॥ আট ।।
২০ মে দুপুর তিনটে দশ থেকে ২০ মে রাত সাড়ে এগারোটা।
.
মেহুলের চেম্বারে ঢুকে রঘুবীর শুনতে পেলেন তিনি কথা বলছেন স্বপনের সঙ্গে। রঘুবীরকে দেখে স্পিকার ফোন অন করলেন মেহুল। স্বপন ওপ্রান্ত থেকে বললেন, “তিনটে দশে স্টার্ট করলাম। আমি, পেশেন্ট, পেশেন্টের বাবা আর ড্রাইভার।”
মেহুল নোটবইতে তথ্যগুলো লিখে নিচ্ছেন। স্বপন বললেন, “সন্ধে ছ’টার সময়ে গয়াতে টি ব্রেক নেব। তারপরে গোমোতে ডিনার করব। সেটা আন্দাজ রাত পৌনে এগারোটা। তারপরে একেবারে ভোর চারটের সময়ে শক্তিগড়ে টি ব্রেক। ডানকুনিতে একবার দাঁড়াতে পারি। কারও বাথরুম যাওয়ার ব্যাপার থাকতে পারে।”
ফোনালাপ শেষ করে মেহুল রঘুবীরকে বললেন, “পটনা সিথ্রি থেকে যাত্রা শুরু করেছেন ডক্টর স্বপন মিশ্র, পেশেন্ট রিমুল সেন, পেশেন্টের বাবা সরল সেন এবং আমাদের ড্রাইভার প্রান্তর দাস। কলকাতা থেকে অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে পটনা পৌঁছতে প্রান্তরের সময় লেগেছে তেরো ঘন্টা ধরে নেওয়া যেতে পারে পটনা থেকে বাই রোড কলকাতা আসতেও একই সময় লাগবে। তার মানে ২১ মে সকালবেলা পেশেন্ট কলকাতা সিথ্রিতে অ্যাডমিশন নেবে।”
মেহুল ১৯ মে সকালে চেম্বারে ঢুকেছিলেন। আর বেরোননি। এখানেই খাওয়া, এখানেই ঘুম, এখানেই টয়লেট এবং পোশাক বদল। খাওয়া বলতে স্যান্ডউইচ আর চা। স্যান্ডউইচ এনে দিচ্ছে কাঠি। চেম্বারের কোণে বসে রয়েছে ললিতা সিস্টার। সে কিছুক্ষণ বাদে বাদে টেবিলে চায়ের কাপ রেখে যাচ্ছে। মেহুলের চোখ ঘোরাঘুরি করছে ডেস্কটপের মনিটরে। দু’টি মোবাইলে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। খসখস করে নোট নিচ্ছেন। সাজাচ্ছেন ফ্লো চার্ট। যে কাজগুলো হয়ে গেল, সেগুলো কেটে নতুন কাজের ফর্দ লিখছেন। একটাই উদ্দেশ্য। কোনও ভুলত্রুটি যেন না হয়। কাঠি মাঝে মাঝে এসে দেখে যাচ্ছে চেম্বারে কী হচ্ছে। তাকে দেখলেই হাত নেড়ে চলে যেতে বলছেন মেহুল। কাঠি বাধ্য হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বাদে ফিরেও আসছে।
মেহুলের সঙ্গে একবার দেখা করে, হাসপাতালে রাউন্ড দিয়ে, বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে রঘুবীর মেহুলের চেম্বারে ফিরে এলেন সন্ধে সাতটার সময়। তাঁকে দেখে চায়ে চুমুক দিয়ে মেহুল বললেন, “বিনুনি বোঝেন? মেয়েদের বিনুনি। তিনগুছি চুল দিয়ে যেটা বাঁধা হয়?”
“বুঝি না, তবে ব্যাপারটা জানি। আমাদের স্টিচ দেওয়ার সঙ্গে মিল আছে,” চেয়ারে বসে বললেন রঘুবীর, “হঠাৎ বিনুনির প্রসঙ্গ?”
“আচ্ছা। বিনুনি বুঝতে হবে না। এই তিনটে সুতো দেখুন,” লাল, নীল আর হলুদ রঙের ফাইল বাঁধার সুতো হাতের মুঠোয় নিয়েছেন মেহুল। লালটা দেখিয়ে বললেন, “সুতো বা সূত্র নম্বর এক হল রিমুল সেন। মানে রেসিপিয়েন্ট। সে ২১ মে সকালবেলা আমাদের এখানে পৌঁছবে এবং অ্যাডমিটেড হবে।”
রঘুবীর চুপচাপ শুনছেন।
নীল সুতো দেখিয়ে মেহুল বললেন, “দ্বিতীয় সূত্র বা সুতো। ডোনার। অর্থাৎ সায়ক মণ্ডলের হাট। এটি আসবে চেন্নাই থেকে। কিন্তু তার আগে সায়কের ডেথ ডিক্লেয়ার করতে হবে। তারও আগে দেখতে হবে চেন্নাই-কলকাতা ফ্লাইট কটার সময় আছে।”
“সেগুলো এখনও ঠিক হয়নি?” আঁতকে উঠেছেন রঘুবীর।
“সেটাই এবার জানব,” মোবাইল হাতে নিয়ে পীযূষকে ফোন করলেন মেহুল। স্পিকার অন করে দিলেন, যাতে রঘুবীর কথোপকথন শুনতে পান এবং অংশগ্রহণ করতে পারেন। ঠিক এই সময়ে কাঠি চেম্বারে ঢুকে বলল, “যদি কাউকে না বলেন, তা হলে একটা কথা বলি। লাল সুতো আর নীল সুতো নিয়ে একটা গল্প বাদল আমাকে বলেছিল।”
“তুমি এখন যাও,” কড়া গলায় বললেন মেহুল। কাঠি পালাল। মোবাইলের স্পিকারে পীযূষের গলা শোনা গেল, “বলুন।”
“ওদিককার খবর কী?” নীল সুতো আঙুলের ফাঁকে নাড়ছেন মেহুল। পীযূষ বললেন, “চেন্নাই থেকে কলকাতা যাওয়ার আলিয়েস্ট ফ্লাইট আগামী কাল সকাল আটটা পঁয়ত্রিশে।”
নোটবুকে লিখেছেন মেহুল, “২১ মে, সকাল আটটা পঁয়ত্রিশ “
“ওই ফ্লাইটের টাইম মাথায় রেখে তার আগের প্রোগ্রাম সাজানো হয়েছে। আগামীকাল সকাল সাতটার সময় সায়ক মণ্ডলকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গিয়ে আমি ডেথ ডিক্লেয়ার করব। দেন অর্গ্যান হারভেস্টিং শুরু হবে।”
“অর্গ্যান হারভেস্টিং মানে?”
“মৃতদেহ থেকে হাট বের করে নেওয়ার অপারেশন। কাজটা করবেন আমাদের হাসপাতালের সার্জন। ম্যাক্সিমাম আধঘণ্টা লাগবে।”
“অর্থাৎ সকাল সাড়ে সাতটা।”
“অর্গান ডোনেশন বক্স অপারেশন থিয়েটারে রেডি থাকবে। আমি ওই বক্স নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরব, ধরে নেওয়া যাক, সাতটা পঁয়ত্রিশে। আয়াঙ্গার হাসপাতাল থেকে চেন্নাই এয়ারপোর্টের দূরত্ব পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার হাতে সময় থাকবে আধঘণ্টা। অর্থাৎ তিরিশ মিনিটে, বাস্ত শহরের মধ্য দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সকে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার পেরতে হবে।”
“পারবেন?”
“আপনাদের, মানে কলকাতা শহরের লোকেদের ‘গ্রিন করিডোর’ নিয়ে কোনও ধারণা আছে!”
“গ্রিন করিডোর বলতে জঙ্গলে জানোয়ারদের যাতায়াতের পথ বোঝায়। মানুষ সেই রাস্তা অ্যাভয়েড করে। তাই না?”
“সেটাও গ্রিন করিডোর। তবে আমি অন্য করিডোরের কথা বলছি। গ্রিন করিডোরের কোনও মান্য বাংলা আছে কি? আমার পছন্দ ‘সবুজ সরণি’।”
এই কথাটাও মেহুল খসখস করে নোটবইতে লিখে নিলেন।
পীযূষের কণ্ঠস্বর হঠাৎই কেজো হয়ে গেল, “এনিওয়ে, অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে গ্রিন করিডোর মানে একটা স্পেশ্যাল রাস্তা। যে রাস্তা দিয়ে হারভেস্টেড অর্গ্যান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট হাসপাতালে যাবে। ‘নির্দিষ্ট সময় ব্যাপারটা খুব জরুরি। কারণ সময়ের সামান্য এদিক-ওদিক হলে অর্গ্যান নষ্ট হয়ে যায়। গ্রিন করিডোর তৈরি করার জন্যে অনেকের ভূমিকা থাকে। ট্রাফিক পুলিশ, কর্পোরেশন বা মিউনিসিপালিটি, এনজিও, স্থানীয় মানুষ… কারণ সবুজ সরণি দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স যখন যায়, তখন ট্রাফিক লাইট ম্যানুয়ালি কন্ট্রোল করা হয়। পুরো সরণি জুড়ে সব ট্রাফিক বাতি সবুজ থাকে। যত ক্রসিং আছে, যত লেন ও বাইলেন আছে, যত গলি এসে রাজপদে পড়েছে, সবকিছু এইটুকু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সবুজ সরণি দিয়ে দৌড়া শুধু অ্যাম্বুল্যান্স।”
“হুম” গম্ভীর গলায় বললেন মেহুল।
“কার কার ভূমিকা আছে, সেই তালিকা দিতে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের কথা একদম শেষে বললাম। কারণ তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। বরযাত্রীর গাড়ি হোক বা শববাহী যান, ভিআইপিদের মোটরকেড হোক বা রাজনৈতিক মিছিল, তামিলনাডুর রাস্তায় সবাই গ্রিন করিডোরের ক্রসিংয়ে লাল সিগনাল দেখে থেমে যায়। বিরক্ত হয় না, রেগে যায় না, গালাগালি দেয় না। অন্য অ্যাম্বুল্যান্স থাকলে তার কথা আলাদা। সেটি প্রায়োরিটি পায়। গ্রিন করিডোরকে তামিলনাড়ুর সবাই কেন মান্যতা দেয় জানেন? তার কারণ হল দীর্ঘদিন ধরে এই রাজ্যে অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে কাজ হচ্ছে। পাবলিক বিষয়টি নিয়ে সচেতন। তারা জানে, মানুষের জীবনের চেয়ে অমূল্য কিছু নেই। আপনার কলকাতার লোক সেটা জানে তো
“আপনিও কলকাতার লোক ডক্টর!”
“ছিলাম। আর নেই,” হাসলেন পীযূষ, “যাক গে। এবার আসল কথায় আসি। আমাদের অতিরিক্ত একটা সুবিধে হয়েছে। যে ছেলেটির ব্রেন ডেথ হয়েছে, তার অফিস কোলিগের বাবা চেন্নাই পুলিশে আছেন। মা আছেন চেন্নাই মিউনিসিপালিটিতে। এর ফলে গ্রিন করিডোরের ব্যবস্থা করতে আমাদের তরফে বিশেষ কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। আগামী কাল আমি ঠিক সময়েই এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাব। তারপর সবকিছু পবনদেব আর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের হাতে।”
“প্রথম প্রশ্ন। পবনদেব আর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল যদি সহায় হন, তা হলে আপনি ক’টার সময় দমদম এয়ারপোর্টে নামছেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, আপনি কি একা আসছেন?”
“প্রথম প্রশ্নের উত্তর হল, আটটা পঁয়ত্রিশে চেন্নাই থেকে রওনা দিয়ে প্লেন কলকাতায় ল্যান্ড করবে সকাল দশটা পঁয়তাল্লিশে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হল, আমি একাই আসছি। তবে ‘ফ্লাইওয়ার” প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের সিট বুক করা হয়েছে দুটো। ওদের স্টাফদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে অর্গ্যান ডোনেশন বক্সকে কেবিন লাগেজ হিসেবে প্লেনের পেটের ভিতরে ছুড়ে দেওয়া যাবে না। পরে কনভেয়র বেল্ট থেকে তুলে নেওয়া যাবে না। হ্যান্ড লাগেজ হিসেবে লটেও রাখা যাবে না।
মেহুল ঝড়ের গতিতে নোট নিচ্ছিলেন। লেখা থামিয়ে বললেন, “এয়ার ফেয়ার আপনার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিচ্ছি। কাইন্ডলি আপনার ব্যাঙ্ক ডিটেল আমাকে মেসেজ করুন।”
“করে দিয়েছি,” বললেন পীযূষ।
মেহুল বললেন, “ এবার আমি একটু বলি?”
“আই অ্যাম অল ইয়ারস।”
“দমদম বিমানবন্দরে আমাদের অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড়িয়ে থাকবে আপনার জন্যে। অ্যাম্বুল্যান্স ড্রাইভারের নামটাও জেনে রাখুন। কাঠি খাসকিল।”
“কাঠি। খাসকিল। কোনটা নাম আর কোনটা পদবি!”
“প্রথমটা নাম আর পরেরটা পদবি,” ঠান্ডা চায়ে চুমুক দিয়ে চেম্বারের কোণে বসে থাকা সিস্টার ললিতাকে ইশারায় আর এক কাপ চা দিতে বললেন মেহুল। সিস্টার ললিতা রঘুবীরকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, তিনি চা খাবেন কি না। রঘুবীর ঘাড় নেড়ে ‘না’ বললেন।
মেহুল ফোনে বলছেন, “কলকাতা বিমানবন্দর থেকে আমাদের হাসপাতাল তেরো কিলোমিটার রাস্তা। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ভি আই পি রোড ধরে বাগুইআটি হয়ে উলটোডাঙা। সেখান থেকে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস ধরে কবির মোড়।”
পীযূষ বললেন, “সকাল পৌনে এগারোটার কলকাতা। পিক অফিস আওয়ার। জ্যাম রাস্তা। ওই সময় রাস্তার মাপ দূরত্ব দিয়ে হয় না, সময় লাগে।”
“আমি সেই জন্যেই এখন কলকাতা পুলিশের ডিসি ট্রাফিক সুধীর সেন এবং বিধাননগর কমিশনারেটের প্রধান সায়ন্তন মিত্রর সঙ্গে কথা বলব,” ফোন কাটলেন মেহুল।
রঘুবীর চেয়ার থেকে উঠলেন। তাঁকে এবার বেরতে হবে। বন্ধুর ছেলের জন্মদিনের নিমন্ত্রণ আছে। মুখ দেখিয়ে ফিরে আসবেন।
*
জন্মদিনের নিমন্ত্রণে মুখ দেখাতেও অনেকটা সময় যায়। নিমন্ত্রণ রক্ষা করে রঘুবীর আবার যখন মেহুলের চেম্বারে ফিরলেন তখন রাত দশটা বাজে। মেহুল এখনও ফোনে ব্যস্ত। রঘুবীরকে দেখে ফোনের স্পিকার অন করলেন। রঘুবীর শুনলেন ভারী গলায় কেউ বলছেন, “আগামীকাল কলকাতায় কোনও রাজনৈতিক দলের মিটিং-মিছিল নেই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”
মেহুল বললেন, “স্যার। বিধাননগর কমিশনারেটের সায়ন্তনস্যার বলেছেন যে বিধাননগর এলাকাতেও কোনও ধর্মীয় সমাবেশ বা মিছিল নেই।
“তা হলে আশা করা যায়, এয়ারপোর্ট থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে সিগ্রি পৌঁছতে মিনিট কুড়ি লাগবে। তার জন্যে কোনও গ্রিন বা ইয়েলো করিডোরের প্রয়োজন নেই।”
“আচ্ছা স্যার,” ফোন কেটে টেবিলে রাখলেন মেহুল। ললিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর দু’কাপ চা,” তারপর রঘুবীরকে বললেন, “দ্যাট ওয়াজ সুধীর সেন। ডিসি ট্রাফিক। গলার আওয়াজটা খুব ইমপ্রেসিভ না?”
রঘুবীর উত্তর দেওয়ার আগেই আবার বেজে উঠেছে মেহুলের ফোন। তিনি ফোন ধরে স্পিকার অন করে বললেন, “বলুন ডক্টর।”
ওদিক থেকে পীযূষ বললেন, “আপনার সঙ্গে কলকাতার ডিসি ট্রাফিকের কথা হয়েছে।”
“এক্ষুনি হল ডক্টর। উনি বললেন সায়কের হার্ট মিনিট কুড়ির মধ্যে সিগ্রিতে ঢুকে যাবে। তার জন্যে কোনও গ্রিন করিডোর লাগবে না।”
“গ্রিন করিডোর হচ্ছে না?”
“না।”
“আপনি এঁকে বুঝিয়ে গ্রিন করিডোরের ব্যবস্থা করতে বলুন প্লিজ! ঠিক সময়ে অর্গ্যানের, আই মিন, হার্টের হাসপাতালে পৌঁছনো এই ট্রান্সপ্লান্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সেই ধাপ পেরতে না পারলে বাকি সব উদ্যোগ জলে যাবে। আঠারো কিলোমিটার রাস্তা কুড়ি মিনিটে পেরনো ইজ নট আ ম্যাটার অফ জোক!”
“ঠিক আছে। আমি আবার ওঁদের সঙ্গে কথা বলছি,” মেহুল শ্রাগ করে ফোন কাটলেন, “প্রবাসী বাঙালিরা কলকাতাকে গ্রাম ভাবে মনে হয়?”
ললিতা দু’কাপ চা নিয়ে এসেছেন। ট্রে থেকে চায়ের কাপ নিয়ে রঘুবীরকে মেহুল বললেন, “সিস্টার না থাকলে আমি এই ম্যারাথন সেশন টানতে পারতাম না। কনস্ট্যান্ট ফোনে কথা বলা, নোট নেওয়া, সমানে নতুন-নতুন সমস্যার সমাধান করা…. ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা না পেলে পেগলে যেতাম।”
ললিতা কম কথার মানুষ। নিজের মোবাইল ফোন চার্জিং পয়েন্ট থেকে খুলে বলল, “কাল রাত থেকে আপনি পঞ্চাশ-ষাট কাপ চা খেয়েছেন। এবার পেটে বাধা শুরু হবে।”
“ঠিক আছে। তা হলে কাঠিকে বলো দু’প্লেট স্যান্ডউইচ দিতে,” ললিতার স্নেহের ধমকের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন মেহুল। রঘুবীরও স্যান্ডউইচের ব্যাপারে আপত্তি করলেন না। বস্তুপুত্রের জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু একটা আইসক্রিম খেয়ে চলে এসেছেন। পাঁচমিশেলি, মশলাদার খাবার তাঁর সহ্য হয় না।
কাঠি দু’প্লেট স্যান্ডউইচ টেবিলে রেখে চেম্বারে ঘোরাঘুরি করছে। ললিতাকে কী সব জিজ্ঞেস করছে। হাত নেড়ে তাকে চলে যেতে বললেন মেহুল। কাঠি চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে রঘুবীরকে বললেন, “দুপুরে আপনাকে তিনটে সুতোর কথা বলেছিলাম। লাল, নীল আর হলুদ। হলুদের কথা তখন বলা হয়নি। তাই না?”
আবার মেহুলের হাতে চলে এসেছে তিনটে সুতো। তিনি বললেন, “লাল আর নীল সুতোর কথা বলা হয়ে গিয়েছে। এরা হল ডোনার আর রেসিপিয়েন্ট। বাকি রইল হলুদ সুতো। যে লাল আর নীলকে জুড়বে। অর্থাৎ আপনি,” তিনটে সুতোয় গিট বেঁধে মেহুল বললেন, “সিথ্রি-র টিম অফ ডক্টরস আগামী কাল ওটিতে রেডি থাকবেন। কার্ডিয়োলজিস্ট, জেনারেল ফিজিশিয়ান, অ্যানাস্থেটিস্ট, জেনারেল সার্জন, সবাই আপনার লিডারশিপে কাজ করবে। এই নিয়ে আপনার প্ল্যানিং কী?”
মেহুলের হাত থেকে গিঁটবাঁধা সুতোগুলো নিয়ে, হলুদ সুতোটা দেখিয়ে রঘুবীর বললেন, “একজন কার্ডিয়ো থোরাসিক সার্জন আসছেন পটনা থেকে, বাহ রোড। একজন অ্যানাস্থেটিস্ট আসছেন চেন্নাই থেকে, বাহ এয়ার। তাঁদের আপনি হিসেবে ধরেননি। আমি গেস করছি, ডোনার এবং রেসিপিয়েন্ট ঠিক সময়ে এলে এঁরাও ঠিক সময়েই আসবেন। তাই তো?”
“দ্যাটস টু।” ললিতার দেওয়া চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন মেহুল। “আপনার হিসেব মতো সায়কের হার্ট সিথ্রি-র অপারেশন থিয়েটারে পৌঁছচ্ছে আগামী কাল সকাল এগারোটা পাঁচে। তখনই প্রি-অপারেটিভ প্রসিডিয়ার শুরু হবে। পাশাপাশি, আগামী কাল সকালবেলা রিমুল সেন এখানে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। তাকে মেডিকেশন দিয়ে স্টেবল করার জন্য আমরা হাতে অনেকটা সময় পাচ্ছি। হুইচ ইল গুড। এটি শুরু করতে হবে শার্প সাড়ে এগারোটায়। তার বেশি দেরি করা যাবে না।
“কেন?”
“একটা তথ্য খুব মন দিয়ে শুনে রাখুন। হার্ট মানবদেহ থেকে বের করে নেওয়ার পরে ট্রান্সপ্লান্টের উপযোগী থাকে মাত্র চারঘণ্টা। তারপরে সেটিতে পচন ধরতে শুরু করে। এই কারণেই ব্রেন ডেড সায়ককে ভেন্টিলেশন থেকে সরানো হয়নি। এবং এই কারণেই পীযূষ বারবার করে আপনাকে বলছেন কলকাতার রাস্তায় গ্রিন করিডোর তৈরি করার জন্যে।”
মেহুলের ভুরু কুঁচকে গিয়েছে।
“সায়কের হার্ট বের করে নেওয়া হচ্ছে আগামী কাল সকাল সাড়ে সাতটায়। সেই হার্ট রিমুলের শরীরে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে সকাল সাড়ে এগারোটায়। মানে, চার ঘণ্টার মধ্যে। কাজেই কোনও অসুবিধে হবে না। তবে কোথাও যেন ডিলে না হয়,” রঘুবীর গিট বাঁধা লাল, নীল আর হলুদ সুতো দোলাচ্ছেন, “না অর্গ্যান আসতে, না পেশেন্ট আসতে, না সার্জন আসতে। যে কোনও একটা জায়গায় লেট হলেই পুরোটা ঘেঁটে যাবে।”
মেহুল উত্তেজিত হয়ে মোবাইল তুলে নিয়ে ডিসি ট্রাফিক সুধীর সেনকে ফোন করে গ্রিন করিডোর তৈরির জন্যে আবেদন করতে লাগলেন। রঘুবীর। ইশারায় সিস্টার ললিতাকে চলে যেতে বললেন। সিস্টার চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতেই ঢুকে পড়েছে কাঠি। জিজ্ঞেস করছে, “আর দুটো স্যান্ডউইচ দিই”
হাত নেড়ে তাকে চলে যেতে বললেন রঘুবীর। বসে বসে শুনতে লাগলেন মেহুল আর সুধীরের মধ্যে আলোচনা। সবুজ সরণি তৈরির ব্যাপারে ফোনালাপ চলল আধঘণ্টা। একটা সময় রঘুবীর বলতে বাধ্য হলেন, “আমি শুতে যাচ্ছি। রাতে আট ঘণ্টা ঘুম না হলে কাল অপারেশন করতে পারব না
ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে এগারোটা।
