।। চোদ্দো ।।
২১ মে ভোর চারটে থেকে ২১ মে সকাল পৌনে এগারোটা
.
অ্যাম্বুল্যান্সের টায়ারে চোখ রেখেই প্রান্তর বুঝতে পারল, এটা স্বাভাবিক পাংচার নয়। রাস্তায় পড়ে থাকা পেরেক বা ওই জাতীয় ধারালো কিছু দিয়ে টায়ার যে ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, চরিত্রগত ভাবে এই পাংচার তার চেয়ে আলাদা। টায়ারের গায়ে একাধিক ফুটো রয়েছে। ধারালো কোনও যন্ত্র দিয়ে টায়ার ফালাফালা করে দেওয়া হয়েছে।
অ্যাম্বুল্যান্সের টায়ার নষ্ট করে কার কী লাভ কে জানে! এই নিয়ে না ভেবে টায়ার বদলানোয় মন দিল প্রান্তর। তার কাছে স্টেপনি আছে। টায়ার বদলাতে অল্প সময় লাগবে।
প্রান্তর যখন টুল বক্স আর জ্যাক বের করছে, তখন অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে এলেন সরল। জিজ্ঞেস করলেন, “টায়ার পাংচার হল কী করে।”
“টা নর্মাল পাংচার নয়। কেউ কাজটা করেছে।”
“সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। আমার কথা হল, তুমি গাড়ি থেকে নেমেছিলে কেন?”
সরলের কথা শুনে দাঁত খিঁচিয়ে প্রান্তর বলল, “হাগা পেলে কী করব? প্যান্টে হাগব?”
স্বপন এসে সরলকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। একটু পরে ফিরে এসে প্রান্তরকে বললেন, “মাথা গরম করছ কেন?”
প্রান্তর গলা তুলে বলল, “যার আটে হয় না, তার আশিতেও হয় না। বুড়োটা আগে যে রকম শয়তান ছিল, এখনও সেই রকম শয়তানই আছে।” প্রান্তরের কাঁধে হাত রেখে শান্ত হতে অনুরোধ করলেন স্বপন। বললেন, “এখন কী করবে?”
“আমার কাছে স্প্রেয়ার টায়ার আছে। বদলাতে পাঁচ মিনিট সময় লাগবে। এই বুড়ো শকুনটা যদি কানের কাছে বকবক না করে।“
প্রান্তরকে না ঘাঁটিয়ে স্বপন সরে দাঁড়ালেন। জ্যাক লাগিয়ে টায়ার বদলাতে দশ মিনিট সময় লাগল। ফুটো টায়ার নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে প্রান্তর আবার চালকের আসনে বসল। ড্যাশবোর্ডের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, ভোর চারটে পঁয়ত্রিশ বাজে।
তারা শক্তিগড়ে দাঁড়িয়েছিল ভোর চারটের সময়। শক্তিগড় ছাড়ছে চারটে পঁয়ত্রিশে। বেশ খানিকটা লেটে রান করছে। সকাল হয়ে গেলে রাস্তায় গাড়ি বাড়তে থাকবে। তখন অ্যাম্বুল্যান্সের স্পিড কমবে। এই পরিস্থিতিতে কতটা মেক আপ দেওয়া যায় দেখা যাক।
দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে চলেছে অ্যাম্বুল্যান্স। এমন সময় ইন্টারকম বেজে উঠল। রিসিভার কানে দিয়ে প্রান্তর বলল, “কী হল? বুড়ো আবার পেচ্ছাপ করবে না কি?”
ওদিক থেকে স্বপন নিচু গলায় বললেন, “রিমুলের শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড় করাও।”
ব্রেকে পা রাখার বদলে অ্যাক্সিলারেটরে পা রাখে প্রান্তর। গাড়ির গতি মুহূর্তের মধ্যে আশি কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা থেকে বেড়ে একশো কুড়ি কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা হয়ে যায়। প্রান্তরের চোয়াল শক্ত, দাঁতে দাঁত। সে জানত, ছোটখাটো দেরিগুলো পরের দিকে অসুবিধেয় ফেলবে। কিন্তু অসুবিধেটা যে রিমূলের তরফ থেকে আসবে, এটা ভাবতে পারেনি।
“দাঁড় করাবে না?” গাড়ির গতি বেড়ে যাওয়ায় অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন স্বপন।
“গাড়ি দাঁড় করালে বেফালতু দেরি হবে। তার থেকে টেনে চালিয়ে কলকাতা চলে যাওয়াটা বেটার, “ একটা লরিকে ওভারটেক করেই প্রান্তর দেখতে পেল সামনে একটা বাইক। শেষ মুহূর্তে কাটিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল সে। রিয়ার ভিউ মিররে দেখল, ব্যালান্স রাখতে না পেরে বাইক পাশের জমিতে নেমে গিয়েছে। চালক অ্যাম্বুল্যান্সের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে গালিগালাজ করছে।
অ্যাম্বুল্যান্সের ওভারটেকের সময় চুপ করে ছিলেন স্বপন। এবার বললেন, “রিমুলের অক্সিজেনে আর কাজ হচ্ছে না। ‘বাই প্যাপ’ দিতে হবে। গাড়ি নড়লে আমি কাজটা করতে পারব না।
হার্ট ইনস্টিটিউটে কাজ করে বলে প্রান্তর অনেক টেকনিকাল টার্ম জানে। স্বপন যে জিনিসটা করবেন বলছেন, সেটা কেন করতে হয় সেটাও জানে। ফুসফুসের হাওয়া টানার ক্ষমতা কমে গেলে বাইরে থেকে চাপ দিয়ে অক্সিজেন ঢোকাতে হয়। তাকেই বলা হয় ‘পজিটিভ এয়ার প্রেশার’ বা ‘পি এ পি’ বা ‘গ্যাপ’।
ফাঁকা জায়গা দেখে অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড় করাল প্রান্তর। এক লাফে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে দৌড়ে পিছনে গিয়ে দরজা খুলল। দেখল, সরল নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসে আছেন। চোখ মেয়ের দিকে। স্বপন রিমুলকে নিয়ে ব্যস্ত।
কার্ডিয়াক মনিটরের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে প্রান্তর বুঝতে পারল, রিমুলের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেন মুখোশের আড়াল সত্বেও যেটুকু চামড়া দেখা যাচ্ছে, সেটা ফ্যাকাসে, ছাই রঙা। মৃত্যু এসে মাথার উপরে ঘুরপাক খেলে মানুষের চামড়ায় এই রং ধরে।
গাড়ি থামতেই স্বপন নিজের কাজ সেরে ফেলেছেন। রিমুলের দায়িত্ব সরলকে দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে প্রান্তরকে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, “আর একটা কথা। যেটা ইন্টারকমে বলা যেত না। মেহুল ফোন করেছিলেন। উনি বললেন যে রঘুবীর ফোন ধরছে না দেখে উনি রঘুবীরের কোয়ার্টারে যান। এবং দেখেন যে রঘুবীর কোয়ার্টারের সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। আপাতত রঘুবীর সিথ্রিতে ভর্তি আছে। এখন…” মোবাইলে সময় দেখে স্বপন বললেন, “ভোর পাঁচটা পনেরো বাজে। রঘুবীরের ব্রেন স্ক্যান হয়ে গিয়েছে। ওখানে কোনও চোট নেই। তবে স্ক্যাঙ্ক, মানে খুলির চামড়ায় স্টিচ করতে হয়েছে। ও এখনও অজ্ঞান। অপারেশনটা করতে পারবে কি না বোঝা যাচ্ছে না।”
প্রান্তর বলল, “আমার মনে হচ্ছে, কেউ বা কারা চাইছে না যে এই অপারেশনটা হোক!”
“ধুস!” প্রান্তরের কথা উড়িয়ে দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে উঠে বসলেন স্থপন প্রাপ্তর চালকের আসনে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। পেশেন্ট যে অ্যাম্বুল্যান্সে যাচ্ছে তার টায়ারে ফুটো। সার্জনের মাথায় আঘাত। এক রাতের মধ্যে ঘটে যাওয়া দু’টি ঘটনা কি সমাপতন? প্রান্তরের মনে হচ্ছে না।
দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের সিক্স লেন হাইওয়ে দিয়ে ঘণ্টায় একশো কুড়ি কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে অ্যাম্বুল্যান্স। দু’দিক মিলিয়ে বারো লেনের মহাসড়ক। এমন রাস্তায় গাড়ি চালিয়েও সুখ। সাড়ে পাঁচটার সময় ডানকুনি পৌঁছে গেল প্রান্তর। এখানে একবার দাঁড়াতে হবে। এবং এটাই শেষ দাঁড়ানো। একটু-একটু ঘুম পাচ্ছে। এককাপ চা খাওয়া জরুরি। তা ছাড়া প্রান্তরকে একবার টয়লেট যেতে হবে। এবং খবর নিতে হবে, রিমুল কেমন আছে।
*
হোটেলের নাম আপনজন। হোটেলের সামনে কয়েকটা লরি দাঁড়িয়ে। এখানে বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে পিছনের দরজা খুলে রিমুলের দিকে তাকাল প্রান্তর। রিমুল চোখ বুজে শুয়ে রয়েছে।
সরল আর স্বপন গাড়ি থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙছেন। প্রান্তর বলল, “আপনারা বাথরুম থেকে ঘুরে আসুন। আমি টয়লেট যাব। ফিরে এসে একভাঁড় চা খেয়ে দৌড় দেব। ম্যাক্সিমাম পনেরো মিনিট।”
সরল মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “একা থাকতে অসুবিধে হবে না তো?”
অক্সিজেন মাস্কের আড়ালে ঘাড় নেড়ে রিমুল ‘না’ বোঝাল। সরল এগোলেন বাথরুমের দিকে। স্বপন এগোলেন চা-ওয়ালার দিকে। প্রাপ্তর দৌড়ল বাথরুমের দিকে।
বাথরুমে ঢুকেও বেরিয়ে এল প্রাপ্তর। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎ তাকে বলল, অ্যাম্বুল্যান্স ছেড়ে সবার চলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি।
অ্যাম্বুল্যান্সের দিকে তাকাল প্রান্তর। দুটো লরির মাঝখানে রাখা রয়েছে বলে পুরো গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। যেটুকু দেখা যাচ্ছে সেটাই যথেষ্ট। একটা ঢ্যাঙা লোক নিচু হয়ে সামনের টায়ার ফুটো করার চেষ্টা করছে।
“এইইই!” দুর থেকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছে প্রান্তর। লম্বা- লম্বা পা ফেলে দৌড়ে যাচ্ছে অ্যাম্বুল্যান্সের কাছে। দেখছে, ঢ্যাঙা লোকটা তার চিৎকার শুনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুখে ভয়ের ছায়া। লোকটা দৌড়চ্ছে।
প্রান্তর দুর থেকেই চিৎকার করল, “চোর! চোর!” তারপরে হাতের ফোনটা ছুড়ে মারল।
অব্যর্থ লক্ষ্য ফোন গিয়ে লাগল লোকটার পিঠে। কতটা জোরে লেগেছে বুঝতে পারল না প্রান্তর। কারণ লোকটা দাঁড়াল না। ফোন কুড়িয়ে নিয়ে বাইক চালিয়ে হাওয়া হয়ে গেল।
প্রান্তরের চিৎকার অনেকে শুনলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। বাইক আরোহী চলে যাওয়ার পরে এক-এক করে ড্রাইভার আর খালাসিরা জড়ো হচ্ছে। ওদের পাত্তা না দিয়ে টায়ারের দিকে তাকাল প্রান্তর।
হ্যাঁ। আবার একাধিক জায়গায় টায়ার ফুটো করা হয়েছে। এই টানার বদলাতে হবে। এক্সটা স্টেপনি শেষ হয়ে গিয়েছে। অবিলম্বে নতুন চাকা জোগাড় করতে হবে। মুশকিল হল, এই অ্যাম্বুল্যান্সে রোডকিং কোম্পানির টিউবলেস টায়ার ছাড়া অন্য টায়ার লাগে না। সেটা আবার কলকাতার একটা মাত্র শোরুমে পাওয়া যায়। কলকাতার বাইরে পাওয়া যায় কি?
স্বপন আর সরল ফিরে এসেছেন। অ্যাম্বুল্যান্সের চারদিকে ভিড় দেখে সরল জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?
সরলের কথার উত্তর না দিয়ে স্বপনের দিকে তাকিয়ে প্রান্তর বলল, “আমি যে কথাটা বলছিলাম সেটাই সত্যি প্রমাণিত হল।”
“কী?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন স্বপন।
“কেউ বা কারা চাইছে না অপারেশনটা হোক! বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম একটা লোক নতুন টায়ারটা পাংচার করে বাইক চেপে পালাল।”
“আমি এক্ষুনি মেহুলকে ফোন করছি,” উত্তেজিত হয়ে বললেন স্বপন। সেদিকে কান না দিয়ে প্রান্তর দৌঁড়ল মোটর মেকানিকের দোকানে। ওরা যদি টায়ারে তারি মেরে কাজ চালানোর মতো অবস্থা করে দেয়।
এক মেকানিক এল। সে পুরনো এবং নতুন টায়ার দেখে বলল, “দুটো টায়ারেই সাইড থেকে অনেকবার ছ্যাঁদা করেছে। দুটোই মায়ের ভোগে চলে গিয়েছে। এদের সারানো আর মশারির ফুটো রিপেয়ার করা একই জিনিস।”
উপমা শুনে প্রান্তরের হাসি পেল না। সে মেকানিকের টাকা মিটিয়ে বলল, “তুমিই একটা টায়ার জোগাড় করে দাও।”
“রোডকিং কোম্পানির টায়ার এখানে পাওয়া যায় না.” টাকা নিয়ে মেকানিক চলে গেল।
কলকাতা থেকে টায়ার আনার মতো সময় নেই। অন্য কোনও উপায় বের করতে হবে। আপনজনে ঢুকে ক্যাশবাক্স আগলে বসে থাকা ভুঁড়িওয়ালা মালিককে সে বলল, “এখানে কোথায় টায়ার কিনতে পাওয়া যায়?”
মালিক জবাব দিল, “ড্রাইভার আর বালাসিদের জিজ্ঞেস করুন। ওরা এসবের খবর রাখে।”
আপনজন থেকে বেরিয়ে এল প্রান্তর। সামনেই স্বপন পায়চারি করছে আর মোবাইলে কথা বলছে। প্রান্তরকে দেখে ফোনালাপ বন্ধ করে মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “টায়ার বদলানো হয়ে গিয়েছে। তা হলে চলো।”
স্বপনের দিকে তাকিয়ে প্রান্তর কেটে কেটে বলল, “রিমুলের বুড়ো বাপটা পটনা থেকে বেরনোর সময় নিজের মোবাইল বউকে দিয়ে এসেছে। আমার ফোন একটু আগে চুরি হয়ে গেল। বাকি রইল আপনার ফোন। বকবক করে ব্যাটারি নষ্ট করছেন কেন?”
“অ্যাম্বুল্যান্সে চার্জিং পোর্ট আছে। আমার কাছে চার্জারও আছে। কিন্তু আমার কোম্পানির ফোনের চার্জার দিয়ে অন্য কোম্পানির ফোনে চার্জ দেওয়া যায় না। ওই জন্যেই বলছিলাম, কম কথা বলুন। ইন্টারনেট বন্ধ করে দিন। না হলে মাঝরাস্তায় মোবাইল অফ হয়ে যাবে।
“ঠিক বলেছ, “ ঘাড় নাড়লেন স্বপন, “কিন্তু ওদিকে একটা সমস্যা হয়েছে। রঘুবীর বলছে ও অপারেশনটা করতে পারবে না। এদিকে আমার একার পক্ষে এত বড় এটি করা সম্ভব নয়।”
“অপারেশন করতে চাইছেন না।” ভুরু কুঁচকে গিয়েছে প্রান্তরের। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল সে। ওসব নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। তার নিজের সামনে অনেক বড় সমস্যা। টায়ার সংক্রান্ত সমস্যার কথা সংক্ষেপে স্বপনকে জানিয়ে প্রান্তর বলল, “এখন একটাই উপায়। আমি রাস্তার এই ফুটের সমস্ত দোকান আর ধারায় গিয়ে ড্রাইভার আর খালাসিকে জিজ্ঞাসা করছি, ওদের কাছে রোডকিং কোম্পানির টায়ার আছে কি না। আপনি রাস্তার অন্য ফুটে গিয়ে এই কাজটাই করুন। একই সঙ্গে মেহুল স্যারকে বলে রাখুন, আমাদের রুটে একটা অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাতে।”
কথা শেষ করে সামনের ধাবায় ঢুকে গেল প্রান্তর। এখানে একাধিক ড্রাইভার নাস্তাপানি করছে। তাদের কাছে নিজের অসুবিধের কথা জানাল প্রান্তর সবাই একটা কথাই বলল, তাদের কাছে রোডকিং কোম্পানির টায়ার নেই।
পরের ধাবার ঢুকল প্রান্তর। এখানেও অনেক ড্রাইভার খাওয়াদাওয়া করছে। একজন বলল, “চলো। তোমার গাড়িটা দেখি।”
গাড়ি দেখে সে অবশ্য হাত তুলে দিল। প্রান্তর যেন অন্য কোনও অ্যাম্বুল্যান্সে পেশেন্টকে কলকাতায় নিয়ে যায়।
প্রাপ্তর কী করে বোঝাবে যে রিমুলকে যে-কোনও অ্যাম্বুল্যান্সে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। ক্রিটিকাল কেয়ার অ্যাম্বুল্যান্স থেকে রিমুলকে বেরই করা যাবে না। পরের ধাবার ঢুকল প্রান্তর।
কতক্ষণ ধরে এই পাগলামো সে করে চলেছে তার হিসেব নেই। একটা সময় প্রান্তর দেখল স্বপন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
“কী হল!” জিজ্ঞেস করল উত্তেজিত প্রান্তর, “টায়ার পাওয়া গেল?”
স্বপন চুপ করে রয়েছেন। প্রাত্তর ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী হল। কথা বলছেন না কেন?”
“রিমুলের ভেনট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া হচ্ছে,” এইটুকু বলেই স্বপন বুঝতে পারলেন তিনি ডাক্তারি পরিভাষা ব্যবহার করে ফেলেছেন। সহজ করে বললেন, “মানে, রিমুলের হার্ট খুব জোরে দৌড়চ্ছে। এত জোরে দৌড়লে হার্ট বন্ধ হয়ে যায়।”
মোদ্দা কথাটা বুঝেছে প্রান্তর। সে বলল, “তা হলে কী হবে?”
ওটা আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। কিন্তু কথা হল, আমাকে সারাক্ষণ কার্ডিয়াক মনিটরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। ওটা আবারও হতে পারে।”
“আপনি অ্যাম্বুল্যান্সে গিয়ে বসুন স্যার। রিমুলকে দেখুন। আপনাকে এসব করতে হবে না,” স্বপনের হাত ধরে কাঁদছে প্রান্তর। চোখের জল উপচে পড়ছে স্বপনের হাতে। গরম অশ্রুতে কুড়ি বছর আগেকার বন্ধুত্বের নোনতা স্পর্শ পাচ্ছেন স্বপন। তাঁরও কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
হঠাৎ প্রান্তর চিৎকার করে বলল, “এই! রোককে রোককে ও গাড়িওয়ালা! দাঁড়াও! দাঁড়াও?” তারপর স্বপনের হাত ছেড়ে রাস্তার মাঝখানে ছুটে গেল। স্বপন অবাক হয়ে দেখলেন যে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বিশাল বড়, অগুনতি ঢাকাওয়ালা একটা গাড়ি যাচ্ছে। এই গাড়িগুলোকে বলে ‘কার ক্যারিইং ট্রেলার’ বা ‘অটো ট্রান্সপোর্ট ট্রেলার”। ট্রেলারে দুটো তলা জুড়ে পরপর সাজানো রয়েছে দশটা প্রাইভেট কার। ঠিক যে কোম্পানির গাড়ি প্রান্তরের এই মুহূর্তে দরকার। হরিয়ানার প্লান্ট থেকে গাড়িগুলো বাই রোড কলকাতার শো রুমে আসছে।
যে ট্রেলার দশটা প্রাইভেট কার বয়ে আনছে, প্রান্তর ছুটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। চ্যাঁচাচ্ছে, “ভাইয়া! এক মিনিট! ঘোড়া হেল্প চাহিয়ে। ভাইয়া! প্লিজ?” প্রান্তরের কাণ্ড দেখে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের দু’দিকে লোক দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
সব্বাইকে অবাক করে ট্রেলারের চালক জানলা দিয়ে মুখ বের করে বলল, “কেয়া পরেশানি হ্যায় তেরা। মরনা হ্যায় তো দুসরা গাড়ি দেখ। মেরা কাম হ্যায়”
“মরনা নেহি হ্যায়। কিসিকো বচানা হ্যায়,” ট্রেলারের গা বেয়ে উঠে চালকের সঙ্গে কথা বলল প্রান্তর। জাতীয় সড়কের মাঝখানে অত বড় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা নিয়ে কারও কোনও হেলদোল নেই। চালক ঘাড় ঘুরিয়ে শাগরেদকে কিছু বলল। একটু পরে শাগরেদ নতুন একটা টায়ার নিয়ে প্রান্তরের সঙ্গে রাস্তা পেরিয়ে এ দিকে চলে এল। স্বপন হাঁফ ছেড়ে দৌড় লাগালেন অ্যাম্বুল্যান্সের দিকে।
*
সকাল সাড়ে আটটার সময় টায়ার বদলে চালু হল অ্যাম্বুল্যান্স। স্বপন এখনও ব্যস্ত রিমুলকে নিয়ে। সরল মাথা নিচু করে বসে রয়েছেন। অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা বন্ধ করার আগে প্রান্তর দেখল কার্ডিয়াক মনিটরে রিমুলের জীবনরেখার চলন। বালির উপর দিয়ে বিছে দ্রুত হেঁটে গেলে যে রকম আঁকাবাঁকা, অনিয়মিত, অগোছালো দাগ রেখে যায়, সেই রকম দাগ তৈরি করছে রিমুলের হৃদয়। হঠাৎ একটু উপরে, তারপরে আবার সোজা, পরক্ষণেই অনেকটা নীচে নেমে গিয়ে আবার উপরে ওঠার চেষ্টা। বার্থ হয়ে কেঁপে-কেঁপে ওঠা এবং মুহূর্তের জন্যে থেমে গিয়ে আবার নতুন চলন। প্রান্তর বুঝতে পারল, রিমুলের হৃদয় শেষ লড়াই চালাচ্ছে। স্বপন সাহায্য করছেন। কিন্তু মানব হৃদয় খুব অহংকারী। সে অন্যের সাহায্য নিয়ে বাঁচতে চায় না। নিজের লড়াই নিজে করে। না পারলে হাল ছেড়ে দেয়।
ড্রাইভারের আসনে বসল প্রান্তর। সে চাইলেও জোরে গাড়ি চালাতে পারছে না। রাস্তায় গাড়ি অনেক বেড়েছে। বেড়েছে পথচারী। বেড়েছে ক্রসিং। ঘণ্টাপিছু পঞ্চাশ থেকে ষাট কিলোমিটারের বেশি স্পিড তোলাই যাচ্ছে না। টিকি-টিকির করে অ্যাম্বুল্যান্স এসে থামল নিবেদিতা সেতুর কাছে। টোল ট্যাক্স দেওয়ার সময় গাড়ি দাঁড় করাতে হল। সেই সময় সরল এসে প্রান্তরের পাশে বসলেন। বললেন, “চলে আসতে বাধ্য হলাম। মেয়েটার অবস্থা আর দেখতে পারছি না। ডক্টর মিশ্র না থাকলে কী যে হত…
দাঁতে দাঁত চেপে প্রান্তর বলল, “রিমুলের এই অবস্থার জন্যে দায়ী কে? আজ রিমুল মারা গেলে কার জন্যে মারা যাবে?”
“আমার জন্যে,” হাউহাউ করে কাঁদছেন সরল ব্যক্তিত্ববান মানুষটির মধ্যে কাঠিন্যের ছিটেফোঁটাও আর নেই। হাতজোড় করে বললেন, “রিমুলকে বাঁচিয়ে দাও বাবা! আমি তোমার কাছে চিরঋণী থাকব। ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই।”
অ্যাম্বুল্যান্স ছুটছে ঝড়ের বেগে। নিবেদিতা সেতুর উচ্চতা থেকে অনেক নীচে দেখা যাচ্ছে পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গা। মাথার উপরে মালিনাহীন আকাশ। এই রকম সময়ে মনের কথা বলে ফেলতে ইচ্ছে করে। প্রাত্তর বলল, “রিমুল ছাড়া আমারও কেউ নেই।”
উপরে আকাশ আর নীচে নদী নিয়ে শুয়ে রয়েছে এক সেতু। তার উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে আপৎকালীন যান। তার মধ্যে জমে উঠছে নীরবতা। অনেকক্ষণ পরে সরল বললেন, “তুমি বিয়ে করোনি?”
প্রান্তর বলল, “আপনি আমাকে জেলে ভরে দিলেন। সেই শোকে আমার মা আত্মহত্যা করেন। জেল থেকে বেরিয়ে দেখলাম, এই জগতে আমার কেউ নেই। আমি মরেই যেতে চেয়েছিলাম। নেহাত রঘুবীর আপত্তি করল, তাই মরিনি।”
“কোন রঘুবীর!” সম্রস্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন সরল। অতীত আর বর্তমান এখন খেলা করছে তাঁর মাথায়। যেভাবে আকাশ আর নদী খেলা করছে অ্যাম্বুল্যান্স ঘিরে।
“যাঁর সঙ্গে আমি আর রিমুল পবিত্র স্যারের কাছে পড়তাম। তিনি এখন কার্ডিও-থোরাসিক সার্জন। আপনার মেয়ের ডাক্তার ডক্টর মিশ্রও পড়ত এই কোচিংয়ে। রঘুবীর আর স্বপনই তো রিমুলের অপারেশন করবেন।”
সরল আপন মনে বললেন, “এই ডক্টর মিশ্রই সেই স্বপন! আমি তো ভাবতেই পারছি না। চেহারায় কোনও মিলই নেই!”
“ওঁরা ভাল ছেলে। ডাক্তার হয়েছেন। রিমুলের অপারেশন করবেন। আর আমি খারাপ ছেলে। ড্রাইভার হয়েছি। আমার কাজ রিমূলকে বয়ে নিয়ে যাওয়া। বেঁচে থাকতে বহন করছি। মরে গেলেও করব।”
সরলের চোখে জল। তিনি মুখ ঘুরিয়ে চোখ মুছে পুরনো প্রশ্নটা আবার করলেন, “তুমি বিয়ে করোনি?”
“না।”
“কেন?”
“রিমুল বিয়ে করেনি কেন?”
আবার নীরবতা খেলা করছে আকাশ আর নদীর মাঝখানে, বর্তমান আর অতীতের মাঝখানে। সরল বললেন, “তোমার সঙ্গে রিমুলের যোগাযোগ ছিল? গত কুড়ি বছরে?”
“গতকালের আগে আমি জানতামই না রিমুল বেঁচে আছে না মরে গিয়েছে। বিয়ে করেছে না করেনি…” সজোরে ব্রেক করে প্রান্তর বলল।
ঠিক এই সময় ইন্টারকম বেজে উঠল সরল চুপ করে গেলেন। প্রান্তর ফোন ধরে বলল, “হ্যাঁ…”
“আমার মোবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেল,” বললেন স্বপন, “ মেহুলের সঙ্গে যোগাযোগের আর কোনও উপায় রইল না।”
“আমাদের ওয়াই-ফাই আছে। আমরা সিথ্রি-র সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলেও সিথ্রি জানতে পারছে আমরা কোথায় আছি,” বলতে-বলতেই প্রান্তর খেয়াল করল, ড্যাশবোর্ডের যেখানে ওয়াই-ফাই আইকন থাকে, সেখানে এখন একটা বিস্ময়সূচক চিহ্ন। অর্থাৎ সিগনাল নেই। হতাশ হয়ে সে বলল, “আমরা নিবেদিতা সেতুর ঠিক মাঝখানে। এখানে ওয়াই-ফাই কাজ করছে না।”
“অন্য গাড়ির ড্রাইভারের থেকে মোবাইল চেয়ে নেওয়া যেতে পারে,” বললেন সরল।
“সেটা করা যায়। মেহুল স্যার বা রঘুবীর স্যারের মোবাইল নম্বর মুখস্থ না থাকলেও সিথ্রি-র টোল ফ্রি নাম্বার মনে আছে,” অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লরির ড্রাইভারকে প্রান্থর বলল, “মোবাইলটা একবার দেবে? একটা ফোন করতাম।”
পরিচালক বিরক্ত মুখে বলল, “আমিই ফোন করতে পারছি না। কোনও টাওয়ার নেই।”
হতাশ হয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের পিছনের দরজা খুলে স্বপনের সঙ্গে কথা বলতে গেল প্রান্তর। ভিতরে যা হচ্ছে সেটা দেখে চমকে উঠল।
কার্ডিয়াক মনিটরে রিমুলের জীবনরেখা এত দ্রুত ওঠানামা করছে যে গোনা যাচ্ছে না। স্বপনের দু’হাতে করতালের মতো দুটো যন্ত্র। প্রান্তর জানে, এগুলোকে ‘ডিফিব্রিলেটার’ বলে। হার্ট যখন বেয়াদপি করে তখন এই যন্ত্রের মাধ্যমে হার্টে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। অনেক পেশেন্ট তাতে ভাল হয়ে যায়। অনেক পেশেন্ট হয় না।
অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা বন্ধ করে দিয়ে রাস্তার উপরে বসে পড়ল প্রান্তর। চোখ বুজে প্রার্থনা করতে লাগল, “রিমুলকে বাঁচিয়ে দাও। প্লিজ প্লিজ। রিমুলকে বাঁচিয়ে দাও।”
গাড়ির সামনের আসনে বসে সরল তখন হাতঘড়িতে সময় দেখছেন। সকাল পৌনে এগারোটা বাজে। সামনে বিশাল যানজট। কোনও গাড়ি এক ইঞ্চি নড়ছে না।
