সবুজ সরণি – ১

॥ এক ॥

১৭ মে রাত সাড়ে বারোটা থেকে ১৭ মে রাত দেড়টা

.

“এখন একটু ভাল লাগছে?” জিজ্ঞেস করলেন কার্ডিওথোরাসিক সার্জন স্বপন মিশ্র।

হাসপাতালের নীল পোশাক পরা আটত্রিশ বছরের রিমুল সেনের মুখে অক্সিজেন মাস্ক। সে কথা বলার অবস্থায় নেই। ঘাড় নেড়ে বোঝাল, ‘হ্যাঁ।’

সিস্টার এগিয়ে দিয়েছে বিমূলের রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট। রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়েছে। কমেছে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ রিপোর্ট দেখে খুশি হলেন স্বপন। কার্ডিয়াক মনিটরের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, রিমুল স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কাল সকালে অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়া হবে। পরশু সকালে ছুটি দেওয়া যাবে।

চারতলার প্রাইভেট কেবিনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন স্বপন। পটনা শহর রাত সাড়ে বারোটার সময় ঘুমিয়ে পড়েছে। ‘কার্ডিয়াক কেয়ার ক্লিনিক’ বা ‘সিথ্রি’ থেকে পটনা স্টেশন দু’ কিলোমিটার দূরে। দিনের বেলায় দুষণের কারণে স্টেশন দেখতে পাওয়া যায় না। এখন কিন্তু ‘কার্ডিয়াক কেয়ার ক্লিনিক’ বা ‘সিথ্রি’ থেকে পটনা স্টেশন দিব্যি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

পটনা শহরে হৃদয়ের ব্যামোর এক নম্বর হাসপাতালের নাম হল সিথি। ওডিশার ভুবনেশ্বর, ঝাড়খণ্ডের রাঁচি এবং অসমের তেজপুরে সিথ্রি-র শাখা আছে। হেড অফিস কলকাতায়। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে, রুবির মোড থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে।

আটত্রিশ বছরের ডাঃ স্বপন মিশ্র প্রাইভেট কেবিন থেকে বেরোলেন। এখন তাঁকে দেখা করতে হবে রিমুলের বাবা-মা সরল এবং জোনাকি সেনের সঙ্গে। একমাত্র মেয়ে রিমুলের হার্টের অবস্থার কথা তাঁরা জানেন। তা সত্ত্বেও আর একবার কথা বলতে হবে।

স্বপন আদতে কলকাতার বাসিন্দা। সরল, জোনাকি এবং রিমুলও তাই। সেন পরিবার কলকাতা ছেড়েছিলেন আজ থেকে কুড়ি বছর আগে। স্বপন ছেড়েছেন অনেক পরে।

সরল এবং জোনাকি পটনার অন্যতম বড় উদ্যোগপতি। তাঁদের একটি আইসক্রিম কোম্পানি আছে, যার নাম ইয়ামি’। সারা ভারতের সমস্ত বড় এবং মাঝারি শহরে ইয়ামির আইসক্রিম পাওয়া যায়।

প্রাইভেট কেবিনের বাইরের সোফায় বসেছিলেন সরল এবং জোনাকি। চৌষট্টি বছরের সরল রোগা, লম্বা। মে মাসের গরমেও তাঁর পরনে সুট। রিমলেস চশমার লেন্সের আড়ালে বুদ্ধিদীপ্ত চোখদু’টি ঝকঝক করছে।

জোনাকির বয়স তেষট্টি, বোঝা যায় কম বয়সে অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন। পরনে হালকা নীল রঙের তাঁতের শাড়ি, চোখে লাইব্রেরি ফ্রেমের চশমা।

স্বপন তাঁদের বললেন, “আপনারা আমার চেম্বারে আসুন।” সেন দম্পতি স্বপনের পিছু-পিছু চললেন।

স্বপন ছ’ফুটের উপরে লম্বা। ব্যায়াম করার কারণে পেশিবহুল চেহারা। আটত্রিশ বছর বয়সেই মাথায় টাক পড়ে গিয়েছে বলে রোজ মাথা কামান। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আছে। তিরিশ পেরনোর পরে চোখে উঠেছে জন লেনন চশমা। সুট পরা স্বপনকে দেখে বোঝা যায় না যে কুড়ি বছর আগে তিনি জিনস আর টি শার্ট পরা ল্যাংপেঙে ছেলে ছিলেন।

সরল অবশ্য কুড়ি বছর আগেও সুট পরে থাকতেন। তখন সেন দম্পতি মধ্য চল্লিশে। স্বপন আর রিমুল আঠারো।

দুই দশক পেরিয়ে অন্য শহরে রিমুল আর তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে স্বপন চমকে উঠেছিলেন। অবাক হয়ে ভেবেছিলেন, রিমুল বা সরল তাঁকে চিনতে পারছেন না কেন? পরে বুঝেছিলেন, কুড়ি বছর অনেক লম্বা সময়। দু’ দশক আগে কলকাতায় যে ঘটনা ঘটেছিল, তাতে স্বপন ছিলেন পার্শ্বচরিত্র। তা ছাড়া দীর্ঘকাল বিদেশবাসের কারণে স্বপনের আচার-আচরণ বদলেছে। নিয়মিত জিম করে বদলেছে চেহারা। চশমা, ফ্রেঞ্চকাট আর কামানো মাথা অন্য ব্যক্তিত্ব দিয়েছে।

চেম্বারের চেয়ারে বসে সেন দম্পতির দিকে তাকিয়ে স্বপন বললেন, “পেশেন্টের রোগ ধরা পড়েছিল আজ থেকে তিন বছর আগে। মেয়ের প্রবল শ্বাসকষ্ট দেখে আপনারা এঁকে জেনারেল ফিফিশিয়ানের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। উনিই বলেছিলেন পেশেন্টের হার্টে জটিল ব্যামো আছে। তাঁর কথা শুনে আপনারা এলেন আমার কাছে। নানা পরীক্ষা করে আমি যা বলেছিলাম আজও তার থেকে এক চল সরছি না। পেশেন্টের ডায়লেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি আছে। ওষুধ খেয়ে এই রোগ সারবে না। এর একটাই চিকিৎসা। শি নিডস হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট।”

চেম্বারে এখন নীরবতা। সেন দম্পতির মাথা নিচু। স্বপন বললেন, “আপনারা আমার কথা শুনলেন না। প্রথমে পটনার অন্য ডাক্তারের কাছে গেলেন সেকেন্ড এবং থার্ড ওপিনিয়নের জন্যে। তার পরে ভেলোর, দিল্লির এমস, মুম্বইয়ের নানাবতী হাসপাতাল। সব্বাই এক কথা বলল। তখন আপনারা শ্যামবাবাজির জড়িবুটিতে ঝুঁকলেন। কেটে গেল তিনটে বছর। পেশেন্ট ক্রমশ দুর্বল হতে লাগল। ওষুধ খেয়েও এখন ওর শ্বাসকষ্ট কমে না। অক্সিজেনের নল খুলে দিলে জল থেকে তোলা মাছের মতো খাবি খায়। মাসের মধ্যে পনেরোদিন সিথ্রি-তে ভর্তি থাকতে বাধ্য হয়।

সরল বললেন, “ভেবেছিলাম, মেয়েটা ওষুধ খেয়ে ভাল হয়ে যাবে।” স্বপন বললেন, “ওষুধ আর কাজ করছে না। চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই পেশেন্টের হার্ট কাজ করা বন্ধ করে দেবে।”

রোগীর বাড়ির লোককে সত্যি কথাটা এইভাবে বলে ফেলা উচিত নয়। শুধু রোগ নিরাময় নয়, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে ভরসা দেওয়াও চিকিৎসকের দায়িত্ব। কিন্তু আজ স্বপন কঠিন কথাটা সরাসরি বলে দিলেন।

কেন বললেন? তাঁর মনে পড়ছে কুড়ি বছর আগের কথা….

নতুন সহস্রাব্দ আসতে তখনও এক বছর বাকি। ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে রিমুল সেন, চাকুরিজীবী পরিবার থেকে উঠে আসা স্বপন মিশ্র আর রঘুবীর চক্রবর্তী এবং নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা প্রান্তর দাসের যোগাযোগ হয়েছিল পবিত্রস্যারের কোচিংয়ে। রিমুল থাকে বন্ডেল রোডের প্রাসাদে। স্বপন আর রঘুবীর অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে। প্রান্তর থাকে বালিগঞ্জ স্টেশনের ওপারের রেল কোয়ার্টারে

প্রান্তরের বাবা মারা গিয়েছে। মা ছায়া দাস রেলের গ্রুপ ডি স্টাফ। ছায়া ছেলেকে বলত, “তুই লেখাপড়া করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হ”। সুইপারের ছেলে পরিচয়ে কেন বাঁচবি দেখিয়ে দে, আমরা কারও থেকে কম যাই না!”

মেডিক্যাল এন্ট্রান্সের কোচিংয়ের জন্যে পবিত্রস্যারের কাছে প্রান্তরকে পড়তে পাঠায় ছায়াই।

এই ঘটনার দু’বছর পরে সরল আর জোনাকি জানতে পারলেন যে আইসক্রিম কোম্পানির ভাবী মালকিন রিমুলের সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়া হয়েছে রেলের গ্রুপ ডি স্টাফের ছেলে প্রাভরের।

তারপরেই সেই বিশ্রী ঘটনাটা ঘটে। তছনছ হয়ে যায় প্রাপ্তরের জীবন।

স্বপনের চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল সরলের প্রশ্নে, “ইন্ডিয়ায় হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হয়?” স্বপন মৃদু হেসে বললেন, “ভারতবর্ষ হল কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্টের হাব। আমাদের দেশে মেডিক্যাল টুরিজমের বাড়বাড়ন্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হল কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট। সাহেব-মেম ছাড়া আমাদের দেশের লোকজনও এই অপারেশন করান। মুম্বই, চেন্নাই, ভেলোর, বেঙ্গালুরু, দিল্লি… সব জায়গায় এখন এই অপারেশন হয়।

“এটা কি মেজর অপারেশন?”

“অবশ্যই। পেশেন্টকে অজ্ঞান করার পরে তাকে ‘হার্ট-লাং মেশিন’- এর সঙ্গে কানেক্ট করা হয়। হার্ট বদল যতক্ষণ ধরে ঘটে ততক্ষণ ওই মেশিন পেশেন্টকে বাঁচিয়ে রাখে। পেশেন্টের বুক চিরে, হাড় সরিয়ে হার্টে পৌঁছতে হয়। একে মেজর অপারেশন না বললে কাকে বলব? সিস্টার এবং ডাক্তার মিলে তৈরি একাধিক টিম একসঙ্গে কাজ করে এই অপারেশনের জন্যে।

এখনও-কখনও বারো ঘন্টা লেগে যায় অপারেশন করতে।

ময়দানবের যজ্ঞের কথা শুনে কিছুক্ষণ ভাবলেন সরল। জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের এখানে ওই অপারেশনটা হয়?”

“আমাদের এখানে ম্যানপাওয়ার থাকলেও ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই। এখানে করা যাবে না। এই অপারেশনের ক্ষেত্রে অন্য একটা সমস্যাও আছে। সেটা ডোনার পাওয়া নিয়ে।”

“ডোনার মানে। যার শরীর থেকে হার্ট নেওয়া হবে।”

“হ্যাঁ। যেভাবে মৃত মানুষের শরীর থেকে কর্নিয়া নেওয়া হয়, সেভাবেই নেওয়া হয় অন্যান্য অঙ্গ। আপনার মেয়ের ক্ষেত্রে একটা মুশকিল আছে। ওর ব্লাড গ্রুপ এবি পঙ্কিটিভ। এটা রেয়ার ব্লাড গ্রুপ। দাতা আর গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ না মিললে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা যায় না। আমি ওয়েবসাইট চেক করে দেখেছি। এবি পজিটিভ গ্রুপের কোনও হার্ট পটনা, বিহার বা ঝাড়খণ্ডে নেই। এমনকী আন্তঃরাজ্য পুলেও নেই।”

“আন্তঃরাজ্য পুলটা কী জিনিস?”

স্বপন আড়চোখে মোবাইলের দিকে তাকালেন। রাত একটা দশ। এখনও বাড়ি ফেরা হল না। বাড়ির কথা ভুলে স্বপন বললেন, “ অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে সামাজিক সচেতনতা আমাদের দেশে বাড়ছে। মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার অনেকেই করে থাকেন। ফলে অর্গ্যান পাওয়া আগের চেয়ে সুলভ হয়েছে। ইন্টারনেটের কারণে কোন রাজ্যে কোন ব্লাড গ্রুপের অর্গ্যান এই মুহূর্তে পাওয়া যেতে পারে, সেটা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে চেক করা যায়। ওটাই ইন্টারস্টেট পুল।”

সরল একবার জোনাকির দিকে তাকালেন। তারপর স্বপনকে বললেন, “আমরা রাজি।”

চেয়ার থেকে উঠে স্বপন বললেন, “তিন বছর আগে যদি কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্টে রাজি হতেন, তা হলেও আপনাদের মেয়েকে অপেক্ষা করতে হত। তখন ওর শরীর এত খারাপ ছিল না। এখন হার্টের জন্যে অপেক্ষা করতে গিয়ে কিছু একটা না হয়ে যায়?”

জোনাকি নিচু গলায় বললেন, “আমাদের ভুল হয়ে গিয়েছে ডক্টর।” স্বপন একটা কাগজ ওঁদের দিকে এগিয়ে বললেন, “আপনারা এই ফর্মটা পড়ে সই করে রাখুন।”

“কী এটা?” জিজ্ঞেস করলেন সরল।

“এটা কনসেন্ট ফর্ম। আপনারা যে মেয়ের অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্টে রাজি আছেন তার প্রমাণপত্র। এটাও লেখা আছে যে এই বাবদ আপনারা কোনও টাকা দিচ্ছেন না। এবং দাতার চিকিৎসার সব খরচ আপনারা বহন করবেন। দু’জনেই সই করুন। তারপরে আমি ডকুমেন্টটা স্ক্যান করে মোবাইল আর ডেস্কটপে রেখে দিই। হঠাৎ হাট পাওয়া গেলে আপনাদের সইয়ের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে না। কাজ এগিয়ে থাকবে।’

ফর্মে সই করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন সেন দম্পতি। কনসেন্ট ফর্ম স্ক্যান করে মোবাইলে আর ডেস্কটপে স্টোর করে রাখলেন স্বপন। চেম্বার থেকে বেরিয়ে সিথ্রি-র বেসমেন্টে এসে এসইউভি-তে চেপে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। মিলি নির্ঘাত জেগে বসে আছে।

স্বপনের স্ত্রী মিলির বয়স তেত্রিশ। বাপের বাড়ি সিঁথিতে। বিয়ের সময় মিলির বাবা-মা দু’জনেই জীবিত ছিলেন। স্বপন আর মিলির মেয়ে ঝিলিক যে-বছর হল, সেই বছরই নাতনির মুখ দেখে পরলোক গমন করলেন মিলির মা। স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে ভয়ানক ভেঙে পড়লেন মিলির বাবা। তিনি এখন শয্যাশায়ী। সিঁথির বাড়িতে একা থাকেন। কিন্তু পটনায় নিয়ে আসার প্রসঙ্গ তুললেই তীব্র প্রতিবাদ করেন। স্বপনের বাবা-মা অবশ্য সুস্থ।

স্বপনের বাড়ি বোরিং রোডে বোরিং রোড পটনার উচ্চবিত্তদের এলাকা। ভদ্র এবং অভিজাত। চোর-ডাকাত বা গুন্ডা-বদমাইশের ভয় নেই। কিন্তু সম্প্রতি বোরিং রোডে আজেবাজে ছেলের আনাগোনা বেড়েছে। তার কারণ হল স্বপনের পাঁচ বছরের মেয়ে ঝিলিক। ওকে দেখলেই অচেনা, বখাটে ছেলেরা খারাপ কথা বলে, অশালীন ইঙ্গিত করে, শিস দেয়। পাঁচ বছরের শিশুর উপরে এই মানসিক অত্যাচারের কারণ আছে।

পটনায় ‘রংদারি ট্যাক্স’ চালু আছে। এলাকার রাজনৈতিক নেতাকে নিয়মিত টাকা দিলে এলাকায় এবং পরিবারে শান্তি বজায় থাকে। টাকা না দিলে নানাভাবে জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়।

পার্টির নেতা একদিন দেখা করতে এসে দশ লাখ টাকার রসিদ কেটে স্বপনের হাতে ধরিয়েছিল। স্বপন রসিটা ছিঁড়ে নেতার হাতে ধরিয়ে দেন। নেতা কিছু না বলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে ঝামেলা শুরু হল।

ঝিলিকের স্কুল রাজেন্দ্রনগরে। স্কুলের বাস তাকে নিয়ে যায় এবং বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। বাসের হেল্লার এবং ড্রাইভার স্কুলে জানিয়েছিল যে একটি বাইক রোজ বাসের পিছু নিচ্ছে এবং ঝিলিকের নাম ধরে ডাকছে। স্বপন এবং মিলিকে খবরটা দেন ঝিলিকের স্কুলের প্রধান শিক্ষক। স্কুল এবং বাড়ির তরফে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।

পুলিশ কিছু করতে পারেনি। কারণ বাইকগুলো নিয়মিত বদলে যায়। ছেলেগুলোও বদলে যায়। কোনও বাইকে নম্বর প্লেট থাকে না। এবং ছেলেগুলো রোজ আসে না। আসার কোনও নির্দিষ্ট সময়ও নেই। কখনও মাঝরাতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কখনও স্কুলবাসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ঝিলিকের নাম ধরে ডেকে খারাপ কথা বলে গলিতে ঢুকে যায়। কখনও স্বপনের এসইউভি-র পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুই হাতে অশালীন ইঙ্গিত করে।

সমাধান একটাই। পটনা ছাড়তে হবে এবং কলকাতায় ফিরতে হবে। বাবাকে নিজের কাছে রাখলে মিলি শান্তি পাবে। ঝিলিককে নিয়ে দুশ্চিন্তা চলে যাবে। সিথ্রি-র মালিক মেহুল সাহাকে স্বপন বলেছেন কলকাতা ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার করে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু ওখানে রয়েছেন স্বপনের বাল্যবন্ধু রঘুবীর সে এই মুহূর্তে কলকাতার এক নম্বর কার্ডিওথোরাসিক সার্জন।

বাড়ি এসে গিয়েছে। এসইউভি গ্যারাজে ঢোকানোর সময়ে স্বপনের মাথায় অন্য চিন্তা এল। একদিকে যেমন সেন পরিবারের কেউ জানেন না যে স্বপন কুড়ি বছর আগে থেকে তাঁদের চেনেন, তেমনই রঘুবীরকে স্বপন বলেননি যে রিমুল এখন তাঁর পেশেন্ট। এবং সেন পরিবার পটনায় থাকেন।

স্বপন যখন বাড়ি ঢুকলেন, তখন রাত দেড়টা। ঠিক সেই সময়, সিথ্রি- র প্রাইভেট কেবিনে শুয়ে অক্সিজেন মাস্ক থেকে বেঁচে থাকার রসদ টেনে নিচ্ছে রিমুল তার রোগা, ফ্যাকাসে চেহারা দেখে বোঝা অসম্ভব যে কিছুদিন আগেও সে পুতুলের মতো সুন্দরী ছিল। জানলার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রয়েছে বিপুল। অক্সিজেন মাস্ক পরা, ক্রমাগত হাঁপাতে থাকা, ক্রমাগত ফ্যাকাসে হতে থাকা, ক্রমাগত মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকা ওই বুড়িটা কি রিমুল? দু’ দশকের মধ্যে তার এই অবস্থা হল কেন?

সব হয়েছে প্রান্তরের জন্যে। সে যদি প্রান্তরের প্রেমে হাবুডুবু না খেত, তা হলে বাবা-মা তার বিয়ে দিত পালটি ঘরে, পয়সাওয়ালা পরিবারে। রিমুল কলকাতাতেই থেকে যেত। হয়তো তার না-হওয়া-বর এখন ‘ইয়ামি’ সামলাত। হয়তো রিমুলের একটা বা দুটো বাচ্চা হত। হয়তো সেই না-হওয়া- বর সরল আর জোনাকিকে বুঝিয়ে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করিয়ে ফেলত অনেক আগেই। তা হলে রিমুল এখন ভরপুর সংসারী। না-হওয়া ছেলেমেয়ে সামলাতে দিন চলে যায়। না-হওয়া-বর অফিস থেকে ফিরে আসার আগেই রিমুল স্নান সেরে সেজেগুজে রেডি হয়ে থাকে। না-হওয়া বরের পাশে বসে চা খায়। তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়ে না-হওয়া সংসার নিয়ে।

আলো ফুটে ওঠে রিমুলের মুখে। এত না-হওয়া নিয়ে সে কী করবে? তার একটা প্রেম হয়েছিল। আলো-বাতাসের মতো, নুড়িপাথরের মতো, নদী-পাহাড়ের মতো স্বাভাবিক একটা প্রেম। সেই প্রেম পূর্ণতা পায়নি তো কী হয়েছে? সব প্রেম কি পূর্ণতা পায়।

রিমুল আজও প্রান্তরকে ভালবাসে। প্রথম যেদিন পবিত্রস্যারের কোচিং ক্লাসে বুঝতে পেরেছিল সেই অলৌকিক ভালবাসার কথা, সেদিন যেমন উত্তেজনা হয়েছিল, আজও সেই উত্তেজনা হয় প্রান্তরের কথা ভাবলে।

প্রান্তর কোথায়! জানে না রিমুল। বালিগঞ্জের স্টেশনের ওপারের রেল কোয়ার্টারে আর থাকে না। সেই জমানায় প্রান্তরের ল্যান্ডলাইন ছিল না। পরবর্তীকালে ওর মোবাইল নম্বর, সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল বা ইমেল আইডি হয়ে থাকলেও সেগুলো খুঁজে পায়নি রিমুল। প্রান্তর শুধু রিমূলের জীবন থেকেই হারিয়ে যায়নি, মিলিয়ে গিয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে কুড়ি বছর আগে ঠিক কী হয়েছিল, বাবার কাছ থেকে কখনওই জানতে পারেনি রিমুল। জানতে পারেনি প্রাপ্তর কোথায় ও কি আদৌ বেঁচে আছে?

হাঁপের টান বাড়ছে। শরীর চাইছে আরও প্রাণদায়ী বাতাস। কলিং বেল টিপে সিস্টারকে ডাকতে গিয়ে নিজেকে আটকাল রিমুল। থাক না। পরবর্তী পাঁচ মিনিট শরীরে কম অক্সিজেন ঢুকলে যদি সে মরে যায়, তা হলে তো ভালই। প্রান্তরের সঙ্গে ঠিক দেখা হয়ে যাবে।

মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল রিমূল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *