প্রাককথন
১৫ মে রাত দশটা থেকে ১৭ মে রাত সাড়ে বারোটা
১৫ মে রাত সাড়ে দশটার সময় যে ছেলেটা ‘লা ডোনা বার’-এ বসে পেগের পর-পেগ মদ খাচ্ছে, ওর নাম সায়ক মণ্ডল। সায়ক চাকরি করে ‘দ্য মাট্রিক্স’ নামের একটি বহুজাতিক সংস্থার চেন্নাই শাখায়। বাড়ি চেন্নাইয়ের পেরিয়ামেটে। সেখানেই ওর জন্ম ১৯৯৫ সালে। মৃত্যু এই মুহূর্তে সায়কের মাথার পিছনে চালচিত্রের মতো সাজানো রয়েছে।
.
সায়কের বাবা রাজর্ষি মণ্ডলের বয়স আটচল্লিশ। মা মোহর, পঁয়তাল্লিশ। রাজর্ষি চেন্নাইয়ের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, মোহর বাড়ি সামলান। ব্যাঙ্কে চাকরির সুবাদে মণ্ডল দম্পতি কলকাতা ছেড়েছেন অনেক দশক আগে। আর ফেরা হয়নি। মা-বাবার এক ছেলে সায়ক লেখাপড়ায় সাধারণ। বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন করে যোগ দিয়েছে ম্যাটিক্সে, অ্যাসিস্ট্যান্ট সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পোস্টে। পরের বছর সিনিয়র সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে উন্নীত হওয়ার এবং বিদেশ যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সে চুটিয়ে প্রেম করছে সুচিত্রা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
ম্যাট্রিক্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে সুচিত্রা যোগদান করেছে মাত্র তিন মাস আগে, সায়কের টিমে। ম্যাট্রিক্সে যোগদান করার এক মাসের মধ্যে তেইশ বছরের সুচিত্রা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে চব্বিশ বছরের সায়ক মণ্ডলের প্রেম হয়ে গেল। দু’জনে সমবয়সি, দু’জনেই এক রকমের বাঙালি পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে, দু’জনের কাজের ধরন এক, দু’জনকেই একসঙ্গে অফিসে কাটাতে হয় দিনের মধ্যে বারো ঘণ্টা। প্রেম না হওয়াটাই অস্বাভাবিক ছিল। টিমের সবাই এই সম্পর্কের কথা জানে। টিম লিডার সুন্দর বালাচন্দ্র এটাকে ভাল চোখে না দেখলেও নাক গলায় না।
সুচিত্রার বাবা, আটচল্লিশ বছরের নবকুমার চট্টোপাধ্যায় চেন্নাই পুলিশে চাকরি করেন। সুচিত্রার মা জ্যোতির্ময়ীর বয়স পঁয়তাল্লিশ। তিনি চাকরি করেন চেন্নাই মিউনিসিপালিটিতে। উচ্চ শ্রেণির ব্রাহ্মণ হিসেবে তাঁদের বংশ গরিমা আছে। একমাত্র মেয়ের বিষয়ে তাঁরা পজেসিভ এবং স্ট্রিক্ট। সুচিত্রা আর সায়কের প্রেমের বয়স দু’ মাস। আজ সকালে সায়ক সুচিত্রাকে বলেছে, “বাবা-মাকে তোমার কথা বলেছি। ওঁদের আপত্তি নেই। এঁরা চাইছেন তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে ফেলতে।”
প্রেম, বিবাহ অথবা জীবন, এই সব বিষয়ে সুচিত্রার কোনও ধারণাই নেই। আর পাঁচজন মিলেনিয়াল’ বা সহস্রাব্দের সন্তানের মতো সে-ও সোশ্যাল মিডিয়ার বুদ্বুদে বাস করে, অ্যাটেনশন স্প্যান খুব কম, এক মিনিট চুপ করে বসে থাকতে বললে মোবাইল টেনে নেয়। কেউ কোনও নির্দেশ দিলে সেটা পালন করে দিতে ওস্তাদ। বাবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বলেছিল। সে পড়েছে। মা চাকরি করতে বলেছিল। সে করেছে। সায়ক প্রেম করতে বলেছিল। সে রাজি হয়েছে। যদিও প্রেমের ব্যাপারটা বাড়িতে জানায়নি। নিজে থেকে জানাতে পারবে বলে মনেও হয় না। তাই সায়ক যখন বলল, “আজ তোমাদের বাড়ি যাব। কাকু কাকিমার সঙ্গে আলাপ করে আসব,” তখন প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে নিশ্চিন্ত হল সুচিত্রা। যাক বাবা! বাড়িতে বলার ঝামেলাটা নিজের কাঁধে রইল না। সুচিত্রা রাজি হয়ে গেল।
১৫ মে রাত দশটার সময় সুচিত্রা বাড়ি ফিরল সায়কের সাড়ে তিনশো সিসি-র বাইকে সওয়ার হয়ে। এবং এই কাহিনি শুরু হয়ে গেল।
জিন্স, টি-শার্ট আর বিদেশি স্নিকার পরা একটি লম্বা-চওড়া ছেলেকে হেলমেট হাতে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকতে দেখে ভুরু তুলে তাকালেন চট্টোপাধ্যায় দম্পতি। এ-ই নির্ঘাত সায়ক। ম্যাট্রিক্সে যোগদান করার পর থেকে এর নাম মেয়ের মুখে নিয়মিত শুনে আসছেন তাঁরা
জ্যোতির্ময়ী জিজ্ঞেস করলেন, “শরবত খাবে?’
“না” জ্যোতির্ময়ীর প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে সায়ক বলল, “আপনাদের সঙ্গে একটা দরকার ছিল।”
“কী দরকার?” নবকুমারের ভুরু কুঁচকে গিয়েছে।
“আমার নাম সায়ক মণ্ডল,” হাতজোড় করে পরিষ্কার বাংলায় বলল সায়ক, “আমি আর সুচিত্রা এক অফিসে, একই টিমে আছি।”
নবকুমার মেয়ের দিকে তাকালেন। সে চোখ নামিয়ে নিল। নবকুমার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সায়কের দিকে তাকালেন, “তো?”
“আমি সুচিত্রাকে ভালবাসি। সুচিত্রাও বাসে। আমি আমার বাবা-মাকে এর কথা জানিয়েছি। এঁদের কোনও আপত্তি নেই। সুচিত্রার মুখ থেকে আপনারাও আমার কথা শুনেছেন। এই বিষয়ে আপনাদের মত জানতে চাই।”
কোন বিষয়ে।” জিজ্ঞেস করলেন নবকুমার।
“আমরা বিয়ে করতে চাই, এই বিষয়ে, “ কনফিডেন্টলি বলল সায়ক।
পরবর্তী কয়েক সেকেন্ড ঘরে পিন পতনের স্তব্ধতা। সেই নৈঃশব্দ্য ভেঙে খানখান হয়ে গেল নবকুমারের চিৎকারে, “হাউ ডেয়ার ইউ? চট্টোপাধ্যায় বংশের মেয়ের দিকে তাকাতে লজ্জা করে না? এত বড় সাহস যে সরাসরি বাড়ি চলে এসেছ। বদমায়েশির একটা সীমা থাকা উচিত। বিয়ের শখ আমি ঘোচাচ্ছি। তোমার বাবা-মায়ের ফোন নম্বর দাও।”
সায়ক ঠান্ডা মাথায় বলল, “২০১১ সালে দাঁড়িয়ে জাতপাতের কথা বলছেন? স্ট্রেঞ্জ। সুচিত্রা, তুমি তোমার বাবাকে কিছু বলতে পারছ না
“আমার মেয়ে কী বলবে, সেটা তুমি ডিক্টেট করবে নাকি ছোকরা?” পুলিশি হুঙ্কার ছাড়লেন নবকুমার, “সুচি, তুই ভিতরে যা।”
একটাও কথা না বলে সুচিত্রা ভিতরে চলে গেল। মেয়ের সঙ্গে চলে গেলেন জ্যোতির্ময়ী। ঠিক এই সময়েই চড়াত করে বিদ্যুৎ চমকাল। ঠান্ডা এক ঝলক হাওয়া বয়ে গেল। কপালের ঘাম মুছে নবকুমার বললেন, “আমি পুলিশে চাকরি করি। সুচি তোমাকে এটা বলেছে?”
“হ্যাঁ,” ক্লান্ত গলায় বলল সায়ক। নবকুমারের চোখরাঙানি নিয়ে সে চিন্তিত নয়। তাকে ভাবাচ্ছে সুচিত্রার নীরবতা।
“মেয়ে যদি থানায় গিয়ে তোমার নামে মলেস্টেশনের অভিযোগ করে তা হলে তুমি অ্যারেস্টেড হবে। চাকরি মায়ের ভোগে চলে যাবে। বুঝেছ ছোকরা?”
সায়ক ফুঁসে উঠে বলল, “আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
নবকুমার কিছু বলার আগেই বসার ঘরে ঢুকেছেন জ্যোতির্ময়ী। তিনি নরম গলায় সায়ককে বললেন, “বৃষ্টি আসছে। তুমি এখন বাড়ি যাও। এই নিয়ে আগামীকাল কথা হবে।”
সায়ক ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, “একবার সুচিত্রাকে ডেকে দিন। আমি এর সঙ্গে দেখা করেই চলে যাব।”
“ও বাথরুমে গিয়েছে। কাল দেখা কোরো,” সদর দরজা খুলে বললেন জ্যোতির্ময়ী। ইঙ্গিত পরিষ্কার, ‘তুমি এবার এসো।”
বাড়ি থেকে গটগট করে বেরিয়ে বাইকে চড়ে বসল সায়ক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে খ্যাপা ষাঁড়ের উপরে বসেছেন বাবা মহাদেব। বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে দিয়ে ধীর লয়ে এগোচ্ছে সায়কের বাইক। হঠাৎই বৃষ্টি নামল জোরে। নিজেকে যত না, তার চেয়েও বেশি মোবাইলকে বাঁচাতে ‘লা ডোনা বার’-এ ঢুকল সায়ক। আজ মদ্যপান করার ইচ্ছে নেই। চেনা বারে দশ মিনিট বসলে ওয়েটাররা আপত্তি করবে না। চেনা ওয়েটারের কাছ থেকে টাওয়েল চেয়ে নিয়ে টয়লেটে গেল সায়ক। হেলমেটের কারণে মাথা না ভিজলেও টি-শার্ট আর জিনস ভিজেছে। সে সব শুকোনোর উপায় নেই। হাত-মুখ মুছে মোবাইল দেখল সায়ক। যাক বাবা! প্লাস্টিকের পাউচে রাখা ছিল বলে শুকনো আছে।
টয়লেট থেকে বেরিয়ে বারের জানলা দিয়ে বাইরে উকি দিল সায়ক। বৃষ্টি হয়েই চলেছে। বাজ পড়ছে চড়াত-চড়াত করে। সুচিত্রার কথা মনে পড়ে গেল সায়কের। মেয়েটা সেই যে ভিতরের ঘরে ঢুকে গেল, তারপরে আর বেরলো না। বাবা-মা ওকে জোর করে আটকে রাখেনি তো? ও হয়তো সায়কের সঙ্গে দেখা করতে চাইছে কিন্তু ওর বাবা-মা আটকাচ্ছে। মারধরও করছে নাকি? ঘাবড়ে গিয়ে সুচিত্রার মোবাইল নম্বরে ফোন করল সায়ক।
সুচিত্রা ফোন ধরে বলল, “বলো।”
সায়ক বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি কী বলব! বলবে তো তুমি: তোমার বাবা ওইভাবে আমাকে অপমান করলেন। তুমি কিছু বললে না কেন? তুমি তো জানতে যে তোমার ফ্যামিলি গোঁড়া। তা হলে?”
“আমার ভুল হয়ে গিয়েছে সায়ক।”
“কিসসু ভুল হয়নি। তুমি বাবা-মায়ের কথায় ভয় পেয়ো না। আমি তো আছি,” উত্তেজিত সায়ক চেয়ারে বসে ওয়েটারকে দুটো রাম-কোলার অর্ডার দেয়। আড়চোখে দেখে নেয়, দেওয়ালঘড়ি বলছে, দশটা কুড়ি বাজে। বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ নেই।
“আমার ভুল হয়ে গিয়েছে সায়ক। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও” অনুভূতিহীন, একঘেয়ে গলায় বলল সুচিত্রা।
ওয়েটার রামের গ্লাস আর বিনি পয়সার পাঁপড় সাজিয়ে দিয়েছে টেবিলে। সায়ক টকাটক দু’ পেগ মদ শেষ করে বলল, “হোয়াট ডু ইউ মিন বাই ‘ভুল হয়ে গিয়েছে? আজ তোমাদের বাড়ি যাওয়ার সময় বাইকের পিলিয়নে বসে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কানে-কানে বললে, ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না সায়ক। তোমাকে একদিন দেখতে না পেলে আমি মরে যাব সেইসব কথা ভুল হয়ে গেল? মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে?”
“আমার ভুল হয়ে গিয়েছে সায়ক। তুমি আমাকে ভুলে যাও,” নতুন একটি বাক্য যোগ করল সুচিত্রা।
আবার বাজ পড়ল। এবার পড়ল সায়কের মাথায়। সে বুঝতে পারল যে সে হেরে গিয়েছে। সুচিত্রা তাকে আর ভালবাসছে না। আর কোনও দিনও ভালবাসবেও না। আঙুলের ইশারায় আরও দুটো রাম-কোলার অর্ডার দিয়ে সায়ক বলল, “কিন্তু কেন? আমার কী অপরাধ তুমি আর আমি অন্য জাত বলে? এঁদের এই কথাটা তুমি মেনে নিচ্ছ? নাকি এঁরা তোমার উপর চাপ সৃষ্টি করছেন? আমি তোমাদের বাড়ি আবার যাব? আর ইউ ইন ডেঞ্জার?”
“তুমি আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো না। ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া, কোথাও নয়। আমি কাল থেকে আর অফিস যাব না। রাখছি, “ যন্ত্রমানবীর মতো কথা ক’টা বলে ফোন কেটে দিল সুচিত্রা।
মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বেকুবের মতো বসে রইল সায়ক। হঠাৎ সুচিত্রার উপরে বেদম রাগ হল তার। পরমুহূর্তে মনে হল মেয়েটা বোধ হয় বিপদে পড়েছে। তারপরে প্রবল অভিমান হল। এইভাবে কেউ কাউকে ফোনে ডাম্প করতে পারে? সুচিত্রা তাকে আদৌ কখনও ভালবেসেছিল? নাকি ভালবাসার অভিনয় করেছে। সে এত বোকা যে অভিনয় বুঝতেই পারেনি? নিজের উপরে ধিক্কার আসছে সায়কের। অনুভূতির ক্যালাইডোস্কোপ খেলা করছে সায়কের মাথার মধ্যে। কখনও নিজের উপরে রাগ হচ্ছে, কখনও ঘেন্না আসছে। কখনও ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে সুচিত্রাকে খুন করতে। অনুভূতির ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে, ডুবতে ডুবতে সায়ক আরও অনেকগুলো রাম- কোলা মেরে দিল।
কতগুলো মেরে দিল? জানা নেই। টলতে টলতে উঠে টয়লেটে গিয়ে হিসি করল। মোবাইল প্লাস্টিকের পাউচে ভরে জিনসের পকেটে ঢোকাল। বিল মিটিয়ে, ওয়েটারকে টিপ দিয়ে লা ডোনা থেকে বেরিয়ে দেখল, বৃষ্টিতে একলা ভিজছে তার বাইক। সায়ক পণ করল, কালকেই সুচিত্রার চেয়েও সুন্দরী একটা মেয়েকে তুলবে। কালকেই।
বাইকে চড়ে স্টার্ট দিয়ে সায়ক চেঁচাল, “টুমরো বাই সিক্স পিএম। ইট্স আ প্রমিস!” তারপরে বৃষ্টির ফোঁটার মধ্য দিয়ে তিরের মতো ছিটকে গেল।
ভিজে হাইওয়ে। রাত এগারোটা। ট্রাফিক পুলিশহীন রাস্তায় বেপরোয়া ট্রাক। মাতাল বাইক চালকের হাতে দেড়শো কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় ছুটে যাওয়া বাইক! বেঘোরে প্রাণ হারানোর যাবতীয় উপকরণ মজুত। এবং যা ঘটার, তাই-ই ঘটল। একটা ট্রাককে পাশ কাটাতে গিয়ে রাস্তার ডিভাইডারে সজোরে ধাক্কা মারল সায়ক। বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে ফুলঝুরির মতো আগুনের ফুলকি উড়িয়ে, বিকট শব্দ করে বাইক উড়ে গিয়ে পড়ল একটি দোকানের শাটারে। শাটার থেকে সায়ক বুলেটের মতো আছড়ে পড়ল পাশের বাড়ির দেওয়ালে। সেখানে ধাক্কা খেয়ে ওর শরীর ছিটকে গিয়ে পড়ল রাস্তার মাঝখানে। হাত, পা আর ঘাড় বিশ্রীভাবে বেঁকে আছে। দেখেই বোঝা যায় অনেকগুলো হাড় ভেঙেছে। হেলমেটের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে আসা মোটা দাগের রক্তস্রোত ধুয়ে দিচ্ছে বৃষ্টির জলের ঝাপটা। সায়কের শরীরের পাশ দিয়ে হুশহুশ করে চলে যাচ্ছে ট্রাক আর লরি, বাইক আর স্কুটার কেউ ঘুরেও দেখছে না।
বৃষ্টি পড়েই চলেছে…
*
১৬ মে রাত আড়াইটের সময় সায়কের বাবা রাজর্ষির মোবাইলে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। রাজর্ষি আর মোহর জেগেই বসেছিলেন। মোহর বারবার ফোন করছিলেন ছেলের মোবাইলে। ফোন ক্রমাগত বেজে গিয়েছে। সায়ক ফোন ধরেনি। মোবাইলে দু’-একটা কথা বলে ফোন কেটে দিলেন রাজর্ষি। তাঁর ভুরু কুঁচকে। চোয়াল শক্ত। মোহর যা বোঝার বুঝে গিয়েছেন। হাউ হাউ করে কাঁদছেন আর বলছেন, “সায়কের কী হয়েছে গো? তুমি আমায় বলো না!”
“অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ও আয়াঙ্গার হাসপাতালে ভর্তি আছে।”
“হ্যাঁ গো, আমাদের ছেলেটা বেঁচে আছে তো!” রাজর্ষির বুকে মাথা রেখে কাঁদছেন মোহর। তাঁকে সরিয়ে তড়াক করে খাট থেকে উঠলেন রাজর্ষি। শার্ট আর ট্রাউজার্স গলিয়ে মোহরকে সংক্ষেপে জানালেন কে ফোন করেছিলেন।
কয়েকজন ফুটপাথবাসী অ্যাক্সিডেন্টটা দেখতে পেয়ে পুলিশ কিয়ন্তে খবর দেয়। পুলিশ অজ্ঞান সায়ককে আয়াঙ্গার হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করে। পুলিশই সায়কের পকেট থেকে মোবাইল বের করে ‘লাস্ট ডায়াড নাম্বার’-এ ফোন করেছিল। সুচিত্রার ফোন ধরেন তার বাবা নবকুমার। তিনিই সবটা শুনে রাজর্ষিকে ফোন করেছেন।
রাতপোশাক বদলে শাড়ি পরে নিয়েছেন মোহর। আলমারি খুলে টাকার বান্ডিল, ক্রেডিট আর ডেবিট কার্ড বের করছেন। গলায় ঝোলানো মা কালীর লকেট মুঠোর মধ্যে নিয়ে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করছেন।
সাঁ সাঁ করে গাড়ি চালিয়ে রাত তিনটের সময়ে আরাঙ্গার হাসপাতালে চলে এলেন দু’জনে। চেন্নাইয়ের অন্যতম বড় এই হাসপাতালটি অর্থোপেডিক্স এবং টমা কেয়ারের জন্যে বিখ্যাত। টমা কেয়ার’ বলতে বোঝায় আঘাতের চিকিৎসা। সেই আঘাত ছাদ থেকে পড়ে হতে পারে, মার খেয়ে হতে পারে, রোড ট্র্যাফিক অ্যাক্সিডেন্ট থেকেও হতে পারে।
আয়াঙ্গার হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট জানাল, সায়ক এখন অপারেশন থিয়েটারে। সে কেমন আছে জানতে চাওয়ায় উত্তর দিতে পারল না।
অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। ওয়েটিংরুমের চেয়ারে বসতে না বসতেই সেখানে হাজির হলেন নবকুমার, জ্যোতির্ময়ী এবং ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার সুচিত্রা আসেনি। চট্টোপাধ্যায় দম্পতি তাকে সুন্দর বালাচন্দ্রের জিম্মায় রেখে এসেছেন। সুন্দরকে একবার ফোন করতেই সে তাঁদের বাড়ি চলে এসেছে।
পুলিশকে বয়ান দেওয়ার সময় নবকুমার চেপেচুপে বললেন। জাতপাতের প্রসঙ্গ বা মলেস্টেশনের মিথ্যে অভিযোগে গ্রেফতার করার প্রসঙ্গ তুললেন না। তা ছাড়া পুলিশ অফিসার তাঁর পরিচিত। ও ম্যানেজ করে নেবে। ভারপ্রাপ্ত অফিসার হাসপাতাল থেকে চলে গেলেন ভোর চারটের সময়। নবকুমার আর জ্যোতির্ময়ী গেলেন সকাল সাতটায়। দু’জনেরই অফিস আছে।
১৬ তারিখ সকাল সাতটা থেকে সকাল আটটা। আটটা থেকে ন’টা, দশটা, এগারোটা… কোনও খবর নেই। দুপুর বারোটার সময় জানা গেল সায়ক মণ্ডলের বাড়ির লোককে ডাঃ পীযূষ আইচ খুঁজছেন।
তামিলনাডুর হাসপাতালে অজস্র বাঙালি চিকিৎসক চাকরি করেন। পীযূষ তাঁদেরই একজন। বয়স আটত্রিশ বছর। সৌম্যদর্শন। গায়ের রং ফরসা। শার্ট এবং ট্রাউজার্সের উপরে রক্তলাঞ্ছিত অ্যাপ্রন পরিহিত পীযূষ একজন
অ্যানেস্থেটিস্ট বা অবেদনবিদ। একইসঙ্গে তিনি আইসিইউ এক্সপার্ট।
“পেশেন্টের দুই পায়ের হাড় ভেঙেছে, দুই হাতের হাড় ভেঙেছে, ছ’টা পাঁজরা ভেঙেছে,” বাংলায় কথা বলছেন পীযূষ। তাঁর হাত ধরে মোহর জিজ্ঞেস করলেন, “ও কেমন আছে? বলুন না ডাক্তার!”
পীযূষ বলে চলেছেন, “হিউজ ব্লাড লস হয়েছে। আমরা অলরেডি দু’ ইউনিট ব্লাড দিয়েছি। পেশেন্টের মাথায় ম্যাসিভ চোট আছে। সিটি স্ক্যানে দেখা গিয়েছে মাথার মধ্যে রক্তক্ষরণ হয়েছে। পেশেন্ট এখন ভেন্টিলেশনে।”
“ওহ মাই গড!” বিড়বিড় করে বললেন রাজর্ষি।
“ও বেঁচে তো?” জিজ্ঞেস করলেন মোহর।
“হি ইজ্ ইন কোমা। তার মানে এই নয় যে ওর ভাল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই ক্রিটিকাল অবস্থা থেকেও অনেক পেশেন্ট ভাল হয়ে যায়। তার জন্যে সবার আগে ওর মাথা থেকে রক্তের ডেলাটা বের করতে হবে। আপনারা অনুমতি দিলে আমরা সার্জারি শুরু করব।’
মোহর বললেন, “ডাক্তার, আপনি অপারেশন শুরু করুন। প্লিজ।”
মোহর আর রাজর্ষি যখন অনুমতিপত্রে সই করছেন, তখন পীযূষ ঢুকে গিয়েছেন ওটি-তে। সন্ধে ছ’টার সময় এটি থেকে বেরিয়ে, রাজর্ষি বা মোহরের সঙ্গে কথা না বলে তিনি চলে গেলেন। রিসেপশনিস্ট জানাল, অপারেশন হয়ে গিয়েছে। পীযূষ আবার আসবেন। তবে এখন নয়। রাতে।
এই দীর্ঘ সময় মোহর আর রাজর্ষি আয়াঙ্গার হাসপাতালের কাফেটেরিয়ার চা আর কেক খেয়ে কাটিয়ে দিলেন। খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও জোর করে
খেয়েছেন। না হলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
১৬ মে চলে গেল। এল ১৭ মে। রাত বারোটা কুড়ি মিনিটে পীযূষ কাফেটেরিয়ায় এসে মণ্ডল দম্পতিকে বললেন, “ব্রেন থেকে ব্লাড বের করে দেওয়া হয়েছে। সায়ক ভেন্টিলেশনে আছে। এখন একটাই কাজ, অপেক্ষা।”
“আমার ছেলেটা ভাল হবে তো?” অঝোরে কাঁদছেন মোহর। তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে পীযূষ বললেন, “আটচল্লিশ ঘণ্টা না পেরনো পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না। ১৯ মে রাতে আবার আপডেট দেব। এখন আপনারা বাড়ি যান।”
কাফেটেরিয়ার দেওয়ালঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটার ঘণ্টা বাজল।
