মণিরত্নের মন্দির
মণিরত্নের মন্দিরের চাতালে বসে হাওরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হাওর না বলে সমুদ্র বললেই বা ক্ষতি কী? ওপাশে বহুদূরে, দিগন্তের কাছে মেঘের মতো দেখা যায় মেঘালয়ের পাহাড়। সেই পাহাড়ের যাবতীয় জল— ঝরনার জল, নদীর জল, বৃষ্টির জল, এমনকি পার্বত্য অরণ্যে যত আকাশছোঁয়া গাছ আছে, তাদের পাতার ডগা থেকে গড়িয়ে পড়া শিশিরের ফোঁটাগুলি অবধি পাথুরে দেওয়াল বেয়ে টিপটিপিয়ে, হুড়হুড়িয়ে, গুমগুমিয়ে গড়িয়ে নামছে এই হাওরের বুকে। কত কোটি বছর ধরে এই নিরন্তর জলধারা নামছে কে জানে। এত জল পেয়ে হাওরের বুক থইথই করে। সমুদ্রের মতনই ঢেউ ওঠে তার বুকে।
সন্ধে নেমেছে। আমি আর মণিরত্ন মন্দিরের পিছনের চাতালে দুটো খালি প্যাকিং বাক্স পেতে পাশাপাশি বসে আছি। দেখছি সূর্যাস্তের পর থেকে কীভাবে ক্রমশ হাওরের জল গোলাপি থেকে নীল, নীল থেকে কালো হয়ে উঠছে। রাত আরও একটু বাড়তেই আকাশ ভরে তারা ফুটল। এত তারা, মনে হচ্ছিল যেন নীল মৌমাছিদের চাক ভেঙে গেছে। হাওরের কালো জলে সেই তারাদলের ছায়া নীল গুলে দিচ্ছিল।
মণির কাছে এসব দৃশ্য নতুন নয়। ও-ই তো এখানে মন্দির দেখতে ডেকেছে আমাকে। কিন্তু আমি প্রায় সম্মোহিত হয়ে পড়েছিলাম। উঠে যেতে পারছিলাম না ওখান থেকে। মণিই একটু বাদে বলল, ‘চল, রুদ্র, ঘরে চল। তোর অভ্যেস নেই। মাথায় হিম বসে ঠান্ডা লেগে যাবে।’
মণিরত্ন আমার কলেজের বন্ধু। মণিরত্ন মণ্ডল। চিরকালই প্রতিভাবান, চিরকালই পাগলাটে। সেই কুড়ি-একুশ বছর বয়সে, আমরা ক্লাসের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা যখন নানারকম বখাটেপনা করে বেড়াচ্ছি, নেশা করছি, রাজনীতি করছি, প্রেম করছি, মণিরত্ন তখনও হয় লাইব্রেরিতে কোনও বইয়ে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকত আর না হলে কলকাতার আশেপাশে মন্দির মসজিদ, চার্চ, গুরুদ্বারা আর বৌদ্ধ সংঘে ঘুরে বেড়াত। মাঝে মাঝে কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যেত। ফিরে আসার পরে জিজ্ঞেস করতাম, ‘কী রে, কোথায় গিয়েছিলিস?’ ও কোনও একটা অচেনা গ্রামের নাম করে বলত, অমুক বাউল কিংবা তমুক ফকিরের আশ্রমে গিয়েছিলাম।
আমি ছিলাম ওর প্রিয় বন্ধু। আর সকলে ওকে নানাভাবে উত্যক্ত এবং উপহাস করলেও আমি কখনও তা করিনি। হ্যাঁ, ওর চেহারা, কথাবার্তা সবই অত্যন্ত বিরক্তিকর ছিল ঠিকই- যাকে বলা যায় আনস্মার্ট… বোরিং। কিন্তু আমার কী জানি কেন কেবলই মনে হত, এসবই ওর ছদ্মবেশ। মণিরত্ন ইচ্ছে করলেই আমাদের থেকে অনেক বেশি স্মার্ট হতে পারত, আমাদের থেকে অনেক বেশি বাচাল। কিন্তু ও সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে একটা কিছু খুঁজে যাচ্ছে আর সেই খোজাখুঁজির কাজটা যাতে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারে সেইজন্যই ও নিজেকে যতভাবে পারে অসামাজিক জীব হিসেবে প্রতিপন্ন করছে। এমনটাই মনে হত আমার।
একদিন আমি ওকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘কী খুঁজছিস, মণি? ঈশ্বর?’
ও হেসে ফেলেছিল। বলেছিল, ‘খোঁজার ব্যাপারটা ঠিকই ধরেছিস। ঈশ্বরের ব্যাপারটা ভুল।’
‘ঈশ্বর নন? তা হলে ধর্মস্থানে গিয়ে কী খুঁজিস?’
ও বলেছিল, ‘এখন বলা যাবে না। বলব তোকে ঠিকই। তবে আগে আর-একটু তথ্য জোগাড় করে নিই। না হলে তুইও আমাকে পাগল ভাববি।’
এটা কুড়ি বছর আগের কথা। তার কিছুদিন বাদেই মণিরত্ন আর্কিয়োলজিতে এম. এ. পড়ার জন্য কানপুর আই. আই. টি.-তে চলে গেল আর আমি গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে কলকাতাতেই ব্যাংকে চাকরি নিলাম। দু’জনের মধ্যে যোগাযোগটা কমতে কমতে একসময় একেবারেই ছিঁড়ে গেল। ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায় মণির কথা। এমন সময়, এই মাত্র একসপ্তাহ আগে, বাড়ির ঠিকানায় মণির চিঠি এল।
চিঠিতে লিখেছিল-
ভাই রুদ্র, তোর ফোন নম্বর জানি না। যদি সেই একই বাড়িতে থেকে থাকিস তা হলে এই চিঠি পাবি নিশ্চয়ই। মনে আছে, কুড়ি বছর আগে একদিন তোর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি কী খুঁজছি সেটা তোকে সময় হলেই জানাব? সেই সময় এখন হয়েছে।
চিঠিতেই ঠিকানা এবং ফোন নম্বর ছিল। বাংলাদেশের সিলেট জেলার এক দুর্গম এলাকা। সেই এলাকার উত্তরে মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণি। দক্ষিণে বন। বাকি দু’দিকে আঠেরোশো একর জুড়ে এই হাওর, যে শব্দটা নাকি এসেছে ‘সাগর’ বা ‘সায়র’ থেকে।
সবচেয়ে কাছের পাকা সড়কটিও চার কিলোমিটার দূরে। সেখানেই নৌকা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল মণিরত্ন মণ্ডল, আমার একদার সহপাঠী। কিন্তু ও আমাকে দেখে হেসে হাত না নাড়ালে আমি ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম। কে বলবে, ছোট্ট নৌকাটার ওপরে লগিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যে লোকটা হাসছে, তার পকেটে কানপুর আই. আই. টি. – র প্রত্নতত্ত্বের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে? যে কিছুদিন সেখানে অধ্যাপনাও করেছে।
অনেক বছর ধরে রোদে পুড়লে আর জলে ভিজলে চেহারায় যে ছাপটা পড়ে, সেটাই ওর চেহারায় পড়েছিল। তার ওপরে পরনে ছিল একটা রংচটা কর্ডের ট্রাউজার আর স্যান্ডো গেঞ্জি। গালভরতি কাঁচাপাকা গোঁফদাড়ি, যেটা ছাত্রজীবনে ছিল না। তবু যে মুহূর্তে হেসে হাত নাড়াল, সেই মুহূর্তেই ওই বুদ্ধিদীপ্ত হাসিটা দেখেই ওকে চিনে নিলাম।
তারপর ও নিজেই নৌকা চালিয়ে আমাকে নিয়ে এল এই বিশাল কাঠের ঘরটায়। বলল, এটা নাকি একটা মন্দির। ও বানায়নি, আগে থেকেই ছিল। ও শুধু খুঁজে বার করেছে।
***
পিছনের উঠোন থেকে আমরা সেই ঘরেই ঢুকে এলাম। সন্ধে আটটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া সেরে মণি আমার সঙ্গে গল্প করতে বসল। ও বলল-
‘জিজ্ঞেস করেছিলিস, কী খুঁজছি। খুঁজছিলাম একটা নৌকা পৃথিবীর প্রায় সমস্ত প্রাচীন লোককথাগুলোতে যে নৌকাটার কথা শোনা যায়। মহাপ্লাবনের সময় যে নৌকায় মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী আশ্ৰয় পেয়েছিল। প্লাবনের জল নেমে যাওয়ার পরে যে নৌকা স্থির হয়েছিল কোনও এক অজানা জায়গায়।
সুমেরীয় মহাকাব্যে, আক্কাদীয় মহাকাব্যে, গিলগামেশের মহাকাব্যে- কোথায় নেই মহাপ্লাবনের গল্প? বাইবেলে নোয়ার আর্কের গল্পটাই অবশ্য আমাদের বেশি পরিচিত। গল্প তো নয়, ঘটনা। সত্যিই যদি মহাপ্লাবন না আসত, তা হলে পৃথিবীর সমস্ত দেশে কি একইভাবে একই কাহিনির জন্ম হত? তখন তো মহাদেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগেরও কোনও উপায় ছিল না।
গল্প একটা আমাদের হিন্দু পুরাণেও ছিল। মনু আর মহামৎস্যের গল্প। সেই মাছ নাকি ছিলেন আসলে ব্রহ্মা। তিনিই প্লাবনের সময় মনুর পরিবার আর সাত ঋষিকে নৌকায় বসিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন।
মোটামুটিভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নানান দেশে সেই নৌকার ধ্বংসাবশেষ খোঁজার কাজ শুরু করেছিলেন। প্রত্নতত্ত্বের একটা নতুন ধারার সূত্রপাত হয়েছিল।
আমাকেও ছাত্রাবস্থা থেকে ওই হারানো নৌকা টানতে শুরু করেছিল। লাইব্রেরির মধ্যে আর নানান ধর্মস্থানে রক্ষিত পুথিপত্রের মধ্যে আমি খুঁজতে শুরু করেছিলাম সেই প্লাবনের নৌকার হদিশ। কুড়ি বছরের ওপর হয়ে গেল আমি খুঁজে চলেছি। এই নেশায় আমি চাকরি ছেড়েছি বারবার। সংসার করিনি। যাযাবরের জীবন কাটিয়েছি। অবশেষে …’
আমি মন দিয়ে মণির কথা শুনছিলাম। ও থামতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘অবশেষে কী?’
‘অবশেষে এই হাওরে এসে মনে হল আমি যা খুঁজছিলাম তা বোধহয় পেলাম।’
আমি অবিশ্বাসের সুরে বললাম, ‘এইখানে! এই জঙ্গল আর জলের মধ্যে?’
মণি বলল, ‘সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? মিলিটারিরা যখন তাদের ট্যাংক, ট্রাক, ক্যানন এগুলোকে লুকিয়ে রাখে তখন কি খুব ঝলমলে আলোর নীচে সাজিয়ে রাখে? সেগুলোকে এইরকম জল-জঙ্গলের মধ্যেই লুকিয়ে রাখে।’
‘তুই বলতে চাইছিস, এই হাওরের মধ্যে কোথাও লুকোনো রয়েছে নোয়ার নৌকা?’
‘নোয়ার কিংবা মনুর কিংবা আর কারুর। কার সেটা বড়ো কথা নয়। কথা হচ্ছে, হ্যাঁ, এখানেই রয়েছে সেই নৌকা।’
‘কেমন করে বুঝলি?’
‘এই যে মন্দিরটা দেখছিস না,’ মণি ঘরের চারপাশে হাত ঘুরিয়ে দেখাল, ‘এই মন্দিরটার বয়সের গাছপাথর নেই। অথচ এই হাওরের এদিকটায় লোকই বাস করে না। আজ বলে নয়, কোনওদিনই করত না।’
‘কেন?’ আমি অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম। আমার অবাক হওয়ার কারণ ছিল। মণির এখানে আসবার আগে হাওর নিয়ে একটু পড়াশনা করে এসেছিলাম। দেখেছিলাম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে হাওরের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে একইসঙ্গে কৃষিজীবী মানুষ নাবাল জমিতে ধান চাষ করে, মৎস্যজীবীরা জলে মাছ ধরে। আর জল নেমে গেলে যে তৃণভূমি জেগে ওঠে সেখানে রাখালেরা গরু চরায়। কাজেই হাওর তো জনহীন হওয়ার কথা নয়।
আমার সংশয়ের কারণটা মণি বুঝতে পারল। বলল, ‘এর পিছনে স্থানীয় লোকেরা যে ভয়ের গল্পটা বলে থাকে সেটাই তো আমাকে এখানে টেনে আনল। এখানকার লোকে বলে, হাওরের এই অংশে নাকি এক দানবিক মাছের বাস। সেই মাছের কথা জানে বলেই এখানকার জলে কোনও ছোটো মাছ সাঁতার কাটে না। পাড়ে কাদাখোঁচার মতো পাখি কিংবা উদবিড়ালের মতন প্রাণীরা বাস করে না। এমনকি এখানকার আকাশ দিয়ে পাখিও উড়ে যায় না। সাপও নেই এখানকার মাটিতে।
কথাগুলো সত্যি। আমি গত একবছর এখানে রয়েছি। তার মধ্যে এখানে পোকামাকড় ছাড়া অন্য কোনও প্রাণের চিহ্ন দেখিনি। কিন্তু অন্য কয়েকটা জিনিস দেখেছি।’
‘যেমন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘কপালে থাকলে তুইও দেখবি। দেখবি, হঠাৎই কিছুটা দূরে রাতের হাওর একটা জায়গায় কুঁজের মতো ফুলে উঠল। যেন ওখানে জলের নীচে এক বিশাল মাছ ঘাই মারল। আর সঙ্গে সঙ্গেই আঁশটে গন্ধে বাতাস ভরে গেল।’
একটু চিন্তা করে বললাম, ‘মহামৎস্য যদি এখানে থাকেনও, তা হলেও একটা সমস্যা থেকে যাচ্ছে। নৌকার কিছু প্রত্ন অবশেষ না পেলে তুই বাইরের লোকের কাছে তোর থিয়োরি প্রমাণ করবি কেমন করে? কেমন করে বলবি, এই মহামৎস্যই সেই মহাপ্লাবনের রক্ষাকর্তা?’
মণিরত্ন কেমন অদ্ভুতভাবে হেসে বলল, ‘আর দুটো দিন থেকে যা। থাকতে তোকে হবেই। একটা ঝড়তুফানের ফোরকাস্ট আছে। শুনতে পাচ্ছিস, মেঘ ডাকছে? এখনই বৃষ্টি নামবে। প্রলয়ংকর বৃষ্টি। তার মধ্যেই তুই তোর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবি।’
সেই প্রথম আমার মনে হল, মণি বোধহয় আর স্বাভাবিক নেই। পাগল হয়ে গেছে। ওর উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। জানালার কাচের মধ্যে দিয়ে দেখলাম, একটু আগের তারা-ভরা আকাশ মুহুর্মুহু বিদ্যুতের শিখায় পুড়ে যাচ্ছে। সেদিকেও বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। বললাম, ‘ক্লান্ত লাগছে। চল শুয়ে পড়ি।’
***
সেই যে বৃষ্টি নামল, সেই বৃষ্টি আর থামল না। কোনওদিন থামবে বলেও মনে হচ্ছিল না। মণি চুপ করে ঘরের এককোনায় বসে ছিল আর নিজের মনে বিড়বিড় করে কীসব যেন বলে যাচ্ছিল। আমি নিজেই চালডাল খুঁজে পেতে নিয়ে খিচুড়ি বানাচ্ছিলাম। প্রথম দু’দিন সেই খিচুড়ি দিয়েই ক্ষুন্নিবৃত্তি করলাম। তারপর শুকনো কাঠ ফুরিয়ে গেল। তখন জলে একমুঠো চাল ভিজিয়ে তা-ই চিবোলাম। মণিকেও একমুঠো দিতে গেলাম। ও নিল না।
ওর পাশে বসে শুনছিলাম, ও মানুষের পাপের কথা বলে চলেছে। হিংসা, খুন, ধর্ষণের কথা বলে চলেছে। ঠিক এমনই অবস্থা নাকি বারবার ফিরে এসেছিল মানুষের ইতিহাসে আর প্রতিবারই নেমে এসেছিল মহাপ্লাবন।
মণিরত্নের এই মন্দিরটি ভারী অদ্ভুত। কোনও বিগ্রহ নেই। পুজোপাঠেরও কোনও চিহ্ন নেই। তবু মানুষজন একে মন্দির বলেই জানে। ইট-পাথরের নয়, কাঠ দিয়ে তৈরি এর মেঝে, দেওয়াল আর ছাদ। সে যে কত পুরোনো কাঠ, কে জানে। রোদে-জলে পাথরের মতো কালো হয়ে গেছে তার রং। পাথরের মতোই শক্ত হয়ে গেছে তার ফাইবার।
তৃতীয় দিনে ঘরে একজোড়া সাপ ঢুকে এল। আমি মারতে যাচ্ছিলাম। মণি বলল, ‘কী করছিস? তুই কি সব ভুলে গেলি? থাকতে দে ওদের।’
সাপদুটো কুণ্ডলী পাকিয়ে খাটের নীচে গিয়ে শুয়ে রইল। তারপর দরজার ফাঁক দিয়ে এল দুটো ইঁদুর। তারাও সাপদুটোর পাশে গিয়ে থাবার মধ্যে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি বললাম, ‘মণি, তুই যে বলেছিলিস এদিকে কোনও প্রাণী বাস করে না? কোনও মানুষও না?’
মণি বলল, ‘করে না-ই তো। ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে। আরও আসবে। অপেক্ষা কর।’
সত্যিই এল। চতুর্থ দিনে দুটো চিতাবাঘ এসে পিছনের উঠোনে, কার্নিশের ছায়ায় শুয়ে পড়ল। দুটো বক, একঝাঁক পানকৌড়ি, আরও কত অজানা পশু, অজানা পাখি। মন্দিরের ভেতরেই হোক কিংবা বাইরে, আমাদের আর পা ফেলার জায়গা রইল না।
ওদিকে বৃষ্টি পড়েই চলেছিল। এক মুহূর্তও বিরাম ছিল না। জানালা দিয়ে দেখলাম, জল ছাড়া কোথাও আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। আকাশের ধূসর মেঘ আর হাওরের ধূসর জল যেন একে অন্যের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। সেই জল সাঁতরে দুটো ঘড়িয়াল আর দুটো মাছশিকারি ভোঁদড় এসে উঠল মন্দিরের উঠোনে। তারপর ঘরে ঢুকে এল।
প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পেটে কিছুই যায়নি আমাদের। এই যে এত প্রাণী জোড়ায় জোড়ায় শুয়ে-বসে আছে, তারা কেউই কিছু খায়নি। আমি ভাবছিলাম, হয়তো ওরা এবার নিজেদের মধ্যে মারামারি করে একে অন্যকে খাবে। কিন্তু সেরকম কিছু হল না। কী এক অলৌকিক উপায়ে যেন আমাদের দেহ থেকে খিদে আর ঘুমের প্রয়োজন অন্তর্হিত হয়েছিল। আমরা সবাই এক ঝিমুনির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছিলাম।
সপ্তম রাত্রে ঝোড়ো হাওয়ায় হঠাৎই যেন জাহাজের ভেরি বেজে উঠল। সে কী গর্জন বাতাসের! আমি আর মণিরত্ন চতুর্দিকে শুয়ে থাকা পশুপাখিগুলোকে বাঁচিয়ে বাইরে গিয়ে দেখলাম, জলের ঢেউয়ে একটি নারী ভেসে এসেছে। যুবতি, শ্যামাঙ্গী। উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। আমরা দু’জনে ধরাধরি করে ওকে ঘরে এনে শোয়ালাম। মণি বলল, ‘এবার নৌকা ছাড়বে। এই মেয়েটির জন্যই তিনি অপেক্ষা করছিলেন।’
অবাক হয়ে বললাম, ‘নৌকা! মানে? তিনিই বা কে?
মণি বলল, ‘কিছুই বুঝিসনি এখনও? তিনি মানে মহামৎস্য। ওই দেখ, নৌকা ছেড়েছে।’
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, মন্দিরের পাথরের উঠোনটাকে পিছনে ফেলে, কাঠের স্ট্রাকচারটা দ্রুতবেগে মাঝ-হাওরের দিকে ছুটে চলেছে। অদৃশ্য টানে প্লাবনের নৌকা পাহাড়ের দিকে এগোচ্ছে।
সেই মেয়েটি চৈতন্য ফিরে পেয়ে বুকের ওপরে একটুকরো কাপড় টেনে নিল। মণি বলল, ‘রুদ্র! আমাদের দু’জনের তো এই নৌকায় একসঙ্গে থাকা হবে না।’
আমি বললাম, ‘কেন?’
ও বলল, ‘সেটাই তো নিয়ম। সেরকমই তো হয়ে এসেছে। প্ৰতি প্রজাতির একটিই পুরুষ, একটিই নারী।’
কথা বলতে বলতে আমরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। যেটাকে এতদিন কাঠের পাটা দিয়ে তৈরি বারান্দা ভাবতাম এখন দেখছি সেটা আসলে এই বিশাল নৌকার গলুই। বেরোনোমাত্রই ছুরির মতন বৃষ্টির ধারায় আমাদের চোখ-মুখ যেন ফালাফালা হয়ে গেল। একটা নীল বিদ্যুতের রেখা কী যেন অলৌকিক পন্থায় স্থির হয়ে রইল আকাশে।
সেই নীল আলোয় দেখলাম, দূরের পাহাড়ের কাঁধের কাছে জলের ঢেউ ভাঙছে। দেখলাম, জলের স্রোতে ভেসে চলেছে গ্রাম-নগরের ধ্বংসস্তূপ, মৃত পশুপাখি আর মানুষ। পৃথিবীর বুক থেকে সবকিছু চেঁছে নিয়ে চলে যাচ্ছে এই মহাপ্লাবন।
আর দেখলাম, মুখে শৈবালের কাছি ধরে মণিরত্নের মন্দিরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল যে মহামৎস্য, সে এবারে আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়েছে। তার নিষ্পলক দুই চোখে ঘন হয়ে রয়েছে করুণা। আগামী দিনের মানুষের স্বার্থেই সে আমার আর মণির মধ্যে একজনকে গ্রাস করবে। তিরবেগে এগিয়ে আসছে কিরিচের মতো দাঁতের পাটিতে সাজানো ইস্পাতকঠিন মৎস্যমুখ
আমরা দু’জনেই চোখ বুজলাম।

এই গল্পটা একেবারেই গালগল্প। ভালো লাগল না। আরও অনেক কিছু ভাবা যেতে পারত।
Achha ei motso purane bisnur abotar chilo na? Ekhane brohmar kotha bola hoeche. Eta ki thik