদার আর কোনওদিনই ফিরবে না। জানেন সে কথা?’

মুনিয়া দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল। বলল, ‘আমি জানি না, সত্যিই জানি না!’

মৃদুলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আপনার কথা। সেই মুক্তি কীভাবে এসেছে তা রঞ্জনবাবু কোনওদিনই আপনাকে জানাবেন না। জানাবার মতন নয় সে কথা। বড়ো বীভৎস … বড়ো বীভৎস…’ দু’হাতের তালুতে মুখ ঢাকলেন মৃদুলবাবু।

নিস্তব্ধ ঘরে শুধু মুনিয়ার ফোঁপানির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেই নৈঃশব্দ ভেঙে মৃদুলবাবু বললেন, ‘এই কেসটা আমি ক্লোজ করে দিচ্ছি। বলব, দ্য কালপ্রিট ইজ অ্যাবস্কন্ডিং। এতে আমার কোনও বিবেক দংশন হবে না। আমি জানি, কৌশিক যে ঘৃণ্য অপরাধ করেছিল তার বিচার হয়ে গেছে। এখন এটাকে নিয়ে নাড়াঘাঁটা করা মানে আর-একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করা। আশা করি আপনি তুষকাঠিতে ফিরে যাবেন। চার বছর আগে যে ভুলটা করেছিলেন সেটাকেও এবার শুধরে নেবেন। মনে রাখবেন, সন্ন্যাসের পথ খুব সহজেই ঘরের দিকে ফিরে আসে। আর আমার একটা পরামর্শ মনে রাখবেন। কৌশিক কোথায় সেটা কখনওই জানার চেষ্টা করবেন না। আপনি সহ্য করতে পারবেন না।’

হতবাক মুনিয়াকে পিছনে রেখে মৃদুলবাবু আসানসোলের ভিড়াক্রান্ত রাস্তায় নেমে এলেন। আপনমনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, এই মুহূর্তে বেদেদের দল হয়তো পৌঁছেছে কোনও ধু ধু প্রান্তরের মধ্যে এক জলার ধারে। সেখানে শরঘাসের জঙ্গলের আড়ালে কালো নরম মাটির বুকে বেদে-যুবকদের কোদালের কোপে একটা কবর খোঁড়া হচ্ছে। সেই কবরে একটু বাদে ওরা শুইয়ে দেবে বোবা রাজপুত্রের পুতুলটাকে।

পৃথিবীর কোনও ধর্মই মৃতদেহকে বেশিক্ষণ বহন করার ব্যাপারটা সমর্থন করে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *