বাবাই হরবোলার লাস্ট শো
‘ম্যাম!’
দিয়া বাবাইয়ের হাত ধরে গ্রিনরুম থেকে বেরিয়ে আসছিল। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন ওকে ডাকল। ওকেই যে ডাকা হচ্ছে তা দিয়া প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। হয়তো অনেকগুলো বছর সে ম্যাডামের মতো কোনও ভদ্র সম্বোধন শোনেনি বলেই তার বুঝতে অসুবিধে হয়েছিল।
একসময় অবশ্য রোজই শুনত, যখন সে শ্যামনগরের সেই নার্সারি স্কুলটায় চাকরি করত। সকালবেলায় ক্লাসে ঢুকলেই একরাশ ফুলের মতো শিশু, বাঁশির মতো গলায় ওকে উইশ করত— ‘গুডমর্নিং, ম্যাম। ‘ কিন্তু সে তো দশ বছর আগের কথা। বিয়ের আগের জীবন। তারপর থেকে তো সে শুধুই গালাগাল শুনেছে। স্টুপিড, ইডিয়ট। ছোটোঘরের মেয়ে, অশিক্ষিত। ইংরিজি গালাগালগুলো কুণালের। বাংলাগুলো কুণালের মা’র… মানে দিয়ার শাশুড়ির।
তাই সেদিন ডাকটা শুনেও দিয়া মুখ না ফিরিয়েই বাবাইয়ের হাত ধরে চলে আসছিল। পায়ের দিকে তাকিয়ে একটু সাবধানে হাঁটতে হচ্ছিল তাকে; সেটাও ওর পিছন ফিরে না তাকানোর আর-একটা কারণ। আসলে স্টেজ বলো আর গ্রিনরুম বলো, সবই তো পাড়ার ডেকরেটরের তৈরি বাঁশ আর তক্তার মাচা, রবীন্দ্রসদন কিংবা কলামন্দির তো আর নয়। ওই প্যান্ডেলেই নবযুবক সংঘের বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষ্যে বিচিত্রানুষ্ঠান হচ্ছিল আর সেই অনুষ্ঠানেই পারফর্ম করতে এসেছিল বাবাই, মানে দিয়ার আট বছরের ছেলে কৌস্তভ।
গ্রিনরুম থেকে মাঠে নামার জন্য ডেকরেটর যে কাঠের সিঁড়িটি দিয়েছিল সেটি ছিল নড়বড়ে। তাছাড়া প্যান্ডেলের পিছন দিক বলে জায়গাটা বেশ অন্ধকারও ছিল। নিজের শাড়ি সামলে, বাবাইয়ের হাতটা শক্ত করে মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে দিয়া যখন সেই সিঁড়ির তিন নম্বর ধাপে পা ফেলেছে ঠিক তখনই আবার কেউ ডাকল— ম্যাম’
দিয়া সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে মাঠে পা দিয়ে পিছনে ঘুরে তাকাল। দেখল সেই সুন্দর ছেলেটি, প্রথম থেকেই যে আর্টিস্টদের দেখাশোনা করছিল, সে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। ফাংশনের জায়গায় পৌঁছোনোর পরেই ছেলেটি দিয়ার সঙ্গে আলাপ করে নিয়েছিল। বলেছিল, ওর নাম অলোক সান্যাল, নবযুবক সংঘের কালচারাল সেক্রেটারি। খুব ভালো ছেলে অলোক। ভীষণ ভদ্র। প্রত্যেক শিল্পীকে নিজে চেয়ার টেনে এনে বসিয়েছিল। প্রত্যেকের হাতে জলের বোতল ধরিয়ে দিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে টিফিনের প্যাকেট আর মেমেন্টো, তা-ও।
ওকে তাকাতে দেখে অলোক তড়তড় করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে ওদের মুখোমুখি দাঁড়াল। বলল, ‘ম্যাম, আমাদের তরফ থেকে কৌস্তভবাবুর জন্য এই সামান্য সাম্মানিক।’ এই বলে একটা লম্বা সাদা খাম ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাবাইয়ের মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিল। বলল, ‘দারুণ হয়েছে তোমার অনুষ্ঠান। অন্য সব স্টেজেও ডাকব তোমাকে, কেমন?’
দু’বছর আগের কথা। তবু দিয়ার এখনও পরিষ্কার মনে পড়ে খামটার ওপরে নীল-কালিতে নবযুবক সংঘের নাম প্রিন্ট করা ছিল আর ভেতরে ছিল একটা পাঁচশো টাকার নোট। ভীষণ অবাক হয়েছিল দিয়া। হরবোলা ডেকে সাম্মানিক পাওয়া যায়! তা-ও আবার এইটুকু ছেলের পারফরমেন্সে!
সেটাই ছিল বাবাইয়ের প্রথম রোজগার। তার আগে দু’-চার জায়গায় অনুষ্ঠান করেছিল ঠিকই, কিন্তু শিঙাড়া-দরবেশ ছাড়া কিছুই জোটেনি। না, একটু ভুল বলা হল। মনে মনে জিভ কাটল দিয়া। দর্শকাসন থেকে প্রবল হাততালি আর হাসির রোল… সেটা তো জুটেছিলই। ওটা না পেলে আর সব পাওনা তো মিথ্যে হয়ে যায়, তা-ই না?
অলোক কথা রেখেছিল। সেবারের কালীপুজোতেই অলোক বেলেঘাটার তিনটে বড়ো ক্লাবের অনুষ্ঠানে মাস্টার কৌস্তভ দাসের হরবোলা ডাকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এবারের সাম্মানিকের পরিমাণটা ছিল দিয়ার কাছে অপ্রত্যাশিত। তিনটে ক্লাব মিলিয়ে সাতহাজার টাকা। ও নিজে তখন সেলস ট্যাক্সের এক উকিলের অফিসে খাতা লিখে মাস গেলে উপার্জন করত আঠারো হাজার টাকা, এখন যেটা বেড়ে বাইশ হাজার হয়েছে। কাজেই সাত হাজার টাকাটা ওর কাছে তখন অনেকটা টাকাই ছিল।
মাঝের এই দু’বছরে আরও এগিয়ে গিয়েছে বাবাই।
সুনাম জিনিসটা সুগন্ধের মতোই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এখন প্রায় সারা বছরই ওর টুকটাক প্রোগ্রাম লেগে থাকে। চার মাস আগে জনপ্রিয় এক টিভি চ্যানেলের লিটল স্টার্স নামে রিয়েলিটি শো-তে সেকেন্ড প্রাইজ পাওয়ার পর থেকে দিয়া বাবাইয়ের অ্যাপিয়ারেন্স ফি বেঁধে দিয়েছে। এখন আর যে যা দেয় হাত পেতে নেয় না। বলেই দেয়, ও ম্যাক্সিমাম ত্রিশ মিনিট পারফর্ম করবে। তার জন্য পাঁচ হাজার টাকা নেবে। কেউ কেউ চড়া দর শুনে মুখ বেঁকিয়ে চলে যায়। তারপরেও ওদের ডাকবার মতো ক্লাবের অভাব হয় না। কেনই বা হবে? দিয়া ভেবে দেখেছে, একটা দুর্গাপুজোর বাজেট যদি হয় পঁচাত্তর লাখ, সেখানে পাঁচ হাজার টাকা আর কতটুকু!
দিয়া এখন বাবাইকে নিয়ে বেলেঘাটা খালপাড়ে একটা পুরোনো বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকে। শ্যামনগর থেকে ওর মা মাঝে মাঝে আসেন। ওদের সঙ্গে এক-দুমাস করে কাটিয়ে যান। কুণাল ডিভোর্স দেয়নি। দেবেও না। ও ওর সেই মহিলা সহকর্মী বনানীর সঙ্গে স্বামী- স্ত্রী’র মতোই থাকবে, কিন্তু দিয়াকে মুক্তি দেবে না।
দিয়া কয়েকবার বাবাইয়ের জন্য ওর কাছ থেকে টাকা চেয়েছিল। বলেছিল, ‘ছেলেটা তো তোমারও। তোমার কোনও দায়িত্ব নেই?’ তাতে কুণাল প্রতিবারই অসভ্যের মতো হেসে বলেছে, ‘কোনও প্রমাণ আছে ছেলেটা যে আমার? যে ছেলে ক্লাসে ফেল করে আর গরু-ছাগলের ডাক ডাকে সে আমার ছেলে হবে কেমন করে!’
***
বাবাই স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে বিকেল পাঁচটায় আর দিয়ার অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধে সাতটা বেজে যায়। সারা দিনের মধ্যে এই দু’ঘণ্টা সময়টাই বাবাইয়ের সবচেয়ে অসহ্য লাগত।
না তখন পড়তে ভালো লাগত, না খেলতে। আর কার সঙ্গেই বা খেলবে? খালধারের এই রাস্তাটায় তো শুধু ছোটো ছোটো লেদ মেশিনের ফাউন্ড্রি, গোডাউন আর এক-দুটো লেবার-বস্তি। বসতবাড়ি বলতে শুধু ওদের এই ভাড়াবাড়িটা। সঙ্গী কোথায় খেলার মতন?
খেলার মাঠই বা কোথায়? বাড়ির সামনের খোয়া-ওঠা পিচরাস্তাটা পেরোলেই বেলেঘাটা খাল। তার জল কাজলের মতো কালো। কী যেন এক দুর্গন্ধ গ্যাস বেরোয় সারাক্ষণ, বেশিক্ষণ জলের কাছে দাঁড়ালে চোখ- নাক জ্বালা করে।
এখন অবশ্য বাবাইয়ের অতটা খারাপ লাগে না। বরং এখন সে চায় মা যেন একটু দেরি করে বাড়ি ফেরে। দিন সাতেক হল সে এক নতুন খেলা খুঁজে পেয়েছে।
হরবোলা ডাকাটাও তার কাছে একটা খেলাই ছিল। যখন সে বাবা-মা আর ঠাম্মার সঙ্গে যোধপুর পার্কের বাড়িতে থাকত তখন সকাল থেকেই চারিদিকের গাছগুলোয় অনেক পাখির ডাক শুনতে পেত। বাড়ির দোতলার একটা ঘরের জানালায়, লোহার গরাদের মধ্যে পা-দুটো গলিয়ে দিয়ে বসে ও পাখি দেখত আর তাদের ডাক নকল করত। তখন মা চাকরি করত না আর ওর ছিল মর্নিং স্কুল। সারা দুপুর ওর ওইভাবে পাখি দেখে আর পাখির ডাক ডেকেই কেটে যেত।
তখন বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে ঠাম্মা ওকে ডেকে বলত, ‘বাবাই! তুমি একটু এঁদের দেখিয়ে দাও তো, কোকিল কেমন করে ডাকে, মৌটুসি কেমন করে ডাকে, অরিওল কেমন করে ডাকে।’
ও দেখাত। মুখের সামনে ছোট্ট হাতদুটো চোঙার মতো করে ধরে একের পর এক পাখির ডাক ডেকে যেত। অতিথিরা অবাক হতেন, মুগ্ধ হতেন।
তারপর আস্তে আস্তে বাড়ির পরিবেশটা কেমন যেন বদলে গেল। কেবল ঝগড়া, কেবল ঝগড়া। মা আর বাবার ঝগড়া, মা আর ঠাম্মার ঝগড়া। বেশিরভাগ দিনই বাবাই স্কুল থেকে ফিরে দেখত, মা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। ও জুতো খুলে বিছানায় উঠে মা’র মুখটা জোর করে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিত। চোখের জলে ফুলে যাওয়া মুখ চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাওয়া, কপালের টিপ ধেবড়ে যাওয়া মুখ। আর চোখে কেমন যেন পাগল পাগল দৃষ্টি।
মা ওকে বুকে চেপে ধরে কাঁদত আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঠাম্মা বলত, ‘বউমা, সন্তানের গায়ে মা’র চোখের জল পড়লে তার অকল্যাণ হয়। এটুকুও কি শেখোনি?’
এরপর একদিন সেই যোধপুর পার্কের বাড়িতে খুব কেষ্টবিষ্টু ধরনের কয়েকজন গেস্ট এলেন। একজন মহিলা, তিনজন পুরুষ। বাবা একটা বিজনেস স্টার্ট করবে, ওরা তাতে টাকা দেবে, এরকমই শুনেছিল বাবাই। সেদিন মাকেও বিছানা ছেড়ে উঠে মুখ-চোখ ধুয়ে একটু সাজগোজ করতে হল। একটু ভালো শাড়ি পরতে হল। বাবা ভীষণ বকুনি দিয়ে মাকে ওইসব করাতে রাজি করেছিল। বলছিল, ‘তুমি যদি আজ ওদের সামনে না যাও তা হলে তোমাকে গলা টিপে মেরে ফেলব।’
যথারীতি সন্ধেবেলায় সেই গেস্টদের সামনে বাবাইয়ের ডাক পড়ল। মা আর বাবা হাসি হাসি মুখে লোকগুলোর সঙ্গে গল্প করছিল। কানুকাকা কিচেন থেকে ফিশফ্রাই, কফি এইসব এনে টেবিলে রাখছিল। ফুলদানিতে ফুল ছিল। মিউজিক সিস্টেমে খুব আস্তে আস্তে রবি ঠাকুরের গান বাজছিল।
বাবাই ঘরে ঢোকামাত্র ঠাম্মা রিমোট দিয়ে সেই গান অফ করে দিয়ে বলল, ‘এসো সোনা, আমার পাশে বসো তো। এই আঙ্কলদের একটু পাখির ডাক শুনিয়ে দাও।’
হরবোলার ডাকই তো বাবাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন। তার মুক্তির জায়গা। তাই ঠাম্মা বলামাত্রই সে দিব্যি একের পর এক টিয়া, শালিখ, বেনেবউ— এদের ডাক শুনিয়ে অতিথিদের মুগ্ধ করে দিল। তাঁরা ওর সঙ্গে হ্যান্ডশেক-টেক করে একাকার। কত প্রশংসা যে করলেন। তাতে ভারী উৎসাহ পেয়ে বাবাই ওদের বলল, ‘আপনারা বাবার ডাক শুনবেন?’
বাবার ডাক! শুধু গেস্টরা নন, মা, বাবা, ঠাম্মা সবাই অবাক। গেস্টদের মধ্যে যে সুন্দরী মহিলাটি ছিলেন তিনি খিলখিল করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘শোনাও তো ডার্লিং, বাবা কেমন করে ডাকে ‘
উপস্থিত সকলকে অবাক করে দিয়ে সেই ছ’বছরের শিশুর গলা দিয়ে অবিকল তার বাবা কুণাল দাসের কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এল— ‘শোনো, দিয়া, তুমি যদি এই-মুহূর্তে উঠে তৈরি না হও তা হলে আমি তোমাকে গলা টিপে খুন করে ফেলব। আমার সোশাল স্ট্যাটাস তুমি ধুলোয় লুটিয়ে দেবে সেটা হবে না।’
বাবার ডাক শেষ করে বাবাই দেখল, সবাই অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মানে ওদের ভালো লেগেছে। সে বলল, ‘এবার ঠাম্মার ডাক শোনো, হ্যাঁ। বউমা, সন্তানের গায়ে মা’র চোখের জল পড়লে তার অকল্যাণ হয়। এটুকুও কি শেখোনি?’
অবিকল এক বয়স্কা মহিলার গলায় সেদিন কথাগুলো বলেছিল বাবাই।
গেস্টরা মুখ নিচু করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন আর তাঁরা বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই ওই ড্রইংরুমেই বাবা কোমরের বেল্ট খুলে বাবাইকে মাটিতে ফেলে পেটাতে শুরু করেছিল। ঠাম্মা পাশ থেকে বলছিল, ‘মার মার! খুন করে ফেল! এটা মানুষ না জানোয়ার? দরকার নেই আমার এমন বংশধরের। গর্ভস্রাব কোথাকার!’
বাবাই মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল। ওর ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে ওর বেশিরভাগ মার মা নিজের পিঠের ওপরে নিয়েছিল। কানুকাকা কিচেন থেকে ছুটে এসে না বাঁচালে সেদিন ওরা দু’জনেই সত্যিই হয়তো খুন হয়ে যেত।
ওই রাতেই দিয়া বাবাইয়ের হাত ধরে যোধপুর পার্কের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। প্রথমে দু’মাস শ্যামনগরে বাপের বাড়িতে ছিল। তারপর বেলেঘাটার খালপাড়ে এই বাড়িতে। এখানেও প্রায় চারটে বছর কেটে গেল। তখন বাবাইয়ের বয়স ছিল ছয়। এখন দশ।
যদিও ওর মাত্রই দশ বছর বয়স তবু বয়সের তুলনায় ও জীবনের নিষ্ঠুরতা দেখে ফেলেছে অনেক বেশি। আর সেইজন্যই ও এমন অনেককিছু বুঝতে পারে, যা ওর সমবয়সি বাচ্চাদের বোধের অগম্য। বাবাই জানে, ও হরবোলা ডেকে যে টাকা পায় সেটা মা’র কাজে লাগে। ও জানে, মা ক্রমশ ওকে দিয়ে আরও বেশি বেশি করে প্রোগ্রাম করাবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাফল্যও পাচ্ছে সে ব্যাপারে।
ইদানীং প্রতি সপ্তাহেই এক-দুটো করে প্রোগ্রাম থাকছে ওর এবং সেইসব প্রোগ্রাম আর কলকাতার মধ্যে আটকে নেই। কলকাতা ছাড়িয়ে কখনও ডায়মন্ডহারবার, কখনও ব্যান্ডেল কিংবা আরও দূরে যেতে হয় তাকে। একবার হলদিয়ায় গিয়েছিল। একবার আসানসোলে।
আজকাল আর শুধু পাখি, কুকুর আর বেড়ালের ডাক ডাকলে হয় না। মা নিজেই তার জন্য স্ক্রিপ্ট লিখে দেয়। স্ক্রিপ্ট মানে একটা ছোটো গল্প। ধরো, একটা বাচ্চা ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল। সে ট্রেনে উঠল। ট্রেনের হুইসল, চাকার ঝিকঝিক শব্দ… আস্তে থেকে জোরে। তারপর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়াল। সেখানে চা-ওলার ‘চায় গ্রম চায়ে’ হাঁক। তারপর বাচ্চাটা একটা অচেনা স্টেশনে নেমে পড়ল। একটা গ্রাম। রাস্তার ধারে কুয়ো থেকে বউরা জল তুলছে। কুয়োয় বালতি নামার আওয়াজ… এরকম অনেক শব্দ বসিয়ে একটা গল্প। গল্পটা মা পাঠ করে আর শব্দগুলো বাবাই তার মুখে অনুকরণ করে দেখায়।
অলোককাকু মা’র জন্য এরকম কয়েকটা গল্পের সাউন্ডট্র্যাকও বানিয়ে দিয়েছে। সেখানে ওদের পাঠ আর হরবোলার আওয়াজের সঙ্গে মিউজিকও থাকে। সবমিলিয়ে ক্রমশই আরও জমজমাট হয়ে উঠছে মাস্টার কৌস্তভের শো।
কিন্তু বাবাই এখন আর শো করতে মজা পায় না। শো-এর জন্য তাকে মা’র আর অলোককাকুর পছন্দমতন আওয়াজ শিখতে হয়। আগে যেমন জানালার শিকের মধ্যে পা ঝুলিয়ে বসে, নিজের ইচ্ছেমতন নিজের ভালো লাগা শব্দ গলায় তুলে নিত, তার আর উপায় নেই এখন। এমনকি তার জন্য কখনও কখনও অলোককাকু ওকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে এখানে-ওখানে নিয়ে যায়। যেমন কুয়োয় জল তোলার শব্দ কেমন হয় ও বুঝতে পারছিল না। তখন অলোককাকু ওকে রাজারহাটের ভেতরদিকে একটা গ্রামের মতো জায়গায় নিয়ে গিয়ে সেই শব্দ শুনিয়ে নিয়ে এসেছিল।
কয়েক মাস আগে বাবাই ওর মাকে একবার বলেছিল, ‘ক্লাস-টিচার আমাকে বকেছে মাম্মা। বলেছে, এত অ্যাবসেন্ট হলে আমাকে প্রোমোশন দেবে না।’
‘জানি জানি!’ শুনেই খ্যাঁকখ্যাঁক করে উঠেছিল দিয়া, ‘তোদের ক্লাস – টিচারকে বলিস…’ কী ভেবে কথাটা আর শেষ করেনি। বরং সুর নরম করে বলেছিল, ‘আচ্ছা, বাবা। আমি তোর ক্লাস-টিচারের সঙ্গে দেখা করে বুঝিয়ে বলে আসব। তুই হচ্ছিস স্কুলের প্রাইড। তোর সঙ্গে এরকম ব্যবহার করলে হবে?’
মনে হয় দিয়া সত্যিই ক্লাস-টিচারের সঙ্গে দেখা করে ওর নিজের আর্থিক অবস্থা-টবস্থা নিয়ে কিছু বলে এসেছিল। বাবাইয়ের শো করাটা যে নিছক শখের ব্যাপার নয়, একটা নেসেসিটি, সেটাও বলে এসেছিল নিশ্চয়ই।
তারপর থেকে ক্লাস-টিচার রঞ্জনাম্যাম আর বাবাইকে কিছু বলেন না ঠিকই, কিন্তু ও বুঝতে পারে ক্লাসে ও কেমন যেন একঘরে হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুরা ওকে এড়িয়ে চলে। অ্যাবসেন্ট হলেও কেউ ওকে ক্লাস-নোস দিতে চায় না। রেজাল্ট খারাপ হচ্ছিল। মা রেজাল্ট খারাপ হলে বকে না ঠিকই, কিন্তু বাবাইয়ের নিজেরই খারাপ লাগে। ওর মনে আছে, বাবা ওকে বলত ‘ফেল-করা ছেলে’। ফেল করতে ওর ভালো লাগে না।
কিন্তু কয়েকদিন আগে তার ছোট্ট বুকের ভেতরে লুকিয়ে-রাখা এইসব একাকিত্ব, একঘেয়েমি এবং বিফলতার কথা ভুলিয়ে দেওয়ার মতো একটা অদ্ভুত খেলা খুঁজে পেয়ে গেছে বাবাই। ওই একটু আগেই যেটার কথা বলছিলাম। যে খেলাটার কথা ও মাকেও বলেনি। মা বাড়িতে ঢুকবার আগে অবধি যে খেলাটা ও আজকাল একা একাই খেলে।
***
বাবাই নিজের মধ্যে ক্রমশ একটা বদল টের পাচ্ছিল। একটা আশ্চর্য ক্ষমতা জন্ম নিচ্ছিল ওর ভেতরে। সেটার কথা ও কাউকে বলেনি, এমনকি মাকেও না। ওর ভয় করে, মাকে বললে মা হয়তো এটাকেও শো-তে ঢুকিয়ে দেবে। এই ক্ষমতাটা দেখিয়েও কিছু পয়সা রোজগার করবার চেষ্টা করবে আর তখন বাবাইয়ের নিজের আর এই ক্ষমতাটাকে ভালো লাগবে না।
বাবাই আজকাল সাধারণ মানুষ শুনতে পায় না এমন কিছু কিছু শব্দ শুনতে পাচ্ছে। যেমন, পিঁপড়েদের ডাক। বেলেঘাটার ভাড়াবাড়ির মেঝেতে অনেক ফাটল আছে। সেই ফাটলগুলোর মধ্যে বড়ো বড়ো ভেঁয়ো পিঁপড়ে থাকে। বাবাই কয়েকবার তাদের কামড় খেয়েছে। ব্যাটারা একবার কামড়ে ধরলে আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়।
কিছুদিন আগে মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে ওরকম কয়েকটা ভেঁয়ো পিঁপড়েকে অবজার্ভ করছিল। হঠাৎ ও শুনতে পেল খুব মৃদু পিড়িং পিড়িং করে একটা শব্দ হচ্ছে। ঠিক যেন মেলায় যে মাটির বেহালা পাওয়া যায়, সেই বেহালার তারে কেউ আলতো করে টান দিচ্ছে।
সেটা ছিল ছুটির দিন। দিয়া বালিশে হেলান দিয়ে বসে মন দিয়ে স্ক্রিপ্ট লিখছিল। বাবাই মা’র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কীসের শব্দ?’
‘কোথায় আবার শব্দ?’ দিয়া বলল।
‘শুনতে পাচ্ছ না? কনটিনিউয়াসলি হয়ে যাচ্ছে তো। পিড়িং পিড়িং… পিড়িং পিড়িং।’
‘চুপ কর!’ ছেলেকে ধমক লাগাল দিয়া। ‘লিখতে দে আমাকে। দিবারাত্র শুনছিস, তবু কারখানার লোহা পেটার শব্দটাকে চিনতে পারছিস না।’
বাবাই আর মা’র সঙ্গে তর্ক করল না, যদিও সে বুঝতে পারছিল, কারখানার লোহা পেটানোর শব্দ এটা নয়। এটা অন্য আর-একটা শব্দ। সে আবার মেঝের দিকে মুখ ঘোরাল। যে পিঁপড়েগুলোকে ও এতক্ষণ অবজার্ভ করছিল তারা এবার একটা মরা পোকাকে টানতে টানতে মেঝের ফাটলের দিকে চলে যাচ্ছে। বাবাই স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, শব্দটাও ওই পিঁপড়েদের সঙ্গে ক্রমশ কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
কিছুদিন আগেই ও পাঠ্যবইয়ে সেইসব শব্দতরঙ্গের কথা পড়েছিল, যা মানুষের কানে ধরা দেয় না। মা তো পিঁপড়েদের ডাক শুনতে পাচ্ছে না। তার মানে কি পিঁপড়েরাও সেইরকম শুনতে-না-পাওয়া শব্দতরঙ্গে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে?
বাবাই ভাবে, আমি পারব না গলা দিয়ে অমন শব্দ বার করতে? সবই তো পারি। দেখি না চেষ্টা করে।
চেষ্টা করল এবং পারল। ও গলা দিয়ে শব্দ বার করতেই যে পিঁপড়েগুলো মেঝের ফাটলের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, তারা কেমন যেন থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর-একবার শব্দ করতেই পিঁপড়েগুলো ঘুরে বাবাইয়ের দিকে মুখ তুলে তাকাল। মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে বাবাই দেখছিল ভেঁয়ো পিঁপড়েদের চোখ চকচক করছে। লিকপিকে ঠ্যাং আর শুঁড় নেড়ে ওরা যেন বাবাইকে কিছু বলতে চাইছিল।
বাবাই চট করে একবার দেখে নিল মা’র কোনও বিকার হয়েছে কি না। না। যেমন লিখছিল লিখে যাচ্ছে। পিঁপড়েদের ডাক যেমন শুনতে পায়নি, তেমনই ওর গলা দিয়ে বার করা শব্দও শুনতে পায়নি। বাবাই দু’হাত মুঠি করে মাথার ওপরে তুলে সোল্লাসে বলল ‘ইয়া!’
এটা ছিল মানুষের শ্রবণযোগ্য শব্দ। দিয়া চমকে ছেলের দিকে তাকাল। বলল, ‘কী রে! এত ফূর্তি কীসের?’
‘কিছু না।’ বাবাই আবার পিঁপড়েদের চমকে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওর মনে হল, কিছুদিন চেষ্টা করলে ও হয়তো শব্দগুলোর মানে বুঝতে পারবে।
এটাই বাবাইয়ের নতুন খেলা। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে ও এখন মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে পিঁপড়েদের সঙ্গে কথোপকথন চালাবার চেষ্টা করে। সেই প্রথম ও কোনও শ্রবণাতীত শব্দকে শুনতে পেয়েছিল, অনুকরণ করতে পেরেছিল। তাই এই ঘটনাটার কথা বলা।
***
আরও মাস দুয়েক পরের কথা। বাবাই আর দিয়া এমনিতে রোজ সকাল ন’টার সময় একসঙ্গেই বেরোয়। বাবাইয়ের স্কুল ওখান থেকে বেশি দূরে নয়। ও বেলেঘাটা মেন রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে চলে যায়। ফেরেও একইভাবে— হেঁটে। আর দিয়া একটা অটো ধরে চলে যায় উকিলবাবুর অফিসে। সেদিন বাবাই দেখল মা বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছে না।
‘অফিস যাবে না?’ ও জিজ্ঞেস করল।
‘না।’
বাবাই চিন্তিত মুখে বলল, ‘কেন? শরীর খারাপ?’
মা-ছেলের সংসারে ওই বয়সেই বাবাইকে অনেক দায়িত্ব নিতে হত। তার মধ্যে একটা দায়িত্ব ছিল, মা’র শরীর খারাপ হলে মোড়ের মাথায় রবি আঙ্কলের ওষুধের দোকান থেকে সিমটম বলে ওষুধ নিয়ে আসা। সেইজন্যই ও আবার প্রশ্ন করল, ‘মেডিসিন আনতে হবে?’
‘না, বাবা। শরীর খারাপ নয়। আজ আমার এমনিই ছুটি। তুমি সাবধানে এসো।’ ছেলের গালে একটা চুমো খেয়ে ওকে রাস্তা অবধি এগিয়ে দিয়ে এল দিয়া।
কিন্তু বাবাইয়ের মনটা পড়ে রইল বাড়ির দিকে। মা বাড়িতে রয়েছে এটা তো একটা বড়ো পাওনা। আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে মাকে তো বলাই যায়, চলো কোথাও বেড়িয়ে আসি।
তা-ই করল বাবাই। তিনটে বাজতেই মিথ্যে করে রঞ্জনাম্যামকে বলল, শরীর খারাপ লাগছে। এই বলে বাড়ি চলে এল।
বাড়ির বাইরে রাস্তায় অলোককাকুর লাল স্কুটারটা স্ট্যান্ড করানো ছিল। আগেই বলেছি, বয়সের তুলনায় বাবাই অনেক বেশি বুঝত। তাই দরজার কড়া না নেড়ে ও বাড়িটাকে বেড় দিয়ে পিছনের একচিলতে জমিটায় গিয়ে দাঁড়াল। ওদিকে ওদের শোবার ঘরের জানালা। পুরোনো বাড়ি, তাই দরজা-জানালায় অনেক ফাটাফুটি। সবক’টাই বাবাইয়ের মুখস্থ। তার খেলাই তো ওইসব ফুটোয় চোখ লাগিয়ে বাইরে কী হচ্ছে দেখা।
এখন সে বাইরে থেকে ওরকম একটা ফুটোয় চোখ লাগিয়ে দেখল, মা আর অলোককাকু বিছানায় শুয়ে আছে। দু’জনেরই গায়ে কোনও কাপড় নেই। বন্ধ ঘরের আবছা অন্ধকারে ওদের গায়ের রং টিকটিকির মতো হলদে লাগছিল। টিকটিকির মতোই ওরা একে অন্যকে পেঁচিয়ে ধরে খাটের এদিক থেকে ওদিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল।
বাবাইয়ের চোখদুটো প্রথমে জ্বালা করে উঠল। তারপর জ্বলে উঠল 1 সেই সময়ে যদি সত্যিই কেউ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখত, তা হলে দেখতে পেত দুই চোখের মণি সাপের চোখের মণির মতো জ্বলছে। হঠাৎই ও জানালার ফাটলে মুখ লাগিয়ে ওর সেই নতুন-শেখা পিঁপড়ের ভাষায় কিছু বলল। বলেই জানালার সামনে থেকে সরে গেল। আর পিছন ফিরেও তাকাল না। পিঠে স্কুলব্যাগ নিয়েই হাঁটতে শুরু করল।
বাবাই যে কী বলেছিল তা দিয়া কিংবা অলোক শুনতে পেল না; কিন্তু যাদের শোনার তারা ঠিকই শুনল। পিঁপড়েগুলোকে বাবাই বলেছিল, ‘খাটের ওপরে দুটো টিকটিকি লড়াই করে আহত অবস্থায় পড়ে আছে। তোমরা ওদের খেয়ে নাও।’
সেই কথা শুনে মেঝের বিভিন্ন ফাটল থেকে রাশি রাশি ভেঁয়ো পিঁপড়ে বেরিয়ে, মিছিল করে খাটটার দিকে চলল। তারপর তাদের ডাকে বেরিয়ে এল খালপাড়ের যত লেদ-কারখানা, যত গোডাউনের পিঁপড়েরা; আড়াইশো বছর ধরে যারা কলকাতার মাটির নীচে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তারা।
তাদের পিছন পিছন ওই বাড়ির মেঝের ফাটল দিয়ে উঠে এল মাকড়শা, কাঁকড়াবিছে, মাছির লার্ভা।
মুহূর্তের মধ্যে দিয়া আর অলোকের শরীরদুটো লাল, কালো, ধূসর, সাদা নানা রঙের কীটপতঙ্গে ছেয়ে গেল। ওরা কয়েকবার চিৎকার করেছিল, কিন্তু সেই বসতিহীন পাড়ায় মেশিনের আওয়াজ ছাপিয়ে ওদের সেই আর্তনাদ কারুর কানে পৌঁছোয়নি। তিন-চারদিন বাদে পথচারীরা বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধে বিরক্ত হয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দুটো কঙ্কাল খুঁজে পায়। একরাশ পরিচ্ছন্ন হাড় শুধু। হাড়ের ওপরে একটুও চামড়া বা মাংস লেগে ছিল না।
***
এই ঘটনার প্রায় দশ বছর বাদে, এক বর্ষার সন্ধ্যায়, যোধপুর পার্কের প্রায়ান্ধকার রাস্তা ধরে যখন আনোয়ার শাহ রোডের দিকে শর্টকাট করছি, তখন একটি ছেলের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে আমার কাছে সিগারেট ধরাবার জন্য আগুন চায়। দিই। ঠিক সেই সময়েই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে এবং আমি আর সেই ছেলেটি দৌড়ে গিয়ে একটা বন্ধ চায়ের দোকানের খালি চালার নীচে ঢুকে পড়ি।
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমি আবার তাকে ভালো করে দেখি। মনে হয় তার বয়স কুড়ি বছরের বেশি হবে না। আমার চেয়ে অনেকটাই ছোটো। এবং যদিও তার পোশাক-আশাক ছিল নোংরা এবং মাথায় ছিল কাকের বাসার মতো চুল, তবু তাকে পাগল কিংবা পাতাখোর বলে মনে হয়নি আমার। কারণ, তার চোখ-মুখের ভাব ছিল অত্যন্ত সতর্ক এবং বুদ্ধিদীপ্ত। শুধু তা-ই নয়, ছেলেটির মুখে এমন এক গম্ভীর বিষণ্ণতা জড়িয়ে ছিল যে, মনে হচ্ছিল সে যেন দুনিয়ার অনেককিছু দেখে ফেলেছে।
চালাটার নীচে একটা কাঠের বেঞ্চি ছিল, দোকানদার সেটাকে শেকল দিয়ে ঘরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে গিয়েছিল। সেই বেঞ্চিটাতেই আমরা দু’জন পাশাপাশি বসে চুপচাপ সিগারেটে টান দিচ্ছিলাম। কিন্তু একটু বাদে একটা অত্যন্ত অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটল।
আমাদের সামনেই ছিল সেই মাঠটা, যেটার নাম তালতলা পার্ক তুমুল বৃষ্টিতে সেই পার্ক এবং সামনের রাস্তা তখন জনহীন। শুধু মাঝেমধ্যে এক-দুটো গাড়ি হর্ন দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
পার্কের একদিকে কয়েকটা বড়ো দেবদারু গাছ বৃষ্টিতে ভিজছিল। হঠাৎ একটা গাছ থেকে একটা বাদুড় উড়ে এসে আমরা যে চালাটার নীচে বসেছিলাম, তার সিলিংয়ে পা আটকে দুলতে দুলতে স্থির হয়ে গেল। তারপর আর-একটা বাদুড় ঠিক একইভাবে প্রথম বাদুড়টার পাশে এসে বসল। তারপর আর-একটা… আর-একটা। মিনিটখানেকের মধ্যে গোটা দশেক বাদুড় এসে আমাদের চালাটার সিলিং-এর বিমে ঝুলতে শুরু করল। মাঝে মাঝে চলন্ত গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ওদের পুঁতির মতো চোখগুলো ঝিলিক দিয়ে উঠছিল; কিন্তু তাছাড়া, প্রাণীগুলো ছিল একেবারেই স্থির, নিঃশব্দ।
তবুও আমার ভয়ংকর অস্বস্তি হচ্ছিল। বাদুড়ের থেকে মানুষের শরীরে কী যেন একটা সংক্রমণ হয় না? এখান থেকে পালাতে পারলেই ভালো হত, কিন্তু তখন বৃষ্টি পড়ছিল একেবারে মুষলধারে। আমি আবার তার ক’দিন আগেই জ্বর থেকে উঠেছিলাম, তাই বেরোতে সাহস পাচ্ছিলাম না।
ছেলেটি আমার অস্বস্তি খেয়াল করে বলল, ‘আপনার খারাপ লাগছে? ওদের যেতে বলব?’
অবাক হয়ে বললাম, ‘তার মানে! তুমি বললেই ওরা চলে যাবে?’
‘যাবে বইকি। আমিই তো ওদের ডাকলাম। আচ্ছা, ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
ও কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই একটা-দুটো করে সবকটা বাদুড়ই আবার দেবদারু গাছের আশ্রয়ে ফিরে গেল। আমি অবাক হয়ে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। কারণ, এই পুরো সময়টায় ওকে কোনও অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা তো দূরের কথা, মুখ দিয়ে টুঁ শব্দ করতেও শুনিনি। তা হলে বাদুড়গুলোকে ফেরত পাঠাল কেমন করে?
ছেলেটা একটা টুসকি মেরে সিগারেটের শেষটুকু চালার বাইরে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘অবাক হচ্ছেন? না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি একজন হরবোলা। তবে বহু বছর মানুষ শুনতে পায় এমন কিছুকে নকল করিনি। নকল করি মানুষ যা শুনতে পায় না সেইসব শব্দকে। যেমন, বাদুড়ের ডাক। জানেন তো, ওরা ক্রমাগত মুখ দিয়ে শব্দোত্তর তরঙ্গ নিক্ষেপ করে আর তারপর সেই প্রতিফলিত তরঙ্গকে অনুসরণ করে বুঝতে পারে সামনে কোথায় খাদ্য, কোথায় বিপদ, কোথায় বাধা?’
বললাম, ‘জানি। কিন্তু …’
তখনই ছেলেটি নিজের পরিচয় দিল। বলল, ওর নাম কৌস্তভ দাস। ডাকনাম বাবাই। এই কলকাতাতেই, এমনকি এই যোধপুর পার্কেই ছোটোবেলাটা কাটিয়েছিল। তারপর মাত্র দশ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে পালায়।
তারপর বলল, আজকেই নাকি ওর জীবনের শেষদিন।
আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘আত্মহত্যা করবে নাকি? একদম না। আমি কিন্তু পুলিশ ডাকব। বলব তোমাকে লকআপে আটকে রাখতে। ‘
ও ম্লান হেসে বলল, ‘না, আত্মহত্যা করলে অনেক আগেই করতে পারতাম। আসলে অনেকদিন ধরে চেষ্টা করতে করতে আজই একটা ডাক আয়ত্ত করতে পেরেছি। সেই ডাকটা যদি নিখুঁতভাবে ডাকতে পারি তা হলে আমার মৃত্যু হবে।’
***
এরপর কৌস্তভ, মানে বাবাই আমাকে আস্তে আস্তে ওর জীবনের সমস্ত কথা খুলে বলে; ওই যে কথাগুলো এতক্ষণ ধরে লিখলাম। শুরুর দিকে আমি অবিশ্বাস নিয়েই শুনছিলাম। কিন্তু যত সময় যেতে লাগল ততই আমার মনে হচ্ছিল যে, না, এ যা বলছে তা সত্যি। তার একটা কারণ তো ওই বাদুড়দের ওপরে বাবাইয়ের প্রভুত্বের ঘটনা, যা আমি একটু আগেই দেখেছি। তাছাড়া মাঝে মাঝেই অভ্যাসবশত ও কথার মধ্যেই এমন সব শব্দ নকল করে বসছিল, যা অকল্পনীয়। আমি সারা জীবনে প্রচুর হরবোলা শুনেছি। কিন্তু মেঘের ডাককে নকল করতে পারে এমন কাউকে শুনিনি। কিংবা টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দকে।
অতীত জীবনের কথা বলা হয়ে গেলে বাবাই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর বলল, ‘আপনার নাম জানি না, ধাম জানি না। তবু আপনাকে এত কথা বলছি কেন জানেন?’
‘কেন?’
‘প্রকৃতির একটা গোপন সত্য, কী জানি কেন, শুধু আমার চোখের সামনেই ফুটে উঠেছিল। আমি কাল থেকে আর থাকব না। তাই ভাবছি সেই সত্যের কথা একজন কাউকে অন্তত জানিয়ে দিয়ে যাই।’
‘সত্য মানে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘আপনারা ইংরিজিতে যাকে বলেন ফেনোমেনন— এমন একটা প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা যা সব দেশে, সব কালে সত্য। যেমন, সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে মেঘ হয়; মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরে; সেই জল আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। এটা একটা ফেনোমেনন।’
বৃষ্টির বেগ একটু ধরেছিল। কিন্তু আমাদের সামনের রাস্তাটায় ততক্ষণে জল জমে গিয়েছে। আনোয়ার শাহ রোডের দিকে তাকিয়ে দেখলাম কোনও গাড়িঘোড়া চলছে না। একটা অ্যাপ-ক্যাব বুক করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। এই অবস্থায় আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর উপায় নেই। তাই মোবাইল ফোনটা পকেটে পুরে বললাম, ‘বলো শুনি, তোমার কাছে কোন সত্য ধরা দিয়েছিল।’
বাবাই বলল, ‘দেখুন, আমি জন্ম-হরবোলা। সেই কোন ছোটোবেলা থেকেই আমি কোনও চর্চা ছাড়া যে-কোনও শব্দ গলায় তুলে নিতে পারতাম। তারপর আপনাকে তো বললামই, কীভাবে একটা সময়ে যে শব্দ মানুষের কানে ধরা দেয় না সেই শব্দগুলোকেও আমি নকল করতে সমর্থ হলাম। পিঁপড়ের শব্দ, পোকামাকড়ের শব্দ।
ষোলো বছর বয়সে আমি গাছেদের কথাবার্তা শুনতে পেলাম। কোনও চেষ্টা করতে হয়নি। এমনই একদিন বিহারের এক বনভূমির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনলাম মাটির নীচে শেকড় থেকে শেকড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে শীতকাল আসার বার্তা। কী করুণ সেই কম্পন কীভাবে বোঝাব আপনাকে জানি না। আমি মুখে আওয়াজ করছি। দেখুন তো কিছু শুনতে পান কি না।’
আমি দেখলাম বাবাই চোখদুটো বুজে ফেলল। কোনও শব্দ-টব্দ শুনতে পেলাম না, কিন্তু আমাদের সামনে ফুটপাথে যে অল্পবয়সি ছাতিম গাছটা ছিল, হঠাৎই ঝরঝর করে তার সমস্ত পাতা ঝরে পড়ল। বাবাই অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, ‘দেখলেন? গাছটা ভুল বুঝল। আপনি কিছু শুনতে পেলেন না, না?’
কথা বলতে পারলাম না। কোনওরকমে ঘাড় নাড়ালাম।
ও বলল, ‘যাক গে। এরপরেও আমি ভারতবর্ষের উত্তর থেকে দক্ষিণে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি। হরবোলার ডাক ডেকে দু’বেলা দু’মুঠো ডালভাত জুটিয়েছি আর ভেবেছি– এরপরে কী? অনুকরণের জন্য আর কি কোনও শব্দ বাকি আছে?
ঠিক এক বছর আগে একদিন রুদ্রপ্রয়াগের এক নির্জন তৃণভূমিতে বিশাল এক ওকগাছের নীচে বসে আছি। হঠাৎ অদ্ভূত গম্ভীর আর মধুর এক সুর শুনতে পেলাম। মনে হল সারা আকাশ জুড়ে এক বিশাল তারযন্ত্রের বাজনা বাজছে আর সেই তারের অনুরণনে আকাশে তারার মালাগুলোও কেঁপে কেঁপে উঠছে।
বুঝলাম এ-ই সেই মহাজাগতিক সংগীত, মহাকাশ জুড়ে জ্যোতিষ্কদের ছন্দবদ্ধ ঘূর্ণনে যে সুরের জন্ম হয়। যে সুরের কথা মানুষ অনুমান করেছে মাত্র, কিন্তু যে সুর কেউ শুনতে পায়নি। আমার কানে সেই সুর ধরা দিয়েছে।
আমি সেই সুরকে অনুকরণ করার চেষ্টা করলাম। একদিন… দু’দিন… পুরো একটা বছর রুদ্রপ্রয়াগের সেই নির্জন গ্রামে তীব্র ঠান্ডার মধ্যে ওই ওকগাছটার নীচে বসে আমি, বাবাই হরবোলা, সেই সুরকে গলায় তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। কেন পারলাম না জানেন?’
‘কেন?’
‘কারণ, আমার মনের মধ্যে একটা নীচতা, একটা ক্ষোভ, হিংসা সেই ছোটোবেলাতেই ঢুকে গেছে। ওই সুরকে ধরতে গেলে মনকে রুদ্রপ্রয়াগের রাতের আকাশের মতোই নির্মল হতে হয়। কিন্তু সেই নির্মলতা আমি কোথায় পাব? আমি তো নিজের মাকে খুন করেছি। এখনও প্রতিদিনই যে একবার না একবার আমার জন্মদাতা পিতার কামুক হিংস্র মুখটা আমার চোখে ভেসে ওঠে।
এই কথা বুঝতে পারামাত্রই আমি আর সময় নষ্ট না করে সমতলে নেমে এলাম। চলে এলাম এখানে, কলকাতায়। কারণ, মানুষের জীবনের শেষ যে নিঃশব্দ আহ্বান, সেই আহ্বান আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই শুনতে পেয়েছি। আমি, বাবাই হরবোলা, এবার সেই শব্দটাকে অনুকরণ করব। তারপর কী হবে আমি জানি না। আপনি কি সাক্ষী থাকবেন আমার সেই লাস্ট শো-এর? থাকতে চান? তা হলে চলুন আমার সঙ্গে।’
এই বলে ও আমার হাত ধরে টান দিল আর আমি সম্মোহিতের মতো ওর সঙ্গে যোধপুর পার্কের জল-জমা রাস্তায় নেমে এলাম। কেন নামলাম, কেন এই অপরিচিতের সঙ্গে হেঁটে গেলাম তা আজও বুঝতে পারি না। তবে গিয়েছিলাম বলেই এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম সেদিন।
***
একটার পর একটা সরু রাস্তা পার হয়ে আমরা একটা পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাবাই বলল, ‘এটাই আমার জন্মদাতা কুণাল দাসের বাড়ি। সকালবেলায় পাড়ার লোকের কাছে খোঁজ নিয়ে গেছি। ঠাম্মা মারা গেছেন অনেক বছর আগেই। ওঁর যে উপপত্নী, বনানী, সে-ও অনেকদিন আগেই চলে গেছে। এখন কুণালবাবু এই বাড়িতে একা থাকেন।’
বললাম, ‘তুমি কী যেন এক আহ্বানের কথা বলছিলে?’
বাবাই কলিং-বেলের স্যুইচে চাপ দিয়ে কেমন যেন বাঁকা হাসি হেসে বলল, ‘মৃত্যুর আহ্বান। হঠাৎই একদিন বুকের ভেতর থেকে নিঃশব্দে সেই ডাক উঠে আসে। কবে, কখন, কোথায় সেই ডাক আসবে আমরা কেউ জানি না। তবে জীবনে একবার না একবার সেই ডাক সকলেই শুনতে পায়।
শুনতে পায়, কিন্তু কেমন সেই ডাক বলে যেতে পারে না। সাধারণ মানুষ মৃত্যুর ডাক শুনে এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়ে যে, তারা আর কিছুই করে উঠতে পারে না। যাঁরা খুব স্থিতধী, তাঁরা সেই ডাক শোনার পরে অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি তো সাধারণ নই। আমি তো হরবোলা। তাই আমি সেই ডাকটাকে নকল করে ফেলেছি। এবার দেখুন কী হয়।’
কলিং বেলের শব্দে দোতলার বারান্দায় একজন দেখা দিলেন। অন্ধকার বারান্দা। শুধু একটা স্ট্রিট-ল্যাম্পের সামান্য আলো সেখানে গিয়ে পড়েছে। সেই আলোয় দেখলাম, একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক, রুগ্ণ চেহারা, পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা, একটু ঝুঁকে মুখ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কে? কী চাই?’
‘আমি বাবাই। আপনার ছেলে। মনে আছে আমাকে?’
ভদ্রলোক যেন একটা জোরালো শক খেয়ে ছিটকে সোজা হয়ে গেলেন। অন্ধের মতো দুটো হাত সামনে বাড়িয়ে বারান্দার রেলিং ধরে কয়েক পা হেঁটে গেলেন। তারপর বাঁ-হাতটা বাড়িয়ে রেলিং খামচে ধরে বললেন, ‘কে? কে ডাকছে? না। এখনই কেন? এত তাড়াতাড়ি কেন যাব?’
বাবাই আমার দিকে ফিরে হাসল। জয়ের হাসি। বলল, ‘শুনতে পেয়েছে। মৃত্যুর ডাক শুনতে পেয়েছে। ওটা কিন্তু সত্যি নয়। আমার হরবোলার খেলা। দেখতে থাকুন। আমি আবার ডাকছি।’
দু’হাতের চেটো দিয়ে প্রাণপণে আমার নিজের দুটো কান চেপে ধরলাম। এই বাবাই হরবোলা? এ তো দেখছি সাক্ষাৎ শয়তানের অনুচর! কোনওক্রমে ওর ওই ডাক যদি আমার কানে ঢুকে যায়? তা হলে তো আমাকেও মরতে হবে!
আমি কী করছি বাবাই তা খেয়াল করেনি। ও নিজের দুটো হাতের চেটো চোঙার মতো মুখের সামনে ধরে ওপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন চিৎকার করছে, অথচ কোনও শব্দ পাচ্ছিলাম না। দোতলার বারান্দায় কুণাল দাস তখনও ছটফট করছিলেন। অন্ধের মতো বুকে হাত দিয়ে ঘুরছিলেন। ঘুরতে ঘুরতেই একসময় তিনি বিপজ্জনকভাবে রেলিং ডিঙিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়লেন।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘কী করছেন? পিছিয়ে যান! পিছিয়ে যান!’
হয়তো আমার কথা তাঁর কানে গিয়েছিল, তাই দু’পা পেছোনোর চেষ্টা করলেন বলেও মনে হল। কিন্তু বাবাই ততক্ষণে আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে বাড়িটার দিকে। শ্রবণাতীত তরঙ্গ উৎক্ষেপণের অমানুষিক পরিশ্রমে এই ঠান্ডার মধ্যেও ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে। হাতদুটো মুখের সামনে জড়ো করা, চোখদুটো বিস্ফারিত। ও মৃত্যুর আহ্বান পাঠাচ্ছে।
পরমুহূর্তেই কুণাল দাস দোতলার বারান্দা থেকে আমাদের সামনে আছড়ে পড়লেন। তাঁর রোগা শরীরটা দু’-চারবার কাটা পাঁঠার মতো ধড়ফড় করে স্থির হয়ে গেল।
ঠিক পাশের বাড়িটা থেকে এক মহিলার গলা ভেসে এল। ‘কীসের আওয়াজ রে? পিন্টু, একবার বেরিয়ে দেখ তো!’
একটা আলোও জ্বলে উঠল কোথাও। বাবাই আমার হাতে টান দিয়ে বলল, ‘চলে আসুন। কাজ শেষ।’
আমরা প্রায় দৌড়োতে দৌড়োতেই আনোয়ার শাহ রোডে এসে উঠলাম। আমি বললাম, ‘এরপর?’
‘এরপর আমার পালা। তবে আমার দুঃখ নেই। এই অভিশপ্ত জীবন টেনে নিয়ে বেড়ানোর আর কোনও মানে হয় না। কীভাবে যাব জানি না। তবে যেতে আমাকে হবেই।’
‘কেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ও বলল, ‘ভুলে গেলেন? মৃত্যুর ডাক তো আমিই আগে শুনেছিলাম। শুনেছিলাম বলেই তো নকল করতে পেরেছিলাম। এখন বুকের মধ্যে ক্রমশ সেই ডাক জোরালো হয়ে উঠছে। কী জানি, কোন আশ্চর্য হরবোলা কোট কোটি বছর ধরে প্রতিটি প্রাণীর কাছে এই ডাক পাঠিয়ে চলেছেন।’
কৌস্তভ দাস, অর্থাৎ বাবাই হরবোলার সঙ্গে সেই আমার শেষ কথা।
একটু বাদেই টালিগঞ্জের দিক থেকে বৃষ্টিভেজা ফাঁকা রাস্তা ধরে একটা সরকারি বাস তীব্রবেগে ছুটে এল। আমি কিছু বুঝতে পারার আগেই বাবাই অন্যমনস্কভাবে আমার পাশ থেকে দু’পা রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। বাসটাও সামান্য স্কিড করে ফুটপাথের দিকে এগিয়ে এল— ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকুই।
বাবাই হরবোলার লাস্ট শো-এর ওপর এইভাবেই যবনিকা পড়ল।

ডার্ক ফ্যান্টাসি কি জিনিস বুঝতে চাইছিলাম । মনে হয় কিছুটা পেরেছি ।