ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

লোলুপ – সৈকত মুখোপাধ্যায়

লোলুপ

মাঝখানে তিন বছর নানান ডামাডোলে আমাদের সায়েন্স কলেজের কোনও ম্যাগাজিন বেরোয়নি। এ বছর স্টুডেন্টস ইউনিয়ন থেকে আমরা কয়েকজন আদাজল খেয়ে লাগলাম ওটা আবার বার করতে হবে। এত বড়ো একটা ইনস্টিটিউশন, বছরে একটা ম্যাগাজিন না বেরোলে হয়?

উৎসাহটা যেহেতু আমিই বেশি দেখিয়েছিলাম, তাই আমাকে, মানে শ্রী অর্ক মণ্ডলকেই সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে হল।

আমাদের কলেজ-ম্যাগাজিনে গল্প, কবিতা ইত্যাদির পাশাপাশি অধ্যাপক এবং প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের লেখা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধও থাকে। সত্যি কথা বলতে কী, ওই সুলিখিত প্রবন্ধগুলোই পত্রিকার মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।

ম্যাগাজিন কমিটির কনভেনর ছিলেন প্রাক্তন ছাত্র অরিন্দম চক্রবর্তী। দু’ হাজার তিন সালে সায়েন্স কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছিলেন। তারপর মাস্টার্স, পি. এইচ. ডি. ইত্যাদি করার পরে এখন হিন্দুস্থান লিভারের কী যেন একটা বিশাল পোস্টে আছেন। অরিন্দমদা ছিলেন আমার বড়ো সহায়। তাঁর অফিস-কোয়ার্টারটাও ছিল আমাদের কলেজ থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে। একটা ফোন করে নিয়ে সন্ধের পরে যখন ইচ্ছে ওঁর কাছে চলে যাওয়া যেত। যেতামও তাই। যে লেখাগুলো পেয়ে গেছি সেগুলো ওঁকে দেখিয়ে নিতাম। এডিট-টেডিট যা করার উনিই করে দিতেন। তাছাড়া আর কার কার কাছে লেখা চাওয়া যায় সে ব্যাপারেও ওঁর পরামর্শ নিতাম।

একদিন এরকম বসে আছি অরিন্দমদার ঘরে। আমার ল্যাপটপে একটা প্রবন্ধ খোলা আছে, যেটা সেদিনই মেলে পেয়েছি। উনি সেটা পড়ছেন। কিন্তু খেয়াল করলাম পড়তে পড়তে বারবারই যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছেন। কী যেন বলবেন বলবেন করেও বলছেন না।

শেষকালে প্রশ্নটা করেই ফেললাম। ‘কী ভাবছেন, অরিন্দমদা? পছন্দ হচ্ছে না?’

উনি বললেন, ‘না, লেখাটা তো খুবই ভালো। কিন্তু এখনও অবধি যতগুলো লেখা পড়লাম সবই যেন চেনা গণ্ডির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। সেইজন্যই একজনের কথা মনে পড়ছে, যে চিরকাল ছকভাঙা কাজ করত। আমাদেরই একজন ব্যাচমেট।’

আমি প্রবল উৎসাহে অরিন্দমদার দিকে ঝুঁকে পড়লাম। বললাম, ‘কে তিনি?’

‘রাতুল। রাতুল ব্যানার্জি।’

বোকার মতো বলে বসলাম, ‘রাতুল ব্যানার্জির লেখা ভালো?’ অরিন্দমদা কিচ্ছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে, কেটে কেটে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, ‘রাতুল যদি আর কিছু না করে পপুলার সায়েন্সের বই লিখত, তা হলে মিশিও কাকু, বিল ব্রাইসন কিম্বা রিচার্ড ডকিন্সের দলে নাম লেখাতে পারত— একইসঙ্গে এত লুসিড এবং কবিত্বময় ছিল ওর প্রবন্ধের ভাষা। আর ওর রিসার্চের বিষয়গুলোও ছিল তেমনই ইউনিক। পড়লেই মনে হত, এভাবেও ভাবা যায়?’

অরিন্দমদাকে ততদিনে যেটুকু চিনেছি তাতে জানতাম, উনি অত্যন্ত খুঁতখুঁতে প্রকৃতির মানুষ। নিজে একজন স্কলার বলেই চট করে অন্য কারুর লেখাকে ভালো বলেন না। এহেন অরিন্দমদা যাঁর সম্বন্ধে এতটা উচ্ছসিত, তিনি তা হলে কেমন মাপের বৈজ্ঞানিক! বললাম, ‘আপনি এক্ষুনি আমাকে রাতুল ব্যানার্জির কনট্যাক্টস দিন। আমি লেখার জন্য ঝাঁপাচ্ছি।’

অরিন্দমদা বিষণ্ণ মুখে বললেন, ‘সেটাই তো দুঃখ রে, অর্ক! আমার একার নয়, আমাদের ব্যাচের সবার দুঃখ। টু থাউজ্যান্ড টেন, মানে রাতুল যখন জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের টুবিংগেন ইউনিটে জেনেটিক্স নিয়ে রিসার্চ করছে তখন অবধি ওর সঙ্গে আমাদের দিব্যি যোগাযোগ ছিল। তারপর কোথায় যে হারিয়ে গেল। গত চোদ্দো বছরে আর কোনওভাবেই যোগাযোগ করতে পারিনি।

দু’হাজার আটে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কেই ওর এক কো-রিসার্চার, দাঁড়া, নামটাও মনে আছে লরা… হ্যাঁ, লরা স্রিংবার্গ-কে বিয়ে করেছিল। ওখানেই দিব্যি ছিল দু’জনে। ফোনে কথাবার্তাও হত। তারপর একদিন লিখল, ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি। একটা ফিল্ড-স্টাডির ব্যাপার আছে। তোদের সঙ্গে দেখা হবে। ব্যস, ও-ই শেষ।

খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ওরা দু’জনেই টুবিংগেন ইউনিট থেকে রেজিগণেশন দিয়ে ইন্ডিয়ায় এসেছিল। তারপর দু’জনেই যেন জাস্ট হাওয়ায় উবে গেল।’

বললাম, ‘অরিন্দমদা, আপনার ব্যাচমেটরা সারা ভারতে শুধু নন, সারা পৃথিবীর যতগুলো নামকরা রিসার্চ ইনস্টিটিউট রয়েছে সবক’টাতে ছড়িয়ে রয়েছেন। প্রাণীবিজ্ঞানে যেখানে যা কাজ হচ্ছে সব আপনাদের নখদর্পণে। আপনারা যদি গত চোদ্দো বছরে রাতুল ব্যানার্জি কিংবা তাঁর স্ত্রী লরা সিংবার্গের খোঁজ না পেয়ে থাকেন, তা হলে তার একটাই মানে হয়।’

অরিন্দমদা ভুরু কুঁচকে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী মানে?’

‘ওঁরা দু’জনে আর অ্যাকাডেমিশিয়ার মধ্যে নেই। গবেষণা এবং শিক্ষকতার জগৎ ছেড়ে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।’

অরিন্দমদা বললেন, ‘কিংবা মারা গেছে।’

‘উহুঁ। কোনও ইনস্টিটিউটে কর্মরত অবস্থায় মারা গেলেও আপনারা খবর পেতেন। ওঁরা আর বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কই রাখেননি।’

‘কী করছে তা হলে? চাষ করছে না ছাগল চরাচ্ছে? শোন অর্ক, রাতুল ছিল আমার প্রাণের বন্ধু। ওর বউ লরার সঙ্গেও ফোনে অনেক আড্ডা মেরেছি, যদিও মুখোমুখি কখনও দেখা হয়নি। ওরা দু’জনেই ছিল সত্যিকারের জ্ঞানতাপস। রিসার্চ জিনিসটা ওদের কাছে ছিল নিশ্বাস প্রশ্বাসের মতো।

তুই যা বলছিস তার মধ্যেও যুক্তি আছে মানছি। কিন্তু তবু আমি তোকে একটা কথা বলে দিচ্ছি। ওরা হয় গবেষণার মধ্যে থাকবে আর না হলে কিছুর মধ্যেই থাকবে না। আমার মতো কর্পোরেটের কলার পরে টাকা কামাবার মানুষ ওরা নয়। রাতুল যে ঠিক কী মাপের গবেষক এবং লেখক ছিল সেটা এই লেখাগুলো পড়লে তুই কিছুটা বুঝতে পারবি।’

এই বলে অরিন্দমদা রাতুল ব্যানার্জির কিছু পুরোনো লেখার সফ্‌টকপি তখনই আমার মেলে ফরোয়ার্ড করে দিলেন। আমি রাত জেগে সেগুলো পড়লাম। পড়ে ফ্ল্যাট হয়ে গেলাম। ঠিক করলাম, এই ভদ্রলোকের লেখা যেভাবে হোক জোগাড় করবই। তবে তার জন্য আগে ওঁকে খুঁজে পাওয়া দরকার।

আমার মন বলছিল উনি কোনও কারণে অজ্ঞাতবাসে আছেন এবং অজ্ঞাতবাসে থাকতে হলে সবচেয়ে ভালো জায়গা নিজের বাড়ি। রাতুলবাবুর নিজের বাড়ি কোথায় ছিল? অরিন্দমদা তো বললেন কলেজে পড়ার সময় কলেজ হোস্টেলে থাকতেন। এখন তো আর সেখানে থাকবেন না।

পরদিন কলেজে গিয়ে অফিস-অ্যাসিস্ট্যান্ট দেবু মাইতিকে তিতিবিরক্ত করে কলেজের স্টোর রুম থেকে দু’হাজার সালের অ্যাডমিশনের জাবেদা খাতা বার করিয়ে রাতুল ব্যানার্জির হোম-অ্যাড্রেস নোট করলাম এবং অরিন্দমদাকে মেসেজ করলাম, আমি এখনই ট্রেন ধরে টাকি যাচ্ছি। রাতুল ব্যানার্জি যদি ইন্ডিয়া থেকে আবার বিদেশে ফিরে না গিয়ে থাকেন, তা হলে টাকিতেই থাকবেন। কারণ ওখানেই ওঁর পৈতৃক বাড়ি।

টাকি লঞ্চঘাটে অনেকক্ষণ ধরে একে-ওকে রাতুল ব্যানার্জির ঠিকানা জিজ্ঞেস করার পর এক বৃদ্ধা পানের দোকানি বললেন, ‘ও! তুমি বোধহয় রমেনডাক্তারের ছেলের কথা বলছ। সে-ই তো শুনেছি বিলেতে গিয়ে মেমসাহেব বিয়ে করেছিল।’

মনে পড়ল, অ্যাডমিশনের খাতায় রাতুল ব্যানার্জির নামের নীচে ‘সন অফ ডক্টর রমেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি’-ই লেখা ছিল বটে। ঘাড় হেলিয়ে বৃদ্ধাকে বোঝালাম, তার অনুমান নির্ভুল।

তিনি বললেন, ‘তা হলে এক কাজ করো বাছা। নদীর বাঁধ ধরে সোজা পশ্চিমে হাঁটা লাগাও। জেলেপাড়া পেরিয়ে দেখবে নদীর ধারে হলুদ রঙের একটা দোতলা বাড়ি। ওখানে আর অন্য কোনও বাড়িঘর নেই। চিনতে অসুবিধে হবে না।’

সেই হাঁটা লাগালাম তো লাগালাম। চোখের সামনে ইছামতীর জলকে রাঙিয়ে দিয়ে বৈশাখ মাসের সূর্য অস্ত গেল। প্রায় পঁচিশ মিনিট হাঁটার পরে দেখলাম, নদীর পাড়ে খোলায় ছাওয়া কুঁড়েঘরগুলোর উঠোনে মাছ ধরার জাল শুকোচ্ছে। বুঝলাম, জেলেপাড়ায় পৌঁছে গেছি। তারপরেই একদম একলা একটা দোতলাবাড়ি। বাড়ির রং হলুদ ছিল নিশ্চয়ই কোনওকালে। এখন অর্ধেক জায়গায় পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে গেছে। বাকি অর্ধেকের রং শ্যাওলা সবুজ।

নদীর বাঁধ থেকে নেমে ইটের রাস্তা ধরে বাড়িটার সামনে পৌঁছোলাম 1 ভাঙা গেটের ওপাশে একটুকরো বাগান। সন্ধের অন্ধকারে ঠিক বুঝলাম না, তবে মনে হল বাগানটায় শাকসবজির গাছই বেশি। একটা ক্রোটন গাছের ঝোপের ভেতর থেকে ঠিক আমার পায়ের সামনে দিয়ে দুটো বেজি ওই অন্ধকারে ডুবে থাকা বাড়িটার দিকেই দৌড়ে চলে গেল। আমিও ওদের পিছন পিছন বাগান পেরিয়ে আধভাঙা সদর দরজায় কড়া নাড়লাম।

মিনিট তিনেক পরে পাল্লার ক্র্যাকের মধ্যে দিয়ে একফালি আলো এসে আমার গায়ে পড়ল। বুঝলাম, ভেতরে কোথাও একটা বাল্‌ব জ্বলেছে। তারপরেই যিনি দরজা খুলে আমার মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তাঁর পরনে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি। গায়ের রং ফ্যাকাশে। বয়স হয়তো চল্লিশের একটু ওপরেই হবে… মানে, দু’হাজার তিনে গ্র্যাজুয়েশন করে থাকতেই পারেন। কিন্তু মাথার সমস্ত চুল সাদা। সব মিলিয়ে ওঁকে একটা মোমবাতির মতন লাগছিল— ওরকমই রোগা আর নীরক্ত। আমতা আমতা করে বললাম, ‘ইয়ে, মানে মিস্টার রাতুল ব্যানার্জি…’

‘আমিই রাতুল।’ এইটুকু বলে তিনি আমার মুখের ওপর উজ্জ্বল কালো চোখদুটোকে স্থির রেখে, দরজার দুটো পাল্লায় দুটো হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

নমস্কার করে বললাম, ‘আমার নাম অর্ক মণ্ডল। সায়েন্স কলেজের সেকেন্ড ইয়ার। আমাকে অরিন্দম চক্রবর্তী আপনার কথা বলেছেন।’

মনে হল ভদ্রলোকের চোখের খরদৃষ্টি একটু নরম হয়ে এল। বললেন, ‘অরিন্দম! কেমন আছে ওরা? কতদিন যোগাযোগ নেই। এসো, ভেতরে এসো।’

উনি দরজার পাল্লা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে একটা শ্যাওলা-জমা পেছল উঠোন পেরিয়ে মূল বাড়ির দালানে উঠলেন। পিছন পিছন আমি। সারি সারি বন্ধ দরজার মধ্যে একটার শেকল খুলে, হাত বাড়িয়ে দেওয়ালের গায়ের স্যুইচ টিপে আলো জ্বালালেন। আমাকে বললেন, ‘ভেতরে এসো। তুমি কি কলকাতা থেকে এলে?’

‘হ্যাঁ, স্যার।’

ঘরটার মধ্যে একটা কাঠের সোফাসেট ছিল ঠিকই, কিন্তু তার গদিগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, বসার যোগ্য ছিল না। উনি আমার দিকে একটা মোড়া এগিয়ে দিয়ে নিজে মুখোমুখি একটা মোড়ায় বসে বললেন, ‘স্যার বলছ কেন? কলেজতুতো ভাই যখন, আমাকে রাতুলদাই বলবে। এই বাড়ির ঠিকানা জানলে কোত্থেকে?’

কলেজের অ্যাডমিশন রেজিস্টারের কথা বললাম। তারপর কেন ওঁর কাছে এসেছি, সে কথাও। উনি শুনেই বললেন, ‘আমাকে বাদ দাও, অর্ক। আমি আর কিছু ভাবতে পারি না, পড়তেও পারি না। বিজ্ঞানের সঙ্গে বহুদিন কোনও যোগাযোগ নেই। আমি বাতিল হয়ে গেছি। ফুরিয়ে গেছি।’

বুঝলাম, আমার অনুমান ঠিকই ছিল। এরপর যে প্রশ্নটা করা স্বাভাবিক সেটাই করলাম। বললাম, ‘তা হলে কী করেন এখন?’

‘আমি? আমার একটা ছেলে আছে। অ্যাবনর্মাল। কিম্বা বলা ভালো, ওর নিজের মতন করে নর্মাল। ওর দেখাশোনা করি। আর একটু বাগান- টাগান করি। বাবার আমলের একজন বিশ্বাসী হেল্পিং-হ্যান্ড আছেন- তারককাকা। উনিই সংসার সামলান।’

মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘আর আপনার স্ত্রী? মিসেস লরা সিংবার্গ?’

‘মারা গেছে। ওই বাচ্চা হওয়ার সময়েই। তখন আমরা ছত্তিশগড়ে মারিয়া উপজাতিদের একটা গ্রামে ফিল্ড-ওয়ার্ক করছিলাম। ওসব জায়গায় ডাক্তার পাওয়া যায় না। বাচ্চাটাকেও বাঁচাতে পারতাম না। কোনওরকমে নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। সেই যে এই বাড়িতে ঢুকেছি, তারপর আর বাড়ির বাইরে পা রাখিনি।’

মনে মনে বললাম, ডাক্তার না পাওয়া যাক, প্রোটেকশন নিতে কেউ বারণ করেছিল? লরার প্রেগন্যান্সিটা আটকানো গেলে তো অকালে প্রাণটা যেত না। একেবারেই ষণ্ডের মতন কাজ করেছেন।

হঠাৎ খেয়াল করলাম রাতুলদার ঝকঝকে চোখের দৃষ্টি আবার আমার মুখের ওপরে স্থির হয়ে রয়েছে। যেন উনি আমার মন পড়তে পারছেন। তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বললাম, ‘রাতুলদা, এখন, এই মুহূর্তে যদি কোনও রিসার্চের কাজ না-ও করেন, অন্তত যে কাজটা নিয়ে জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন তার সম্বন্ধেই কিছু লিখুন। কাজটা কি শেষ হয়েছিল, না কি অ্যাবানডন করে দিয়েছিলেন?’

আমার কথা শুনে উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘এমন করে বলছ, অর্ক, আমার খুব মায়া হচ্ছে। কিন্তু ওই বিষয় নিয়ে লেখা যাবে না। লোকে আমাকে পাগল বলবে। এর আগে কয়েকজন সায়েন্টিস্টকে বলতে গিয়েছিলাম। ফল ভালো হয়নি। অ্যাকাডেমিশিয়া থেকে আমার নির্বাসনের কারণ ওইটাই। পৃথিবীর খুব বড়ো কয়েকজন পণ্ডিত আমাকে পাগল বলে ঘোষণা করেছেন। সে-ও অবশ্য অনেকদিন আগের কথা। তারপর থেকে আর কারুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি। আমার কম্পিউটার নেই, ফোন নেই। খবরের কাগজও পড়ি না।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উনি বললেন, ‘আজ বহুদিন পরে আবার একজন বাইরের লোকের মুখ দেখলাম। না, সরি। বাইরের কেন হবে? তুমি আমার সতীর্থ, আমার ভাই। তুমি শুনবে, অর্ক? আমার সেই কাজটার কথা? পাগল ভাববে না তো আমাকে?’

আমি কথা না বলে জোরে দু’বার ঘাড় নাড়লাম।

‘আসলে আমি তো খুব সোশ্যাল মানুষ ছিলাম। গল্প করতে, আড্ডা মারতে ভালোবাসতাম। আজ তোমাকে দেখে আবার প্রাণভরে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। জানো, অর্ক, এই অভিশপ্ত প্রোজেক্টটাই আমার জীবনটাকে নষ্ট করে দিল। চেষ্টা করছি আবার একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে, বাইরের দুনিয়ায় বেরোতে। কিন্তু ঘোটুলবাবা আমার বড়ো পিছুটান। ওকে যে কোথায় কার কাছে রেখে যাব।’

‘ঘোটুল আপনার ছেলে? মিষ্টি নাম তো।’

উনি একটু হেসে বললেন, ‘শব্দটা কি চেনা?’

‘কোন শব্দটা? ঘোটুল? ওরকম শব্দ সত্যি করেই আছে নাকি! আমি শে ভাবলাম আঁটুল বাঁটুল শামলা সাঁটুলের মতন বানিয়েছেন।’

‘আজ্ঞে না। গোন্দ-মারিয়াদের প্রতিটি গ্রামের বাইরে একটা মস্ত ঘর থাকে। থাকত বলাই ভালো; আজকাল আর থাকে না। সেই ঘরের নামই হচ্ছে ঘোটুল। বিবাহিত নারী-পুরুষদের সেই ঘরের ত্রিসীমানায় যাওয়া বারণ। কিন্তু সন্ধের পর গ্রামের যত অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীদের ঘোটুলে যেতেই হবে।

ঘোটুলে গিয়ে ওরা একসঙ্গে নাচে, গান গায়, গল্প করে। পালা করে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে সেক্সও করে। এবং তার জন্য খুব একটা আড়ালও প্রয়োজন হয় না। তবে গ্রুপ-সেক্স নৈব নৈব চ। অলওয়েজ ওয়ান-ইজ-টু ওয়ান। এবং একজন পার্টনারের সঙ্গে একটানা তিনরাতের বেশি কখনওই নয়।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এরকম অদ্ভুত নিয়ম কেন?’

‘অদ্ভুত কোথায় দেখলে? প্রথমত, এইভাবে ইয়ং জেনারেশনের মধ্যে একটা বন্ডিং তৈরি হয় নিশ্চয়ই। সবাই সবার বন্ধু হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ওই ঘোটুল থেকেই বিয়ের জুড়িও তৈরি হয় যায়। কী ভয়ংকর প্রোগ্রেসিভ সিস্টেম ভাবতে পারছ? আমাদের সভ্যসমাজে শুধু স্বামী- স্ত্রী’র সেক্সুয়াল ডিজায়ার ম্যাচ করে না বলে কত দাম্পত্যজীবন বিষ হয়ে যাচ্ছে, আর ওই তথাকথিত অসভ্য মারিয়ারা কত লক্ষ বছর ধরে বিয়ের আগেই পার্টনারের মন এবং শরীর সব যাচিয়ে নিচ্ছে।’

মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘বাপরে! এসব তো অ্যানথ্রোপলজির ব্যাপার। আপনি কেমন করে জানলেন?’

রাতুলদা বললেন, ‘প্রথমত, আমি চিরকালই পল্লবগ্রাহী। নিজের সাবজেক্টের বাইরে আরও অনেককিছুই পড়ে ফেলি। মানে, ফেলতাম। এখন তো কিছুই পড়ি না। আর দ্বিতীয়ত আমি আর লরা বাইসন- মারিয়াদের গ্রামে অনেকদিন বাস করেছি। কাজেই ওদের প্রথাগুলো সবই আমার নিজের চোখে দেখা— বই পড়ে শিখতে হয়নি। তবে হ্যাঁ, আমি ছেলের নাম দিয়েছি শব্দটার মিষ্টত্বের জন্যই। ঘোটুল শব্দটা লরারও বড়ো প্রিয় ছিল। আর কিছু নয়।’

এই সময়েই একজন প্রৌঢ় মানুষ আমাদের জন্য চা-বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। রাতুলদা তাঁকে বললেন, ‘তারককাকা, ছাদে একটা মাদুর পেতে দাও তো। আমরা দু’জন ছাদে গিয়ে বসি। ইছামতীর হাওয়া ছেড়েছে। এখন ঘরের চেয়ে ছাদে বসতেই আরাম লাগবে। চলো, অর্ক।’

.

দুই

ছাদে উঠে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। মাথার ওপরে আকাশ ভরা অজস্র তারা। ইছামতীর কালো জলে তাদের ছায়া পড়েছিল। নদীর উলটো পাড়ে বাংলাদেশের কোনও গ্রামের আলো চিকমিক করছিল। সে-ও যেন আরও একমুঠো তারা। হাওয়ার সঙ্গে শিশুফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল।

রাতুলদা বললেন, ‘জার্মানি থেকে ফিরে এই বাড়িতেই আমি আর লরা এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলাম। কী আনন্দে কেটেছিল সেই একটা সপ্তাহ! তারপর এখান থেকেই রওনা হয়েছিলাম ছত্তিশগড়ে।’

বললাম, ‘কিছু মনে করবেন না, রাতুলদা। আপনি তো জেনেটিক্‌স নিয়ে কাজ করছিলেন। আপনার কয়েকটা প্রবন্ধ আমাকে অরিন্দমদা পড়তে দিয়েছিলেন। ওই কাজগুলো সবই ল্যাব-ওরিয়েন্টেড ছিল। সাধারণত জিন নিয়ে রিসার্চগুলো ল্যাবরেটরির মধ্যেই হয়। আপনার ফিল্ড-ওয়ার্কের প্রয়োজন হল কেন?’

‘ঠিকই বলেছ,’ বললেন রাতুলদা, ‘শুধু আমার কেন, লরারও সাবজেক্ট ছিল জেনেটিক্স। আরও স্পেসিফিকলি বলতে গেলে আমরা দু’জনে মিলে চেষ্টা করছিলাম সংকর প্রজাতি তৈরি করতে গেলে কোষের ভেতর থেকে যে বাধাগুলো আসে, সেগুলোকে উড়িয়ে দিতে। একেবারে উড়িয়ে দিতে না পারি, বাধাগুলো কিছুটা অন্তত কমিয়ে আনতে। বুঝতে পারছ তো, তা হলে হাইব্রিড তৈরির কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়।’

রাতুলদা এত সহজ করে ওঁদের গবেষণার মূল ব্যাপারটা বললেন, মনে হল কাজটা চাল থেকে কাঁকর বেছে ফেলার মতন সহজ। আসলে তা নয়। যদি তা-ই হত তা হলে দু’জন মেধাবী গবেষক দু’বছর ধরে ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের একটা ইউনিটে ঘাড় গুঁজে কাজ করে যেতেন না। তবে এটা বুঝলাম, আর যাই হারিয়ে ফেলুন, কঠিন কথা সহজ করে বলার প্রতিভাটা রাতুল ব্যানার্জির মধ্যে এখনও পুরোদমে রয়েছে। ম্যাগাজিনের জন্য ওঁর লেখাটা জোগাড় করার লোভ আবার পেয়ে বসল আমাকে।

লিখবেন কি না জানি না, কিন্তু উনি বেশ ঝরঝর করে সেই সময়ের কথা বলে চললেন-

‘একটা সময়ের পরে আমরা আর এগোবার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বুঝতে পারছিলাম, পরিবেশের কিছু কিছু উপাদানকে বদলাতে পারলে প্রাণীশরীর সহজেই ফরেন জিনের অনুপ্রবেশ মেনে নেবে। প্রকৃতির বুকে এরকম ঘটনা কখনও-সখনও ঘটেই থাকে। কিন্তু সেই আদর্শ পরিবেশকে ল্যাবরেটরির মধ্যে সিমুলেট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।

প্রকৃতি এমন অনেককিছুই পারে এবং করেও ফেলে মানুষের কাছে যা ধারণার অতীত। হবে না কেন? নেচারের ল্যাবরেটরিতে বুনসেন বার্নারের কাজ করে আগ্নেয়গিরি। খলনুড়িতে পেষাইয়ের কাজটা হয় এগিয়ে আসা হিমবাহের কোটি কোটি টন বরফের নীচে। তার কাছে আমরা তো শিশু! একদিন ফ্রাসট্রেটেড হয়ে লরাকে বলেই ফেললাম, যদি এরকম একটা জায়গা খুঁজে পেতাম, যেখানে হাওয়া-মাটি-জল সব আমাদের কাজের জন্য তৈরি হয়ে বসে আছে!

জার্মান মেয়ে লরার রক্তে লড়াই। তবু সে-ও আমার কথাটা শুনে নোটবুকের ওপর থেকে ক্লান্ত মাথাটা তুলে বলল, কী ভালোই যে হত তা হলে।

তুমি তো নিশ্চয়ই জানো, অর্ক, অনেক বিজ্ঞানীই যখন গবেষণার কাজে একটা অন্ধগলির মধ্যে আটকে পড়েছেন, যখন কোনদিকে কীভাবে এগোলে লক্ষ্যে পৌঁছোবেন বুঝতে পারছেন না, তখন কোনও একটা অদ্ভুত ঘটনা তাদের সামনে নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে। কখনও স্বপ্নে পেয়েছেন নতুন পথের সন্ধান। কখনও বাচ্চা ছেলেমেয়ের খেলনা দেখে বৈজ্ঞানিকের মাথায় ঝলসে উঠেছে নতুন আইডিয়া। আমাদের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হল। যেদিন আমার আর লরার মধ্যে ওই কথাবার্তা হচ্ছিল, ঠিক তার পরের দিনই আমাদের ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর রুবেনবাৰ্গ আমাকে ডেকে বললেন, ওহে ব্যানার্জি, তোমাকে নিজের কাজের বাইরে একটা কাজ একটু তুলে দিতে হবে।

শুনে যতটা খারাপ লাগার কথা, অতটা খারাপ লাগল না। নিজের কাজ বলতে তখন নোটবুকের পাতায় বলপয়েন্ট পেন ঘষে জিলিপির পর জিলিপি আঁকা নয়তো ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকা। ভাবলাম, একটু অন্যদিকে মন দিলে হয়তো ভালোই হবে। জিজ্ঞেস করলাম, কী কাজ, স্যার?

এরিকা মেয়ারের নাম শুনেছ?

মস্ত বড়ো করে ঘাড় হেলালাম। ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের যে- কোনও ইউনিটে যে পড়তে কিম্বা পড়াতে এসেছে, কিম্বা ওসব কিছু নয়, নিতান্ত ইনস্টিটিউটের লনের ঘাস ছাঁটতে এসেছে যে, তার পক্ষেও এরিকা মেয়ারের নাম না শোনাটা আশ্চর্য। উনি ছিলেন প্রতিভাবতী এক গবেষক। গবেষণার বিষয় ছিল, ওই একটু আগে যা বলছিলে, অ্যানথ্রোপলজি, অর্থাৎ নৃতত্ত্ব। উনি কাজ করতেন লিপজিগের হিউম্যান- সায়েন্স ইউনিটে।

এরিকার একটা বিখ্যাত থিয়োরি ছিল, বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে প্রচলিত যেসব ফোকলোর অর্থাৎ লোককথা, সেগুলো মোটেই গাঁজাখুরি নয়। তাদের মধ্যে ইতিহাসের উপাদান লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের কোনও শাখাতেই শুধু থিয়োরিতে আটকে থাকলে তো চলে না। থিয়োরির সপক্ষে প্রমাণ জোগাড় করতে হয়। সেইসব প্রমাণ জোগাড় করতে এরিকা মেয়ার পাপুয়া-নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার গহন জঙ্গলে ছ’বছরে তিনবার অভিযান চালিয়েছিলেন এবং এমন অকাট্য সব প্রমাণ নিয়ে এসেছিলেন যা সারা বিশ্বের অ্যানথ্রোপলজিস্টদের টনক নড়িয়ে দিয়েছিল। নিন্দুকে বলে, ওইসব অভিযানের খরচ এবং ম্যান- পাওয়ার জোগাবার জন্যই এরিকার এত পুরুষবন্ধুর প্রয়োজন হত!

পুরুষবন্ধু শুনে ঘাবড়ালে নাকি? ঘাবড়িয়ো না। এরিকা ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী এবং প্রেমের মাঠের নিপুণ খেলুড়ি। লিপজিগ ক্যাম্পাসের ভেতরে তাঁর নৈশ-অভিসারগুলো কারুর কাছেই গোপন ছিল না, এবং ছিল না বলেই বেশ কয়েকজন তরুণ সুদর্শন অধ্যাপকের চাকরি নিয়েও টানাটানি হয়েছিল। শুনেছি দেনার দায়ে ইনস্টিটিউট ছেড়ে পালাতেও হয়েছিল কয়েকজনকে। আর এ সবই ঘটেছিল সত্তরের দশকের শেষে, যখন উইমেন-লিব ব্যাপারটা এমনকি ইউরোপেও তেমন পপ্যুলারিটি পায়নি।

উনিশশো-বিরাশি সালে এহেন এরিকা মেয়ার তাঁর জীবনের শেষ অভিযানটিতে যান। অভিযানটা ছিল ভারতে। তখন এরিকা মেয়ারের বয়স মাত্র উনচল্লিশ।

ছত্তিশগড় তখনও আলাদা রাজ্য হয়নি। পুরোটাই ছিল মধ্যপ্রদেশ। সেই মধ্যপ্রদেশের মারিয়া গোন্দ উপজাতিদের লোককথা নিয়ে গবেষণা করার জন্য এরিকা ভারতে এসেছিলেন উনিশশো বিরাশি সালের এপ্রিল মাসে। সঙ্গে এমন কেউ ছিল না যার সঙ্গে ইনস্টিটিউটের যোগাযোগ রয়েছে। পোর্টার, গাইড সবই রিক্রুট করেছিলেন এখান থেকে।

ওই বছরের জুলাই মাস অবধি এরিকা নিজে টেলিফোনের মাধ্যমে ইনস্টিটিউটের তৎকালীন ডিরেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তারপর একসময়ে হঠাৎই সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। জুলাইয়ের পর এরিকা যেন মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।

ভূতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, পুরাতাত্ত্বিক— এদের কাজের ধরনটাই এমন যে, দু’-চার মাস খবর না পাওয়া গেলে তা নিয়ে বাড়ির লোকেরাও মাথা ঘামায় না। অবিবাহিতা এরিকার বাড়ির লোক বলতে কেউ ছিলেন না। তার ওপরে জুলাই মাস মানে ভারতে মৌসুমী বৃষ্টির সময়। এক গ্রামের লোকেরা তখন পাশের গ্রামে যেতে পারে না তো ইন্ডিয়া থেকে জার্মানি খবর যাবে কী করে।

তাই প্রথমে কেউ ব্যাপারটাকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি।

কিন্তু যখন বছর ঘুরে গেল, তখন ইনস্টিটিউটের কর্তারা নড়েচড়ে বসলেন। দিল্লির জার্মান কনসুলেট থেকে এরিকার যাত্রাপথের প্রতিটি জায়গায় সার্চ-পার্টি পাঠানো হল। আদিবাসীদের গ্রামে গ্রামে খবর নেওয়া হল। মোটামুটি যা বোঝা গেল, তিলকগড় বলে একটা জায়গার কাছাকাছি গিয়ে কোনও অজ্ঞাত কারণে এরিকা তাঁর দলের বাকি সবাইকে মালপত্র নিয়ে সবচেয়ে কাছের বড়ো শহর রায়পুরে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি ফিরে গিয়ে আবার ওদের সঙ্গে যোগ দেবেন। এইটুকু বলেই এরিকা পিঠে একটা হ্যাভারস্যাক আর কাঁধে অনেকদিনের সঙ্গী হালকা স্প্রিংফিল্ড রাইফেলটা ঝুলিয়ে সামনের পাহাড়টায় চড়তে শুরু করেছিলেন। লেবার-পোর্টার-গাইড ওরা ফিরে এসেছিল রায়গড়ে।

সেই পাহাড়টায় রাস্তা বলতে নাকি কিছুই ছিল না। তার ওপরে বুনো মোষ আর ভালুকের উৎপাত সাংঘাতিক। সর্বোপরি পাহাড়ের ওপাশে যে উপত্যকা, সেখানে নাকি বাইসন-মারিয়াদের একটা উপজাতি বাস করত। বাইসন-মারিয়াদের হিংস্র স্বভাবের জন্য অন্য উপজাতির মারিয়ারাও তাদের এড়িয়ে চলত। কাজেই সার্চ-পার্টির লোকেরা ধরেই নিয়েছিল এরিকা মেয়ার ওই তিলকগড়ের পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন।

ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের অফিসিয়াল গেজেটও সভ্যসমাজকে সেরকমটাই জানিয়ে দিল। সেই খবর শুনে এরিকার প্রেমিকেরা কিছুদিনের জন্য দুঃখিত হলেও তাঁর সহকর্মী পণ্ডিতেরা মনে মনে খুশিই হলেন। কারণ, ওই মহিলাকে তাঁরা কুলের কলঙ্ক বলেই গণ্য করতেন। তাছাড়া কম্পিটিটর যত কমে ততই ভালো।’

আমি অবাক হয়ে রাতুলদার কথা শুনছিলাম। ভাবছিলাম এরিকার দুঃসাহসের কথা। নিজের কাজের প্রতি কতটা ডেডিকেশন থাকলে একজন মহিলা এইভাবে প্রাণটা খোয়াতে পারেন কে জানে! রাতুলদা একবার উঠে গিয়ে কোথা থেকে যেন একটা রংচটা কাঁধ-ব্যাগ নিয়ে ফিরে এলেন। দেখে মনে হল, ব্যাগটার ভেতরে ঠাসা কাগজপত্র রয়েছে।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কী হল, রাতুলদা?’

রাতুলদা বললেন, ‘এরিকা যেসব কাগজপত্র তাঁর লোকেদের হাত দিয়ে রায়পুরে ফেরত পাঠিয়েছিলেন, দিল্লির জার্মান কনসুলেট সেগুলো উদ্ধার করে ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। কাগজ-টাগজগুলো এতদিন ইনস্টিটিউটের মহাফেজখানার এককোণে ডাঁই হয়ে পড়ে ছিল। সেদিন আমাদের ডিপার্টমেন্টের কো-অর্ডিনেটর রুবেনবার্গ আমাকে যে কাজটা দিলেন, সেটা হল, এরিকা মেয়ারের সেই কাগজপত্রগুলো নেড়েঘেঁটে একটা মোটামুটি ইনডেক্স তৈরি করে দেওয়া। কারণ, তার তিনমাস বাদেই মেয়ারের একটা ভারী গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হওয়ার কথা ছিল, আর সেই উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশের কয়েকজন নামী অ্যানথ্রোপলজিস্ট তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে লিপজিগ ইউনিটে আসছিলেন। তাঁদের যিনি দলপতি, তিনি বলেছিলেন মেয়ারের কাগজপত্রগুলোয় একবার চোখ বোলাবেন।

রুবেনবার্গ বিমর্ষমুখে বললেন, হামবাগটাকে ফুটিয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু সে ব্যাটার আবার আমাদের চ্যান্সেলরের সঙ্গে খুব খাতির। কাজেই ভেবে দেখলাম, একটা ইনডেক্স বানিয়ে রাখাই ভালো।

আমি বললাম, মানছি। কিন্তু কাজটা অ্যানথ্রোপলজির কোনও সেকেন্ড-ইয়ারের স্টুডেন্টকে দিয়ে করালে আরও ভালো হত না কি? আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই, আমার যেটুকু পড়াশোনা সবই বায়ো- সায়েন্স নিয়ে।

উত্তরে রুবেনবার্গ যা বললেন, তাতে সেই প্রথম আমি নড়েচড়ে বসলাম। সাদা কাকতাড়ুয়ার মতন মুখে যতটা সম্ভব সমবেদনা ফুটিয়ে আমাদের কো-অর্ডিনেটর বললেন, বুঝতে পারছি, ব্যানার্জি, তোমার আত্মসম্মানে বাধছে। কিন্তু ব্যাপার হল, তুমি যা বললে, আমি প্রথমে ঠিক তা-ই করেছিলাম। আমার বোধবুদ্ধি তো তোমার থেকে কম কিছু নয়। ডরোথি বলে একটা সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টকেই কাজটা দিয়েছিলাম।

তো?— আমি তোম্বা মুখে একটা সিগার ধরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

রুবেনবার্গ বললেন, তো, সেই গালে মেচেতাওলা, বেণি-দোলানো খুকুটি বলল, ওর মধ্যে রয়েছে এরিকার দুটো ফিল্ড-নোসের খাতা, যাতে পাতার পর পাতা অদ্ভুত সব গাছপালা, পোকামাকড় আর জীবজন্তুর ডেসক্রিপশন আর স্কেচ। খুকুমণির মনে হয়েছে সবকটাই হাইব্রিড। কিন্তু তারা রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশে। অ্যানথ্রোপলজির সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রীটি আদিবাসীদের গয়না, পোশাক, ঘাসের ঘাঘরা, কড়ির মালা এইসব চেনে। কিন্তু সে হাইব্রিড জীবজন্তু আর গাছপালার ইনডেক্স বানাবে ক্যামনে! তাই ভাবলাম, তুমি তো এখন কাজের কাজ সেরকম কিছুই করছ না। তোমাকেই বলি।

রুবেনবার্গের কথার শেষদিকের খোঁচাটা গায়ে না মেখে আমি আধখাওয়া সিগারটা এক টুসকিতে জানালার বাইরে বার করে দিয়ে রুবেনবার্গকে বললাম, আর্কাইভের চাবি দিন। আর একটা পারমিশন দিন। এই কাজে আমার স্ত্রী তথা সহকর্মিণী লরা স্রিংবার্গ আমাকে সাহায্য করবে। লরাও এই মুহূর্তে কোনও কাজের কাজ করছে না।

রুবেনবার্গ বললেন, ‘বেশ তো। ওকেও সঙ্গে নিয়ে নাও।’

.

তিন

রাতুলদাকে কথা থামাতে হল, কারণ, তারককাকা আমাদের দু’জনের জন্য মিষ্টি আর শরবতের গ্লাস নিয়ে এসেছিলেন। রাতুলদা বললেন, ‘তারককাকা, চিলেঘরের আলোটা একটু জ্বেলে দিয়ে যাও তো।’

আলোটা জ্বালানোর পর চিলেঘরের খোলা দরজার মধ্যে দিয়ে একফালি আলো এসে ঠিক আমাদের কোলের কাছে পড়ল। রাতুলদা খাওয়া শেষ করে, সেই পুরোনো ব্যাগটার মধ্যে থেকে একটা সস্তার বাঁধানো খাতা বার করে কোলের ওপরে খুলে বসলেন।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কী, রাতুলদা?’

রাতুলদা বললেন, ‘একটু আগে বৈজ্ঞানিকদের জীবনে আশ্চর্য ব্রেক- থ্রু-র কথা বলছিলাম না? পরের এক সপ্তাহ ধরে এরিকা মেয়ারের কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আমরা সেই ব্রেক-থ্রু পেয়ে গেলাম। অন্য সব কাগজের ইনডেক্স বানিয়ে দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু যেটার কথা সেই ইনডেক্সে রাখিনি, সেটা হল এরিকা মেয়ারের ডায়েরি। সেই ডায়েরিতে আমরা যা চাইছিলাম, তাই পেয়ে গেলাম। পেয়ে গেলাম এক আশ্চর্য দেশের হদিশ যেখানে… না, আমি অত গুছিয়ে বলতে পারব না। এরিকার ডায়েরি থেকে আমি কিছু কিছু প্রাসঙ্গিক অংশ এই খাতাটায় কপি করে রেখেছিলাম। অনুবাদটা আমারই করা। জার্মান ভাষা চর্চার কাজটা একসঙ্গেই চালিয়ে গিয়েছিলাম আর কী! পড়ে দেখো, কেমন হয়েছে।’

আমি পড়তে শুরু করলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই লেখার মধ্যে ডুবে গেলাম। আমার কান থেকে ইছামতীর স্রোতের শব্দ মুছে গিয়ে ভেসে উঠল সেগুনবনের শুকনো পাতার মর্মর। স্টিমারের ভোঁ শুনে ভাবছিলাম অনেক দূর থেকে বুনোহাতির ডাক ভেসে আসছে বুঝি। আমি মনে মনে চলে গিয়েছিলাম মধ্যপ্রদেশের তিলকগড় উপত্যকার এক আদিবাসী গ্রামে।

এরিকা মেয়ার লিখেছেন-

২৩ জুলাই, ১৯৮২

গত পরশু বাইসন-মারিয়াদের গ্রাম সুনারিয়ায় এসে পৌঁছেছি। তিলকগড় থেকে পায়ে হেঁটেই চলে এলাম। অসুবিধে তো কিছুই হল না। লোকে শুধু-মুধু নানারকম ভয় দেখায়। তবে হ্যাঁ, আমার লোকগুলোকে নিয়ে এলে অন্য অসুবিধে ছিল। বাইসন-মারিয়াদের আচার-আচরণ, ফুড হ্যাবিটস এসব ওদের সহ্য হত না। কখন কী বলে বসত— তা থেকে ঝামেলা বেধে যেত। আদিবাসীরা নিজেদের সংস্কৃতির ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর হয়। বাইসন-মারিয়ারাও তার থেকে আলাদা কিছু নয়।

সতেরো বছর ধরে পৃথিবীর নানান প্রান্তের আদিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করার ফলে আমার মধ্যে একধরনের স্কিল তৈরি হয়ে গেছে। সবচেয়ে সন্দেহপ্রবণ একালঘেঁড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকদের কাছেও আমি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আপন হয়ে উঠতে পারি। সুনারিয়াতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এমনিতে আমি দিব্যি রয়েছি। নিজের মতন করে ওদেরই ছেড়ে-দেওয়া একটা কুঁড়েঘরে জিনিসপত্র সাজিয়ে নিয়েছি। তেল- নুন-আনাজ-মাংস সবকিছুই গ্রামের লোকেরা ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেছে।

ঠিক হয়েছে মুংরি বলে একটা মেয়ে আমার সঙ্গে সবসময় থাকবে। আমি ঘোরাঘুরি করতে চাইলে আমার সঙ্গে যাবে। ঘরের কাজেও সাহায্য করবে।

মুংরির বয়স আঠারো থেকে কুড়ির মধ্যে। ভারী সুন্দরী। এখনও বিয়ে হয়নি, শরীরটা কৃষ্ণসার হরিণীর মতন ছিপছিপে। ওর কানে পেতলের কানফুল, হাতে রুপোর বাজু, গলায় পুঁতি আর কাঁসার টুকরো দিয়ে গাঁথা মালার ছড়া। আবার চিবুকে উল্কি দিয়ে তিনটে তারাও আঁকা রয়েছে।

সুনারিয়ার ছেলেমেয়ে, বুড়োবুড়ি সবাই সুন্দর। দিগন্তে মেঘের মতন পাহাড়। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কলহা ঝোরা। জল গভীর নয়, কিন্তু কাচের মতন স্বচ্ছ। ঝোরার ওপাশে গভীর বন। এসবও কম সুন্দর নয়। তবু এখানে এসে থেকে ভারী অস্বস্তি হচ্ছে।

অস্বস্তিটা কেমন করে বোঝাব জানি না। আমি সমস্ত ইন্দ্ৰিয় দিয়ে অনুভব করছি এই জায়গাটা অদ্ভুত। জায়গাটা বিষাক্ত। এই সুনারিয়া গ্রামের আকাশ, বাতাস, ঝরনা, গাছপালা সবকিছুই কোনও না কোনও বিষ বয়ে নিয়ে চলেছে।

চোখ দিয়ে দেখছি এখানকার গাছপালার পাতায়, ঘাসে, বল্কলে তুঁতের সবুজ রং। তার মানে বিষ। আমি নিশ্বাস নিলে মিথেনের ঝাঁঝালো গন্ধ পাচ্ছি। একগ্লাস জল খেলেও যেন সিসের স্বাদে ভরে উঠছে ঠোঁট থেকে আলজিভ।

কিন্তু এগুলো নিশ্চয়ই আমার কল্পনা। অত বিষ শরীরে ঢুকলে আমি এমন সুস্থ, স্বাভাবিক থাকতে পারতাম না। আমার শরীরে তো কোনও কষ্ট নেই। কারুরই নেই। ওই তো, মারিয়াদের বাচ্চারা উঠোনে খেলা করছে। পুরুষ আর মেয়েরা কাঠ কাটছে, মহুয়া কিম্বা তেন্দুপাতা তুলে আনছে। জঙ্গলের কিনারায় গোরু-মোষ চরছে। সবাই সুস্থ। সবকিছুই স্বাভাবিক।

.

২৭ জুলাই, ১৯৮২

গত এক সপ্তাহে মুংরিকে সঙ্গে নিয়ে সুনারিয়ার বাড়িতে বাড়িতে অনেক ঘুরলাম। কথা বললাম সব বয়সের নারী-পুরুষের সঙ্গে, বিশেষ করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সঙ্গে। আসলে ওদের দেবতাকে নিয়ে যে গানগুলোর টেক্সট আমার হাতে এসেছে, তাদের মর্মোদ্ধার করতে গেলে বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে কথা বলাই ভালো।

ওই গানের টানে, কিম্বা বলা ভালো গান গেয়ে যে গল্পটা ওরা বলে তার টানেই আমার এখানে আসা। সেই গানে সুনারিয়া গ্রামের মারিয়ারা তাদের দেবতার কথাই বলে। তিনি নাকি এক অপরূপ দেবতা। তাঁর রূপ, তাঁর পৌরুষ অনন্য।

পৃথিবীর প্রায় সব আদিবাসী গোষ্ঠীই নিজেদের কোনও না কোন ও পশু বা গাছের সন্তান হিসেবে কল্পনা করে। যখন পশুকে আদিপিতা হিসেবে কল্পনা করে, তখন তার পিছনে লুকিয়ে থাকে সেই পশুর শক্তি কিম্বা অন্য কোনও বিশেষ ক্ষমতাকে নিজেদের মধ্যে পাওয়ার ইচ্ছা। যখন গাছকে কল্পনা করে তখনও তা-ই।

এই পশু কিম্বা গাছের প্রতীক তারা নিজেদের শরীরে উল্কি করে এঁকে নেয়। বাড়ির সদর দরজার কাঠে খোদাই করে রাখে। এমনকি গ্রামের মাঝখানে কাঠের খুঁটির ওপরেও খোদাই করে রাখে আদিপিতার মূর্তি। এগুলোকে বলা হয় ওই গোষ্ঠীর ‘টোটেম’। আমাজনের জঙ্গলে বসবাস করে যারা, সেরকম অনেক আদিবাসী গোষ্ঠীরই টোটেম হল জাগুয়ার। একইভাবে ভারতীয় আদিবাসীদের মধ্যে একাধিক গোষ্ঠীর টোটেম বুনো মোষ। কখনও বাইসন।

সুনারিয়ার টোটেমের বিশেষত্ব হল, তিনি সম্পূর্ণ পশু নন। তিনি অর্ধেক মহিষ এবং অর্ধেক মানুষ।

সমস্যা হচ্ছে, গ্রামের কোনও মানুষ, এমনকি বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও তার সম্বন্ধে কিছুই বলতে চান না।

.

৩০ জুলাই, ১৯৮২

আরও একটা কাজ করছি। ঘুরতে ঘুরতে কোনও অদ্ভুত পোকা, গাছ কিম্বা ছোটোখাটো পাখি বা জন্তুর দেখা পেলে তাদের স্কেচ করে রাখছি। প্রাণিবিজ্ঞান বা উদ্ভিদবিজ্ঞান সম্বন্ধে আমার জ্ঞান প্রায় শূন্য। তবু সারা পৃথিবীর নানান জঙ্গলে তো কম ঘুরে বেড়াইনি, তাই সাধারণ পশুপাখি, গাছপালাগুলোকে ভালোই চিনি। কিন্তু এখানে, এই সুনারিয়ার আশেপাশে যে জঙ্গল, সেখানে অনেকসময় এমন কিছু দেখছি যেগুলোকে সাধারণ বলে মনে হচ্ছে না। এঁকে নিচ্ছি তাদের ছবি। ফিরে গিয়ে আমার বটানি বা জুলজির সহকর্মীদের দেখাব।

এই এখনই যেমন নদীর ধারে বসে রয়েছি আর দেখছি একটা স্নেক-লিলির ঝোপ। স্নেক-লিলির সাদা ফুল আমি চিনি। সাপের ফণার মতন চেহারা। কিন্তু এখানে চেহারা ঠিক থাকলেও ফুলগুলোর রং দেখছি টকটকে লাল। একদম ওই পাশের জবাগাছে যে ফুলগুলো ফুটেছে, ওইগুলোর মতন লাল। জবার রংটাই কি স্নেক-লিলির গায়ে এসে লাগল? এরকম হয়?

তা-ও যদি বা হয়, কিন্তু ওই যে ওখানে একটা খরগোশের সঙ্গে একটা বেজি সংগম করছে— ওটা কেমন করে সম্ভব হচ্ছে?

মনে পড়ে গেল, কয়েকদিন আগে কয়েকটা বাচ্চা বেজিকে আমাদের উঠোনে ঘুরতে দেখেছিলাম, যাদের গায়ের লোম ধবধবে সাদা… খরগোশের মতন। তখন কিছু মনে হয়নি। ভেবেছিলাম, বাচ্চাগুলো বোধহয় অ্যালবিনো। এখন তো মনে হচ্ছে ওগুলো বেজি আর খরগোশের হাইব্রিড। সেটাও কি হয়?

শরীরে একটা অস্বস্তি ঘনিয়ে উঠছে। সেটার ধরনটা আমি চিনি। এটা ঠিকই যে অনেকদিন আমার এই দেহ উপবাসী আছে। কিন্তু আমি যখন কাজের মধ্যে থাকি তখন আমার মাথাই শুধু কাজ করে। হরমোন- গ্ল্যান্ডগুলো ঘুমিয়ে থাকে। এই প্রথম ফিল্ডে এসেও আমার অসম্ভব সংগমের ইচ্ছা জাগছে। নাহ্, মনটাকে অন্যদিকে ঘোরাতে হবে। এখানে আমার পছন্দের পুরুষ পাব কোথায়?

এইভাবে আলস্যে কেটে গেল অনেকটা সময়। একটা ছোটো পাথরের ওপরে বসে ছিলাম। মুংরি আমার পিছনেই ঘাসজমির ওপরে ঘুরতে ঘুরতে গুনগুন করে গান গাইছিল আর ঝোপের মধ্যে বুনো কুল খুঁজছিল। ভাবলাম ওকে ডেকে নিয়ে ঘরে যাই, বেলা হয়েছে। কিন্তু ও মা! মুংরিকে আর কোথাও খুঁজে পাই না।

গলা তুলে ডাকলাম— ‘মুংরি! মুংরি!’ সাড়া নেই। খুব ভয় পেয়ে গেলাম। মেয়েটার কিছু হল না তো? চারিদিকে কত বিষাক্ত সাপ, চিতা, বুনো শুয়োরের আনাগোনা। আমি মুংরির খোঁজে ঝোপ থেকে ঝোপে প্রায় দৌড়ে বেড়াতে শুরু করলাম।

তারপর হঠাৎ দেখলাম, নদীর ধারে কয়েকটা পাথরের আড়াল থেকে ওর পা-দুটো বেরিয়ে আছে। স্থির আর উদোম দুটো পা। আমি ভেবেছিলাম ও মরে গেছে। নিশ্চয়ই মরে গেছে। কিন্তু ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখলাম ও ঘুমোচ্ছে।

আমি নিজে একজন নারী। মুংরির এই ঘুম আমি চিনি। ওর দুই ঊরু খুবই নিন্দিত-ভঙ্গিতে বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। ওর একটা হাতও ছড়ানো রয়েছে পাশে, যেন ওই বাহুর ওপরে কারুর মাথা রাখার কথা ছিল। খোলা বুকের ওপরে কয়েকটা নখের আঁচড়ের দাগ, খোলা ঊরুতেও। এই ঘুম রতিঘুম। ঠোঁটে একটা আলতো সুখের হাসি জড়িয়ে মুংরি রতিঘুমে পাথর হয়ে রয়েছে।

কিন্তু পুরুষ কোথায়? এই নদীর তীরে ছোটোখাটো কিছু ঝোপঝাড় আর পাথরের টুকরো ছাড়া এমন কোনও আড়াল নেই, যেখানে একটা মানুষ লুকিয়ে থাকতে পারে। তা হলে কে ওকে ওই গভীর সংগমসুখ দিল?

হঠাৎ চোখে পড়ল মুংরির ঠিক পাশ থেকে শুরু হয়ে একসারি থাবার ছাপ বালি মাড়িয়ে চলে গেছে জলের দিকে। যেন সেই চতুষ্পদ জন্তু তিরতিরে জলের স্রোত পেরিয়ে মুংরির কাছে এসেছিল। আবার ওই পথেই ফিরে গেছে।

ঠিক তখনই মুংরি ধড়মড় করে উঠে বসে গায়ের কাপড়-টাপড় ঠিক করে নিল। তারপর বলল, ‘দেখেছেন, কেমন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’

ওর পাশে হাঁটতে হাঁটতে আমি ওর গা থেকে একটা বুনো গন্ধ পেলাম। আমার ভালো লাগল গন্ধটা। বুঝতে পারলাম, সেই গন্ধে আমার যোনিপথ পিচ্ছিল হয়ে উঠছে। আমি এরিকা মেয়ার, নৃতত্ত্বের গবেষিকা, ঈর্ষা করছি ওই আদিবাসী মেয়ে মুংরিকে।

নিজের মনেই বলে উঠলাম, এ-ও কি সম্ভব?

মুংরি বলল, ‘কী বলছ, দিদি?’

আমি বললাম, ‘কিছু না। তোর বুকে অমন টাটকা আঁচড়ের দাগ কেন?’

.

১ অগাস্ট, ১৯৮২
দুপুর আড়াইটে

কাল রাত থেকে ঘোরতর বর্ষা নেমেছে। খোলার চালের ওপরে মুষলধারায় বৃষ্টির শব্দে ঘুম আসছিল না। ওদিকে মুংরি দিব্যি মেঝেয় ওর বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে। শুয়ে শুয়ে একটা কথা ভাবছিলাম। আমার পড়াশোনার কাজেই আমাকে নানান ধর্মের, নানান রকমের সৎকারের পদ্ধতি খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়েছে। আমি শ্মশান দেখেছি, গোরস্থান দেখেছি, পারসিদের ‘টাওয়ার অফ সাইলেন্স’ দেখেছি। দেখেছি, এইসব জায়গাগুলো খুব উর্বর হয়। মৃত শরীরের শটিত-পচিত অবশেষ কোনও না কোনও ভাবে মাটিতে মেশে। সেই মাটিতে লকলকিয়ে ওঠে গাছপালা আর ঘাস।

সুনারিয়া যেন সেরকমই এক সৎকারস্থল। এখানে বাইরের রূপের আড়ালে সারাক্ষণই এক পচন ঘটে চলেছে। আর সেইজন্যই যেন এখানকার মাটি এত উর্বর।

না, শুধু মাটিই উর্বর নয়। এখানকার নদীতে মাছ কিলবিল করে। গাছের বাকল ছাড়ালেই দেখা যায় লার্ভার কলোনি। সন্ধের বাতাস থিকথিক করে উড়ন্ত কীটপতঙ্গে। প্রাণ… প্রাণ– প্রাণের বন্যা চতুর্দিকে! জন্ম… জন্ম— এত জন্ম কোথাও দেখিনি।

শ্মশানের ছাই-মেশানো মাটির মতন, গোরস্থানের মাংসের ধুলোর মতন, টাওয়ার অফ সাইলেন্সের ড্রেন দিয়ে নেমে আসা মৃতশরীরের রসের মতন কোনও এক পচনের সারে পুষ্ট এখানকার মাটি, জল, বাতাস।

বিষাক্ত এই গ্রাম। বিষের সঙ্গে জন্মের বিরোধ নেই। বেশ্যাপাড়ার গলিতে কি সিফিলিসের বিষ আর জারজ শিশুরা একসঙ্গে খেলে বেড়ায় না?

.

২ অগাস্ট, ১৯৮২
সন্ধে সাতটা

আজ দেয়াসির কাছে গিয়েছিলাম। ‘দেয়াসি’ মানে দেবাংশী— দেবতার অংশ।

দেয়াসি কিন্তু শামানের থেকে আলাদা। ‘শামান’ বা ওঝা হচ্ছে একইসঙ্গে আদিবাসীদের পুরোহিত এবং চিকিৎসক। এখানে তিনিই মারিয়াদের লিঙ্গিয়া গানে বর্ণিত সমস্ত দেবতা এবং অপদেবতার পুজো করেন। ঝাড়ফুঁক, জলপড়া, তেলপড়া আর পাতা-লতার ওষুধ দিয়ে রোগের চিকিৎসাও তারই কাজ। বিয়ে, শ্রাদ্ধ ইত্যাদিও।

সুনারিয়ার শামানের সঙ্গে তো প্রথমদিনেই দেখা করেছিলাম। অনেক উপহার নিয়ে এসেছিলাম তার জন্য, যার মধ্যে খুব দামি মদের বোতলও ছিল দুটো। আমার পাপুয়া-নিউগিনি কিম্বা ইন্দোনেশিয়া ট্যুরের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কোনও গ্রামের শামানকে বশ করে ফেলা মানে নব্বইভাগ কাজ হয়ে যাওয়া। তারপরে ওদের যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত লোককথা আর জ্ঞানের ভান্ডার, এমনকি ওদের তথাকথিত মন্ত্রসিদ্ধ কবচ-টবচের দু’- একটা স্যাম্পলও সহজেই হাতে চলে আসে।

সুনারিয়াতেও সেই পথেই দিব্যি কাজ এগোচ্ছিল। শামান লোকটার বয়স আমার মতোই হবে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একঘেয়ে সুরে অজস্র গল্প বলে যাচ্ছিল আর আমি শর্টহ্যান্ডে নোটস নিচ্ছিলাম। মুংরি ঘরের অন্য একটা কোনায় হাতজোড় করে বসে ভয়ে ভয়ে সব শুনছিল। কিন্তু যে-ই না বলেছি আমি একবার টিলার মাথায় মহিষদেবতার মন্দিরে যেতে চাই, অমনি মুংরি আর শামান একসঙ্গে হা হা করে উঠল। বলল, ‘খবরদার অমন কাজ করবেন না। মেয়েদের ওদিকে তাকানোই বারণ, যাওয়া তো দূরের কথা।’

ছেলেমেয়ের মধ্যে তফাত করে, এমন কিছু শুনলেই আমার মাথা গরম হয়ে যায়। আমি কড়াগলায় বললাম, ‘কেন? মেয়ে হয়েছি তো কী হয়েছে?’

তখন শামান থতমত খেয়ে বলল, ‘তা নয়। আমরাও তো যাই না। দরকারটা কী! এই তো, আমার ঘরেই মহিষদেবতার টোটেম রাখা আছে। আপনি সেটাই দেখুন না।’

ও টোটেম আমি আগেই দেখেছি। সম্ভবত ইউক্যালিপটাস গাছের গুঁড়ি কুঁদে বানানো একটা মূর্তি। সাদা কাঠ দিয়ে মূর্তি বানানোর কারণটা বুঝতে পারছি। ওদের সমস্ত গানে আর গল্পে মহিষদেবতাকে শ্বেতকায় বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। তাই অমন সাদা কাঠের মূর্তি। মোষের মাথাটা যথাসম্ভব ভয়ংকর করে বানিয়েছে। মানুষের শরীরটা একেবারেই যা তা। পাত্তা না দিয়ে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘যাব না কেন? ভয়টা কীসের?’

শামান ইতস্তত করে বলল, ‘দেয়াসি পছন্দ করেন না।’

সেই প্রথম দেয়াসির কথা জানালাম এবং শুনে অবাক হলাম তিনি একজন মহিলা। সেই মহিলাই নাকি ওই টিলা আর জঙ্গলের রক্ষক।

‘কতদিন ধরে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

শামান বলল, ‘বহু বছর। আমি, আমার বাবা, দাদু সবাই ওই টিলার মাথার মন্দিরে দেয়াসিকে দেখেছি। ওঁকেও এক দেবীই বলতে পারেন। দেবতারই অংশ তো। ওঁরও দেবতার মতনই গোরা গায়ের রং।’

এইটুকু বলে ফেলেই শামান জিভ কাটল। ওদিকে মুংরির মুখ থেকেও ইসস’ করে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল। বুঝলাম, নেশার ঘোরে এইমাত্র শামান যেটা বলে ফেলল, সেটা ওদের টপ সিক্রেট। বাইরের লোকের সামনে বলা বারণ। আমি মুখে কিছু বললাম না। এমনই হাবভাব করে রইলাম, যেন কথাটা খেয়ালই করিনি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী আমার মনের ভেতরে কৌতূহলের নতুন একটা জ্বালামুখ খুলে গেল।

এই মধ্যপ্রদেশের গহন জঙ্গলে শ্বেতকায়া মহিলা কোথা থেকে আসেন?

দ্বিতীয় কথা, এটা অবশ্য শামানের নেশার ঘোরে অতিশয়োক্তি ও হতে পারে, কয়েকশো বছর ধরে দেয়াসি মহিলা বেঁচে আছেন কেমন করে?

সেই প্রথমদিন থেকেই তক্কে তক্কে ছিলাম, একবার টিলার মাথায় ওই মহিষদেবতার মন্দিরে যাব। সুযোগ এসে গেল আজ সন্ধের পর। আজ মারিয়াদের শিকার উৎসব। গ্রাম ফাঁকা করে ওরা চলে গেছে বনে। আর, এটা লিখতেও কেমন লাগছে— বন থেকে অনেককিছু ঢুকে পড়েছে গ্রামে।

অনেক যৌনতা, অনেক অশ্লীলতা, অনেক মৈথুন।

ঘরের জানালায় বসেই দেখতে পাচ্ছিলাম, পাশের ঘরের চাল থেকে একটা লাউগাছের ডগা অবিকল একটা সবুজ প্রত্যঙ্গের মতন কাঁপতে- কাঁপতে ঢুকে যাচ্ছে পেঁপেফুলের পরাগধানীর মধ্যে। উঠোনে যে মুরগিটা চরে বেড়াচ্ছিল তার ঘাড়ের পালক কামড়ে ধরে পিঠে চড়ে বসল একটা তিতির পাখি। আমার নিজের মধ্যেও আবার সেই উদগ্র কাম জেগে উঠেছে। আমার তলপেটে আর বুকের মাঝখানে সূর্যাস্তের রং ধরেছে। চোখ জ্বালা করছে। হলকা বেরোচ্ছে কান দিয়ে। দুই স্তন এত ভারী হয়ে উঠেছে যে, মনে হচ্ছে এখনই কারুর মুখে গুঁজে দিয়ে বলি, শুষে নাও, পান করো আমার সুধা!

কী আছে? কী রয়েছে সুনারিয়ার হাওয়ায়?

একটা সময় আর পারলাম না। ব্রিচেস আর জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে তার ওপরে একটা অয়েল-ক্লথের দোলাই জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বেরোনোমাত্রই একটা হাওয়া আমাকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আমার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল।

চারিদিকে যে বর্ষার ভিজে হাওয়া বইছিল, তার থেকে ওই হাওয়াটার গন্ধ ছিল আলাদা। মধু, শালফুল আর কামোন্মত্ত মদ্দা-হাতির রগ থেকে যে আঠালো রস ঝরে পড়ে, সেই সবকিছুর গন্ধ মিলিয়ে সেই গন্ধের একটা শরীর গড়ে উঠেছিল। আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম, সবল পেশল হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে সেই হাওয়াটাই আমাকে টেনে নিয়ে চলেছিল ওই মহিষদেবতার টিলার দিকে।

কেমন করে যে ওই টিলার চূড়ায় পৌঁছেছিলাম, এখন আর মনে পড়ছে না। পথের মধ্যেই বৃষ্টি নেমেছিল। মাটির পথ পেছল হয়ে গিয়েছিল। মনে হয় আমি পড়েও গিয়েছিলাম কয়েকবার। তবু থামিনি চলতে চলতে একসময় টিলার মাথায় একটা খোলার চালের বড়ো ঘরের সামনে গিয়ে পৌঁছোলাম। তারপর আর পারলাম না। ওই দাওয়ার মাটির মেঝের ওপরেই আমি হাঁটু গেড়ে বসে হাঁফাতে লাগলাম।

লম্বা দালানের এককোনায় একটা আগুনের কুণ্ডের মধ্যে শালের আঠা আর ইউক্যালিপটাসের কাঁচা ডাল জ্বলছিল। যখন একটু শক্তি ফিরে পেলাম, মুখ তুলে চারিদিকে তাকাতে পারলাম, তখন সেই অগ্নিকুণ্ডের কম্পমান আলোয় প্রথমেই চোখে পড়ল, বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক শ্বেতাঙ্গিনী মহিলা। ভরা যুবতি। দুধের সরের মতো সাদা চামড়া। গোমেদের মতন বাদামি চোখের মণি। বুকে আর পিঠে লুটিয়ে- পড়া চুলের গুছি দেখলে বোঝা যায় স্বর্ণকেশিনী। উনি এগিয়ে এসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তারপর রুক্ষ গলায় বিশুদ্ধ জার্মানে প্রশ্ন করলেন, ‘এখানে এসেছ কেন? মরবার সাধ হয়েছে?’

আমি ওঁর বাড়িয়ে ধরা হাত ধরে উঠে দাঁড়ালাম। প্রতিপ্রশ্ন করলাম, ‘আপনি জার্মান?’

উত্তর পেলাম, ‘হ্যাঁ। আমি জানি তুমি এক সপ্তাহের ওপরে নীচের গ্রামে রয়েছ। এ-ও জানি, তোমাকে বারণ করা হয়েছিল এখানে আসতে। তবু এলে কেন?’

কথা বলতে বলতে আমি ওঁর পিছন পিছন ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম, ভেতরটা অন্য যে-কোনও আদিবাসী মন্দিরের মতন করেই সাজানো। ছাদের শালকাঠের কড়ি থেকে দুটো বড়ো বড়ো লণ্ঠন ঝুলছিল। চেরা-বাঁশ দিয়ে মজবুত করে তৈরি দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো ছিল মাদল আর নাকাড়ার মতো বাদ্যযন্ত্র, কিছু আদিম অস্ত্রশস্ত্র আর মানুষের করোটি। ঘরের মাঝখানে ছিল মহিষদেবতার সাদা কাঠে গড়া মূর্তি।

ভাবছিলাম, শামান কেন দেয়াসির বয়স নিয়ে অমন মিথ্যে কথাটা বলল! ওর বাবা, দাদু সবাই নাকি এই দেয়াসিকে দেখেছে! তা কখনও হতে পারে? এর বয়স তো ত্রিশ বছরের একটুও বেশি নয়।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে দেয়াসি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘কেন এলে?’

উত্তরে আমি অনেককিছুই বলতে পারতাম। বলতে পারতাম আমার পরিচয়, আমার গবেষণার কথা। উনি নিশ্চয়ই বুঝতেন, কারণ ওঁকে দেখে আর সামান্য যেটুকু কথা শুনেছি তার থেকে বুঝতে পারছিলাম উনি শিক্ষিতা। কিন্তু আমার মুখ দিয়ে সত্যি কথাটাই বেরিয়ে গেল। আমি বললাম, ‘আমি ইচ্ছে করে আসিনি। আমাকে কে যেন টেনে নিয়ে এল।’

উনি কিছুক্ষণ তীব্রচোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আরও ভালো করে দেখার জন্যই যেন আমার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন।

এবার আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি কে? এই আদিম গ্রামে এক বিদেশিনী আপনি, এখানে কী করছেন?’

উনি দু’হাত দিয়ে আমার দোলাইটা সরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘বিদেশিনী ছিলাম কখনও। আজ আমি দেয়াসি।’

ইনিই দেয়াসি! অবাক হয়ে গেলাম। শামান তো তা হলে গোরারঙের ব্যাপারে মিথ্যে কথা বলেনি, যদিও এঁর বয়স কিছুতেই পঞ্চাশের বেশি বলে কল্পনা করা যাচ্ছিল না।

আমি আবার বললাম, ‘সে তো আজকে। কিন্তু কোনও একসময়ে তো আপনি জার্মানিতে ছিলেন। কত বছর আগে? এখানে এলেন কীভাবে?’

দেয়াসি কথা বলছিলেন ঠিকই কিন্তু ওঁর হাতদুটো আমার ব্যস্ত ছিল আমার জ্যাকেটের বোতাম খোলার কাজে। বোতামগুলো খুলতে খুলতেই উনি বললেন, ‘এটা কত সাল?’

আমি বললাম, ‘উনিশশো বিরাশি।’

উনি বললেন, ‘তিপ্পান্ন বছর আগে এখানে এসেছিলাম। তারপর আর ফিরে যেতে পারিনি।’

মনে মনে বললাম, উন্মাদ! তিপ্পান্ন বছর আগে ওর মা’রই জন্ম হয়েছিল কি না সন্দেহ। মুখে বললাম, ‘কেন? এসেছিলেন কেন? ফিরেই বা যেতে পারলেন না কেন?’

দেয়াসি ইতোমধ্যে আমার শার্টটাকে দু’হাত দিয়ে টেনে ওপরে তুলে দিয়েছিলেন। ঝুঁকে পড়ে দেখছিলেন আমার বুক আর নাভির চারপাশের জায়গাটা। তারপর উনি আমার কপালে ওঁর ডানহাতের চেটোর উলটো দিকটা ঠেকিয়ে একবার তাপ নিলেন। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তোমারও আর ফেরা হবে না। বোসো এইখানে।’

ঘরের এককোনায় চওড়া শালকাঠের তক্তা পাশাপাশি জুড়ে, তার ওপরে শুকনো খড় আর একটা সস্তার চাদর বিছিয়ে বিছানা তৈরি করা ছিল। সেখানেই উনি আমাকে হাত ধরে বসালেন। আমি শার্ট আর জ্যাকেট যথাস্থানে ফিরিয়ে এনে ওঁর পাশে বসলাম। উনি বললেন, ‘সরি। তুমি আমাকে অনেকগুলো প্রশ্ন করেছিলে। আমি উত্তর দিইনি। আসলে আমি আগে নিশ্চিত হয়ে নিলাম, তোমাকে উত্তর দেওয়া যায় কি না।

‘কী দেখলেন?’

‘দেখলাম, তোমাকে বলা যায়। সত্যি কথা বলতে কী, আমাকে বলতেই হবে’ কারণ, তুমি তার নির্বাচিত।’

‘কার?’

‘মহিষদেবতার।’

তিনি কি সত্যিই আছেন?’ নিজেই বুঝতে পারলাম প্রশ্নটা করার সময়েই আমার গলা কেঁপে গেল।

টিলার শীর্ষ থেকে ঢালু হয়ে চারিদিকে নেমে গিয়েছিল ঘাসজমি। এই বর্ষায় সেই জমিতে মাথা তুলেছিল প্রায় কোমর সমান উঁচু ঘাস আর কাশের ঝোপ। ঘন ঘন বিদ্যুত চমকাচ্ছিল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, মন্দির-চত্বরের বেড়ার ওপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একপাল বুনো মোষ। তাদের পালিশ করা শিঙে আর চামড়ায় বিদ্যুতের নীল আলো ঠিকরে যাচ্ছিল। ওরা আমাকেই দেখছিল। দুই বিদ্যুচ্চমকের মধ্যবর্তী সময়ে জোড়া জোড়া সবুজ চোখের দৃষ্টি পুড়িয়ে ফেলছিল আমাকে।

‘আমার নাম এলফ্রিডে।’ হঠাৎই বলে উঠলেন সেই মহিলা। নিজেকে যিনি এতক্ষণ বলছিলেন দেয়াসি।

বললেন, ‘পদবিটা আর বলছি না। প্রয়োজন নেই। কোন পরিবারে জন্মেছিলাম, কোথায় বিবাহ হয়েছিল, কোন শহরে কিছুই না। শুধু এইটুকু বলে রাখি, আমার স্বামী ছিলেন জার্মানির এক ধনী পরিবারের সন্তান- কিন্তু তাঁর রক্তে আর্য বিশুদ্ধতা ছিল না। বিয়ের পরে জানতে পেরেছিলাম, তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ স্পেনদেশের কোনও রমণীকে বিবাহ করেছিলেন, কেউ ফ্রান্সের।

আমি মনস্থির করেছিলাম, ওই লোকটার সন্তানের মা আমি হব না। আমার নিজের আর্য গরিমা ছিল। আমি চেয়েছিলাম শুদ্ধতম শুক্রবীজ।

তুমি কি জানো, আমি একা নই, সেই সময়ে জার্মানির বহু নারী এই স্বপ্নে বিভোর ছিল। আমাদের মধ্যে শুদ্ধতার এই স্বপ্নটা একটা পাগলামির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। আমরা রক্তমাংসের কোনও পুরুষকেই বিশ্বাস করতে পারতাম না। কে জানে, কোন শাখাপ্রশাখায় কোন অনার্য রক্ত ঢুকে গিয়েছে তার শরীরে। আমরা দেবতার সঙ্গে সংগমের স্বপ্ন দেখতাম। চাইতাম দেবতার মতোই সুন্দর, বলশালী আর মেধাবী সন্তান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, জার্মানিতে আমার মতো অভিজাত বংশের নারীদের একটা গোপন সংগঠন গড়ে উঠেছিল। বিশুদ্ধ আর্যপুরুষের সন্ধান কোথায় পাওয়া যেতে পারে তা নিয়ে রীতিমতন গবেষণা চালিয়েছিলাম আমরা। কয়েকটা জায়গার কথা উঠে এসেছিল যার মধ্যে অন্যতম ছিল তিব্বত।’

এলফ্রিডের কথার মধ্যেই বলে উঠলাম, ‘জানি। আমি একজন নৃতাত্ত্বিক। এটা আমার বিষয়। লোককথায় বলে, ঐশ্বরিক বজ্রের আগুনে অ্যাটলান্টিস নগরী যখন ধ্বংস হয়, তখন সেখানকার কিছু অধিবাসী তিব্বতে আশ্রয় নিয়েছিল। উনিশোশো আটত্রিশ সালে নাৎসি জার্মানির দ্বিতীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিমলার স্বয়ং পাঁচজন বৈজ্ঞানিকের একটা দলকে তিব্বতে পাঠিয়েছিলেন সেই গোপন আর্য-গ্রাম খুঁজে বার করার জন্য। বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে যাওয়ায় দলটা তাদের কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যায়।’

এলফ্রিডে অর্থাৎ দেয়াসি বললেন, ‘বাহ্! তুমি তো অনেকটাই জানো দেখছি। একইভাবে অন্য আর-একটা লোককথা বলে, আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময়ে তাঁর কয়েকজন সেনাপতি দলত্যাগ করে লাদাখের একটা অঞ্চলে স্থায়ীভাবে থেকে যান। আমাদের মধ্যে কয়েকজন মেয়ে সেই লাদাখের গ্রামগুলোতেও যায় শুদ্ধতম আর্য শুক্রবীজের সন্ধানে।

আর আমি আসি এখানে, এই সুনারিয়া গ্রামে।

‘কেন?’ আমি প্রশ্ন করলাম।

‘বলছি।’ এলফ্রিডে একটা তামার ঘটি থেকে একঢোক জল খেলেন। তারপর বললেন, ‘সেই সময়ের এক বিখ্যাত ভারতীয় ফোকলোরিস্ট, তাঁর নামটা বলছি না, তিনি ছিলেন আমার এজেন্ট। আমার হয়ে তিনি খুঁজে দেখছিলেন তিব্বত কিংবা লাদাখের গ্রামগুলোর মতো আর কোনও অঞ্চলের লোককথায় স্বর্গচ্যুত দেবতাদের কথা রয়েছে কি না। তিনিই আমাকে একদিন এই সুনারিয়া গ্রামের কথা জানালেন। বললেন, এ এক আশ্চর্য গ্রাম। প্রজনন বিজ্ঞানের সমস্ত ধারণা এখানে এলে তছনছ হয়ে যায়।

তা হোক, ওসবে আমার কোনও আগ্রহ ছিল না। কিন্তু তিনি যখন বললেন, এখানে এখনও এমন এক দেবতা স্বশরীরে রয়েছেন যিনি নারীদের গর্ভে সন্তান উৎপাদন করতে পারেন তখন আমি ভাবলাম, একবার চান্স নিয়েই দেখি না।’

‘কী দেখলেন?’ আমি কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলাম। কারণ, তিনি যা দেখেছিলেন আমি নিজেও ততক্ষণে তা দেখতে পাচ্ছিলাম। বেড়ার ওপাশে সেই বুনো মহিষদের দলের মধ্যে থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়ে সামনে এগিয়ে আসছেন একজন শ্বেতকায় দেবতা— সুনারিয়া গ্রামের টোটেমে যাঁর একটা অক্ষম অনুকরণ আমি দেখেছিলাম। তাঁর পায়ের পাতা থেকে গলা অবধি নিখুঁত এক মানুষের শরীর I

‘মিকেলেঙ্গোলোর তৈরি ডেভিডের মূর্তি দেখেছ তো? সেই ডেভিডের মতো রূপবান শরীর। কিন্তু গলার ওপরে মাথাটা বুনো মহিষের।’

.

৩ অগাস্ট, ১৯৮২

এলফ্রিডে মারা গেছেন।

কাল দেয়াসির ঘরেই থেকে গিয়েছিলাম। দেয়াসি এলফ্রিডে নিজের হাতে আমাকে বুনো ফুলের মালা, ফুলের মুকুট, ফুলের বালা পরিয়ে নতুন বউয়ের মতন করে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। তার আগে কাঠের আগুনে তামার পাত্রে জল গরম করে আমাকে স্নান করিয়ে দিয়েছিলেন। সারা গায়ে মাখিয়ে দিয়েছিলেন নাম-না-জানা বনজ সুগন্ধি। আমার ইউরোপীয় পোশাক খুলে একটাই স্বচ্ছ রাতপোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন, যেটা সম্ভবত কোনও গাছের বাকল দিয়ে তৈরি।

তারপর আমার চোখের সামনেই তিনি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন মন্দির আর অরণ্যের সীমানায়, যেখানে তখনও কষ্টিপাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে ছিল বুনো মোষের পাল আর তাদের মাঝখানে শ্বেতপাথরের মূর্তির মতো সেই নরমহিষ।

এলফ্রিডে সটান সেই মহিষদেবতার সামনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলেন। মহিষদেবতার মাথাটা একবার মাটির কাছে নেমে এল, যেন এলফ্রিডের কোলে মাথা রাখলেন তিনি। পরমুহূর্তেই মাথাটা একটা ঝটকায় সোজা হয়ে গেল আর এলফ্রিডের শরীরটা বাতাসে একটা প্যারাবোলা এঁকে মিলিয়ে গেল গভীর খাদের মধ্যে।

একটা আর্ত চিৎকার। তারপর আবার সব চুপ। শুধু গাছের পাতায় বৃষ্টি পড়ার ঝরঝর শব্দ। যেমন নিঃশব্দে এসেছিল তেমনই নিঃশব্দে জঙ্গলে ফিরে গেল বুনো মোষের পাল। শুধু মহিষদেবতা ধীর পদক্ষেপে এসে উঠলেন দেয়াসির ঘরে। সবল দুই বাহুতে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।

তবে সকালে ঘুম ভাঙার পরে বুঝলাম কাল রাতে যা যা দেখেছিলাম তার সবটাই সত্যি। কিছুই স্বপ্ন নয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, মহিষদেবতা আমাতে উপগত হয়েছিলেন। আমার শরীরে তার স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে।

একটু বাদেই নীচের গ্রাম থেকে একটা ছোট্ট শোভাযাত্রা এই টিলার মাথায় মন্দিরে উঠে এল। সেই দলের মধ্যে ছিল ওদের শামান, মুংরি আর মাত্র দু’জন যুবক। তারা আমাকে নতুন দেয়াসি হিসেবে পুজো করল। আমি কিছুতেই বাধা দিলাম না। কারণ, বুঝতে পারছিলাম আমি আর বৈজ্ঞানিক এরিকা মেয়ার নই। আমি দেয়াসি।

এলফ্রিডে যা বলেছিলেন তাই সত্যি। আমি মহিষদেবতার নির্বাচিত নারী। তিনিই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। এখানেই আমাকে থেকে যেতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে দেবতার নর্মসহচরী হিসেবে, যতদিন না আর-একজন নির্বাচিতা এসে দেয়াসির আসন গ্রহণ করে। তারপরে আমার মুক্তি, আমার মৃত্যু।

ঠিক যেভাবে আমি এসে মুক্তি দিলাম এলফ্রিডেকে।

মুংরি যখন ফিরে যাবে তখন ওর হাতে আমার এই ডায়েরিটা তুলে দেব। বলব আমার আর সব জিনিসের সঙ্গে এটাকেও পুড়িয়ে ফেলতে।

.

চার

এখানেই এরিকা মেয়ারের ডায়েরির অনুলিপি শেষ হয়েছিল। আমি খাতাটা রাতুলদার হাতে ফেরত দিয়ে বললাম, ‘বোঝাই যাচ্ছে, মুংরি, এরিকা মেয়ারের কথা অমান্য করে তাঁর যাবতীয় কাগজপত্র কাছের কোনও শহরে পৌঁছে দিয়েছিল, যেখান থেকে সেগুলো আবার ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটে পৌঁছে গিয়েছিল।’

‘একদম ঠিক,’ বললেন রাতুলদা।

আমি বললাম, ‘তারপর কী হল? আপনারা সুনারিয়া গ্রামে গিয়েছিলেন?’

‘গিয়েছিলাম। দু’হাজার এগারোর মার্চ মাসে আমি আর লরা সুনারিয়ায় পৌঁছেছিলাম। দেখেছিলাম, এরিকা মেয়ার জায়গাটা সম্বন্ধে যা লিখেছিলেন তার একবিন্দুও মিথ্যে নয়। সত্যিই ওখানে প্রকৃতি এক অদ্ভুত জগৎ তৈরি করে রেখেছে যেখানে সংকরায়ণটাই স্বাভাবিক। তার জন্য কাউকে কোনও চেষ্টা করতে হয় না। শালফুলে মহুয়ার গন্ধ মিশে যায়, শরীরে চিতল হরিণের ছাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় নীলগাই।

এরিকা, মুংরির সম্বন্ধে তাঁর ডায়েরিতে যা লিখেছিলেন সেটা মাথায় ঘুরত। সেই নদীর চরে কোনও এক চতুষ্পদ হিংস্র প্রাণীর সঙ্গে ওর সংগমের কথা। আগের শামান আর ছিল না। তার জায়গায় আর-একজন ছোকরা শামান হয়ে বসেছিল। ছেলেটার নাম বিশু। এ-ও মাতাল, এও লোভী। ফলে এর মুখ থেকেও কথা বের করা ছিল সহজ। ওকেই একদিন আমি আর লরা সরাসরি প্রশ্ন করলাম, তোমাদের এখানে মানুষে পশুতে মিলে যায় না? সেরকম বাচ্চা জন্মালে কী করো?

ও খুব সরল মুখ করে উত্তর দিল, মেরে ফেলি। মহিষদেবতার সেরকমই নির্দেশ।

সুনারিয়াতে মানুষে-পশুতে সংকর নেই কেন— এই গ্রামে পা দেওয়ার পর থেকেই এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছিলাম। সেটা পেয়ে গেলাম। সেরকম সংকর-সন্তানেরও জন্ম হয় আকছার, কিন্তু এরা তাদের বাঁচতে দেয় না। মেরে ফেলে।’

রাতুলদাকে প্রশ্ন করলাম, ‘তারপর কী করলেন? আপনারা তো ঠিক এরকম একটা প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরিই চেয়েছিলেন, তা-ই না? যেখানে এক প্রজাতির জিন বিনা বাধায় আর-এক প্রজাতিতে প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। কাজে লাগালেন সেই সুযোগকে?’

উনি বললেন, ‘না। সময় পেলাম না।’

‘কেন? বর্ষা নেমে গিয়েছিল না কি লোকাল পিপলরা ঝামেলা করল?’

‘ওসব কিছু না।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাতুলদা উত্তর দিলেন, ‘মহিষদেবতা লরাকে তাঁর দেয়াসি হিসেবে নির্বাচন করলেন। এলফ্রিডে, এরিকা। তারপর তৃতীয় শ্বেতাঙ্গিনী… লরা স্প্রিংবার্গ।

আকাশে তারা ঝিকমিক করছিল। তবু আমার মনে হল সেই নির্মেঘ আকাশ থেকেই যেন আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। এ কী বলছেন রাতুলদা! আমি কোনওরকমে তোতলাতে তোতলাতে বললাম, ‘মম্‌- মানে? আপনি কী বলছেন রাতুলদা? ম-মম্-মহিষদেবতা সত্যিকারেই আছে?’

মুখে কোনও কথা না বলে রাতুলদা ওপরে-নীচে ঘাড় নাড়ালেন।

‘কী হয়েছিল একটু বলবেন?’

‘না-আআ! বলব না!’ হঠাৎ চিৎকার করে একটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন রাতুলদা। আমিও চমকে উঠে দাঁড়ালাম। রাতুলদা আমার দিক থেকে মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে একইভাবে চেঁচিয়ে চলেছেন, ‘এই তারককাকা! এই লোকটা কে? এ কীভাবে আমাদের বাড়িতে ঢুকল?’

এক মুহূর্ত আগে যে স্নেহময় সুভদ্র মানুষটিকে দেখেছিলাম, তাঁকে এইভাবে বদলে যেতে দেখে আমার হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল।

রাতুলদার চিৎকারে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে ওপরে উঠে এলেন রাতুলদার পরিচারক, সেই তারককাকা। এসেই দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন রাতুলদাকে। বললেন, ‘শান্ত হ’ন, শান্ত হন, দাদাবাবু! উনি আপনার কলেজের ছেলে, আপনার ভাই। মনে পড়ছে না?’

রাতুলদা তখনও প্রাণপণে তারকদার হাতের বাঁধন ছাড়াবার চেষ্টা করে চলেছেন। চোখদুটো লাল টকটক করছে, মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। তারকদা আমার দিকে ফিরে অনুনয়ের সুরে বললেন, ‘ভাই, আপনি চলে যান। চলে যান দয়া করে! দাদাবাবু যখনই পুরোনো লেখার ঝাঁপি নিয়ে বসেছেন তখনই জানতাম, আজ এরকমই কিছু একটা ঘটবে। যান ভাই, চলে যান।’

আমি ছাদ থেকে আমার কাঁধব্যাগটা তুলে নিয়ে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, সমস্তটাই তা হলে রাতুল ব্যানার্জির পাগলামো? বানিয়ে তোলা ছাইপাঁশ গল্প? এইজন্যই তার সঙ্গে আর কারুর যোগাযোগ নেই?

সিঁড়ির নীচে পৌঁছে জুতোয় পা গলাতে গলাতেই শুনলাম একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ। মুখ তুলে তাকালাম। দেখলাম কোনার দিকে একটা ঘর। ঘরটার দরজা বাইরে থেকে শেকল দিয়ে বন্ধ করা আছে, কিন্তু একটা বড়ো জানালা রয়েছে এইদিকে, মানে দালানের দিকে মুখ করে। সেই খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে রয়েছে রাতুলদার ছেলে ঘোটুল।

তার শরীরটা তেরো-চোদ্দো বছরের বালকের মতো সুন্দর, কিন্তু…

মাথাটা মোষের!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *