ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

পরিষ্কার আত্মহত্যা – সৈকত মুখোপাধ্যায়

পরিষ্কার আত্মহত্যা

পক্ষাঘাতগ্রস্ত হাতে নিজের চোখের জলটাও উনি নিজে মুছতে পারেন না। গেনুর মা তাই একটা ছোটো সাদা তোয়ালে দিয়ে চৈতালি সিংহের চোখের কোল থেকে জলের ফোঁটাদুটো যত্ন করে মুছে দিয়ে বলল, ‘কেঁদো না, বউদি, কেঁদো না। কেঁদে কী লাভ বলো? বাড়ির মালিক যে, সে-ই বারান্দা ভাঙাচ্ছে। বাইরের লোক এসে তো আর ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে না। এর জন্য তুমি কাকে নালিশ জানাবে?’

ওরা দু’জনে বসে ছিল পশ্চিমের ছোটো ঘরটায়। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এই দমচাপা ঘরটাই চৈতালির জন্য বরাদ্দ। এমনকি রাতেও এ ঘরেই সিঙ্গল খাটে চৈতালি শোন আর মেঝেতে বিছানা পেতে শোয় তার সবসময়ের আয়া, গেনুর মা। চৈতালির স্বামী মোহিত সিংহ সারাদিন দোকানদারি করেন। সন্ধেবেলাটা মদের আসরে কাটিয়ে ফেরেন রাত বারোটা নাগাদ। তারপর পাশের বড়ো ঘরটায় অন্য একটা সিঙ্গল খাটে অচৈতন্য হয়ে পড়ে যান। একতলা থেকে তাঁকে ধরাধরি করে দোতলায় তুলে আনাটা গেনুর মা’র প্রতি রাতের একটা বাড়তি কাজ।

বউয়ের মুখ তাঁকে সারাদিনে আর দেখতে হয় না। সত্যি কথা বলতে কী, শরীর যাওয়ার পর থেকেই মোহিত সিংহের কাছে চৈতালি আইসক্রিমের কাঠির মতো অচ্ছুৎ। তিরিশ বছর সংলগ্ন থাকার পরে তাই গত পাঁচ বছর ধরে মানুষটার নালিশ, ঝগড়া, প্রতিবাদ— এসব করার মতো মনোবৃত্তিই নেই বউদির। ঠোঁটের ওপর ঠোঁট টিপে চুপ করে হুইলচেয়ারটিতে বসে থাকবে, আর কখনও কখনও শরীরের নয়, মনের ব্যথা খুব অসহ্য হলে, আর কাছেপিঠে দাদাবাবু না থাকলে লুকিয়ে চোখের জল ফেলবে। এই এখন যেমন ফেলছে।

ঠিক সেই সময়েই নীচের বাগান থেকে মোহিত সিংহের বাজখাঁই গলা দোতলার ঘরে ভেসে এল। ঊর্ধ্বমুখে দাঁড়িয়ে সানতারাসকে সঠিক পদ্ধতিতে বারান্দা ভাঙার নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি— ‘আরে এই ছোকরা! তুই আগে রেলিংগুলোকে খুলে নীচে রেখে যা। তারপরে বাকিটা ভাঙবি।’

ভাঙা হচ্ছে ওই পাশের ঘরের, মানে মোহিতবাবুর ঘরের লাগোয়া পুবের বারান্দাটা। অবশ্য মোহিতবাবু নিজে আর ক’দিন ওই বারান্দায় বেরোন? তার অনুপস্থিতিতে বউদিরই সারাদিন ওখানে হুইলচেয়ারে বসে কেটে যায়। কিছুক্ষণের জন্য হাতুড়ি পেটার দুমদাম শব্দে ছেদ পড়েছিল। সেই সুযোগে চৈতালিদেবী ক্ষীণকণ্ঠে গেনুর মাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ রে গেনুর মা, কতদিন ধরে এদের এই কাজ চলবে?’

‘দাদাবাবু তো বলছিল আজকেই ভাঙার কাজ শেষ হয়ে যাবে। দিন তিনেক বাদে রাজমিস্ত্রিরা নতুন ঘর তৈরির কাজে হাত দেবে।’

চৈতালির মুখটা আবার বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ল। বেশিক্ষণ একটানা ঘাড় সোজা করে রাখতে পারেন না। গেনুর মা তোয়ালে দিয়ে সযত্নে ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া সরু সুতোর মতো লালা মুছে দিয়ে বলল, ‘চলো, বউদি। তোমাকে চানটা করিয়ে দিই। এগারোটা বাজল।’

বলল বটে, কিন্তু আজকে গেনুর মা’রও যেন হাত-পা চলছে না। বউদির মনে যে কী উথালপাথাল হচ্ছে সে কথা ভেবে তার নিজের মনটাও যেন হামেশাই অসাড় হয়ে যাচ্ছে। কাজে ভুল হচ্ছে বারবার। অন্যদিন দশটা বাজলে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠানটা চালিয়ে দেয়। বউদির খুব প্রিয় অনুষ্ঠান ওটা। কিন্তু আজ তো ভুলেই গেল। এই এতক্ষণে মনে পড়ছে। পাঁচ বছর ধরে গৃহবন্দি মানুষটা এইরকম সব ছোটোখাটো জিনিস নিয়েই তো জীবন কাটাচ্ছে। রেডিয়োর একটা অনুষ্ঠান, কাগজের একটা পাতা। প্রবাসী নাতির ছবি যদি ইন্টারনেটে এসে কোনওদিন পৌঁছোল তো আনন্দ দেখে কে! বাড়তি কোনওকিছুর দাবি নেই, কারও ওপর কোনও রাগ-বিরক্তি নেই। নিজের অর্থহীন অস্তিত্বকে শান্তমুখে শুধু শেষের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া।

আর উলটোদিকে এ বাড়ির পুরুষ মানুষটাকে দেখো। মানুষ না জানোয়ার! দাঁতের ওপর দাঁতগুলো শক্ত হয়ে বসে যায় গেনুর মা’র, মোহিত সিংহর কথা ভাবতেই। নির্মম…. এত নির্মম হতে পারে কোনও মানুষ! বয়স তো হল বোধহয় ষাট-পঁয়ষট্টি। এখনও এত ভোগবাসনা! সারাদিন মোষের মতো গতরে গা-দেখানো চাঁপারঙের পাঞ্জাবি পরে জুয়েলারি দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে বসে রয়েছে, টাকা কামাচ্ছে আর সেই টাকায় ভোগ করে যাচ্ছে— মদ-মাংস-মেয়েছেলে স-অ-অ-ব … স-অ-অ-ব। তবু অসম্ভব রাগ ঘরের বউটার ওপর। ও কেন মরছে না? ও কেন ঘরের আবহাওয়াকে অসুস্থ, অসুখী করে রেখেছে? প্রথম প্রথম তো তবু ঠারেঠোরে বলত। এখন কিছুদিন হল পরিষ্কার বলে, ‘মর, মর, তুই মর! মরে আমাকে শাস্তি দে!’

‘ওর কীসের শান্তির অভাব বল তো, গেনুর মা?’ আড়ালে করুণ স্বরে গেনুর মাকে জিজ্ঞেস করেন চৈতালিদেবী। ‘আমার অসুখের জন্য কি ওকে এক মুহূর্ত কখনও ঘরে আটতে থাকতে হয়েছে? শেষ কবে যে জিজ্ঞেস করেছে আজ কেমন আছ, তা তো মনেই পড়ে না!’ গলাটা ধরে আসে চৈতালির। ‘তবু আমি নাকি ওকে শাস্তি দিচ্ছি না!’

কী জবাব দেবে গেনুর মা? সত্যিই তো, তোমার বিয়ে করা বউ, অসুস্থ বউ যদি ঘরের এককোণে চুপচাপ পড়েই থাকে, তাতে তোমার কীসের এত গাত্রদাহ? তবে সন্দেহ একটা হচ্ছিল ক’দিন ধরে। দিন পনেরো আগে কম্পাউন্ডার ছেলেটা, ওই যে বিজন, ও বউদিকে ইনজেকশন দিতে এসে সন্দেহটাকে সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে গেল। সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে চোখ মটকে বলে গেল, ‘তোমাদের কর্তা যে আবার বিয়ে করল গো।’

‘ছি, ছি! ও কেমনধারা কথা, বিজন? একটা বাপের বয়সি ভদ্রলোক সম্বন্ধে এমন কথা বলতে তোমার মুখে আটকায় না?’

‘আর ভদ্রলোক দেখিয়ো না গো, মাসি। কাল অগ্রণী ক্লাবের ছেলেরা মলয়বাবুর বিধবার ঘর থেকে হাতেনাতে ধরেছে সিংহমশাইকে। তখন সিংহর সে কী গর্জন! আমি ভিড়ের পিছনে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। বলে কী, এ আমার বিয়ে করা বউ! যখন ক্লাবের ছেলেরা বলল, বউ মানে! মামদোবাজি নাকি? ঘরে তোমার একটা বউ রয়েছে না… তখন বলে কী, সে-ও রয়েছে, এ-ও থাকবে। আমার কি পয়সার অভাব, যে দুটো বউকে খেতে দিতে পারব না? তারপর কী হল আর জানি না। আমি চলে এসেছিলাম। ক্লাবের ছেলেদের পয়সাকড়ি দিয়ে ম্যানেজ করেছে নিশ্চয়ই। পয়সা যার দুনিয়া তার, বুঝলে, মাসি? কিন্তু তোমার বউদিকে বল ভালোয় ভালোয় পটল তুলতে। না হলে সতীন নিয়ে ঘর করতে হবে।’

এমনিতে গেনুর মা বউদিকে ছেড়ে বড়ো একটা বেরোয় না। কিন্তু বিজনের মুখে ওই কথা শোনার পর, সে কয়েকদিন সন্ধেবেলা বাজারের দিকে একটু ঘোরাঘুরি করে বুঝে গেল কথাগুলো নিয্যস সত্যি। আরও সর্বনাশের কথা হল কী, বউদির কানেও কথাটা পৌঁছে গেল। মুখপুড়ি মিনতির কল্যাণে। দশবাড়ি কাজ করে, এই বাড়ির খবর ওই বাড়িতে পৌঁছে দেওয়াটাই তো ওর সবচেয়ে বড়ো আনন্দ কিনা! তাতে আর একটা মানুষের বুকে যে কত বড়ো শেল বিধল, তা বুঝবে কী ওই ষোলো বছরের ছুঁড়ি!

তারপর থেকে বউদি কেবলই কাঁদে। দাদাবাবুকে যে জিজ্ঞেস করবে, হ্যাঁ গো, যা শুনছি তা কি সত্যি— সে সাহসটাও পায় না। বোঝে গেনুর মা… সবই বোঝে। সে-ও তো মেয়েমানুষ। যদি দাদাবাবু বলে, হ্যাঁ, সত্যি- তা হলে কি আর পায়ের তলার মাটি থাকবে বউদির? মাটি অবশ্য এখনই নেই; চাকা আছে, হুইলচেয়ারের চাকা।

তবু যা-ই হোক, মাথার ওপর একটা ছাদ, হাতের পাশে ডাক্তারকে ডাকার জন্য একটা টেলিফোন, একটা সামাজিক পরিচয়— অমুকবাবুর স্ত্রী— এসব তো রয়েছে। তাই ভয় পায় বউদি খুঁচিয়ে সত্যিটাকে বের করতে।

গেনুর মাও তা-ই ভাবে। কী হবে খুঁচিয়ে ঘা করে? কিছু কি করতে পারবে? পারবে কি উথালপাথাল কেঁদে, ছেলেকে ডেকে, পাড়া- প্রতিবেশীদের ডেকে মুড়োঝ্যাঁটা দিয়ে বদমাশটার বিষ ঝেড়ে দিতে? পারবে না। যে মানুষ ভাতের গরাসটা মুখে তুলতে পারে না, তার কি আর বিবাদে যাওয়া মানায়? অসুস্থ হওয়ার আগে দাদাবাবুকে বউদি কোনওদিন মুখের ওপর কিছু বলেছে কি না তা বলতে পারবে না গেনুর মা। সে তো আর সে সময়ে ছিল না। তবে অসুস্থ হওয়ার পর প্রথম প্রথম এক- দু’বারই মাত্র অমন ভুল করতে দেখেছে সে বউদিকে। হ্যাঁ, ভুলই বলবে, মহা ভুল। সেইসব সামান্য অভিমানের কথাতেই এমন ইতরের মতো চেঁচামেচি শুরু করেছিল মোহিত সিংহ, এমনই গালিগালাজ আর অন্তরে ছ্যাঁকা দেওয়া সব বাক্যিবাণ বর্ষাতে লেগেছিল, যে সামান্য আয়াগিরি করে খাওয়া গেনুর মা অবধি কানে আঙুল দিয়ে পালাতে পথ পায়নি। বউদি ও আর দাদাবাবুর সামনে মুখ খোলার সাহস দেখায়নি কোনওদিন। আড়ালে গেনুর মাকে বলেছে, ‘অমন হলে ভীষণ বুক ধড়ফড় করে রে, গেনুর মা। মাথা-ঘাড় মনে হয় ফেটে পড়বে। আর-একটা স্ট্রোক হয়ে যাবে বুঝি আমার। তা হলে তো মরেই যাব, বল? আর মরতে আমি চাই, গেনুর মা। এই তোকে আমি সত্যি কথা বলি!’

জানে। গেনুর মা জানে বউদির এই কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। সে বউদির অষ্টপ্রহরের সঙ্গিনী না? সে জানে বউদি ভীষণ বাঁচতে ভালোবাসে। সুস্থ মানুষ হয়তো পেত্যয় পাবে না, কিন্তু ওই হুইলচেয়ারে বসা, লালে-ঝোলে মাখা মানুষটাই কান খাড়া করে গান শোনে। কোলের ওপর বই নিয়ে বসে থাকে। সামনে গেনুর মা থাকলে সেই বইয়ের পাতা উলটে দেয়, না থাকলে হাওয়ায় পাতা ওড়ে। বউদি তখন বিনা অনুযোগে, সেই হাওয়ার ইচ্ছেমতো, যখন যে পাতা সামনে আসে সেই পাতাটা যেটুকু পারে পড়ে ফেলে। টিভি দেখে না। বলে, মাথায় যন্ত্রণা হয়। কিন্তু হুইলচেয়ার ঠেলে ঠেলে বারান্দায় সন্ধ্যামণি গাছে প্রতিদিন ফুল এল কি না দেখতে যায়। এমনকি….. ভাবতে গিয়ে চোখে জল আসে গেনুর মা’র— পুজোর সময় নতুন কাপড়টি পরা চাই, বারান্দায় গিয়ে দেখা চাই রঙিন জনস্রোত।

বারান্দা!

হঠাৎ শব্দটা আলাদা করে গেনুর মা’র বুকে বাজে। আর তো রইল না বারান্দাটা। তার মানে বউদির কাল থেকে আর রইল না সকালে সূয্যি উঠতে দেখা। রইল না আকাশে টিয়ার ঝাঁকের গতিবিধি লক্ষ করার খেলা। রইল না বিকেলে সামনের মাঠে ছেলেপুলেদের খেলা দেখা। এমনকি সামান্য তুলসী-গাঁদা-সন্ধ্যামণির মন-কেড়ে নেওয়া কোণটুকুও তো ধুলিসাৎ হয়ে গেল। কী নিয়ে তা হলে থাকবে বউদি?

বারান্দা না থাকলে বউদিও কি আর থাকবে? বাঁচবে মানুষটা? বাঁচার প্রতি ভালোবাসাটাই হারিয়ে যাবে না তার?

আচ্ছা, জানোয়ারটা কি এইভাবে বউদিকে মেরে ফেলতে চায়, ওর বাঁচার অবলম্বনটুকু কেড়ে নিয়ে? না হলে কেন বারান্দাটা ভেঙে ফেলল? কী হবে নতুন ঘর নিয়ে? দু’টি তো মানুষ। আসলে মোহিত সিংহ তো কম চালাক নয়। ও নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছে যে, বারান্দাটাই আসলে সেই সরু শেকড়, যেটা দিয়ে বউদি আয়ুর রস টেনে নেয় আকাশ, মাটি, জল থেকে। শেকড়টাই তাই আজ কেটে দিল মোহিত সিংহ, তা-ই না? এরপর বউদিকে চিতায় তুলে দিয়ে নতুন বউ নিয়ে নতুন ঘরে সংসার পাতবে। বাহ্ বাহ্! থু! থু! ক্রোধে বিকৃত হয়ে গেল গেনুর মা’র বিগতযৌবন হাড়সার চৌকো মুখটা।

‘ও কি আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে, গেনুর মা?’ ভীষণ চমকে গেনুর মা তাকাল চৈতালিদেবীর মুখের দিকে। বউদি কি তার মন পড়ে নিল? চৈতালিদেবী আবার প্রশ্ন করলেন, ‘ও কি বারান্দাটা ভেঙে ফেলে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে, গেনুর মা?’ অবাক গেনুর মা দেখে কোথায় সেই শীর্ণ, সুন্দর, ভঙ্গুর মুখশ্রী। এ যে কোণঠাসা বেড়ালের মুখ। বউদির ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে দাঁতের পাটি। চোখের মণি ছড়িয়ে পড়ে ঢেকে ফেলেছে প্রায় সমস্তটা সাদা।

‘কিন্তু আমি মরব না, গেনুর মা! আমি মরব না, কিছুতেই না!’

সানতারাসের দমাদ্দম হাতুড়ির আওয়াজকে ছাপিয়ে কেমন করে উঠে এল ওই পক্ষাঘাতগ্রস্ত গলার আকুলতা? ওকে কি ভূতে পেয়েছে? ভাবতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল গেনুর মা’র।

হঠাৎ গলাটা আবার খাদে নেমে এল, ‘আমি ওকে মেরে ফেলব, বুঝলি, গেনুর মা? আমাকে মারার আগে আমি ওকে মেরে ফেলব!’

গেনুর মা হাঁটু গেড়ে চৈতালিদেবীর সামনে বসে পড়ল। ফিসফিস করে বলল, ‘সে তো খুবই ভালো হত গো, বউদি। কিন্তু আমরা মেয়েমানুষ। পারব কী করে ওই দশাসই লোকটাকে খুন করতে?’

‘পারবি গেনুর মা, পারবি। আমি তোকে রাস্তা বলে দেব। এখন নয়। সন্ধেবেলা বাবু অভিসারে বেরোন। তারপর তুই সব কলকাঠি সাজিয়ে রাখবি। বাড়ি যখন ফিরবে তখন তো বেহেড মাতাল। কিচ্ছু বুঝতে পারবে না। বুঝবে না। তারপর… তারপর রাতে যখন বাথরুম যাওয়ার জন্য উঠবে, তখন নিজে নিজে টুক করে গিয়ে পড়বে সেই কলে। ব্যস। চিত্তির!

চৈতালির মুখের দিকে চেয়ে আবার বুক কেঁপে উঠল গেনুর মা’র।

সন্ধে হতে চাঁপারঙের পাঞ্জাবি গায়ে গলিয়ে বেরিয়ে গেলেন মোহিত সিংহ। তখনই পাশের ঘর থেকে হুইলচেয়ার ঠেলে ঠেলে মোহিত সিংহর পুবের ঘরে পৌঁছোলেন চৈতালিদেবী। ফিসফিস করে ডাক দিলেন গেনুর মাকে, ‘এদিকে আয়। একটা টুল নিয়ে আয়। নিয়ে এসে বাথরুমের দরজার মাথা থেকে দেওয়ালঘড়িটা খোল। হ্যাঁ, এবার ওটাকে বারান্দায় ব্রেনোর দরজার মাথার ওপর টাঙিয়ে দে। পেরেক নেই তো কী হয়েছে। একটা পেরেক পুঁততে পারবি না?

দিয়েছিস? লক্ষ্মী মেয়ে! আর-একটা কাজ কর। দাদাবাবুর বালিশটা মাথার কাছ থেকে নিয়ে পায়ের কাছে দিয়ে দে। মনে রাখিস, মাতালটাকে যখন ধরে ধরে নিয়ে এসে শোওয়াবি, তখন কিন্তু ঠিক এইভাবেই শোওয়াবি। অন্যদিন যেদিকে মাথা থাকে সেদিকে পা, আর পায়ের দিকে মাথা। ও কী! এখন আবার ঝাঁট দিতে যাচ্ছিস কেন! মেঝেটা রাবিশের ধুলোয় ভরে গেছে? তা যাক না। যেতে দে। ওর ওপরে ভালো পায়ের ছাপ পড়ে। তুই ধুলো বাঁচিয়ে চলে আয় এদিকে। না, না, নাইটল্যাম্পটা এখন জ্বালিস না। একদম না। আজ ওকে অন্ধকার ঘরেই শোওয়াবি। কেন? তা তোকে অত ভাবতে হবে না। পাপ যদি কিছু লাগে তো আমারই লাগবে। তুই যা। খাওয়া-দাওয়া সেরে নে।’

হুইলচেয়ারে নিজের ঘরে চলে গেলেন চৈতালি দেবী। আবার তিনি এ ঘরের দরজায় ফিরে এলেন, রাত যখন বারোটা। অ্যালকোহলের বাষ্পে বেহেড মোহিত সিংহকে নীচ থেকে ধরে ধরে ওপরে নিয়ে এল গেনুর মা, যেমন রোজই নিয়ে আসে। অন্যদিন মাথা থাকে উত্তরে। আজ দক্ষিণে মাথা করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। চোখ সরু করে পুরোটাই দেখলেন চৈতালিদেবী।

রাত দুটো। হ্যাবিট ইজ দ্য সেকেন্ড নেচার। প্রতিদিনের মতোই বাথরুমে যেতে উঠলেন মোহিত সিংহ। ধুর শালা! নাইটল্যাম্পটা বোধহয় ফিউজ হয়ে গেছে। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। যাক গে, নিজের ঘরে চলতে গেলে আলো লাগে না। জানাই আছে, সিঙ্গল খাটের বাঁ-দিক দিয়ে নামলে বাথরুম, ডানদিকে দিয়ে নামলে বারান্দা। মানে বারান্দা ছিল। এখন আর নেই। এখন বাঁ-দিকে বাথরুম… ডানদিকে শূন্যতা। শূন্যতার দিকে যাবেন কোন দুঃখে মোহিত সিংহ? তার জীবন এখন ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। তিনি বাথরুমে যাওয়ার জন্য প্রতিদিনের মতো বাঁ-দিকেই নামলেন। নামতেই পায়ের কাছে বাথরুম স্লিপার পেয়ে গেলেন। আহ্, এই মাগিটা বড়ো ভালো। কী যেন নাম? গেনুর মা। হ্যাঁ হ্যাঁ, গেনুর মা সবদিকে নজর। একটু যদি বয়সটা কম হত… যাক গে, সবকিছু কি আর একসঙ্গে হয়? পায়ে স্লিপার গলিয়ে মোহিত সিংহ অন্ধকারের মধ্যেই বাথরুমের দিকে হাঁটা দিলেন। মাত্রই তো কয়েক পা।

ওই তো বাথরুমের দরজার মাথায় ওপরে রাখা দেওয়ালঘড়িটা রোজকার মতোই বেজে চলেছে— টিক-টিক, টিক-টিক, টিক-টিক। সেই শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে গেলেন মোহিত সিংহ। নেশাতুর চোখে ভেজানো দরজাটা খুললেন এবং পা বাড়ালেন …

পুবের ঘরের বাইরে অন্ধকার করিডরে তীব্র প্রতীক্ষায় যে এতক্ষণ ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল, সেই নিঃশব্দ হুইলচেয়ার এবার ফিরে চলল পশ্চিমের ঘরে।

যেতে যেতে চৈতালিদেবী মনে মনে বললেন, বারান্দাটা আবার নতুন করে বানাতে হবে। হ্যাঁ, যেখানেই ছিল সেখানেই।

পরদিন সকাল আটটা নাগাদ, বাগানে রাবিশের স্তূপের ওপর পড়ে থাকা মোহিত সিংহের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে থানার ফার্স্ট অফিসার, সেকেন্ড অফিসারকে বললেন, ‘তুমি বড়ো বেশি বেশি ভাবো, মৃদুল। বাড়িতে দু’জন মহিলা, তার মধ্যে একজন আবার প্যারালাইজ্‌ড। খুনটা করবে কে? ভূতে? ফুটপ্রিন্ট দেখো, ফিংগারপ্রিন্ট দেখো। লোকটা নিজে খাট থেকে নেমেছে। বারান্দার দরজা খুলেছে, তারপর লাফ মেরেছে। কদিন আগে মেয়েঘটিত ব্যাপারে পাড়ার ছেলেদের কাছে ইনসাল্টেড হয়েছিল। খুঁজলে দেখবে ব্যাবসাতেও লস খেয়েছে। মোটিভের অভাব কী?

‘না, না, মৃদুল। ইট ইজ আ ক্লিয়ার কেস অফ সুইসাইড। পরিষ্কার আত্মহত্যা।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *