ডার্ক ফ্যানটাসি
অলৌকিক
থ্রিলার
ডিটেকটিভ

মাকড়শা – সৈকত মুখোপাধ্যায়

মাকড়শা

কণাদ বলল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার, বুঝলে অরুণ, আশেপাশে সমস্ত জায়গা এত জমজমাট… এক কাঠা জায়গাও কোথাও খালি পাওয়ার উপায় নেই, অথচ ওই তাঁতিপাড়ায় গেলে দেখবে প্রায় সাত বিঘের একটা জমি ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে আছে। সেখানে না হচ্ছে চাষবাস, না রয়েছে কোনও ঘরবাড়ি।

জায়গাটা হাইওয়ের ধারে নয় ঠিকই, তবে একটা সাইড-রোড দিয়ে গেলে, ধনেখালি শহর থেকে গাড়িতে আধঘণ্টার বেশি লাগে না। যাওয়ার পথে যেদিকেই তাকাবে দেখবে হয় ফসলের খেত, না হলে কারখানার শেড আর না হলে নতুন নতুন হাউসিং। তারই মধ্যে ওই সাত বিঘে জায়গা জুড়ে তাঁতিপাড়ার জঙ্গল। জঙ্গল ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই।

কণাদ মিত্র আমার কলেজের বন্ধু। দশ-বছর আগে আমরা একসঙ্গেই শ্রীরামপুর টেক্সটাইল কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু পাশ করার পর কণাদ উচ্চশিক্ষার জন্য সেই যে ম্যাঞ্চেস্টারে চলে গেল, তারপর আর পাকাপাকিভাবে দেশে ফেরেনি। ওখানেই এক মালটি- ন্যাশনাল টেক্সটাইল ফার্মে ও এখন বেশ উঁচু পোস্টে কাজ করছে। আর আমি, অরুণ চ্যাটার্জি রয়ে গেছি কলকাতাতেই। এখানেই আমার চাকরি।

তবে ওর সঙ্গে বন্ধুত্বটা রয়েই গেছে। প্রায়ই ফোনে কিংবা ভিডিয়ো কলে কথা হয়। তাছাড়া বছরে একবার করে যখন বাবা-মাকে দেখবার জন্য কণাদ কলকাতায় ফেরে তখন আমরা একসঙ্গে বসে প্রচুর আড্ডা মারি।

এবারে কিন্তু কণাদ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ছুটি নিয়ে আসেনি; এসেছে কোম্পানির কাজেই। ওর কথা শুনে যা বুঝলাম, কাজটা হচ্ছে একটা মসলিনের ফ্যাক্টরি তৈরি করা। হ্যাঁ, সেই ঐতিহাসিক মসলিন। কুয়াশার মতো সূক্ষ্ম সুতির কাপড়, সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের ইউরোপের বাজারে যার দাম ছিল সোনার চেয়েও বেশি। একইসঙ্গে মুঘল বাদশা-বেগম আর ইওরোপের রাজা-রানিরা যে কাপড়ের জন্য পাগল হয়ে পথ চেয়ে থাকতেন।

মসলিন শিল্প তো কবেই হারিয়ে গেছে। ঢাকা শহরের লাগোয়া সোনারগাঁ, মুর্শিদাবাদ আর ধনেখালি— এই কয়েক জায়গাতেই মাত্র তাঁতিরা মসলিন বুনতে পারত। অন্য কোথাও তাঁতিদের হাতে মসলিনের সেই সূক্ষ্মতা আসত না। কিন্তু অষ্টাদশ শতকেই ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা মিলের সস্তা কাপড়ের চাপে বাংলার মসলিন হারিয়ে গিয়েছিল। সস্তা কাপড় পেলে কে আর দামি কেনে? এসব কথা তো আমরা ইতিহাসেই পড়েছি।

কিন্তু কণাদরা সম্প্রতি নাকি ধনেখালিতে কয়েক ঘর তন্তুবায়ের খোঁজ পেয়েছে, যাঁরা এখনও মসলিন বোনার উপযোগী সরু সুতো কাটতে পারেন এবং মসলিনের কাপড় বুনতেও পারেন। ওদের ইচ্ছে, সেই কয়েকজন তন্তুবায়কে একত্রিত করে আবার মসলিন-শিল্পের পুনরুত্থান ঘটায়।

কণাদ বলল, ‘এখন আবার সারা পৃথিবীতেই হ্যান্ডমেড জিনিসের কদর বেড়েছে, জানো তো? তাছাড়া একশ্রেণির লোকের হাতে পয়সারও অভাব নেই। কাজেই যদি নতুন করে মসলিন বানানো যায়, তা হলে সেটা একটা দারুণ লাভজনক ব্যাবসা হবে। এর আগে আমার কয়েকজন সহকর্মী ধনেখালিতে এসে তাঁতিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে গেছে। তাঁতঘর বসানো আর অফিস, কোয়ার্টার ইত্যাদি বানানোর জন্য জমিও কিনে রেখে গেছে…’

ওর কথার মধ্যেই বাধা দিয়ে আমি বললাম, ‘সে কি ওই তাঁতিপাড়ার জমি?’

‘ঠিক ধরেছ। সমস্যা হচ্ছে, যাঁর কাছ থেকে জমিটা আমরা কিনেছিলাম, এক জমিদার ফ্যামিলির একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী, এখন তিনি ব্যাঙ্গালোরে থাকেন। জমিটা বিক্রি করার সময় তিনি আমাদের কিছুই বলেননি। অথচ ছ’মাস আগে যখন কাজ শুরু করতে গেলাম, তখন দেখলাম স্থানীয় একটি মানুষও ওই জমিতে পা দিতে চাইছে না। বিশেষত সূর্যাস্তের পরে মরে গেলেও তারা ওদিকে যাবে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, ওখানে এক ধরনের বিষাক্ত মাকড়শার উপদ্রব রয়েছে। এবার বলো, লেবার ছাড়া আমরা কাজ করব কেমন করে?’

আমি বললাম, ‘এতে সমস্যা কোথায়? প্রথমে কয়েকজন বাইরের লোককে নিয়ে একটা রাত ওই জঙ্গলে কাটিয়ে এসো না। যখন স্থানীয় লোকেরা দেখবে তোমরা নির্বিঘ্নে ফিরে এলে, তখন তারাও আর যেতে আপত্তি করবে না।’

কণাদের মুখটা প্রচণ্ড গম্ভীর হয়ে গেল। এতক্ষণ আমার বসার ঘরে আমার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে ও কথা বলছিল। এবার কেমন অস্থিরভাবে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জানালার বাইরে অন্ধকারে ঢাকা আমাদের বাগানটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছ’মাস আগেই সেই চেষ্টা করা হয়েছিল।

আমি যাইনি, আমি তো তখন ওদেশে। আমাদের কোম্পানির জুনিয়র ম্যানেজার রাসেল নামে এক ছোকরা সাহেব, সে-ই ওই জমি কেনা এবং প্ল্যান্ট বসানোর কাজ দেখাশোনা করার জন্য তখন ব্রিটেন থেকে ধনেখালিতে এসেছিল। ছেলেটা খুব উদ্ধত ধরনের। লোকাল লোকেদের ওইসব কথা শুনে বুকে চাপড় মেরে বলেছিল, তোমরা সব কুসংস্কারাচ্ছন্ন গাঁইয়া লোকজন। দেখো, আমি আজকেই ওই জমিতে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে যাচ্ছি। কাল সকালে কফি আর নাস্তা নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করবে।’

‘তারপর?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। ‘পরদিন সকালে ওরা গিয়েছিল?’

কণাদ বলল, ‘গিয়েছিল। দশ-বারোজন গ্রামবাসী, তারা তাঁতিপাড়ার জঙ্গলের ঠিক বাইরেই একটা গ্রামে থাকে, তারাই গিয়েছিল। গিয়ে দেখেছিল, ছোটো তাঁবুটার ঠিক বাইরে রাসেলসাহেবের মৃতদেহ পড়ে আছে।’

‘বলো কী!’ কণাদের কথা শুনে আমি স্তম্ভিত।

‘হ্যাঁ। মৃতদেহের চারপাশে ঝোপঝাড় এমনভাবে দলে-মুচড়ে গিয়েছিল যে, দেখেই বোঝা যাচ্ছিল মারা যাওয়ার আগে রাসেল ভয়ংকর স্ট্রাগল করেছে। কীসের বিরুদ্ধে স্ট্রাগল সেটাও ওই গ্রামবাসীরা বুঝতে পেরেছিল। রাসেলের হাতে আর গলায় ফরসা চামড়ার ওপরে অজস্র লাল লাল দাগ ফুটেছিল। যেন তিন-চার ইঞ্চি করে লম্বা আর আঙুলের মতন মোটা পাপড়ি সমেত এক-একটা লাল ফুল।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আসলে সেগুলো কীসের দাগ ছিল?’

কণাদ আবার চেয়ারে এসে বসল। বলল, ‘গ্রামবাসীদের বিশ্বাস মাকড়শার পায়ের দাগ। ফুলের পাপড়ির মাঝে মাঝে তো গাঁট থাকে না, এগুলোর মধ্যে ছিল। তা হলে মাকড়শার ঠ্যাং ছাড়া আর কীসেরই বা ছাপ হবে ওগুলো?’

‘আর মৃত্যুর কারণ? মাকড়শার বিষ?’

কণাদ ঘাড় নাড়াল। বলল, ‘উঁহু। সেটাই তো আশ্চর্য। পোস্টমর্টেম এবং ভিসেরা-টেস্টে ওর শরীরে কোনও বিষ পাওয়া যায়নি। রিপোর্টে বলা ছিল, কোনও অজানা আতঙ্কে ওর হৃৎপিণ্ডের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। তারপর বললাম, ‘তুমি এখন কী করবে?’

ও বলল, ‘কোম্পানি আমাকে পাঠিয়েছে ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করে দেখতে। অর্থাৎ আমাকে তাঁতিপাড়ার জঙ্গলে গিয়ে রাত কাটাতে হবে। হাতে সময় বেশি নেই। আমি কালকেই যাচ্ছি। তুমি আমার সঙ্গে যাবে অরুণ?’

আমাকে সঙ্গে যেতে বলার কারণ রয়েছে। চাকরি ছাড়া আমি আর যেটা করি সেটা হচ্ছে জঙ্গল-ভ্রমণ। শুধু ভারতেরই নয়, বিদেশেরও বহু গহন অরণ্য আমার ঘোরা। তার মধ্যে আমাজনও রয়েছে। কণাদ জানত আমি সঙ্গে থাকলে অতর্কিতে কোনও প্রাণী বা কীটপতঙ্গের আক্রমণের মুখে পড়ার সম্ভাবনা নেই।

কণাদের চোখে স্পষ্ট মিনতি দেখতে পেলাম। এর পরে ‘না’ বলার প্রশ্নই ওঠে না। বললাম, ‘ঠিক আছে। চলো’

***

পরদিন দুপুরে লাঞ্চ করেই আমরা দু’জনে ধনেখালির উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলাম। কণাদ প্রাণপণে চেষ্টা করেও আমাদের সঙ্গে রাত কাটাবার জন্য কোনও স্থানীয় মানুষকে রাজি করাতে পারেনি। তবে বলল, ডেভিডসাহেব আমাদের সঙ্গে যাবেন।

‘ডেভিডসাহেব কে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

কণাদ মুখটা ব্যাজার করে বলল, ‘তিনি এক খ্যাপাটে বৃদ্ধ। হুগলির অ্যাংলিকান চার্চের যাজক, পঁচাশি বছর বয়স। ছ’মাস আগে যখন আমাদের কোম্পানির টিম ধনেখালিতে সার্ভে করতে গিয়েছিল, তখনই খবর পেয়ে উনি তাদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিলেন। ওদের কাছ থেকেই তখন আমার ফোন নম্বরও নিয়ে রেখেছিলেন।’

আমি বললাম, ‘নাম শুনে তো ইউরোপিয়ানই মনে হচ্ছে।’

‘ইউরোপিয়ান মানে? খাঁটি ব্রিটিশ! কিন্তু পঞ্চাশ বছরের ওপরে হুগলিতে আছেন তো, তাই পুরো বাঙালি হয়ে গেছেন। দারুণ বাংলা বলেন, কই মাছের কাঁটা বেছে খান। শুনেছি চার্চের বাইরে লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে ঘোরাঘুরি করেন।’

‘ইন্টারেস্টিং মানুষ তো। তা উনি আমাদের সঙ্গে যাবেন শুনে তুমি ব্যাজার হচ্ছ কেন?’

‘ব্যাজার হব না? লোকটা খালি আমাদের কাজে বাধা দিতে চায়। বলে, মিস্টার মিত্র, জায়গাটাকে শোধন না করে ওখানে ফ্যাক্টরি তৈরি করার মতো ভুল করবেন না। আড়াইশো বছর আগে যারা ওখানে বসে তাঁত বুনত, তাদের অভিশাপ ছড়িয়ে আছে তাঁতিপাড়ার জঙ্গলের, মাটিতে আর বাতাসে। আপনারা ঝাড়ে-বংশে উৎখাত হয়ে যাবেন। ‘

আমি কণাদকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘ছাড়ো তো। উনি সঙ্গে থাকলে থাকবেন। আমরা দু’জনেই যথেষ্ট। তোমার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে আর আমার জানা আছে বুশক্র্যাফট— জঙ্গলে রাত কাটানোর কায়দাকানুন। যদি কোনও অজানা কীতপতঙ্গ থেকেও থাকে, তাদের পক্ষে আমাদের কাছে আসাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ওসব বিছে-সাপ-মাকড়শা আমি অনেক দেখেছি; অনেক রাত কাটিয়েছি ওদের মধ্যে।’

এতক্ষণে ওর মুখে একটু স্বস্তির চিহ্ন দেখতে পেলাম।

একটু বাদে বললাম, ‘ডেভিডসাহেব তোমাকে বলেছেন, আড়াইশো বছর আগে ওখানে বসে লোকে তাঁত বুনত? সেইজন্যই বোধহয় জায়গাটার নাম তাঁতিপাড়া, তা-ই না?’

ও বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, সেই তাঁতিরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেল কেন, তখন আর উত্তর দিলেন না। সাধে কি আর খ্যাপাটে বলছি?’

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘কী জানি, বিষাক্ত মাকড়শার অত্যাচারেই ওদের পালাতে হয়েছিল কি না। একটা কথা বলো তো, অরুণ! ভারতে এরকম প্রকাণ্ড সাইজের মাকড়শা আছে?’

আমি বললাম, ‘এইসব সাপ, মাকড়শা, বিছে— এদের মতো ছোটোখাটো প্রাণীদের নিয়ে একটা সমস্যা কী জানো তো? এরা অনেক সময় বিদেশি জাহাজের মালের স্তূপের মধ্যে লুকিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়, তারপর সেখানে বংশবৃদ্ধি করে। আমি নিজেই একবার কলকাতা ডকে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা শালগাছের গুঁড়ির ফোকরের মধ্যে মালয়েশিয়ার বিষাক্ত সাপের দেখা পেয়েছিলাম।’

এরপর কণাদ যে কথাটা বলল, সেটা যে শুধু অদ্ভুত তা-ই নয়, বেশ ভয়-ধরানো। ও বলল, রাসেলের মৃত্যুটাই ওই জঙ্গুলে মাকড়শাদের হাতে প্রথম মৃত্যু নয়। উনিশশো চোদ্দো কিংবা পনেরো সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক সাহেব তাঁর দু’জন শ্বেতাঙ্গ সঙ্গীকে নিয়ে ওই জঙ্গলে বুনো শুয়োর শিকার করতে ঢুকেছিলেন। তাঁরাও ঠিক একইভাবে মারা পড়েছিলেন।

‘একইভাবে মানে? মাকড়শার কবলে?’

‘হ্যাঁ। কথাটা অবিশ্বাস করার কারণ নেই। আমি লন্ডন লাইব্রেরিতে তখনকার এক ইংরিজি খবরের কাগজে খবরটা খুঁজে পেয়েছি। সেখানেও লেখা আছে, তাদেরও দেহের অনাবৃত অংশে প্রায় চার ইঞ্চি ব্যাসের ফুলের পাপড়ির মতন লাল লাল ছোপ ছিল।’

কথা বলতে-বলতেই আমরা পৌঁছে গেলাম ধনেখালি বাজার আর সেখানেই কণাদের কোম্পানির তিন-চারটি ছেলে আমাদের স্টেশন ওয়াগনের পিছনে দুটো সুইস-টেন্ট, স্টোভ, বাসনপত্র, চাল-ডাল-মাছ- মাংস এবং জলের ড্রাম তুলে দিল। কিন্তু তারা নিজেরা কেউ গাড়িতে উঠল না। উঠলেন পাদরি ডেভিডসাহেব

কণাদ যা-ই বলুক, আমার কিন্তু মানুষটিকে বেশ লাগল। বয়স হলেও এখনও খুব শক্তসমর্থ চেহারা। টাকমাথা। পরিষ্কার করে কামানো দাড়িগোঁফ। গ্যালিস দেওয়া কর্ডের প্যান্ট আর জ্যাকেট পরেছিলেন। বললেন, পাদরির পোশাকটাও সঙ্গে নিয়েছেন। সেটা পিঠের রাকস্যাকের মধ্যে রয়েছে।

গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার পরে বললেন, শুধু পাদরির পোশাকই নয়, আরও অনেককিছুই নাকি তাঁর সঙ্গে রয়েছে, যেগুলো ভূত তাড়াতে কাজে লাগে।

কণাদ ড্রাইভ করতে করতেই অধৈর্য স্বরে বলল, ‘আপনি ভূতটা কোত্থেকে পাচ্ছেন বলুন তো, স্যার? এখনও অবধি তো পুলিশ, আমাদের লোকাল স্টাফ, কেউ ভূতের কথা বলেনি।’

উনি ঠোঁটের হাসিটা ঠোঁটেই ধরে রেখে বললেন, ‘চিনতে পারেনি, তাই বলেনি। ওরা কি কেউ আমার মতো এই অঞ্চলের ইতিহাস জানে? ওরা কি কেউ দেখেছে, অ্যাংলিকান চার্চের লাইব্রেরির এক পুথিতে কোন ভয়ংকর ঘটনার কথা লেখা আছে?’

আমি সামনের সিটে কণাদের পাশেই বসেছিলাম। ও আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল, বুড়োর মাথাটা পুরোই গেছে।

***

তাঁতিপাড়ার জঙ্গলের বাইরে গাড়ি রেখে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ছ’মাস আগে রাসেল আর তার দলবল একটা পায়ে-চলা রাস্তা বানিয়েছিল। ছ’মাসের রোদে-বৃষ্টিতে সেই রাস্তার অনেকটাই ঢেকে গিয়েছিল, তবু যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটুকু ধরেই আমরা তিনজন এগিয়ে চলেছিলাম। তিনজনেরই হাতে আর পিঠে অনেক মাল ছিল, তাই আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম আমরা।

মিনিট পনেরো হাঁটবার পরে বেশ পরিষ্কার চৌকোনা একটা জমিতে গিয়ে থামলাম। বুঝতে অসুবিধা হল না, এখানেই রাসেল তার তাঁবু খাটিয়েছিল। গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। মনে পড়ল, এখানেই অজানা কোনও আতঙ্কে আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে মারা গিয়েছিল এক তরতাজা যুবক। সেই আতঙ্কের কারণ কি আজ আমাদেরও দেখা দেবে?

কণাদ ক্যাম্পিং সাইটের আশপাশটা ঘুরে দেখছিল। হঠাৎ ডাক দিল, ‘অরুণ! একটা জিনিস দেখে যাও।’

আমি আর ডেভিডসাহেব দু’জনেই ওঁর ডাক শুনে ওদিকে গিয়ে দেখলাম, একজায়গায় সারিবদ্ধভাবে কয়েকটা বাড়ির উঁচু ভিত দেখা যাচ্ছে। ডেভিডসাহেব বললেন, ওগুলোই নাকি আড়াইশো বছর আগের সেই তাঁতিদের গ্রামের ধ্বংসাবশেষ।

‘আর ওইটা?’

ক্যাম্প সাইট থেকে বড়োজোর দশহাত দূরেই পাথুরে ইট দিয়ে তৈরি একটা অদ্ভুত চৌকোনা স্তূপ দেখা যাচ্ছিল। সেটার দিকেই আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

স্তূপটা মন্দিরের তুলনায় অনেক ছোটো আবার কবরের তুলনায় অনেক বড়ো। সারা গায়ে বট-অশ্বত্থের গাছ গজিয়ে উঠে স্থাপত্যটাকে আরওই দুর্বোধ্য করে তুলেছে। তবে একদম মাটি ঘেঁষে ওটার গায়ে একটা বড়ো গর্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, ওই গর্তটার সামনের মাটিতে লতাপাতা কিংবা ঘাস গজায়নি। দেখলে মনে হবে যেন কেউ নিয়মিত ওখানটা পরিষ্কার করে।

ডেভিডসাহেব কিছুক্ষণ দূর থেকেই স্তূপটাকে লক্ষ করলেন। তারপর বললেন, ‘এরকম একটা জিনিসের কথা আমাদের লাইব্রেরির সেই পুথিতে পড়েছিলাম ঠিকই। তবে বিশ্বাস করিনি। এখন মনে হচ্ছে, সত্যি কথাই লিখেছিল ওরা।’

ওটা মন্দির না কবর, না কি অন্য কিছু তা আর ডেভিডসাহেব আমাদের বললেন না। জিজ্ঞেস করায় বললেন, ‘চিন্তা বাড়িয়ে লাভ কী?’

***

সন্ধেটা সোলার ল্যাম্পের আলোয় কোনওরকমে কাটিয়ে, একটু রাত হতেই আমরা খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলাম। আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম, টেন্টের মেঝের বদলে গাছের ডালে হ্যামক টাঙিয়ে শোওয়া হোক। তাতে মাকড়শাজাতীয় কীটপতঙ্গের হাত থেকে অনেকটাই নিরাপদে থাকা যাবে। ডেভিড সাহেব বললেন, ‘আমি শোবো না। আমাকে আজ রাতে জেগে থাকতে হবে।’

পরিবেশটা খুব অস্বস্তিকর লাগছিল। কিছুই না। শুধু মনে হচ্ছিল, গাছগাছালির আড়াল থেকে কারা যেন অপলকে আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অথচ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। ডেভিডসাহেব বললেন, ‘আপনারা কি একটা প্রেজেন্স, অর্থাৎ কারুর উপস্থিতি টের পাচ্ছেন?’ আমি আর কণাদ দু’জনেই ঘাড় হেলালাম। মুখে কিছু বললাম না।

‘আমিও পাচ্ছি,’ এই বলে ডেভিড ওঁর ব্যাগ থেকে পাদরির সাদা আলখাল্লা আর বাটির মতো টুপি বার করে গায়ে চড়ালেন। গলায় পরলেন বড়ো একটা রুপোর ক্রশ। তারপর একটা শিশি থেকে পবিত্র জর্ডন নদীর জল আমাদের গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করলেন। বললেন, ‘শুয়ে পড়ুন আপনারা। আপনাদের ভয় নেই। ওরা আমাকেই আক্রমণ করবে। আক্রান্ত হওয়ার জন্যই আমি এসেছি। আমি ওদের চিরশান্তি দিতে চাই।’

ওঁর কথা কিছুই বুঝলাম না। তবে এটা বুঝলাম, মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সেই থম হয়ে থাকা আবহাওয়া যেন একটু হালকা হল। একটু বাতাস বইল, দু’-একটা রাতপাখির ডাক শোনা গেল। আশেপাশের ঝোপে জোনাকি জ্বলতে শুরু করল। আর যে অদৃশ্য চোখগুলো আমাদের দিকে তাকিয়েছিল, তারাও যেন পিছিয়ে গেল অনেকটা।

শুকনো পাতা আর ঝোপঝাড় জড়ো করে ক্যাম্পিং সাইটের চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে দিলাম। তারপর একটা পুরোনো তেঁতুলগাছের ডালে পাশাপাশি দুটো হ্যামক টাঙিয়ে আমি আর কণাদ শুয়ে পড়লাম। ডেভিডসাহেব টেন্টের দরজায় শিরদাঁড়া খাড়া করে বসে রইলেন। বললেন, ‘সোলার ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিন, মিস্টার মিত্র। না হলে চার্জ খতম হয়ে যাবে।’ কণাদ শোবার আগে আলোটা নিভিয়ে দিয়ে এল।

এরপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, খেয়াল নেই। হঠাৎ ঘুম ভাঙল উচ্চৈঃস্বরে মন্ত্রপাঠের শব্দে। ধড়মড় করে হ্যামক থেকে লাফিয়ে নামলাম। কণাদও নেমে এল।

নিভু নিভু আগুনের লালচে আলোয় দেখলাম এক বীভৎস দৃশ্য।

দেখলাম, সেই পাথরের স্ট্রাকচারটার নীচের গর্ত থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে সাদা মাকড়শা। এক-দুই-তিন… ত্রিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ। আর গুনতে পারছিলাম না! মাকড়শাগুলো বিদ্যুৎবেগে দৌড়ে এসে ডেভিডসাহেবের গায়ের ওপরে লাফিয়ে পড়ছিল।

উনি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার মাকড়শার চাপে মাটিতে পড়ে গেলেন। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও মন্ত্রপাঠ থামালেন না।

‘আলোটা কোথায়? আলোটা?’ কণাদ পাগলের মতন এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে সোলার ল্যাম্পটা খুঁজে পেল এবং সেটা জ্বালিয়ে ফেলল। আলোটা ডেভিডসাহেবের গায়ে গিয়ে পড়তেই যে-দৃশ্য দেখলাম, তেমন দৃশ্য কোনওদিন দেখিনি তো বটেই, কল্পনাতেও আনিনি। দেখলাম, যেগুলোকে মাকড়শা ভেবেছিলাম, সেগুলো মোটেই মাকড়শা নয়… মানুষের কাটা হাতের কঙ্কাল। ডানহাতের কবজি থেকে শুরু করে পাঁচটা আঙুল। আঙুলগুলো কিলবিল করে নড়ছে আর হাড়সর্বস্ব হাতগুলো এগিয়ে যাচ্ছে… ঠিক দৈত্যাকার মাকড়শার মতোই।

আমরা যখন আতঙ্কিত এবং হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তখনই হঠাৎ হাতগুলো পিছু হঠতে শুরু করল। মুঠোর মধ্যে জর্ডন নদীর জলের পাত্র নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ডেভিডসাহেব। ওঁর মুখ দেখে বুঝতে পারলাম লড়াইটা উনি জিতে গেছেন।

আর হাতগুলো? সেগুলোর কী হল?

তাকিয়ে দেখলাম, সেগুলো এক এক করে আবার ওই পাথরের স্তূপটার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। শেষ হাতটাও ঢুকে যাওয়ার পরে পাদরি ডেভিড গর্তটার সামনে গিয়ে নতুন উদ্যমে আমাদের অজানা কোনও ভাষায় মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন। একটু বাদেই গহ্বরের ভেতর দপ করে একটা চোখ-ধাঁধানো নীল আলো জ্বলে উঠল। সেই নীল আলোর রশ্মি আকাশের দিকে উঠে মিলিয়ে গেল। কপালের ঘাম মুছে ডেভিডসাহেব হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়লেন।

আমি আর কণাদ ওঁর দিকে দৌড়ে গেলাম। দেখলাম অলৌকিক কাটা হাতেদের সঙ্গে এতক্ষণের লড়াইয়ের পরিশ্রমে উনি প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়েছেন। ওঁর মুখে-চোখে জল দিয়ে তাঁবুর ভেতরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলাম। ঠিক তখনই ভোরের প্রথম পাখিটা ডেকে উঠল।

***

ফেরার পথে ডেভিডসাহেব বললেন, ‘ব্রিটিশ শাসকেরা মসলিন তাঁতিদের ডানহাত কেটে নিয়েছিল, জানেন? যাতে তারা আর কোনওদিন মসলিন বুনতে না পারে। সেই ঘটনায় মারা পড়েছিল তাঁতিপাড়ার প্রায় সমস্ত পুরুষ। যারা বেঁচে ছিল, তারা মৃত সঙ্গীদের দেহগুলো চিতায় জ্বালিয়ে সৎকার করেছিল। কিন্তু কোনও এক অজানা ক্ষোভে, গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে, আত্মীয়-বন্ধুদের কাটা হাতগুলো তারা একটা পাথরের স্তূপ বানিয়ে তার নীচে চাপা দিয়ে গিয়েছিল।

সেই হাতের কঙ্কালগুলোই আমরা দেখলাম। দু’শো বছর ধরে কোনও শ্বেতাঙ্গকে হাতের কাছে পেলে, হাতগুলো এইভাবেই তাদের ওপর প্রতিশোধ নিয়ে আসছে। ভেবে দেখুন, তাঁতিপাড়ার বনে এখনও অবধি এদেশীয় কোনও লোকের কিন্তু মৃত্যু হয়নি। তার কারণ, ওই অতৃপ্ত আত্মাদের রাগ ছিল শুধু সাহেবদের ওপরে, যাদের হাতে ওদের মৃত্যু হয়েছিল।

সবাই হাতের ছাপগুলোকে মাকড়শার পা বলে ভুল করতেন। কিন্তু আমি চার্চের লাইব্রেরিতে রক্ষিত প্রাচীন পুথি পড়েছিলাম বলেই জানতাম ওদের আসল পরিচয়। আমি ওদের অভিশপ্ত আত্মাকে মুক্তি দিতে চাইছিলাম; সেই মন্ত্রও আমার জানা ছিল। আপনারা আমাকে সুযোগ করে দিলেন, ধন্যবাদ আপনাদের।

এবার আপনারা নিশ্চিন্তে এখানে কারখানা স্থাপন করতে পারেন। সম্ভবত উত্তরসূরিদের হাতে আবার মসলিন বোনা হচ্ছে দেখলে স্বৰ্গ থেকে তাদের পূর্বপুরুষেরা আপনাদের আশীর্বাদই করবেন।’

আমি আর কণাদ একসঙ্গে বললাম, ‘আমেন!’

1 Comment

এই গল্পটা আমার ভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছে। শুধু যে সুন্দর তাই নয় ভাষার বুনোট বলার কায়দা এবং অবশ্যই ঘটনাটা আর তার সঙ্গে জড়িত ইতিহাস। অনেক শুভকামনা জানাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *