।। সাত।।
২০ মে রাত দুটো থেকে ২০ মে দুপুর তিনটে দশ
.
রাত দুটোর সময়ে ট্যাঁও ট্যাঁও আওয়াজ করে কলকাতার রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে একটি অ্যাম্বুল্যান্স। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস থেকে ভি আই পি রোড হয়ে চলে এল দমদম বিমানবন্দরে। এয়ারপোর্টের আড়াই নম্বর গেট পেরলেই সামনে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে। মাঝরাতের ফাঁকা, কালো এক্সপ্রেসওরে দেখে অ্যাম্বুল্যান্স চালক প্রান্তরের মনে হচ্ছে সামনে পা রয়েছে রিমুলের চুলের ফিতে, চুল বাঁধার সময় যেটা আঙুলের ফাঁক থেকে ফসকে গিয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে কলকাতা শহর জুড়ে।
দক্ষিণেশ্বর, বিবেকানন্দ সেতু, ডানকুনি টোল প্লাজা। টোল ট্যাক্স মিটিয়ে প্রান্তর ন্যাশনাল হাইওয়ে উনিশ ধরল। মাঝরাতে রাস্তা কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে ষোলো আর বত্রিশ চাকার কন্টেনার, ট্রাক, লরি। অনেকগুলো টু হুইলার হুশহাশ করে চলে গেল, যেগুলোর দাম কয়েক লাখ টাকা বাইক আরোহী বা পিলিয়ন রাইডার, কেউ হেলমেট পরেনি। এসব হল কম বয়সের পাগলামো। গতির নেশা। ডিভাইডারে টোকা লাগলেই ছিটকে পড়বে রাস্তার ধারে। ভগবানও বাঁচাতে পারবে না। প্রাপ্তরও এক সময় যুবক ছিল। কই, তার তো এই রকম পাগলামি করার কথা কখনও মনে হয়নি। পাশে রিমুল ছিল বলে।
রিমুল আর ক’দিন পাশে ছিল? সাকুল্যে দু’বছর। ওই দু’টি বছর প্রান্তরের জীবনকে এতটাই বদলে দিয়েছিল যে বাকি জীবনে সে অন্য কোনও মেয়ের দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকায়নি। তার রিমুল আছে। পাশে না থাক। বুকের মধ্যে তো আছে।
রাস্তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছে প্রান্তর। ডানহাতে স্টিয়ারিং, বাঁহাত গিয়ারের উপরে রাখা। এক পারে ক্লাচ। অন্য পা কখনও ব্রেকে কখনও অ্যাক্সিলেটরে। মে মাসের গরমে তেতেপুড়ে যাচ্ছে চারদিক। প্রান্তর বসে রয়েছে এসির মধ্যে। তার গরম লাগছে না। অ্যাম্বুল্যান্সের পাশ দিয়ে ছুটে চলে যাওয়া গাড়ির আলোয় কখনও উদ্ভাসিত হচ্ছে তার মুখ, কখনও অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। শরীর বর্তমানে থাকলেও মন ঘুরে বেড়াচ্ছে কুড়ি বছর আগের এক লোডশেডিংয়ের সন্ধেবেলায়, যেদিন রিমুলের সঙ্গে দ্বিতীয় মোলাকাত হয়েছিল…
*
পরের শুক্রবার একটু আগেই পবিত্র স্যারের কাছে পড়তে চলে গিয়েছিল প্রান্তর। তখনও আগের ব্যাচের পড়া শেষ হয়নি। প্রান্তরের ব্যাচের ছেলেমেয়েরাও আসেনি। ভাঙাচোরা সাইকেল স্ট্যান্ড করে, উদগ্রীব হয়ে রিমুলের আসার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল প্রান্তর।
রিমুল না এলেও স্বপন আর রঘুবীর সহ বাকি ন’জন ঠিক সময়ে চলে এল। প্রান্তরকে অপেক্ষা করতে দেখে তারা অবাক! রঘুবীর প্রান্তরের পেটে খোঁচা মেরে বলল, “কী ব্যাপার? নতুন মেয়েটাকে ঝাড়ি মারছিস না কি?”
“ধুত! কী যে বলিস না!” লজ্জায় প্রাপ্তরের কান লাল। রঘুবীর হাসতে-হাসতে বলল, “ঠিক ধরেছি। তুই শালা কেস খেয়েছিস।”
নিজের অপ্রস্তুত অবস্থা ঢাকতে রঘুবীরের ঘেঁটি ধরে এক ঝটকায় আকাশে তুলে ধরল প্রান্তর। আর ঠিক তখন দেখা গেল গোলাপি সাইকেল চালিয়ে গলিতে ঢুকল রিমূল। আজ সে পরেছে কচি কলা-পাতা রঙের সালোয়ার- কামিজ আর জলপাই সবুজ দোপাট্টা। কাঁধে কাঁচা হলুদ রঙের পাশঝোলা।
রিমুলকে দেখেই রঘুবীরকে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে প্রান্তর। পবিত্র স্যারের আগের ব্যাচটাও এই সময়েই ভাঙল। সেই ব্যাচের ছাত্ররা বেরতে না-বেরতেই রঘুবীর, স্বপন অ্যান্ড কোং দৌঁড়ে ঘরে ঢুকে পোজিশন নিয়েছে।
সবার শেষে ঢুকে প্রান্তর আর রিমুল দেখল তাদের বসার কোনও জায়গা নেই। ন’জন ছেলেমেয়ে মিলে টাইট একটা বৃত্ত বানিয়ে রেখেছে আর একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে। পবিত্র স্যার এখন নেই। গরম চা খেয়ে গলা ভেজাতে ভিতরে গিয়েছেন।
রঘুবীর আর স্বপনের কাঁধে হাত রেখে এক ঝটকায় দু’জনকে পিছনে ঠেলে দিল প্রান্তর। বাকিদের হুকুম করল, “একটু ছড়িয়ে বোস। না হলে সবাইকে ঘাড় ধরে সরিয়ে দেব।”
অত বড় চেহারার ছেলের শাসানি শুনে বাকিরা পিছন দিকে সরে বসল। এখন মাদুরের উপরে অনেক জায়গা। প্রান্তর আর রিমুল পাশাপাশি বসল। পবিত্র স্যার ঘরে ঢুকে বলল, “আজ যৌন আর অযৌন জনন পড়ানো হবে। হ্যাঁ রে প্রান্তর, স্পাইরোগাইরা কীভাবে রিপ্রোডাকশন করে?”
“যৌন জনন স্যার,” উত্তর দিয়েছিল প্রান্তর।
“যে উত্তর দিতে পারবে না তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ে গেল। এবার যারা পারবে তাদের জিজ্ঞেস করা যাক। রঘুবীর না স্বপন, কে বলবি?”
“বোধ সেক্সুয়াল অ্যান্ড অ্যাসেক্সুয়াল স্যার?” দু’জনে একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে। অপমানিত প্রাপ্তর মাথা নিচু করে বসে থাকে। একটু পরে খেয়াল করে, রিমুলের হাত সবার নজর এড়িয়ে তার পিঠ ছুঁয়ে গেল। যেন ভরসা দিল, ‘না জানাদের দলে আমি তো আছি।”
সেদিন কোচিং-এর পরে সবাই দুদাড়িয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। অন্ধকারে বোগেনভেলিয়ার তোরণের তলা দিয়ে বেরিয়ে প্রান্তরের কালো আর রিমুলের গোলাপি সাইকেল এলোমেলো ঘোরাঘুরি করতে লাগল কলকাতার রাস্তায়। একটা সময়ে তারা চলে এল আয়রন সাইড রোডে। এখানে ফ্ল্যাট কম, বসতবাড়ি বেশি। গাড়ি কম চলে। ফুটপাথে হকারের উপদ্রব নেই। প্রান্তর দেখল একজন আইসক্রিমওয়ালা ‘ইয়ামি’ কোম্পানির গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার কাছ থেকে দুটো ভ্যানিলা ফ্লেভার্ড কাঠি আইসক্রিম কিনে একটা রিমুলের হাতে ধরিয়ে প্রান্তর বলল, “গত সপ্তাহে একদম লেখাপড়া হয়নি। কী যে হবে, বুঝতে পারছি না।”
প্রান্তরের এই মন্তব্যের পিছনে একটা ছক আছে। ওই কথার পরিপ্রেক্ষিতে রিমুল তাকে জিজ্ঞেস করবে, ‘কেন লেখাপড়া হয়নি।’ তা-না-না-না করে প্রান্তর বলবে, ‘সারা সপ্তাহ মনে হচ্ছিল আবার কবে তোর সঙ্গে দেখা হবে। তারপর কথা যেদিকে গড়াবে, প্রান্তরও সেই দিকে যাবে।
প্রান্তরের ছক তছনছ করে দিয়ে, ভ্যানিলা আইসক্রিমে জিভ বুলিয়ে রিমুল বলল, “আমিও গত সাতদিন লেখাপড়া করিনি।’
“কেন?” যে প্রশ্নটা রিমুলের করার কথা, সেইটা প্রান্তর করে ফেলল।
“তোর কথা খুব মনে হচ্ছিল। আমি বোধ হয় তোর প্রেমে পড়ে গিয়েছি।” দু’টি মাত্র বাক্য। বারোটি শব্দ। কিন্তু এই বারো শব্দের অভিঘাত টেকটনিক প্লেট বারোবার সরে যাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি। একশো বারোবার বিগ ব্যাং হলেও অত তীব্র ইমপ্যাক্ট হয় না। বারো হাজার আগ্নেয়গিরির উদগিরণেও অত লাভা নিঃসৃত হয় না। প্রাপ্তরের হাতের কাঠি আইসক্রিমের ভ্যানিলা ফ্লেভার মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে, চ্যাটচেটে ক্রিম গড়িয়ে পড়ছে আঙুল বেয়ে। প্রান্তর অবাক হয়ে রিমূলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
নিজের আইসক্রিম শেষ করে প্রান্তরের হাত থেকে গলে যাওয়া আইসক্রিম নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে রিমুল বলল, “আর খেতে হবে না।”
প্রাপ্তর আঁতকে বলল, “আইসক্রিমটা ফেলে দিলি। আমি খেয়ে নিতাম।”
রিমুল ঠোঁট মুচড়ে বলল, “ভ্যানিলা ফ্লেভার খেতে আমার জঘনা লাগে।”
“তুই নিজের কোম্পানির আইসক্রিমের নিন্দে করছিস!”
“আমার না। আমার বাবা-মায়ের আইসক্রিম কোম্পানি। অথচ ওরা আমাকে ডাক্তার বানাতে চায়। কী মুশকিল বল তো!”
ডাক্তারি বা মোক্তারি এখন প্রান্তরের মাথায় নেই। রাস্তার ধারে কালো সাইকেল দাঁড় করিয়ে প্রান্তর ম্লান হেসে বলল, “তুই আমার প্রেমে পড়েছিস। পাগল না পাজামা। আমি থাকি রেল কোয়ার্টারে। আমার মা রেলের গ্রুপ ডি স্টাফ।”
“তো!”
“রিমুলের ‘তো’ শুনে ভরসা পেয়ে প্রান্তর বলল, “মা অবশ্য বলে যে আমাকে সংসার নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি যেন লেখাপড়া চালিয়ে যাই।”
“কাকিমা ঠিকই তো বলেন,” আয়রন সাইড রোড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে গোলাপি সাইকেল।
কালো সাইকেল বলল, “আমাকে তুই ভুলে যা বিমূল। আমিও তোকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করব। এটা ঠিক না।”
গোলাপি সাইকেল ফিক করে হেসে বলল, “তুই আমাকে ভুলে যাবি কি যাবি না, সেটা তুই আর তোর মনের ব্যাপার। ও ব্যাপারে আমার নাক গলানো উচিত নয়। একই ভাবে আমি তোকে ভুলে যাব কি না সেটা আমার আর আমার মনের ব্যাপার। সেই বিষয়ে তোর নাক গলানো উচিত নয়।”
“আমি তা হলে কী করব? তুই বলে দে।
“সামনের শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারব না। কাল বিকেলে দেখা করি? বালিগঞ্জ স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে?”
বোকার মতো ঘাড় নাডল কালো সাইকেল, “ঠিক আছে।”
গোলাপি সাইকেল বলল, “আজ থেকে আয়রন সাইড রোডের নাম ‘মল্লিকাবন’।”
“কেন?” কালো সাইকেল অবাক!
“কেন না, এইখানেই আমার প্রথম কুঁড়ি ধরেছে।” খিলখিল করে হাসছে গোলাপি সাইকেল। প্রজাপতির মতো উড়ে গেল সাইকেল আর কালো সাইকেল দাঁড়িয়ে রইল ভ্যাবা গঙ্গারামের মতো। আয়রন সাইড রোড থেকে বেরিয়ে কোয়ার্টারে না ফিরে অলিগলিতে ঘুরপাক খেতে লাগল।
প্রান্তর পরিষ্কার বুঝতে পারছে, সে প্রেমে পড়েছে। সে বুঝতে পারছে প্রেমে ‘পড়া’-র কথা কেন বলা হয়। এ এক অমোঘ পতন ছাড়া কিছু নয়। মাধ্যাকর্ষণের টান যেমন সত্য, তেমনই সত্য প্রেমের টান।
উপায়হীন প্রান্তর ঘুরতে লাগল কলকাতা শহরের ভিড়ের মধ্যে। রাত ন টার সময়ে অফিসের কাজ আর রোজের বাজার সেরে বাড়ি ফিরে ছায়া দেখলেন কোয়ার্টারের দরজা না খুলে বাইরের দালানে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে রয়েছে প্রান্তর।
ছায়া অবাক হয়ে বললেন, “কী রে, কী হয়েছে। কেউ কিছু বলেছে? আলো জ্বালাসনি কেন? পড়তে বসিসনি? শরীর খারাপ?”
এতগুলো প্রশ্ন। একটারও উত্তর না দিয়ে প্রান্তর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।
*
উলটোদিকের লেনে বিকট জোরে শব্দ হতে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরল প্রান্তর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একটা ষোলো ঢাকার ট্রাক ডিভাইডারের উপরে উঠে এইদিকের লেনে চলে এসেছে। ড্রাইভার ব্রেক কমেছে, কিন্তু ট্রাক এত জোরে আসছিল যে ব্রেক কাজ শুরু করার আগেই ট্রাকের অর্ধেক ডিভাইডারের ওদিকে আর বাকি অর্ধেক এদিকে।
দ্রুত জায়গাটা পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে প্রান্তর। অ্যাক্সিডেন্টটা তিরিশ সেকেন্ড আগে ঘটলেই সে আটকে পড়ত। তার পিছনে, দুই লেনে যে ট্রাফিক জ্যাম শুরু হল, তা কাটাতে অনেক ঘণ্টা সময় লাগবে। স্থানীয় মানুষ কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকে খবর দেবে। তিনি খবর দেবেন ট্রাফিক আউটপোস্টে। সেখান থেকে লোকজন এসে ক্রেন দিয়ে ডায়নোসরের মতো ট্রাক সরাতে সরাতে দুপুর হয়ে যাবে।
বর্ধমান পেরিয়ে গেল। পেরিয়ে গেল আসানসোল। চলে এল ধানবাদ। সকাল হয়ে গিয়েছে। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হু হু করে চলছে আপৎকালীন যান।
ঝাড়খণ্ডের বাগোদরে পৌঁছে পেট্রল পাম্পে গিয়ে ট্যাঙ্কি ফুল করল প্রান্তর। একটা ধাবায় অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড় করিয়ে বাথরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এক ভাঁড় চা আর একটা পাউরুটি খেতে-খেতে ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারল, বাগোদর থেকে পটনা যাওয়ার একাধিক রাস্তা আছে। সবচেয়ে কম সময়ে পটনা পৌঁছনো যাবে ন্যাশনাল হাইওয়ে বাইশ ধরলে।
আবার গাড়িতে উঠে স্টিয়ারিং ধরল প্রান্তর। একটানা গাড়ি চালিয়ে দুপুর আড়াইটে নাগাদ পটনার মিঠাপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জেনে নিল সিগ্রি কোন দিকে ১৩ ঘণ্টায় ৫৮০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ২০ মে দুপুর তিনটে বাজতে দশে সিপ্পিতে অ্যাম্বুল্যান্স ঢোকাল। গাড়ি থেকে নেমে দেখল, সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বপন।
প্রাপ্তরকে দেখে স্বপনের মুখে কোনও অভিব্যক্তি ফুটে ওঠেনি। প্রান্তর কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারল না। সে বলল, “স্যার আপনাকে তো চেনাই যাচ্ছে না।”
“সেটা তো ভাল কথা!” শ্রাগ করলেন স্বপন, “বাই দ্য ওয়ে, আমাদের হাতে একদম সময় নেই। তুমি কিছু খেয়েছ?”
“এক ভাঁড় চা আর একটা পাউরুটি।”
“দশ মিনিটের মধ্যে ক্যান্টিনে খেয়ে নাও। পরে আর সময় পাওয়া যাবে না। আমি ততক্ষণে পেশেন্টকে অ্যাম্বুল্যান্সে শিট করার ব্যবস্থা করছি।”
এই রকম একটা পরিস্থতি তৈরি হবে, এটা প্রান্তর আঁচ করেছিল। রিমুল একবার অ্যাম্বুল্যান্সে উঠে গেলে আর ওর সঙ্গে একলা দেখা হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে না। তখন সঙ্গে সরল বা জোনাকি সঙ্গে থাকবেন। রিমুলের সঙ্গে একা দেখা করার একটাই উপায়। এক্ষুনি কেবিনে যাওয়া।
প্রান্তর বলল, “খাওয়া পরে। আগে আমি পেশেন্টের অবস্থা দেখতে চাই। গাড়ি সেই মতো রেডি করতে হবে।”
স্বপন এক মুহূর্তের একটু বেশি সময়ের জন্যে প্রান্তরের দিকে তাকালেন। মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “চারতলায় চারশো এক নম্বর কেবিন। লিফ্ট দিয়ে উঠেই একদম সামনের দরজা।
প্রান্তর লিফটে উঠে বোতাম টিপে চুলটা আঙুল দিয়ে আঁচড়ে নিল। আজ দাড়ি কামানো হয়নি।
লিফ্ট থেকে বেরিয়ে চারশো একের দরজা খুলে কেবিনের ভিতরে ঢুকল প্রাপ্তর। দেখল বেডে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে শোয়ানো রয়েছে রিমূলকে। মুখে অক্সিজেনের নল, হাতে আইভি চ্যানেল। শরীরময় অজস্র তার আর নল সাপের মতো পেঁচিয়ে রয়েছে।
আর রিমুল দেখল, দরজা খুলে ঢুকছে তার প্রেম। কুড়ি বছর আগে যার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। সে যে বেঁচে আছে, এটাই জানত না রিমুল আজ যখন সে মরতে বসেছে, তখন প্রেম এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।
প্রেম কাকে বলে? কাকে বলে ভালবাসা? দু’জন মানুষ কেন পরস্পরের কাছে আসতে চায়? একে অপরের সারা জীবনের সঙ্গী হতে চেয়ে কেন দুঃখ ভোগ করে? আর, সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, এই অলৌকিক অনুভব যুগযুগান্ত ধরে ঘটে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যাচ্ছে, মানু আবিষ্কার করছে আগুন ও লোহা, ঢাকা ও টাকা। নতুন-নতুন রাষ্ট্র তৈরি হচ্ছে, পুরনো রাষ্ট্র ভেঙে ছারখার হয়ে যাচ্ছে, দাসপ্রথার বিলোপ ঘটছে, শিল্প বিপ্লব আসছে, আসছে কমিউনিস্ট রেজিম। মানুষ চাঁদে পা রাখছে, চলচ্চিত্র আবিষ্কার হচ্ছে। সংবাদপত্র ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশে, নতুন প্রযুক্তি আসার কারণে খবরের কাগজ উঠেও যাচ্ছে। আসছে বিশ্বায়ন, আসছে সোশ্যাল মিডিয়া, আসছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। মানুষ চাঁদে জমি কিনছে। মানুষ আকাশে কৃত্রিম চাঁদ পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রেম? সে থেকেই যাচ্ছে। থেকে যাচ্ছে অলৌকিক অনুভব।
কেন? জানে না রিমুল।
প্রান্তর রিমুলের পাশে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে তার হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, “কেমন আছিস?”
রিমুল ফ্যাকাসে হেসে বলল, “এতদিন খুব খারাপ ছিলাম। এখন ভাল আছি। তুই বিয়ে করেছিস?”
হেসে ফেলেছে প্রাপ্তর। অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে, উপচে আসা কান্না চেপে বলছে, “না। আমার মতো অপোগন্ডকে কে আর বিয়ে করবে। একা আছি। দিব্যি আছি।”
“আমিও বিয়ে করিনি, জানিস?” উত্তেজিত হয়ে উঠে বসতে চাইছে রিমুল বাবা-মা আমাকে জোর করে পটনায় নিয়ে এসেছিল। তুই জানতিস “
প্রান্তরের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। হাতের ইশারায় সে বোঝাল, “চুপ!”
রিমুল চুপ করে গেল। কেবিনে ঢুকেছেন সরল আর স্বপন। স্বপন জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি সব দেখে নিয়েছ তো? তোমার ভরসাতেই বাই রোড কলকাতা যাওয়া।”
সরল ভুরু কুঁচকে প্রান্তরকে দেখছিলেন। বেশ জোরে বললেন, সেই স্কাউলেটা না? যে আমার মেয়ের পিছনে লাগত? এ কোথা থেকে এলা
স্বপন বিরক্ত হয়ে বললেন, “ইনি সিথ্রি কলকাতা ব্রাঞ্চের অ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার। আপনি এইভাবে কথা বলছেন কেন?”
জোনাকিও চলে এসেছেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে সরল বললেন, “এই লোকটাকে চিনতে পারছ? এর নাম কী ছিল যেন? যে আমাদের মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছিল। যার জন্যে আমরা কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম।”
জোনাকি অবাক হয়ে প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “খুব মনে আছে। পলাশ দাস না প্রতীক মণ্ডল, কী যেন নাম তোমার?”
প্রান্তর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপমানে কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। কিন্তু চুপ করে থাকা ছাড়া তার উপায় নেই।
সরল রাগত দৃষ্টিতে স্বপনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই ইডিয়টা অ্যাম্বুল্যান্স চালালে আমি মেয়েকে পাঠাব না।”
স্বপন হঠাৎই ভীষণ নম্র হয়ে গেলেন। মোলায়েম গলায় বললেন, “ঠিক আছে। আমি তা হলে কলকাতায় ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি। এই হার্ট অন্য রেসিপিয়েন্ট পাবে। আপনাদের মেয়ে এখানেই ভর্তি থাকুক। আপনারা চাইলে বাড়িও নিয়ে যেতে পারেন।”
সরল বললেন, “আমি ড্রাইভার দিচ্ছি। মাই ড্রাইভার উইল বি মোর এফিসিয়েন্ট।’
স্বপন রেগে গিয়ে নম্রতর হয়ে গিয়েছেন, “কার্ডিয়োলজিক্যাল ইকুইপমেন্ট নিয়ে প্রাপ্তর রেগুলার ডিল করে। এই অ্যাম্বুল্যান্সটা ও চালালে রাস্তায় আপনার মেয়ের কোনও ইমার্জেন্সি হলে সেটা সামলানো যাবে। আপনার ‘এফিসিয়েন্ট’ ড্রাইভার সেটা পারলে তাকে ডেকে নিন। আমি প্রান্তরকে টেনে করে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
সরল ফুঁসছেন। জোনাকি স্বপনের হাত ধরে বললেন, “স্যার, প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমার হাজব্যান্ড মেয়ের ব্যাপারে খুব সেনসিটিভ…”
“সেটা গত তিন বছর ধরে দেখছি।”
সরল ও জোনাকি মাথা নিচু করে অপমানটা হজম করলেন। অবশেষে জোনাকি বললেন, “আপনি যখন অ্যাম্বুল্যান্সে রিমুলের সঙ্গে যাচ্ছেন, তখন চিন্তা নেই। আমার হাজব্যান্ডও থাকবেন। চলুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“আপনি যাবেন না?”
“আমার যাওয়া উচিত ছিল,” বললেন জোনাকি, “মেয়েলি সমস্যায় আপনারা সাহায্য করতে পারবেন না। তবে রিমুলের ক্যাথিটার করা আছে। ডায়াপারও পরানো আছে। ও সলিড ফুড খাচ্ছেও না যে টয়লেটের সমস্যা হবে। আর মাত্র বারো-তেরো ঘণ্টার তো মামলা। অসুবিধে হবে না।”
“তাও…” বললেন স্বপন।
“হাঁটুর ব্যথা সামলে আমি বারো ঘণ্টা অ্যাম্বুল্যান্সে বসে থাকতে পারব না। আমি বাই এয়ার আসছি। আপনি রিমুলকে নিয়ে ভাবুন।”
প্রান্তর দৌড়ে কেবিন থেকে বেরিয়েছে। একতলায় নেমে অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা খুলে বের করেছে স্ট্রেচার-কাম-টলি-কাম-হুইলচেয়ার। সেটা নিয়ে চলে এসেছে চারশো এক নম্বর কেবিনে। অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় রিমুলের শরীর থেকে যাবতীয় যন্ত্রপাতি এবং তার খুলে, তাকে চেয়ারে বসিয়ে নেমে এসেছে একতলায়। সরল, জোনাকি আর স্বপন নীচে এসে দেখলেন, রিমুল অ্যাম্বুল্যান্সের মধ্যে ঠিক সেইভাবে শুয়ে আছে, যেভাবে সে একটু আগে কেবিনে ছিল। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে। ধীর, স্থির, শ্বাসকষ্টবিহীন। নাকে অক্সিজেনের নল, হাতের আইভি চ্যানেলে ফ্লুইড, শরীরময় কার্ডিয়াক মনিটরের তার। স্বপন রিমুলের পাশের আসনে বসলেন।
সরল শ্লেষের সঙ্গে রিমুলকে বললেন, “আমাকে একটা ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ দে। সেদিন তোকে কলকাতা থেকে তুলে না আনলে ড্রাইভারের বউ হয়ে জীবন কাটাতে হত,” তারপর জোনাকির হাতে নিজের মোবাইল দিয়ে বললেন,
এতে সমানে ব্যবসার ফোন আসবে। এটা তোমার কাছে রাখো।”
“আমার মোবাইলটা নাও,” বললেন জোনাকি।
“দরকার নেই, “ অ্যাম্বুল্যান্সে উঠে সরল বললেন, “ডক্টর মিশ্রর মোবাইলে ফোন করলেই আমাকে পাবে। আমি এখন অন্য কারও ফোন ধরতে চাই না। এখন আমার একমাত্র প্রায়োরিটি হল রিমুল।”
“আমারও!” চালকের আসনে বসে নিজেকে বলল প্রান্তর। অ্যাম্বুল্যান্সে স্টার্ট দিয়ে সময় দেখল। দুপুর তিনটে দশ। স্বপন মোবাইলে মেহুলের সঙ্গে কথা বলছেন।
