বরফপাহাড়ের আগুন
শুনেছি, মৃত্যুর আগের মুহূর্তে নাকি মানুষের চোখের সামনে তার সমস্ত জীবনটা ছবির মতন ফুটে ওঠে। কথাটা সত্যি হলেও হতে পারে। এই তো, সারা জীবনের না হলেও গত সাতটা দিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ সমস্ত ঘটনার ছবি কেমন আপনা থেকেই আমার মনের মধ্যে দিয়ে ভেসে চলেছে; আমি চেষ্টা করেও তাদের থামাতে পারছি না। এ ব্যাপারে তো কোনও সন্দেহ নেই যে, আজ এই সাতাশে ডিসেম্বর রাত সাড়ে তিনটের সময় আমি মৃত্যুর খুব কাছে এসে পৌঁছেছি। এই যে আমি একটি নিপাট গাড়লের মতন বসে বসে একথা সেকথা ভাবছি, ভালো করেই জানি, আমার এই নিষ্কর্মা অবস্থার সুযোগ নিয়েই সে— মানে আমার মৃত্যু— ধীর কিন্তু নিশ্চিত গতিতে এগিয়ে আসছে আমার দিকে।
অবশ্য বসে না থেকে আমার উপায় নেই। কুন্দন সিং-এর রাইফেলের গুলিটা ডানহাতের ওপরের দিক থেকে বেশ বড়ো একটা চাকলা উড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে। ব্যথাটা এখনও তেমন টের পাচ্ছি না, তবে অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পাব ঠিকই। হয়তো পনেরো বা বিশ মিনিট পরে। তখন ব্যথার চোটে বাপ বলিয়ে ছাড়বে। আপাতত রক্তপাতটা বন্ধ করা খুব জরুরি। স্বাস্থ্যের কারণে নয়। আসলে ওটুকু না করলে আমার কাজটা শেষ করতে পারব না। মরা মানুষ কোনও কাজই করতে পারে না। এমনকি শুনলে অবিশ্বাস্য লাগতে পারে, কম্যান্ডো অপারেশনের মতন সহজ কাজও নয়।
পাতা-ঝরা রডোডেনড্রনের ঝোপের আড়াল থেকে মাথাটা সামান্য বার করেই আবার গুটিয়ে নিলাম। যা দেখলাম তা মোটেই খুশি হওয়ার মতন কিছু নয়। দেখলাম, পায়ের নীচে সাদা বরফের ওপর কালো একটা রেখা, যেন চিনির স্তূপের ওপর দিয়ে এগিয়ে আসছে ভেঁয়ো পিঁপড়ের একটা সারি। কালো নয়, আসলে ওই রেখার রং লাল। আমারই রক্তের ফোঁটা ওইগুলো। অন্ধকারে কালো লাগছে।
আমার নিজের রক্ত কুন্দন সিংকে পথ দেখিয়ে আমার কাছে নিয়ে আসবে— এটা হতে দেওয়া যায় না। এই জন্যই বলছিলাম, ব্লিডিংটা বন্ধ করা খুব জরুরি। ব্যাকপ্যাক থেকে ফার্স্ট এইড কিট বার করে, একহাতে যতটা পারি শক্ত করে জখম ডানহাতের ক্ষতের ওপরে ব্যান্ডেজ জড়ালাম। ভগবানের অশেষ কৃপা, আবার বরফ পড়তে শুরু করেছে। তার মানে পুরোনো রক্তের দাগটাও এক্ষুনি ঢেকে যাবে।
হিপ-পকেট থেকে ফ্লাস্ক বার করে একচুমুক নিট ব্র্যান্ডি গলায় ঢাললাম। হাতের পাতাদুটো এতক্ষণ অল্প অল্প কাঁপছিল। সেগুলো স্থির হল। আরও কিছুক্ষণ এখানেই বসে থাকা ভালো। মেঘের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে একটু বাদেই আরও জোরে বরফ পড়বে। মানে আরও ভালো আড়াল পাব। তখনই এই ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে হেলিপ্যাডের মাথা থেকে সরাইখানা অবধি বাকি পথটুকু নামবার চেষ্টা করব। আপাতত একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে পা-দুটো ছড়িয়ে দিলাম। একটু বিশ্রাম দরকার, বড়ো অবসন্ন লাগছে। বুঝতে পারছি শরীরের সমস্ত শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। শীত, অনিদ্রা, রক্তপাত— শরীরের দোষ কী! মাথাটা গাছের গুঁড়িতে রেখে চোখ বুজলাম।
চোখের সামনে ভেসে উঠল বসন্ত সাক্সেনার নয়ডার বাড়ির দোতলার বারান্দাটা। কানে ভেসে উঠল ওঁর খুব আস্তে কিন্তু কেটে কেটে বলা কথাগুলো।
‘আই নো, ক্যাপটেন… স্যরি, মিস্টার রুদ্র… ইউ আর নো মোর অন দ্য সাইড অফ ল।’
আমার চোখদুটো সন্দেহে সরু হয়ে গেল। বললাম, ‘আপনি আমার সম্বন্ধে কী জানেন?’
‘সবই জানি, মিস্টার রুদ্র। প্রবাসী বাংগালি আছেন। দেরাদুন আর্মি স্কুল থেকে পাশ করে ইন্ডিয়ান আর্মিতে টু থাউজ্যান্ড টু-এ জয়েন করলেন। উসকি বাদ স্পেশাল গ্রুপের কম্যান্ডো ট্রেনিং। ফির টু থাউজ্যান্ড এইটে কাশ্মীর ভ্যালিতে কাউন্টার ইনসার্জেন্সির চার্জ নিয়ে বারমুলাতে পোস্টিং। আর তারপর…’
‘থামলেন কেন? বলে যান।’
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বসন্ত সাক্সেনা বাকি কথাগুলো বলতে পারলেন না। সিগারেট ধরাবার অছিলায় মুখটা লাইটারের দিকে নামিয়ে নিলেন। তারপর ওই অবস্থাতেই বললেন, ‘আপনার নানান কাজকর্মে হায়ার অফিশেয়ালদের সন্দেহ হল আপনি একজন বিশ্বাসঘাতক। বর্ডারের ইন্ডিয়ান সাইডে যে ক’টা আর্মি ক্যাম্প আছে তার ম্যাপ আপনি টেররিস্টদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। রেড-হ্যান্ডেড ধরা পড়েননি, তাই আপনার এগেনস্টে কড়া স্টেপ নেওয়া গেল না। আপনাকে বলা হল নিজে থেকেই সসম্মানে পদত্যাগ করতে। অ্যান্ড অ্যাট দা বিগিনিং অফ দিস ইয়ার, ইউ রিজাইন্ড।’
এটা শোনার পর সাক্সেনাকে একটা প্রশ্ন করতে বাধ্য হলাম।
‘আপনি এসব কথা জানলেন কোত্থেকে?’
আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বসন্ত সাক্সেনা চোখের ইশারায় আমাদের মাঝখানে টি-টেবলটার ওপরে পড়ে থাকা একটা নীল ফাইলের দিকে দেখিয়ে দিলেন। আমি সেটা হাতে তুলে নিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, ফাইলটার কভারে ভারতীয় স্থলসেনার লোগো। তার নীচে আমার নাম। আমারই সার্ভিস ফাইল ওটা। অরিজিনাল নয়, তবে হুবহু প্ৰতিলিপি। আমার জয়েনিং থেকে রেসিগনেশন অবধি প্রতিটি কাগজের ফটোকপি তারিখ অনুযায়ী সাজানো রয়েছে।
বসন্ত সাক্সেনা মুচকি হেসে আমার বিস্ময়টা উপভোগ করলেন। তারপর বললেন, ‘বুঝতে পারছেন তো, মিস্টার রুদ্র, কেন এত জোর দিয়ে বলতে পারছি, ইউ আর নো মোর অন দ্য সাইড অফ ল?’
বসন্ত সাক্সেনা আমার সম্বন্ধে যতটা ইনফর্মড, অতটা না হলেও, আমিও ওঁর সম্বন্ধে কিছু খোঁজখবর নিয়েই ওঁর বাড়িতে সেদিন পা রেখেছিলাম। এটা জানতাম, উনি লন্ডনের বিখ্যাত এক অকশন হাউসের এজেন্ট। অগাধ পয়সা। সমাজের উচ্চকোটির লোকেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ওঁর বন্ধুদের মধ্যে ফিল্মস্টার আছে, গাইয়ে আছে; ক্রিকেটার, ফ্যাশন ডিজাইনার, মডেল– এককথায় এ দেশের নিউজ-পেপারের থার্ড পেজে যাদের ছবি দেখা যায় এবং যাদের সম্বন্ধে গসিপ পড়া যায় তারা সকলেই আছে।
এর কারণটাও সহজেই অনুমেয়। লন্ডনের ওই অকশন হাউসে নিলাম হয় দুষ্প্রাপ্য সব অ্যান্টিক। তার মধ্যে থেকে যে-কোনও একটা আইটেম বাড়িতে রাখতে পারলে ওই অর্থবান এবং ক্ষমতাবান লোকগুলো নিজেদের ধন্য মনে করে। হতে পারে সেটা একটা একটা তিব্বতি ভাস্কর্য, চিনা ফুলদানি, মুঘল পেইন্টিং কিম্বা পারসিক সোনার মুদ্রা; পাঁচশো বছরের পুরোনো দামাস্কাসের ছোরা কিম্বা অরিজিনাল শাহতুষের শাল। এই কারণেই ওরা বসন্ত সাক্সেনাকে খুশি রাখতে চেষ্টা করে।
আবার বসন্ত সাক্সেনারও নানা কারণে ওদের প্রয়োজন হয়। ওদের মধ্যে থেকেই কোনও পড়তি বড়োলোক কিম্বা ঋণগ্রস্ত বাতিল ফিল্মস্টার নিজের সংগ্রহের কিছু জিনিস বিক্রি করে দিতে চাইলে সাক্সেনাসাহেবের কাছেই সবার আগে খবর আসে।
আর আছে ফার্স্ট পেজের লোকেরা, মানে পলিটিশিয়ানরা। তাদের কৃপা ছাড়া চোরাই ভাস্কর্য কিম্বা পেইন্টিং-এর ব্যাবসা চালিয়ে যাওয়া যে সম্ভব নয় সে তো একটা বাচ্চা ছেলেও বোঝে।
সেরকম কোনও যোগাযোগের সূত্রেই নিশ্চয়ই ওই গোপন ফাইলের কপি ওঁর কাছে পৌঁছিয়ে গেছে। যিনি দিয়েছেন তিনি নিশ্চয়ই আমার সম্বন্ধে একটা রেকমেন্ডেশনও দিয়েছেন— বসন্ত, এই একটা কাদায় পড়া হাতির খোঁজ দিলাম। একে যেমন ইচ্ছে ব্যবহার কোরো।
ভেবে দেখলাম, সত্যি করে রাগ না হলেও এইখানে আমার একটু রিঅ্যাকশন দেখানো দরকার। তাই কঠিন স্বরে বললাম, ‘ইয়েস, আই অ্যাম নো মোর উইথ দ্য আর্মি। বাট ডাজ দ্যাট ইমপ্লাই আই উইল হেল্প ইউ ইন ব্রেকিং দ্য ল? আর্মির চাকরি থেকে লাথি খেয়েছি বলেই বেআইনি কাজে হাত লাগাব নাকি?’
বসন্ত সাক্সেনা দেখলাম পোড় খাওয়া লোক। আমার মেজাজ দেখে একটুও ঘাবড়ালেন না। বললেন, ‘আমি কখন আপনাকে আইন ভাঙতে বললাম, রুদ্রসাহেব? আমি তো বললাম, একটা হিড্ন ট্রেজার আছে। মানে, যাকে বলে গুপ্তধন। সেটা এমনিই পড়ে আছে, কোনও মালিক নেই। ইউ জাস্ট নিড টু ব্রিং মি দ্য ট্রেজার। কাজটা যদি আপনি পিসফুলি করতে পারেন, দেন ইট্স অলরাইট। আর যদি ভায়োলেন্ট মিন্স নিতে হয়, তাতেও আপনার অপরাধবোধের কোনও কারণ নেই। হয়তো কয়েকটা এমন লোককে খুন করতে হবে যারা নিজেরাই খুনি।’
তারপর আমার দিকে আরও একটু ঝুঁকে বসলেন বসন্ত সাক্সেনা। গলাটা আরও একটু নামিয়ে বললেন, ‘অ্যান্ড থিংক অফ মাই অফার। পঁচিশ কোটি টাকার মালের পুরোটাই যদি আমার হাতে তুলে দিতে পারেন, দেন আই উইল গিভ ইউ টেন পার্সেন্ট, স্ট্রেটঅ্যাওয়ে। মানে আড়াই কোটি। ক্যাশ।’
কিছুদিন হল বেশ ফলাও করে চাকরির খোঁজে নেমেছিলাম। এই ধরা যাক শপিং মল কিম্বা হাউসিং কমপ্লেক্সের সিকিয়োরিটি অফিসারের মতন কোনও চাকরি। বন্ধুবান্ধবদের বলে বেড়াচ্ছিলাম, চাকরি চাই; যেরকম হোক একটা চাকরি। সে কথা নিশ্চয়ই সাক্সেনার কানে পৌঁছেছিল। এখন সেই প্রসঙ্গ তুলে উনি বেশ জোরেই হেসে উঠলেন বললেন, ‘ভাবা যায়, একজন স্পেশাল গ্রুপের কম্যান্ডো অফিসার কোনও শপিং মলে কিম্বা ব্যাংকে পাহারাদারের পোশাকে টহল দিচ্ছেন!’
‘এক্স-অফিসার,’ আমি শুধরে দিয়েছিলাম।
‘আপনার ট্রেনিং, আপনার এক্সপিরিয়েন্স— সেগুলো তো এক্স হয়ে যায়নি।’ বসন্ত সাক্সেনা অবিচলিত সুরে বলেছিলেন। আমার অফারটা অ্যাকসেপ্ট করে নিন। সারা জীবন আর চাকরির জন্য ভাবতে হবে না।’
সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ব্যাপারটা আগে ডিটেলে বলুন। তারপর বলছি অ্যাকসেপ্ট করব কি করব না।’
.
দুই
বসন্ত সাক্সেনা হঠাৎই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বললেন, ‘বুঝলেন, ক্যাপটেন… স্যরি, মিস্টার রুদ্র, এই ঘরের মধ্যেই প্রায় দু’-তিন কোটি টাকা দামের অ্যান্টিক রয়েছে। ওই দেখুন, বলিউডের ফার্স্ট মুভি ওই ক্যামেরাটা দিয়ে তোলা হয়েছিল; আন্ধেরির একটা বস্তি থেকে আমার লোক উদ্ধার করে এনেছে। এদিকে তাকান, এই যে, এই দেওয়ালে… অরিজিনাল টিবেটান থাংকা। ওই আয়রন চেস্টটার মধ্যে কাঞ্জুরের পুঁথি আছে, মহারাজ রণজিৎ সিং-এর হিরের ব্রোচ আছে। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে যে জিনিসের স্যাম্পেল আমার কাছে এসেছে তার কাছে এই সবই নস্যি। তার গল্পই শুধু আমরা এতদিন শুনে এসেছি। মডার্ন ম্যান কেউ সে জিনিস চোখে দেখেনি।’
এই বলে বসন্ত সাক্সেনা তাঁর চেয়ারের পাশে মেঝেতে নামিয়ে রাখা একটা মাঝারি কার্ডবোর্ডের বাক্স খুলে, তার মধ্যে থেকে তুলোর প্যাডে মোড়া একটা জিনিস খুব সাবধানে হাতে তুলে নিলেন। তারপর সেটাকে কোলের ওপর রেখে ততোধিক সাবধানে তুলোর মোড়কটা খুলে ফেললেন। কী বলব, যা দেখলাম তেমন জিনিস আমি কোনওদিন চোখে তো দেখিনি বটেই, কল্পনাও করিনি।
একটা কাটগ্লাসের বোতল। তার ভেতরে রক্তিম এক তরল।
এটুকু বললে কিছুই বলা হয় না। তখন নয়ডার দিগন্তে বিকেল নামছিল। ওই কাটগ্লাসের অযুত লক্ষ পল থেকে পড়ন্ত রোদ্দুর বিচ্ছুরিত হয়ে আমার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল। মনে হল কোনও কাচের পাত্র নয়, বসন্ত সাক্সেনা তার হাতে একখণ্ড রত্নপাথর ধরে রেখেছেন।
আর তেমনই মায়াবী বোতলের আধারে ধরে রাখা সেই তরলের রং। দেখা যায়, স্পর্শ করা যায় এমন কোনও কিছুর সঙ্গে তার তুলনা করতে পারব না। তুলনা যদি করতেই হয় তা হলে করতে হবে মনের একটা আবেগের সঙ্গে। হ্যাঁ। সেই তরলের রং অবিকল কামনার মতন লাল। আমার মতন কাঠখোট্টা নির্মম লোকেরও বুকটা কেন জানি না সেই তরলের দিকে তাকিয়ে মুচড়ে উঠল। আমার কৈশোরের, আমার যৌবনের যত অপ্রাপ্তি, যত অপূর্ণ বাসনা— সব যেন ওই গলানো রুবির মতন লাল তরলের ভেতর থেকে আমাকে ডাকতে লাগল। বলল, ও গো, দেরি কেন? জীবন যে ফুরিয়ে আসছে। আমাকে নাও… আমাকে নাও! নেবে না আমাকে?
আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা… এটা কী, মিস্টার সাক্সেনা?’
বসন্ত সাক্সেনাও সম্মোহিতের মতন সেই বোতলটার দিকে চেয়ে ছিলেন। আমার কথায় চমকে উঠে সেটাকে টি-টেবিলের ওপর সাবধানে নামিয়ে রেখে, অত্যন্ত গোপন কথা বলার মতন করে বললেন, ‘সিরাজি। লাল সিরাজি। যার জন্য বাদশা জাহাঙ্গীর তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকতেন। পারস্যের লাল আঙুরের রস থেকে তৈরি মদ— মরুভূমি আর পাহাড় পেরিয়ে, দস্যুদের তলোয়ারের কোপ বাঁচিয়ে, পশু আর মানুষের পিঠে চড়ে সেই সুরার শ্রেষ্ঠ সুরার যে ক’টি এমন বোতল ভারতে এসে পৌঁছোত, তাতে সাধারণ মানুষ হাত ছোঁয়াতে পারত না। সিরাজির নেশা করতে গিয়ে অনেক নবাব অবধি ভিখিরি হয়ে যেতেন।
বসন্ত সাক্সেনা সেই সুন্দর কাচের বোতলটার কিনারায় একটা অংশের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, যেখানটায় কাচ গলিয়ে বোতলের মুখটা সিল করা রয়েছে। দেখলাম কাচের গায়ে একটা সিলমোহরের ছাপ। হরফগুলো অচেনা। বসন্ত বললেন, ‘এটা পারস্যের সুলতানের সুরাশালার সিলমোহর। আমি লিপি-বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে দেখেছি। তাছাড়া ভেতরের এই তরল, তা-ও ফরেনসিক এক্সপার্টদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছি। পরীক্ষা করিয়েছি ওয়াইন এক্সপার্টকে দিয়েও। এই বোতল, এই মদ— এর প্রত্যেকটা জিনিস চারশো বছরের বেশি পুরোনো।’
এরপর যে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে সেটাই করলাম। ‘কোথায় পেলেন এই জিনিস?’
‘এত সহজে পেয়েছি যে, আপনি বিশ্বাসই করবেন না। আজ থেকে ঠিক এক মাস আগে, সেদিন ছিল শনিবার, আমি অভ্যেসমতন অ্যান্টিকের খোঁজে মীনাবাজারের গলিঘুঁজিতে ঘুরছি। এমন সময়ে এক মুসলিম বৃদ্ধ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, বাবু, একটা ভালো জিনিস আছে, নেবেন?
এটাই মীনাবাজারের স্বাভাবিক বিক্রিবাটার দস্তুর। যেহেতু এখানকার বিকিকিনির পসরার মধ্যে অনেক চোরাই মাল থাকে, তাই কাউন্টার সাজিয়ে, লোক দেখিয়ে সেসব জিনিস বিক্রি করা যায় না। এ বাজারে গলির আবছায়া কোণে কিম্বা খাপরার চালের এঁদো ঘরের মধ্যে কোটি কোটি টাকার জিনিস হাতবদল হয়। তবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় জানি, এমন সব দালালদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বইজনই বদমাশ। এইভাবে ডেকে নিয়ে গিয়ে ঝুটো মাল গছানোর চেষ্টা করে। তেমন আনাড়ি আদমি কিম্বা পুরোনো দিল্লির রূপকথায় মুগ্ধ ট্যুরিস্টকে পেলে গছিয়ে দেয়ও অনেকসময়। তাই আমি গলাটাকে যথাসম্ভব নিস্পৃহ রেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী মাল?
লোকটা বলল, এক বোতল পুরোনো শরাব।
অবাক হয়ে গেলাম। এমন জিনিসের অফার এর আগে কখনও পাই নি। এক বোতল পুরোনো শরাব! তার মানে আমরা ভদ্রভাষায় যাকে বলি ভিনটেজ ওয়াইন!
জানতাম, ভিনটেজ ওয়াইন এক আলাদা শাস্ত্র। বহু মানুষের সারা জীবন কেটে যায় দ্রাক্ষাসবের রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ নিয়ে গবেষণায়। তাঁরা শুধু নাকের কাছে পানপাত্রটি তুলে ধরে বলে দিতে পারেন ফ্রান্সের কোন প্রদেশের কোন বাগানের আঙুরের রস থেকে তৈরি সেই ওয়াইন। কত সালে কোন কাঠের ব্যারেলে বন্দি করে তাকে সেলারের হিমছায়ায় ঘুম পাড়ানো হয়েছিল। পানপাত্রের নীচ থেকে উঠে আসা বুদ্বুদের চেহারা দেখে তারা বলতে পারেন তার পেডিগ্রি। কিন্তু জীবনের শেষে এমনকি সেই বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কিছুই জানা হল না; সুরার এমনই সূক্ষ্ণ বৈচিত্র্য। হাজার হোক, মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন বিলাসিতা তো এটাই। তার কূল পাওয়া কি অতই সোজা!
তবু মনে মনে ভাবলাম, ক্ষতি কী, দেখাই যাক না। আমরা যা যা নিলাম করি তার মধ্যে প্রাচীন সুরাও থাকে বই-কি। তাদের দাম শুনলে চোখ কপালে উঠে যাবে। সত্যি কথা বলতে কী, এমন কিছু কিছু ভিনটেজ ওয়াইন আমাদের লন্ডন হাউসের স্টকে আছে, যার নির্দিষ্ট দামই নেই, যাকে বলে ফ্যান্সি প্রাইস। যেমন পঞ্চাশ-ষাট বছরের পুরোনো বার্গান্ডি কিম্বা শ্যাম্পেন। ওয়াইনের জহুরিরা ওসব জিনিসের জন্য যা দাম চাই তা-ই দেয়। তবে ভিনটেজ ওয়াইনের ব্যাপারটা ইউরোপের একচেটিয়া। তাই ভেবেছিলাম, উনি হয়তো কোনও বনেদি বাড়ির স্টকের ডম পেরিগনন কিম্বা ক্রিস্টাল-এর বোতল জোগাড় করেছেন। মনেও ছিল না, এককালে এই এশিয়ার একটা অঞ্চলের সুরাই সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিকোত।
বৃদ্ধকে বললাম, চলুন কোথায় যেতে হবে।
কোথাও যেতে হবে না। ওটা আমার সঙ্গেই আছে। শুধু একটু আড়াল দরকার। আপনার গাড়ি রয়েছে?
বললাম, আছে। বাজারের বাইরে।
চলুন তবে।
দু’জনে হাঁটা লাগালাম চাঁদনি চকের কার-পার্কের দিকে। আমি চলছিলাম স্বাভাবিক গতিতে, কিন্তু সেই বৃদ্ধ মানুষটি বড্ড বেশি তাড়াহুড়ো করছিলেন। ফলে মাঝে মাঝেই তিনি আমার থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আবার দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন আমার জন্য। দাঁড়িয়ে থেকেও স্বস্তি ছিল না। বার বার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। যেন নির্ঘাত জানতেন তাঁকে কেউ অনুসরণ করে আসছে। বেশ বুঝতে পারছিলাম ওঁর মধ্যে একটা প্রবল অস্থিরতা কাজ করছে।
আমি চলতেই চলতেই তাঁকে ভালো করে লক্ষ করছিলাম। পোশাকে – আশাকে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। সে পোশাক ঠিক দিল্লির হালফিলের মুসলিমদের পোশাকের মতন নয়। কেমন যেন প্রাচীন দিনের ছাপ তার চোগা-চাপকানের ছাঁট-কাটে।
একই কথা বলা যায় তার চেহারা সম্বন্ধেও। বোঝাই যায়, সেই শরীরকে অনেক বছর ধরে অনেক রোদ্দুর পুড়িয়েছে, অনেক বৃষ্টি ভিজিয়েছে। তবু বৃদ্ধের শিমুলতুলোর মতন চিকন সাদা দাড়ি, চোখের নীল মণি, পাতলা ঠোঁট আর আমলকির খোসার মতন স্বচ্ছ ত্বক থেকে যেটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, সেটাকে এক কথায় আভিজাত্য ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এঁকে কিছুতেই মীনাবাজারের সাধারণ দালাল বলে ভাবা যায় না। সম্ভবত কোনও বনেদি বংশের ভাগ্যাহত উত্তরপুরুষ, অভাবের তাড়নায় বংশের সঞ্চিত সামগ্রী বিক্রি করতে এসেছেন। ওরকম অনেকেই করে, কিন্তু নিজেদের হাতে করে না। চক্ষুলজ্জা এড়াতেই মাঝখানে দালাল রাখে। ইনি কেন নিজে এসেছেন?
এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই আমার গাড়ির কাছে এসে পৌঁছেছিলাম। গাড়ি আমি নিজেই চালিয়ে এনেছিলাম, ড্রাইভার ছিল না। জানালার সব কাচও তোলাই ছিল। পিছনের সিটেই বসলাম দু’জনে। দরজাটা বন্ধ করে, এ. সি. অন করে, বৃদ্ধের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। বললাম, দিন, দেখি।
আংরাখার ভেতর থেকে বৃদ্ধ আমার হাতে তুলে দিলেন এই বোতলটা। দেওয়ার সময় বললেন, এই নিন বাবুসাব, যে জিনিস গত চারশো বছরে কেউ চোখে দেখেনি, সেই জিনিস আমি আপনার হাতে তুলে দিলাম।
রুদ্রসাহেব, একটু আগে এই সুরার বোতল আপনি যখন প্রথম দেখলেন, তখন আপনার মনের ভাব কেমন হয়েছিল বলুন। অস্বীকার করবেন না নিশ্চয়ই যে, শুধু এর রূপেই আপনি কিছুক্ষণের জন্য ভেসে গিয়েছিলেন। আমারও তখন ঠিক সেই অবস্থাই হয়েছিল। তবে আমরা হলাম জাত-বেনিয়া। হতভম্ব ভাবটা তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে গলায় যথাসাধ্য ক্যাজুয়াল ভাব ফুটিয়ে তুলে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী? কোনও লেবেল নেই, কিছু না। এটা ওয়াইন না হয়ে লাল জল হলেই বা বুঝব কেমন করে?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ আহত দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর খুব শান্ত গলায়, চোস্ত উর্দুতে বললেন, তনবীর আলম মাজহারির কথায় এর আগে কখনও কেউ সন্দেহ করেনি। বাবুসাব, বাদশা জাহাঙ্গীরের আমলে কাগজের লেবেল আবিষ্কার হয়নি। তবে সুলতানের সিলমোহর এই বোতলের কাচের ওপর ঢালাই করা আছে, দেখে নিন।
জানলাম, বৃদ্ধের নাম তনবীর আলম মাজহারি। তবে তাঁর দেখানো সেই সিলমোহরের একবর্ণও পড়তে পারলাম না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তনবীর আলম সে কথা বুঝতে পারলেন। তাই একটা ছোটো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ঠিক আছে, এখনই আমার কথায় বিশ্বাস করতে হবে না। আপনি সবদিক থেকে এই বোতলটাকে পরীক্ষা করান। এর গলানো কাচের ঢাকা ভেঙে ফেলুন, ভেতরের দ্রব্যটিকেও যাচাই করুন। যদি নিশ্চিত হন যে, আমি যা বলেছি তা সত্যি, তা হলে ঠিক তিনদিন বাদে এই সময় এখানে আসবেন। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব।
আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি যা বলছেন, এ যদি তা-ই হয়, যদি সত্যিই এটা পারসিয়ার সিরাজি হয়, তা হলে তো এ এক অমূল্য জিনিস। আপনি আমার কাছে এই জিনিস রেখে চলে যাবেন!
বৃদ্ধ বললেন, আমি অবিশ্বাস শব্দটাতেই অভ্যস্ত নই, বাবুসাব। হিমাচলের যে গ্রামটায় থাকি, সেই গ্রামে রাস্তায় একটা সোনার হার পড়ে থাকলে সারা গ্রামের লোক তার পাশ কাটিয়ে চলে যাবে, কেউ সে জিনিস ছুঁয়েও দেখবে না। অথচ ওরা সবাই গরিব, ভীষণই গরিব, বাবুসাব। ঠিক আমারই মতন। তবু বলছেন যখন, আপনার ভিজিটিং কার্ড একটা আমাকে দিয়ে রাখুন। আপনাকে এখানে না পেলে আমিই আপনার কাছে চলে যাব।’
তারপরেও বসন্ত সাক্সেনা আরও প্রায় পনেরো মিনিট ধরে নিজের গাড়ির মধ্যে বসে তনবীর আলম মাজহারির কথা শুনেছিলেন। এই সেই কাহিনি।
.
তিন
হিমাচল প্রদেশের মণিকরণ জায়গাটা তীর্থযাত্রী আর ট্যুরিস্টদের কল্যাণে সবার কাছেই খুব পরিচিত। কিন্তু তারই কিছুটা উত্তরে বেশ কয়েক হাজার ফিট ওপরে এমন এক দুর্গম গ্রাম রয়েছে যেখানে সভ্যতার কোনও চিহ্নই পৌঁছোয়নি। সেখানে না আছে পাকা রাস্তা, না রয়েছে বিদ্যুৎ। স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, রেশনের দোকান, পোস্ট অফিস– কিচ্ছু নেই। যেন প্রশান্ত মহাসাগরের এক নাম-না-জানা দ্বীপ হিমালয়ের চূড়ায় উঠে পড়েছে।
সেই গ্রামে বড়োজোর খান তিরিশেক পরিবারের বাস। তারা পাহাড়ের ঢালে ধাপ-চাষ করে। রামদানা আর মকাই ফলায়। গাই- বকরি পালে। তাছাড়া আশেপাশের জঙ্গলে খরগোশ কিম্বা বনমোরগ শিকার করা যায়। সারাদিন পাহাড়ি ঝোরার বরফশীতল জলে জাল টানলে একমুঠো কুচোমাছও পাওয়া যায়। এসব দিয়েই সেই গ্রামের ওই তিরিশটা পরিবারের ছেলেমেয়ে, বুড়োবুড়ির খিদে মেটে, কিম্বা মেটে না।
বাইরের কোনও লোক যদি কখনও সেই গ্রামের চড়াই রাস্তা ধরে ওপরের দিকে হেঁটে যায়, তা হলে একটু বাদেই সে শ্লেটপাথরের টালিতে ছাওয়া কাঠের ছোটো ছোটো কুঁড়েঘরগুলোকে ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে টিলার মাথায় একটা বড়ো সমতল জায়গায়। সেখানে দাঁড়ালে সে দেখতে পাবে, তাকে চক্রাকারে ঘিরে রয়েছে ধৌলাধার পর্বতশ্রেণির তুষারশৃঙ্গগুলো। তার পায়ের নীচে মরকত-সবুজ পাইনের বন ঢালু হয়ে নেমে গেছে অনেক নীচে রুপোলি ফিতের মতন পড়ে থাকা পার্বতী নদীর পাড়ে। সে দেখতে পাবে কোথাও কোথাও অরণ্যের সবুজ চাঁদোয়ার মাথা ছাড়িয়ে সাদা ধোঁয়ার একটা রেখা আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে তকতকে নীল আকাশের দিকে। সে বুঝতে পারবে ওইখানে জঙ্গলের আড়ালে রয়েছে আরও একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম।
আবার সে এসব কিছুই না-ও দেখতে পারে। কারণ, তার চোখ টেনে নিতে পারে সে যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঠিক সেই জায়গাটা। তখন সে অবাক হয়ে দেখবে, সমতল জমিটার চারিদিকে বড়ো বড়ো পাথরের ইট আর কাঠের কড়িবরগা ছড়িয়ে রয়েছে। পুরো জায়গাটাকে ঘিরে রয়েছে একটা পাথরের পাঁচিল যার অনেকটাই ভেঙে পড়লেও যেটুকু এখনও আস্ত রয়েছে তার থেকেই বোঝা যায় যে এককালে ওই পাঁচিল ছিল অন্তত কুড়ি ফিট উঁচু। তাছাড়াও তার চোখে পড়বে মাটির বুকে বড়ো বড়ো পাথরে-বাঁধানো চৌবাচ্চা, কিছু ভাঙাচোরা ঘর। পাথরের টালি দিয়ে বাঁধানো রাস্তাটাও প্রায় অটুট।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তনবীর, বসন্ত সাক্সেনাকে বললেন, ‘কিন্তু বাইরের লোক তো ও গ্রামে যায়ই না, বাবুসাব। কেমন করে যাবে? মোটরের রাস্তা ছেড়ে দিন, একটা ভালো পায়ে চলার পথই তো নেই।
‘কিন্তু ওই ধ্বংসস্তূপটা তা হলে কীসের? কোনও দুর্গ?’
‘আমার গ্রামটার কথা আর-একটু বলি, বাবুসাব। তা হলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন ও খন্ডহর কীসের। আজ মোটরগাড়ি-রেলগাড়ির যুগে যে গ্রামকে সবাই এড়িয়ে চলে, পায়ে হাঁটার যুগে সেই গ্রামটাই ছিল যেন একটা জমজমাট ইস্টিশন। হ্যাঁ, বাবুসাব। ইস্টিশনে যেমন রেলগাড়ি দাঁড়ায়, প্যাসেঞ্জারেরা বিশ্রাম নেয়, খাবার খায়, গাঁঠরি খোলে, গাঁঠরি বাঁধে— আমাদের ওই গ্রামটাও ছিল দিল্লি থেকে লাদাখ হয়ে তিব্বতের বাণিজ্যপথের ওপরে এক বড়ো ইস্টিশান। ঘোড়া আর খচ্চরের পিঠে মাল চাপিয়ে যে শয়ে শয়ে বণিক ওই পথে যাতায়াত করত, তারা বিশ্রাম নিত ওইখানে। তা হলেই বুঝতে পারছেন, বাবুসাব, ওটা কীসের ধ্বংসস্তূপ। সরাইখানা, বাবুসাব, সরাইখানা। চারশো বছর আগে এক মশহুর সরাইখানা ছিল ওই জায়গাটায়। ওই যে চৌবাচ্চাগুলোর কথা বলছিলাম, ওগুলো সব ঘোড়াদের জল খাওয়ার চৌবাচ্চা। এমন প্ল্যান করে বানানো যে, আজও পাহাড়ি ঝোরার জল নালি দিয়ে এসে ওই চৌবাচ্চা ভরে দেয়। আজও পুবদিকটায় মেঝেতে বড়ো বড়ো তন্দুর- উনুনের গর্ত দেখতে পাবেন। আর পাঁচিল? সে তো থাকবেই, বাবুসাব। তখন দস্যুদের অত্যাচার তো ছিল সাংঘাতিক। সরাইখানাগুলোর ওপর মঙ্গোল দস্যুদের নজর ছিল খুব, কারণ, ওরা জানত ওই সরাইখানার আগুনের ধারে বসে যারা গল্পগুজব করছে তাদের পোশাকের আড়ালে লুকোনো রয়েছে সোনার দিনারের থলি। আর বাণিজ্যের জন্য বয়ে নিয়ে চলা তামা-পেতলের তৈজস, হাতির দাঁত, রেশম এসবের কথা তো ছেড়েই দিন।
বসন্ত সাক্সেনা, তনবীর আলমের কথার স্রোতে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কিন্তু এভাবে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল কেমন করে? এরকম সরাইখানাকে ঘিরেই তো পৃথিবীর নানান জায়গায় পরবর্তী কালে আরও বড়ো জনপদ গড়ে উঠেছে। লোকজন ছেড়ে চলে গেছে বলে তো শুনিনি কোথাও।’
‘ওই যে বললাম, দস্যুর অত্যাচারে। এত ঘন ঘন তারা হামলা করতে শুরু করেছিল যে, বণিকেরা অন্য একটা রাস্তা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা একটু ঘুরপথ হলেও মুঘল রাজসৈন্যদের চৌকির গা ঘেঁষে বানানো। ফলে সুরক্ষাটা ছিল বেশি।’
‘আর এই সরাইখানাটা জল-না-পাওয়া গাছের মতন আস্তে আস্তে শুকিয়ে গেল, তা-ই তো?’ বললেন বসন্ত সাক্সেনা।
‘আস্তে আস্তে? না, বাবুসাব। আমরা সকলেই তা-ই ভাবতাম। কিন্তু গত মাসে বুঝতে পারলাম আস্তে আস্তে নয়, হঠাৎই একটা আঘাতে শেষ হয়ে গিয়েছিল ওই সরাইখানার মালিক, কর্মচারী সকলের প্রাণ। না হলে ওই জিনিসগুলো চারশো বছর ধরে ওইভাবে পড়ে থাকত না।’
‘ওই জিনিসগুলো মানে? ওই শরাবের বোতলগুলো? তার মানে ওগুলো আপনি নিজের গ্রামে ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই পেয়েছেন?’
উত্তরে তনবীর আলম যা বললেন, তাতে বোঝা গেল, বসস্ত সাক্সেনার অনুমান নির্ভুল। তনবীরের মতে, সে ঘটনা তাঁর প্রতি খোদাতালার রহম ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁরই কুদরতে ফকির তনবীর আলম গুপ্তধনের সন্ধান পেলেন। তাঁর আজন্ম পরিচিত ওই ভগ্নস্তূপ, যেখানে তিনি শৈশবে লুকোচুরি খেলেছেন, যে উঠোনের পপলার গাছের নরম গায়ে যৌবনে ছুরি দিয়ে প্রেয়সীর নাম লিখেছেন, যে ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি ইটকে তিনি মনে করতেন তাঁর চেনা, সেইখানেই একটা পুরোনো ঘরের ভাঙা কাঠের মেঝের গর্ত দিয়ে তাঁর একটা ছাগলছানা নীচে পড়ে যায়। ছাগলটাকে উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন ঘরটার তলায় ভিত নেই, রয়েছে আরও একটা ঘর।
কাউকে কিছু জানাননি তনবীর— স্ত্রীকে নয়, ছেলেকে নয়, পাড়া- প্রতিবেশীকে তো নয়ই। তিনি একটা ছোটো মইয়ের সাহায্যে, লণ্ঠন হাতে নিয়ে নেমে পড়েছিলেন সেই মাটির নীচের চোরাকুঠুরিতে।
ঘরটার প্রায় বারো আনা জুড়েই পাইনকাঠের বড়ো বড়ো বাক্স টাল দিয়ে সাজানো ছিল। পাইনকাঠে এমনিতেই পোকা লাগে না। তার ওপর উত্তর হিমাচলের মরুভূমির মতন শুকনো শীতল আবহাওয়ায় সহজে পচনও ধরে না কোনও কাঠে। সেইজন্যই ওই অঞ্চলে আজও চার-পাঁচশো বছরের পুরোনো কাঠের মন্দির হামেশাই দেখতে পাওয়া যায়। চোরাকুঠুরিতে সাজিয়ে রাখা পাইনকাঠের বাক্সগুলোও মোটামুটি অবিকৃতই ছিল।
তনবীর আলমের নিজের ভাষায়, বাক্সগুলো দেখার পর তাঁর বুকটা এত জোরে ধুকপুক করছিল যে, তাঁর ভয় হচ্ছিল সেই আওয়াজ শুনতে পেয়ে আশেপাশের মাঠঘাট থেকে লোকজন ছুটে আসবে। কারণ, তিনি ভেবেছিলেন বাক্সগুলো ভাঙলেই দেখতে পাবেন হিরে-জহরত।
প্রথমটায় তিনি হতাশই হয়েছিলেন, যখন হিরে-জহরতের বদলে বাক্স থেকে বেরিয়েছিল এই রকম শরাবের বোতল। পরে অবশ্য তনবীর আলম ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছিলেন, মুঘলযুগের সরাইখানায় হিরে-জহরত লুকনো থাকবে কেন? বরং বাণিজ্যপথের যাত্রী বিত্তশালী বণিকদের গলা ভেজানোর উপকরণ হিসেবে শরাবের মজুত থাকাটাই তো স্বাভাবিক। রাজধানী থেকে অনেক দূরে ওই সরাইয়ে তো সবসময় সব জিনিস হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত না। তাই হয়তো সারা বছরের পণ্য একেবারেই কিনে রাখা হত। সেইজন্যই অমন শ-পাঁচেক সিরাজির বোতল মাটির নীচে ঠান্ডা ঘরে জমিয়ে রাখা ছিল।
কিন্তু সরাইখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় মালিক ওগুলোকে বিক্রি করে দিয়ে যাননি কেন?
এর একটাই উত্তর হয়। মালিক, কর্মচারী সকলেই আকস্মিকভাবে মারা পড়েছিল। তারা জানতই না যে তাদের সময় ফুরিয়ে এসেছে। সে মৃত্যু মঙ্গোল ডাকাতদের হাতেও হতে পারে, আবার কোনও মড়ক কিম্বা তুষারঝড়েও হতে পারে। তবে দস্যুদের হাতে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ডাকাতেরা জানতেও পারেনি সেই সম্পদের কথা, যা তখনই ছিল মহার্ঘ। যত দিন গেছে, যত বছর কেটেছে, ততই মাটির নীচে লুকিয়ে রাখা সেই সুরার বোতলগুলো হয়ে উঠেছে অমূল্য— পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ভিনটেজ ওয়াইনের সংগ্রহ।
আরও একটু পরে, মাথাটা ঠান্ডা হলে, তনবীর আলম ভেবে দেখেছিলেন হিরে-জহরতের থেকে এই সুরার বোতলগুলো পেয়ে একদিক থেকে ভালোই হল। কারণ, তাঁর মতো মানুষের পক্ষে ধনদৌলতের বিলি বন্দোবস্ত করা অসম্ভব কাজ। করতে গেলে হয় ডাকাত, নয় পুলিশের হাতে মরতেন। তার চেয়ে বরং এই দামি শরাবগুলো আস্তে আস্তে বিক্রি করে দেওয়া অনেক সহজ। আর সোনাদানা হাতে পেলে নিশ্চয়ই তাঁর মনটা খুঁত খুঁত করত— কী জানি কার কষ্টার্জিত ধনদৌলত আত্মসাৎ করছি। কিন্তু একজন ধর্মভীরু মুসলমান হিসেবে সুরার বোতলগুলোকে গ্রামের চৌহদ্দি থেকে তাড়াতাড়ি বিদায় করার পরিকল্পনার মধ্যে তিনি পাপ নয়, পুণ্যই খুঁজে পাচ্ছিলেন। সেদিক থেকেও কাজটা তাঁর পক্ষে সহজ হয়ে গেল।
এরপর বাকি রইল জিনিসগুলোর সঠিক দাম যাচাই করা আর তাদের বিক্রি করার কাজ। সেই কাজেই তনবীর আলম দিল্লি এসেছিলেন। তার মতো গ্রাম্য, ইংরিজি-না-জানা গরিব লোকের পক্ষে নিজের হাতে এ কাজটা করা ছিল মুশকিল। অতএব তিনি কপাল ঠুকে মুরুব্বি ধরলেন বসন্ত সাক্সেনাকে।
***
‘মিস্টার রুদ্র!’ সাক্সেনার শরীরটা হঠাৎই টেবিল পেরিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল। চাপা গলায় বললেন, ‘ওয়াইন এক্সপার্টদের মতে, এরকম সিরাজির বোতলের টাকায় কোনও দাম হয় না, এগুলো কালেক্টর’স আইটেম। ওয়াইন কাউন্টারে এরকম একটা বোতল সাজানো থাকলে বলিউড ছেড়ে দিন, হলিউডের সুপারস্টারদেরও ইজ্জত বাড়ে। সদবী কিম্বা ক্রিস্টির নিলামখানায় বহু বছর বাদে বাদে হয়তো এরকম একটা বোতল নিলামে ওঠে— লক্ষ লক্ষ ডলার, পাউন্ড কিম্বা ইয়েনের বিনিময়ে সেই বোতল চলে যায় কোনও ধনকুবেরের ঘরে। তবু ধরুন, যদি একটা বোতলের দাম কম করে পাঁচ লক্ষ টাকাই ধরি, তা হলেও ওই পাঁচশো বোতলের দাম পঁচিশ কোটি টাকা। টু মাচ! তা-ই না?
সেইজন্যই তনবীর আলমের সঙ্গে দেখা হওয়ার ঠিক তিন দিন বাদে আমি পাঁচশো খানা হাজার টাকার নোট, মানে পাঁচ লক্ষ টাকা ওর নোংরা বেডিং-এর মধ্যে নিজের হাতে বেঁধে দিয়ে বলেছিলাম, এটা অ্যাডভান্স। ফিরে যান নিজের গ্রামে। নিয়ে আসুন পুরো মাল। দিল্লি অবধি আনবার তকলিফ আপনাকে করতে হবে না। আপনি স্রেফ মণিকরণে নামিয়ে দিন। বাকি ব্যবস্থা আমার লোকেরা করবে।
আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর দক্ষ দু’জন কর্মচারীকে তনবীর আলমের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম মণিকরণে, ট্রান্সপোর্টের পুরো ব্যাপারটা অ্যারেঞ্জ করার জন্য। আমি ভাবিনি কাজটায় কোনও অসুবিধে হবে বলে, কারণ, আপনার কাছে লুকোব না— ওই দু’জন কর্মচারী সুরেশ আর আদিল, ওরা ছিল অ্যাকচুয়ালি আমার হেঞ্চম্যান, পোষা খুনে। তাছাড়া হিমাচল প্রদেশ গভর্মেন্টের দু’জন মন্ত্রীর সঙ্গে আমার আত্মীয়তা আছে। মাসল পাওয়ার বলুন, পলিটিকাল পাওয়ার বলুন— সব অ্যারেঞ্জ করে দিয়েছিলাম তনবীর আলমের নিরাপদ যাত্রার জন্য।
তবু ওরা মণিকরণেই পৌঁছোতেই পারল না। তার আগেই সুরেশ আর আদিল খুন হয়ে গেল।
ওদের গুলিতে ঝাঁঝরা বড়িগুলো মণিকরণের একটু আগে হাইওয়ের ওপর পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকেরা পুলিশে খবর দেয়। ওখানকার পুলিশ অবশ্য দুটো বডির মধ্যে একটাকেও আইডেন্টিফাই করতে পারেনি। সেটা স্বাভাবিক। পরিচয় জানা যায় এরকম এককুচি কাগজও ওদের সঙ্গে ছিল না, থাকে না। পুলিশ এখনও অন্ধের মতন হাতড়ে বেড়াচ্ছে ওই মৃতদেহগুলোর পরিচয় জানবার জন্য। এই সবই ওখানে আমার যিনি পলিটিকাল সোর্স আছেন তিনি আমাকে জানিয়েছেন। অবশ্য তাকেও আমি এদের আসল কাজ, কীসের খোঁজে আমার লোকেরা ওই গ্রামে যাচ্ছিল, সেসব কিছুই বলিনি। তবে ওই দু’জন যে আমারই লোক সেটা উনি জানতেন।
‘আর তনবীর আলম? তাঁর খোঁজ পাননি?’
‘না। এরপরে আমি অন্যভাবে ট্রাই করেছিলাম। আমার সেই পলিটিকাল কানেকশনের কথা বলছিলাম না, তাঁকে ধরে, একটা ট্যুরিস্ট হেলিকপ্টারে করে আমার দশজন বাছাই লোককে ওই গ্রামে পাঠিয়েছিলাম। দে ওয়ার আর্মড টু দ্য টিথ। এমন কোনও অস্ত্র নেই যা ওদের সঙ্গে ছিল না— গ্রেনেড, মর্টার, স্টেনগান সব কিছু। ওরা নেমেওছিল ঠিকঠাক। যে পাহাড়টার ওপরে গ্রাম, তার একদম চূড়ায় ওই হেলিকপ্টার ল্যান্ড করেছিল। কিন্তু তারপর ওদের হাতে আমার লোকগুলো কচুকাটা হয়ে গিয়েছিল। আমার হেলিকপ্টারটাও গ্রেনেড মেরে ভেঙে দিয়েছে বলে শুনেছি।’
প্রশ্ন করলাম, ‘ওদের হাতে মানে কাদের হাতে?’
‘সেইটাই তো জানি না। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, ওই ভিনটেজ ওয়াইনের স্টকের কথা আরও কেউ জানতে পেরেছে। সাম নোটোরিয়াস গ্রুপ। তারাও সহজে ছাড়বে না।’
আমি বললাম, ‘তা হলে এখন আমি গিয়ে কী করব? মাল তো হাওয়া হয়ে গেছে।’
বসন্ত সাক্সেনা বললেন, ‘না, মিস্টার রুদ্র। ওই পাহাড়ের নীচে আমার লোকেরা ঘাঁটি গেড়ে দিনরাত পাহারা দিচ্ছে। ওরা কাউকে ওখান থেকে বেরোতে দেবে না।’
আমি বললাম, ‘তার মানে এখন কন্ডিশনটা ইংরিজিতে যাকে বলে স্টেলমেট, তা-ই তো?’
‘বিলকুল। কেউ জমি ছাড়ছে না। এদিকে আমার অবস্থা ভাবুন। না পারছি পুলিশকে জানাতে, কারণ তা হলে ওই আনক্লেম্ম্ড মাল সরকারি মালখানায় জমা পড়ে যাবে। আবার খুব বেশি ভায়োলেন্সকেও ভয় পাচ্ছি। কারণ, ওই জিনিসগুলো খুব নাজুক তো। যদি গোলাগুলির মধ্যে পড়ে বোতলগুলোই ভেঙে যায়, তা হলে আমার কী ফায়দা বলুন!
তাই এ কাজটা আপনাকেই করতে হবে। আমি বুঝতে পারছি, মিস্টার রুদ্র, রাজার দৌলত আমার হাতে এসেও আবার পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে। আপনিই একমাত্র তাকে ধরে রাখতে পারেন। আপনি একবার যান ওখানে। আপনার যা সাপোর্ট লাগে আমি দেব; আর্মস, টাকা— সবকিছু। একবার শুধু কোনওভাবে ওই সরাইখানায় ঢুকে পড়ন। আপনার রেপুটেশন আমি জানি। ভেড়ার গোয়ালে নেকড়ে বাঘ ঢুকে গেলে যা হাল হয়, আমার অপোনেন্টের সেই হাল করে দেবেন আপনি।’
****
নয়ডার শহরতলির সেই বাড়ির বারান্দায় বসে দেখতে পাচ্ছিলাম, সরষে আর ভুট্টার খেতের প্রান্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। দূরে দূরে বাবলা গাছের জঙ্গল। সেই জঙ্গলের ভেতর থেকে ময়ুরের কেঁওয়া কেঁওয়া ডাক ভেসে আসছে। শীতের সন্ধেয় চারিদিকে বিরাজ করছে অখণ্ড শান্তি। কোথাও ভায়োলেন্সের কোনও চিহ্নই নেই। তবুও আমার নাকে হঠাৎই যেন পোড়া কার্তুজের গন্ধ এসে লাগল। নিজের অজান্তেই আমার হাতের মুঠিদুটো শক্ত হয়ে উঠল। কাঠের ব্যারেলের উষ্ণতা আর লোহার ট্রিগারের শৈত্য পরিষ্কার অনুভব করলাম সেই মুঠোর মধ্যে। মন বলল, সামনে একটা লড়াই আছে; আমি নিয়তিবাধ্য সেই লড়াইয়ে নামতে।
শুধুই কি নিয়তিবাধ্য? আর কিছু নয়?
হলেও সেটা বসন্তর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা ভীষণই জরুরি। অতএব কথা না বাড়িয়ে আমি ডানহাতটা ওঁর বাড়ানো হাতের দিকে দিকে এগিয়ে দিলাম।
‘ডিল পাক্কা। তবে…’
‘তবে কী, রুদ্রসাহাব?’ বসন্তের চোখে নতুন করে উদ্বেগের ছায়া ঘনাল।
‘নাহ্, তেমন কিছু নয়’ আমি জবাব দিলাম। ‘আমার সঙ্গে একজন মহিলা যাবেন।’
‘মহিলা! ইউ মিন আ লেডি?’
‘হ্যাঁ।’
আমার প্রস্তাব শুনে বসন্ত সাক্সেনার চোখের মণিদুটো মনে হল সকেট ছেড়ে ছিটকে বেরিয়ে আসবে। অনেকক্ষণ লাগল তাঁকে আমার প্ল্যান বোঝাতে। শেষ অবধি অবশ্য তিনি মেনে নিলেন, ‘হাঁ, ইসকো হি কহতে হ্যায় বাংগালি দিমাগ। কিতনা শার্প! কিন্তু রুদ্রসাহেব, নিজের জান বাজিতে লাগাবে এমন মেয়ে পাবেন কোথায়?’
‘আহা, সে তো আমার গার্লফ্রেন্ড। তাছাড়া আমার সঙ্গে কে মরতে যাবে বলুন?’
‘ও বাত তো বিলকুল সহি,’ বিজ্ঞের মতন ঘাড় নাড়লেন বসন্ত। আমি বললাম, ‘এবার বলুন, আমাকে যেতে হবে কোথায়?’
বসন্ত সাক্সেনা যে ধুরন্ধর লোক আর-একবার তার প্রমাণ পেলাম। দু’হাত জোড় করে ভারী অপরাধী গলায় বললেন, ‘মাফ করবেন, রুদ্রসাহেব। গ্রামটার নাম বলতে পারব না। তবে ওই গ্রামের সীমানা অবধি আমার লোকেরা আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আসবে। আপনাকে আর আপনার সহেলিকে। বুঝতেই পারছেন…’
ওঁর অসম্পূর্ণ বাক্যটা আমি সম্পূর্ণ করলাম, ‘যদি গুপ্তধনের ঠিকানা নিয়ে ভেগে যাই, তা-ই তো?’
‘রাম রাম!’ কানে হাত ছোঁয়ালেন বসন্ত সাক্সেনা। ঠোঁটে কিন্তু সম্মতির হাসি।
.
চার
সারা রাত ব্লিজার্ড বয়েছে। ভোরের দিকে প্রবল বাতাস এবং বরফপাত— দুটোই কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিল। মীনাহার গ্রামের নীচের পাহাড়ি ঢালে, আদিগন্ত সাদা বরফের প্রান্তরের মধ্যে দাঁড়িয়ে, চার-পাঁচটা লোমশ কুকুর পরিত্রাহি চিৎকার করছিল। তারা কী যেন দেখেছে।
মীনাহার গ্রামের লোকজন কুকুরগুলোর বিরামহীন চিৎকারে আকৃষ্ট হয়ে সেই জায়গাটায় পৌঁছে যা দেখল, তাতে তো তাদের চক্ষু চড়কগাছ। তারা দেখল, কুকুরদের বৃত্তের মাঝখানে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে দু’জন নারীপুরুষ। সারারাতের ঝরে পড়া তুষারের তলায় তাদের শরীরের অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। তারা যেখানটায় শুয়ে আছে তার থেকে অনেকটা দূরে পড়ে আছে ছিন্নভিন্ন একটা সুইস টেন্ট বা ছোটো তাঁবু- একেবারেই পলকা জিনিস। বোঝাই যাচ্ছে, ওরা দু’জন ওই তাঁবুটার আড়ালে রাত কাটাতে গিয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
গ্রামবাসীদের মধ্যে ওই গ্রামের গাঁওবুড়ো তীরথ রাণাও ছিল। সে ওদের নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখল, নিশ্বাস বইছে। অতঃপর তীরথ রাণার কাঠের দেওয়াল, পাথরের টালির চালওলা বড়ো বাড়িটাতেই ওদের বয়ে নিয়ে আসা হল। সেঁক তাপ, গরম দুধ এবং তার মধ্যে কী সমস্ত জড়িবুটি— এত কিছুর পরে আর অজ্ঞান হয়ে থাকাটা ভালো দেখায় না। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে বসলাম। ওঠবার সময়েই জেতাকে একটা কনুইয়ের খোঁচা দিয়েছিলাম। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে ও ‘আমি কোথায়, আমি কোথায়’ বলতে বলতে উঠে বসল।
জেতাকে নিয়ে এই এক মুশকিল। ও আমারই মতন চিত্তরঞ্জন পার্কের বাঙালি। কিন্তু পড়াশোনাটা করেছে হেভি হাইফাই একটা কনভেন্ট স্কুলে। সেখানে নাকি শেক্সপিয়রের নাটক-টাটক করত। সেইজন্যই এখনও চান্স পেলেই একটু বেশি নাটক করে ফেলে। তার ওপরে ভয়ংকর রোমান্টিক। বসন্ত সাক্সেনার বাড়ি থেকে ফিরে কনট সার্কাসের একটা এঁদো রেস্তোরায় ওর সঙ্গে দেখা করে আমাদের অ্যাসাইনমেন্টটা ওকে বুঝিয়ে বলতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু পুরোটা বলার আগেই, সিরাজির কথা শুনেই ও প্রায় মূৰ্চ্ছা যাচ্ছিল। চোখ-টোখ ঢুলু ঢুলু করে, পর পর বেশ কয়েকটা ফিৎজেরাল্ডের অনুবাদে ওমর খৈয়াম আওড়াল— যাদের মধ্যে সুরা আর সাকির জন্য অনেক হা-হুতাশ রয়েছে। ওকে বাস্তব জগতে ফেরাবার জন্য বাধ্য হয়েই বলতে হয়েছিল, ‘ওখানে কিন্তু সিরাজির জন্য বেশ কয়েকটা লাশ পড়ে গেছে। একটা হেলিকপ্টারও উড়িয়ে দিয়েছে।’
জেতা অবিচলিতভাবে বলেছিল, ‘তাতে আর অবাক হওয়ার কী রয়েছে? যুগে যুগেই সিরাজির জন্য অনেক রক্ত ঝরেছে, আবারও না- হয় ঝরবে।’
কী লেভেলের রোমান্টিক ভাবুন!
অবশ্য ওই অ্যাকশনের দিনটায় ও আর বিশেষ বাড়াবাড়ি করেনি। মীনাহার গ্রামের লোকজন আমাদের দু’জনকে ঘিরে ধরে জানতে চাইল আমরা কে, কোথা থেকে আসছি ইত্যাদি। উত্তরগুলো আমরা দু’জনে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যভাবেই দিলাম।
গ্রামটার কিছু আগে, একটা খাড়াই ট্রেক-রুটের শেষে সত্যিকারেই একটা ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে। সেই গ্রামের নাম মালানা। ওখানে অদ্ভুত এক জনগোষ্ঠী থাকে। তারা নাকি আলেকজান্ডারের সঙ্গে আসা গ্রিক সেনাদের বংশধর। তাদের দেবতার নাম জমলু। সভ্য জগতের লোকেরা তাদের কথা জেনেছে অল্প কয়েক বছর আগে। খুব ডাকাবুকো ট্যুরিস্ট ছাড়া ওই দুর্গম পথে বেশি কেউ যায় না, তার ওপর এমন তীব্র শীতের দিনে।
বললাম, আমরা অমনই দুই মাথামোটা ট্যুরিস্ট, যারা মালানা যেতে গিয়ে পথ হারিয়ে মরতে বসেছিলাম।
গ্রামবাসীরা গল্পটা অবিশ্বাস করল না। তবে আমরা জানতাম ওরাই শেষ কথা নয়। আর-একবার আমাদের পরীক্ষা হবে। হলও তা-ই। দুপুরের দিকে, তখন আমরা সবে খাওয়া-দাওয়া করে একটু শুয়েছি, হঠাৎই এক লাথিতে ঘরের কপাট হাট হয়ে খুলে গেল। দেখলাম দরজার বাইরে পাঁচ-ছ’জন বন্দুকধারী লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের যে দলপতি, পরে জেনেছিলাম তার নাম কুন্দন সিং, এগিয়ে এসে এক হ্যাঁচকা টানে আমাকে খাট থেকে মেঝেতে ফেলে দিল। ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। জেতাও দারুণ অভিনয় করল। ভয়ে মুখ-চোখ ফ্যাকাশে করে এমন হাঁউমাউ কান্নাকাটি শুরু করে দিল যে, কার সাধ্য ওকে দেখে বলবে ওর খালি- হাতে মানুষ মারার অভিজ্ঞতা আছে।
যা-ই হোক, কুন্দন সিং আর ওর দলবল আমাদের দু’জনের রাকস্যাকদুটো খুলে, যাকে বলে চিরুনি তল্লাশি চালাল। সন্দেহজনক কিছুই পেল না, বরং আমাদের ইনার লাইন পারমিট দুটো দেখে খুব ইমপ্রেড হল। সেগুলোতে আমাদের দু’জনের পরিচয় দেওয়া ছিল জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্ব বিভাগের গবেষক হিসেবে। বসন্ত সাক্সেনাই ওই কাগজদুটো আমাদের জন্য বানিয়ে দিয়েছিলেন, একেবারে ছবি-টবি সমেত। যাওয়ার সময় কুন্দন সিং আমার ব্যাগ থেকে এটা দামি পারফিউম নিয়ে পকেটে ঢোকাল, তারপর বলল, ‘এখানে আছ থাকো, কিন্তু ভুল করেও যদি ওপরে ওই খন্ডহরের দিকে পা বাড়িয়েছ তো কচুকাটা করে ফেলব।’
আমি হাতজোড় করে বললাম, ‘আমরা যেখানে থাকি, সেই দিল্লি শহরটাই সুলতানি আমলের খন্ডহরে ভরতি। কাজেই আমাদের মীনাহারের খন্ডহর দেখবার কোনও বাসনা নেই। কাল সকাল হওয়ার আগেই আমরা মণিকরণে ফিরে যাব।’
‘বেশ বেশ।’ এই বলে গম্ভীর মুখে চড়াই রাস্তা ধরে ওপরের দিকে হাঁটা লাগাল পাঁচ মস্তান।
***
রাতে তীরথ রাণার ঘরেই রয়ে গেলাম। সেই যে তুষারঝড় শুরু হয়েছিল, মাঝে মাঝে এক-দেড় ঘণ্টার বিরাম ছাড়া, তা চলছে তো চলছেই। আমরা যে ঘরটায় ছিলাম, তার জানালার কাচের শার্সির মধ্যে দিয়ে গ্রামের মাথার কাছে ভাঙা সরাইখানাটা দেখা যাচ্ছিল। অনেকটা জায়গা নিয়ে পাঁচিল ঘেরা এক প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ, ঠিক বসন্ত সাক্সেনা যেমন বলেছিলেন। আমি সম্মোহিতের মতন তাকিয়ে ছিলাম ওইদিকে।
অবশ্য আমি সেই ধ্বংসস্তূপকে দেখছিলাম, না কি সেই ধ্বংসস্তূপই আমাকে দেখছিল, সে বিষয়ে মাঝে মাঝে একটু খটকা লাগছিল। এমনই সেই পোড়োবাড়ির চেহারা যে, মনে হচ্ছিল একটা কুৎসিত প্রাগৈতিহাসিক ড্রাগন ঘাড় বাড়িয়ে আমার গতিবিধি লক্ষ করছে। এটা আরও মনে হচ্ছিল, চারিদিকের ভাঙাচোরা ঘরবাড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মোটামুটি আস্ত মিনারের জন্য। মিনারের চূড়ায় দুটো পাল্লা ভাঙা জানালা। যেন ড্রাগনের লম্বা গলার ওপর বসানো দুটো হিংসুটে চোখ
হঠাৎই একটা চোখে কীসের যেন চকমকানি দেখলাম। একপলকের জন্য দেখা দিয়েই আলোর ঝিলিকটা মিলিয়ে গেল। আমার রাকস্যাকে একটা বাইনোকুলার ছিল। জিনিসটা দেখতে অতি সাধারণ বাইনোকুলারেরই মতন, যে কারণে কুন্দন সিংদের মনে কোনও সন্দেহের উদ্রেক করেনি। কিন্তু আসলে ওটা নাইট-ভিশন বাইনোকুলার। আমি রাকস্যাক থেকে সেটাকে বার করে হাতে নিলাম।
ওই! ওই যে আবার সেই ঝিলিক। খুব সাবধানে বাইনোকুলারটা চোখে লাগালাম।
কোনও ভুল নেই। আলোটা ঠিকরোচ্ছে একটা ইস্পাতের নল থেকে। আর ইস্পাতের নলের মানে আমার থেকে ভালো কে জানে?
জেতা ঘরের কোণে একটা বেতের চেয়ারে বসে পুরোনো খবরের কাগজ থেকে ক্রসওয়ার্ড পাজল সল্ভ করছিল। ওকে বললাম, ‘বাড়িটাকে দুর্গ বানিয়ে রেখেছে, বুঝলে?’
জেতা উত্তরে বলল, ‘আট অক্ষরে ফুলের নাম বলতে পারো, শুরুতে ডাবলিউ?’
‘ধুত্তেরিকা!’ চোখে হাত চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। এ মেয়েকে নিয়ে কেউ বাইরে বেরোয়?
কিন্তু শুলেই কি আর ঘুম আসে, না মন থেকে দুশ্চিন্তাগুলো পালায়? হাজার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
আজ একটু আগেই কথায় কথায় তীরথ রাণাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তনবীর আলম মাজহারির বাড়িটা কোনদিকে?’ সে তো আমার প্রশ্ন শুনে আকাশ থেকে পড়ল। বলল, কস্মিনকালেও মীনাহার গ্রামে অমন কোনও মানুষ ছিল না। মাজহারি পরিবারও এখানে কোনওদিন বাস করেনি।
অর্থাৎ তনবীর আলমের সঙ্গে মীনাবাজারে বসন্ত সাক্সেনার দেখা হওয়ার গল্পটা পুরোটাই মিথ্যে।
কিন্তু সিরাজির গল্পটাও কি মিথ্যে?
তা যে নয়, সে তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। পুরোপুরি অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত একটা গ্যাং মীনাহার গ্রামের সরাইখানা পাহারা দিচ্ছে। কোতল হয়েছে সুরেশ আর আদিল। এমনকি যে ঘরটায় বসে আছি, তার জানালা দিয়েই দেখতে পাচ্ছি, অনেকটা দূরে, সরাইখানার ও মাথার অনেক ওপরে, একটা ডানাভাঙা প্রাগৈতিহাসিক পতঙ্গের মতন পড়ে রয়েছে সেই হেলিকপ্টারটা, যেটাকে বসন্ত সাক্সেনা সিরাজি দখলের জন্য এখানে পাঠিয়েছিলেন।
তীরথ রাণাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কুন্দন সিং আর তার দলবলের পরিচয়। জবাবে সে যা বলল, তার থেকে বুঝতে পারলাম কুন্দন এই গাঁয়েরই লোক। খুব খারাপ লোক। ওর বাবার মণিকরণে একটা হোটেল ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর কুন্দন সেসব বিক্রি করে দিয়েছে। নেশাভাঙ আর গুন্ডাগার্দি করত। অন্য দোকানিদের থেকে তোলা আদায়, ছোটোখাটো ছিনতাই— এইসব। হঠাৎই বছর দুয়েক আগে থেকে সবাই দেখল কুন্দনের হাতে প্রচুর পয়সা আসতে শুরু করেছে। সবসময় ওর ঘরে দু’-দশটা গুন্ডামার্কা ছেলে বাসা করে থাকে। সকলেরই গলায় সোনার চেন। বিলিতি দারুর খালি বোতল জমে জমে বাড়ির সামনেটায় পাহাড় হয়ে গেল। একটা গাড়িও কিনেছিল। সেটায় চেপে মণিকরণ থেকে সিমলা ফূর্তি করতে যেত।
ওই কুন্দন সিং আর ওর পোষা ছেলেছোকরারাই সরাইখানা দখল করে রেখেছে। যেদিন ওই হেলিকপ্টার নামল, সেদিনও কুন্দনই ওদের কোতল করেছিল।
একটা কথা শুনে চমকালাম। কুন্দনের হাতে বছর দুয়েক আগে থেকেই প্রচুর পয়সা! সেটা কেমন করে হয়? সিরাজি আবিষ্কার তো হালের ঘটনা। অন্তত বসন্ত সাক্সেনা তো তা-ই বলছেন।
ঠিক বলছেন কি?
.
পাঁচ
কখন যে ক্লান্ত চোখদুটো বুজে এসেছিল, বুঝতেই পারিনি। হঠাৎই পিঠের ওপর ছোটো একটা ধাক্কায় জেগে উঠলাম। ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালের দিকে চোখ রেখে দেখলাম, রাত তিনটে। জেতা আমাকে উঠতে দেখে ঘরের কোনায় সরে গিয়ে বাকি প্রস্তুতি সারতে বসল।
প্রস্তুতি আর কী? এমন নিরস্ত্র অবস্থায় এর আগে কখনও কোনও অপারেশনে বেরোইনি। কুন্দন সিংদের খানাতল্লাশির কথা মাথায় রেখেই একটা রিভলভার অবধি সঙ্গে নিয়ে আসিনি।
আমাদের সেই ভেঙে পড়া স্যুইস টেন্টটা গ্রামবাসীরা যত্ন করে তুলে নিয়ে এসে তীরথ রাণার ঘরের এক কোণায় রেখে দিয়েছিল। ভাগ্যিস ওটাকে নতুন করে কেউ খাটাবার চেষ্টা করেনি। করলে বুঝতে পারত ওটা কোনওদিনই তাঁবুর কাজ করতে পারে না। এখন জেতার হাতের এক-দুটো নিখুঁত টানে সেই তাঁবুর সাদা নাইলনের ছাউনি থেকে দুটো বর্ষাতির মতন পোশাক তৈরি হয়ে গেল, যা দিয়ে আমরা আপাদমস্তক ঢেকে নিলাম। অতঃপর সেই তাঁবুর ফ্রেম। আপাতদৃষ্টিতে যেগুলোকে নিরীহ অ্যালুমিনিয়ামের পাইপ মনে হচ্ছিল, সেগুলোর মধ্যে থেকেই বেরিয়ে এল একটা গুপ্তির মতন লম্বা এবং ধারালো হান্টিং নাইফ। এই আমার আজকের রণসজ্জা। জেতার শুধু হাতদুটো ছাড়া কিছুই রইল না, অবশ্য আগেই বলেছি, ও খালি-হাতেও মানুষ খুন করতে পারে। যদি কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে তবেই অবশ্য। আমি রাকস্যাকটাও পিঠে নিয়ে নিলাম। কখন কী কাজে লাগে বলা যায় কি? তারপর আমরা দুটো সাদা ছায়ার মতন উঠোন পেরিয়ে আকাশের নীচে বেরিয়ে এলাম।
দেখলাম, চাঁদ ডুবে গেছে। তবুও চারিদিকের বরফের চাদরের ওপর নক্ষত্রের আলো প্রতিফলিত হয়ে একটা অপার্থিব নীল দ্যুতি জড়িয়ে রয়েছে মীনাহার গ্রামকে।
দেখলাম, নীলচে বরফের ওপর কাজল দিয়ে গড়া ঘরবাড়ি, কাজললতার মতন পর্ণমোচী সব গাছপালা। সত্যি, এত গাঢ় সিল্যুয়েট আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ভাগ্যিস আমাদের দু’জনেরই পরনে সাদা পোশাক। না হলে আমাদেরও বরফের পটভূমিকায় ওরকমই পরিষ্কারভাবে দেখা যেত।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটা শুঁড়িপথ ধরে সরাইখানার পিছনদিকটায় পৌঁছে গেলাম। জেতা রইল সামনের দিকটায়। একটা পাথরের আড়ালে শুয়ে কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে সরাইখানার দিকে নজর রেখে বুঝতে চেষ্টা করলাম ওদের লোকবল, ওদের প্রস্তুতি।
মনে হল, একটা ভ্রান্ত নিশ্চিন্ততা-বোধ ওদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে, যে কারণে খুব বেশি লোকের পাহারা রাখেনি। ভাঙাচোরা পাঁচিলটার জায়গায় জায়গায় টিনের পাত লাগিয়ে মোটামুটিভাবে মেরামত করে নিয়েছে। সেই পাঁচিলের বাইরে আপাতত তিনটে ছেলে পায়চারি করছে। প্রত্যেকের কাঁধে পুরোনো আমলের বন্দুক। প্রখর শীতে ওদের হাত পা জমে যাচ্ছে নিশ্চয়ই। সরাইখানার বাঁ-দিকের পাঁচিলের বাইরে এক জায়গায় কিছু কাঠকুটো জ্বলছে। মাঝে মাঝেই একজন করে গিয়ে সেই আগুনে হাত পা সেঁকে আসছে। যখন আগুনের ধারে উবু হয়ে বসছে তখন কাঁধের বন্দুক নামিয়ে রাখছে পাশে। স্বর্গীয় উষ্ণতার স্পর্শে দিগ্বদিক জ্ঞান থাকছে না।
একজন করে যাচ্ছে… ভাবা যায়? এরা এত অসাবধান হয় কী করে! যে ছেলেটা বাঁ-দিকের পাঁচিলের আড়ালে চলে যাচ্ছে, বাকি দু’জনের কেউ তার দিকে নজর রাখছে না। এটা কি ঠিক?
অগ্নিকুণ্ডের ঠিক পিছনে পাঁচিলের গায়ে অনেকখানি ঘন অন্ধকার। আমি হান্টিং নাইফটা খাপ থেকে বার করে হাতে নিলাম। এই ছোরাটা আমার অনেকদিনের সঙ্গী। টাইটানিয়াম স্টিলের ব্লেড। মাংস তো কোন ছার, মানুষের হাড়কেও কেটে দু’ফালা করে দিতে পারে!
দ্রুত পায়ে পৌঁছে গেলাম ওই অন্ধকার জায়গাটার আড়ালে।
শেষ ছেলেটা কিছু সন্দেহ করেছিল, কারণ তার সঙ্গী দু’জন ফিরছিল না তা অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছিল। সে তাই সতর্ক হয়েই এগিয়েছিল। হাতের বন্দুকটা তৈরি ছিল। চোখের নজর ঘুরছিল চারপাশে। তাই আমার ছোরাটা পিঠের বাঁ-পাশে ঢুকে যাওয়ার আগে ও একটা চিৎকার করতে পেরেছিল।
ওহ্, সে কী চিৎকার! আদিগন্ত নিস্তব্ধতার মধ্যে সেই তীক্ষ্ণ মরণ- আর্তনাদ যেন একটা আহত বাজপাখির মতন এদিক থেকে ওদিকে ডানা ঝটপটিয়ে ঘুরে ঘুরে তারপর আস্তে আস্তে স্থির হয়ে গেল। আমি হাতের ছোরাটা কোমরের খাপে গুঁজে নিয়ে ওখান থেকে দৌড় শুরু করলাম। ছোরার প্রয়োজন এখনকার মতন শেষ। এবার অন্যকিছুর কথা ভাবতে হবে।
সরাইখানার মাথার ওপরে পরিত্যক্ত হেলিকপ্টারটাকে লক্ষ করে দৌড় শুরু করলাম। পুরু বরফের স্তূপের মধ্যে আমার হাঁটু অবধি ডুবে যাচ্ছিল। পা টেনে টেনে চলেছিলাম। তবুও কোনওরকমে ওই টিলার পায়ের কাছটায় পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে টিলার চূড়া অবধি পুরো জায়গাটাই একটা সাদা রুমালের মতন পরিচ্ছন্ন; সামান্য ঘাসের শিষের আড়ালও কোথাও নেই। এবং আমি ঘন পায়েসের বাটির মধ্যে পা টেনে টেনে চলা একটা পিঁপড়ের মতো ধীর, স্পষ্ট আর অসহায়। একটা বারো- বছরের বাচ্চা মেয়েও এখন আমার ওপরে টার্গেট প্র্যাকটিস করতে পারে।
পিছনদিকে তাকিয়ে দেখলাম, ভগ্নস্তূপটার আনাচে-কানাচে, অলিন্দে, বারান্দায় অনেকগুলো জোরালো টর্চ জ্বলে উঠেছে। কিছু উত্তেজিত গলার আওয়াজ। ঈশ্বর, ওই আলো যেন এই মুহূর্তে আমার ওপর এসে না পড়ে!
আমার সেফ প্যাসেজের ব্যবস্থাটা জেতাই করল। হঠাৎই আকাশে ভেসে উঠল একটা দুটো-তিনটে চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আলোর ফানুস। কুন্দন সিং আর তার দলবল অবাক হয়ে চেয়ে রইল সেইদিকে। ওরা জানে না, ফানুসগুলো নিভে যাওয়ার পরেও বহুক্ষণ ওরা চোখে কিছু দেখতে পাবে না। এই মিলিটারি ফ্ল্যাক্সগুলোও তাঁবুর পাইপের মধ্যে করে লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। জেতার ব্লেজারের পকেটে ছিল, এখন কাজে লাগল।
আলোর বলগুলো নিভে যাওয়া মাত্র চারিদিক নীরন্ধ্র অন্ধকারে ঢেকে গেল। জানি, ওরা এখন অন্তত পাঁচ মিনিট কিছুই দেখতে পাবে না, তাই আমি আড়াল ছেড়ে বরফের ঢাল বেয়ে ওপরে দৌড় শুরু করলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম, টর্চের আলোগুলো এবার বাইরে বেরিয়ে এসেছে। দেখে আশ্বস্ত হলাম, এখনও ওরা অন্ধের মতন এক-একজন এক-একদিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আবার পিছিয়ে আসছে। তার মানে ওরা এখনও আমাকে দেখতে পায়নি। ওরা খুঁজছে।
খুঁজুক, আরও একটু সময় দিক আমাকে— দু’তিনশো ফিট বরফে ঢাকা চড়াই উঠতে যতটুকু সময় লাগে। ওইটুকু দূরত্বেই বিশাল এক ডানাভাঙা ফড়িং-এর মতন দাঁড়িয়ে রয়েছে হেলিকপ্টার। যদি ওই অবধি পৌঁছোতে পারি… যদি পৌঁছোতে পারি…. আঃ! এই তো, পৌঁছে গেছি।
কিন্তু এখানেই তো আমার কাজ শেষ নয়, সবে শুরু। এবং সময়ও নেই, কারণ এবার ওরা আমাকে দেখতে পেয়েছে, মানে আমার নড়াচড়া দেখতে পেয়ে গেছে। ওই যে, টিলার ঢাল বেয়ে ওরা ধীর সতর্ক পায়ে উঠে আসছে। ওরা প্রায় বারো-তেরোজন লোক। আমি হেলিকপ্টারটার পেটের তলায় ঘন অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে গেলাম।
একটা কর্কশ গলার আওয়াজ ভেসে এল যার মর্মার্থ হল— ‘ওরে গাধা, ওই হেলিকপ্টার এ জন্মে আর আকাশে উড়বে না। ওখানে ঢুকেছিস কেন? ভালো চাস তো বেরিয়ে আয়। কথা দিচ্ছি তোকে মারব না।’
কিন্তু আমার সময় নেই ওসব কথা শোনার। জবাব দেওয়ার সময় তো নেই-ই। আমি ব্যাকপ্যাকের মুখটা খুলে প্রাণপণে ভেতরটা হাতড়াচ্ছি ভারী টিন কাটার মেশিনটার জন্য। ওটাও যে-কোনও পর্বতারোহীর ব্যাগে পাওয়া যায়, তাই কুন্দন সিংরা তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এখন ওটাই আমার দরকার। গেল কোথায় যন্তরটা? কাজের সময় কোনও একটা জিনিস যদি পাওয়া যায়!
নাহ্, এই তো পেয়েছি। এবার ফুয়েল ট্যাংকের সিলটা। কিন্তু না, তারও আগে আরও একটা কাজ করতে হবে। পারব কি! পারব কি ঠেলে এই বিশাল ফড়িংকে নড়াতে?
প্রাণপণে ঠেলতে শুরু করলাম। ভাগ্য ভালো, ঢালু জায়গায় এমনিতেই দু’ঠ্যাঙা হেলিকপ্টারটা কিছুটা ভারসাম্যহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঠেলাঠেলিতে হেলে পড়ল যেদিকে চাইছিলাম সেই দিকে, মানে সরাইখানার দিকে। ওইদিক দিয়েই হইহই করতে করতে উঠে আসছে আমার ঘাতকেরা। হেলিকপ্টারটাকে হেলে পড়তে দেখে ওরা এক ভলি গুলি চালাল। গুলিগুলো অনেক দূর দিয়ে বেরিয়ে গেল। এখনও ওরা আমাকে দেখতে পাওয়ার মতন জায়গায় পৌঁছোয়নি, একটু পরেই পৌঁছে যাবে। তার আগেই আমাকে এই ফুয়েল ট্যাংকের লোহার ক্যাপটা খুলে ফেলতে হবে। দাঁতে দাঁত চিপে টিন-কাটারটা দিয়ে ক্যাপটাকে আঁকড়ে ধরে প্যাঁচ মারলাম। এমন ঠান্ডায় বোধহয় ধাতুও জমে যায়। কড়কড় করে একটা আওয়াজ হল কেবল। একচুলও ঘুরল না। আবার, আবার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলাম।
ইতোমধ্যে আরও একঝাঁক গুলি ছুটে এল। এবার ওরা আমার অবস্থান সম্বন্ধে অনেক নিশ্চিত। তাই গুলিগুলো লাল জোনাকির মতন শিস দিয়ে আমার আশপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। পরের দফায় ওরা আর টার্গেট মিস করবে না। আমি একবার মুখ বার করে দেখে নিলাম— ছড়িয়ে পড়েনি তো খুনেগুলো? নাহ্। এখনও অবধি একসঙ্গেই উঠে আসছে। আরও একটু কাছে এসে ওরা নিশ্চয়ই মানুষের বৃত্ত বানাবে। সেটুকু বুদ্ধি ওদের আছে বলেই ধরে নিচ্ছি। যা করার করতে হবে তার আগে, মানে ওই যতক্ষণ ওরা এক জায়গায় জটলা পাকিয়ে রয়েছে তার মধ্যেই।
ঘুরেছে। ক্যাপটা একটু হলেও ঘুরেছে। গ্লাভসের মধ্যেও আমার হাতের চামড়া ছিঁড়ে যাচ্ছে টের পেলাম। কিন্তু ওসব দিকে নজর দেওয়ার সময় এটা নয়। আর একটা প্যাঁচ, আর এক… আহ্! এই তো।
হেলে-পড়া ফুয়েল ট্যাংকের পেট থেকে গলগল করে অতিদাহ্য এভিয়েশন-ফুয়েলের গাঢ় বাদামি ধারা বরফের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে গেল। যেন একটা অতিকায় অজগর সাপ বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গেল তার শিকারের দিকে।
ঘাতকদের হইহল্লা একমুহূর্তের মধ্যে চুপ। ওরা ভিজে গেছে দাহ্য তরলে। ওরা দেখতে পেয়েছে ওদের নিয়তিকে। পকেট থেকে দেশলাইটা বার করে একটা জ্বলন্ত কাঠি ছুড়ে দিলাম বাদামি অজগরটার মাথায়। জ্বলে উঠল নরকের নদী। তার উথালপাথাল কমলা-হলুদ স্রোতের মধ্যে একমুহূর্তের জন্য লাফিয়ে উঠল বারো-তেরোজোড়া জ্বলন্ত হাত। তারপর সেগুলো আবার গলে পড়ল আগুন-নদীর মধ্যে। আমি টিলা থেকে উলটোদিকের ঢালে গড়িয়ে পড়লাম, তা না হলে ওই আগুন পেছু হটে এসে আমাকেও খেয়ে নিত।
আর তখনই দেখতে পেলাম কুন্দন সিংকে।
.
ছয়
তীরথ রাণা রাগের মাথায় বলেছিল, কুন্দন একটা আস্ত নেকড়ে বাঘ। সত্যি, এর চেয়ে যথার্থ বিবরণ আর হয় না।
আমাদের পিছনে তখনও অবশিষ্ট জ্বালানি তেল আর ভস্মপ্রায় মানুষের দেহের ওপর কিছু আগুনের শিখা নাচানাচি করছিল। সেই আগুনের অস্থির আলোয় দেখলাম অবিকল একটা নেকড়ে বাঘই যেন হাঁটু অবধি ঢাকা লেদার বুট, জিন্স আর জ্যাকেট পরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। ছুঁচলো মুখ, মুখের ওপর তেরছাভাবে বসানো দুটো চোখ আর শিথিল, ঝুলে পড়া ঠোঁট।
মানতে বাধ্য হলাম, লোকটা বদমাইশি বুদ্ধিতেও নেকড়ে বাঘের সমতুল্য। কেমন উলটো দিক দিয়ে এগিয়ে এসেছে! ফলে নিজে যে বেঁচে গেছে শুধু তা-ই নয়, আমাকে মারবার ব্যবস্থাও পাকা করে ফেলেছে প্রায়। আমাকে জমি থেকে ওঠবার সময় দিল না কুন্দন সিং, তার আগেই গুলি চালাল।
শেষ মুহূর্তে রিফ্লেক্স অ্যাকশনেই এক পাকগড়িয়ে যেতে পেরেছিলাম, তাই গুলিটা বুকে লাগল না। তবে ডানহাতের ওপরের দিকটায় চামড়ার জ্যাকেট ফুঁড়ে রক্ত বেরিয়ে এল। ব্যথা টের পেলাম না। একটু পরে পাব। আমি উঠে দাঁড়ালাম, তারপর উলটোদিকে ফিরে দৌড়োতে শুরু করলাম। এই আদিগন্ত সমতলের মধ্যে আড়াল বলতে একটাই— তা হল ওই সরাইখানার ধ্বংসস্তূপ।
কিন্তু মুশকিল হল, আসবার সময় যেমন সরাইখানা থেকে সোজা পথে উঠে এসেছিলাম, এবার আর তা হল না, কারণ টিলার ওই ঢালে এখনও আগুন জ্বলছে। ওখানে গেলেই ওই আগুনের পটভূমিকায় আমার সিল্যুয়েট কুন্দনের বন্দুকের সামনে সুন্দর, সহজ টার্গেট হয়ে যাবে। আবার উলটো ঢালেও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রয়েছে কুন্দন সিং নিজে। অতএব আমার সামনে একটা রাস্তাই খোলা। বাঁ-দিকের ঢাল বেয়ে আমি দৌড়ে নামতে শুরু করলাম। এদিকটায় মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়ও রয়েছে, প্রয়োজনে যেগুলোর আড়ালে লুকোতে পারব। এইভাবে টিলার নীচ অবধি নেমে তারপর একটা বাঁক নিয়ে পৌঁছোতে হবে সরাইখানায়।
একটানা দৌড়োতে পারলাম না অবশ্য। প্রথমত, ওই যে শুরুতেই বলেছি, শরীরটা যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। আর দ্বিতীয়ত, আমি জানি কুন্দন এখন টিলার মাথায় উঠে এসেছে। আমি কোনদিকে গেছি তা নিয়ে ও এখন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। এই সুযোগটা হারালে চলবে না। আমাকে এক ঝোপ থেকে অন্য ঝোপে লুকিয়ে এগোতে হবে। ওর চোখে পড়ে গেলে আমি আর সরাইখানা অবধি পৌঁছোতে পারব না; তার আগেই ও আমাকে শেষ করে দেবে। তাই এই নিষ্পত্র রডোডেনড্রনের ডালপালার জটলার মধ্যে বসে পড়লাম।
আবার বরফ পড়তে শুরু করেছে। এখন আমাকে দেখতে পাওয়া কুন্দন সিং-এর পক্ষে সহজ হবে না। এই সুযোগেই যতটা পারা যায় এগিয়ে যেতে হবে।
***
থামতে থামতে, দৌড়োতে দৌড়োতে কোনওরকমে একসময়ে সরাইখানার ভেতরে পৌঁছে গেলাম। কুন্দন সিং কোথায় গেল কে জানে! দেখতে তো পাচ্ছি না। হয় তো আমার খোঁজে টিলার ডানদিকের ঢালে নেবে পড়েছে। তা হলে আমি সরাইখানায় পৌঁছে লুকোনোর মতন একটা জায়গা খুঁজে নেওয়ার সময় পাব।
লুকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না। কুন্দন সিং-এর একটা বুলেটই আমার লড়াই শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু জেতা রয়েছে। জেতার ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস। আমি নিশ্চিত, ও সমস্তকিছু দেখছে, বুঝতে পারছে। ও অপেক্ষা করছে সুযোগের জন্য, যখন ও মরণ-ছোবল দেবে।
আমার কাজ, ওকে সেই সময়টুকু করে দেওয়া।
কিন্তু সরাইখানার পাঁচিলের মধ্যে ঢুকে যা দেখলাম তাতে বুকটা বড়ো দমে গেল। এই অবিশ্রাম তুষারপাত মাতা ধরিত্রীর শরীরকে ব্যাটাছেলের বুকের মতন সমতল বানিয়ে দিয়েছে। আড়ালে লুকোবার মতন এতটুকু উঁচু-নিচু কোথাও বাকি রাখেনি। শুনেছিলাম, এখানে নাকি ঘোড়ার জল খাওয়ার চৌবাচ্চা আছে, তন্দুর উনুনের গর্ত আছে। ওরকম যে-কোনও একটা তৈরি ট্রেঞ্চ পেয়ে গেলে বাঁ-হাতে ছোরাটা নিয়েই পিছন থেকে কুন্দনকে অ্যাটাক করতে পারতাম। কিন্তু হায়! সমস্ত চৌবাচ্চা ইত্যাদি দেখছি বরফ জমে ভরাট হয়ে গেছে।
কোথায় লুকোব? তা হলে এখন আমি লুকোবটা কোথায়?
মনে হল, পাঁচিলের এক জায়গায় টিনের পাতের তলা থেকে দুটো পায়ের ছায়া সরে গেল। তা হলে কি কুন্দন সিং এখানে পৌঁছে গেছে? এত তাড়াতাড়ি!
আমি একদৌড়ে খোলা উঠোন থেকে একটা লম্বা বারান্দায় উঠে পড়লাম। দালানটার একদিকে পাথরের ইটে গাঁথা দেওয়াল। দেওয়ালের মাঝে মাঝে এক-একটা পাল্লা-ভাঙা দরজা। দরজার ওপাশে কোথাও একটা ঘর, কোথাও ঘরের ধ্বংসস্তূপ। মাথার ওপরের ছাদও অনেক জায়গাতেই ভেঙে পড়েছে।
এগোতে এগোতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছোলাম, যেখানে দালানটা প্রায় সমকোণে বাঁক নিয়েছে।
একটা পায়ের আওয়াজ!
একটা ছায়া বাঁকের ওই প্রান্ত থেকে এদিকে এসে পড়ল। মানুষের ছায়া।
অর্থাৎ একজন কেউ ওদিক থেকে এগিয়ে আসছে। এক্ষুনি সে বাঁক ঘুরবে, আর ঘুরলেই আমাকে দেখতে পাবে। এমনই কপাল, ঠিক এই মুহূর্তে আমার পাশে কোনও ঘর নেই, রয়েছে এক নিরেট দেওয়াল। অথচ ছায়াটা এগিয়ে আসছে।
আর ছায়া নয়, এবারে কায়া। একটা কমবয়সি ছেলে। বোধহয় আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই এগিয়ে আসছিল, তাই হাতের ছোটো ব্যারেলের শটগানটা একদম বুকের কাছে তুলেই রেখেছিল। আমাকে দেখা মাত্র সেই অস্ত্রটার ট্রিগারের দিকে তার আঙুলগুলো এগিয়ে গেল। নিতান্ত প্রাণরক্ষার জৈব তাগিদেই আমি বাঁ-হাতে ছোরাটা নিয়ে আমার শরীরটাকে সামনে ছুড়ে দিলাম। আমার ছোরা ছেলেটার পেটের মধ্যে ঢুকে গেল। কোনও শব্দ না করে ছেলেটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। কিন্তু মাটিতে পড়বার সময় আমার জখম ডানহাতটা আমারই শরীরের নীচে মুচড়ে গেল। যন্ত্রণায় ঝনঝন করে উঠল আমার সমস্ত স্নায়ু।
এক মুহূর্ত ওখানেই চোখ বুজে শুয়ে রইলাম। যন্ত্রণাটা একটু থিতিয়ে এলে আবার উঠে দাঁড়ালাম। মাথাটা ঘুরছে। দেখলাম যেমন- তেমন করে বাঁধা ব্যান্ডেজটা রক্তে চুপচুপে হয়ে ভিজে গেছে। সুস্থভাবে কিছু ভাবতে পারছি না। তবু খুব মোটা দাগের একটা প্রশ্ন মাথায় এল–আর সকলেই আমাকে ধরার জন্য বেরিয়ে গেলেও এই একজনকে ওরা কীসের পাহারায় রেখে গিয়েছিল? উত্তর হয় একটাই। সিরাজির পাতালঘর। আমি ছেলেটার মৃতদেহ টপকে দালানের বাঁকটা ঘুরলাম। দেখলাম আমার আন্দাজ ঠিক।
বাঁকের ওপাশে দালানের আচ্ছাদিত অংশটা শেষ হয়ে গেছে। শেষ হয়েছে একটা মাঝারি সাইজের খোলা চাতালের প্রান্তে এসে। ঠিক যেখানে দালানটা এসে খোলা জায়গায় মিশেছে, সেখানেই দেখতে পেলাম একটা ছোটো ট্র্যাপডোর। যদি ট্র্যাপডোরটা বন্ধ থাকত, যদি ওটা বরফে ঢাকা থাকত, তা হলে মিশে যেত চত্বরের অন্যান্য বরফে ঢাকা অংশের সঙ্গে। কিন্তু যে ছেলেটাকে এইমাত্র খুন করলাম, সে নিশ্চয়ই এখনই ওই ট্র্যাপডোর খুলে উঠে এসেছিল। ওটাকে বন্ধ করারও সময় পায়নি অতএব এখন ওটাকে দিব্যি দেখা যাচ্ছে। আমি কি ওদিকে যাব?
একটা মন বলছিল, পালাও! আড়াল খোঁজো! লুকিয়ে পড়ো! তুমি আহত। তোমার পিছনে খুনেরা তাড়া করে আসছে।
অথচ অন্য মনের কী আশ্চর্য শক্তি! সে আমাকে টেনে নিয়ে গেল ওই চোরাকুঠুরিটার দিকেই। আমি ট্র্যাপডোরটার মধ্যে মাথা নামিয়ে নীচের দিকে তাকালাম। একটা অ্যালুমিনিয়ামের মই ঘরের মেঝে অবধি নেমে গেছে। ভেতরে বোধহয় কোনও ব্যাটারি-চালিত আলো জ্বলছিল। তার মৃদু আলোয় দেখতে পেলাম একদিকের দেওয়ালে সার সার কাঠের বাক্সের আভাস। আমি আর কৌতূহল সামলাতে পারলাম না। তাছাড়া, মনে মনে ভাবলাম, এটাও তো বাঁচার একটা রাস্তা হতে পারে। যদি কুন্দন সিং আমাকে এখানে না খুঁজে চলে যায়?
তবে তার জন্য একটা কাজ করতে হবে।
দালানের প্রান্ত থেকে ছেলেটার মৃতদেহ টেনে নিয়ে এসে কাঁধে তুললাম। চিহ্নগুলো মুছে দিয়ে যেতে হবে। এখনও বরফ পড়ছে। আশা করি কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার পায়ের দাগ-টাগ সব ঢেকে যাবে। তবে ঢাকা দালানের এখানে-ওখানে মেঝের ওপর নিশ্চয়ই কিছু রক্তের দাগ ছড়িয়ে রইল— আমার নিজের আর ওই ছেলেটার। থাক। কিছু করার নেই। বাইরে এখনও অন্ধকার। সেটুকুই ভরসা। হয়তো ওইসব দাগ কুন্দন সিং-এর নজর এড়িয়ে যাবে।
ছেলেটাকে কাঁধে নিয়ে নীচে নামতে শুরু করলাম। সুস্থ বাঁ-হাতটা দিয়ে ওর দেহটা কাঁধের ওপরে ধরে রেখেছিলাম। অগত্যা জখম ডানহাত দিয়েই মইয়ের খুঁটি ধরতে হচ্ছিল। মাথার ওপরে ট্র্যাপডোরের পাল্লাটাও বন্ধ করতে হল ডানহাত দিয়েই। আর এইসব কাজ করবার সময়ে কেউ যেন ছুরি দিয়ে আমার কাঁধ থেকে বুক অবধি নিষ্ঠুরের মতন খোঁচাতে লাগল। ব্যথার তড়াসে বমি পেয়ে গেল আমার। চোখে একরাজ্যের অন্ধকার নিয়েই কোনওরকমে মেঝেতে পা দিলাম।
মেঝের একদিকে ছেলেটার শরীরটাকে নামিয়ে রেখে চারিদিকে তাকালাম। এমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল, কী বলব! মনে হল এক মুহূর্তে আমি যেন চারশো বছর আগেকার পৃথিবীতে পৌঁছে গেছি। বাইরে সরাইখানার চবুতরা থেকে ঘোড়া আর খচ্চরের গলার ঘণ্টার টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে, ভেসে আসছে সদ্য আগত বণিকদের কথাবার্তা। বণিকদের পিছন পিছন ঘুরে বেড়ায় যে কৃপাপ্রার্থী ফকির-মিসকিনদের দল, তাদেরই মধ্যে কেউ বোধহয় রবাব বাজিয়ে গান ধরেছে— ভালোবাসার শের-শায়েরি। সেই সুরে ধৌলাধারের চূড়ার বরফ আস্তে আস্তে গলে যাচ্ছে। নেমে আসছে ছোটো ছোটো ঝরনা।
তবে শুধু সুরই তো নয়, হিমমরুর হাড়-জমানো শৈত্যের মোকাবিলা করতে গেলে চাই সুরা। তারও আয়োজনে কমতি নেই। ওই তো, আমার চারপাশে ভাঙা পাইনকাঠের বাক্সগুলোর মধ্যে চকমক করছে মদিরার বোতল, সুরার সম্ভার। সেই টকটকে লাল তরলের মধ্যে দিয়ে আলো প্রতিসরিত হচ্ছে, মনে হচ্ছে চুনি-পাথরের খনির মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছি। বাইরে থেকে কেউ কি হাঁক দিল— ইউসুফ, শরাবখানা থেকে আরও দু’পেটি সিরাজি তুলে আন।
মাথাটা একবার জোরে ঝাঁকালাম। বুঝতে পারছি এক গভীর হ্যালুশিনেসন আমার চেতনাকে আস্তে আস্তে ডুবিয়ে দিচ্ছে। আমি বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখায় দাঁড়িয়ে রয়েছি। সত্যিই কি বাইরে থেকে, ওই মাথার ওপরের উঠোন থেকে কেউ কাউকে ডেকেছিল?
হ্যাঁ, সত্যি। আবারও সেই গলাটা ভেসে এল। ইউসুফ নামেই কাউকে কেউ চিৎকার করে ডাকছে। তার মানে এই ছেলেটা, যাকে একটু আগে খুন করলাম, এর নাম ইউসুফ? একেই দেখতে না পেয়ে ডাকাডাকি করছে কুন্দন সিং?
‘ইউসুফ! ইউসুউউফ!’ আবার চিৎকার করে ডেকে উঠল কুন্দন সিং।
আর সাড়াটা এল আমার ঠিক পাশ থেকে। একটানা একটা ঘড়ঘড় শব্দ, একটা গোঙানির আওয়াজ। সেই নিঃশব্দ পরিবেশে ওই গোঙানি এত স্পষ্ট শোনা গেল কী বলব! আমি অবাক হয়ে তাকালাম পাশে নামিয়ে রাখা মৃতদেহটার দিকে। মৃত কোথায়! এর শরীরে এখনও প্রাণ আছে, এ তো মরেনি। আমি বাঁ-হাতে ছোরাটা নিয়ে হাঁটু গেড়ে ওর পাশে বসে পড়লাম। চিরে দেব এই আধমরা ছেলেটার কণ্ঠনালি? ঘুচিয়ে দেব ওর গোঙানি চিরকালের মতন? তাছাড়া আমার উপায়ই বা কী? ওই আওয়াজ অনুসরণ করে তো কুন্দন এক্ষুনি এখানে পৌঁছে যাবে।
মনে হল অনন্তকাল আমি ছোরাটা হাতে ধরে ওই ছেলেটার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর হতাশভাবে ঘাড় নেড়ে আবার ছোরাটাকে কোমরের খাপে ঢুকিয়ে রাখলাম। পারলাম না। পারলাম না একটা নিরন্ত্র, আহত ছেলের গলায় ছোরা বসাতে।
হঠাৎ মাথার ওপর ট্র্যাপডোরটা খুলে গেল। একটা আলোর চতুষ্কোণ ফুটে উঠল ছাদের গায়ে। ভোর হয়ে গেছে। দেখলাম সেই আলোর চতুষ্কোণের মধ্যে একটা ছুঁচলো মুখ, ঝুঁকে পড়ে বোঝবার চেষ্টা করছে আমি কী করছি। কয়েক সেকেন্ড লাগল কুন্দনের, আমার অসহায় অবস্থাটা বুঝে নিতে। তারপরেই হিংস্র হাসিতে ভরে গেল ওর মুখ। মই বেয়ে দুটো ধাপ নেমে এল ও, একদম ধীরে-সুস্থে, কোনও তাড়াহুড়ো না করে। ও বুঝে গেছে আমাতে আর বাসা থেকে পড়ে যাওয়া একটা পাখির ছানাতে এখন কোনও তফাত নেই।
সে ছানা কখন কীভাবে মরবে, সেটা বেড়ালের ইচ্ছে।
আরও দুটো ধাপ নেমে এসে কুন্দন সিং ধীরে-সুস্থে তার আগ্নেয়াস্ত্রটা আমার বুকের দিকে নিশানা করল। আমি চোখ বুজে ফেললাম।
যে-কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মনে একটা চিন্তা বোধহয় মাঝে মাঝেই ঘুরে-ফিরে আসে। কোথায়, কীভাবে তার মৃত্যু হবে। হাসপাতালের বেডে? জলের তলায়? রাস্তার ধারে? স্বাভাবিক মৃত্যু হবে, না অপঘাত? না কি, সহসা আত্মহত্যার দিকেই চলে যাবে সে? আমিও কতবার একলা ঘরে বসে এমন সব কথা ভেবেছি। আজ উত্তরটা পেয়ে গেলাম। আমার মৃত্যু হবে বাড়ি থেকে বহুদূরে, মাটির নীচে এক চোরকুঠুরির মধ্যে। আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন ঈশ্বর— রক্তিম মদিরার স্তম্ভ। ওরা হয়তো আজ না হলে কাল এইসব সিরাজির বোতল এখান থেকে সরিয়ে নেবে। সরিয়ে নেবে ইউসুফকেও। শুধু বিশাল এক কবরের মতন এই চোরকুঠুরির মধ্যে থেকে যাবে আমার শরীরটা।
এক সেকেন্ডের কত ভগ্নাংশ লেগেছিল এসব কথা ভাবতে, তা বলতে পারব না। তবে ফের যখন চোখ খুললাম, তখন প্রথমেই যা দেখতে পেলাম, তা হল কুন্দন সিং-এর মাথার পিছনে একটা ছায়া– একটা মুখ। ও মুখ আমার অনেকদিনের চেনা। জেতা! জেতা সুযোগ খুঁজে পেয়েছে। জেতার হাতদুটো এবার কুন্দনের ঘাড়ের পিছনে উঠে এল।
কিন্তু না।
জেতার ছায়াটা নিশ্চয়ই কুন্দনও দেখেছিল। সে মুখ না ঘুরিয়েই রিভলভার ধরা হাতটা সর্বশক্তিতে পিছনের দিকে চালাল। ভারী অস্ত্রটা একটা হাতুড়ির মতন জেতার হাঁটুতে আঘাত করল। জেতা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম, ও তুলোর পুতুলের মতন ট্র্যাপডোরের দিকে ঝুঁকে পড়তে পড়তেও মাথার ওপর কী যেন একটা আঁকড়ে ধরে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
কীসের অবলম্বন পেল ও? বুঝতে পারলাম না। শুধু দেখতে পেলাম কুন্দন সিং রিভলভারটাকে এবার হাতুড়ি নয়, রিভলভারের মতনই কাজে লাগাবে বলে সেটাকে ধীরে-সুস্থে জেতার দিকে তাক করল।
কিন্তু ফায়ারিং-এর শব্দ নয়। চড়াৎ করে একটা অন্যরকমের শব্দ হল। দেখলাম, জেতার শরীরটা সাপের ছোবলের মতন নেমে এল কুন্দনের শরীরের ওপর। একটা হাড়-হিম-করা আর্তনাদ। কুন্দনের শরীরটা যেন স্লো-মোশনে ট্র্যাপডোরের মুখ থেকে ভাসতে ভাসতে আমার ঠিক একহাত দূরে আছড়ে পড়ল। ওর গলার নরম মাংসে তখনও গেঁথে রয়েছে একটা শাবলের মতন বড়ো ধারালো আইসিকলের ফলা।
বুঝতে দেরি হল না, জেতা বারান্দার কার্নিশ থেকে ঝুলতে থাকা সারি সারি বরফের ধারালো চাঙড়গুলোর মধ্যেই একটাকে হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিল। তারপরে সেটাকেই হাতের চাপে ভেঙে নিয়ে গেঁথে দিয়েছে কুন্দন সিং-এর গলায়।
.
সাত
উত্তেজিত স্নায়ুগুলোকে শান্ত করতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। তারপর কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালাম। এগিয়ে গেলাম সিরাজির বোতলভরতি ক্রেটগুলোর দিকে। সবচেয়ে নীচের বাক্সটা থেকে একটা বোতল টান মেরে বার করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, এই বোতলটা একেবারেই সাধারণ, হাল আমলের মদের বোতল। এর মুখটাও বসন্ত সাক্সেনার বাড়িতে দেখা সেই বোতলটার মতন যত্ন করে সিল করা নেই। নিতান্তই সাধারণ একটা টিনের ঢাকা প্যাঁচ দিয়ে আটকানো রয়েছে।
এটা কেমন হল!
মাটির নীচের যে গোপনকক্ষে নাকি চারশো বছর মানুষের পা পড়েনি, সেখানে পুরানা শিশিবোতলওলার বেচাকেনার মাল!
বোতলটা চোখের কাছে ধরে ভেতরের জিনিসটাকে ভালো করে দেখলাম। কোথায় সেই কামনারঙিন রক্তিম মদিরা? এ যে নিতান্তই গাঢ় খয়েরি থকথকে এক পদার্থ। একটা সন্দেহ মনের মধ্যে উঁকি দিল। ঢাকনাটা খুলে বোতলটাকে নাকের কাছে এনে জিনিসটার ঘ্রাণ নিলাম।
নাহ্, আর কোনও সন্দেহ নেই। এ-ও দামি জিনিস, এ-ও নেশার জিনিস, কিন্তু এর মধ্যে সিরাজির রোমান্টিক আভিজাত্য নেই। বরং রয়েছে এক-একটা দেশের অর্থনীতিকে নষ্ট করে দেওয়ার ইতিহাস, নেশায় ডুবিয়ে অজস্র দরিদ্র লোকের প্রাণ নিয়ে নেওয়ার ঐতিহ্য। এ হল ‘হ্যাশ অয়েল’ কিম্বা ‘হানি অয়েল’, ক্যানাবিস গাছের ফুলের রেণু থেকে তৈরি মাদক— হাশিশ তৈরির র মেটিরিয়াল।
জানতাম হিমাচল প্রদেশের হাশিশ-শিল্পের কথা। বেআইনি এই কারবারে শুধু স্থানীয় লোকেরা নয়, বিদেশিরাও জড়িত, কারণ, এর পুরোটাই প্রায় চোরাপথে রপ্তানি হয়ে যায় ইউরোপ এবং আমেরিকায়। এই জিনিসের জন্যই হিমাচলের পথে-ঘাটে এত হিপিমার্কা ট্যুরিস্টের আনাগোনা। বেআইনি বলেই এই জিনিস সোনার চেয়েও দামি।
হঠাৎই দু’রকমের দুটো আওয়াজ একইসঙ্গে কানে ভেসে এল। নির্জন পাহাড়ি পরিবেশে বহুদূরের শব্দও পরিষ্কার শুনতে পাওয়া যায়। তাই মীনাহার পাহাড়ের পায়ের কাছ থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দ চিনতে ভুল হল না। যাক, জেনারেল কাপুরের শিখ রেজিমেন্টের জওয়ানেরা তা হলে পাহাড়ের নীচে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা বসন্ত সাক্সেনার লোকেদের ছত্রভঙ্গ করতে শুরু করে দিয়েছে। আর একটু দেরি করলে বিপদে পড়ে যেতাম। বসন্ত সাক্সেনা অ্যান্ড কোম্পানি শত্রুহীন সরাইখানায় এসে হাশিশের ভান্ডারের দখল নিত। আমরা তো প্রাণে বাঁচতামই না, ওদের এখান থেকে ফ্লাশ আউট করার কাজটা তখন জেনারেল কাপুরের পক্ষেও কঠিন হত।
দ্বিতীয় আওয়াজটা আরও মধুর লাগল। একটা হেলিকপ্টারের মৃদু গুঞ্জরণ। শব্দটা আস্তে আস্তে বাড়তে বাড়তে কানে তালা লাগিয়ে দিয়ে তারপর হঠাৎই থেমে গেল। বুঝলাম ল্যান্ড করেছে। একটু পরেই জেনারেল কাপুরের হেঁড়ে গলা প্রায় হেলিকপ্টারের সমান আওয়াজ করতে করতে সরাইখানার ভেতর ঢুকে পড়ল।
‘কাঁহা হ্যায় বেটে রুদরা? আরে জেতা বিটিয়া, কাহা গায়েব হো গয়ে তুম দোনো?’
***
ঠিক তিনদিন পরে সিমলার একটা তিন-তারা হোটেলের কাচে ঘেরা বারান্দায় বসে আমি, জেতা আর জেনারেল কাপুর কফি খাচ্ছিলাম। আমার হাতে ব্যান্ডেজ। জেতার হাঁটুতে ব্যান্ডেজ। আজকেই আমাদের কম্যান্ড হসপিটাল থেকে ছেড়েছে। কাল দিল্লি ফিরব।
ফিরে যাওয়ার আগে, যে কথাটা জেনারেল কাপুরকে জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম সেটা করেই ফেললাম।
আচ্ছা, স্যার, আপনি কি বরাবরই জানতেন যে, বসন্ত সাক্সেনার সিরাজির গল্পটা মিথ্যে?’
উনি বললেন, ‘জরুর। সি, বি. আই.-এর অ্যান্টি-নারকোটিক্স সেলের রায়বন্ধন যখন আমার হেল্প চেয়েছিল, তখন ও বলেইছিল কি হিমাচলে কোথাও হাশিশের বিরাট স্টক আছে, সেটা নিয়ে গ্যাং-ওয়ার চলছে। এ-ও বলেছিল যে, ওরা বসন্ত সাক্সেনাকে সাসপেক্ট করছে, কিন্তু এভিডেন্স ছাড়া কিছু করতে পারছে না। সাক্সেনার বিরাট পলিটিকাল কনেকশন আছে তো। তাছাড়া লোকেশনটাও খুঁজে পাচ্ছে না। ‘
অবাক হয়ে বললাম, ‘তা হলে আমাকে ওখানে পাঠানোর আগে সেটা বললেন না কেন?’
‘দেখো রুদরা, ব্রিফিং-এর সময় তুমি যখন আমাকে বসন্ত সাক্সেনার ওই সিরাজির স্টোরিটা বলছিলে, দেন আই স আ গ্লিটার ইন ইয়োর আইজ। তোমার চোখ ঝলমল করছিল। আমার বয়স হয়েছে তো, আমি বুঝতে পারলাম কি ওই স্টোরিটা তোমায় মোটিভেট করছে। অ্যান্ড দেন আই স কি জেতা ইজ অলসো ইনফেকটেড বাই ইয়োর রোমান্টিসিজম
আমার মনে হল, এই অ্যাট্রাকশনটা তোমাদের ওখানে পৌঁছোতে হেল্প করবে। সেইজন্যই… বুঝলে তো?
আর তাছাড়া দেখো, আমরাও তো বসন্ত সাক্সেনাকে কয়েকটা ব্লাফ দিয়েছি— মানে, ওই ফাইলটা, তোমার বিশ্বাসঘাতকতার গল্প, তারপর তোমাকে আর্মি থেকে স্যাক করা, একজন ফার্স্টক্লাস কম্যান্ডো চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে— এসব তো আমার লোকেরাই ওকে গিলিয়েছে, তা-ই না? তা হলে তো শোধবোধ হয়েই গেল। তবে আর মাইন্ড করছ কেন, মাই সন?’
জেনারেল কাপুর তাঁর অদ্ভুত যুক্তিতে আমাদের স্তম্ভিত করে রেখে বেরিয়ে গেলেন। জেতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখ ছলছল করছে। আপনমনে বলে উঠল, ‘ধুর ছাই! কত আশা করেছিলাম, এখনকার একজন কবিও যদি ওই ফিরে পাওয়া সিরাজির গ্লাস হাতে নিয়ে নতুন করে একটা খৈয়ামের মতন রুবাইয়াৎ লিখতে পারে। তা নয়, উদ্ধার করে আনলাম কী? নোংরা হানি অয়েল!’
আমি উঠে গিয়ে আমাদের হোটেল রুমের ছোট্ট সেলার থেকে একটা ভিনটেজ পোর্ট-ওয়াইনের বোতল হাতে নিয়ে আবার জেতার মুখোমুখি এসে বসলাম। অপূর্ব সুন্দর লালরঙের সুরা। সম্ভবত এমনই কোনও ওয়াইন পুরোনো কাটগ্লাসের বোতলে ভরে বসন্ত সাক্সেনা সেদিন সিরাজির নামে আমাকে দেখিয়েছিল। যা-ই হোক, দুটো গ্লাসে সেই ওয়াইন ঢালতে ঢালতে জেতাকে বললাম, ‘কবিতা কি আর সিরাজির বোতলে থাকে, প্রিয়তমা? থাকে কবির হৃদয়ে। সত্যি কথা বলতে কী, আমি একটু আগেই আমার মাথায় একটা কবিতা এসেছে। শুনবে?’
জেতা বিরস মুখে বলল, ‘শোনাও।’
