রক্তের ব্যবস্থা
কাপড়ের বালতি থেকে মা’র ভিজে পেটিকোটটাকে তুলে নিয়ে শিখা এমন হিংস্রভাবে সেটাকে মোচড়াতে শুরু করল, যেন ওটা নিছক একটা সাদা পেটিকোট নয়; যেন ওটা ওর মা’র গলা, যার ভেতরে মা’র সরু সরু কণ্ঠার হাড় আছে, জ্যালজেলে রক্তের নালি রয়েছে। যেন প্রাণপণে মোচড় দিলে জলের বদলে তাদের এই এজমালি বাড়ির ছাদে শিখার মা’র কশেরুকা-মজ্জা-রক্ত ঝরে পড়বে।
সেরকম কিছু হল না অবশ্য। শিখা একে একে মা’র পেটিকোট, তোয়ালে, বিছানার চাদর আর অয়েলক্লথ, সবই বালতি থেকে তুলে ছাদের রোদ্দুরে মেলে দিল। প্রত্যেকটা জিনিস দড়িতে মেলার আগে শিখা হাওয়ার মধ্যে সপাটে আছড়ে তার জল ঝাড়ছিল আর দাঁতে দাঁত চিপে বলছিল, ‘মরবে না! বুড়ি মরবে না!’
শিখা যা বলে আস্তেই বলে। অনেকসময় বলেও না, মনের মধ্যে পুষে রেখে দেয়। কাকা-জ্যাঠাদের পরিবারের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতে থাকতে এই অভ্যেসটা তার রপ্ত হয়ে গেছে। এখানে চারিদিকে অনেক চোখ, অনেক কান। শিখা কী করছে, কী বলছে সব তারা দেখে, শোনে। শুধু হাত নেই কারুর। শিখার জন্য এই বাড়িতে সাহায্যের হাত নেই একটাও।
এই এখনই যেমন, খালি বালতিটা নিয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে কি বাড়ায়নি, ছোটোকাকিমা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। শিখাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল,,বড়দি কেমন আছে রে, শিখা?’
শিখা মিষ্টি হেসে উত্তর দিল, ‘ভালো আছে গো, ছোটোকাকি।’
‘রক্ত কমে যাচ্ছে না কী যেন বলেছিল ডাক্তার? ব্লাড দিতে হবে বলেছিল না? দিয়েছিলিস?’
শিখা বলল, ‘পরশু আবার টেস্ট করিয়েছিলাম। এখন হিমোগ্লোবিন কাউন্ট এমনিতেই আবার নর্মাল হয়ে গেছে। ব্লাড দিতে হবে না।’
কাকি বলল, ‘দুর্গা! দুর্গা! ভালো হলেই ভালো।’
মার্কেটের মধ্যে ছোটোকাকার একটা বেশ চালু কসমেটিক্সের দোকান রয়েছে। অন্তত চারটে মেয়ে দোকানটায় সেল্সগার্লের চাকরি করে। শিখাকে ইচ্ছে করলেই দোকানটায় ঢুকিয়ে নিতে পারত কাকা, কিন্তু নেবে না। ওদের মা-মেয়ের ওপর সবার অত রাগ কেন কে জানে!
‘কে জানে’-টা কথার কথা। শিখা জানে, মাকে এই বাড়ির লোকেরা ঘেন্না করে মা’র লুজ ক্যারেকটারের জন্য। শিখাও কি করে না? করে। তবে আবার কিছুটা ক্ষমা না করেও পারে না। তার কারণ, মা যদিও এ ব্যাপারে একটি কথাও কোনওদিন বলেনি, তবু ওর মনে হয়, মা রথীনকাকুর সঙ্গে সম্পর্কটা রেখেছিল কিছুটা শিখার কথা ভেবে। শিখাকে বাঁচানোর জন্য। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে রথীনকাকুই ছিল ওদের একমাত্র সহায়। কী না করেছে লোকটা তাদের জন্য? অথচ তার বদলে মা’র কাছ থেকে ভালোবাসা ছাড়া পেয়েছে কি কিছু? মনে তো হয় না। মা কোনওদিন শিখাকে ছেড়ে বাইরে রাত কাটায়নি।
অবশ্য ভালোবাসা পাওয়াই তো অনেক। শিখা আজ এই চব্বিশ বছর বয়সে পৌঁছে সেটা বেশ বুঝতে পারে। ওকে আজ অবধি কেউ ওইভাবে ভালোবাসতে পারল না, মাকে যেভাবে রথীনকাকা ভালোবেসেছিল। শরীরের দিকে হাত বাড়িয়েছে অনেকে, এমনকি বিয়ে করতেও চেয়েছে। কিন্তু যে-ই শুনেছে অসুস্থ মা ওর গলগ্রহ হয়ে রয়েছে, অমনি সেইসব যুবকেরা মানে মানে সরে পড়েছে। ওগুলো ভালোবাসা ছিল না।
হঠাৎই পাশের নন্দ মিত্তিরদের বাড়ির ছাদ থেকে প্রবল খিস্তির স্রোত ছুটে এল। শিখা আড়চোখে দেখল, নন্দ মিত্তিরের দামড়া ছেলে বকাই একটা হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে সারা ছাদে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আর কাকে যেন গালাগালের তোড়ে ধুইয়ে দিচ্ছে। ছোটোকাকিমার মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে গিয়েছিল। শিখা কাকিমাকেই জিজ্ঞেস করল, ‘ছোটোলোকটার হঠাৎ কী হল? খেপল কেন?’
ছোটোকাকিমা তেতো স্বরে বলল, ‘আর বলিস কেন! লাটসাহেবের পোষা পায়রা কে যেন চুরি করে নিয়ে গেছে। চুরি আবার কী? অন্য ঝাঁকে সেরকম পছন্দের মদ্দা পায়রা পেলে দু’-একটা মাদি অমনিই ভেগে যায়। প্রকৃতির নিয়ম। তা নিয়ে মানুষকে গালমন্দ করলে হবে?’
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে শিখা ছোটোকাকিমার শেষের কথাগুলো নিয়েই ভাবছিল। তারও ইচ্ছে করে মাদি-পায়রার মতন পছন্দের কোনও পুরুষের সঙ্গে এন্টালির এই বস্তি থেকে ভেগে যেতে। কিন্তু যাবে কেমন করে? মা তো মরছে না। আর মা না মরলে তো কোনও মদ্দাই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে না।
***
শিখাদের জন্য বরাদ্দ ঘরটা দোতলার কোনার দিকে। এন্টালি মার্কেটের পিছনে এই পুরোনো তিনতলা বাড়িটায় সবচেয়ে অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে ঘর ওটাই। ঘরের সামনে দালানের একটা কোনা টিন দিয়ে ঘিরে বাবা রান্নাঘর বানিয়েছিল। বাথরুমটা ঘরের পিছনের দিকে।
ঘরের দরজা ভেজিয়ে রেখে শিখা ছাতে গিয়েছিল। এখন দরজা খুলে ঘরে ঢুকে দেখল, মা চোখ খুলে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। গত একবছর ধরে মা ওইটুকুই পারে— চোখ খোলা আর চোখ বন্ধ করা। হ্যাঁ, মুখের মধ্যে ধীরে ধীরে চামচে করে খাবার ঢুকিয়ে দিলে গিলে নিতেও পারে। ব্যস, ওইটুকুই। বাকি সবকিছুর জন্য বেডপ্যান আর কাঁথাকানি আর শিখার হাজা-পড়া দুটো হাত ছাড়া কিছু নেই।
ডেটল আর ফিনাইলের গন্ধে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে রয়েছে। সবসময়েই থাকে। তার সঙ্গে অবধারিতভাবে প্রস্রাবের গন্ধও মিশে থাকে। কিন্তু আজ ঘরে ঢুকেই শিখা এইসবের মধ্যে একটা অন্যরকমের গন্ধ পেল। কেমন যেন বিদঘুটে বুনো একটা গন্ধ। এই ঘরে গলির দিকে একটামাত্র জানালা। তার আলোতে পুরো ঘরটা ভালো করে আলো হয় না। শিখা তাই ঘরের টিউবলাইটটা জ্বেলে ঘরের কোনাঘুপচি, খাটের তলা সব ভালো করে দেখল, কিন্তু কোথাও সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেল না। তখন সে ঘরে একটা ধূপ জ্বেলে দিয়ে রান্নাঘরে মা’র জন্য গলা ভাতের ব্যবস্থা করতে গেল।
এই গলা ভাত আর আলুসেদ্ধ খেয়ে মা’র গায়ে যে কেমন করে আবার রক্ত ফিরে এল বুঝতে পারে না শিখা। কতটুকুই বা পুষ্টি আছে এর মধ্যে? ডাক্তারবাবু ব্লাড দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তার জন্য নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হত। উৎসাহ পায়নি শিখা। কী লাভ মা’র আর বেঁচে থেকে? ব্রেন শুকিয়ে গিয়েছে। পাথরের মতন পড়ে রয়েছে আজ দু’বছর হল। মৃত্যু মানে কি এখন মানুষটার মুক্তি নয়?
মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে মা’র সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছিল। কেউ তাকে বলেনি, কিন্তু শিখা বুঝতে পারে কেন মা’র মাথার শিরা ছিঁড়ে গিয়েছিল। হয়তো আরও কেউ কেউ বুঝতে পারে, যারা জানে সেই বিকেলটার ঘটনাগুলো।
মা বাণীবীথি ইস্কুলে ক্লার্কের চাকরি করত। রোজ বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ হেঁটেই বাড়ি ফিরত। তো, সেদিনও ওইরকম ফিরছিল। চৈত্রমাস ছিল সেটা। একটা ঝড় উঠেছিল হঠাৎ।
রথীনকাকু ছিল ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির মিস্ত্রি। ছোটোবেলা থেকে কতবার কত জায়গায় শিখা নিজেই রথীনকাকুকে দেখেছে ইলেকট্রিকের পোলের ওপরে উঠে কাজ করছে। লম্বা, কালো, ছিপছিপে চেহারা। একটু কটা চোখের মণি। কাজের মধ্যে রথীনকাকুকে দেখলে ভয় ভয় করত শিখার, ওই অত উঁচু মইয়ের ওপরে হাত-টাত ছেড়ে দাড়িয়ে রয়েছে। যদি পড়ে যায়। পড়ত না অবশ্য। মা বলত, ‘ও গতজন্মে বেড়াল ছিল।’
শিখা জানে, মানে পরে জেনেছে, সেদিন মা’র ফেরার রাস্তাতেই, গাজনতলার মোড়টার কাছে একটা ফল্ট রিপেয়ার করার জন্য রথীনকাকু পোস্টের মাথায় উঠেছিল। ঝড়ের প্রথম দমকাটা কোনও জ্যান্ত তারকে দুলিয়ে দিয়ে থাকবে— শিখার ধারণা। মা’র চোখের সামনেই রথীনকাকু পোলের ওপর থেকে পুড়তে পুড়তে রাস্তায় আছড়ে পড়ে
এই দৃশ্য দেখার পরেও যদি একজন মহিলার মাথার শিরা ছিঁড়ে না যায় তা হলে সে কীসের প্রেমিকা?
সে-ই সূত্রপাত। তারপর থেকেই মা এইভাবে পাথরের মতন বিছানায় পড়ে রয়েছে। ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মরছে না। আর মরছে না মা’র চোখদুটো।
শিখা ভিজে গামছার কোন দিয়ে মা’র চোখ-মুখ মুছিয়ে দিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, এখনও মা’র চোখদুটো কী সজীব, কী সুন্দর! স্থিরদৃষ্টি যেন নিবদ্ধ কোনও প্রেমিকের মুখে। একমাত্র তখনই কোনও মেয়ের চোখ এরকম সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। শিখা মা’র কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ‘মা! তোমার রথীনকাকুকে মনে আছে?’
হয়তো মনেরই ভুল, শিখার মনে হল এই প্রশ্ন শুনে মা’র চোখের মধ্যে এক লহমার জন্য আলো জ্বলে উঠল। চামচে করে একটু গলা ভাত মুখের মধ্যে ঠুসিয়ে দিয়ে শিখা বলল, ‘ঘুমোও, মা।’
মা চোখ বোজার পরেও শিখা কিছুক্ষণ তার মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। রক্তহীনতার জন্য মা’র গায়ের রং অনেকদিন ধরেই ইটচাপা ঘাসের মতন ফ্যাকাশে হয়ে ছিল। কিন্তু আজ সেই বিবর্ণতায় কোথা থেকে যেন লালিমা এসে মিশেছে। দুধে মিশেছে আলতা। মা তো কিছুই খায় না। রক্ত তৈরি হচ্ছে কোথা থেকে— ভাবল শিখা।
***
বুনো গন্ধটা তারপর থেকেই মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে ফিরে আসতে শুরু করল। দিন তিনেক বাদে, শোবার সময় শিখা তার বিছানার পাশে একগোছা রক্তমাখা পালক দেখতে পেয়ে শিউরে উঠল। কোনওরকমে বমি চেপে সে পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে চেপে ধরে পালকগুলোকে পিছনের গলিতে ফেলে দিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম আসছিল না। সেটা গরমের জন্যও হতে পারে আবার শোবার আগের ওই গা-গোলানো ঘটনাটার জন্যও হতে পারে। ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে হঠাৎই শিখা বুঝতে পারল, জানালার মধ্যে দিয়ে ঢুকে আসা ল্যাম্পপোস্টের আলোটা একটু কমে গেল। কে যেন আলোটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে।
ঘুমের ঘোর কেটে গেল। শিখা দেখল, মানুষ নয়, একটা কালো বেড়াল। বেড়ালটা নিঃশব্দে লাফ মেরে ঘরে ঢুকল। তারপর আর-একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে উঠে পড়ল মা’র বিছানায়। ওর মুখে একটা মরা পায়রা বুনো গন্ধে ঘরটা ভরে উঠল।
শিখা অল্প হেসে উলটোদিকে ফিরে শুল। মনে মনে বলল, খাওয়াও, রথীনকাকু, তোমার প্রেমিকাকে মাংস খাওয়াও। আমি তো পারি না, আমার ক্ষমতা নেই তুমি জানো। তুমিই মা’র রক্তের ব্যবস্থা করো।
