পলাতক আর বেবিপিসি
ইদানীং একটা বাড়ির কথাই শুধু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে পড়ে। বাড়িটা ছিল আমার পিসিমার শ্বশুরবাড়ি। বয়স দেড়শো বছর। একতলায় দোকানঘর-টর ছিল। দোতলার একদিকে থাকত আমার পিসিমার ফ্যামিলি আর অন্য অর্ধে থাকত পিসিমার বিধবা ননদ, যাকে আমরা ‘বেবিপিসি’ বলে ডাকতাম।
পলেস্তারা খসা, পুরোনো সেই বাড়িটার রং ছিল ফসিল হয়ে-যাওয়া এক ডাইনোসরের ঊরুর হাড়ের মতন। সেরকমই সরু, লম্বা আকার। বাদামি রঙের পাথুরে টেক্সচার। তবে একবার ফসিল হয়ে গেলে হাড়ের যেমন আর বদল ঘটে না, চৌষট্টির দুই পানিট্যাঙ্কি লেনের বাড়িটাকেও তেমনই আর অধিকতর জীর্ণ হতে দেখিনি কখনও।
দোতলার বারান্দার মাঝখানে যে পার্টিশন ওয়ালটা ছিল, তার গায়ের দরজাটা খুললে পিসিমার অংশ থেকে বেবিপিসির অংশে যাওয়া যেত। যদিও একই ছাদের তলায়, তবু বাড়ির ওই অংশটাকে চিরকাল বেবিপিসিমার বাড়ি বলেই জানি।
পিসিমার বাড়ির পিছনদিকের সেই বারান্দাটা অনেকদিক থেকেই বেশ অস্বাভাবিক ছিল। বারান্দাটার নীচে একটা খুব সরু গলি ছিল। গলিটার মধ্যে দিয়ে কোনওদিন কোনও মানুষকে যাতায়াত করতে দেখিনি। তবে নির্জন দুপুরে বেজিদের খেলা করতে দেখেছি ওখানে। পাঁচিলের পুরোনো ইটের খাঁজে উত্তুরে হাওয়ায় জাতসাপের খোলস দোল খেত। গলির একপাশে পিসিমার বাড়ির মতনই পুরোনো কয়েকটা বাড়ি। অন্যপাশে সেন্ট জোসেফের মলিন গির্জা আর তৎসংলগ্ন ভবঘুরে- আশ্রমের উঁচু পাঁচিল।
বারান্দায় গেলে দেখতে পেতাম, ভবঘুরে আশ্রমের পাঁচিলঘেরা মাঠে দাঁড়িয়ে কিছু লোক ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের রোগা শরীর, ন্যাড়া মাথা, ফ্যাকাশে গায়ের রং। পরনে তাদের সাদার ওপরে ছাইরঙা স্ট্রাইপড ঢোলা জামা আর পায়জামা। ছোটোবেলায় আমি ওদের দেখে ভয় পেতাম।
পার্টিশন-ওয়ালটার গায়ে যে কাঠের পাল্লাদুটো ছিল, তাদের গায়ে কোনও এককালে সবুজ রং করা ছিল হয়তো। তবে আমি জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখছি, সেই রঙের আভাসটুকুই মাত্র রয়েছে। ছোটোবেলায় ওই পাল্লার ফাঁকে চোখ লাগিয়ে আমি বেবিপিসির ঘর-সংসার দেখবার চেষ্টা করতাম। কখনও কখনও বেবিপিসিও আমার চোখের নড়াচড়া দেখতে পেয়ে যেত। হঠাৎ করেই খিল খুলে আমার হাত ধরে পার্টিশনের ওপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বলত, ‘লুকিয়ে দেখিস কেন? দরজায় নক করলে কি আমি দরজা খুলব না? দেখ! ঘুরে ঘুরে দেখ তোর পিসেমশাইয়ের পাপের সম্পত্তি।’
আমি বালকের দ্বিধাজড়ানো পায়ে দুটো ঘরের লাল মেঝে মাড়িয়ে হাঁটতাম আর দেখতাম বেবিপিসির দেওয়াল আলমারিতে কত পোর্সেলিনের পুতুল— পরি, মৎস্যকন্যা, স্প্যানিয়েল কুকুর, হাতে দুধের বালতি নিয়ে গাউন পরা মেম গোয়ালিনী।
একটা ঘরের মাঝখানে পালিশ-করা মেহগনি কাঠের বিশাল পালঙ্ক পাতা ছিল। তার গোটা জমিন স্কটল্যান্ডের কারিগরদের হাতে তৈরি আঙুরলতা আর গোলাপের তোড়ায় ভরা। পালঙ্কের মাথার দিকে কাঠের জাফরির মাঝখানে ডিমের মতন একটা আয়নাও ছিল। দুধসাদা বালিশের ওয়াড়ে ছিল রঙিন সুতোর আইভিলতা।
আরও কত কী-ই যে ছিল ওই বিশাল দুটো ঘরে। চোঙাওলা গ্রামাফোন ছিল। ব্রোঞ্জ আর মার্বেলের স্ট্যাচু ছিল। দেওয়ালঘড়ি আর টেবিলঘড়ি ছিল সবমিলিয়ে আট থেকে দশটা। আর দেওয়ালে ছিল গিলটি করা ফ্রেমে বাঁধানো অনেকগুলো অয়েল পেইন্টিং।
কিন্তু বেবিপিসি ছাড়া আর কোনও মানুষ ছিল না।
আমি বেবিপিসির বাড়ি থেকে আবার যখন মাঝখানের দরজা পেরিয়ে আমার নিজের পিসিমার কাছে চলে আসতাম, তখন পিসিমা জিজ্ঞেস করত, ‘কোথায় গিয়েছিলিস?’
আমি বলতাম, ‘বেবিপিসির বাড়ি।’
পিসিমা গম্ভীরমুখে বলত, ‘কিছু খেতে দিলে খাস না। অত যাওয়ার দরকারই বা কী?’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, ‘কেন?’
‘মেয়েটা ভালো নয়।’ এইটুকু বলেই পিসিমা আমাকে আর কোনও কথা বলতে না দিয়ে, অন্য কোনও কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত।
আমি অবশ্য বেশি যেতামও না ওদিকে। মনেই থাকত না যাওয়ার কথা। সারাদিন আমি পনিট্যাঙ্কি লেনে আমার সমবয়সি বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করতাম। কখনও কখনও বগলে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে চলে যেতাম একটু দূরে, লেবুতলা পার্কে। ইটের উইকেট বানিয়ে ক্রিকেট খেলতাম কিংবা হাওয়াই চটির গোলপোস্ট বানিয়ে রবারের বলে ফুটবল। ছুটির সেই দিনগুলোতে খেলা নিয়েই মেতে থাকতাম বেশি। মা, বাবা, বেবিপিসি, মাস্টারমশাই— কারুর কথাই তখন মনে পড়ত না।
তবু কখনও কখনও সন্ধের মুখে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরবার সময় হঠাৎ করেই চোখ চলে যেত পিসিমার বাড়ির দোতলার দিকে। অবাক হয়ে দেখতাম, দোতলায় মাত্র দুটো ঘর দেখা যাচ্ছে— পিসিমার অংশের ঘরদুটো। বেবিপিসির দুটো ঘর আমি বাইরে থেকে অনেকবার দেখবার চেষ্টা করেও দেখতে পাইনি।
হয়তো পিছনের ওই গলিটায় গিয়ে মুখ তুলে তাকালে, বেবিপিসির ঘরদুটো দেখতে পেতাম। সেই চেষ্টা করিনি যে তা-ও নয়। কিন্তু কখনওই গলিটায় পৌঁছোনোর পথ খুঁজে পাইনি। পানিট্যাঙ্কি লেনের ঠিক কোনখান থেকে যে গলিটা শুরু হয়েছিল কে জানে।
***
এক-একটা শীতের ছুটি ফুরিয়ে যায়, আমি নিজের বাড়িতে ফিরে যাই। পরের বছর শীতকালে আবার যখন পিসিমার বাড়িতে ছুটি কাটাতে আসি, তার মধ্যে আমার এক বছর বয়স বেড়ে গিয়েছে। স্কুলের উঁচু ক্লাসে একধাপ উঠে গেছি। পায়ে কড়া লোম গজাচ্ছে। ঠোঁটের নীচেও হালকা রোম। গলা ভাঙছে।
তবে এই সবই তো বাইরের বদল। ভেতরের বদলটা হঠাৎই এল সেইবার, বেবিপিসির হাত ধরে।
নিস্তব্ধ দুপুরে আমি বরাবরের মতন বারান্দার দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতেই দেখি বেবিপিসি এদিকেই তাকিয়ে আছে। আমার চোখের মণিটা নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছিল, তাই দ্রুত এগিয়ে এসে দরজা খুলে আমাকে ভেতরে টেনে নিল।
বলল, ‘কত বড়ো হয়ে গেছিস। কত লম্বা হয়ে গেছিস। যা, ওখানে বসে বই-টই পড়। আমি চান করে আসছি।’
সত্যিই, আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক ফুট বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছিলাম। তাই সেদিন আমার চোখের নাগালে এসে গিয়েছিল বেবিপিসির দেওয়াল-আলমারির সবচেয়ে ওপরের তাকটা। দেখেছিলাম সেই তাকটায় শুধুই পোর্সেলিনের তৈরি নানারকমের ল্যাংটো পুতুল সাজানো রয়েছে। বিলিতি সব মিথুনমূর্তি— কমিক্সের ছবির মতন। স্থূলাকার লোকগুলোর গায়ে শুধু কোট; প্যান্ট নেই। তাদের মুখে শয়তানি হাসি আর দু’ঊরুর ফাঁক থেকে মাটির সঙ্গে সমকোণে বেরিয়ে আছে তাদের অস্বাভাবিক দীর্ঘ পুরুষাঙ্গ। মেয়ে পুতুলগুলোর গায়ে কোনও পোশাকই নেই, তাদের ঊরুসন্ধিতে সাদা চিনেমাটির ওপরে গাঢ় খয়েরি রঙের তিনকোনা প্রলেপ।
শৈশব পেরিয়ে গিয়েছিলাম বলেই সেদিন প্রথম খেয়াল করলাম, দেওয়ালের অয়েল পেইন্টিংগুলো জুড়েও উলঙ্গ পুরুষ আর উলঙ্গিনী নারীদের ভিড়।
আমার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছিল। গলার ভেতরে কে যেন এক শিশি আঠা উপুড় করে দিয়েছিল, নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। তার মধ্যেই হঠাৎ শোবার ঘরের লাগোয়া স্নানঘরের দরজা খুলে বেবিপিসি বেরিয়ে এল। আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই, হাতে কিছু ভিজে পোশাক নিয়ে চলে গেল বারান্দার দিকে।
বেবিপিসির আদুল গায়ে তখন শুধুমাত্র একটা ভিজে শাড়ি জড়ানো ছিল। আমি দেখলাম, ওইসব পুতুল-মেমসাহেব আর দেওয়ালের ছবির মতনই বেবিপিসির শরীর। হয়তো তার চেয়েও সুন্দর।
তাই দেখে পোর্সেলিনের তৈরি অসভ্য সাহেবদের মতোই আমার লিঙ্গোত্থান ঘটল এবং বারান্দায় কাপড় মেলে ঘরে ঢুকবার জন্য দরজায় পা রাখতেই বেবিপিসির সেটা চোখেও পড়ল। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, বেবিপিসি আমার কোমরের নীচের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখদুটো একবার বিস্ময়ে একটু বড়ো হয়েই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল; তার বদলে পাতলা ঠোঁটদুটো বেঁকে গেল মজা- পাওয়া হাসিতে। শাড়িটা গা থেকে খুলতে খুলতে বেবিপিসি আমাকে ডাকল, ‘আয়।’
বেবিপিসির বাড়ি থেকে সেদিন ফেরার পরে, আমার চোখ-মুখ দেখে আমার নিজের পিসিমা কিছু বুঝে থাকবে। পরের দিনই দেখলাম একটা ছুতোর এসে পার্টিশনের দরজার ওপরে আরও একটা তক্তা ঠুকে ওটাকে পার্মানেন্টলি সিল করে দিয়ে গেল। অবশ্য না করলেও কিছু যেত-আসত না। আমি নিজেই আর যেতাম না ওদিকে। চোদ্দো বছর বয়সে সেই সংগমের অভিজ্ঞতা আমার তীব্রভাবে খারাপই লেগেছিল, শরীরে এবং মনে।
পরের বছর, মানে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকেই শীতের ছুটিতে পিসিমার বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। কারণ, তখন না ছিল আর রাস্তায় খেলার বয়স, না ছিল পড়াশোনার ঢিলেমি দেওয়ার সুযোগ। গেলেও একবেলার জন্য বাবা-মা’র সঙ্গে যেতাম। দোতলায় না উঠেই ফিরে আসতাম বেশিরভাগ দিন। ক্রমশ ভুলেই গেলাম যে পিসিমার বাড়িটায় একটা বারান্দা আছে, সেখান থেকে ভবঘুরে আশ্রম দেখা যায়। পার্টিশন- ওয়ালের ওদিকে পিসিমার বিধবা ননদ থাকে, যাকে বেবিপিসি বলে ডাকতাম।
***
তারপরে আরও কত বছর যে কেটে গেল। বেবিপিসির বাড়ি ছাড়া আর কিছুই প্রায় মনে করতে পারি না ইদানীং। বেবিপিসি ছাড়া আর যাদের মনে পড়ে তাদের মধ্যে আছে নন্দিতা বলে খুব ফরসা আর রোগা একটা মেয়ে। মনে হয় মেয়েটা আমাকে খুব ভালোবাসত কিন্তু একলা ঘরে ওর মুখোমুখি পড়লেই আমি ভয়ে সিঁটিয়ে যেতাম, কাঁদতাম, লুকোতে চাইতাম। রাত্রি হলে ও আমার পোশাক খুলে নিতে চাইত, কিন্তু আমি খুলতে দিতাম না।
নন্দিতা আমাকে একজন দাড়িওলা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারবাবুর জেরার চোটে আমি বেবিপিসির বাড়িতে সেই দুপুরে যা যা ঘটেছিল, সবই বলে ফেলেছিলাম। ডাক্তারবাবু সব শুনে নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘ইয়েস, দ্যাট সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ মাইট হ্যাভ ট্রিগার্ড হিজ গাইনোফোবিয়া। গাইনোফোবিয়া মানে জানেন তো? মানে মহিলায় আতঙ্ক; যেটা এঁর ক্ষেত্রে ঘটছে।’
তারপর সেই দাড়িওলা আমাকে অনেকগুলো ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। সপ্তাহে একদিন করে ওঁর চেম্বারে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু কেন যাব? কেনই বা ওষুধ খাব? আমি কি অসুস্থ না পাগল? কাজেই সেই বাড়িটা যেখানে নন্দিতা আর আমি ছিলাম, সেটা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম।
তারপর এখানে কেমন করে এসে পৌঁছোলাম কে জানে। তবে এসে দেখছি ভালোই হয়েছে। কত বছর বাদে আবার পিসিমার সেই বাড়িটাকে দেখতে পাচ্ছি। ডাইনোসরের ঊরুর হাড়ের মতন লম্বা বাদামি একটা বাড়ি। তার দোতলায় কাঠের রেলিং দেওয়া সরু বারান্দা। আমার পিছনে সেন্ট জোসেফের মলিন গির্জাঘর। পায়ের কাছে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দুটো বেজি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এইভাবে পিছন দিক থেকে আগে কখনও পিসিমার বাড়িটাকে দেখিনি। সামনে যে উঁচু পাচিলটা রয়েছে, তার ওদিকে নিশ্চয়ই সেই সরু গলি, যেটাকে আমি এর আগে অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পাইনি।
দোতলার বারান্দায় রেলিং-এ দুই কনুই রেখে, হাতের তালুর মধ্যে অনিন্দ্যসুন্দর মুখটাকে রেখে বেবিপিসি দাঁড়িয়েছিল। বেবিপিসি এত বছরেও একটুও বদলায়নি। ফসিলেরা বদলায় না। এখনও বেবিপিসির গায়ের ভিজে শাড়ি থেকে টুপটাপ জল ঝরে মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছে। বেবিপিসির চিনেমাটির ঊরুর মাঝখানে বল্লমের ফলার মতন ধারালো ত্রিভুজ।
এই পৃথিবীর আর কেউ বেবিপিসিকে দেখতে পাচ্ছে না।
শুধু ভবঘুরে আশ্রমের বাগানে দাঁড়িয়ে আমি, আমার পরনে সাদার ওপরে ছাইরঙের স্ট্রাইপড ঢোলা জামা আর পাজামা, চাঁদের আলোয় দেখতে পাচ্ছিলাম বেবিপিসির নিষ্ঠুর শান্ত মুখ। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।
