সবুজ সরণি – ১২

।। বারো।।

২০ মে রাত সওয়া এগারোটা থেকে ২১ মে ভোর চারটে

.

গোবিন্দপুর খালসা ধাবার মতো ধাবা সারা ভারতে ছড়িয়ে আছে। হাইওয়ে দিয়ে কয়েক কিলোমিটার গেলেই এই রকম ধাবা চোখে পড়বে। মালিক এক সদাহাস্যময় সর্দারজি, যিনি সবদিকে নজর রাখছেন, খদ্দেরদের সঙ্গে হেসে কথা বলছেন, কর্মচারীদের কাজে গাফিলতি করতে দেখলেই ‘মা’ ও ‘বেহেন’ সংক্রান্ত গালিগালাজ করছেন। খন্দের বা কর্মচারী, কেউই তাঁর গালিগালাজ গায়ে মাখছে না।

ধাবার খদ্দের বলতে ট্রাকচালক আর খালাসি। তারা খাটিয়ায় বসে রামের বোতল খুলে ফেলেছে। সর্দো দা সাগ, মঞ্চে কী ব্রোটি আর বাটার চিকেন খাচ্ছে গপাগপ। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, যেটা খাটিয়ার কাঠের ফ্রেমে রেখে ঘুসি মেরে ফাটানো হচ্ছে। তারস্বরে বাজছে হনি সিং, দালের মেহন্দি আর বাদশা-র গান।

ধাবা থেকে সামান্য দূরে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝলমলে পোশাক পরা মেয়েরা। রাতের খাবার সেরে ড্রাইভাররা তাদের সঙ্গে চলে যাচ্ছে পাশের ঝুপড়িতে। একটু বাদে ফিরে এসে খালাসিকে নিয়ে উঠে পড়ছে ট্রাকে সারা রাত চোখের পাতা না ফেলে ট্রাক চালাতে অসুবিধে হবে না। অনেকে অ্যাক্সিলারেটরে ইঁট রেখে, স্টিয়ারিংয়ে হাত স্টেডি রেখে অল্প ঘুমিয়েও

দু’টি ট্রাকের মাঝখানে এসে দাঁড়াল একটি অ্যাম্বুল্যান্স। সেটা থেকে প্রথমে নামলেন সরল। তারপরে স্বপন। কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করে সরল বাথরুমের দিকে এগোলেন। স্বপন ধাবা মালিকের কাছে গিয়ে বললেন, “আমাদের সঙ্গে একজন পেশেন্ট আছে। যদি তাড়াতাড়ি খাবার পাওয়া যায়, তা হলে ভাল হয়।”

রোগিনীর কথা শুনে সর্দারজি লাফঝাঁপ করে মুহূর্তের মধ্যে হাতে গড়া গরম রুটি আর ডিমের কারির ব্যবস্থা করে ফেললেন। সরল বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন, তাঁর আর স্বপনের জন্যে আলাদা টেবিলে ধোঁয়া ওঠা রুটি আর ডিমের কারি সাজানো রয়েছে। দূরের একটি টেবিলে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রান্তরের জন্যে। সেদিকে এক ঝলক তাকিয়ে সরল বললেন, “ড্রাইভার কোথায়”

স্বপন হাত ধুতে যাওয়ার আগে বললেন, “ধাবা মালিক একবার রিমূলকে দেখতে চেয়েছে। প্রান্তর এঁকে নিয়ে গিয়েছে।”

“যত নাটক” খেতে বসে গেলেন সরল।

সরল আর স্বপন যখন খেতে ব্যস্ত, তখন অ্যাম্বুল্যান্সের পিছনের দরজা খুলে প্রান্তর বলল, “রিমুল, ধাবা মালিক তোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।” সর্দারজি রিমুলের হাত স্পর্শ করে একটি পঞ্জাবি ভজন গাইতে লাগলেন। গানের একটি বর্ণও বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু গানের সুরে উপরওয়ালার প্রতি আর্তি নিংড়ে বেরচ্ছে। সঙ্গীতের শক্তি এত তীব্র যে, মন শুদ্ধ হয়ে যায়।

গান শেষ করে সর্দারজি বললেন “ওয়াহে গুরু।” তারপরে চলে গেলেন। রিমুল জিজ্ঞেস করল, “ওঁকে আমার কথা কে বলল?”

“ডক্টর মিশ্র বলেছেন হয়তো?” বলল প্রান্তর।

“তোকে একটা কথা বলি। আমি গত তিন বছর ধরে স্বপনের ট্রিটমেন্টে রয়েছি। বুঝতেই পারিনি যে এই স্বপন মিশ্র আর আমাদের ছোটবেলার সেই স্বপন একই মানুষ। আমার বাবা-মা তো এখনও জানেন না।”

“আমি এতদিন সিথ্রিতে আছি। আমিও জানতাম না। অন্যান্য রাজ্যে কাজ করেছি। কিন্তু পটনা সিভিতে কাজ করিনি। ওই জনোই জানতে পারিনি। নেহাত আগে শুনেছিলাম। না হলে আমি ডক্টর মিশ্রকে চিনতে পারতাম না।”

“স্বপন অ্যাম্বুল্যান্সে ওঠার পরে আমাকে সব বলল। আমি তো সব শুনে অবাক। কিছুতেই চেহারা মেলাতে পারছি না।

“তোর বাবা কিছু শোনেনি তো?

“লাকিলি বাবা সিটবেল্ট বেঁধে ঘুমোচ্ছিল। স্বপনের কাছেই শুনলাম যে কলকাতা সিথ্রিতে রঘুবীর আছে। ও-ও কার্ডিও-থোরাসিক সার্জন। ওরা দু’জনে মিলে অপারেশন করবে।”

প্রান্তর হাসল, “তোর সঙ্গে যেমন না জেনে স্বপনের যোগাযোগ হয়ে গিয়েছিল আমার ক্ষেত্রে সে রকম নয়। রঘুবীর…. সরি, ডক্টর চক্রবতীর সঙ্গে আমার আগাগোড়াই যোগাযোগ ছিল। উনিই আমাকে সিথ্রি-র কাজটা জুটিয়ে দিয়েছিলেন….” পিছন দিকে তাকিয়ে প্রান্তর বলল, “তোর বাবার খাওয়া হয়ে গিয়েছে। হাত ধুতে যাচ্ছে। আমি পেটে কিছু দিয়ে নিই।”

রিমুল চোখ বুজল। অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা বন্ধ করে প্রান্তর দৌড়ল খেতে। গবগবিয়ে রুটি আর ডিমের কারি খেয়ে পটাপট দু’প্লেট গাজরের হালুয়া মেরে দিল। এক ভাঁড় চা নিয়ে চলে এল অ্যাম্বুল্যান্সের কাছে সরল উঠে বসেছেন। স্বপন ধাবা মালিককে টাকা মিটিয়ে গাড়িতে বসতেই অ্যাম্বুল্যান্স স্টার্ট দিল প্রান্তর। আড়চোখে দেখে নিল, রাত সওয়া এগারোটা বাজে। তারা খেতে ঠিক আধঘণ্টা সময় নিয়েছে।

ধাবার সামনেটায় জ্যাম। খুচরো একটা মারামারি হচ্ছে। অ্যাম্বুল্যান্সের হুটারের ট্যাঁও ট্যাঁও শব্দ শুনে বা বিকনের নীল আলো দেখেও কেউ সরে যাচ্ছে না। তদের টপকে ফাঁকা উনিশ নম্বর জাতীয় সড়কে আসতে মিনিট পনেরো লাগল। প্রান্তর এক লাফে গাড়ির স্পিড তুলে দিল একশো কুড়ি কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় তিনশো কিলোমিটার রাস্তা এক লপ্তে অতিক্রম না করে সে থামবে না। গাড়ি চলছে সামনের দিকে। প্রাপ্তরের মন দৌড়চ্ছে পিছনে। মনে পড়ছে সেই দিনটার কথা, যেদিন কলেজ পালিয়ে সিনেমা দেখার সময় সে রিমূলকে চুমু খেয়েছিল। জীবনের প্রথম চুমু…

*

সিনেমাটা দেখার কথা অনেক দিন ধরেই বলছিল রিমূল। মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ উপন্যাস থেকে ছবি বানিয়েছে বলিউডের এক পরিচালক। মৈত্রেয়ী দেবীর নাম প্রান্তর শোনেনি। সিনেমাটা দেখার ইচ্ছেও নেই। কিন্তু রিমুল নাছোড়বান্দা। সে বলল, “তুই যাবি কি না বল। সলমন খান, ঐশ্বর্যা রাই আর অজয় দেবগণ আছে। ‘নিম্বুড়া’ গানটা এই সিনেমার।”

প্রান্তর যেসব সিনেমা দেখতে ভালবাসে, সেগুলো রিমুলকে বলা যায় না। সোসাইটি, টাইগার, রিগাল, এই সব হলে রিলিজ করে ছবিগুলো। প্রান্তর আর তার এক স্যাঙাত সেই সব ছবির নিয়মিত খদ্দের। যেদিন রিমুল কলেজে আসে না, সেদিন কলেজ কেটে নুন শোয়ে এই সব ছবি দেখা রুটিন হয়ে গিয়েছে। ছবির নাম ইংরেজি হোক বা হিন্দি সিনেমার প্যাটার্ন এক। প্রথমে কয়েক সিন বাড়িঘর দেখাবে। কত্তা আপিস যাচ্ছে, গিন্নি রান্না করছে, খোকা ইশকুল যাচ্ছে’ টাইপ। তারপরেই হুট করে ‘পানু’ বা সফট পর্ন শুরু হয়ে যাবে। সেটা যে অন্য ছবির থেকে কেটে লাগানো হয়েছে, পরিষ্কার বোঝা যায়। তবে দর্শক খুব ভদ্র। কেউই আপত্তি করে না। কেউ-কেউ ‘ফির সে দিখাও’ বলে চিকুর ছাড়ে। হলের কর্মচারীরাও ভাল। তারা ওই অংশটি আবার দেখিয়ে দেয়।

কিছু দর্শক একটা ‘সিন’ দেখেই সিনেমা হল ছেড়ে বেরিয়ে যায়। বাকিরা পরের ‘সিন’-এর জন্যে অপেক্ষা করে। একঘণ্টার মধ্যে দুটো ‘সিন’ দেখানো হয়ে গেলে সবাই সিনেমা হল ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

প্রান্তরের বাতিক আছে সিনেমার টিকিট জমানোর। ওই কারণেই সে রিমুলের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিল। প্রান্তরের পিঠে কিল মেরে রিমুল বলেছে, “পারভার্ট! পারভার্ট! পারভার্ট!” তারপর “পানু দেখার অপরাধে তিনদিন প্রান্তরের সঙ্গে কথা বলেনি।

আজ যখন রিমুল নিজেই আড়ি কাটিয়ে ভাব করতে রাজি হয়ে গেল, তখন প্রান্তর ‘না’ বলে কোন সাহসে? তা ছাড়া সিনেমা হলের মধ্যে রিমুলের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর সুযোগ কমই পাওয়া যায়। প্রান্তর তাই রাজি হয়ে গেল।

ছবিটা রিলিজ করেছে মাসদুয়েক আগে। কলেজ কেটে মধ্য কলকাতার সিনেমা হলে গিয়ে প্রান্তর দেখল একতলাটা সলমন খানের ফ্যানেরা হাউসফুল করে দিলেও দোতলার ব্যালকনিতে তাদের মতো আরও দু’জোড়া কলেজ পালানো ছেলেমেয়ে ছাড়া কেউ নেই।

সিনেমা দেখতে-দেখতে বোর হচ্ছে প্রান্তর। এইসব নাচগান তার ভাল লাগে না। সন্তর্পণে সে চেয়ারের হাতলে কনুই রাখল। সেখানে রিমুলের হাত রাখা ছিল। রিমুল হাত সরিয়ে নিল না। বরং প্রান্তরের হাতের তালু নিজের হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে সিনেমা দেখতে লাগল।

প্রান্তরের অস্বস্তি হচ্ছে। অতীতে তারা বহুবার হাতে হাত রেখে বসে থেকেছে। রঘুবীরের বাড়িতে বা ছায়াতলায়। কিন্তু সেগুলো পাবলিক স্পেস। আলো ছিল। অন্য লোক ছিল।

সিনেমা হলের ব্যালকনিতে অন্ধকার। অন্য দু’জোড়া ছেলেমেয়ে যে সিনেমা দেখেছে না, সেটা এত দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে।

“নিখুড়া’ গানটা শুরু হয়েছে। প্রান্তর ঘাড় ঘুরিয়ে রিমুলের কানে-কানে বলল, “নিমুড়া মানে কী রে?”

“লেবু,” শিউরে উঠে জবাব দিল রিমূল। প্রান্তর বলল, “কী হল! চমকালি কেন?”

“কানে ফুঁ দিলে আমার খুব অস্বস্তি হয়। সারা গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়। এই দ্যাখ।” প্রান্তরের হাতের তালু নিজের হাতে বুলিয়ে দিচ্ছে রিমুল। প্রান্তর অবাক হয়ে বলল, “এ কী রে! তোর হাত তো পাপোশের মতো হয়ে গিয়েছে।”

উপমা শুনে কুলকুল করে হাসছে রিমুল। প্রান্তরের দিকে সরে এসে, তার বুকে মাথা রেখে বলছে, “ছোটবেলায় বাবা কানে ফুঁ দিলে এই রকম হত। খুব কাতুকুতু লাগত আর হাসি পেত। বড় হয়ে যাওয়ার পরে আর অ্যালাও করি না। অন্য রকম অনুভূতি হয়।”

“অন্যরকম বলতো?” আবার রিমুলের কানে ফুঁ দিয়েছে প্রান্তর। রিমুল শিউরে উঠে প্রান্তরের হাতের তালু খিমচে দিয়ে বলল, “প্লিজ! ও রকম করিস না!”

পর্দায় নীলবসনা ঐশ্বর্যা নাচতে নাচতে লেবুর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যালকনিতে প্রান্তর আর রিমুলের সেদিকে মন নেই। রিমুল তার পাতলা ও অধর এগিয়ে দিয়েছে প্রাপ্তরের মোটা ঠোঁটের দিকে। প্রান্তর কিছু বোঝার আগেই দীর্ঘ চুম্বনে আবদ্ধ হল সে। প্রান্তরের শার্টের কলার ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়েছে রিমূল, প্রান্তরের হাত টেনে নিচ্ছে নিজের শরীরের দিকে পরদায় নায়িকা নাচছে। রিমুল আর প্রান্তর তার দিকে তাকিয়েও দেখছে না।

*

ইন্টারকমের পিক পিক শব্দে প্রান্তরের ঘোর কাটল। গাড়ি চালাতে- চালাতে বাঁ হাতে রিসিভার তুলে সে বলল, “হ্যালো?”

ওপার থেকে স্বপন চিন্তিত গলায় বললেন, “রঘুবীরকে ফোন করলাম। ও ফোন ধরল না। কী ব্যাপার বলো তো?”

রঘুবীর যে ঘুমের ওষুধ খান, এটা প্রান্তর জানে। কেন খান, সেটাও জানে। কিন্তু এখন সেসব কথা বলার মানে হয় না। রাস্তায় চোখ রেখে সে বলল, “কাল বড় অপারেশন আছে। আজ বোধ হয় ফোন সাইলেন্ট মোড়ে রেখে ঘুমোচ্ছে।

“তাই হবে…” বিড়বিড় করে বললেন স্বপন, “রাত দুটো থেকে আমি অনেকবার ওকে ফোন করেছি। গতকালও অনেক রাতে ওর সঙ্গে কথা হল দিব্যি ফোন ধরেছিল। আজ কী হল কে জানে?”

রিসিভার নামিয়ে রাখল প্রান্তর। এখন এইসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। উনিশ নম্বর হাইওয়েতে শেষ বড় জায়গা হল বাগোদর তার একটু পরেই গাড়ি বাংলায় ঢুকে যাবে।

কী মনে করে রঘুবীরের দেওয়া সেকেন্ডহ্যান্ড ফোনটা হাতে নিয়েছে প্রান্তর। রঘুবীরের মোবাইলে ফোন করেছে। দেখা যাক ধরেন কি না! অনেকক্ষণ ধরে রিং হল। রঘুবীর ফোন ধরলেন না। গাড়ি চালাতে চালাতেই আরও কয়েকবার ফোন করল প্রান্তর। রিং হয়ে গেল। রঘুবীর ফোন ধরলেন না। প্রান্তর আর রঘুবীরকে নিয়ে মাথা ঘামাবে না। তার এখন একটাই কাজ। ঠিক সময়ে শক্তিগড় পৌঁছনো।

প্রান্তরের মনে পড়ে গেল, সিনেমা হলের অন্ধকারে সেই চুম্বন আর ভালবাসাবাসির পরে রিমুলকে আর স্পর্শ করেনি সে। কেন করেনি। খুবই বোকা-বোকা ভাবনা। প্রান্তর মনে করত, শরীরের সম্পর্ক হবে বিয়ের পরে। আজ তো বটেই, আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও এটা একটা ব্যাকডেটেড সিদ্ধান্ত ছিল। প্রান্তরকে উপায়হীন হয়ে সিদ্ধান্তটা নিতে হয়েছিল। তাকে তো কোথাও একটা প্রমাণ করতে হবে যে, সে রিমুলের সঙ্গে প্রেম করার যোগ্য। তার কিছু নেই, কিন্তু চরিত্র আছে। রিমূলকে সে মন থেকে ভালবাসে। শরীরের জন্য নয়। পরে প্রান্তর বুঝতে পেরেছিল, এটা খুব ভুল ধারণা। সরল যখন প্রতিশোধ নিলেন, তখন দেখতেও যাননি প্রান্তর আর রিমূলের সম্পর্কের মধ্যে শরীর ছিল কি না। তিনি প্রান্তরকে জাস্ট মরা টিকটিকির মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন।

পরবর্তী দু’ দশক জুড়ে প্রান্তরের কাছে অনেক সুযোগ এসেছে। প্রাপ্তরের ভাল লাগে না। রিমুলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে, এই ভেবে সে বিয়ে পর্যন্ত করেনি। যদিও সে জানত না রিমুল বেঁচে আছে কি না, বেঁচে থাকলে কোথায় আছে, কাকে বিয়ে করেছে, কটা বাচ্চা হয়েছে….

প্রান্তর একজন বার্ধ পুরুষ। চেহারাটা ভাল বলে দারোয়ানের চাকরি পেয়েছিল। উপার্জন যৎসামান্য। সঞ্চয় বলে কিছু নেই। কিন্তু ভারতবর্ষে বার্ধ পুরুষদেরও মেয়ের অভাব হয় না। তারা বিয়ে করে নেয়। কাঠি, যোগী, বাদল বা সিথ্রি-র অন্য স্টাফেরা এখনও প্রান্তরকে বিয়ে করতে বলে। যোগী তো একবার একটা মেয়েকে প্রান্তরের কোয়ার্টারে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটাকে বুঝিয়েসুজিয়ে বাড়ি পাঠায় প্রান্তর। সেই থেকে সিথ্রি-র কর্মচারীদের মধ্যে প্রাপ্তরের পুরুষত্ব নিয়ে নানা রসিকতা চালু আছে। প্রাপ্তর পাত্তা দেয় না। সত্যিই তো, তার মধ্যে মেয়েদের প্রতি কোনও যৌন আকাঙ্ক্ষা নেই। শুধু আছে রিমুলের প্রতি সীমানাহীন ভালবাসা। এখনও রাতে বিছানায় শুয়ে রিমুলের কথা ভাবলে উত্তেজিত হয়ে ওঠে প্রান্তর। নিজেকে ঠান্ডা করতে- করতে ভাবে, এইভাবেই যদি জীবনটা কেটে যায়, মন্দ কী?

আকার ও অবয়বহীন একজন মানুষকে ভালবাসা যায়? একমুখী ভালবাসার চালিকা শক্তি দিয়ে আস্ত একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়? লোকে কী বলবে প্রান্তর জানে না। সে শুধু জানে, যায় যায়! ভীষণ সুখে কাটিয়ে দেওয়া যায়।

আর হঠাৎ করে সেই ভালবাসার মানুষটা হাতের নাগালে চলে এলে? নিজেকে কী শান্ত আর কী উত্তেজিত, কী তৃপ্ত আর কী তৃষ্ণার্ত, কী উন্মাদপ্রায় আর কী স্থিতধী যে লাগে… সেকথা বলে বোঝানো যায় না।

আবার চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ল প্রান্তরের। আবার ইন্টারকম বাজছে। রিসিভার কানে গুঁজে সে বলল, “হ্যালো?”

স্বপন বললেন, “আমি মেহুলকে ফোন করেছিলাম। উনি বললেন রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত রঘুবীর ওঁর সঙ্গে ছিল। আমার কাছ থেকে ফোন না ধরার কথা শুনে উনিও রঘুবীরকে ফোন করলেন। ও ফোন ধরেনি।”

অ্যাম্বুল্যান্সের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে প্রান্তর বুঝতে পারল তারা বাংলায় ঢুকে গিয়েছে। পেরিয়ে গেল দুর্গাপুর। সাইনবোর্ডে বাংলা অক্ষর দেখা যাচ্ছে। রাত কেটে গিয়ে ভোর আসছে। আর একটু পরেই শক্তিগড়।

প্রান্তর বলল, “আমরা শক্তিগড়ে থামব। বাথরুম যাওয়া, চা খাওয়ার পর্ব পনেরো মিনিটে সারতে হবে। রঘুবীরস্যারকে নিয়ে না ভাবলেও চলবে।

স্বপন বললেন, “ঠিকই বলেছ। আমি অবশ্য মেহুলকে রিকোয়েস্ট করলাম, ওর বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসতে। দেখা যাক কী বলেন।

রিসিভার ক্রেডলে রেখে দিয়ে চোয়াল শক্ত করে গাড়ি চালাচ্ছে প্রান্তর। দেখতে-দেখতে চলে এল শক্তিগড়। ল্যাংচা প্যালেসের সামনে গাড়ি রেখে সে ড্রাইভারের আসন থেকে নামল। পিছন থেকে নেমেছেন স্বপন আর সরল। সরলকে পাত্তা না দিয়ে প্রান্তর স্বপনকে বলল, “আমি বাথরুম থেকে ঘুরে আসছি। আপনারা চা-জলখাবার খেয়ে নিন আর বাথরুম করে আসুন

মোবাইলে সময় দেখলেন স্বপন, “ভোর চারটে বাজে। তার মানে ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা আসতে সময় লাগল চার ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট।”

প্রান্তর উত্তর না দিয়ে ‘পে অ্যান্ড ইউজ’ টয়লেটের দিকে এগোল। ওর ভিতরে স্নান করার জায়গা আছে। মাথায় জল ঢালা খুব জরুরি। তার প্রবল ঘুম পাচ্ছে। রিমুলের কথা ভেবে সে নিজেকে এতক্ষণ জাগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শরীর আর পারছে না।

স্নান সেরে থাবায় গিয়ে গরগবিনে কচুরি-আলুর দম আর চারটে ল্যাংচা খেল প্রান্তর। স্বপনকে জিজ্ঞেস করল, “রিমুল কেমন আছে?”

“ভাল” জবাব দিলেন স্বপন।

সরল গাড়িতে উঠে বসেছেন। স্বপনও উঠে গেলেন। পিছনের দরজা বন্ধ করার সময় অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল প্রান্তরের। তার মনে হল, দরজা বন্ধ করার সময় গাড়িতে এমন কিছু একটা হল, যেটা আগে হয়নি।

প্রান্তর ড্রাইভার। গাড়ির মন বোঝা তার কাজ। সামান্য শব্দ, সামান্য কাঁপুনি, সামান্য এদিক-ওদিক তার মাথায় সিগন্যাল দেয়। এখনও কোনও একটা সিগন্যাল এল। ভুরু কুঁচকে চালকের আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিল সে। এবং আওয়াজ শোনামাত্র বুঝতে পারল, সামনের টায়ার পাংচার হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *