বিষদৃষ্টি
এ. জি. বেঙ্গলের বড়োবাবু জয়দেব সরকার মানুষটি অনেক দিক দিয়েই যে সাধারণ তাতে সন্দেহ নেই। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স, ছিপছিপে চেহারা। একদিন অন্তর গোঁফদাড়ি কামান। মাঝারি দামের প্যান্ট-শার্ট পরেন। রেডিমেড নয়, পাড়ার শম্ভুদরজির বানানো।
পাড়া বলতে শেয়ালদা ফ্লাইওভারের পশ্চিমদিকে সার্পেন্টাইন লেন, ফর্ডাইস লেন নিয়ে ওই ছোট্ট এলাকাটা। সার্পেন্টাইন লেনে তাঁর দাদুর বানানো বাড়ি। স্ত্রী কাবেরী আর মেয়ে শাঁওলিকে নিয়ে সেই বাড়িতেই জয়দেবের ছোট্ট সংসার। শাঁওলি প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে পড়ে। কাবেরী বিনোদিনী গার্লস স্কুলে ইংরিজির টিচার।
কিন্তু এটাই যদি তাঁর পুরো পরিচয় হত, তা হলে তাঁকে নিয়ে গল্প হত না। এটা তার পুরো পরিচয় নয়। জয়দেব সরকারের নেশা হচ্ছে গ্রুপ থিয়েটার। তাঁর নিজের হাতে তৈরি একটি নাট্যদল রয়েছে, নাম ধানসিঁড়ি। তিনি নাটক লেখেন, সেই নাটক নিজেই পরিচালনা করেন। খুবই কষ্টেসৃষ্টে বছরে একটি করে নাটক নামান। কাবেরী যদি স্কুলে পড়ানোর চাকরিটা না করত তা হলে বোধহয় ওটুকুও পেরে উঠতেন না।
আচ্ছা, তা হলে বোঝা গেল জয়দেব সরকার নামে রুচিশীল মধ্যবয়সি মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোকটি সরকারি চাকরির পাশাপাশি একটি নাটকের দল চালান। কিন্তু তাতেই বা কী এসে গেল? এরকম তো কত মানুষই আছেন। এর মধ্যে গল্প কোথায়?
মজাটা এইখানেই। পাঁচ বছর আগে অবধি জয়দেব সরকার নিজেও জানতেন না যে, ওই নাটক করতে করতেই তিনি একটা আশ্চর্য ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছেন। সেটা আর কিছুই নয়, খুঁটিয়ে সবকিছু দেখার ক্ষমতা। অসংগতি ধরে ফেলার ক্ষমতা। এবং সর্বোপরি খুব জোরালো কল্পনাশক্তি দিয়ে সেই অসংগতির কারণগুলো বোঝার ক্ষমতা। তিনি নিজে বলেন, নাটকের মঞ্চসজ্জা করতে গিয়েই তাঁর এই ক্ষমতাটা তৈরি হয়েছে।
নাটকের মঞ্চে বাহুলোর কোনও জায়গা নেই। সেই যে আন্তন চেখভ একবার বলেছিলেন না, ‘থিয়েটারের প্রথম দৃশ্যে যদি দেওয়ালে একটা বন্দুক ঝুলিয়ে রাখো, তা হলে পরের কোনও দৃশ্যে অবশ্যই সেটি ফায়ার কোরো। নাহলে রেখো না, জয়দেব সরকার একসময় বুঝতে পারলেন, নাটকের মঞ্চের এই কৃপণতা আমাদের সংসারের মঞ্চের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। ঘরে এবং বাইরে প্রতিটি জিনিসই বাসিন্দাদের জীবনের ছাপ ধরে রাখে।
জয়দেববাবু সেই ছাপগুলো দেখতে পান।
দেখতে যে পান, সেটা তিনি এবং কল্যাণ বোস একইসঙ্গে বুঝতে পেরেছিলেন। লেবুতলা থানার ও. সি. কল্যাণ বোস।
বছর পাঁচেক আগের ঘটনা। হয়েছিল কী, ওই সার্পেন্টাইন লেনেই নিজের বাড়ির থেকে একটু দূরে জয়দেব সরকার নাটকের রিহার্সালের জন্য একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। বাড়িটা ছিল অদ্ভুত। নীচে একটা ঘর, যেটা তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন। তার মাথায় আর-একটা ঘর। আর দোতলার সেই ঘরের সঙ্গে রাস্তার দিকে একফালি বারান্দা- ব্যস। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ছিল বাড়ির বাইরে দিয়ে।
ওই দোতলার ঘরটাতেই এক দম্পতি খুন হয়েছিল। বন্ধ ঘরে খুনের রহস্য নিয়ে থানার ওসি কল্যাণ বোস হিমশিম খাচ্ছিলেন। জয়দেব সরকারকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন রুটিন কিছু প্রশ্ন করার জন্য; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল, জয়দেব বসু এদিক-ওদিক তাকিয়ে তাঁকে বলে দিয়েছিলেন খুনি কে এবং সে কীভাবে খুন করার পর ওই বন্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছে।
তারপর থেকে কল্যাণ বোস আর তাঁকে ছাড়েননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণ আর জয়দেবের বন্ধুত্ব গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে। যদিও দু’জনে দু’জনকে আপনি-আজ্ঞে করেই কথা বলেন। জয়দেব বয়সে সামান্য বড়ো হওয়ায় কল্যাণ বোস তাঁকে ‘জয়দেবদা’ বলে ডাকেন, জয়দেব কল্যাণ বোসকে ‘বোসসাহেব’; কোনও কেসে ঠেকে গেলে যেমন কল্যাণবাবু জয়দেব সরকারকে সঙ্গে নিয়ে যান, তেমনই জয়দেব সরকারও সময়-সুযোগ পেলে কল্যাণ বোসকে নিয়ে যান নাটক দেখতে।
যা-ই হোক, মোদ্দা ব্যাপার হল, সার্পেন্টাইন লেনের জয়দেব সরকার, মধ্যবিত্ত, নাট্যকর্মী জয়দেব সরকার, অন্য অনেক দিক থেকে খুব সাধারণ একজন মানুষ হলেও কোনও ক্রাইম সিনে গিয়ে দাঁড়ালে তাঁর অন্য একটা রূপ দেখা যায়। সেখানে তাঁর বুদ্ধি খাপখোলা তরোয়ালের মতন ঝিলিক দিয়ে ওঠে। তাঁকে নিয়েই এই গল্প।
***
গত মাসের নয় তারিখে কল্যাণ বোস জয়দেবকে যেখানে নিয়ে গেলেন, সেটা অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে কোনও ক্রাইম সিন ছিল না।
দিনটা ছিল রোববার। ইদানীং কল্যাণ বোস রোববারে মাঝেমধ্যে ছুটি নেওয়ার বিলাসিতা দেখাতে পারছেন, কারণ, থানার সেকেন্ড অফিসার হিসেবে যে ছেলেটিকে পেয়েছেন, অরিন্দম মিত্র, সে একটি জুয়েল। পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান পুলিশ অফিসার। সেদিন তার হাতেই থানার দায়িত্ব দিয়ে, কল্যাণ বোস জয়দেব সরকারকে নিয়ে সোনারপুরের দিকে একটা বাগানবাড়িতে মাছ ধরতে যাবেন, এমনই ছিল প্ল্যান। সেইমতন জয়দেব সরকার বেলা বারোটার মধ্যে স্নান-খাওয়া সেরে, জামাকাপড় পরে রেডি হয়ে বসেছিলেন। কল্যাণ বোস তাঁর নিজের গাড়ি নিয়ে সোয়া বারোটায় তাঁর বাড়িতে পৌঁছেও গেলেন। কিন্তু তারপর যেটা বললেন, সেটার জন্য জয়দেব সরকার প্রস্তুত ছিলেন না।
কল্যাণবাবু বললেন, ‘জয়দেবদা! যাওয়ার পথে একবার একটা জায়গায় জাস্ট মুখটা দেখিয়ে যাব। কথা দিচ্ছি, দশ মিনিটের বেশি ওখানে থাকব না। থাকার দরকারও পড়বে না। অরিন্দম অলরেডি পৌঁছে গেছে, যা করার ও-ই করবে। আমি শুধু দু’-একটা পেপারে সই করে দিয়ে বেরিয়ে আসব।’
কল্যাণ বোসের পাশে বসে সিটবেল্ট আঁটতে আঁটতে জয়দেব সরকার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেসটা কী?’
কল্যাণ বোস উত্তর দিলেন, ‘বি. বি. গাঙ্গুলি স্ট্রিটের ওপরে একটা স্কিনকেয়ার ক্লিনিক আছে, নাম সুরূপা। পটলার তেলেভাজার দোকানটা চেনেন তো? ওই বাড়িতেই, সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায়। বাইরে সাইনবোর্ড-টোর্ড নেই, শুধু দরজার ওপরে… কী সারাক্ষণ বাচ্চাদের মতন গুগল সার্চ করেন বলুন তো? ফোনটা রাখুন।’
জয়দেববাবু লজ্জিতমুখে সেলফোনটা নামিয়ে রাখলেন। সত্যিই তিনি ‘সুরূপা’ নামটা দিয়ে নেট সার্চ করতে শুরু করেছিলেন।
কল্যাণ বোস বললেন, ‘নেটে সুরূপাকে খুঁজে পাবেন না। আমি চেষ্টা করে দেখেছি। কেন পাবেন না তা বলতে পারব না। তবে একটা কারণ হতে পারে, ডক্টর দিব্যেন্দু ব্যানার্জি, যিনি ক্লিনিকটা চালান, ইয়ে… চালাতেন বলাই ভালো, তাঁর বয়স হয়েছিল ষাট। পুরোনো আমলের লোক। নিজে টেক স্যাভি ছিলেন না বলেই হয়তো…’
‘ওটা কোনও ফ্যাক্টর নয়,’ বললেন জয়দেববাবু। ‘কর্মচারীদের বললে করে দিত।’
একটা সরু গলি দিয়ে গাড়িটাকে খুব সাবধানে বড়োরাস্তায় উঠিয়ে কল্যাণ বোস বললেন, ‘কর্মচারী বলতে একটি কমবয়সি মেয়ে আর একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। মেয়েটি কমবয়সি হলেও প্রায় নিরক্ষর; ঘরদোর পরিষ্কারের কাজ করে। তাছাড়া চেম্বারে মহিলা পেশেন্টকে এক্সামিন করতে গেলে নিয়ম মেনে আর-একজন মহিলাকে সেখানে থাকতে হয় তো; সেই কাজেও লাগত মেয়েটি।
আর অন্যজন, মানে ওই বয়স্ক ভদ্রলোক, তিনি স্মার্টফোনই ব্যবহার করতে জানেন না, তো কম্পিউটার! ওঁর কাজ ছিল খাতা লেখা, বাজার থেকে ওষুধ-টষুধ কিনে নিয়ে আসা এইসব। কাজেই বুঝতেই পারছেন, এদের দিয়ে প্রোফাইল বানানোর কাজ হবে না। হ্যাঁ, কোনও এজেন্সিকে দিয়ে করাতেই পারতেন। কেন করাননি জানি না।’
‘এত সব জানলেন কেমন করে?’
‘অরিন্দম একটু আগে ফোন করেছিল তো। ছোকরা গুছিয়ে কাজ করে।’
তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ডক্টর ব্যানার্জি কাল রাতে ওই ক্লিনিকের ভেতরেই মারা গিয়েছেন। একাই ছিলেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ওই যে পুরুষ কর্মচারীটির কথা বলছি, তিনিই সকালে কলিং-বেল বাজিয়ে সাড়া না পেয়ে থানায় খবর দেন। অরিন্দম ফোনে বলল, মনে হচ্ছে অ্যানাদার কেস অফ সাডেন হার্ট অ্যাটাক। সিম্পল। সেইজন্যই বলছি, সময় লাগবে না।’
আর কিছু বলার আগেই ওঁরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলেন। বউবাজার স্ট্রিটের বাড়ি যেরকম হয়, সেরকমই একটা বহু পুরোনো দোতলা বাড়ি। একতলায় দুটো ফার্নিচারের শোরুম। শোরুমদুটোর পাশে একফালি একটা ঘরে পটলার তেলেভাজার দোকান। ওই দোকানটার পাশ দিয়েই দোতলার সিঁড়ি উঠে গেছে।
বাড়িটার সামনে লেবুতলা থানার কালো ভ্যান দাঁড়িয়েছিল। ছিল একটা অ্যাম্বুলেন্সও। আর ছিল চিরকালীন সেই আমোদগেঁড়ে জনতা— যে-কোনও দুর্ঘটনাস্থলেই আমের গন্ধে মাছির মতো যারা এসে জমা হয়ে যায়।
কল্যাণ বোসের পুলিশের বোর্ড লাগানো গাড়িটা এসে দাঁড়াতেই ভিড়টা দুভাগ হয়ে ওদের যাওয়ার জায়গা করে দিল। কল্যাণ বোস গাড়িতে চাবি দিয়ে জয়দেববাবুকে ডাকলেন, ‘আসুন, দাদা।’
***
সাব ইনস্পেক্টর অরিন্দম মিত্র সিঁড়ির মুখ থেকেই ওঁদের দু’জনকে রিসিভ করল। লেবুতলা থানায় যাতায়াত আছে বলে জয়দেববাবু ওকে আগে থেকেই চিনতেন। ও-ও চিনত জয়দেববাবুকে।
প্রায় আট ফুট উঁচু দরজার ভারী কাঠের পাল্লা ঠেলে ওরা দু’জনে অরিন্দমের সঙ্গে ঘরের ভেতরে পা দিলেন। পাল্লাদুটোর মাঝখান বরাবর কাঠের চোকলা উঠে গেছে। একটা চৌকো প্যানেল ভেঙে ঢুকে গেছে ভেতরের দিকে। ঘরের মেঝেয় পড়েছিল মোটা কাঠের খিল, সেটাও ভেঙে দু টুকরো।
কল্যাণ বোস সেগুলো দেখে স্বগতোক্তি করলেন, ‘তোমাদের খাটুনি গেছে, অরিন্দম।’
অরিন্দম হাসল। আর বলবেন না, স্যার! শুধু শোল্ডার চার্জ করে ভাঙতে পারিনি। নীচের দোকান থেকে শাবল আনতে হয়েছিল।’
দালানের গায়ের ওই একমাত্র দরজাটি পেরিয়ে ওঁরা যেখানে ঢুকলেন সেটাকে একটা থ্রি-রুম ফ্ল্যাট বলা যায়, যদিও আশি বছর আগে ফ্ল্যাটের ধারণা ছিল না। সেভাবে বানানোও হয়নি। একতলার মতনই দোতলাতেও পাশাপাশি তিনটে ঘর— শুধু এখানে ওগুলো সেপারেটেড নয়। একটার সঙ্গে আর-একটা কানেক্টেড। তিনটে ঘরেই যত জানালা, সব ভেতর থেকে ঠেসে ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করা ছিল। অরিন্দম বলল, ‘ওরা ঘরে ঢুকে এইরকম বন্ধই দেখেছে। ফ্ল্যাট থেকে ঢোকা বা বেরোনোর দ্বিতীয় কোনও দরজা নেই, বারান্দাও না।’
দরজার মুখোমুখি একটা বড়ো টেবিলে স্তূপ করে রাখা ছিল নানান মাপের রেজিস্টার, রাইটিং প্যাড, সস্তার ডটপেন এবং একটা টেলিফোন। আর ছিল সুরূপা নামক সংস্থাটির কিছু লিফলেট। চকচকে কাগজে রঙিন কালি আর ছবিতে সাজানো, যাতে বলা ছিল এই সংস্থায় গ্রাহকেরা কী কী পরিষেবা পেতে পারেন এবং তার অর্থমূল্য কত হতে পারে। একটা লিফলেট তুলে নিলেন জয়দেব সরকার। কল্যাণ বোসকে প্রশ্ন করলেন, ‘এটা রাখতে পারি?’
‘হ্যাঁ, রাখুন না। অনেকগুলোই রয়েছে তো,’ বললেন কল্যাণ বোস।
পাশের ঘরটিতে গিয়ে ঢুকলেন ওঁরা। জয়দেব আর কল্যাণের সঙ্গে ছিল অরিন্দম মিত্র এবং আরও দু’জন ব্যক্তি। তাদের মধ্যে একজন এই বাড়ির মালিক, গোপাল চন্দ্র বসাক। তিনি দুটো বাড়ি পরেই থাকেন। দরজা ভাঙার আগেই অরিন্দম তাঁকে ডাকিয়ে এনেছিল। এসব কাজে সাক্ষী রাখতে হয় এবং সেই সাক্ষী যদি বাড়ির মালিক স্বয়ং হন, তার চেয়ে ভালো কিছু হয় না।
দ্বিতীয়জনের নাম গোপীনাথ মণ্ডল। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। এক- একজন মানুষ থাকেন না, দেখলে মনে হয় এককালে সুপুরুষ ছিলেন কিন্তু অভাবের তাপে সেই রূপ জ্বলে গিয়েছে? এঁর চেহারাটাও ঠিক সেরকম। ভদ্রলোক যথেষ্ট লম্বা কিন্তু রোগা এবং কোলকুঁজো। গায়ের রং ফরসাই বলতে হবে কিন্তু তার সঙ্গে যেন রক্তহীনতার ফ্যাকাশে ভাব মিশে আছে। চুল উঠে কপাল চওড়া হয়ে যাওয়ার ফলে এবং অকালেই গাল কিছুটা তুবড়ে যাওয়ার ফলে তীক্ষ্ণ নাক এবং বড়ো বড়ো চোখগুলো যেন প্রকট হয়ে জেগে আছে।
জানা গেল, গোপীনাথবাবুই হচ্ছেন সুরূপা ক্লিনিকের সেই পুরুষ কর্মচারী। ওকে খবর দিয়ে আনাতে হয়নি। প্রতিদিনের মতো সকাল সাড়ে ন’টায় তিনি ডিউটিতে চলে এসেছিলেন। ডক্টর ব্যানার্জি এই ফ্ল্যাটেই বাস করতেন। রাতে ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে খিল দিয়ে বন্ধ করে রাখলেও, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ খিল খুলে দিয়ে পাল্লাদুটো শুধু ভেজিয়ে রাখতেন। গোপীনাথ আসবেন বলেই তিনি এরকম করতেন।
সেদিন কিন্তু গোপীনাথ মণ্ডল দরজা ঠেলার পরেও দরজা খুলল না। এরপর যা হয়। প্রথমে কলিং-বেল। তারপর আস্তে টোকা। তারপর দুমদাম দরজায় ধাক্কা। এই সবকিছুই বিফলে যাওয়ার পরে গোপীনাথ দৌড়ে নীচে নামেন। নীচের শোরুমের ম্যানেজার লেবুতলা থানায় ফোন করেন।
জয়দেব সরকার একবার চট করে গোপীনাথবাবুর জামা, জুতো, রিস্টওয়াচ মোবাইল ইত্যাদির ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। সবই কমদামি। তার মানে, ডক্টর দিব্যেন্দু ব্যানার্জি তাঁর কর্মচারীদের ভালো মাইনেকড়ি দিতেন না, মনে মনে ভাবলেন জয়দেব।
মাঝের ঘরটিও আয়তনে বেশ বড়ো। কোনও কসমেটিক সার্জনের কাজের জায়গার সঙ্গে ইতোপূর্বে জয়দেব সরকার কিংবা কল্যাণ বোসের পরিচয় ছিল না। তাদের চোখে ঘরটাকে অনেকটা ডেন্টিস্টের চেম্বারের মতো লাগল। সেইরকমই রিক্লাইনিং চেয়ার, জোরালো পেডেস্টাল — লাইট। একদিকে স্টিলের টেবিলের ওপরে উজ্জ্বল স্টেইনলেস স্টিলের ডিক্যান্টার যার মধ্যে বাষ্পের তাপে সার্জারির অস্ত্রশস্ত্র শোধন করা যায়। তবে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা হসপিটাল বেডটা সব ডেন্টিস্টের চেম্বারে থাকে না। আর থাকে না অর্ধেক দেওয়াল জুড়ে অমন বিশাল এবং আলোকিত এক আয়না।
এই ঘরেও কোনও কম্পিউটার ছিল না।
জয়দেব সরকারের মাথার মধ্যে একটা অ্যালার্ম বেল বাজতে শুরু করেছিল। তাঁর মন বলছিল, মঞ্চসজ্জা ঠিক নেই হে। গরমিল… অনেক গরমিল। দু’হাজার চব্বিশ সালে একজন ডাক্তারের চেম্বারে কম্পিউটার নেই কেন? ইন্টারনেটে তাঁর ক্লিনিকের অস্তিত্ব নেই কেন? তিনি নিজে বিজ্ঞাপন না-ই করুন, কোনও পেশেন্ট সুরূপার নাম দিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা কোথাও শেয়ার করেননি? ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে?
হাতে ধরে থাকা লিফলেটটা আর-একবার উলটে-পালটে দেখলেন। ডাক্তারবাবুর নামের পাশে কোনও ডিগ্রির উল্লেখ নেই। আর কোথাও তাঁর চেম্বার ছিল না? তিনি যদি একজন সার্জনই হবেন, তা হলে দ্বিতীয় কোনও হসপিটালের সঙ্গে অ্যাটাচ্ড থাকবেন না? এরকম একটা ছোটো ক্লিনিকে কটা প্রসিডিওরই বা ঠিকঠাকভাবে নামানো যায়। সেরকম ইনস্ট্রুমেন্ট কই?
খুব বেশি কিছু যে করা যায় না, সেটা হাতের ওই লিফলেট থেকেই পরিষ্কার। ইলেক্ট্রো-কটারাইজেশন সার্জারি বলে একটা প্রসিডিওরের উল্লেখ আছে। আঁচিল, স্কিন ট্যাগ ইত্যাদি রিমুভ করার কাজে লাগে সম্ভবত। লাইপোসাকশনও হত নিশ্চয়ই একসময়। এখন ইংরিজি অক্ষরগুলোকে মোটা মার্কার-পেনের পৌঁচ দিয়ে ঢাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু কালির দাগের ভেতর দিয়েও পড়া যাচ্ছে ‘লাইপোসাকশন’ কথাটা। আর রয়েছে অনুজ্জ্বল চুলকে উজ্জ্বল করা; কপাল, গাল, গলা ইত্যাদি জায়গা থেকে বলিরেখার অপসারণের কথা।
কল্যাণ বোস একবার অরিন্দমের মুখের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালেন। প্রশ্নটা পরিষ্কার। ডাক্তারের বড়ি কোথায়? অরিন্দম বলল, ‘পাশের ঘরে, স্যার। ওটাই শেষ ঘর— ওঁর লিভিং স্পেস। আসুন।’
এখানেও দুটো ঘরের মাঝে একটা দরজা। সেই দরজা ঠেলে শেষ ঘরটায় ঢোকার আগে কল্যাণ বোস বাড়িওলা বসাকবাবু আর গোপীনাথকে বললেন, ‘আপনারা আসবেন না। ওখানেই দাঁড়ান।’
ওঁরা আসবার জন্য পা বাড়িয়েছিলেন। হুকুম শুনে পেছিয়ে গেলেন। পাশের ঘরটা জয়দেবের কাছে খুব ইন্টারেস্টিং লাগল। জটিল মঞ্চসজ্জা। ঘরটা সরু হলেও লম্বা অনেকখানি। সামনের দিকটায়, মানে সিঁড়ির দিকটায় একটা কুইন-সাইজ খাট। মোটা গদি, দামি বেডকাভার আর পিলোকাভার দিয়ে সাজানো। দেখলেই বোঝা যায় ঘরের মালিক আগের রাতে ওই বিছানায় শোননি।
খাটের গায়েই দুই আসনের ডিনার-টেবিল। সে-ও বেশ দামি কাঠের। উপরন্তু ক্রকারি, নুনদানি, মরিচদানি এবং ছুরি-কাঁটা যেটুকু ওই টেবিলে নামানো ছিল, সবই বেশ দামি।
ডক্টর ব্যানার্জি রাতের ডিনারটা যে করেছিলেন সেটা বোঝা যাচ্ছে পাশের সিংকের দিকে তাকালে। সেখানে এঁটো থালাবাসন নামানো ছিল। জয়দেব সরকার একবার উঁকি মেরে এট বাসনগুলো দেখলেন। পরিচ্ছন্ন করে মাংস চুষে নিলে যেরকম সাদা হাড় পড়ে থাকে সেরকম কয়েকটি হাড় ছাড়া ভুক্তাবশিষ্ট বলে আর কিছুই দেখতে পেলেন না। ডাক্তারবাবু কাল রাতের খাওয়াটা তৃপ্তি করেই খেয়েছিলেন।
টেবিলের পাশে একটা একশো পঁয়ষট্টি পিটারের ফ্রিজ ছিল। বেশ পুরোনো ডিজাইন। ফ্রিজের মাথায় কয়েকটা বাহারি জার। সেগুলোর মধ্যে অ্যামন্ডস, ক্র্যানবেরি, কাজু ইত্যাদি রাখা ছিল।
আর ছিল একটা শোকেস। তার মাথায় একটা ছোটো টিভি। ভেতরে কিছু গল্প-কবিতার বই আর বেড়াতে গেলে মানুষ যেরকম স্যুভেনির কিনে আনে সেরকম কিছু স্যুভেনির।
বিছানা, খাবার টেবিল, টিভি, ফ্রিজ আর শোকেস – এই ক’টি আসবাব দিয়েই ডক্টর ব্যানার্জির জাগতিক প্রয়োজন মিটে গিয়েছিল বলে মনে হয়। কারণ, যাকে ঘরোয়া আসবাব বলে, সেরকম আর কিছুই ছিল না ঘরটার মধ্যে। দেওয়াল জুড়ে একটা বিশাল কাঠের ওয়ারড্রোব ছিল। জামাকাপড় তো তার মধ্যে আছে নিশ্চয়ই, তাছাড়া আর কী রয়েছে সেটা অরিন্দম পরে দেখবে।
ঘরের জিনিস কিন্তু এইটুকুতেই শেষ হয়নি। এরপরেই ছিল সেই জায়গাটা, যার জন্য জয়দেব সরকারের কাছে এই ঘরটাকে ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল। সেটা হচ্ছে একটা ছোটো ল্যাবরেটরি।
হ্যাঁ। খাবার টেবিল এবং শোকেস রাখার পরে প্রায় পনেরো ফুট লম্বা ঘরটার বাকি অর্ধেক জুড়ে ছিল একটা ল্যাবরেটরি।
ওটা যে ল্যাবরেটরি তা কেমন করে বোঝা গেল?
কেমন করে আবার! ল্যাবরেটরিকে ল্যাবরেটরি বলে চিনিয়ে দিতে হয় নাকি কাউকে? সেই টানা লম্বা কাঠের টেবিল। তার মাঝখানে সিংক। জলের কল। একটা বুনসেন বার্নার। কয়েকটা কাচের বকযন্ত্র, বেলজার, সাধারণ জার, মাইক্রোস্কোপ। একদিকে কাঠের ট্রে-র ওপরে অসংখ্য কাচের স্লাইড। শুধু ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারের জন্যই একটা ছোটো রেফ্রিজারেটরও রাখা ছিল ওইদিকের কোণটায়।
আর ওখানে, ওই ল্যাবরেটরির বেঞ্চের সামনেই মেঝের ওপরে চিৎ হয়ে পড়েছিল ডক্টর দিব্যেন্দু ব্যানার্জির মৃতদেহ।
***
মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে জয়দেব সরকার লক্ষ করলেন যে, মৃত্যুর সময় ডক্টর ব্যানার্জি ঘরের পোশাক পরে ছিলেন। পাজামা আর পাঞ্জাবি। কিন্তু তার ওপরে তিনি চড়িয়েছিলেন একটা হাঁটু অবধি ঝুলের ল্যাবরেটরি অ্যাপ্রন। একইভাবে তাঁর হাতে ছিল রাবার-গ্লাভ্স।
কল্যাণ বোস মৃতদেহের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে খুব খুঁটিয়ে সবকিছু দেখছিলেন। এবার ওই অবস্থাতেই অরিন্দমের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি তো আগেই একবার সবকিছু দেখে গেছ। কীভাবে মারা গেছেন, কিছু বুঝছ?’
অরিন্দম বলল, ‘স্যার, আইদার অ্যাকসিডেন্ট অর আত্মহত্যা।’
‘কেন কেন কেন? অত বড়ো বড়ো জিনিস ভাবছ কেন? কোথাও কোনও ইনজুরি নেই তো। আমার তো মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক। দেখো না, হাতের আঙুলগুলো নীল হয়ে আছে।’
অরিন্দম কুণ্ঠিতভাবে বলল ‘স্যার, আসলে এই গোপীনাথবাবু আমাকে যেটা দেখালেন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওই যে সিরিঞ্জ আর একটা ছোটো শিশি টেবিলের ওপরে পড়ে আছে…’
কল্যাণ বোস উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘কই? কোথায় সিরিঞ্জ? ও হ্যাঁ। তাতেই বা কী হল? ওই শিশিতে কি বিষ রয়েছে? গোপীনাথবাবু? বিষ নাকি ওটা?’
গোপীনাথ মণ্ডল আমতা আমতা করে বললেন, ‘স্যার, সেটা তো নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে এখানে উনি একধরনের বিষ নিয়েই যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন সেটা জানি।’
তারপর? ওই সিরিঞ্জ দিয়ে সেই বিষ নিজের শরীরে ইনজেক্ট করেছেন— এটাই বলতে চাইছেন? বেশি বোঝেন আপনি?’
মহা উত্তেজিত হয়ে কল্যাণ বোস আবার ডেডবডির পাশে নিলডাউন হলেন। মৃতদেহের দুটো হাত খুব খুঁটিয়ে দেখে বললেন, ‘কোথায়? নিডলের পাংচার-মার্ক কোথায়। সূচ বিঁধলে একটা দাগ থাকবে তো।’
গোপীনাথবাবু বললেন, ‘আছে, স্যার। ডানচোখের নীচটা দেখুন।’
গোপীনাথ মণ্ডলের এই কথাটা জয়দেববাবুকেও ভীষণ অবাক করল। এতক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনিও হাঁটু মুড়ে মৃতদেহের পাশে বসে পড়লেন এবং তাঁরা দু’জনেই দেখলেন, গোপীনাথ ভুল বলেননি। সত্যিই মৃতের ডানচোখের নীচে একটা রক্তব্রণের মতন দাগ দেখা যাচ্ছে, যেটা নিডল-বাম্প হতেই পারে। কিন্তু এরকম জায়গায় কেউ সূচ ফোটায় নাকি! সেটাই তিনি গোপীনাথবাবুকে বললেন।
গোপীনাথবাবু বললেন, ‘স্যার, একটু পাশের ঘরে চলুন দয়া করে। আমার যা মনে হচ্ছে বলছি। এখানে ডাক্তারবাবুকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে আমার শরীরটা কেমন আনচান করছে, গা-টা গোলাচ্ছে।’ গোপীনাথবাবুর মুখটা সত্যিই ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। হাত-টাত কাঁপতে শুরু করেছিল।
কল্যাণ বোস তা দেখে বললেন, ‘কোয়াইট ন্যাচারাল। চলুন, চলুন, পাশের ঘরেই চলুন। এই অরিন্দম! তুমি ভাই ফরেনসিককে একবার ডেকে নাও। এইসব সিরিঞ্জ, বিষ-টিষ সব ওরা পরীক্ষা করে দেখুক। আমি তো ভাবছিলাম নর্মাল হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু এখন তো অন্য সব অ্যাঙ্গেল চলে আসছে দেখছি।’
‘ওকে, স্যার।’ অরিন্দম মিত্র উর্দির পকেট থেকে মোবাইলটা বার করল। কল্যাণ বোস আবার ফিরে গেলেন প্রথম ঘরটায়। সেখান থেকে আর সবাইকে সরিয়ে দিয়ে গোপীনাথ মণ্ডলকে পাখার নীচে একটা চেয়ারে বসালেন। হাতে একটা জলের বোতল ধরিয়ে দিলেন। তারপর মুখোমুখি দুটো চেয়ারে তিনি আর জয়দেববাবু বসে বললেন, ‘বলুন। ধীরে-সুস্থে বলুন।’
গোপীনাথবাবু এক চুমুকে অনেকটা জল পান করে হাতের চেটোয় মুখটা মুছে নিলেন। ইতোমধ্যে অরিন্দমও এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসেছিল ওখানে। কোলের ওপরে খোলা নোটপ্যাড। গোপীনাথ যা বলবেন তার নোট নেবে।
একটু থেমে থেমে থেমে গোপীনাথ মণ্ডল যা বলে গেলেন তার মর্মার্থ এই-
বেলুড় স্টেশন-বাজারে গোপীনাথবাবুর একটা ছোটো ঘড়ির দোকান ছিল। কলকাতা থেকে মূলত সস্তার ওয়ালক্লক কিনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন। কিন্তু দোকানটা চলত না, কারণ, কলকাতার অত কাছে হওয়ায় বেলুড়ের লোকজন ঘড়ির প্রয়োজন হলে কলকাতা থেকেই কিনে নিয়ে যেত।
ঘড়ি সারাতেও জানতেন গোপীনাথবাবু। মিস্ত্রি হিসেবে তার ভালোই নামডাক ছিল। কিন্তু সে অনেকদিন আগে, যখন স্প্রিং আর হুইলের ঘড়ি ছিল। ব্যাটারি চালিত কোয়ার্টজ ক্লক চলে আসার পরে হাতঘড়ি সারাতেই বা আসে কটা লোক?
তবু স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে তাদের তিনজনের সংসার ওই দোকানটার আয়েই কষ্টেসৃষ্টে চলে যাচ্ছিল। কোভিডের ঢেউয়ে সেই দোকানটাও ভেসে গেল। ওই যে দু’বছর পুঁজি ভেঙে খেলেন, তারপরে আর দোকানে নতুন স্টক তুলতেই পারলেন না।
যখন মেয়ে-বউকে নিয়ে উপোস করার মতন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন তখনই তিনি স্টেশন-বাজারেরই এক ওষুধের হোলসেল ব্যবসায়ীর দয়ায় ডক্টর ব্যানার্জির কাছে এই কাজটা পান এবং আক্ষরিক অর্থে বেঁচে যান।
এরপর ডক্টর ব্যানার্জি সম্বন্ধে গোপীনাথ মণ্ডল ঠারেঠোরে যা যা বললেন তাতে তিনজন শ্রোতাই বুঝতে পারলেন যে, নিষ্প্রভ হাবভাবের আড়ালে গোপীনাথ মণ্ডল আসলে একজন হুঁশিয়ার মানুষ। বিশেষ কিছুই তাঁর চোখ এড়ায়নি।
তিনি পরিষ্কার বললেন, নামের আগে ডাক্তার শব্দটা ব্যবহার করলেও দিব্যেন্দু ব্যানার্জির ডাক্তারি ডিগ্রি ছিল না। তিনি সম্ভবত কোনও নামজাদা কসমেটিক সার্জনের আন্ডারে অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন এবং সেইভাবেই হাতেকলমে কাজ শিখেছিলেন। কাজটা যে ভালোই শিখেছিলেন তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু প্র্যাকটিসটা করতে হত লুকিয়ে- চুরিয়ে।
লুকিয়েচুরিয়ে প্র্যাকটিস করতে হত বলেই ডক্টর ব্যানার্জির কোনও হাইফাই ক্লিনিক ছিল না, বাড়ি ছিল না, গাড়ি ছিল না। দশটা নার্স, এলাহি অপারেশন থিয়েটার কিছুই ছিল না। আর এইসব ছিল না বলেই তাঁর কাছে ট্রিটমেন্ট করানোর খরচ ছিল বড়ো ক্লিনিকে যা খরচ হয় তার সিকিভাগ।
একশ্রেণির পেশেন্টের কাছে সেটা শাপে বর হয়েছিল। বিশেষত নিম্নবিত্ত মহিলা, যারা সস্তায় রূপযৌবন ধরে রাখতে চাইত কিংবা রূপযৌবন বাড়াতে চাইত, তারা কীভাবে যেন খবর পেয়ে এই সুরূপায় চলে আসত ঠিক।
এইখানে গোপীনাথবাবুকে একবার থামিয়ে জয়দেব সরকার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কিন্তু গোপীনাথবাবু, কসমেটিক সার্জারির বাজারটা কি উচ্চবিত্ত মহিলাদেরই একচেটিয়া নয়? নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরা তো ঘরোয়া রূপটানেই সন্তুষ্ট বলে জানতাম।’
গোপীনাথবাবু মুখটা নিচু করে বললেন, ‘আপনি ভুল জানেন, স্যার। কত গরিব ঘরের মেয়েরা এখন যৌবন বেচে খাচ্ছে জানেন? সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে। তারা টালিগঞ্জে এক্সট্রার কাজ করে, কলগার্লের কাজ করে, ম্যাসেজ-পার্লারের আড়ালে দেহব্যাবসায় নাম লেখায়। তারা কী করবে, বলুন? শরীরটাই তো তাদের মূলধন। সেই মূলধনটাকে বাড়াতে হবে না?’
তারা এখানে এসে কী করাত?’ কল্যাণ বোস জিজ্ঞেস করলেন।
‘অনেককিছুই করাত, স্যার। মুখের আঁচিল, ব্রণর ট্রিটমেন্ট থেকে শুরু করে ব্রেস্টের মাপ বাড়ানো…’
‘সিলিকন ইমপ্ল্যান্ট?’
‘না, স্যার। ওটা অনেক কস্টলি পড়ত। ডাক্তারবাবু স্যালাইন ইমপ্ল্যান্ট করতেন।’
কল্যাণ বোস অসহায়ের মতন মুখ করে অরিন্দমের দিকে তাকালেন। সে-ও ঠোঁট উলটে ইশারায় জানাল শব্দটা প্রথম শুনছে।
কল্যাণ বোস আবার গোপীনাথবাবুর দিকে ঘুরে বসলেন। বললেন, ‘পুরো ব্যাবসাটার মধ্যেই একটা ফিশি স্মেল আছে। এরকম একটা ছোটো ক্লিনিকে এত রকমের প্রসিডিওর… দুর্ঘটনা ঘটত না, গোপীনাথবাবু?’
‘ঘটত, তবে খুবই কম। ডিগ্রি না থাকলেও ডাক্তারবাবুর হাত ছিল পরিষ্কার। আর দু’-একটা ওরকম ঘটনা ঘটলেও কেউ ওঁকে ছুঁতে পারত না। তার ব্যবস্থা উনি করে রেখেছিলেন।
আপনি ওই রেজিস্টারগুলো খুঁজে দেখুন। একটাও নাম-ঠিকানা পাবেন না। শুধু কোড নাম্বার। অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেলে কেউ প্ৰমাণ করতে পারবে না যে সে এখানে ট্রিটমেন্ট করিয়েছিল। এই রিস্কটুকু নিত বলেই না চল্লিশ হাজার টাকায় ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট, আট হাজার টাকায় লাইপোসাকশন আর আড়াই হাজার টাকায় বোটক্স ট্রিটমেন্ট করাতে পারত। ও হ্যাঁ, টাকা কিন্তু উনি ক্যাশে নিতেন। তাই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুঁজেও কারুর হদিশ পাবেন না।’
‘বোটক্স ট্রিটমেন্ট! সেটাও হত এখানে?’
‘সেটাই তো বেশি হত, স্যার। ডাক্তারবাবু ছিলেন বোটক্স ট্রিটমেন্টের জাদুকর। বাজারচলতি বোটক্স ইনজেকশনের দাম বেশি বলে নিজেই এটা-ওটা মিশিয়ে এমন সব শট বানিয়ে নিতেন যে, কাজ হত একেবারে হানড্রেড পারসেন্ট। এসব ওঁর কাছেই শুনেছি। নিজেই গর্ব করে বলতেন আমাকে।’
‘কী বলতেন?’
‘বলতেন, গোপীনাথ, এই যে আমরা বোটক্স-বোটক্স করি, জিনিসটা কী থেকে তৈরি হয় জানো তো? বটুলিনাম টক্সিন থেকে। দুনিয়ার সবচেয়ে তীব্র বিষ। কতটা তীব্র জানো? ধরো একটা নুনের দানার মাপের ওই বটুলিনাম টক্সিন দিয়ে দু’জন মানুষকে আরামসে মেরে ফেলা যাবে, এতটাই বিষাক্ত। আমরা যখন চিকিৎসায় ব্যবহার করি তখন ওর টক্সিসিটিকে অনেক কমিয়ে এনে ব্যবহার করি।
চোখের কোণের কোঁচকানো জায়গাগুলো, নাকের দু’পাশের দাগ, কপালের ভাঁজ, মানে এককথায় যাদের বলি বয়সের বলিরেখা, সেগুলো আসলে কী? সেগুলোও তো ঝুলে পড়া পেশি। আমরা খুব স্মল ডোজে বটুলিনাম ইনজেক্ট করে সেই মাসলগুলোকে প্যারালাইজ্ড করে দিই। সেগুলো সেগুলো তখন আর ঝুলে পড়তে পারে না, জমে শক্ত হয়ে যায়।
কিন্তু সমস্যা কী জানো? স্মল ডোজ বলেই এফেক্ট থাকে দুই থেকে চার মাস। দেখো গোপীনাথ, আমার কাছে মধ্যবিত্ত মেয়েরা ট্রিটমেন্ট করাতে আসে। তারা দু’মাস অন্তর পাঁচ-ছ’ হাজার টাকা কোথা থেকে পাবে বলো তো। তাই আমি চেষ্টা করি এফেক্টটাকে আর-একটু স্থায়িত্ব দিতে। আবার সেটা করতে গিয়ে পুরো মুখটাই যাতে প্যারালাইজ্ড না হয়ে যায় সেটাও তো দেখতে হবে।’
কল্যাণ বোস বললেন, ‘সেইজন্যই ল্যাবরেটরি?’
‘ঠিক ধরেছেন, স্যার। সেইজন্যই ল্যাবরেটরি। হোমমেড বোটক্সের শট তৈরি করার জন্য। একটু আগে আপনাকে ওই সিরিঞ্জ আর বিষের শিশির ব্যাপারে বলছিলাম না যে উনি বিষ নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, এটাই সেই।’
‘সেইজন্যই আপনি ভাবছেন এটা অ্যাকসিডেন্টাল ডেথ হতে পারে? নিজের তৈরি শট নিজের ওপরে প্রয়োগ করতে গিয়ে ডক্টর ব্যানার্জি মারা পড়েছেন?’
গোপীনাথ মণ্ডল ধরাগলায় বললেন, ‘আর কী বলি, স্যার! ওই ছোট্ট সিরিঞ্জ, ওই শিশি সবই যে আমার খুব চেনা।’
‘আর চোখের নীচে নিডল-বাম্প? সেটা চেনা নয়?’
‘অবশ্যই, স্যার। ওই জায়গাগুলোই তো বোটক্স ইনজেকশনের ফেভারিট জায়গা। কপালের চামড়া, চোখের নীচের চামড়া, চিবুক, গাল। প্রতিদিনই কত মেয়ের মুখে ওরকম মশার কামড়ের মতন দাগ নিয়ে এখান থেকে বেরোতে দেখছি, স্যার। বেশিদিন থাকে না দাগগুলো। এক-দু’দিন বড়োজোর। কিন্তু দেখেছি বলেই আপনাকে বলতে পারছি, স্যার, এটা ওই সূচ ফোটানোর দাগই বটে। ডাক্তারবাবু না জেনে নিজেই নিজের মৃত্যুকে ডেকে এনেছেন।’
কল্যাণ বোস আপনমনে বললেন, ‘এরকম রিস্ক কেউ নেয়?’
গোপীনাথবাবু বললেন, ‘উনি নিতে পারতেন। সংসারে টান কী ছিল, বলুন? নিঃসন্তান। স্ত্রী বহুদিন আগেই মারা গেছেন।’
জয়দেববাবু হঠাৎ বলে বসলেন, ‘আপনি এখন কী করবেন, গোপীনাথবাবু?’
বয়সের চেয়ে বেশি বুড়িয়ে-যাওয়া মানুষটি অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, ‘জানি না। সত্যিই জানি না।’
আপনার মেয়ের বয়স কত? সে কিছু করে না?’
‘উহুঁ। বয়স তো হল তেইশ-চব্বিশ বছর। কিন্তু সেখানেও ওপরওলা আমাকে মেরে রেখেছেন। মেয়েটা পাগল। ঘরের মধ্যেই হাসে-কাঁদে। আপনমনে বকবক করে। ঘর থেকে বেরোয় না।’
কথাগুলো শুনে কল্যাণ বোস এবং অরিন্দমের মতন দুই দুদে পুলিশ অফিসারও কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। তারপর একটু কেশে গলাটাকে সাফ করে নিয়ে কল্যাণ বোস বললেন, ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবে। আমি দেখব আপনার জন্য কী করা যায়। আপাতত আপনি ছোটোবাবুর কাছে আপনার ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা দিয়ে বাড়ি যেতে পারেন। অ্যাড্রেস-প্রুফ কিছু আছে কাছে?’
গোপীনাথবাবু বললেন, ‘খুঁজলে এখানেই পাওয়া যাবে, স্যার।’ তারপর সত্যিই একটা ড্রয়ারের ভেতর থেকে নিজের আধার কার্ডের ফটোকপি বার করে অরিন্দমের হাতে দিলেন। পকেট থেকে কলম বার করে সেটার পিছনে নিজের ফোন নম্বরও লিখে দিলেন।
উনি চলে যাওয়ার পর কল্যাণ বোস বললেন, ‘অরিন্দম, তুমি তা হলে ফরেনসিককে ডেকে নাও। অ্যাম্বুলেন্সকে বলো, পরে ডেকে নেবে। আর ইয়ে, সবই তো শুনলে। ওই সিরিঞ্জ-টিরিঞ্জে একদম হাত দিতে যেয়ো না। আমি আর জয়দেবদা চললাম। এখন পোস্টমর্টেম আর ফরেনসিকের রিপোর্ট পাওয়ার আগে আর তো কিছু করার নেই। তবে মনে হচ্ছে, অ্যাকসিডেন্টাল ডেথই বটে।’
ই. এম. বাইপাসে ওঠার আগে জয়দেব সরকার কোনও কথা বলেননি। তারপর আস্তে করে ডাকলেন, ‘বোসসাহেব!’
‘বলুন, দাদা।’
‘আপনার খটকা লাগছে না?’
‘কী ব্যাপারে বলুন তো… ‘
‘ইয়ে… মানে একজন ডাক্তার সিরিঞ্জ পুশ করার সময় হাতে গ্লাভ্স পরে থাকবেন কেন? আর তাছাড়া আপনাকে যদি নিজের চোখের নীচে একটা সুঁই ফোটাতে হত, তা হলে আপনি কি পাশের ঘরের ওই আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন না?’
‘আর?’
‘না, আপাতত আর কিছু না। রিপোর্টগুলো পেলে আমাকে একবার জানাবেন তো।’
কল্যাণ বোস রাস্তার দিক থেকের চোখ সরিয়ে জয়দেববাবুকে একবার দেখলেন। তারপর বললেন, ‘কিছুর গন্ধ পেয়েছেন মনে হচ্ছে। অবশ্যই জানাব।’
***
কল্যাণ বোস কথা রাখলেন। ঠিক তিনদিনের মাথায় ফোন করে জয়দেববাবুকে জানালেন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেয়ে গেছেন। জয়দেববাবু তা শুনে অফিস থেকে ফেরার পথেই লেবুতলা থানায় ঢু মারলেন।
ও.সি.-র ঘরে সেকেন্ড অফিসার অরিন্দম মিত্রও তখন উপস্থিত ছিল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে জানিয়ে গেল, গোপীনাথবাবু ডক্টর দিব্যেন্দু ব্যানার্জিকে যতটা মুক্তপুরুষ বলে ক্লেম করছিলেন, ততটা মুক্তপুরুষ তিনি ছিলেন না। ডাক্তারবাবুর ঘরের ওয়ারড্রোব থেকে যৌনতাবর্ধক দাওয়াই এবং কন্ট্রাসেপটিভ দুই-ই পাওয়া গেছে। সেই কর্মচারী মেয়েটি জেরায় স্বীকার করেছে, তার সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক ঘটাতেন ডক্টর দিব্যেন্দু ব্যানার্জি। অবশ্যই মোটা টাকার বিনিময়ে। সেই মেয়েটিই বলেছে, কাস্টমারদের মধ্যে অনেক মেয়ের ট্রিটমেন্টও তিনি বিনা পয়সায় করে দিতেন, যদি সেই মেয়ে তাঁর সঙ্গে শুতে রাজি হত।
জয়দেববাবু সব শুনে বললেন, ‘সেইজন্যই আমি প্রথম থেকে সুইসাইডের অ্যাঙ্গেলটা ধরছি না, বুঝলেন? সেক্সের ব্যাপারটা জানতাম না। কিন্তু ওইভাবে চেটেপুটে মুরগির মাংস খেয়ে, চমৎকার করে বিছানা বানিয়ে কেউ সুইসাইড করে না।’
‘তা হলে অ্যাকসিডেন্টাল ডেথই ধরছেন তো? নিজের শরীরে ওষুধ টেস্ট করতে গিয়ে….
জয়দেববাবু বললেন, না। তা-ও বলছি না।’
এইবার কল্যাণ বোস চটে গেলেন। ‘তা হলে কী বলছেন মশাই? সুইসাইডও নয়, অ্যাকসিডেন্টও নয়। তা হলে কি হোমিসাইড? খুন? ওই বন্ধ ঘরে কে চোখের নীচে বটুলিনাম ইনজেক্ট করে খুন করে গেল? ভূতে?’
জয়দেববাবু একটুও চটলেন না। বললেন, ‘বটুলিনামের ব্যাপারটা ঠিক?’
‘একদম ঠিক। গোপীনাথবাবু যা বলেছিলেন, হুবহু তা-ই। ওই শিশিটিতে বটুলিনামের যা ঘনত্ব ছিল, তাতে তার এককণা শরীরে ঢুকলেও মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষ মারা পড়বে। হয়েওছে তা-ই।’
জয়দেব সরকার মন দিয়ে ফরেনসিক রিপোর্টটা পড়লেন। তারপর মন্তব্য করলেন, ‘হুঁ, চোখের নীচের পাংচার-মার্কটাও সূচ থেকে হয়েছে বলেই তো লিখেছে। সিরিঞ্জে আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিক। ডক্টর ব্যানার্জির হাতে গ্লাভ্স ছিল।’
‘তা হলে আপনার সংশয়টা ঠিক কোথায়?’
হঠাৎ জয়দেব সরকার সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর চোখদুটো উত্তেজনায় জ্বলে উঠল। বললেন, ‘সংশয়ের দুটো কারণ আপনাকে আগে বলেছিলাম। কেন ডক্টর ব্যানার্জি পাশের ঘরের আয়নার সামনে গিয়ে ইনজেকশনটা নিলেন না? কেন তিনি হাত থেকে গ্লাভ্স খুললেন না? এবার তার সঙ্গে আরও কয়েকটা কারণ যোগ করছি। আপনি মন দিয়ে শুনুন।
প্রথমত, গোপীনাথ মণ্ডলের কী দায় পড়েছিল, এত সুন্দর করে ডাক্তারবাবুর মৃত্যুরহস্যটা আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করার? একজন লেম্যান, যাঁর প্রধান কাজ অফিসে খাতা লেখা, তিনি কীভাবে বটুলিনামের কার্যকারিতা নিয়ে এত কথা জানলেন? সবচেয়ে বড়ো কথা, চোখের নীচে একটা ইনজেকশন-বাম্প কেমন করে একজন লেম্যানের চোখে পড়ল? আপনার কি মনে হচ্ছে না, গোপীনাথ মণ্ডল তার অবস্থানের তুলনায় বড্ড বেশি জানেন?
মনের মধ্যে এই খটকাগুলো নিয়েই আমি গত দু’দিন অফিসের পরে বেলুড়-বাজারে আর গোপীনাথবাবুর পাড়ায় ঘুরে বেড়িয়েছি। হ্যাঁ, উনি যখন আপনার হাতে আধার কার্ডটা দিচ্ছিলেন, তখন ওঁর ঠিকানাটা আমি দেখে নিয়েছিলাম।
তবে প্রথমদিনে আমি ওঁর বাড়ির দিকে যাইনি। সুসময় ওয়াচ সেন্টারের উলটোদিকের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসেছিলাম। বুঝতেই পারছেন, সুসময় ওয়াচ সেন্টার গোপীনাথবাবুর দোকানের নাম। একটু খোঁজখবর করতেই বাজারের অন্য দোকানিরাই ওটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
দোকানটা মোটেই উঠে যায়নি, ভালোই চলছে। কারণ, ওখানে শুধু ঘড়ি নয়, মোবাইল ফোন এবং ফোনের সবরকমের অ্যাকসেসরিও বিক্রি হয়। এই কথাটা গোপীনাথবাবু আমাদের বলেননি। দোকান চালান একজন মহিলা। তিনি গোপীনাথবাবুর স্ত্রী। তাঁকে সাহায্য করার জন্য একজন কর্মচারী আছে দোকানে।
গোপীনাথবাবু নিজের দোকানে না বসে সুরূপাতে সামান্য মাইনের চাকরিতে ঢুকেছিলেন কেন? চায়ের দোকানের মালিক গল্প করতে ভালোবাসেন। পরনিন্দা-পরচর্চাতেও অনীহা নেই। তাই এইসব প্রশ্নের উত্তরগুলো পেয়ে গিয়েছিলাম।
গোপীনাথবাবুর কথা উঠতেই তিনি বললেন, আগে তো উনিই চালাতেন, দাদা। মেয়েটাও টেলিভিশন সিরিয়ালে ছোটোখাটো রোল করত। কোভিডের পরে মেয়ের রোজগারের পয়সাতেই তো গোপীদা আবার ঘুরে দাঁড়ালেন। কিন্তু মেয়েটার ওই অ্যাকসিডেন্টটা হয়ে যাওয়ার পর থেকে…
অ্যাকসিডেন্ট! কেমন অ্যাকসিডেন্ট?
মেয়েটার ফিগার-টিগার সব ভালো ছিল। চোখ-নাকও ছিল সুন্দর। শুধু গালদুটো ছিল বড্ড ফোলা, যে কারণে ভালো রোল পেত না। শুনেছি কোন প্লাস্টিক সার্জনের কাছে সেই ফোলা গাল ছোটো করাতে গিয়েছিল। তারপরেই ভুল চিকিৎসায় মেয়েটার মুখটা একেবারে বিলা মতন হয়ে গেল। শোকে-দুঃখে মাথা খারাপ হয়ে গেছে— মেয়েরও আর মেয়ের বাপেরও। শুধু ওর মা বুকে পাথর বেঁধে দোকানটা চালাচ্ছে। মানুষকে তো বাঁচতে হবে নাকি, বলুন?
বুঝলেন বোসসাহেব, দ্বিতীয়দিন ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে বসে ছিলাম। না, চিনতে পারবে কেমন করে? আমি নাটকের লোক, ছদ্মবেশ ধরতে সময় লাগে না।
যা-ই হোক, ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর একটা মেয়ের মুখ একঝলক জানালার ফাঁকে দেখতে পেলাম। সে কী মুখ, বোসসাহেব… সে কী বীভৎস মুখ! ওই মুখ দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন, গোপীনাথবাবুর মেয়ে পাগলও হয়েছে ওই মুখের কারণে আর বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করেছে, তা-ও ওই মুখের জন্য।
একটা স্বাভাবিক তেইশ-চব্বিশ বছরের মেয়ের কাঁধের ওপরে যদি একটা শ্বেতপাথরের তৈরি ভ্রুহীন, কেশহীন, নিষ্পলক মুন্ডু বসিয়ে দেন, তা হলে যেমন দেখতে হবে, মহুয়া মণ্ডলকে দেখতে অবিকল তা-ই। এবং এর কারণটা কি আপনি আন্দাজ করতে পারছেন?’
কল্যাণ বোস আচ্ছন্নের মতন একটাই কথা উচ্চারণ করলেন, ‘ওভারডোজ অফ বোটক্স!’
‘এক্স্যাক্টলি। তা হলে এটাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, যেটাকে আপনি নিরীহ একটা অ্যাকসিডেন্টাল ডেথ ভাবছেন, সেটা তা না-ও হতে পারে। হতে পারে মেয়ের জীবনটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে পিতা হিসেবে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গোপীনাথ সুরূপায় চাকরি নিয়েছিলেন এবং খুনটাও তিনিই করেছেন?’
কল্যাণ বোস অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, ‘জয়দেবদা, মোটিভ ঠিক আছে। কিন্তু বন্ধ ঘরের মধ্যে খুনটা করবে কীভাবে? কোর্টে দাঁড়িয়ে সেটা তো আমাকে বলতে হবে।’
জয়দেব সরকার বললেন, ‘সেটা এই মুহূর্তে আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে আপনি একটা ফাঁদ পাততে পারেন। আপনি ওঁকে ডাক্তারবাবুর ফ্ল্যাটে ডেকে পাঠান। সেখানে ওঁর সামনে আপনি একাই থাকবেন। আমি আর অরিন্দম আগে থাকতেই ফ্ল্যাটের মধ্যে অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকব।’
‘তারপর?’ কল্যাণ বোস বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছিলেন কথাগুলো।
তারপর আপনি সরাসরি ওঁকে চার্জ করুন। ওঁকে কী কী বলতে হবে আমি সব আপনাকে শিখিয়ে দেব। সেগুলোই বলবেন। তারপর উনি কীভাবে রিঅ্যাক্ট করেন দেখুন। মনে হয় সেখান থেকেই একটা রাস্তা বেরিয়ে আসবে।’
***
রাত ন’টা। বউবাজার স্ট্রিটের বেশিরভাগ দোকানের শাটার নেমে গেছে। কিছু ছোটো রেস্তোরাঁ আর পান-সিগ্রেটের দোকান শুধু খোলা। সুরূপা ক্লিনিকের বাড়ির সামনেটা অন্ধকার।। সিঁড়িতে একটা বাল্ব জ্বলছিল। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলেন কল্যাণ বোস। পিছন পিছন গোপীনাথ মণ্ডল। সেই কোলকুঁজো ভঙ্গি, মুখে চিন্তার ছাপ।
দরজার তালায় পুলিশের গালা-সিল থাকার কথা। ছিলও, তবে শুধু আলগা করে তালার ওপরে বসানো। কারণ, প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে ওই সিল খুলে অরিন্দম আর জয়দেব সরকার ভেতরে ঢুকে গেছেন। তারপরে আর-একজন কনস্টেবল সিলটাকে আলগা করে তালার ওপরে বসিয়ে দিয়ে ফিরে গেছে।
এই সবই করা হয়েছিল যাতে গোপীনাথের কোনও সন্দেহ না হয়।
এইবার কল্যাণ বোস সেই ছেঁড়া সিলকেই আবার ছেঁড়ার অভিনয় করলেন এবং তারপর চাবি ঘুরিয়ে তালা খুললেন। পিছনে তাকিয়ে বললেন, ‘ভেতরে আসুন। আলোগুলো সব জ্বালিয়ে দিন।’
গোপীনাথ ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সব ঘরের, স্যার?’
‘হ্যাঁ। সব ঘরের।’
আলো জ্বালানো হলে কল্যাণ বোস রিসেপশনের সামনে একটা চেয়ারে বসলেন। কড়া গলায় গোপীনাথবাবুকে নির্দেশ দিলেন, ‘বসুন।’ তারপর বিনা ভূমিকায় বললেন, ‘আপনি ধরা পড়ে গেছেন, গোপীনাথবাবু। আমরা জানি, আপনার মেয়ে সুন্দরী ছিল। শুধু গালদুটো ছিল ফোলা ফোলা। সেই গালের কারেকশনের জন্য আপনার মেয়ে এখানে এসেছিল আর ডক্টর ব্যানার্জির ভুল বোটক্স ট্রিটমেন্টের জন্যই আপনার মেয়ের সারা মুখ প্যারালাইজ্ড হয়ে গেছে। পাগল হয়ে গেছে আপনার মেয়ে।
গোপীনাথ মাথা নিচু করে রেখেই আস্তে আস্তে বললেন, ‘কোনও প্রমাণ নেই।’
কল্যাণ বোস বাঁকা হাসলেন। বললেন, ‘নেই-ই তো। আপনার মেয়ে চিকিৎসা করিয়েছিল বেনামে, ক্যাশ টাকায় পেমেন্ট করেছিল। নেই বলেই আপনি পুলিশের কাছে যেতে পারেননি। কিন্তু তা বলে কি শয়তান ডাক্তারকে ছেড়ে দেবেন? তা তো হয় না। তাই এখানে চাকরি নিলেন। ঠিক করলেন, যে বটুলিনাম দিয়ে উনি আপনার মেয়ের জীবনটা নষ্ট করেছেন, সেই বটুলিনাম দিয়েই ওঁকে মারবেন।
ডাক্তারবাবু জানবেন কেমন করে আপনি কার বাবা? সম্ভবত আপনি খুব কম টাকায় চাকরি করতে রাজি হয়েছিলেন। আপনাকে দেখেও ওঁর মনে হয়েছিল নিরীহ, বোকাসোকা লোক। তাই চাকরিটা পেতে আপনার অসুবিধে হয়নি।’
গোপীনাথ মণ্ডল যেমন মাথা নিচু করে বসে ছিলেন, সেরকমই বসে রইলেন।
কল্যাণ বোস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘বটুলিনাম নিয়ে ডক্টর ব্যানার্জির এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে আপনি মিথ্যে বলেননি। সত্যিই উনি নিজে নানারকমের শট বানাতেন। কিন্তু নিজের ওপরে সেই শট পরীক্ষা করা, এটা আপনার গালগল্প। কোনও বুদ্ধিমান লোক তা করবে না। উনি পরীক্ষা করতেন গরিব পেশেন্টদের ওপরে। ব্যর্থ খুব কমই হতেন। হলেও যারা ভিকটিম, তারা আপনার মেয়ের মতন হজম করে নিত। অসুবিধে তো ছিল না কিছু।’
গোপীনাথ মণ্ডল তবুও চুপ।
কল্যাণ বোস আবার কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ করলেন। তারপর বললেন, ‘ইনজেকশনের সিরিঞ্জে কারুর আঙুলের ছাপ নেই। তার মানে, ওটা আপনিও পুশ করে থাকতে পারেন।’
এইবার গোপীনাথ মুখ তুলে হাসলেন। কল্যাণবাবু অবাক হয়ে দেখলেন, তাঁর শান্ত, ভীরু মুখটা একেবারেই পালটে গেছে। অসম্ভব শয়তানি একটা হাসিতে জ্বলজ্বল করছে সেই মুখ। হাসতে হাসতেই গোপীনাথ বললেন, ‘কীভাবে পুশ করলাম? ঘরের দরজা-জানালা সবই তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।’
‘সেটা আমাদের দেখতে হবে। ভাবছি ফ্ল্যাটটাকে ইঞ্চি ইঞ্চি করে খুঁজে দেখব, কোনও ব্লু পাই কি না।’
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই গোপীনাথ মণ্ডলের মুখের ওপর দিয়ে একটা দুশ্চিন্তার ছায়া ভেসে গেল কি? না কি ওটা কল্যাণ বোসের মনের ভুল?
গোপীনাথের ঠোঁটে তখনও সেই শয়তানি হাসির রেশ লেগে ছিল। সেইভাবেই বললেন, ‘একটা জিনিস আপনাকে দেখাতে পারি, যেটা দেখলে আপনার মাথা থেকে এই খুনের থিয়োরি একেবারেই চলে যাবে। আপনি বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা অ্যাকসিডেন্ট ছাড়া আর কিছুই নয়।
কল্যাণ বোস বললেন, ‘দেখান।’
‘এখানে নয়, ল্যাবরেটরিতে। আসুন, দেখাচ্ছি।’
গোপীনাথ দুটো দরজা পেরিয়ে ল্যাবরেটরির বেঞ্চের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। পিছন পিছন কল্যাণ বোস। বেঞ্চের ওপরে অন্যান্য অনেককিছুর সঙ্গে একটা সাধারণ সিঙ্গল আইপিসের অপটিকাল মাইক্রোস্কোপও রাখা ছিল। গোপীনাথ মাইক্রোস্কোপটার অবজেকটিভ-লেন্সের নীচে একটা স্লাইড ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এবার আইপিসে চোখ দিয়ে দেখুন। সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
কল্যাণ বোস আইপিসে চোখ লাগানোর জন্য ঝুঁকেছিলেন; কিন্তু সেই মুহূর্তে দেওয়ালের ওয়ারড্রোবের বন্ধ পাল্লা ঠেলে একসঙ্গে দু’জন বেরিয়ে এলেন। জয়দেব সরকার একটা প্রবল ধাক্কায় কল্যাণ বোসকে মাইক্রোস্কোপের সামনে থেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে দিলেন আর অরিন্দম মিত্র গোপীনাথের হাতদুটো মুচড়ে পিঠের দিকে নিয়ে গিয়ে বজ্ৰ আটুনিতে চেপে ধরল।
‘তা হলে ওই মাইক্রোস্কোপের আইপিস, ওখানেই বিষ?’ ধাক্কার ধকল সামলিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে জিজ্ঞেস করলেন কল্যাণ বোস।
জয়দেব সরকার তাঁর মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা আইপিসের কিনারায় যে জায়গাটায় চোখ লাগায়, সেই জায়গাটার দিকে পয়েন্ট করে মন দিয়ে কী যেন দেখছিলেন। এবার ইশারায় কল্যাণবাবুকে ডাকলেন। বললেন, দেখে যান। এই পাতলা মেটালের রিংটা অরিজিনালি এই মেশিনে ছিল না। এটা গোপীনাথ মণ্ডলের সংযোজন। একজন দক্ষ ঘড়ি-মিস্ত্রির পক্ষে এটা কিছু কঠিন কাজ নয়।
রিং-এর নীচের পরিধিতে ওই সূক্ষ্ম সূচটা দেখতে পাচ্ছেন? আপনি মাইক্রোস্কোপে চোখ ঠেকালেই ওই সুচটা আপনার চোখের নীচের চামড়ায় বিধে যেত। সূচের ডগায় মাখানো আছে পৃথিবীর সবচেয়ে তীব্র বিষ বটুলিনাম … সেটা মিশে যেত আপনার রক্তে। সঙ্গে সঙ্গেই আপনার মৃত্যু হত। ঠিক যেভাবে ডক্টর দিব্যেন্দু ব্যানার্জির মৃত্যু হয়েছে। ওই লোকটা আমাদের বিশ্বাস করাতে চাইছিল যে, ডাক্তারবাবু নিজে নিজেকে সূচ দিয়ে ফুড়েছেন।’
অরিন্দমের কবলের মধ্যে থেকেই গোপীনাথ মণ্ডল খ্যাপা কুকুরের মতন গরগর করে উঠলেন। তাঁকে দেখতেও এখন লাগছে অবিকল এক খ্যাপা কুকুরের মতন। ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে মাড়ি বেরিয়ে পড়েছে। চোখদুটো বিস্ফারিত। শান্ত এক ভদ্রলোকের অবচেতনের আড়াল সরিয়ে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর সাইকোপ্যাথ কিলার, যে একটু আগেই দ্বিতীয় খুনটা করতে গিয়েছিল।
কল্যাণ বোস একবার সেই মুখটার দিকে তাকিয়ে তারপর আবার জয়দেববাবুকেই প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু সিরিঞ্জ আর বিষের শিশি তো ছিলই, জয়দেবদা।’
জয়দেববাবু বললেন, ‘সে তো থাকবেই। ডাক্তারবাবুর রিসার্চের ব্যাপারটা তো মিথ্যে নয়। তবে সম্ভবত ওইভাবে টেবিলের ওপরে রাখা ছিল না। কোনও ড্রয়ার কিংবা ফ্রিজের ভেতরে থাকাটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু মনে রাখবেন, অরিন্দম যখন দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকেছিল, তখন ওর সঙ্গে কিন্তু এই লোকটিও ছিল। ও জানত ডক্টর ব্যানার্জি তাঁর সিরিঞ্জ আর বিষের শিশি কোথায় রাখেন। আমার দৃঢ় ধারণা, এই গোপীনাথই একফাঁকে জিনিসদুটোকে মৃতদেহের কাছে নামিয়ে রেখেছিল। অবশ্যই রুমালে জড়িয়ে, না হলে ওর ফিংগারপ্রিন্ট পাওয়া যেত।
কিন্তু আসলে ডক্টর দিব্যেন্দু ব্যানার্জির মৃত্যু হয়েছে ওই মাইক্রোস্কোপের আইপিসে লাগানো সূচের ছোবলে। গোপীনাথ নিশ্চয়ই জানত, প্রতিদিন ডিনারের পর ডক্টর ব্যানার্জি ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন এবং তাঁর কাজে মাইক্রোস্কোপ ছিল অপরিহার্য। কাজেই গোপীনাথ ওই মাইক্রোস্কোপের আইপিসেই বিষাক্ত নীডল ফিট করে রেখেছিল। মৃত্যু এসেছিল অজান্তেই।’
***

খুব ভালো গল্প। আপনার লেখার ফ্যান হয়ে গেলাম মশাই।