সবুজ সরণি – ৩

।। তিন।।

১৭ মে সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে ১৭ মে সকাল সাড়ে ন’টা

.

চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছিল আটত্রিশ বছরের প্রান্তর দাস। রেডিয়োর রবীন্দ্রসংগীত শেষ হতে ঝিমুনি কেটে গেল। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাই তুলল সে। সারা রাত ডিউটি করে সকাল ছ’টায় কোয়ার্টারে ফিরেছে। নাইট ডিউটি থাকলে এফএম চ্যানেল চালিয়ে কিছুক্ষণ রবি ঠাকুরের গান শোনে প্রান্তর। তারপরে একঘন্টা ব্যায়াম করে। স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করতে- করতে সকাল ন’টা। বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি খেতে-খেতে ঘুম এসে যায় সাড়ে ন’টা নাগাদ। বেলা একটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে, ঘুম থেকে উঠে রান্না চাপাতে হয়। খেয়েদেয়ে, বাসন মেজে, ইউনিফর্ম পরে কোয়ার্টার থেকে বেরোয়। দুপুর দুটো থেকে ডিউটি। চলবে রাত দশটা পর্যন্ত।

রান্নাবান্না, ঘর সাফ, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, সবই নিজে করে প্রান্তর। বাবা-মা করেই মারা গিয়েছে। বিয়ে করলে বউ এইসব কাজ করত কি? কে জানে। তবে ডিভিশন অফ লেবার হতে পারত। বিয়ের ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্তি দিয়েছে প্রান্তর। জীবনে একটা প্রেম আছে। সেটা নিয়েই সে সুখী। সব প্রেম কি আর পূর্ণতা পায়? সব কাহিনিই কি শেষ হয় এই বলে, যে, দে লিভড হ্যাপিলি এভার আফটার’। পায় না। তবে তার প্রয়োজনও নেই। কুড়ি বছর ধরে রিমুলকে না দেখেও তাকে ভালবেসে চলেছে প্রান্তর। এবং সে সুখী। এটা ভালবাসা

প্রান্তরের চেহারাটি দেখার মতো। উচ্চতা ২ ফুটের উপরে। তার সঙ্গে মানানসই চওড়া কাঠামো। কৈশোর থেকেই সে তালগাছের মতো লম্বা। বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে সামান্য দূরে একটা ব্যায়ামের আখড়া ছিল। আখড়ায় গিয়ে লোহা তুলে রাবুণে চেহারা বানিয়েছিল। প্রান্তরের মা ছায়া বকাবকি করত, “লোহা তুললে বুদ্ধি কমে যায়। তুই লেখাপড়াটা মন দিয়ে কর।”

লোহা তোলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেকদিন। তবে প্রান্তর রোজ ব্যায়াম করে। চেহারাই এখন তাকে অন্ন জোগায়। প্রান্তর ভন দেওয়া শুরু করল। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ। ঘাম ঝরছে টপটপ করে। ঝরে পড়ছে কুড়ি বছর আগের স্মৃতিকণারা….

*

মেডিক্যাল এন্ট্রান্সের জন্যে পবিত্রস্যারের কোচিংয়ে গিয়ে প্রান্তরের সঙ্গে আলাপ হল রঘুবীর আর স্বপনের। ওরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র। প্রান্তরের বাংলা মিডিয়াম। এই দু’জন একটি সামাজিক বৃত্তে বড় হয়েছে। প্রান্তর অন্য বৃত্তে। কোচিংয়ে ঢুকে সব এক হয়ে গেল। ওই বয়সটা সামাজিক অবস্থানের কুটকচালি বোঝে না।

পবিত্রস্যারের কোচিংয়ে ঢোকা মানে “হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেস’। সপ্তাহে একদিন দেড়ঘণ্টা পড়ান, প্রতি ব্যাচে দশজন স্টুডেন্ট। শুক্রবার সন্ধে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটা। দশজনের ব্যাচে এগারো নম্বর শিক্ষার্থী হিসেবে রিমুল এন্ট্রি নেয় ক্লাস ইলেভেনের মাঝামাঝি। পবিত্রস্যার নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। রিমুলকে শুক্রবার সন্ধের ব্যাচে ঢোকানোর আগে তিনি ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বড়লোক বাড়ির আদুরে মেয়ে। অন্য ব্যাচে পড়ছিল। সেখানে সমস্যা হচ্ছে বলে ব্যাচ বদলাতে চায়।

ছাত্রছাত্রীরা আপত্তি করেনি। তবে ব্যাপারটা পছন্দও করেনি। প্রথম যেদিন রিমুল এল, সেদিন লোডশেডিং। সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি পড়েছে বলে গরম নেই। ঠান্ডা বাতাস বইছে, আর মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই শহরের অন্য কোথাও বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ভিতর ঘরে পবিত্রস্যারের মেয়ে গানের রেওয়াজ করছে, ‘হৃদয়ে মঞ্জিল ডমরু গুরু গুরু’। পবিত্রস্যার তখনও পড়ানোর ঘরে আসেননি। ইনভার্টার কেন গন্ডগোল করছে, সেই নিয়ে গবেষণা করছেন। মেঝেতে পাতা মানুরের উপরে একটা সেজবাতি ঘিরে বসে রয়েছে দশজন ছেলেমেয়ে। আধো আলো আধো অন্ধকারে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল একটা মেয়ে। পরনে হালকা হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ। গলায় কাঁচা হলুদ আর কচি কলাপাতা সবুজের ডোরাকাটা দোপাট্টা, কাঁধে ঝোলা। জড়সড় হয়ে বলল, “আমি রিমুল। কোথায় বসব!”

নতুন সদস্যকে বসতে দেওয়ার ব্যাপারে কেউই আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারা মাদুরে বসে একে অপরকে ঠেলাঠেলি করে জায়গা দেওয়ার অভিনয় করছে। বিরক্ত হয়ে প্রান্তর রঘুবীরকে এক থাকায় সরিয়ে মাঝখানে খানিকটা জায়গা করে দিল, “এখানে বোস।’

সন্তর্পণে রঘুবীর আর প্রাপ্তরের মাঝখানে বসে প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে রিমুল বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ?”

ঠিক এই সময় আলো জ্বলে উঠল। পবিত্রস্যার ইনভার্টার চালিয়ে চলে এসেছেন পড়াতে। আশপাশের বাড়ি অন্ধকার। এই ঘরে টিউবলাইট জ্বলে উঠেছে। ঘুরতে শুরু করেছে ফ্যান। ফ্যানের সুইচ অফ করে দেওয়ার জন্যে উঠতে গিয়ে প্রান্তর বুঝতে পারল তার মাথাটাও ফ্যানের মতো ঘুরছে। রিমুলকে দেখে মনে হচ্ছে, এত সুন্দর কোনও মানুষ হয়। এত অলীক। রেশমের মতো চুল কালো ফিতে দিয়ে বাঁধা। কপালের উপরে ঝামরে পড়েছে আর-একঝাঁক চুল। (প্রান্তর পরে জেনেছিল, একে ‘ফ্রন্ট ফ্রিল্প’ বলা হয়। রিমুলই জানিয়েছিল।) গায়ের রং গোলাপি, মোমের মতো মসৃণ ত্বক, চোখের পাতাগুলো বড়, দৃষ্টিতে বিস্ময় মাথা মেয়েটার প্রতি প্রান্তর একটা অজানা আকর্ষণ অনুভব করছে। এই অনুভূতি তার আঠারো বছরের জীবনের যাবতীয় অভিজ্ঞতার বাইরে।

প্রান্তর পরে রিমূলের কাছ থেকে জেনেছিল, প্রান্তরের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে রিমুলেরও এক অনুভূতি হয়েছিল। রিমুল বুঝে গিয়েছিল, এই ছেলেটার উপরে ভরসা করা যায়। কাঁধে মাথা রেখে নিজের দুঃখের কথা বলা যায়। চওড়া বুকে মাথা গুঁজে কাঁদা যায়।

সেদিন কোচিং-এ রিমুল পাশে বসার পরে পবিত্র স্যার কী পড়ালেন, আদৌ কিছু পড়ালেন কি না, কোনও নোট্স বা সাজেশন দিয়েছিলেন না কোনও বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছিলেন, মনে নেই প্রান্তরের। বায়োলজি এমনিতেই তার পছন্দের বিষয় নয়। কোনও রকমে অঙ্কটা উত্তরে দিতে পারে। ফিজিক্স, কেমিষ্টিতে চলনসই। কিন্তু কুনোব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আর গাছপালার বৈজ্ঞানিক নাম মুখস্থ করতে গেলে জাস্ট বমি পায়।

এই বিবমিষা উদ্রেককারী আবহাওয়ায় এক ঝলক ভিজে বাতাস বয়ে আনল রিমুল। প্রান্তর মুখ নিচু করে পড়া বোঝার অভিনয় করল। কোচিং শেষ হতে দুই বন্ধুকে বলল, “আজ একটু পরে যাব। তোরা বেরিয়ে যা।”

রঘুবীর আর স্বপন নতুন পড়া মাথায় গেঁথে নেওয়ার কাজে এতটাই ব্যস্ত যে প্রান্তরের দিকে ঘুরেও দেখল না। সাইকেল চালিয়ে চলে গেল।

পবিত্র স্যারের কোচিং থেকে বেরলো রিমুল। ও একটা গোলাপি রঙের মেয়েদের সাইকেল চালিয়ে এসেছে। আর প্রান্তরের সম্বল বাবার কেনা ভারী, কালো সাইকেল। প্রান্তর নিয়মিত চেনে তেল দেয়, টায়ারে হাওয়া ভরে, লিকে গ্যাটিস মারে, ব্রেক, ঘন্টি আর সিটের যত্ন নেয়। তাই এখনও চলছে। না হলে তো কবেই দেহ রাখার কথা, বাবার মতো।

পবিত্র স্যারের বাড়ির সামনের ছোট্ট বাগানে চাঁপা আর জুঁইফুলের গাছ ছিল। গেটে ছিল কাগজফুলের তোরণ। বোগেনভেলিয়ার তোরণের তলা দিয়ে হাঁটার সময়ে রিমুল বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”

“থ্যাঙ্ক ইউ কেন?” জিজ্ঞেস করল প্রান্তর।

“তুই বসার জায়গা করে দিলি বলে। বাকিরা আমাকে দেখে বিরক্ত হচ্ছিল। দশজনের ব্যাচে এগারো নম্বর হয়ে ঢুকে আমি যেন বিরাট অপরাধ করে ফেলেছি।”

“অত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। প্রথম দিন একটু ওইরকম হয়। দু’-একদিন একসঙ্গে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“আমি পবিত্রস্যারের কাছে গোড়া থেকেই পড়তাম। তবে অন্য ব্যাচে সেই ব্যাচে একটা ছেলে এমন অসভ্যতা শুরু করল যে আমি বাড়িতে বলতে বাধ্য হলাম। আমার বাবা পবিত্র স্যারকে রিকোয়েস্ট করল অন্য ব্যাচে ঢুকিয়ে নিতে।”

এইসব কথায় প্রান্তরের আগ্রহ নেই। সে বলল, “তোর বাড়ি কোথায়?”

প্রান্তরকে দেখে নিয়ে রিমুল জিজ্ঞেস করল, “তোর বাড়ি কোথায়?”

প্রান্তর ঘাড় চুলকে বলল, “আমি রেল লাইনের ওপারে থাকি।”

“ওপারে মানে? ওদিকে তো রেলের কোয়ার্টার।”

“আমার বাবা মারা গিয়েছেন। মা রেলের গ্রুপ ডি স্টাফ। আমি আর মা ওখানেই থাকি।”

রিমুল চুপ করে গিয়েছে। গোলাপি সাইকেলের গতি সামান্য বেড়ে গেল কি? প্রান্তর নির্লজ্জের মতো জিজ্ঞেস করল, “কোথায় থাকিস বললি না তো!”

“বন্ডেল রোডে।”

“ওখানে রেগুলার যাই। রঘুবীর আর স্বপনের ফ্ল্যাটও বন্ডেল রোডে।”

প্রান্তরের কথা শুনে রিমুল বলল, “ওখানে আইসক্রিম বাড়িটা চিনিস?”

“হ্যাঁ। ইয়ামি কোম্পানির মালিকের বাড়ি। ওরা হেব্বি বড়লোক।”

“আমি ওই বড়লোক বাড়ির মেয়ে,” খিলখিল করে হাসছে রিমূল, “বাড়িটার নাম আগে ছিল ‘সেনবাটী’। আমিই বদলে ‘আইসক্রিম’ করে দিয়েছি। ভাল হয়নি?”

উত্তর না দিয়ে রিমুলের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে প্রান্তর। রিমুল হঠাৎ অসহায় ফরাসিদের মতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“বায়োলজি সাবজেক্টটা আমার অসহ্য লাগে। তোর কেমন লাগে?”

এই বিন্দুতে এসে প্রান্তর একজন সমবাণী খুঁজে পেল। তারও ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে নেই। সামর্থ্যও নেই। সামর্থ্য পরের কথা, লেখাপড়া করতেই তার ভাল লাগে না। মায়ের চাপে কোচিংয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।

পরের কয়েকটা মাস কেটে গেল ঝড়ের মতো। পরীক্ষা এসে গেল। রঘুবীর আর স্বপন খেয়ালও করল না যে পবিত্র স্যারের কোচিংয়ে প্রাপ্তর প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। সেই দিনগুলোয় রিমুলও যে আসে না, এটা খেয়াল করেন পবিত্র স্যার। ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে।

স্বপন এবং রঘুবীর মেডিক্যাল এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ভাল ব্র্যাঙ্ক করে ডাক্তারি পড়তে ঢুকে গিয়েছে। রঘুবীর কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। স্বপন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে। ব্যাচের বাকিরাও কোথাও না কোথাও চান্স পেয়েছে। পায়নি শুধু প্রান্তর এবং রিমুল।

সরল এবং জোনাকি রিমুলকে বলেছিলেন, আর-এক বছর লেগে থেকে আর একবার মেডিক্যাল এন্ট্রান্সে বসতে। সে রাজি হয়নি। ভর্তি হয়ে গিয়েছিল মহেন্দ্রনাথ কলেজে, বি কম পড়তে। রিমূলের মুক্তি ছিল, আমাকে যখন একদিন না একদিন ইয়ামি সামলাতে হবে, তখন কমার্স আর ম্যানেজমেন্ট পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সরল আর জোনাকি অনিচ্ছার সঙ্গে মেয়ের কথা মেনে নিয়েছিলেন।

প্রাপ্তরের বাড়িতে অবশ্য তুমুল অশান্তি করল ছায়া অকা গালিগালাজ, কয়েক যা দেওয়া, কোয়ার্টার থেকে বার করে দেওয়ার হুমকি…. কিছুই বাকি রইল না।

তবে সব কিছুরই শেষ আছে। মায়ের চিৎকারও একদিন বন্ধ হল। তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রান্তর গিয়ে ভর্তি হল মহেন্দ্রনাথ কলেজেই। বি কম পড়তে এবং রিমুলের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ থাকতে।

সরল কিছু একটা আন্দাজ করেছিলেন। তিনি যোগাযোগ করেন পবিত্রস্যারের সঙ্গে। পবিত্রস্যার পরিষ্কার জানিয়ে দেন, “আপনার অনুরোধে নিয়ম ভেঙে রিমূলকে ব্যাচে ঢুকিয়েছিলাম। কিন্তু এর লেখাপড়ায় মন ছিল না। দিন-রাত প্রান্তরের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত।”

সরল সব শুনলেন। প্রশ্ন করলেন, “এই ব্যাচে আর কে-কে পড়ত।”

“রঘুবীর আর স্বপনের সঙ্গেই প্রান্তরের বেশি যোগাযোগ ছিল।”

সরল এর পরে যোগাযোগ করেন রঘুবীর আর স্বপনের সঙ্গে। দু’জনেই কিছু না জানার অভিনয় করে। এবং সরল চলে যেতেই প্রান্তরকে সব জানিয়ে দেয়। সরলের সঙ্গে স্বপনের সেই একবারই মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছিল। জোনাকির সঙ্গে কখনওই হয়নি।

সেটা ছিল হেমন্তকালের এক মনখারাপ করা সন্ধে। প্রত্যেক বুধবার, কলেজের পরে প্রিন্সেপ ঘাটে বেড়াতে যেত রিমুল আর প্রান্তর। সেই বুধবারও গিয়েছিল। দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বিকেল, চারদিকে ছাতিম ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ। এই গন্ধে রিমুলের অ্যালার্জি আছে। নাক বন্ধ হয়ে যায়। চোখ লাল হয়ে টপটপ করে জল পড়ে।

ছাতিম গাছদের থেকে দূরে, গঙ্গার ধারের এক বেঞ্চিতে বসেছিল ওরা। জোয়ারের জলে টলমল করছে নৌকো। লঞ্চ থেকে ভেসে আসছে একটানা, গম্ভীর, বিষণ্ণ হন। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আকাশে ফুটে উঠছে তারা। প্রকৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, আর একটা বছর জীবন থেকে খসে পড়ল। সময় চলে যাচ্ছে। বেঞ্চিতে বসে প্রান্তরের কোলে মাথা রেখে রিমুল বলল, “আমাদের কী হবে বল তো?”

“জানি না!” রিমুলের চুলে বাঁধা কালো ফিতে নিয়ে খেলতে খেলতে অসহায়ভাবে মাথা ঝাঁকালো প্রান্তর, “এই সম্পর্কের কথা জেনে দুই বাড়িতেই লঙ্কাকাণ্ড বাঁধবে।”

প্রিন্সেপ ঘাটের চত্বর থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে দু’জনে। রাস্তার ওপারে ফোর্ট উইলিয়ামের অন্তহীন পাঁচিল, এই পারে চক্ররেলের নিষ্ঠুর লাইন। ফাঁকা, শুনশান রাস্তায় দু’-একটা প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে। বাতাসে মিহি ধোঁয়াশা।

ওদের দু’জনকে চমকে দিয়ে একটা ট্যাক্সি ব্রেক কমল। সেটা থেকে নামল একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। ছেলেটা রিমুলের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে ট্যাক্সিতে তুলে নিল। প্রান্তর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্যাক্সি ঝড়ের বেগে চলে গেল বাবুঘাটের দিকে। প্রান্তর তখনও জানত না, রিমুলের সঙ্গে ওটাই তার শেষ দেখা।

যে মেয়েটি ট্যাক্সি থেকে নেমেছে, সে আচম্বিতে প্রান্তরকে জড়িয়ে ধরল। নিজের ব্লাউজ ছিঁড়ল, শাড়ি ছিঁড়ল, তারপরে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করে চক্ররেলের লাইনের দিকে দৌড় দিল।

প্রান্তরের মাথা কাজ করছে না। সে ট্যাক্সিটাকে ধাওয়া করবে? না ওই মেয়েটার দিকে দৌড়বে? নাকি মেয়েটার থেকে দূরে পালাবে?

চক্ররেলের ধারের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল দু’টি ছেলে। একজন প্রান্তরের মুখে ঘুসি মারল। দ্বিতীয়জন ‘পুলিশ, পুলিশ’ বলে চেঁচাতে লাগল।

হেস্টিংস থানার প্যাটলিং ভ্যান আসার আগেই ছেলেদুটো মেরে প্রান্তরের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, পাজরার হাড়ে চিড় ধরিয়েছে, চোখের নীচে কালসিটে ফেলেছে। আশপাশ থেকে অনেক লোক চলে এসেছিল। গণধোলাই খেয়ে মরে যেত প্রান্তর। পুলিশ আসায় প্রাণে বেঁচে গেল। কিন্তু মেয়েটির অভিযোগের ভিত্তিতে স্থান হল জেলে।

পুলিশ কাস্টডি এবং জেল কাস্টডি হয়ে ছাড়া পেতে সময় লেগেছিল মাসতিনেক। কারণ মেয়েটি অভিযোগ তুলে নিয়েছিল। তবে ওই তিন মাসের মধ্যে ছায়া গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। প্রাপ্তরকে জেল থেকে একদিনের জন্যে প্যারলে ছাড়া হয়েছিল। শ্মশানে রঘুবীর তাকে বলেছিল, পুরোটাই সরলের প্ল্যান। মেয়েটি যৌনকর্মী। ছেলেগুলো স্থানীয় গুন্ডা সরলের সঙ্গে পুলিশের কী আঁতাত হয়েছে কেউ জানে না। তবে পুলিশ কেসটা চালাচ্ছে নাম কা ওয়াস্তে প্রান্তর খুব তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে যাবে।

প্রান্তর চুপচাপ শুনেছিল। রঘুবীরকে জিজ্ঞেস করল, “স্বপন এল না?”

“ও লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত, “ থেমে থেমে বলেছিল রঘুবীর।

প্রান্তর বুঝেছিল, স্বপন তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চায় না।

মায়ের ঘাটকাজ ঢুকিয়ে আবার জেলে ফেরত গেল প্রান্তর। জেল থেকে বেকসুর খালাসও পেল। কিন্তু রিমূলের কোনও খবর পেল না। রঘুবীরের কাছ থেকে জানল, সেন পরিবার বন্ডেল রোডের আইসক্রিম বাড়ি এবং আইসক্রিম কারখানা বিক্রি করে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কোথায় গিয়েছেন। কেউ বলতে পারল না।

রঘুবীরের জোরাজুরিতে প্রাপ্তর বিকম পাশ করল। কিন্তু তার মন পড়ে রিমুলের কাছে। মেয়েটা কোথায়? বেঁচে আছে তো? গভীর অবসাদে ডুবে গেল প্রান্তর। কোয়ার্টারে একা চুপ করে দিনের পর দিন বসে থাকে। কথা বলে না, যায় না, স্নান করে না, দাড়ি কামায় না। মেঝের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আর কাঁদে। কিছুদিন এইরকম চলার পরে একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে গেল প্রান্তর। নেহাত পাশের কোয়ার্টারের এক বাসিন্দা তার খবর নিতে দরজা খটখট করেছিল, তাই বেঁচে গেল। খবর পেয়ে রঘুবীর তাকে ভর্তি করল মেডিক্যাল কলেজের এমার্জেন্সি বিভাগে। স্টমাক ওয়াশ, স্যালাইন, অক্সিজেন আরও যা যা লাগে, সব চলল।

শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার পর প্রান্তরকে রঘুবীর নিয়ে গেল মেডিক্যাল কলেজের মানসিক বিভাগে। ডিপ্রেশনের একগাদা ওষুধ আর লাগাতার কাউন্সেলিং চলল মাসছয়েক ধরে। অবশেষে বাস্তবের মাটিতে ফিরে এল প্রান্তর। রঘুবীরের পরামর্শে স্পোকেন ইংলিশ আর কম্পিউটারের কোর্স করল। চাকরি জুটিয়ে নিল ছোটখাটো প্রাইভেট ফার্মে।

কোথাও বেশিদিন টিকতে পারেনি প্রাপ্তর। এক অফিস থেকে অন্য অফিস, সেখান থেকে অন্য অফিস, এইভাবে কেটে গেল বারো বছরের বেশি সময় রঘুবীর এবং স্বপন এমবিবিএস পাশ করল, লোকে তাদের আপনি বলতে শুরু করল।

ওঁরা সার্জারিতে এম এস করলেন, কার্ডিও-থোরাসিক সার্জারিতে এম সি এইচ করলেন, বিদেশ থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরলেন, বিয়ে করলেন, যোগদান করলেন সিথ্রিতে। তখনও প্রান্তর খুচরো চাকরি করছে।

স্বপন চলে গেলেন পটনায়। রঘুবীরের ঠাঁই হল কলকাতা শাখায়। রঘুবীরই মেহুলের কাছে দরবার করে প্রান্তরকে সিথ্রি-র রাঁচি অফিসে সিকিউরিটি অফিসারের চাকরির ব্যবস্থা করেছেন।

উর্দি পরা দারোয়ানের চাকরি। দরকার পড়লে অ্যাম্বুল্যান্স বা ডাক্তারদের গাড়িও চালাতে হয়। মাইনে ছাড়াও ইনক্রিমেন্ট এবং অবসরকালীন সুবিধে আছে। রাঁচির পরে শিলচর এবং ভুবনেশ্বর শাখা ঘুরে প্রান্তর এখন কলকাতায় থিতু। হাসপাতালের কাজ সেরে কোয়ার্টারে ফিরে গান শোনে বা ব্যায়াম করে

প্রান্তর জানে যে রঘুবীরের সঙ্গে স্বপনের যোগাযোগ আছে। স্বপন কলকাতায় এলে রঘুবীর তাঁর বাড়িতে যান আড্ডা মারতে। কিন্তু কখনও বলেন না যে প্রান্তর সিথ্রিতে চাকরি করে। বলেন না, কারণ অনেক বছর আগেই স্বপন নিজেকে প্রান্তরের থেকে ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন।

*

ব্যায়াম শেষ। ঘেমে নেয়ে গিয়েছে প্রান্তর। তোয়ালেতে শরীর মুছে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে নিল। এই চেহারা দেখেই রিমুল তার প্রেমে পড়েছিল।

এই এক সমস্যা প্রান্তরের। যে-কোনও প্রসঙ্গ থেকেই সে ঘুরেফিরে রিমুলের কাছে চলে যাবে। যেমন, সকালবেলা গান হচ্ছিল, ‘হৃদয়ের এ কুল, ও কুল, দু কূল ভেসে যায়, হায় সজনি, উথলে নয়নবারি। ‘ গানটা শোনার সময় প্রান্তরের মনে হচ্ছিল, রিমুল রবীন্দ্রসংগীত শুনতে ভালবাসত। বা, একটু পরে যখন প্রান্তর রান্না করবে, তখন মনে হবে, রিমুল তাকে পার্ক স্ট্রিটের নামী রেস্তরাঁয় নিয়ে গিয়ে সিজলার খাইয়েছিল। প্রান্তরের মস্তিষ্কের সার্কিটের চূড়ায় বসে আছে রিমুল। প্রান্তরের সব কথা, সব গান, সব চিন্তা, সব আনন্দ-দুঃখ- ভালবাসা মন্দবাসা রিমুলকে লক্ষ্য করে।

সকাল আটটা বাজে। গ্যাসে ডালিয়ার খিচুড়ি আর সয়াবিনের তরকারি চাপিয়ে স্নান করতে ঢুকল প্রান্তর। স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে সেঁকে নিল গোটাছয়েক পাউরুটি। সয়াবিনের তরকারি আর পাউরুটি দিয়ে ব্রেকফাস্ট হয়ে যাবে। দুপুরের জন্যে থাকল ডালিয়ার খিচুড়ি আর সয়াবিনের তরকারি। রাতের খাবারের কথা পরে ভাবা যাবে।

ব্রেকফাস্ট সেরে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিল প্রান্তর। পেট পুরে খাওয়া হয়ে গিয়েছে। এবার ঘুম আসবে। ঘুমের মধ্যে আসবে স্বপ্ন। আর স্বপ্নের মধ্যে আসবে রিমুল। চুল বাঁধার কালো ফিতের ঝাপটা লাগবে প্রান্তরের গালে, মোম মসৃণ ত্বকের স্পর্শ পাবে প্রান্তরের হাত, অলৌকিক গন্ধে ভরে যাবে চরাচর। সেই গন্ধের নাম প্রেম। সেই সুবাসের নাম রিমুল।

দেওয়ালঘড়িতে সকাল সাড়ে ন’টার ঘণ্টা যখন বাজল, তখন প্রান্তর ঘুমিয়ে পড়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *