॥ ষোলো।।
২১ মে সকাল দশটা পঁয়তাল্লিশ থেকে ২১ মে এগারোটা চল্লিশ
.
সকাল আটটা পঁয়ত্রিশে চেন্নাই বিমানবন্দর থেকে উড়াল দিয়েছিল ফ্লাইওয়ারের প্লেন। কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়েতে টাচ ডাউন করল সকাল দশটা পঁয়তাল্লিশে।
দু’ ঘন্টা দশ মিনিটের যাত্রাপথে চুপ করে বসেছিলেন পীযূষ। এয়ার হোস্টেস দীপিকা দু’বার এসে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করে গিয়েছে, তিনি কিছু খাবেন কি না। পীযূষ মিনারেল ওয়াটার নিয়েছেন। মনের মধ্যে একটাই চিন্তা ঘুরঘুর করছে। ঠিক সময়ে পৌঁছনো যাবে তো?
পরিচিত ঝাঁকুনি টের পেতেই পীযূষ বুঝলেন বিমানের ঢাকা রানওয়ে ছুঁয়েছে। গড়গড় করে প্লেন এগোচ্ছে। গতি কমে এক সময় দাঁড়িয়ে গেল। পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে শোনা যাচ্ছে বিমানবালার কন্ঠস্বর। যাত্রীরা সিট থেকে উঠে মোবাইল সুইচ অন করে কথা বলা শুরু করেছেন। মাথার উপরের লট থেকে বের করছেন হ্যান্ড লাগেজ।
এইসবের মধ্যে দীপিকা এসে পীযূষকে বলল, “আসুন স্যার। আপনি আগে নামবেন। তার পরে বিজনেস ক্লাসের যাত্রীরা,” একই ঘোষণা ভেসে এল পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে, পাইলটের গলা থেকে। সব যাত্রী নিজের কাজ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
পাশের আসন থেকে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন পীযূষ। বাক্সর ট্যাপ কাঁধে ঝুলিয়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। প্লেনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সিঁড়িতে পা রেখেছেন পীযূষ, এমন সময় পিছন থেকে দীপিকা বলল, “আমরা কিন্তু টিভিতে আপনাদের কাজের উপর নজর রাখব।”
“টিভিতে? দেখাচ্ছে নাকি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন পীযূষ। উত্তরের অপেক্ষা না করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন। সিঁড়ি যেখানে শেষ, সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি জিপ। তাতে বসে রয়েছে সি আই এস এফ-এর দুই জওয়ান এবং এয়ারপোর্টের একজন গ্রাউন্ড স্টাফ।
আবার সি আই এস এফং ঘাবড়ে গেলেন পীযূষ। পরমুহূর্তে দেখলেন এক জাওয়ান গাড়ি থেকে নেমে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স চাইছে।
জওয়ানের হাতে বাক্স তুলে দিয়ে জিপে উঠলেন পীযূষ। চালকের আসনে বসে থাকা জওয়ান ঝড়ের গতিতে জিপ চালিয়ে এয়ারপোর্ট বিল্ডিংয়ের দিকে যাচ্ছে। পিছন ফিরে পীযূষ দেখলেন, প্লেনের যাত্রীরা নামতে শুরু করেছেন।
জিপে বসে থাকা গ্রাউন্ড স্টাফ পীযূষের হাত থেকে টিকিট আর বোর্ডিং পাস নিয়ে এক পলক দেখে ফেরত দিয়ে দিল। পীযূষ বুঝালেন, ফর্মালিটি শেষ। এবার তাঁকে এয়ারপোর্টের বাইরে ছেড়ে দেওয়া হবে।
বুকপকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে সুইচ অন করলেন পীযূষ। মেহুলের সঙ্গে এক্ষুনি কথা বলতে হবে। আরও আগে মোবাইল অন করা উচিত ছিল তাঁর।
মেহুলকে ফোন করার আগেই পীযূষ দেখলেন জিপ এসে দাঁড়িয়েছে এয়ারপোর্টের গেটের বাইরে। সেখানে সিথ্রি-র লোগো আঁকা একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড়িয়ে রয়েছে। চালকের আসন থেকে নেমে তাঁর দিকে দৌড়ে আসছে রোগা আর লম্বা, মাঝবয়সি একটা লোক। পীযূষের কাছে এসে গলায় ঝোলানো আই কার্ড দেখিয়ে বলল, “আসুন স্যার?”
জিপ থেকে নেমে অ্যাম্বুল্যান্সের দিকে এগোচ্ছেন পীযূষ। লোকটা বলল, “আমার স্যার কাঠি বলে ডাকবেন।
“কাঠি” হেসে ফেলেছেন পীযূষ। তাঁর মনে পড়ে গেল, এর কথাই মেহুল তাঁকে ফোনে বলেছিলেন।
কাউকে যদি না বলেন তা হলে একটা কথা বলি। আমার চেহারার জন্যে এই বাজে নামটা মেহুল স্যার দিয়েছেন। আসুন স্যার,” অ্যাম্বুল্যান্সের চালকের পাশের আসন সংলগ্ন দরজা খুলে দিয়ে বলল কাঠি, “এই বাচ্চোটা পিছনে রাখবেন? না এখানেই থাকবে?
“আমার কাছে থাকবে,” সিটে বসে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স নিজের কোলে রেখে সিট বেল্ট বাঁধলেন পীযূষ। একই সঙ্গে খেয়াল করলেন খাকি উর্দি পরা, লম্বাচওড়া একজন মাঝবয়সি মানুষ তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। কাঠি সেন্ট্রাল লক খুলে পীযূষের দিকের জানলার কাচ নামিয়ে দিয়েছে। থাকি উর্দি জানলার কাছে এসে বললেন, “আমি সুধীর সেন, ডিসি ট্রাফিক।”
“নমস্কার,” সিট বেল্ট বাঁধা অবস্থায়, কোলে ঢাউস বাক্স নিয়ে হাতজোড় করার বার্থ চেষ্টা করছেন পীযূষ। সুধীর বললেন, “আমি গাড়ি নিয়ে আপনাদের পিছনে থাকব। সামনে থাকবেন বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের প্রধান সায়ন্তন মিত্র।”
উর্দি পরা, ঝকঝকে চেহারার এক যুবক পীযূষের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। পীযূও হাসলেন। সায়ন্তন বললেন, “আসুন, আমরা এগোই।”
সায়ন্তন একটা সাদা এস ইউ ভি-র চালকের আসনে বসে হুটার বাজিয়ে দিলেন, জ্বালিয়ে দিলেন বিকন। ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ করে সাদা গাড়ি এয়ারপোর্ট চতুর থেকে বেরচ্ছে। কাঠিও অ্যাম্বুল্যান্সে স্টার্ট দিয়ে সাদা গাড়ির পিছু নিয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্সের পিছনে আসছে ডিসি ট্রাফিকের কালো এস ইউ ভি। সেটাতেও বিকন জ্বলছে এবং হুটার বাজছে। স্বস্তির শ্বাস ফেলে মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকালেন পীযূষ। সকাল এগারোটা।
কাঠি খেয়াল করেছে যে পীযূষ ঘড়ি দেখছেন। সে বলল, “যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে একটা কথা বলি স্যার। আপনি চিন্তা করবেন না। মাত্তর আঠারো কিলোমিটার রাস্তা। আসার সময় সামান্য জ্যাম ছিল। এখন তো আগে-পিছে পুলিশ। হুশ করে উড়ে যাব।”
পীযূষ কথা বললেন না। এই লোকটা বড্ড বাজে বকে।
পীযূষের তরফ থেকে উত্তর না পেয়ে দমেনি কাঠি। সে বকবক করেই যাচ্ছে, “এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ভিআইপি রোড ধরব। বাগুইআটি, লেক টাউন, উলটোডাঙা, সায়েন্স সিটি হয়ে বাইপাস। ব্যস। হয়ে গেল। রুবির মোড় থেকে এটুস খানি রাস্তা। বাকিদের কী অবস্থা কে জানে!”
পীযূষ এইবার বাধ্য হলেন প্রশ্ন করতে, “কাদের কী অবস্থা?”
“আপনাকে মেহুল স্যার বলেননি?” আড়চোখে পীযূষের দিকে তাকিয়ে বলল কাঠি।
“আমি প্লেনে ছিলাম। মোবাইল সুইচড অফ ছিল।”
“কাউকে যদি না বলেন তা হলে একটা কথা বলি স্যার। যিনি সার্জারি করবেন, সেই রঘুবীর চকোত্তির মাথায় কাল রাত্তিরে ডান্ডার বাড়ি মারা হয়েছে। তাঁকে আই সি ইউ-তে ভর্তি করে সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। স্যালাইন, স্টিচ, ইঞ্জেকশন চলেছে। আমি যখন বেরচ্ছি, তখনও খুব দুর্বল। এদিকে টিভিতে সকাল থেকে দেখাচ্ছে, পূর্ব ভারতের প্রথম হার্টের অদল বদল সিথ্রিতে আজই হবে।”
পীযূষ এবার বুঝতে পারলেন, দীপিকা কেন বলেছিল, “আমরা কিন্তু টিভিতে আপনাদের কাজের উপরে নজর রাখব, “ টিভির প্রসঙ্গ এড়িয়ে তিনি বললেন, “ডক্টর চক্রবর্তী না পারলেও ডক্টর মিশ্র তো পটনা থেকে আসছেন। এটি করতে প্রবলেম হবে না।”
“যদি মাইন্ড না করেন, তা হলে বলি, আরও প্রবলেম আছে,” ব্রেক কষে বলল কাঠি।
বাগুইআটির মোড়ে সুপ্রতীমের সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে। সিগনাল সবুজ, কিন্তু একদল লোক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পতাকা আর পোস্টার নাড়াচ্ছে। পোস্টারে লেখা মানব মেননের মুক্তি চাই’, দাবির পাশে দাড়িওয়ালা একজন লোকের মুখ।
মানব মেনন কোন দলের নেতা? কোন প্রদেশের? চিনতে পারলেন না পীযূষ। এরা কেন এখন এখানে মানবের মুক্তি চেয়ে রাস্তা অবরোধ করছে, সেটাও বুঝতে পারলেন না। ওদিকে মন না দিয়ে কাঠির দিকে তাকিয়ে পীযূষ জিজ্ঞেস করলেন, “আর কী প্রবলেম?
“পেশেন্টকে নিয়ে যে অ্যাম্বুল্যান্স পটনা থেকে আসছে, সেটার দুবার টায়ার পাংচার হয়েছে। তারপর থেকে মোবাইলে আর ওদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।”
“তাই আবার হয় না কি” উত্তেজিত পীযূষ নিজের মোবাইল থেকে স্বপনের নম্বরে ফোন করলেন। ওপ্রাপ্ত থেকে যন্ত্রমানবী অনুভূতিহীন কণ্ঠে বলল, “দ্য পারসন ইউ আর ট্রায়িং টু রিচ ইজ্ আনঅ্যাভেলেবল?”
ধুস! ফোন কাটলেন পীযূষ। জানলার কাচ সামান্য নামিয়ে শুনলেন লোকগুলো বলছে, “মানব মেননকে মুক্তি দিতে হবে, দিতে হবে’, ‘মেননের অনৈতিক গ্রেফতার মানছি না, মানব না’।
ঘাবড়ে গিয়ে পীযূষ জিজ্ঞাসা করলেন, “গ্রিন করিডোরে এসব কেন? এই সময়ে তো রাস্তা ওয়ান ওয়ে থাকবে। কোথাও কোনও লাল সিগন্যাল থাকবে না।”
“আপনাদের ম্যাড্রাসে তাই হয়।” জিজ্ঞেস করল কাঠি।
পীযূষ বললেন, “শহরটার নাম এখন চেন্নাই। ওখানে তাই-ই হয়।”
“ক্যালকাটাও কলকাতা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখানে এই সব হয় না,” গাড়ি ফার্স্ট গিয়ার থেকে সেকেন্ড গিয়ারে তুলে বলল কাঠি। সাদা গাড়ি থেকে নেমে চারজন পুলিশ ডান্ডা নিয়ে বিক্ষোভকারীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। লোকগুলো ভয় না পেয়ে বুক পেতে দিচ্ছে লাঠির সামনে। এই গন্ডগোলের মধ্যেই সাদা গাড়ি পাশ কাটিয়ে বেরনোর চেষ্টা করছে।
অ্যাম্বুল্যান্সের পিছন থেকে ডিসি ট্রাফিকের কালো গাড়ি চলে গেল সামনে। সেখান থেকেও চারজন লোক নেমে ডান্ডা উচিয়ে তেড়ে গেল বিক্ষোভকারীদের দিকে। লোকগুলো এতক্ষণে ভয় পেয়ে পিছিয়েছে। সেই সুযোগে কাঠি বাগুইআটির মোড় পেরিয়ে গেল। সাদা এবং কালো গাড়ি চলে এসেছে পিছন পিছন। অ্যাম্বুল্যান্সের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাদা গাড়ির কাচ নামিয়ে সায়ন্তন বললেন, “আমাদের কাছে কোনও খবর ছিল না যে মানব মেননের মুক্তির দাবিতে এখানে আজ বিক্ষোভ হবে। আমার চারজন স্টাফকে ওখানে রেখে এলাম লোকগুলোকে কাস্টডিতে চালান করার জন্য।” পীযূষ কী আর বলেন! বোকার মতো থাম্স আপ করলেন। সায়ন্তন সাদা গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে গেলেন।
লেক টাউনের মোড়ে এসে আবার বিপত্তি। আবার একটা শোভাযাত্রা ভিআইপি রোডের এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। শোভাযাত্রার অংশগ্রহণকারীরা মহিলা এবং শিশু। কোনও এক বাবাজির বিরাট বড় ফোটো আর গোলাপি পতাকা নিয়ে হাঁটছে ওরা।
পীযূষ উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এখানকার লোকে কি গ্রিন করিডোরের মানে জানে না?”
কাঠি ইঞ্জিন বন্ধ করে বলল, “রবি ঠাকুর সেই করে বলেছিলেন, ‘কলিকাতা চলিতেছে নড়িতে নড়িতে, সেই কথা আজও সত্যি।”
ড্রাইভারের কাব্যি শুনতে ইচ্ছে করছে না। পীযূষ বিরক্ত হয়ে কোল থেকে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স লেগ স্পেসে নামিয়ে রাখলেন। সিটবেল্ট খুলে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন ক্রসিংয়ের দিকে। সাদা গাড়ির চালকের আসনে বসে থাকা সায়ন্তন তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ কী? আপনি নেমেছেন কেন?”
“না নেমে উপায় কী? আপনি তো গাড়িতে একা ওদের সঙ্গে কী করে বলবেন কথা বলবেন?” ঠাণ্ডা মাথায় বলল পীযূষ। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু’দিকে হাত ছড়িয়ে বাংলা এবং হিন্দিতে চেঁচাতে লাগলেন, “অ্যাম্বুল্যান্স যাবে। রাস্তা ছাড়ুন। মরিজ হ্যায়, রাস্তা ছোড়িয়ে?”
কেউ কথা শুনল না। উলটে পীযূষের কথা শুনে শিষ্যাদের গতি কমে গেল। পীযূষ বাধা হয়ে এক শিষ্যার সামনে হাত জোড় করে বললেন, “ভাবি, প্লিজ ওয়েট!”
“টাচ মত কর না চু***!” কাঁচা খিস্তি করল শিয্যা, “রেপ কেস মে ফসা লুঙ্গি।”
এ আবার কেমন শিয্যা রে বাবা! ঘাবড়ে গেলেন পীযূষ। অসহায়ভাবে তাকালেন সায়ন্তনের দিকে। সায়ন্তন তার সাদা গাড়ি শোভাযাত্রার ঠিক মাঝখানে দাঁড় করিয়ে পুলিশি হুঙ্কার দিলেন, “স্টপ।”
ভয়ের চোটে কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে গেলেও অনেকে দাঁড়াল না। কিন্তু তারই মধ্যে দিয়ে গলে গিয়েছে অ্যাম্বুল্যান্স। একটু এগিয়ে ব্রেক কয়েছে। কাঠি অপেক্ষা করছে পীযূষের জন্যে।
পীযূষ দৌড়লেন। এক লাফে অ্যাম্বুল্যান্সে উঠে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স কোলে নিয়ে বললেন, “চলুন!”
কাঠি বললেন, “ওঁদের জন্যে অপেক্ষা করব না?’
“এঁরা আসছেন। আপনি চলুন,” হুকুম করলেন পীযূষ। রিয়ার ভিউ মিররে দেখলেন সাদা গাড়ি নয়, এগিয়ে আসছে কালো গাড়ি। অ্যাম্বুল্যান্স উপকে যাওয়ার সময় কালো গাড়ির গতি সামান্য কমল। জানলার কাচ নামিয়ে সুধীর বললেন, “সায়ন্তন ওখানে ঘেরাও হয়ে গিয়েছেন। আমি বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে ফোন করে বলে দিয়েছি এনফোর্সমেন্ট পাঠাতে। বাকি রাস্তা আমিই আপনাকে নিয়ে যাব।”
পীযূষ চিৎকার করে বললেন, “গ্রিন করিডোর কাকে বলে আপনারা জানতেন না?’
দু’টি গাড়ি এখন পাশাপাশি দৌড়চ্ছে। সুধীর গলা বাড়িয়ে বললেন, “অবশ্যই জানতাম। হঠাৎ করে অ্যালিটেশন আর প্রসেশন কোথা থেকে এল কে জানে। এসব করার জন্যে আগে থেকে আমাদের কাছে পারমিশন নিতে হয়। যাদের অ্যারেস্ট করা হয়েছে তাদের কপালে দুঃখ আছে।”
কার কপালে কী আছে তা জেনে পীযূষের লাভ নেই। তিনি চিন্তিত পেশেন্টের কপাল নিয়ে। সকাল সাড়ে সাতটার সময় হার্ট বের করে নেওয়া হয়েছিল সায়কের শরীর থেকে। এখন বাজে এগারোটা দশ। তাঁদের সিথ্রি পৌঁছনোর কথা এগারোটা কুড়ির মধ্যে। অপারেশন শুরু হওয়ার কথা সাড়ে এগারোটার সময়। সেই সময়ের আগে অ্যাম্বুল্যান্স সিথ্রিতে ঢুকতে পারবে তো!
বিধাননগরের একটু আগে থেকে যে ফ্লাইওভারটা বাঁদিকে ঘুরে গিয়েছে, সেটা ধরলে বিধাননগর ক্রসিংয়ের জ্যান এড়ানো যায়। কালো গাড়ি সেদিকে ঘুরছে। ঘুরল কাঠিও। সামনের রাস্তা ফাঁকা, শুনশান। অ্যাম্বুল্যান্স গতি বাড়িয়েছে। পীযূষ নিশ্চিন্তে চোখ বুজলেন।
হঠাৎ বিকট শব্দ করে ব্রেক করেছে কাঠি। সিটবেল্ট বাঁধা থাকা সত্ত্বেও সামনে হুমড়ি খাচ্ছিল পীযূষ। সেটা হয়নি। তবে অর্গান ডোনেশন বক্সের কোনায় থুতনি ঠোকর খেল। ব্যথার চোটে চেঁচিয়ে উঠলেন পীযূষ। বললেন, “কী হল?’
একটা চার অক্ষরের গালি দিয়ে কাঠি জিভ কাটল। বলল, “কিছু করার ছিল না। সুধীরস্যারের গাড়িও এমার্জেন্সি ব্রেক করতে বাধ্য হয়েছে।”
সামনে তাকিয়ে পীযূষ দেখলেন, মানব মেননের মুক্তির দাবিতে আর একদল লোক এখানে বিক্ষোভ শুরু করেছে। আগের বিক্ষোভকারীরা অপেক্ষাকৃত শান্ত ছিল। এরা অনেক বেশি হিংস্র। হাতে পতাকা, ব্যানার আর পোস্টার তো আছেই। সঙ্গে আছে লাঠি আর লোহার রড। সবাই মিলে ফ্লাইওভারের উপরে এমন ভাবে বসে পড়েছে যে গাড়ি যাওয়ার জন্যে এক ইঞ্চি জায়গাও পড়ে নেই।
কালো গাড়ি থেকে নেমে দুই ডান্ডাধারী পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বেধড়ক পেটাচ্ছে। বিক্ষোভকারীরাও ছেড়ে কথা বলছে না। পালটা লাঠিপেটা করছে। দুই পুলিশকর্মী লাঠি চার্জ করতে-করতে রাস্তার একদিক খালি করে দিয়েছে। সেখান দিয়ে প্রথমে গলে গেল কালো গাড়ি। তারপরে অ্যাম্বুল্যান্স। দুটো গাড়ি অবরোধ টপকে যেতেই বিক্ষোভকারীরা মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেল। রাস্তায় পড়ে রইল ছেঁড়া চটি, ভাঙা চশমা, লাঠি আর লোহার রড। কালো গাড়ি আর অ্যাম্বুল্যাগ পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। দুই গাড়ি থেকে একসঙ্গে নামলেন সুবীর আর পীযূষ। সুধীরের কানে মোবাইল। তিনি উত্তেজিত হয়ে বলছেন, “কাউন্সিলার হোক আর যাই হোক, আমি কাউকে ছাড়ব না। না, তুমি পুলিশমন্ত্রীর ভয় পেয়ো না। উনি ক্যাডারদের বাঁদরামো সহ্য করেন না। ওঁর নাম করে নানা বদমায়েশি হয়, এটা উনি ভাল করেই জানেন। আমি ওঁর সঙ্গে এখনই কথা বলছি।”
“কী হল?” ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন পীযূষ।
“কিছু একটা চক্কর আছে, যা আমরা জানতে পারিনি,” বিড়বিড় করে বললেন সুধীর, “রুলিং পার্টির লোকাল কাউন্সিলররা বিক্ষোভ আর শোভাযাত্রা অর্গানাইজ করেছিল। এত বড় সাহস যে আমাদের খবর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। ওরা কেউ ফোরফ্রন্টে ছিল না। কিন্তু যেগুলোকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে, তারা দু’ঘা খেয়েই কাউন্সিলরদের নাম বলে দিয়েছে। এবার পালের গোদাগুলোকে তুলতে হবে। আমার জুনিয়র ভয় পাচ্ছে কাজটা করার জন্যে।”
পীযূষের এসবে আগ্রহ নেই। তিনি বললেন, “আমরা তা হলে এগোই।”
“হ্যাঁ,” কালো গাড়িতে উঠে পড়েছেন সুধীর। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছে দু’টি গাড়ি। পীযূষ এবার মেহুলের মোবাইল নম্বরে ফোন করলেন। দমদম এয়ারপোর্টে নামার পরেই মেহুলকে ফোন করা উচিত ছিল। কিন্তু কম সময়ের মধ্যে এত ঘটনা ঘটে গেল যে পীযূষ ফোনটা করে উঠতে পারেননি।
মেহুলের মোবাইল একটানা বেজে গেল। উনি ফোন ধরলেন না।
কী ব্যাপার রে বাবা? ঘাবড়ে গিয়েছেন পীযূষ। স্বপনের মোবাইল সুইড অফ। মেহুল ফোন ধরছেন না। সিথিতে আজকে আদৌ অপারেশনটা হচ্ছে তো!
তাঁরা এর মধ্যে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে চলে এসেছেন। দু’টি গাড়ি এখন সায়েন্স সিটির সামনে। হু হু করে কালো গাড়ি আর অ্যাম্বুল্যান্স পেরিয়ে গেল সায়েন্স সিটির ক্রসিং।
নীল বিকন জ্বালিয়ে, হুটার বাজিয়ে ছুটছে দু’টি গাড়ি। এখানে প্রতিটি মোড়ে সিগনাল সবুজ। প্রতিটি মোড়ে কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্টরা বাইক থেকে নেমে স্যালুট করছে কালো গাড়িকে। প্রতিটি মোড়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাস আর মিনিবাস, ট্যাক্সি আর প্রাইভেট কার, টু হুইলার আর অটো। পীযূষ বিড়বিড় করে বললেন, “এবার অর্গ্যানটা খারাপ হতে শুরু করবে।”
আবার ব্রেক কষেছে কাঠি। পীযূষ ঝাঁকুনি খেয়ে বললেন, “কী হল?”
অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা খুলে সিথ্রি-র ওটির কর্মচারী বাদল বলল, “আপনি নেমে আসুন স্যার?”
দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে কর্মচারীর দৌড় দিলেন পীযূষ। কাঁধে ঝুলছে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স। অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে দেখলেন, মোবাইলের ঘড়িতে এগারোটা চল্লিশ বাজে।
