ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

গোপন প্রেমিক – সৈকত মুখোপাধ্যায়

গোপন প্রেমিক

রবিবার সকালে বৈঠকখানা বাজারে সাপ্তাহিক বাজার করতে গিয়েছিলেন নাট্যপরিচালক জয়দেব সরকার। মাছ আগেই কেনা হয়ে গিয়েছিল। এক আঁটি শিষপালং কিনে দাম মেটাতে মেটাতেই শুনতে পেলেন পকেটে মোবাইল ফোনটা বাজছে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন ‘ওয়াইফ- কাবেরী’ ফোন করেছে। অন্য একজন কাবেরী আছে, এল. আই. সি.-র এজেন্ট। তার নামটা ‘এল আই সি-কাবেরী’ বলে সেভ করা আছে। জয়দেববাবু বউয়ের ফোন রিসিভ করলেন।

‘বলো।’

‘তোমার বাজার করা সারা হয়েছে? তা হলে অন্য কোথাও না গিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো। থানা থেকে লোক এসেছিল। তোমাকে খুঁজছে।’

সে কী! অবাক এবং আশঙ্কিত হলেন জয়দেববাবু। তিনি শখের নাটকের দল চালান। এ. জি. বেঙ্গলে চাকরি করেন। তাকে থানা থেকে খুঁজবে কেন? কাবেরী আবার বলল, ‘আমি তোমার মোবাইল নাম্বার দিয়ে দিয়েছি। দেখো, ওরাই ফোন করে কি না।’

কাবেরী বোধহয় হাত গুনতে জানে। মোবাইলটা খদ্দরের পাঞ্জাবির পকেটে পুরোপুরি ঢোকানোরও সময় পেলেন না, তার আগেই আবার বেজে উঠল। অচেনা নাম্বার। জয়দেববাবু উত্তর দিলেন, ‘হ্যালো।’

উলটো দিক থেকে গম্ভীর গলায় একজন বললেন, ‘আমি কি মিস্টার জয়দেব সরকারের সঙ্গে কথা বলছি?’

‘হ্যাঁ, বলুন।’

‘নমস্কার, আমি লেবুতলা থানার ওসি কল্যাণ বোস বলছি। ফাইভ বাই টু সার্পেন্টাইন লেনে আপনার একটা ঘর ভাড়া নেওয়া আছে?’

‘হ্যাঁ, মানে আমার একটা নাটকের দল আছে। ধানসিঁড়ি। তার রিহার্সাল-টিহার্সালের জন্যই ওই ঘরটা…’

‘জানি। যদি অসুবিধে না হয়, একবার ওখানে চলে আসতে পারবেন? একটা ব্যাপারে একটু হেল্প লাগবে।’

‘পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছোচ্ছি।’ ফোন ছেড়ে দিয়ে জোরকদমে বাড়ির দিকে পা চালালেন জয়দেববাবু।

বাড়ি ফিরে বাজারের ব্যাগটা কাবেরীর হাতে ধরিয়ে দিয়েই জয়দেববাবু আবার বেরিয়ে পড়লেন। ওঁর বাড়ি থেকে মহলার ঘরে পৌঁছোতে ঠিক সাড়ে সাত মিনিট সময় লাগে।

সবে বছরখানেক আগে বারো হাজার টাকা সেলামি আর মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়ার চুক্তিতে ঘরটার পজেশন নিয়েছেন জয়দেববাবু। এর চেয়ে কম টাকায় এ তল্লাটে আর কিছু জোগাড় করতে পারতেন না।

তার মানে কি পাড়াটা খুব অভিজাত? সুযোগ-সুবিধে দারুণ?

উহুঁ, একেবারে উলটো। শেয়ালদা ফ্লাইওভারের দক্ষিণ দিক থেকে ঢুকে আসা এই সার্পেন্টাইন লেন একটা সরু রাস্তা। দু’পাশের বাড়িগুলোর বয়স সত্তর-আশি বছরের নীচে নয়। সেঞ্চুরি করেছে এরকম বাড়িও বেশ কয়েকটা রয়েছে। সবক’টা বাড়িই পলেস্তারা খসা, ইট বার করা। দেওয়ালে ড্যাম্প, কার্নিশে বটের চারা।

সামনের রাস্তাটায় সারাক্ষণ বড়ো বড়ো লরি ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। সে তো হবেই। এই রাস্তাতেই তো কোলে বাজার। ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সবচেয়ে বড়ো আলু-পেঁয়াজের আড়ত। শীতকালে তার সঙ্গে যোগ হয় ফুলকপি আর টমেটো। কপির পাতা আর কানা টমেটো রাস্তার পাশেই পড়ে পড়ে পচে। হিন্দুস্থানি মুটেরা ড্রেনের ধারে উবু হয়ে বসে রিলে- মূত্রত্যাগ করে যায়। জানালা খোলা থাকলে সামনের রাস্তাটা থেকে পচা পাতা আর পেচ্ছাপের তীব্র গন্ধের ককটেল ঘরে ঢুকে প্রাণ ওষ্ঠাগত করে ছাড়ে। সেইজন্যই শীত-গ্রীষ্ম, দিন-রাত্তির ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে ভেতরে টিউবলাইট জ্বালিয়ে বাস করতে হয়।

জয়দেববাবুর ঘরটাও ওইরকম। সামনের রাস্তাটা ভয়ংকর রকমের সরু। দুটো পাঞ্জাব-ডালার বিশাল লরি যখন একে অন্যকে পাশ কাটাতে গিয়ে ফেঁসে যায়, তখন এক জগাখিচুড়ি অবস্থার সৃষ্টি হয়। ইঞ্জিনের গোঁ গোঁ শব্দে নাটকের ডায়ালগ চাপা পড়ে যায়। সামনে কোনও স্ট্রিটলাইট নেই। তবে ওই ডিমের আড়তটা সারারাত খোলা থাকে বলে রাস্তাটা আলো পায়।

তার ওপরে যে বাড়িটার একতলায় এই ঘর, সেই বাড়িটাও কিম্ভূত। একটা আদ্যিকালের দোতলা বাড়ি। নীচে পাশাপাশি দুটো ঘর। বড়োটায় চালানি ডিমের আড়ত, ছোটোটা জয়দেববাবুর ভাড়া নেওয়া ঘর। দুটোরই এনট্রান্স রাস্তার দিকে।

বাঁ-দিকের বাউন্ডারি ওয়াল আর বাড়ির মাঝখানে সরু প্যাসেজ। সেই পাসেজের শেষমাথায় দেওয়ালের গায়ে একটা কোলাপসিবল গেট। গেটের পরে কাঠের দরজা। গেট আর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে সরু একটা সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে।

একতলার ঘরগুলো থেকে সেই সিঁড়ির দিকে যাওয়ার একটা দরজা কোনওকালে ছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু এখন একতলা আর দোতলাকে সেপারেট করার জন্য সেই দরজা ইট গেঁথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাজেই দোতলায় উঠতে গেলে প্যাসেজের ওই দরজা দিয়ে ঢোকা ছাড়া জন্য কোনও উপায় নেই।

কাবেরী এক-দু’বার এসেছিল ধানসিঁড়ির রিহার্সাল দেখতে। প্রথমবার দেখেই খুব সুন্দর নাম দিয়েছিল ও এই বাড়িটার— ‘টিফিন ক্যারিয়ার।’ সত্যি! বাড়িটার দুটো তলা যেন একটা বাটির ওপর বসিয়ে রাখা আর- একটা বাটি। দুটো বাটির মধ্যে কোনও যোগাযোগ নেই।

তবু স্থানমাহাত্ম্য অস্বীকার করা যায় না। দু’পা দূরেই শেয়ালদা স্টেশন। জয়দেববাবুর দলের কয়েকজন ছেলেমেয়ে নৈহাটি আর বনগাঁ লইনের অনেক দূরের সব শহর থেকে আসে। আরও দু’জন আসে ডানকুনি থেকে। ওই ছেলেমেয়েগুলোকে দিয়েও যে রাত ন’টা অবধি মহলা করাতে পারেন সে কেবল ওই গাড়ির ভোঁ শুনে দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরা যায় বলেই। তাছাড়া এখনও মোড়ের দোকানে পার-হেড ছ’টাকায় দারুন মুড়ি-তেলভাজা পাওয়া যায়। চার টাকায় বড়ো ভাঁড়ে চা। মিলবে নাকি ওসব দক্ষিণ কলকাতায় কিম্বা রাজারহাটে?

সেলামির টাকাটা বার করতে খুব কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু আর কোনও উপায় ছিল না। এর-ওর বাড়িতে চেয়েচিন্তে মহলা করে রেগুলার শো করা যায় না। ঘরটা নেওয়ার পরে মনের মতন করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহলা করতে পারছেন। ফলও মিলেছে। ওঁর নিজের লেখা নাটক ‘ঝরনাতলার নির্জনে’-র সবকটা শো দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছে। কলকাতার চারটে বড়ো কাগজে ভালো রিভিউ বেরিয়েছে।

বাড়িটার দিকে এগোতে এগোতেই জয়দেব সরকার দেখতে পেলেন ওটার সামনে বেশ বড়োসড়ো একটা জটলা। পুলিশের জিপের মাথাটাও ভিড়ের ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল।

জয়দেববাবু ওখানে পৌঁছোতেই একটা গুঞ্জন উঠল— ‘এই তো জয়দা এসে গেছেন।’

‘কই? কোথায়?’ বলতে বলতে ভিড় ঠেলে একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন। জয়দেববাবুর মতনই বয়স হবে, মানে এই চল্লিশ- একচল্লিশ। দশাসই চেহারা, কিন্তু চোখের তারায় একটা সবকিছুতেই মজা পাওয়ার মতন ভাব রয়েছে। এই ধরনের লোকেরা জীবনটাকে খুব সহজভাবে দেখে। চট করে একবার কপালে হাতদুটো ছুঁইয়ে নিয়ে বললেন, ‘আপনিই জয়দেব সরকার? আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম, কল্যাণ বোস। চলুন ওপরে চলুন।

‘কী ব্যাপার বলুন তো?’ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে প্রশ্ন করলেন জয়দেববাবু।

‘দোতলার ভাড়াটেদের চিনতেন?’

মানে ওই যেতে-আসতে যেটুকু দেখেছি। আলাপ হয়নি। যদি স্বামী-স্ত্রী হয়, তা হলে বলতেই হবে বেজোড়মানিক; ভদ্রলোকের বয়স পঁয়তাল্লিশের নীচে হবে না, মেয়েটার এই ধরুন পঁচিশ। আমি যদি কাস্টিং করতাম, তা হলে ডিফারেন্সটা আর-একটু কমিয়ে আনতাম।’

কথাটা শুনে সিঁড়ির চাতালে দাঁড়িয়ে পড়লেন কল্যাণ বোস। বললেন, ‘আনফরচুনেটলি, জীবনটা আপনার থ্যাটারের স্টেজ নয়। এখানে অনেকরকম বেমানান ব্যাপার ঘটে যায়।’

‘একদম ঠিক বলেছেন। আমি নিজেকেও তো সারাক্ষণ সেই কথাটাই বোঝাচ্ছি। কিন্তু এতবছর ধরে থিয়েটার করতে করতে কী হয়েছে জানেন? যে-কোনও জায়গাকেই মনে হয় নাটকের সেট। যে- কোনও লোককেই মনে হয় নাটকের ক্যারেকটার। আর বেমানান কিছু থাকলেই খট করে চোখে এসে লাগে।’

কল্যাণ বোস চাতালে দাঁড়িয়েই ভুরু কুঁচকে জয়দেববাবুর খেদোক্তিটা শুনলেন। তারপর আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বাকি সিঁড়িটা ভাঙতে ভাঙতে বললেন, ‘আপাতত এখানে একটা নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেছে বটে। নারকীয় ঘটনাও বলতে পারেন ইচ্ছে করলে। ওই ভদ্রলোক, সৌমেন দত্ত, আর ভদ্রমহিলা, উদিতা দত্ত— হ্যাঁ ওঁরা স্বামী-স্ত্রী— বোথ আর ডেড।’

***

জয়দেববাবু দোতলায় পা দেওয়ার পর আধঘণ্টা কেটে গেছে। থানার অন্যান্য লোকেদের কাজের তদারকির ফাঁকে ফাঁকে কল্যাণ বোস জয়দেববাবুকে অল্প অল্প করে পুরো কেসটা বলে ফেলেছেন। না বললেও পারতেন, কিন্তু বলেছেন যে, তার পিছনে দুটো কারণ থাকতে পারে। এক, উনি ভালোরকম নাটক-পাগল। নিজেও নাকি পুলিশ রিক্রিয়েশন ক্লাবের ফাংশানে রেগুলার অ্যাকটিং করেন। জয়দেববাবুর মোট তিনখানা নাটক উনি দেখেছেন এবং ওঁর কথায় সবকটাই সুপার্ব। আর দুই, উনি নাকি জয়দেববাবুর সঙ্গে অল্প কয়েকটা কথা বলেই বুঝতে পেরেছেন, জয়দেববাবুর আই. কিউ. অ্যাবভ অ্যাভারেজ।

জয়দেববাবুকে ডেকেছিলেন মামুলি কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করার জন্য। এই যেমন, ঝগড়ার আওয়াজ টাওয়াজ পেতেন কি না, বাড়িতে লোকজন কেমন আসত— এই সব। জয়দেববাবু না শুনেছেন ঝগড়ার আওয়াজ, না দেখেছেন লোকজন। এইটুকু বলে দেওয়ার পরেই উনি চলেই যেতে পারতেন। কিন্তু যাননি যে তার কারণ, ওঁর চোখে বড্ড বেমানান সব জিনিসপত্র ধরা পড়ছিল। উনি এককোণে একটা ভাঙা বেতের চেয়ারে বসেছিলেন এই ভেবে যে, কল্যাণ বোসের ব্যস্ততা একটু কমলে ওঁকে ওইসব বেমানান ব্যাপারগুলো একটু দেখাবেন।

আপাতত উনি চুপ করে বসে কল্যাণ বোসের কাছে শোনা কথাগুলোকে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করছিলেন।

আজ বেলা আটটা নাগাদ উদিতাদের কাজের মেয়ে নমিতা এসে রোজকার মতন কলিং-বেল বাজিয়েছিল, কিন্তু ওঁরা কেউ অন্যদিনের মতন ওপর থেকে চাবি ফেলে দেননি। অনেকক্ষণ ধরে বেল বাজানোর পর নমিতা ওপরদিকে মুখ তুলে ‘ও বউদি, বউদি-ই-ই গো-ও-ও, আর কত ঘুমোবে-এ-এ-এ?’ বলে চিল-চিৎকার শুরু করে।

তাতেও যখন কাজ হল না, তখন কয়েকটা ঠেলাওলা আর একটা পান-বিড়ির দোকানের মালিক এসে নমিতার সঙ্গে হাত লাগিয়ে দরজা পেটাতে শুরু করল। এই সময়েই নমিতার হঠাৎ মনে পড়ে যায়, তার কাছে তো মোবাইল আছে, আর সেই মোবাইলে দাদাবাবুর নম্বরও সেভ করা আছে। সে তাড়াতাড়ি মোবাইল বার করে নম্বর লাগায়। রিং হয়ে হয়ে সেই কল কেটে যায়, কেউ ধরে না। অতএব এরপর যা স্বাভাবিক, পাড়ার লোকে তা-ই করে। থানায় খবর দেয়।

লেবুতলা থানা থেকে ওসি কল্যাণ বোস তিনজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই অকুস্থলে চলে আসেন। তখন বাজে সাড়ে আটটা। কল্যাণ বোস এবং তাঁর লোকজন ধাক্কা মেরে কাঠের পাল্লার ভেতর দিক থেকে লাগানো ছিটকিনি ভেঙে ফেলেন।

দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ-পাশেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে কল্যাণ বোস এবং আরও দু’জন পুলিশের লোক ওপরে উঠে যান। কৌতূহলী জনতা এবং ততোধিক বেপরোয়া নমিতাকে আটকাতে একজন কনস্টেবল নীচে দাঁড়িয়ে থাকেন।

তারা ওপরে উঠে দেখেন, একতলার মতন দোতলাতেও দুটো ঘর। তবে দুটো ঘরই একতলার ঘরদুটোর তুলনায় আয়তনে ছোটো। কারণ, ডিমের গোডাউনের ওপরে যে ঘরটা তার উত্তরদিক থেকে জায়গা কেটে নিয়ে একটা সরু ব্যালকনি তৈরি করা হয়েছে। ব্যালকনিটা রাস্তার ওপরে। ওই ঘরটাকে বসার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হত, কারণ সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলে এটাই প্রথমে পড়ে।

আর ধানসিঁড়ির রিহার্সালের রুমের ওপরে যে ঘর, সেটার থেকে জায়গা কেটে বানানো হয়েছে একটা বাথরুম। এই ঘরটা ছিল সৌমেন আর উদিতার বেডরুম। রান্নাঘর বলতে পিছনের দিকে একচিলতে প্যাসেজ। ওখানেই গ্যাসের উনুন আর অল্প কিছু বাসনকোসন নামানো ছিল।

কল্যাণ বোসরা সিঁড়ির শেষ মাথা থেকেই দেখতে পেয়েছিলেন, বসার ঘরে মেঝের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছেন উদিতা। উদিতার মাথার মাঝামাঝি জায়গায় খুলিটা থেঁতলে গিয়েছে। চুলে আর রক্তে জমাট বেঁধে রয়েছে। তিনি যে বহুক্ষণ আগেই মারা গেছে সেটা কাউকে বলে দিতে হয় না।

ওঁরা সঙ্গে সঙ্গেই যে যাঁর সার্ভিস রিভলভার বার করে হাতে নিয়েছিলেন। যেহেতু বাইরের লোকের ঢোকা-বেরোনোর কোনও সম্ভাবনা নেই, তাই এটা বোঝাই গিয়েছিল মার্ডারার ওই ফ্ল্যাটেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে, এবং সে রয়েছে কোণঠাসা অবস্থায়। হতেই পারে সে বাড়ির কর্তা সৌমেন দত্ত নিজেই। বিপজ্জনক সিচুয়েশন।

তবে বসার ঘর পেরিয়ে শোবার ঘরে ঢুকেই ওঁরা আবার রিভলভারগুলো যে যাঁর হোলস্টারে ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। মরা মানুষকে রিভলভার দেখানোর দরকার পড়ে না।

হ্যাঁ, শোবার ঘরে মেঝের ওপরে উপুড় হয়ে পড়েছিল সৌমেনের ডেডবডি। শরীরের বেশিরভাগটাই শোবার ঘরে মেঝের ওপরে, শুধু কাঁধ আর মাথাটা ঘরের লাগোয়া বাথরুমের মধ্যে। বোঝাই যাচ্ছে, মৃত্যুর আগে প্রবল শারীরিক আক্ষেপে অনেকের মতনই তাঁকেও জলের দিকে ছুটতে হয়েছিল।

মেঝেতে গড়াগড়ি যাচ্ছে একটা বোতল আর একটাই কাচের গ্লাস। সৌমেন ড্রিংক করছিলেন। একা।

ঠোঁটের পাশ থেকে গড়িয়ে আসা গ্যাঁজলা দেখে বোঝা যাচ্ছিল সৌমেন বিষ খেয়েছেন। যদি কেউ মদের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে পান করে, তাকে কি ‘ড্রিংক করা’ বলা যায়?

জয়দেববাবুর চিন্তার সুতোয় টান পড়ল। হঠাৎই ঘরটা ফাঁকা হতে শুরু করেছে। পাশ দিয়ে একের পর মানুষের হেঁটে যাওয়ার শব্দ। মুখ তুলে দেখলেন ওঁরা চলে যাচ্ছেন। পুলিশ ফটোগ্রাফার নানান অ্যাঙ্গেল থেকে ডেড বডিদুটোর ছবি তুলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। ফরেনসিকের মহিলা আর পুরুষ কর্মচারী দু’জন তাঁদের অ্যাপ্রন খুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছিলেন। ওঁরাও এবার বেরিয়ে গেলেন। তারপরে পরেই বডিব্যাগে পুরে সৌমেন আর উদিতার মৃতদেহদুটো নিয়ে নেমে গেল চারজন লোক।

কল্যাণ বোস এসে জয়দেববাবুর পাশের চেয়ারটায় বসলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শেষ-ফেব্রুয়ারির বাতাসও গরম হয়ে উঠেছিল। বন্ধ ঘরটার মধ্যে এতক্ষণ ক্রমাগত ঘোরাঘুরি করার জন্য কল্যাণ বোসের কপালে পাতলা ঘামের আস্তরণ পড়েছিল। রুমাল দিয়ে সেটাকে মুছে নিতে নিতে তিনি বললেন, ‘কী হল, মিস্টার সরকার? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’

‘না, না।’ জয়দেববাবু একটু অসহায়ের মতন এদিক-ওদিক চাইলেন। তারপর মুখটা কল্যাণ বোসের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘কয়েকটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন? ওই কাঁধ-ব্যাগটা দেখুন। আপনার লোকেরা একবার খুলে ভেতরের জিনিসগুলো দেখল, কিন্তু পাত্তাই দিল না। একটা মেয়েকে বাইরে কোথাও যেতে হলে যা যা নিতে হয় সেইসব দিয়ে ব্যাগটা বোঝাই। টাওয়েল, সালোয়ার-কামিজ, নাইটি, ন্যাপকিন, বড়ো দাঁড়ার চিরুনি, কয়েকটা সাজগোজের জিনিস। সেসব ঠিক আছে। কিন্তু ওর মধ্যে একটা হনুমানজির বাঁধানো ফোটো রয়েছে। কেন বলুন তো? শর্ট ট্যুরে যাওয়ার সময় কেউ গৃহদেবতাকে নিয়ে যায় কি?’

জয়দেব সরকারকে কথার মধ্যেই থামিয়ে দিয়ে কল্যাণ বোস বলে উঠলেন, ‘দোহাই আপনার, মিস্টার সরকার! এই কেসটায় কোনও রহস্য টেনে আনবেন না। ইট ইজ আ ভেরি সিম্পল কেস। কালকেই দু’লাইনের একটা রিপোর্ট পাঠিয়ে ক্লোজ করে দেব।’

অবাক গলায় জয়দেববাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন রিপোর্ট?’

‘ওই আপনাদের বাংলা কাগজের ভাষায় যাকে বলে- অভাবের তাড়নায় বধূকে খুন করে স্বামী আত্মঘাতী— তারই একটু বড়োসড়ো ভার্সন আর কী! অভাবের তাড়নায় কথাটার ইংরিজি কী হবে বলুন তো?’

জয়দেববাবু একইরকম অবাক সুরে প্রশ্ন করলেন, ‘ব্যাপারটা কি আপনার তা-ই মনে হচ্ছে? অভাবের তাড়নায় সৌমেন উদিতাকে খুন করে নিজে বিষ খেয়েছে?’

তাছাড়া আবার কী? সৌমেন ছাড়া উদিতাকে কে খুন করবে? বাইরের লোক তো আর ঘরে ঢোকেনি। জানেনই তো, আমরা নীচের দরজা বন্ধ পেয়েছিলাম।’

‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব? নীচে দুটো দরজা আছে। একটা কাঠের পাল্লা। আর একটা লোহার কোলাপসিবল গেট। বাইরের দিকে কোলাপসিবল গেট, ভেতরে দরজা। আপনারা কি দুটোই বন্ধ পেয়েছিলেন?’

এক সেকেন্ড চিন্তা করে কল্যাণ বোস বললেন, ‘উহুঁ। শুধু কাঠের পাল্লাদুটোই ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে আটকানো ছিল। কোলাপসিবল গেটটা খোলা ছিল। ওইজন্যই সহজে ঢুকতে পেরেছি। কোলাপসিবল গেটের তালা ভাঙতে হলে আরও অনেক হাঙ্গামা হত।’

জয়দেব সরকার আপনমনে বললেন, ‘কেন খোলা ছিল বলুন তো? তার মানে ওরা তখনও পার্মানেন্টলি ঘরে ঢুকে যায়নি। ওদের আবার বেরোনোর কথা ছিল। কিম্বা হয়তো বাইরে থেকে কারুর আসার কথা ছিল। কিম্বা, ঘরের মধ্যে আর-একজন কেউ ছিল, যাকে বিদায় দিয়ে তবে ওরা কোলাপসিবল গেটটা লাগাবার কথা ভেবেছিল।’

কল্যাণ বোস জয়দেব সরকারের শেষ কথাটা শুনে ফোঁস করে উঠলেন। ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ‘হ্যাঁ, হয়তো হুডিনি কিম্বা গণপতি এই ঘরে বসে ছিলেন। ভেতর থেকে দরজায় ছিটকিনি, তা সত্ত্বেও তিনি হাওয়া হয়ে গেলেন!’

একটু ব্যথা-পাওয়া গলায় জয়দেববাবু বললেন, ‘আপনি বারান্দার ব্যাপারটা একেবারেই হিসেবের মধ্যে ধরছেন না, না?’

‘না, ধরছি না। আর কেন ধরছি না, সেটা আপনি আমার থেকে ভালো জানেন। এই কোলে বাজারের রাস্তায় আপনি জন্ম থেকে বড়ো হয়েছেন। আপনি জানেন একতলার ওই ডিমের আড়তে সারারাত আলো জ্বালিয়ে কাজ চলে। সামনের ওই রাস্তা দিয়ে সারারাত লরি চলাচল করে। এর মধ্যে দোতলার বারান্দা থেকে কেউ দড়ি কিম্বা মই লাগিয়ে নীচে নামলে কারুর নজরে পড়বে না?’

‘দড়ি কিম্বা মই লাগিয়ে নামলে অবশ্যই নজরে পড়বে, কিন্তু অন্য কোনওভাবে…’

‘আমি আপনার সঙ্গে একমত,’ আবার বিদ্রুপে বেঁকে গেল কল্যাণ বোসের ঠোঁট, ‘ডানা লাগিয়ে উড়ে গেলে কারুর নজরে পড়বে না। ‘

জয়দেব সরকার বেশ জোরগলাতেই হেসে উঠে বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি এই কথায় কিছু মনে করেননি। তারপর হঠাৎই বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা, ওসব কথা ছাড়ুন। অন্য একটা কথা বলি। আপনি অভাবের তাড়নার কথা বলছেন তো? আমি যদি স্টেজের ওপর একজন অভাবী লোকের ঘরের সেট বানাতাম তা হলে কিন্তু সেই ভাঙাচোরা ঘরের মালিকের গায়ে ফ্যাব-ইন্ডিয়ার পাজামা-পাঞ্জাবি রাখতাম না, সেই পাঞ্জাবির পকেটে পাঁচশোর নোটের একটা পুরো বান্ডিল আর একটা আইফোন রাখতাম না। তার ডেডবডির পাশে দেড় হাজার টাকা দামের মদের বোতল আর কাটগ্লাসের ডিক্যান্টার রাখতাম না। রাখতাম না, কারণ, ওই জিনিসগুলো এই ঘরের চটের পাপোশ, দড়ির আলনা আর শাড়ি কেটে তৈরি করা পর্দার সঙ্গে যাচ্ছে না। একেবারেই যাচ্ছে না।’

‘এর থেকে কী প্রমাণিত হল?’

‘প্রমাণিত হল, ভেরি রিসেন্টলি সৌমেন দত্তের অভাব ঘুচে গিয়েছিল। তাই রিপোর্টে অভাবের তাড়নার কথা বলতে গেলে আপনাকে দু’বার ভাবতে হবে। আরও একটা কারণে সৌমেনকে খুনি বলার আগে আপনাকে দু’বার ভাবতে হবে। দাঁড়ান, এটা মুখে বলার থেকে ডেমনস্ট্রেট করে দেখানো সহজ। একবার উঠে দাঁড়ান তো!’

জয়দেব সরকারের গলায় এমন একটা কিছু ছিল যার জন্য দুদে পুলিশ অফিসারটিও হুকুম তামিল করে ফেললেন। উনি উঠে দাঁড়ালেন।

ওঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জয়দেব সরকার বললেন, ‘উদিতাকে যখন মারা হয়েছিল, তখন ও নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে ছিল, কারণ আশেপাশে চেয়ার, মোড়া, মাদুর কিছুই ছিল না। মারা হয়েছে পিছন থেকে। সেইজন্যই ও উপুড় হয়ে পড়েছে। উদিতা আর সৌমেনের হাইট প্রায় সমান, সৌমেন দু’-এক ইঞ্চি লম্বা হবে, যেমন আপনি আমার থেকে দু’-এক ইঞ্চি লম্বা। নিন, এবার আপনি আমাকে পিছন দিক থেকে হিট করুন।’

এদিক-ওদিক তাকিয়ে জয়দেব সরকার একটা পাকানো খবরের কাগজ কল্যাণ বোসের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘এটা একটা হাতুড়ি। এইটা দিয়ে আপনি আমার মাথায় মারুন। ঠিক ব্রহ্মতালুতে মারবেন, উদিতাকে যেখানে মারা হয়েছিল।’

কল্যাণ বোস আঘাত করার ভঙ্গিতে পাকানো কাগজটা জয়দেব সরকারের মাথায় ছোঁয়ালেন, এবং ছুঁইয়েই বুঝতে পারলেন, জয়দেব সরকার কী বলতে চাইছেন।

মাথার খুলির শক্ত হাড় ফাটাতে গেলে যে জোরালো ব্লো দরকার, সেই ব্লো হাত টান করে রেখে দেওয়া যায় না। হাত কনুই থেকে ভাঁজ করে তারপর খুলতে হয়— ঠিক যেভাবে লোকে দেওয়ালের পেরেকের মাথায় হাতুড়ি ঠোকে। আর সেটা করতে গেলে কিছুতেই তিনি জয়দেব সরকারের মাথার মাঝখানে পৌঁছোতে পারছেন না। চোটটা গিয়ে পড়ছে মাথার পিছনে কিম্বা পাশে।

অর্থাৎ উদিতার মাথার মাঝখানে মারতে গেলে হয় উদিতাকে মার খাওয়ার জন্য মেঝের ওপর বসতে হবে। অথবা যে মারছে, তাকে একটা চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে উদিতাকে ডাকতে হবে— এদিকে এসো, আমি তোমার ব্রহ্মতালুতে ছ্যাঁদা করব। এ দুটোই কষ্টকল্পনা। অতএব তিন নম্বর বিকল্পটিই গ্রাহ্য— উদিতাকে যে মেরেছে সে উদিতার থেকে অন্তত একহাত লম্বা ছিল। সৌমেন তা নয়।

কাগজটা একপাশে ছুড়ে ফেলে কল্যাণ বোস অত্যন্ত সিরিয়াস গলায় জয়দেব সরকারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কিছু?’

আবার চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে জয়দেববাবু বললেন, ‘তা হলে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা মানছেন?’

হতাশ ভঙ্গিতে কল্যাণ বোস বললেন, ‘দেয়ার ইজ আ পসিবিলিটি। কিন্তু সে গেল কোথায়?’

‘সে ব্যাপারে আমার একটা থিয়োরি আছে। পরে বলছি। আপাতত বলুন, শ্রী গজা তার বমিবাক্সটা পেল কোথা থেকে?’

‘লীলা মজুমদার কোট করছেন তো? ওই বইটা আমারও ফেভারিট। আপনি বলতে চাইছেন, সৌমেনের হঠাৎ বড়োলোকির উৎস কী?’

‘এক্স্যাক্টলি। একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? সৌমেন মির্জাপুরের নড়বড়ে চৌকির বদলে একটা ভদ্রস্থ খাট কেনেনি। রান্নাঘরে সিংক কিম্বা বেসিন বসায়নি। এখনও দেওয়ালের আয়নায় উদিতাকে মুখ দেখতে হত, ড্রেসিং-টেবিল কেনেনি। সামান্য সচ্ছলতা এলে একজন মহিলা প্রথমে ওইগুলোই কেনেন। না, সৌমেন উদিতাকে কিছুই দেয়নি। অথচ ওর ওই একটা আইফোনের দামে এর সবক’টাই হয়ে যেত। তার মানে, সৌমেনের হাতে পয়সা এসেছিল, কিন্তু উদিতার সঙ্গে ওর সম্পর্ক ভালো ছিল না। তা হলে এরকম কি হতে পারে, সৌমেন উদিতার কোনও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বড়োলোক হচ্ছিল?’

কল্যাণ বোস ভূতগ্রস্তের মতন বলে উঠলেন, ‘ব্ল্যাকমেলিং!’

‘ইয়েস। ব্ল্যাকমেলিং। উদিতার গোপন প্রেমিক। সৌমেনের কাছে ওদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি। গোপন প্রেমিককে চাপ দিয়ে পয়সা রোজগার। হতে পারে না?’

‘পারে। পারে। মিস্টার সরকার, ইউ আর আ জিনিয়াস! হ্যাঁ, জিগস পাজলের টুকরোগুলো মিলে যাচ্ছে। উদিতা আর সেই প্রেমিক দু’জনেই ছটফট করছে সৌমেন দত্তর ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসার জন্য। তারপর কাল সেই প্রেমিক এল পেমেন্ট নিয়ে। সৌমেনের পকেটে ঢুকে গেল নোটের বান্ডিল। সে খোশমেজাজে মদ নিয়ে বসল।

ওহ্! কী অসম্ভব ক্রুয়েল। স্ত্রী ওর কাছে মানুষ নয়। স্ত্রী’র প্রেমিকের ওপর ওর কোনও রাগ নেই, ঘৃণা নেই। উদিতার সম্বন্ধেও ও ইনডিফারেন্ট। সে শুধু ওই প্রেমিককে চুষে ছিবড়ে করছে।

উদিতার মতন কপাল অবশ্য খুব বেশি মেয়ের হয় না। স্বামী তো ওইরকম। যাকে সে প্রেমিক ভেবেছিল সে আরও এক কাঠি ওপরে।

সেই প্রেমিক উদিতাকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল। বলেছিল সৌমেনকে বিষ খাইয়ে ওরা দু’জন পালাবে। সেইজন্যই উদিতার ব্যাগ গোছানো ছিল। বোকা মেয়ে। পিছনে একটা ডেডবডি ফেলে রেখে পালানো অত সহজ? মেয়েরা এসব বোঝে না, জানেন? পুলিশের চাকরিতে এরকম কত দেখলাম!’

চেয়ার থেকে উঠে উদিতার দেওয়াল-আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন জয়দেব সরকার। বললেন, ‘বাকিটা আমি বলি? সেই প্রেমিক তো আর সত্যিকারেই প্রেমিক নয়। সে কেন ফেরার হয়ে নিজের বিপদ বাড়াবে? তার তো মধু খাওয়া হয়ে গেছে। সে সৌমেন আর উদিতা দু’জনকেই খুন করল। সৌমেনকে বিষ দিয়ে, সেটা বোধহয় উদিতার হাত দিয়েই করিয়েছিল। তারপর উদিতাকে মাথায় বাড়ি মেরে। নিখুঁত প্ল্যান। সে যে এখানে এসেছিল সেটাই কেউ বুঝতে পারত না। সবাই ভাববে, ওই আপনিও একটু আগে অবধি যা ভাবছিলেন। স্ত্রীকে খুন করে স্বামী আত্মঘাতী। শুধু আমার…’

ঠিক। শুধু আপনার ওই অসুখ। সেটটাকে নিখুঁতভাবে না দেখলেই মন খুঁতখুঁত করা। এর জন্যই আমি বেঁচে গেলাম। শুধু একটা জিনিস এবার বলে ফেলুন, মিস্টার সরকার। সেই স্কাউড্রেল এই ঘর থেকে নীচে নেমে পালাল কোথা দিয়ে? ওটা না জানলে ইনভেস্টিগেশসন শুরুই করতে পারব না।’

হো হো করে বেশ জোরেই হেসে উঠলেন জয়দেব সরকার। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, ‘ক্লাস নাইনে পড়ার সময় একবার শম্ভু মিত্রের নাটকের শো দেখে রাতদুপুরে বাড়ি ফিরে দেখি বাবা বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। ডেকে তুলতে গেলে তিনি তো জেনে যাবেন, আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। কাজেই একটা পেঁয়াজের বস্তা বোঝাই লরির ছাদে উঠে পড়লাম। লরিটা বাড়ির সামনে আসতেই দেখলাম আমাদের দোতলার বারান্দা আর লরির ছাদ একেবারে মুখোমুখি। টুক করে উঠে পড়লাম বারান্দায়। তারপর আর কী!

এখনও সার্পেন্টাইন লেন দিয়ে একইরকম শম্বুকগতিতে লরি চলে। তাদের খোলে একইরকম পাহাড়প্রমাণ আলু-পেঁয়াজের বস্তা বোঝাই করা থাকে। ওই বারান্দা থেকে পা বাড়িয়ে সেরকম একটা লরির ছাদে উঠে পড়া আজও কোনও কঠিন কাজ নয়। কেউ যদি সেরকম করে, তা হলে নীচের ডিমের আড়ত থেকে কিম্বা রাস্তা থেকে তাকে দেখতে পাওয়া অসম্ভব। বিশেষত, এই বাড়ির সামনে যখন কোনও স্ট্রিটলাইট নেই আর কালকের রাতটাও ছিল কুয়াশায় ঢাকা।

বোসসাহেব, আপনি কাইন্ডলি ওই দু’লাইনের রিপোর্টটা দেবেন না। বরং একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখুন, উদিতার বন্ধুদের মধ্যে খুব লম্বা, অ্যাথলেটিক ফিগারের কোনও পুরুষকে পান কি না।’

***

হ্যাঁ, সেরকম একজনকে পাওয়া গিয়েছিল। কলকাতা ময়দানের নামজাদা গোলকিপার। মহিলাঘটিত নানান কেলেঙ্কারির জন্য কলকাতা পুলিশের খাতায় আগেই কয়েকবার তার নাম উঠেছিল। মোবাইলের কল রেকর্ড থেকে সৌমেনের সঙ্গে তার কথাবার্তা ট্র্যাক করে জানা গেছিল সত্যিই সৌমেন তাকে ব্ল্যাকমেল করছিল।

লেবুতলা থানার সেকেন্ড অফিসার কল্যাণ বোস তার এগেইনস্টে চোদ্দোপাতার চার্জশিট দিয়েছেন। কেসটা এখনও ফয়সালা হয়নি, তাই এর বেশি কিছু বলা গেল না।

1 Comment

গল্পটা খুব ভালো লাগলো। ডিটেকটিভ গল্পই বলুন রহস্য গল্পই বলুন সব দিক দিয়েই ফাটাফাটি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *