পারাপার
রেললাইনের ধারে একটা বাতিল কংক্রিটের স্ল্যাবের ওপরে চুপ করে বসে ছিল কান্তি ডোম। তখন সন্ধে নামছিল। ভাদ্রমাসের আকাশ ধূসর কম্বলের মতন মেঘে ঢাকা; শুধু পশ্চিমপ্রান্তে নখের আঁচড়ের মতন একটু লাল দাগ। ওইখানেই খানিক আগে সূর্য অস্ত গেছে।
রেললাইনের বাঁ-দিকে দুধফেনি গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে একটা- দুটো করে সাঁঝের আলো জ্বলে উঠছে। ডানদিকে কিছুটা দূরে দেখা যায় শিমুলে নামে অন্য একটা গ্রামের আলো। দুধফেনি আর শিমুলে— এই দুই গ্রামের মাঝখানে শুধু ধানখেত আর খেতের বুক চিরে এই রেললাইন।
কেটে গেল আরও প্রায় কুড়ি মিনিট। অন্ধকার আরও গাঢ় হল। লাইন ধরে হু হু শব্দে বেরিয়ে গেল একটা আপ প্যাসেঞ্জার ট্রেন। মাটিতে কয়েক মুহূর্তের কাঁপন, লাইনের পাশের ঝোপঝাড়ের গায়ে দ্রুত কিছু আলোর ঝলক। তারপর আবার সব আগের মতোই নিস্তব্ধ, আগের মতোই অন্ধকারে ঢাকা।
এই কুড়ি মিনিটের মধ্যে কান্তি এতটুকু নড়েনি। বর্ষার বৃষ্টি পেয়ে স্ল্যাবটার চারিপাশের নরম মাটিতে আকন্দ আর পুটুসের গাছ মাথা তুলেছে। তাই খুব কাছ থেকেও বোঝা মুশকিল যে, ওখানে একজন মানুষ বসে আছে। একটু আগেই একটা মেছো বেড়াল ঘুরতে ঘুরতে কান্তির একদম গায়ের কাছে এসে পড়েছিল।
কান্তি ডোম। বছর চল্লিশ বয়স, কষ্টিপাথরে খোদাই করা চেহারা। হাঁটুর ওপরে মালকোঁচা মেরে পরা সাদা ধুতি আর গায়ে একটা লাল বনাতের ফতুয়া, এ-ই তার সবসময়ের পোশাক। তাছাড়া গলায় একগোছা পাথরের মালাও থাকে।
এই যে এখন পুতুলের মতন বসে আছে মানুষটা, বাশুলিতলার শ্মশানে গেলে কিন্তু এই মানুষেরই অন্য মূর্তি দেখা যাবে। তখন সে এই কাঠ চ্যালা করছে তো এই চিতা সাজাচ্ছে। মৃতের আত্মীয়ের হাতে জ্বলন্ত খড়ি ধরিয়ে দিয়ে তাকে দিয়ে শেষ এক-দুটো মন্ত্র পড়ানো, দাহশেষে তাকে দেখিয়ে দেওয়া কোথায় অস্থিতে জল ঢালবে আর কোথায় জলপাত্র ভেঙে দিয়ে পিছনে না ফিরে শ্মশান থেকে বেরিয়ে যাবে, সবই ওই কান্তি ডোমেরই কাজ।
তবে কখনও কখনও অন্য একটা কাজের জন্য শ্মশানের বাইরেও কান্তি ডোমের ডাক পড়ে। সেই কাজটা হল ভূত ছাড়ানো। কান্তি অবশ্য নিজেকে ওঝা বা গুনিন কিছু বলেই দাবি করে না। ও বলে, আত্মাদের ও দেখতে পায়; তাঁদের কথা শুনতে পায়। প্রার্থনা করতে পারে, যেন ভূতে পাওয়া মানুষটাকে তাঁরা ছেড়ে যান। ব্যস, এইটুকুই। কান্তির অনুরোধ যদি তাঁরা রাখলেন ভালো। না হলে, কান্তি হাতজোড় করে বলে দেয়, ‘পারলাম না, বাবু। পারলাম না, মা ঠাকরুন। আপনারা অন্য কাউকে ডাকুন।
সরষেপোড়া, ঝাঁটা মারা— কান্তির কাজের মধ্যে ওরকম রোমাঞ্চকর কোনও আচার-অনুষ্ঠানও থাকে না। তা সত্ত্বেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে সফল হয়। কেউ সফলতার প্রসঙ্গ তুললে ও শান্ত হেসে বলে, ‘আমার গায়ে যে ওঁরা চেনা গন্ধ পান গো, বাবু। পৃথিবীর সঙ্গে শেষ বাঁধনের গন্ধ… পোড়া কাঠ, ঘি আর অগুরুর গন্ধ। তাই আমার কথা ওঁরা ফেলতে পারেন না।’
আজ সেরকম একটা ভূত-ছাড়ানোর দায়িত্ব নিয়েই এই রেললাইনের মাঠে এসে বসে আছে কান্তি।
দুধফেনি বাজারের অন্নপূর্ণা অয়েল মিলের মালিক হলেন গণেশ হাজরা। তার ছেলে গৌতম হাজরার ওপর ভূতের ভর হচ্ছে। ভরটা হচ্ছে এইখানে, এই রেললাইনের মাঠে; এবং ঠিক সন্ধের সময়টাতে। তাই আগেভাগেই এখানে এসে বসে আছে কান্তি। আসবার আগে পইপই করে গণেশবাবুর বাড়ির লোককে বলে এসেছে, কেউ যেন তার পিছু না নেয়। তাতে বিপদ হবে।
***
এতক্ষণে সামান্য নড়েচড়ে বসল কান্তি। সে দেখতে পেয়েছে গৌতম এসেছে। ওই যে, যেন ঘুমের ঘোরে হেঁটে যাচ্ছে রেললাইনের দিকে। আরও পরিষ্কার করে দেখবার জন্য মুখের সামনে দুলতে থাকা একটা আকন্দের ডাল সাবধানে মুচড়ে ভেঙে ফেলল কান্তি। দেখল, গৌতম রেললাইন পার হয়ে, মাঠের আল ধরে শিমুলে গ্রামের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। একটু বাদেই অবশ্য ধানখেতের অন্ধকার তাকে কান্তির চোখের আড়াল করে দিল।
গৌতমকে ছোটোবেলা থেকেই চেনে কান্তি। দুধফেনি এখন গ্রামের পরিচয় ছেড়ে ক্রমশ শহর হয়ে উঠছে ঠিকই— পিচরাস্তার ধারে পাকা বাড়ি উঠছে, বিজলি এসেছে, ঘরে ঘরে টু-হুইলার আর পাড়ায় পাড়ায় হাস্কিং মেশিন— তবু লোকসংখ্যা তো বেশি নয়। তাই সবাই সবাইকে চেনে। আর সকলের মতন কান্তিও জানত যে, পোস্টমাস্টারমশাইয়ের মেয়ে কাবেরীর সঙ্গে গৌতমের ভালোবাসা-বাসি।
বাইশ বছরের গৌতম আর সতেরো বছরের কাবেরী। গত বছর থেকে ওদের দু’জনকে কখনও ক্যানালের পাড়ে মোরামের রাস্তায়, কখনও স্টেশনে ওভারব্রিজের টঙে আবার কখনও বা একেবারে তার নিজের জায়গায়, মানে বাশুলিতলার মন্দিরের পিছনের বাগানে বসে প্রেম করতে দেখেছে কান্তি। আরও অনেকেই দেখেছে। সকলেই জানত কাবেরী আর গৌতমের চারহাত এক হয়ে যাবে, শুধু ওদের পড়াশোনাটা শেষ হওয়ার অপেক্ষা। ওদের বাড়ির লোকেরাও সেটাই ঠিক করে রেখেছিল।
কিন্তু সেটা হল না। একমাস আগে ঠিক ওইখানটায়, ওই যেখান দিয়ে একটু আগে রেললাইন পেরিয়ে চলে গেল গৌতম, ওইখানটায় ডাউন ট্রেনে কাটা পড়ল কাবেরী সাহা।
কান্তির মনে পড়ছিল, সেদিন রাতে কাবেরীর দুই দাদার সঙ্গে ধরাধরি করে যখন সে ওর রোগা শরীরটাকে চিতায় তুলছে, তখন পাশ থেকে এগিয়ে এসেছিল এই গৌতম। সদ্য মর্গ-ফেরত কাবেরীর ঠান্ডা কপালে ডাক্তারবাবুর গুনছুঁচের ক্রশ-সেলাই। সেই সেলাইয়ের দাগের ওপরেই আলতো করে হাত বুলিয়ে গৌতম ফিসফিস করে বলেছিল ‘ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো!’ ওর সেই স্বর এখন আবার কান্তি ডোমের কানে বেজে উঠল।
ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কেন? গৌতমের অপরাধটা কী?
সেটাই আজ সকালে গৌতমের বাবা গণেশবাবুর মুখে শুনে এসেছে কান্তি। ব্যাপারটা হচ্ছে, দুধফেনি গার্লস স্কুলের ছাত্রী কাবেরী সাহা সামনের বছর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় বসত আর তার প্রস্তুতি হিসেবে সে শিমুলে গ্রামের অঙ্কের শিক্ষক তপন রক্ষিত স্যারের কাছে প্রাইভেট টিউশন পড়তে যেত সপ্তাহে দু’দিন— সোমবার আর বুধবার সন্ধেবেলায়।
দুধফেনি আর শিমুলের মধ্যে যাতায়াতের রাস্তা দুটো। একটা লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে পাকা রাস্তা; সেই রাস্তার দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন কিলোমিটার। অন্য রাস্তাটাকে ঠিক রাস্তা বলা যায় না। যেখান দিয়ে গৌতম একটু আগে লাইন পেরোল, ওইখানেই রেললাইন টপকে, ধানখেতের আল ধরে হেঁটে গেলে শিমুলে গ্রামের দূরত্ব দাঁড়ায় মাত্র এক কিলোমিটার।
গণেশবাবু বলছিলেন, কাবেরী পাকা রাস্তা ধরেই যাতায়াত করত, তবে পায়ে হেঁটে নয়। পায়ে হেঁটে সাত কিলোমিটার রাস্তা ভাঙতে বয়েই গিয়েছিল তার। তার প্রেমিকের হন্ডা সিটি বাইক ছিল না?
হ্যাঁ, সপ্তাহে দু’দিন গৌতমই তার টু-হুইলারে চাপিয়ে কাবেরীকে তপনবাবুর বাড়িতে দিয়ে আসত। আবার সময়মতন নিয়েও আসত।
শুধু যেদিন কাবেরীর অ্যাকসিডেন্ট হল, সেই সোমবারটায় গৌতম ব্যাবসার কাজে সাঁইথিয়ায় গিয়ে সময়মতন ফিরতে পারেনি। তাই কাবেরী সেদিন তপনস্যারের বাড়ি গিয়েছিল লাইন পেরিয়ে আবার ফিরছিলও লাইন পেরিয়ে। আর ফিরবার সময় ওই লাইন পেরোতে গিয়েই ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ল মেয়েটা।
কান্তি এখন বুঝতে পারছে যে, সেইজন্যই গৌতম সেদিন কাবেরীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। ওকে একলা ছেড়ে দিয়েছিল বলে।
তবে গৌতমের মন শুধু অপরাধবোধে আটকে থাকলে গণেশবাবু কান্তিকে ডেকে পাঠাতেন না। সেক্ষেত্রে তিনি হয়তো ছেলেকে সাইকায়াট্রিস্ট দেখাতেন। কিন্তু তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আর মেয়ে, তাঁরা তিনজনেই নিশ্চিত যে, তারপরেও একটা ভৌতিক ঘটনা ঘটছে।
‘ঘটনাটা কী?’ প্রশ্ন করেছিল কান্তি।
গণেশবাবু বলেছিলেন, প্রতি সোমবার সন্ধেবেলায়, ঠিক যে-সময়ে কাবেরীর অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছিল, সেইরকম সময়েই কাবেরীর আত্মা গৌতমকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে রেললাইনের মাঠের দিকে।
‘তারপর?’ শুনতে শুনতে খাড়া হয়ে বসেছিল কান্তি।
কান্তির প্রশ্ন শুনে গৌতমের মা চোখে আঁচল চাপা দিয়েছিলেন আর ওর বাবা ধরাগলায় যেন কান্না চাপতে চাপতে বলেছিলেন, ‘তারপর কী কী ঘটে, তা আমরা কয়েকবার ওর পিছন পিছন গিয়ে দেখেছি, কান্তি। কিন্তু সে আমি মুখে বর্ণনা করতে পারব না। কাল তো সোমবার। কাল বরং তুমি নিজের চোখেই একবার দেখে এসো। তারপর দেখো, যদি আমার ছেলেটাকে বাঁচাতে পারো। তার জন্য শান্তি-স্বস্ত্যয়ন যা করতে হয়, পোস্টমাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আমি করাব।’
সেইজন্যই আজ এখানে এসেছে কান্তি।
***
দশ মিনিটও কাটেনি, ওখানে বসেই কান্তি দেখতে পেল, গৌতম আবার ফিরে আসছে। ঢাল বেয়ে উঠে আসছে লাইনের ওপর। এবার ও লাইন পেরিয়ে এদিকে নামল।
কিন্তু যে গৌতম লাইন পেরিয়ে শিমুলের দিকে গিয়েছিল, আর যে গৌতম দুধফেনিতে ফিরে এল, তারা যেন এক নয়।
এই গৌতম কাঁধে করে একটা অদৃশ্য শরীরকে বয়ে নিয়ে আসছে। বাইশ বছরের জোয়ান ছেলেটা সেই শরীরের ভারে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। দুটো হাত বুকের কাছে এমনভাবেই মুঠো করে ধরে রেখেছে যে, দেখলেই বোঝা যায়, ওর কাঁধের ওপরে দু’দিকে পা ঝুলিয়ে যে বসে রয়েছে তাকে সে পড়ে যেতে দেবে না। পড়ে যেতে দেবে না বলেই ও তার অদৃশ্য পা দুটোকে নিজের বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। এই অবস্থাতেই রেললাইন পেরিয়ে মাঠের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুধফেনির গৌতম হাজরা
কান্তি ডোম এইবার চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় কংক্রিটের স্ল্যাব থেকে লাফিয়ে নামল। একবার নিজের গলায় ঝোলানো পাথরের মালাগুলোকে মুঠোর মধ্যে চেপে ধরেই হনহন করে মাঠ পেরিয়ে গৌতমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ডাক দিল, ‘দিদিমণি! চিনতে পারছ? আমি কান্তি ডোম। দিদিমিণি!’
গৌতম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এখনও সে ওভাবেই ভারবহনের ভঙ্গিতে সামনের দিকে ঝুঁকে আছে; শুধু তার চোখের ঘোর কেটে গেছে। সেখানে ফুটে উঠেছে ক্রোধ।
কান্তির প্রশ্নের উত্তরে গৌতম কথা বলল এক সতেরো বছরের মেয়ের গলায়। রিনিরিনে গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী চাই?’
কান্তি বলল, ‘দিদিমণি! তোমাকে দাহ করে তো সবাই ঘরে চলে গেলেন। তারপর যা ঘটেছিল, সেটা কেউ জানেন না। তোমার নাভির কলস নদী থেকে উঠে আবার শ্মশানঘাটে এসে লেগেছিল। আমি নিজের হাতে তিন-তিনবার সেই কলস নদীতে ছুড়ে ফেলেছিলাম। তিনবারই নদী থেকে ছিটকে এসেছিল সেই কলস। সেই নাভি আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। এবার তাকে চিরতরে ভাসিয়ে দিতে চাই। কিন্তু তার আগে একটা কথা বলো তো, দিদিমণি।’
‘কী কথা?’
‘তুমি রেলে কাটা পড়লে কেমন করে? লাইনের ধারে বাস তোমাদের। জ্ঞান হওয়া ইস্তক রেললাইন পারাপার করে যাতায়াত। সব ট্রেনের টাইম মুখস্থ। লাইনের প্রতিটি পাথর চেনা। এই দুধফেনির কেউ তো কোনওদিন রেলের তলায় কাটা পড়েনি। তুমি কেমন করে কাটা পড়লে?’
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর গৌতমের গলা দিয়ে নারীকণ্ঠে হাহাকার বেরিয়ে এল— ‘ভয় পেয়েছিলাম যে, কান্তিদা। ভয়ে যে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম!’
‘ভয়! কীসের ভয়?’
‘অন্ধকার মাঠের মধ্যে মাতালগুলো আমাকে ঘিরে ধরেছিল। আমার কামিজের বুকের কাপড় ধরে একজন টান মারতেই আমি দৌড়োতে শুরু করেছিলাম। সত্যি বলছি, ট্রেনের হুইস্ল শুনতে পাইনি, হেডলাইটের আলো দেখতে পাইনি। এরকম যে হতে পারে তা কি আমি নিজেও কোনওদিন ভেবেছিলাম?’
কান্তি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। যে দৃশ্য সে চর্মচক্ষে দেখেনি, সেই অপমানের দৃশ্যই তার কল্পনায় রূপ নিচ্ছিল। রাগিয়ে তুলছিল সেই শ্মশানবাসী ডোমকে। একটু বাদে কান্তি খুনির মতন ঠান্ডা গলায় গলায় প্রশ্ন করল, ‘মাতাল মানে? ওই পুবের মাঠে পাম্পঘরের পিছনে যে চুল্লুর ঠেকটা গজিয়েছে, ওখানকার খদ্দেররা?’
গৌতমের মুখ দিয়ে কাবেরীর উত্তর ভেসে এল, ‘হ্যাঁ, আবার কারা?’
‘দিদিমণি, এই ভয় নিয়ে কতদিন ঘুরবে?’
কান্তির এই কথায় পাগলির মতন হেসে উঠল কাবেরীর প্রেত। বলল, ‘কেন? চিরকাল। চিরকাল গৌতম আমাকে পিঠে নিয়ে লাইন পার করে দেবে। ও সঙ্গে থাকলে আর কেউ আমাকে রেপ করার কথা ভাবতে পারবে? বলো না? সেদিন ও ছিল না বলেই না জানোয়ারগুলো এত সাহস পেয়েছিল।’
লাইনের পাশে রেল-কোম্পানির অনেক বাতিল লোহালক্কড় পড়েছিল। কান্তি নিচু হয়ে তার মধ্যে থেকে দুটো লোহার রড কুড়িয়ে নিয়ে একটা গৌতমের হাতে গুঁজে দিল। অন্যটা নিজে বাগিয়ে ধরে বলল, ‘ভয় কাটানোর তার চেয়ে ভালো উপায় আছে। চলো দেখি আমার সঙ্গে।’
কথাটা কান্তি অবশ্য গৌতমকে বলেনি। বলেছিল গৌতমের শরীরটাকে যে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সেই কাবেরীর প্রেতকে। সে রাজি হয়েছিল যেতে।
***
একটু বাদে পাম্পঘরের পিছনে চুল্লুর ঠেকের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে গেল। কান্তি শুধু চোলাইয়ের ক্যানগুলোকে উনুনের মধ্যে ছুড়ে ফেলেছিল, যার ফলে একটা বিস্ফোরণের সঙ্গে চালাঘরের চতুর্দিকে আগুন লেগে গিয়েছিল। অন্যদিকে গৌতমের হাত দিয়ে কাবেরী যে দশ-বারোটা লোকের মাথা ফাটিয়েছিল, তারা কোনওরকমে হামাগুড়ি দিয়ে সেই অগ্নিকুণ্ড থেকে বেরিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিল ঠিকই, তবে তারপর তারা আর বেশিদূরে যেতে পারেনি। ওই জলকাদার মধ্যেই মুখ গুঁজে পড়েছিল।
রেললাইন পেরিয়ে দুধফেনির মাটিতে পা দিয়ে কাস্তি একবার পিছন ফিরে দেখল, মাঠের মধ্যে অনেক টর্চের আলো ঘোরাঘুরি করছে। পুলিশ না দমকল সে বুঝতে পারল না। বোঝার দরকারও নেই। কাবেরীর প্রাণ নিয়েছিল যে ডাউন ট্রেনটা, সেটাও এইমাত্র ঝমঝম শব্দ করে বেরিয়ে গেল।
রাত্রির নির্জন রাস্তা ধরে গৌতমকে নিয়ে বাশুলিতলার শ্মশানে পৌঁছোল কান্তি। ও তখনও কুঁজো হয়ে হাঁটছে। বুকের কাছে ধরে রেখেছে কাবেরীর দুটো পায়ের গোছ। জনহীন শ্মশানঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কান্তি বলল, ‘দিদিমণি, এবার গৌতমকে ছেড়ে দাও। রক্তমাংসের পাপী-তাপী জীবকে আশ্রয় করবে কেন? ভয় তো কেটে গেছে। এবার তুমি আলো হয়ে, সুগন্ধ হয়ে নিশ্চিন্তে বিহার করো।’
‘কোথায় যাব?’ কাবেরীর গলায় কিছুক্ষণ আগের সেই ক্রোধ আর নেই। সতেরো বছরের এক বিহ্বল কিশোরীই যেন কান্তিকে প্রশ্নটা করল।
ঘাটের পাশে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রাখা একটা মুখবন্ধ মাটির কলসি দু’হাতে তুলে নিয়ে কান্তি বলল, ‘মুনিঋষিরা যে দেশের ঠিকানা বলতে পারেননি, আমি মূর্খ চণ্ডাল কি সেই ঠিকানা বলতে পারি, দিদিমণি? তবে এটুকু জানি যে, এ তোমার নাভিনৌকা। তুমি এতে চড়ে যদি নদীর স্রোতে ভেসে পড়ো, একসময় ঠিক আলোর দেশে পৌঁছে যাবে। এসো, দিদিমণি।’
কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। তারপর গৌতম হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল, মানে দাঁড়াতে পারল। তার কাঁধের বোঝা নেমে গেছে। হাতদুটোকে বুকের কাছ থেকে তুলে, দু’চোখ কচলে বলল, ‘এ কী? কান্তিদা? আমি বাগুলিতলায় চলে এলাম কেমন করে?’
কান্তি বলল, ‘পরে বলছি। এখন এই কলসিটা তুমিই হাতে করে নদীতে ভাসিয়ে দাও দেখি। তোমার চেয়ে বেশি অধিকার কার? শীতল হোক, জুড়িয়ে যাক ওর সব দাহ।’

দারুন দারুন