।। সতেরো ।।
২১ মে সকাল পৌনে এগারোটা থেকে রাত আটটা
.
প্রান্তরের মুখ দেখে মনে হচ্ছে পাথর কুঁদে বানানো হয়েছে। চোয়াল শক্ত, ভুরু কুঁচকে রয়েছে, দৃষ্টি স্থির। হাতের মুঠো স্টিয়ারিংয়ের উপরে এত জোরে চেপে বসেছে যে আঙুলের গাঁটগুলো ফ্যাকাসে লাগছে।
মাথায় অনেক চিন্তা ভিড় করতে চাইছে, কিন্তু প্রান্তর কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। এখন দুশ্চিন্তা করার সময় নয়। এখন একটাই কাজ, সিখি পৌঁছনো।
নিবেদিতা সেতুর জ্যাম কেটে যাওয়ার পর নির্বিঘ্নে দক্ষিণেশ্বর পেরিয়েছিল অ্যাম্বুল্যান্স। বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে আবার জ্যাম। অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে এক লরি ড্রাইভারের থেকে মোবাইল ধার করে রঘুবীরের সঙ্গে কথা বলেছিল প্রান্তর। সেই সময় সরল চালকের পাশের আসন থেকে পিছনে, রিমুলের পাশে ফেরত চলে গিয়েছিলেন।
বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে শেষ হয়েছে এয়ারপোর্টের আড়াই নম্বর গেটের সামনে। বিমানবন্দর টপকে ভি আই পি রোডে পড়তে পারলে প্রান্তর হুশ করে চলে যাবে। কিন্তু ফ্লাইওভারে সাংঘাতিক জ্যাম।
প্রান্তর জানে, যে-কোনও শহরের যত শতাংশ জুড়ে রাস্তা থাকা উচিত, কলকাতায় সেটা নেই। সেই কারণেই এত ফ্লাইওভার, এত ফুটব্রিল, এত স্কাইওয়াক, এত সাবওয়ে। মাটির নীচে, আকাশে, সব জায়গায় রাস্তা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু যে গতিতে রাস্তা বাড়ছে, তার থেকে অনেক বেশি গতিতে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। প্রান্তরের মাঝে মাঝে মনে হয়, শহরটা একদিন ফট করে ফেটে যাবে, দীপাবলীর সময়ে যেভাবে বোমা ফাটে। কলকাতার চিহ্ন হিসেবে পড়ে থাকবে বহুতলের ভগ্নাবশেষ, ফ্লাইওভারের টুকরো, বাস-ট্রামের কঙ্কাল আর মেট্রো রেলের ভেঙে যাওয়া রেক
না! এইসব চিন্তা নয়। ফার্স্ট গিয়ার থেকে সেকেন্ড গিয়ারে গেল প্রান্তর। সামনের লরি একটু এগিয়েছে।
ইন্টারকম আবার বাজছে। ভুরু কুঁচকে ফোন ধরল প্রান্তর, “স্বপন!”
স্বপন নয়, ফোনে এখন সরল। কাঁদছেন আর বলছেন, “আর কিছু করা যাচ্ছে না বাবা! মেয়েটা নেতিয়ে পড়ছে। ওষুধ, যন্ত্রপাতিতে কাজ হচ্ছে না।।”
সরলের কথা শুনে চুপ করে রইল প্রাপ্তর।
ইন্টারকমে এবার স্বপনের কণ্ঠস্বর, “প্রান্তর, রিমুল এখন সেন্সলেস। আর কিছু করার নেই। এখন মিনিট গোনার পালা। শেষ সময়টায় তুই ওর পাশে থাক। আমি অ্যাম্বুল্যান্স চালাচ্ছি।”
“না।” গর্জে উঠল প্রান্তর তার ইচ্ছে করছে ফিদ্ধ গিয়ারে গাড়ি তুলে সামনের সব যানবাহন গুঁড়িয়ে দিয়ে চলে যেতে।
“আমি বলছি, তুই আয়। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে রিমুল তোর নাম করছিল। আমি আর রিমুলের বাবা সামনে যাচ্ছি, “ স্বপনের গলা ভিজে।
ব্রেক কষল প্রান্তর। ইঞ্জিন বন্ধ করে চালকের আসন থেকে নেমে দৌড় দিল পিছনে। পিছনের চেম্বার থেকে নেমে পড়েছেন স্বপন আর সরল। তাঁরা সামনে গিয়ে বসলেন। প্রান্তর একলাফে পিছনের চেম্বারে উঠে দরজা বন্ধ করতেই অ্যাম্বুল্যান্স স্টার্ট দেওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেল।
রিমুলের দিকে তাকাল প্রান্তর। একগাদা নল, মুখোশ, তার আর গ্যাজেটের আড়ালে টুলটুলে মুখটা দিব্যি দেখা যাচ্ছে। চোখ বন্ধ। প্রান্তর যদি ওর হাতে হাত রাখে, তা হলে ঘুম থেকে উঠে বসবে না? উঠবে তো নিশ্চিত। কিন্তু কী বলে রিমুলকে ঘুম থেকে তুলবে প্রান্তর। তার কাছে তো নতুন কোনও গল্প নেই। যা আছে, সব প্রাচীন কিস্সা, পুরনো নকশা, সাবেক কাহিনি, সেকেলে আখ্যান, কুড়িয়ে পাওয়া দাস্তান …..
রিমুলের তর্জনীতে তর্জনী ছোঁয়াল প্রান্তর। এসি চলেছে বলে আঙুল কী ঠান্ডা! তাড়াতাড়ি রিমুলের হাত নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে প্রান্তর বলল, আচ্ছা, তোর মনে আছে, আমরা একবার বৈশাখ মাসে ময়দানে বেড়াতে গিয়েছিলাম? আছে? মনে। ফাঁকা মাঠে দু’-একটা ঘোড়া চরছিল, কয়েকটা ছোকরা ফুটবল পেটাচ্ছিল, চ্যাটার্জিদের উঁচু বাড়িটা ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিক তদারকি করছিল। এমন সময় আকাশ কালো করে নেমেছিল কালবোশেখি। আমি গরমে হাঁসফাস করছিলাম। সুযোগ পেতেই টিশার্ট খুলে বৃষ্টির মধ্যে নাচতে আরম্ভ করেছিলাম। তুই তোর পলকা গোলাপি লেডিস ছাতা দিয়ে কিছুক্ষণ লড়াই করেছিলি বাদলের ধারাপাতের সঙ্গে। ঝোড়ো হাওয়া আর ঝমঝমে বৃষ্টির কাছে হার মেনেছিলি এক মিনিটের মধ্যে। তুইও নাচতে আরম্ভ করেছিলি। মনে পড়ে।
“শীতকাল এলে রাস্তার উপরে নেট টাঙিয়ে তোদের পাড়ার ছেলেরা ব্যাডমিন্টন খেলত। তোকে কেউ খেলায় নিত না। বলত “আব্বুলিশ। আমি তোর সঙ্গে একবার মিক্সড ডাবলস খেলে হেরে গিয়েছিলাম…
“যে বছর ডিসেম্বর মাসে ভয়ানক শীত পড়ল, তাপমাত্রা নেমে গেল দশ ডিগ্রিতে, কলকাতার লোকেরা পাগলের মতো রুম হিটার কিনতে শুরু করল, সেবারের কথা মনে পড়ে? তুই আমাকে পার্ক স্ট্রিট নিয়ে গিয়েছিলি। গ্রুপ ডি স্টাফের ছেলের রেস্ত ছিল না বড় রেস্তরাঁয় ঢোকার। আমরা অল্প রাম খেয়েছিলাম। সঙ্গে সিজলার। চটরপটর করে আওয়াজ তুলে ধোঁয়া ওঠা প্লেট নিয়ে এসেছিল ওয়েটার। খুব ভাল খেতে জিনিসটা।
“বালিগঞ্জ স্টেশনের ওভারব্রিজের নাম তুই দিয়েছিলি ‘ছায়াতলা”। আয়রন সাইড রোডের নাম দিয়েছিলি ‘মল্লিকাবন’। নিজের বাড়ির নাম দিয়েছিল আইসক্রিম। সাইকেল গ্যারাজের মালিকের নাম দিয়েছিল ‘ডাবল ক্যারি’। আমার পদবি বদলে ‘তলাপাত্র’ করে দিয়েছিলি। এই অদ্ভুত নামগুলো আমি আজও ভুলতে পারিনি। তুই আর কোনও নতুন নাম দিবি না রিমুল!
“তুই আমাকে হিম দিল দে চুকে সনম’ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলি। দেখতে বাধ্য করেছিলি ‘কহো না প্যার হ্যায়’ আর ‘লগান’। আমি বলেছিলাম, ‘হিন্দি ছবির নাচগান আমার ভাল লাগে না। তুই শুনিসনি। কখনও নিউ এম্পায়ার, লাইট হাউস, মেটো, গ্লোব, কখনও রক্সি, হিন্দ, মিত্রা, প্রিয়া… কোথায় আমরা যাইনি। তোকে লুকিয়ে আমি নিয়মিত সোসাইটি, রিগ্যাল বা টাইগার সিনেমা হলে গিয়ে দ্য বডি’, ‘সিরোকো’, ‘জওয়ানি ১৬ সাল কি’, ‘গুলাবি রাতে দেখে আসি, এটা জেনে তুই কী রেগে গিয়েছিলি। আমার পিঠে কিল মারছিলি আর বলছিলি, ‘পারভার্ট! পারভার্ট। পারভার্ট।”
“একবার তো আমার ব্যাগ থেকে বেরল একগাদা চটি বই। বাংলায় ‘দেহে এল যৌবন’, ‘কোকশাস্ত্র’, ‘রতিসুখ’। ইংরেজিতে একগাদা পর্ন ম্যাগাজিন। গ্র্যান্ড হোটেলের সামনের ফুটপাথ থেকে কেনা। ইংরেজি পত্রিকা আর হলুদ মলাটের বাংলা চটি বইগুলো কুচিকুচি করে ছিঁড়ে নর্দমায় ভাসিয়ে দিয়ে তুই আবার আমার পিঠে গুমগুম করে কিল মেরেছিলি। বলেছিলি, *পারভার্ট! পারভার্ট! পারভার্ট!
“তুই শুনতে ভালবাসতিস রবি ঠাকুরের গান। কলেজ কেটে রোজ পালাতাম সিডি কেনার জন্যে। তখন টেপ রেকর্ডারের জমানা শেষ। এসে গিয়েছে সিডি। তুই আমাকে পুরনো ক্যাসেট দিয়ে বলতিস ওয়েলিংটন স্কোয়ারের দোকান থেকে সিডিতে কনভার্ট করে আনতে। আমাদের গরিব বাড়িতে তখনও সাদা-কালো টিভি, কাঠের পাল্লা দু’ভাঁজ করে যা বন্ধ করে দেওয়া যেত। তোদের আইসক্রিম বাড়িতে ততদিনে কালার টিভি এসে গিয়েছে। একবার ক্যাসেটের ফিতে জড়িয়ে গেল। তুই তখন ক্যাসেটের গর্তে পেনসিল ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক করে দিতে গিয়ে ফিতেটাই ছিঁড়ে ফেললি।
“ও রিমূল! ও আমার রিমূল! আমাদের কত কিছু ছিল, তাই না রে? কুড়ি বছর পেরিয়ে গেল, আর কি কিছু বাকি আছে।” রিমুলের হাত ছেড়ে, পকেট থেকে ছেঁড়া মানিব্যাগ বের করে প্রান্তর বলে, “সিনেমা হলগুলো এখন জামাকাপড়ের ওদাম হয়ে গিয়েছে, অথবা বদলে গিয়েছে মাল্টিপ্লেক্সে। এই দ্যাখ, আমার কাছে রাখা রয়েছে ‘হুম দিল দে চুকে সনম’-এর পুরনো টিকিট। কলকাতায় আর আগের মতো শীত পড়ে না। গরম পড়ে অনেক বেশি। বর্ষায় আর আগের মতো শহর ভেসে যায় না রে! তবু, দুগ্গা ঠাকুর জলে পড়লেই গা-টা ছ্যাঁক করে ওঠে আর ছাতিম ফুলের গন্ধ পাওয়া যায়। বুঝতে পারি, হেমন্তকাল এল। তোর এবার অ্যালার্জি শুরু হবে। মাথা ঝিমঝিম করবে, চোখ লাল হয়ে যাবে, নাক দিয়ে জল পড়বে। এই দেখ, মানিব্যাগে রেখে দিয়েছি প্রিন্সেপ ঘাট থেকে কুড়োনো ছাতিম ফুলের পাপড়ি।
“এই দেখ পার্ক স্ট্রিটের রেস্তরাঁর বিল। আবার আমরা সিজলার খেতে যাব। এই দেখ জর্জ বিশ্বাসের রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবামের ক্যাসেটের ফিতে। আমরা এখন অ্যাপে গান শুনব রিমুল। এই দেখ তোর ছিঁড়ে ফেলা ইংরেজি ম্যাগাজিনের সেন্টার স্প্রেডের টুকরো পামেলা অ্যান্ডারসনের লাল বিকিনি এত বছর ধরে জমিয়ে রেখেছি দেখে রাগ করবি না? বলবি না, ‘পারভার্ট?
“আমাদের তো সবই গিয়েছে। এখন অন্য সময়। তুই আর আগের মতো নেই। আমিও বদলে গিয়েছি। কিন্তু আমরা কি আবার নতুন করে শুরু করতে পারি না? ও রিমুল! বল না! একবার কিছু বল। তুই তো বড়লোকের বেটি। কিন্তু আমি এখন একটু আধটু রোজগার করি। মাথার উপরে এক চিলতে ছাদও আছে। থাকবি আমার সঙ্গে। বল না! ও রিল!”
রিমুলের হাতে মাথা রেখে হাউহাউ করে কাঁদছে প্রান্তর। বেড থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছে সিনেমার টিকিট, রেস্তরাঁর বিল, ক্যাসেটের ফিতে, ম্যাগাজিনের ছেঁড়া টুকরো
হঠাৎ রিমুলের চোখের পাতা নড়ে উঠল। কেঁপে উঠল আঙুল। ঠোঁটদুটো বলতে চাইল, “থাকব!”
সত্যিই কি এইসব হল? নাকি প্রান্তর ভুল দেখছে? সে কিছু বোঝার আগেই অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা খুলে গিয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রান্তর দেখল ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বপন, রঘুবীর আর সরল। সঙ্গে কাঠি আর হাসপাতালের একগাদা স্টাফ। স্বপন প্রান্তরের ঘাড় ধরে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামিয়ে বলল, “জলদি নাম। সিথি এসে গিয়েছি।”
প্রান্তর একসঙ্গে স্বপন আর রঘুবীরকে জড়িয়ে ধরে বলল, “রিমুলকে এটিতে নিয়ে যা! এক্ষুনি।”
ড্রাইভার হয়ে ডাক্তারদের তুইতোকারি করছে দেখে কাঠি ভুরু কোঁচকালেও কিছু বলল না। সে আর বাদল মিলে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে স্ট্রেচার নামিয়ে দ্রুত ঢুকে গেল হাসপাতালের মধ্যে। তাদের সঙ্গে দৌঁড়লেন স্বপন আর রঘুবীর। প্রান্তর দেখল লবির দেওয়ালঘড়ি বলছে এগারোটা বিয়াল্লিশ বাজে। সে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের চালকের আসনে উঠে বসল।
প্রান্তর ড্রাইভার গাড়ি গ্যারাজ করে, শাটার ডাউন না করা পর্যন্ত কাজ শেষ হয় না।
*
অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে রিমূলের ভাইটাল সাইন্স দেখছিলেন পীযূষ। দেখা শেষ করে বললেন, “পেশেন্টের অবস্থা খুব খারাপ! এই অবস্থায় অজ্ঞান করলে আর ফেরানো যাবে না। একে অ্যানাস্থেসিয়া দিতে পারব না।”
রঘুবীর হাত ধুয়ে ক্যাপ-মাঙ্ক গ্লাভস আর সার্জিকাল গাউন পরে চেয়ারে বসে রয়েছেন। তাঁর জ্বর এসেছে। ঘুম থেকে উঠে দেখেছেন, তাপমাত্রা একশো তিন ডিগ্রি। সেই সঙ্গে মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। শরীর খুব দুর্বল। অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন এবং ব্যথা কমার বড়ি খেয়ে ওটিতে ঢুকেছেন। দাঁড়াতে পারছেন না বলে বসে আছেন। তিনি বললেন, “আপনি চেষ্টা করলেই হবে পীযূষ।”
“ক্যালকুলেটেড রিঙ্ক বলে একটা কথা আছে?” বিরক্ত হয়ে বললেন পীযূষ, “কিন্তু এখানে তো সব হিসেবের বাইরে গিয়ে রিস্ক নেওয়া হচ্ছে। এটি শুরু হওয়ার কথা ছিল সাড়ে এগারোটার সময়। শুরু হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের পনেরো মিনিট পরে। আমার জানা নেই, অর্গ্যান কতটা ইউজফুল আছে। আমি তামিলনাড়তে যত ট্রান্সপ্লান্ট দেখেছি, সব ক্ষেত্রেই অর্গ্যান বের করে নেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যায়। এত দেরি করলে কী হয় আমার জানা নেই। তা ছাড়া ডক্টর চক্রবর্তীকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে উনি অসুস্থ। এত বড় এটি সামলাতে পারবেন না।”
স্বপন ওটি টেবিলে শুয়ে থাকা রিমুলকে দেখলেন। মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন এটিতে উপস্থিত চিকিৎসক আর সেবিকাদের। নিচু গলায় বললেন, “এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তাঁদের সবাইকে একটা কথা জানাতে চাই। আ থেকে কুড়ি বছর আগে পেশেন্ট রিমুল সেন, ড্রাইভার প্রান্তর দাস, আমি আর রঘুবীর চার বন্ধু ছিলাম। রিমুল আর প্রান্তর একটা অন্যায় কাজ করেছিল। ওরা একে অপরকে ভালবেসে ফেলেছিল। আমরা ওই ব্যামোর পাল্লায় পড়িনি। তাই আজ আমি আর রঘুবীর খ্যাতি, অর্থ, সম্মান, সব পেয়েছি। প্রেম করে রিমুল আর প্রান্তর কী পেয়েছে। রিমুলের বাবা প্রান্তরকে জেল খাটিয়েছেন, মেয়েকে নিয়ে চলে গিয়েছেন পটনা। ওদের মধ্যে গত কুড়ি বছর কোনও যোগাযোগ ছিল না। ওদের জীবনে সাফল্য নেই, উচ্চাশা নেই, আকাঙ্ক্ষা নেই। শুধু আছে বিমূর্ত প্রেম। আজ কুড়ি বছর বাদে, আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে ওদের প্রেমকে বাস্তবায়িত করার। কিন্তু মাঝখানে একটাই বাধা। তার নাম মৃত্যু। স্বয়ং যমরাজ এসে দাঁড়িয়েছেন প্রান্তর আর রিমুলের মাঝখানে। আমরা সবাই মিলে পারব না মৃত্যুর দেবতাকে হারিয়ে দিতে? না পারলে কী শিখলাম?”
অপারেশন থিয়েটারে এখন সুচ পড়লে তার শব্দ শোনা যাবে। কেউ নড়াচড়া পর্যন্ত করছে না। প্রথম নড়লেন পীযূষ। অজ্ঞান করার ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ হাতে নিয়ে রিমুলের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। বাকি ইউনিটের সদস্যরাও নিজেদের কাজ শুরু করেছেন। চেয়ার থেকে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেন অফ দ্য শিপ, রঘুবীর।
সিথ্রিতে মেহুলের চেম্বারে বসে সুধীর আর মেহুল চা খাচ্ছেন। চা এনে দিয়েছে সিস্টার ললিতা। চেম্বারের এক কোণে, জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রান্তর। গাড়ি গ্যারাজ করে সে ঘরে যায়নি। সে প্রচণ্ড ক্লান্ত। কিন্তু তার ঘুম আসছে না। ললিতাকে দাঁড় করিয়ে রিমোট টিপে নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ মনিটরে চালিয়ে দিয়েছেন মেহুল। দেখা গেল, ট্রলি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ললিতা মোবাইল ফোনে বলছে, “রঘুবীর স্যার এটি করবেন বলছেন। তুমি এত গাঘাট কেন? একটা ডান্ডা মাথায় ঠিক মতো মারতে পারলে না? স্যার কী ভাবলেন বল তো?”
আচমকা ভূত দেখলে লোকে যেভাবে চমকে ওঠে, ললিতা সেইভাবে চমকে উঠল। দৌড়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল। সুধীর পুলিশি হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, “দাঁড়ান।”
ললিতা দাঁড়িয়ে গেল।
সুধীর বললেন, “আপনি কার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলছিলেন!”
ললিতার মাথা নিচু। চোখ দিয়ে জল পড়ছে টপটপ করে। একটাও কথা বলছে না। সুধীর গলা নামিয়ে বললেন, “লোকাল থানায় ফোন করেছি। আপনাকে কাস্টডিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ওরা এসে গিয়েছে। লেডি কনস্টেবলও সঙ্গে আছে।
ললিতা ভেঙে পড়ল। বলল, “আমার বর এই কাজ করেছে।”
“যোগীই রঘুবীরকে মেরেছিল?” জিজ্ঞেস করলেন মেহুল।
“হ্যাঁ স্যার।”
মোবাইলে যোগীকে ডেকে পাঠালেন মেহুল। ললিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেন মারল? কে মারতে বলেছিল? এই “স্যারটা’ কে।”
ললিতা গলগল করে বলে দিল যোগীর গোপন মোবাইলের কথা। যোগীই সেই লোক যে সিথ্রি-র যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি স্মার্টফোনে ভিডিয়ো করে শিলাজিৎ বসুর গোপন স্মার্টফোনে পাঠিয়ে দিত। সেখান থেকে ভিডিয়ো ক্লিপ রাজা আর পাপ্পু হয়ে ছড়িয়ে পড়ত সর্বত্র। মেহুল আর চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত দেখাশোনার নামে ললিতা বেশির ভাগ সময় মেহুলের চেম্বারে আসত। নিজের মোবাইলের অডিয়ো রেকর্ডার অন করে রাখত। সেই অডিয়ো ক্লিপ পেয়েই পুরো প্রোগ্রাম ছকেছিল শিলাজিৎ।
ললিতা যতক্ষণে এই সব কথা বলছে, ততক্ষণে যোগী চলে এসেছে। একই সঙ্গে চলে এসেছেন স্থানীয় থানার অফিসার ইন চার্জ, লেডি কনস্টেবলসহ। কথা না বাড়িয়ে যোগী আর ললিতাকে গ্রেফতার করা হল। রিমুলের অপারেশন তখনও চলছে।
*
বিকেল পাঁচটার সময় অপারেশন শেষ করে ওটি থেকে বেরিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বসলেন রঘুবীর, স্বপন, পীযূষ আর মেহুল। প্রথম কয়েক মিনিট এত ফ্ল্যাশ ঝলমল করল যে কেউ কোনও কথা বলতে পারছিলেন না।
প্রথম প্রশ্ন করল পরিমল, “স্যার। অপারেশন সাকসেসফুল!”
প্রান্তর সাংবাদিকদের পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার মনে যে প্রশ্নটা জেগেছে, সেটাই করেছে পরিমল।
রঘুবীর বললেন, “অপারেশন হয়ে গিয়েছে। সেটা সফল কি না, জানার জন্য বাহাত্তর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।”
“কেন স্যার?” জানতে চাইছে চন্দ্রাণী।
“মানুষের শরীর বলে কথা। রোগীর কী কী কমপ্লিকেশন হবে আগে থেকে বলে দেওয়া সম্ভব নয়,” বললেন রঘুবীর, “যখন যেমন সমস্যা হবে, তখন তেমন মোকাবিলা করতে হবে।”
স্বপন বললেন, “কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট খুব কমপ্লিকেটেড সার্জারি। পূর্ব ভারতে প্রথম এই অপারেশন হল। ছুরি-কাচির কাজ ছাড়াও অনেক পেপার ওয়ার্কস থাকে। সে সব সামলেছেন সিথ্রি-র প্রধান শ্রীমেহুল সাহা। এই সাহস দেখানোটাই আসল।
মেহুল কিছু না বলে মাথা নিচু করলেন। পীযূষ পাশ থেকে বললেন, “বাহাত্তর ঘণ্টা পরে আমরা যে আপনাদের ক্রিয়ার কাট কিছু বলতে পারব, এমনটা না-ও হতে পারে। দাতার হৃদয় গ্রহীতা গ্রহণ না করলে একটা রোগ হয়। রোগটা হলে গ্রহীতার শরীরের মধ্যে দাতার হার্ট পচে যায়। ফলে গ্রহীতার মৃত্যু হয়। সেটা আটকানোর জন্যে বিশেষ ওষুধ দেওয়া শুরু হয়েছে। রিমুলের শরীর সায়কের হৃদয় গ্রহণ করল কি না তা জানার জন্যে আমাদের অন্তত দেড় মাস অপেক্ষা করতে হবে।
“শুনলাম সিগ্রি যাতে পূর্ব ভারতের প্রথম হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করতে না পারে, তার জন্যে কোনও-কোনও শিবির থেকে বাধা দেওয়া হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল দিনকালের অর্ধা
“শুনলাম একটি কার্ডিয়াক ইনস্টিটিউটের মালিককে গ্রেফতার করা হতে পাবে এবং আপনাদের একাধিক স্টাফকে গ্রেফতার করা হয়েছে? তাঁদের নাম জানতে পারি?” জিজ্ঞেস করল হিন্দি নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিক।
দু’হাত তুলে সবাইকে থামালেন মেহুল, “সিথ্রিতে যে পূর্ব ভারতের প্রথম কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হবে, এই খবরটা আপনাদের কে দিয়েছেন?”
সাংবাদিকরা চুপ। পরিমল বলল, “আমরা সোর্সের পরিচয় জানাই না।”
মৃদু হেসে মেহুল বললেন, “সোর্সের মধ্যে ভূত ছিল কি না খবর নেবেন। আমরা বরং খারাপ জিনিসের দিকে না তাকিয়ে ভাল জিনিসের দিকে তাকাই। সিথ্রি যে কলকাতা তথা পূর্ব ভারতের এক নম্বর কার্ডিয়াক কেয়ার সেন্টার, সেটা নিয়ে আর কোনও সন্দেহ রইল না। আর একটা জিনিস তো বলতেই পারি। যে, বাংলার হেল্থ সিস্টেম চেষ্টা করলে সব পারে। নট এভরিথিং ই রটেন ইন দ্য স্টেট অফ বেঙ্গল!”
*
দু’ঘণ্টা ধরে সাংবাদিক সম্মেলন চলল। নিজেদের কাজ ঢুকিয়ে সাংবাদিকরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল রাত আটটার সময়। স্বপ্ন চ্যানেলে গোড়া থেকেই লাইভ টেলিকাস্ট দেখাচ্ছে। লবিতে ঝোলানো টিভির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রান্তর। এমন সময় পাশ থেকে চেনা গলা বললেন, “প্রান্তর, আমাকে মাফ করে দাও।”
সরল সেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলল প্রান্তর। সরলের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে কোয়ার্টারের দিকে এগোল সে। এবারে একটা জব্বর ঘুম দিতে হবে।
