॥ নয়।।
২০ মে রাত সাড়ে এগারোটা থেকে ২০ মে রাত বারোটা বাজতে দশ
.
প্রেমের বাস নাকি হৃদয়ে। তাই নিয়ে কত শিল্প। ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’ থেকে ‘হৃদয়ের এ কুল ওকুল দু কূল ভেসে যায়’, ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ থেকে ‘সার্জেন্ট পেপার্স লোনলি হার্টস ক্লাব ব্যান্ড’, ‘দিল ধক ধক করনে লগা’ থেকে ‘দিল হুম হুম করে’, ‘দিল হ্যায় কে মানতা নেহি’ থেকে ‘তোমায় হৃদমাঝারে রাখব’, ‘হালয়ে প্রেমের শীর্ষ’ থেকে ‘হৃদয় অবাধ্য মেয়ে, গানে, চলচ্চিত্রে, কবিতায় হৃদয়ের রমরমা বাজার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সেই লাল হরতন, যাকে ফুঁড়ে চলে যায় মদনদেবের তির। ক্রবাদুর থেকে সুদ সেয়ার, কথক থেকে গায়ক, ক্রিস্টাল বল গেজার থেকে জ্যোতিষী, কবি থেকে গদ্যকার, ট্যারো কার্ড রিডার থেকে অ্যাগনি আন্ট, অভিনেতা থেকে বাচিক শিল্পী, লাভ শুরু থেকে চাইনিজ জোডিয়াক সাইন, সবাই বলেন প্রেমের শুরু থেকে শেষ, সবটাই হৃদরের খেলা। এত সুর আর এত গান, এত দীর্ঘশ্বাস আর এত বিরহ, এত হাসি আর আর এত মিলন… সব কিছুর মুলে ওই হৃদয়।
কিন্তু হৃদয় তো থাকে বুকের বাঁ দিকে, পাঁজরের তলায়। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র বলে দিয়েছে, হার্ট আদতে একটা পাম্প। কুয়ো থেকে জল তুলে ছাদের ট্যাঙ্কিতে পাঠায় যে মেশিন, তার সঙ্গে হার্টের কোনও তফাত নেই। মানুষের জন্মেরও আগে থেকে তার একটাই কাজ। মিনিটে বাহাত্তরবার বিশুদ্ধ রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে দেওয়া।
যখন পাম্প কাজ করা বন্ধ করে দেয়, জীবনের অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। হৃদয়ে প্রেম আছে কি নেই কেউ জানে না। কিন্তু হৃদয় আছে বলেই জীবন আছে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে হৃদয় একটাই কাজ ক্রমাগত, একটানা, বিরামহীন, বিরতিহীনভাবে করে যায়। ধুকপুক…
রিমুল আর প্রান্তরের প্রেমের গল্পটি তাই ঘুরেফিরে হৃদয়ের কাহিনি। আর পাঁচটা লাভ স্টোরির মতো এখানেও একটি ছেলে আর একটি মেয়ে আছে। তাদের পাশাপাশি খলনায়কও থাকতে বাধ্য। এই কাহিনিতে সেই জমকালো ভিলেনের নাম মৃত্যু। জীবনের মতো প্রোটাগনিস্টের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার জন্যে এর চেয়ে খারাপ, এর চেয়ে কাবিল, এর মতো শয়তান অ্যান্টাগনিস্ট আর কে-ই বা হতে পারে।
কিন্তু ভিলেনের একটা অবয়ব থাকা বাঞ্ছনীয়। এই কাহিনিতে সেই অবয়ব হল ল্যাংড়া শিলু। শয়তানের অবতার এই মুহূর্তে বসে রয়েছে নিজের চেম্বারে। দুই হাতের মধ্যে ধরে রেখেছে লাঠি। ভুরু কুঁচকে কী শুনছে এ
শুনছে একটি অডিয়ো ক্লিপ। ল্যাংড়া শিলুর টেবিলে রাখা গোপন স্মার্টফোন থেকে ভেসে আসছে মেহুলের কণ্ঠস্বর, “পটনা সিথ্রি থেকে যাত্রা শুরু করেছেন ডক্টর স্বপন মিশ্র, পেশেন্ট রিমুল সেন, পেশেন্টের বাবা সরল সেন এবং আমাদের ড্রাইভার প্রান্তর দাস। কলকাতা থেকে অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে পটনা পৌঁছতে প্রান্তরের সময় লেগেছে তেরো ঘন্টা। ধরে নেওয়া যেতে পারে পটনা থেকে বাই রোড কলকাতা আসতেও একই সময় লাগবে। তার মানে ২১ মে সকালবেলা পেশেন্ট কলকাতা সিপ্রিতে অ্যাডমিশন নেবে।”
আর একটা ক্লিপ। স্বপন বলছেন, “সন্ধে ছ’টার সময়ে গয়াতে টি ব্রেক নেব। তারপরে গোমোতে ডিনার করব। সেটা আন্দাজ রাত পৌনে এগারোটা। তারপরে একেবারে ভোর চারটের সময়ে শক্তিগড়ে টি ব্রেক। ডানকুনিতে একবার দাঁড়াতে পারি। কারও বাথরুম যাওয়ার ব্যাপার থাকতে পারে।”
সামনের দিকে ঝুঁকে বসে রয়েছে শিশু। ঘরের সব আলো নেবানো। শুধু টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। সেই আলোয় শিলুর ছায়া পড়েছে দেওয়ালে। দেখতে লাগছে রুশদেশের উপকথার ডাইনি বাবা ইয়াগার মতো।
স্মার্টফোনের পরদায় হাত ছুইয়ে পারের অডিয়ো ক্লিপ চালিয়ে দিল শিল্প। মেহুল বলছেন, “সুতো বা সূত্র নম্বর এক হল রিমুল সেন। মানে রেসিপিয়েন্ট। সে ২১ মে সকালবেলা আমাদের এখানে পৌঁছবে এবং অ্যাডমিটেড হবে।
শিলাজিতের সামনে বসে রয়েছে তার দুই হাত, রাজা আর পাপ্পু। তাদেরও ভুরু কুঁচকে রয়েছে। আজ সারাদিন ধরে অজস্র অভিয়ো ক্লিপ এসে জমেছে শিলাজিতের স্মার্টফোনে। আবারও শোনা যাচ্ছে মেহুলের গলা।
“দ্বিতীয় সুত্র বা সুতো। ডোনার। অর্থাৎ সায়ক মণ্ডলের হার্ট। এটি আসবে চেন্নাই থেকে।”
এবার পীযূষের গলা, “… আটটা পঁয়ত্রিশে চেন্নাই থেকে রওনা দিয়ে প্লেন কলকাতায় ল্যান্ড করবে সকাল দশটা পঁয়তাল্লিশে।”
এবার মেহুলের কণ্ঠস্বর, কলকাতা বিমানবন্দর থেকে আমাদের হাসপাতাল তেরো কিলোমিটার রাস্তা। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ভি আই পি রোড ধরে বাগুইআটি হয়ে উলটোডাঙা। সেখান থেকে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস ধরে রুবির মোড়।”
চেয়ারে নড়েচড়ে বসল রাজা আর পাপ্পু। তাদের মাথায় কিছু ঢুকছে না। পরের ক্লিপ চালাল শিলাজিৎ। রঘুবীর বলছেন, “আপনার হিসেব মতো সায়কের হার্ট সিথ্রি-র অপারেশন থিয়েটারে পৌঁছচ্ছে আগামী কাল সকাল এগারোটা কুড়িতে। তখনই প্রি-অপারেটিভ প্রসিডিয়োর শুরু হবে। পাশাপাশি, আগামী কাল সকালবেলা রিমুল সেন এখানে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। তাকে মেডিকেশন দিয়ে স্টেবল করার জন্যে আমরা হাতে অনেকটা সময় পাচ্ছি। হুইচ হয় গুড। এটি শুরু করতে হবে শার্প সাড়ে এগারোটায় তার বেশি দেরি করা যাবে না।”
শিলাজিৎ পরের ক্লিপে চলে গিয়েছে। রঘুবীর বলছেন, “হার্ট মানবদেহ থেকে বের করে নেওয়ার পর ট্রান্সপ্লান্টের উপযোগী থাকে মাত্র চারঘণ্টা। তারপরে সেটিতে পচন ধরতে শুরু করে… সায়কের হার্ট বের করে নেওয়া হচ্ছে আগামী কাল সকাল সাড়ে সাতটায়। সেই হার্ট রিমুলের শরীরে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে সকাল সাড়ে এগারোটায়। মানে, চার ঘণ্টার মধ্যে। কাজেই কোনও অসুবিধে হবে না। তবে কোথাও যেন ডিলে না হয়… না অ্যান আসতে, না পেশেন্ট আসতে, না সার্জন আসতে। যে-কোনও একটা জায়গায় লেট হলেই পুরোটা ঘেঁটে যাবে।”
স্মার্টফোনে হাত দিয়ে শেষ অডিয়ো ক্লিপটা আবার চালাল শিল্প। শেষ হতে জিজ্ঞেস করল, “তোদের কারও কোনও বক্তব্য আছে?”
পাপ্পু বলল, “হাট বদলাবদলির ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে।”
রাজু বলল, “সিথ্রি করছে।”
শিলু দাঁত খিঁচিয়ে বলল, “আমি শালা হার্টবিট খুলে বসে আছি। কাগজে আর টিভিতে বড়-বড় বিজ্ঞাপন দিচ্ছি, ‘হার্দিক শুভকামনা’। মাঝবয়সি লোকদের বুক চিনচিন করলেই অ্যাক্সিয়োগ্রাফি করে বলছি, করোনারি আর্টারিতে মাল্টিপল ব্লক আছে। এক্ষুনি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করতে হবে। স্টেন্ট না বসালে পেশেন্ট মারা যেতে পারে, ডাক্তারগুলোকে মুখের রক্ত তুলে দৌড় করাচ্ছি বাংলার প্রতিটি জেলায়। এমনকী পাশের প্রদেশে এবং পাশের রাষ্ট্রে। ওরা সেখান থেকে পেশেন্ট ধরে আনছে। কোলেস্টেরল লেভেলে গন্ডগোল দেখলেই এমন ভয় পাইয়ে দিচ্ছি যে সবাই ‘স্ট্যাটিন’ গ্রুপের ড্রাগ খেতে শুরু করছে আর কার্ডিয়োলজিস্টের বাঁধা পেশেন্ট হয়ে যাচ্ছে। হার্টবিটকে এক নম্বরে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে আমি পাগলের মতো দৌড়চ্ছি। সেই সময়ে এসব কী, অ্যাঁ? সিথিতে কলকাতার প্রথম হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হয়ে যাবে আর আমি আঙুল চুষবং ইয়ার্কি হচ্ছে?’
“ওরা করুক না। আপনার কী প্রবলেম বস!” শিলুকে তেল মারল রাজা। “ইডিয়ট। মাথায় কি এক ছিপি বুদ্ধিও ভগবান দেননি?” টেবিলে পড়ে থাকা আজকের খবরের কাগজ মুঠো পাকিয়ে টেবিলেই আছাড় মারে শিলু, “এর আগে কলকাতায় কখনও কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হয়নি। এই খবরটা মিডিয়া খুব খাবে। আগামী কয়েকদিন এই নিয়ে খবরের কাগজে পাতার পর পাতা লেখা হবে। টিভিতে বিশেষজ্ঞরা বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাতেলা করবে। এবং সবার মুখে ঘুরবে একটাই নাম। ক্যালকাটা কার্ডিয়াক ক্লিনিক। ওদের পুরনো বদনাম মুছে যাবে। হার্টবিট বলে যে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, সেটা লোকের মন থেকে মুছে দেওয়া হবে।
“আপনি পরের বদলাবদলিটা করবেন বস,” পরামর্শ দিল রাজা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিশু বলল, “চাঁদে প্রথম কে পা রেখেছিল? মনে আছে? “নিল আর্মস্ট্রং,” গর্বের সঙ্গে বলল পাপ্পু।
“দ্বিতীয় কে পা রেখেছিল?”
পাপ্পু চুপ। রাজা বলল, “বুঝতে পেরেছি। আপনি বলতে চাইছেন, কলকাতার দ্বিতীয় হার্ট বদলাবদলি কে করেছে, সেটা কেউ মনে রাখবে না।
“এগজ্যাক্টলি। আমি শুধু ট্রেডার নই। আমি ভিশনারি। শুধু হার্টের ব্যবসায় আমার আগ্রহ নেই। আমি চাই আমার হার্টবিট যেন আমার মৃত্যুর পরেও চলতে থাকে। লাব ডুব… লাব ডুব… লাব ডুব… ইতিহাসের পাতায় আমি আসন গ্রহণ করতে চাই। সেকেন্ড নয়, আমি ফার্স্ট হতে চাই। তার জন্যে
যা যা করার, সব করব।
“সেটা কী করে হয় বস। এরা অপারেশন করছে কাল সকালে। তার আগে আপনি কী করে একটা হার্ট আর একটা রুগি জোগাড় করবেন
“জোগাড় যখন করতে পারব না, তখন আমি ফার্স্ট হব কী করে। স্যাঙাতের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসল শিলু।
রাজা আর পাপ্পু চপ।
“একটাই উপায়, এই ট্রান্সপ্লান্টটা হতে না দেওয়া। তা হলে বাজারে সিথ্রি- র আবার হেব্বি বদনাম হবে। আমরা সেই বদনামটাকে মেনস্ট্রিম মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেব। ওদের পেশেন্ট আরও কমবে। আমাদের পেশেন্ট বাড়বে। হার্টবিট হবে কলকাতার এক নম্বর কার্ডিয়াক ক্লিনিক।”
পাপ্পু অবাক হয়ে বলল, “বস! পাগলামি করবেন না। অ্যালাকায় আপনার একটা সম্মান আছে। কিছু গন্ডগোল হয়ে গেলে?”
“আমার মুখের উপরে কথা বললে জুতিয়ে মুখ ছিঁড়ে নেব,” দাঁত খিঁচিয়ে বলে শিলু।
পাপ্পু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “সরি বস! কী করতে হবে বলে দিন। কার থেকে তোলা তুলতে হবে, কাদের মধ্যে মিউচুয়াল করে দিতে হবে, কোথায় লাশ ফেলতে হবে… জাস্ট নামগুলো বলুন। আমরা প্ল্যানিং-ফ্যানিং বুঝি না।”
“থিয়োরি ছেড়ে প্র্যাকটিক্যালে আসুন বস,” হাসছে রাজা, “কী করতে হবে বলুন। কাজ উত্তরে দেব।”
শিলু হাতে হাত ঘষে দেওয়ালে নিজের ছায়ার দিকে তাকাল। কুচকুচে কালো বাবা ইয়াগাকে দেখে খুশি হল। রাজা আর পাপ্পুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ এই কেসটায় প্ল্যানিং না বুঝলে হবে না।”
“তা হলে বোঝান।” হতাশ হয়ে বলল রাজা।
দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকাল শিলু। রাত পৌনে বারোটা বাজে। সে বলল, “একটা হার্ট আসছে চেন্নাই থেকে। সেটা প্রথমে গাড়িতে করে চেন্নাই ওয়ারপোর্ট পৌঁছবে। তারপর ফ্লাইটে করে কলকাতায়। তারপর অ্যাম্বুল্যান্সে চেপে দমদম এয়ারপোর্ট থেকে সিথ্রি। আমার এত ক্ষমতা নেই যে চেন্নাইয়ের রাস্তায় কিংবা প্লেনে কিছু করব। কিন্তু কলকাতার রাস্তায় ঝামেলা তো পাকাতেই পারি, তাই না? কী রে পাপ্পু? কিছু বল।”
“হ্যাঁ! তা পারি। কিন্তু লাভ কী হবে?”
স্মার্টফোনে আঙুল ছুঁইয়ে আবার পুরনো ক্লিপ চালাল শিলু। রঘুবীর বলছেন, “হার্ট মানবদেহ থেকে বের করে নেওয়ার পরে ট্রান্সপ্লান্টের উপযোগী থাকে মাত্র চারঘণ্টা। তারপরে সেটিতে পচন ধরতে শুরু করে….
অডিয়ো ক্লিপ বন্ধ করে শিলু বলল, “এইবার বোঝা গেল? তোকে কী করতে হবে?”
পাপ্পু বলল, “সাড়ে সাতটার সঙ্গে চারঘণ্টা যোগ করলে হয় সাড়ে এগারোটা। তার মানে এই অ্যাম্বুল্যান্সকে কলকাতার রাস্তায় দুপুর বারোটা পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে।”
“এগজ্যাক্টলি!” উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে শিলু। দুমড়োনো খবরের কাগজ পাল্লুর দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, “বাগুইআটি, লেক টাউন আর উলটোডাঙায় যেন অবরোধ, রাজনৈতিক মিছিল বা ধর্মীয় সমাবেশ থাকে। পৌনে এগারোটায় প্লেন ল্যান্ড করার পরে ধরা চেষ্টা করবে কুড়ি মিনিটের মধ্যে সিথিতে ঢোকার। সেটা টেনে বারোটা পার করে দিতে হবে। পারবি না?
“সময়টা বড্ড কম। পার্টির হাইকমান্ডকে ইনফর্ম করে এসব করা যাবে না। ওই জায়গাগুলোর লোকাল লিডারের সঙ্গে কথা বলে ইসু বানিয়ে রাস্তায় বসে পড়তে হবে।
“নিউজপেপারে একবার চোখ বোলাও ঢ্যাঁড়স।” মানব মেননের মুক্তির দাবি নিয়ে দিল্লির মিছিলের ফোটো আর শ্যামবাবাজির কলকাতায় আসার বিজ্ঞাপনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল শি।
খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে পাতলা হাসি ফুটে উঠল পাপ্পুর মুখে। সে বলল, “ঠিক হ্যায় বস! হয়ে যাবে। আর পুলিশ যদি একবার আমাদের ক্যাডারদের কেলিয়ে দেয়, তা হলে আর দেখতে হবে না। দুপুর বারোটাকে রাত বারোটা করে ছেড়ে করে দেব। কিন্তু বস। খচ্চা আছে। লোকাল লিডাররা রাজি হবে কেন?”
“যা লাগবে আমি দিয়ে দেব।”
“পার লিডার পঞ্চাশ করে ধরুন।”
“মারব জুতোর বাড়ি। আমাকে ধুর পেয়েছিস না কি? পার নেতা কুড়ির বেশি দেব না,” পাপ্পুর হাতে তিরিশ হাজার টাকা ধরিয়ে শিলু বলল, “এইটা অ্যাডভান্স। কাজ উত্তরে দিলে আরও তিরিশ হাজার দেওয়া হবে।”
টাকা নিয়ে পাপ্পু বলল, “কিন্তু এই কাজটার জন্য ওই মেয়েটা মরে যাবে, তাই না? এরকম দক্ষে-দক্ষে মারার চেয়ে গুলি করাটা ভাল। কষ্ট কম পাবে।
হা-হা করে হাসতে হাসতে শিলু বলল, “আমি একজন ভিশনারি হার্টবিটকে এক নম্বরে পাঠানোর জন্যে আমি নিজের আত্মাকে শয়তানের কাছে বেচে দিতে রাজি আছি। নিজেকে খুন করতে রাজি আছি। আর এ তো একটা মেয়ে। আর আসল কথা হল, মরছে সিথি। মরছে মেহুল সাহা। মরছে রঘুবীর চক্কোত্তি। এই মেয়েটা কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজ। বড়-বড় কাজে এই রকম ছোট ছোট স্যাক্রিফাইস করতে হয়। এই নিয়ে ভাবিস না।”
পাপ্পু মাথা নিচু করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। শিলু রাজার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর কাজটা ঝামেলার। লেবার দিতে হবে।”
“কীরকম লেবার বস!” জানতে চাইল রাজা।
“আজ দুপুর তিনটেয় প্রান্তর গাড়ি চালানো শুরু করেছিল। ওরা যেখানে- যেখানে দাঁড়াবে, তার মধ্যে দুটো জায়গা আমাদের কাছাকাছি। একটা শক্তিগড় আর অন্যটা ডানকুনি। শক্তিগড়ে চা খাওয়ার জন্যে আর বাথরুম করার জন্যে দাঁড়াবে। এখন বাজে রাত বারোটা। তুই যদি এক্ষুনি বাইক নিয়ে বেরিয়ে যাস, তা হলে শক্তিগড়ে পৌঁছবি গুদের একটু আগে। ওখানে ওদের জন্যে ওয়েট করবি। সিথ্রি-র অ্যাম্বুল্যান্স দূর থেকে দেখেই চেনা যাবে। জাস্ট অ্যাম্বুল্যান্সের টায়ারটা পাংচার করে দিবি। অনেকগুলো পাংচার চাই। যাতে গ্যাটিস মারা না যায়। অবশ্য আজকালকার টায়ারগুলোয় তারি মেরে কাজ হয় না।
“প্রান্তরের কাছে স্প্রেয়ার টায়ার থাকবে।”
“স্পেয়ার টায়ার ক’টা থাকবে। একটাই তো। টায়ার বদলাতে কিছুটা সময় নষ্ট হবে। এই ফাঁকে তুই ডানকুনি চলে আসবি। এখানেও যদি দাঁড়ায়, তা হলে আবার টায়ার পাংচার। তা হলেই আর ঠিক সময়ে কলকাতায় পৌঁছতে হচ্ছে না।”
“সবই বুঝলাম বস,” রাজা চিন্তিত, “কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটা অনেকগুলো ‘যদি’-র উপরে দাঁড়িয়ে আছে। ‘যদি’ অ্যাম্বুল্যান্স শক্তিগড়ে দাঁড়ায়। ‘যদি’ আমি সবাইকে লুকিয়ে টায়ার পাংচারের সুযোগ পাই।”
“অ্যাম্বুল্যান্স শক্তিগড়ে দাঁড়াবেই। তুই এখানে ওদের আগে পৌঁছবি, এটা কনফার্ম কর। বেশি বাজে না থকে বেরিয়ে যা, “ রাজার হাতে দশহাজার টাকা তুলে দিল শিলু। রাজা দৌড়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। চেম্বারে শিলু এখন একা। সে টেবিল থেকে গোপন স্মার্টফোন তুলে নিয়ে চেনা নম্বরে ফোন করল।
ওদিকে যে ফোন ধরল তাকে নিচু গলায় কিছু বলল শিলু। সামান্য কথা কাটাকাটি হল। ও প্রান্তে যে আছে, সে কিছুতেই শিলুর প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে না। মিনিটপাঁচেক ধরে ধমকে, বাবা-বাছা করে, টাকার লোভ দেখিয়ে তাকে রাজি করাল শিলু। তারপর ফোন কেটে দিল।
এখন রাত বারোটা বাজতে দশ। চেম্বারের আলো নিভিয়ে শুধু টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে রেখেছে শিল্প। দেওয়ালে বাবা ইয়াগার ছায়া দেখে হাসছে আর বলছে, “লাল, নীল আর হলুদ সুতো। তিনটে কম্পোনে ডোনার। রেসিপিয়েন্ট। ডক্টর!”
