।। ছয় ।।
২০ মে রাত সাড়ে বারোটা থেকে ২০ মে রাত দুটো।
.
স্বপন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকলেও চট করে উঠে পড়তে পারেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। রোজ রাতেই একবার বা দু’বার তাঁকে রোগীর বাড়ির লোকের ফোন ধরার জন্যে উঠতে হয়।
মিলি আর ঝিলিকের যাতে ঘুম না ভাঙে, সেইজন্যে মোবাইল ফোন ভাইব্রেটর মোডে রাখেন স্বপন। বালিশের নীচে রাখা থাকলেও ফরর ফরর’ করে শব্দ হয়। ওতেই ঘুম ভেঙে যায়।
গত কদিন ধরে শুতে শুতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে যাচ্ছে। তার কারণ রিমুল।
গত ১৭ মে রাতে সিথ্রি-র সিস্টার রিমুলের কেবিনে ঢুকে দেখে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। অক্সিজেন মাস্ক পড়ে রয়েছে মেঝেতে। স্বপন বাড়ি চলে এসেছিলেন। আবার দৌড়তে হয় সিথি। অনেক চেষ্টার পরে রিনুলকে সুস্থ করা গিয়েছে। কিছুটা স্টেবল হওয়ার পরে স্বীকার করেছে, সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। সেই জন্যেই অক্সিজেন মাস্ক ছুড়ে ফেলে দেয়।
যে-কোনও পুরনো অসুখে বিষাদ আসে। বিষণ্ণতা থেকে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। এক মনোচিকিৎসক রিমুলকে দেখে ওষুধ দিয়েছেন। রিমুল আপাতত মরে যাওয়ার কথা ভাবছে না। স্বপন হাসপাতালের সব কাজ চুকিয়ে রিমুল আর ওর বাবা-মাকে কাউন্সেলিং করেন। ক’দিন ধরে এই কারণেই বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে।
ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিয়ে স্বপন দেখলেন অচেনা মোবাইল নম্বর থেকে ফোন এসেছে। ফোন ধরে নিচু গলায় বললেন, “হ্যালো!”
“হাই! সরি টু ডিস্টার্ব ইউ ডক্টর মিশ্রা। দিস ইজ্ ডক্টর পীযূষ আইচ ফ্রম আয়াঙ্গার হসপিটাল, চেন্নাই। ক্যান আই টক টু ইউ ফর ফাইভ মিনিটস?” পরিশীলিত ইংরিজিতে বলছেন কেউ। উচ্চারণে দক্ষিণী টান নেই।
স্বপন বিছানা থেকে উঠে ডাইনিং স্পেসে এলেন। এখানে কথা বললে মিলি আর ঝিলিকের ঘুম ভাঙবে না। চেয়ারে বসে স্বপন বললেন, “আইচ আর ইউ বেঙ্গলি?”
“ইয়েস স্যার। বাই দ্য ওয়ে, আর ইউ বেঙ্গলি টু?”
“হ্যাঁ, আপনি বলুন।”
পীযূষ গড়গড় করে বললেন সায়কের কথা। স্বপন সবটা শুনে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি আন্তঃরাজ্য পুল থেকে ডোনারের খবর পেলেন?”
“হ্যাঁ ওয়েবসাইটে দেখলাম রিমুল সেন পটনার সিপ্রিতে আপনার আন্ডারে ভর্তি আছে। তাই ফোনটা করলাম। রিমুল এবং সায়ক, দু’জনেই এবি পজিটিভ।”
“আপনাদের ওখানে কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্টের সেট আপ আছে?” জিজ্ঞেস করলেন পীযূষ।
“স্যার! আমরা অর্থোপেডিক সার্জারি আর উমা কেয়ার নিয়ে ডিল করি। সিগ্রিতে কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হয় না?”
“পটনা ব্রাঞ্চে এখনও সিস্টেম ডেভেলপ করানো যায়নি। ওটা কলকাতার সিঞ্জিতে আছে।”
“ঠিক আছে স্যার। তা হলে ছেড়ে দিন। আমি অন্য স্টেটে দেখছি। গুড নাইট,” ফোন কেটে দিয়েছেন পীযূষ।
স্বপন অন্ধকার ড্রয়িং রুমে গাল হাত দিয়ে ভাবছেন। পটনা সিথ্রিতে সেট আপ না থাকলেও কলকাতা ব্রাঞ্চে তো আছে। রঘুবীরকে একবার ফোন করা যাক। ভাবা মাত্র রঘুবীরের মোবাইলে ফোন করলেন স্বপন।
*
রঘুবীরও ঘুমোচ্ছিলেন। তবে তাঁর ওষুধের ঘুম। সহজে ভাঙতে চায় না। স্বপন বারচারেক ফোন করার পরে রঘুবীর ফোন ধরে জড়ানো গলায় বললেন, “কী ব্যাপার? এত রাত্তিরে?”
স্বপন ভাবছিলেন কীভাবে কথা শুরু করবেন। তিনি বললেন, “একটা কথা আমি গত তিন বছর ধরে জানি। তোকে বলিনি।”
“তা হলে আরও আট ঘণ্টা পরে বলিস। এখন আমাকে ঘুমোতে দে…” বিড়বিড় করে বললেন রঘুবীর।
“যা বলছি মন দিয়ে শোন। রিমুল এবং ওর বাবা-মা এখন পটনায় থাকে। রিমুল বিয়ে করেনি। ও গত তিন বছর ধরে আমার পেশেন্ট। ডায়লেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি। মেডিসিনে আর কাজ হচ্ছে না। হার্টের যা অবস্থা তাতে ট্রান্সপ্লান্ট না করলে বাঁচবে না।”
“ওই হার্টলেস লেডি বিয়ে করেছে না করেনি সেটা জেনে আমি কী করব?”
“বাজে না বকে যা বলছি শোন। রিমুলের ব্লাড গ্রুপ এবি পজিটিভ। এক্ষুনি চেন্নাইয়ের আয়াঙ্গার হাসপাতাল থেকে ডক্টর পীযূষ আইচ আমাকে ফোন করে বললেন, চেন্নাইয়ে এক পেশেন্টের ব্রেন ডেথ হয়েছে। ছেলেটি এবি পজিটিভ। তার হার্ট পাওয়া যাবে। কিন্তু পটনা সিথ্রিতে ট্রান্সপ্লান্টের সেট আপ নেই। আমি ভাবছিলাম যদি কলকাতায় ট্রান্সপ্লান্টটা করা যায়।
রঘুবীর হাই তুলে বললেন, “এটা আমি কী করে বলি বল! এটা নিয়ে কথা বলবেন মেহুল।”
“আমি কি একবার মেহুলের সঙ্গে কথা বলে দেখব?”
“সেটা আমিই বলছি। আমি তোকে রিং ব্যাক করছি দুইদিন ফিফটিন মিনিটস। দয়া করে ঘুমিয়ে পড়িস না,” ফোন কাটলেন রঘুবীর।
*
রাত সাড়ে বারোটার সময়েও মেহুল সিথ্রি-র চেম্বারে ছিলেন। রঘুবীর ফোন করে তাঁকে সংক্ষেপে স্বপনের সঙ্গে ফোনালাপের বর্ণনা দিলেন। সেটা শুনে মেহুল বললেন, “আপনি প্লিজ একবার আমার চেম্বারে আসুন। এক্ষুনি।”
চোখে-মুখে জল দিয়ে পোশাক বদলে বাড়ি থেকে মেহুলের চেম্বারে যেতে খুব বেশি হলে দশ মিনিট লেগেছে। সেখানে পৌঁছে রঘুবীর দেখলেন মেহুলের সামনে ডেস্কটপ খোলা। টেবিলে একটা স্মার্টফোন আর একটা ল্যান্ডফোন। আর একটা মোবাইলে মেহুল স্বপনের সঙ্গে কথা বলছেন এবং কাগজে নোট নিচ্ছেন। ইশারায় তিনি রঘুবীরকে বসতে বললেন। মেহুলের কথা শুনে বোঝা গেল স্বপন ওদিক থেকে পীযূষ আইচকে কনফারেন্স কলে জুড়ে নিয়েছেন। মেহুল নোট নিচ্ছেন, লিখে নিচ্ছেন পীযূষের মোবাইল নম্বর। আরও নানা তথ্য নোট করে ফোন কেটে একগাল হাসলেন মেহুল। রঘুবীরকে বললেন, “ডক্টর, আমাকে সবাই কী বলে জানেন তো? ‘ম্যান অফ স্টিল। যে কোনও ডিসিশন নিতে আমার বুক কাঁপে না। সেটা পার্সোনাল লাইফ হোক বা প্রফেশনাল।”
“কী ডিসিশন নিলেন?” জিজ্ঞেস করলেন রঘুবীর।
সিস্টার ললিতা চেম্বারের কোনে বসেছিল। রঘুবীরকে দেখে দু’কাপ ধূমায়িত চা টেবিলে রেখে গেল। চায়ে চুমুক দিয়ে মেহুল বললেন, “আমি ক’দিন আগে আপনাকে কী বলেছিলাম, মনে আছে?”
ঘুমের ওষুধ খেয়ে রঘুবীরের মাথা আস্তে চলছে। তিনি বললেন, “বলেছিলেন?”
“আমি বলেছিলাম, আমাদের এমন একটা কিছু করতে হবে সবাই চমকে যায়। এমন একটা ডেয়ারিং কাজ, যেটা দেখে সবাই বলবে, এই জিনিস কলকাতা শহরে সম্ভব? বলেছিলাম না?”
রঘুবীর চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “আমি তার উত্তরে বলেছিলাম, ‘আমি চিকিৎসক। সুপারম্যান নই।
“অবশ্যই আপনি সুপারম্যান ডক্টর। ইন ফ্যাক্ট আমিও সুপারম্যান। সাধারণ মানুষ যখন কোনও অসাধারণ কাজ করে তখনই সে সুপারম্যান হয়ে যায়।”
“সেই অসাধারণ কাজটা কী?”
“কলকাতায় এখনও পর্যন্ত একটাও কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হয়নি। সেই কাজটা সিঞ্জিতেই প্রথম হবে এবং এমন একটা কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হবে, যেখানে হার্ট আসবে চেন্নাই থেকে আর রেসিপিয়েন্ট আসবে পটনা থেকে। এর চেয়ে ভাল ইমেজ বিল্ডিং এক্সারসাইজ হতে পারে?”
“কার ইমেজ বিল্ডিং? সিথ্রি-র?”
“আমি বিজনেসম্যান আমি সিথ্রি-র ইমেজের কথাই ভাবছি। কিন্তু ডক্টর, আপনি ভাবুন তো একবার। এর ফলে কি ক্যালকাটার হেল্থ সেক্টরের ইমেজ বিল্ডিং হবে না? বাংলার মুখ উজ্জ্বল হবে না? আপনার স্কিলের কথা সারা দেশ জানবে না”
রঘুবীর ম্লান হাসলেন। বিদেশে থাকার সময়ে দিন-রাত এক করে দিয়েছিলেন সার্জিক্যাল স্কিল ডেভেলপ করতে গিয়ে। একের পর এক হার্টের জটিল অপারেশন করেছেন। সেই শিক্ষা নিয়ে যখন বাংলায় ফিরেছিলেন, তখন চোখে ছিল হাজার স্বপ্ন নিজের দেশে শলা-দক্ষতা প্রয়োগ করে রোগীদের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে, এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন।
দেশে ফিরে লাভটা কী হল? রুটিন কাজ করতে করতে স্কিলে জং ধরেছে। চ্যালেঞ্জ নিতে ইচ্ছে করে না। কেন না কাটা উত্তরে গেলে কেউ প্রশংসা করবে না। কিন্তু ভুল করলে কোর্টে, থানায়, মেডিক্যাল কাউন্সিলে টেনে নিয়ে যাবে।
দীর্ঘশ্বাস চেপে রঘুবীর বললেন, “কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট আমার কাছে রুটিন কাজ। কিন্তু এই প্রজেক্টের আসল দায়িত্ব কো-অর্ডিনেটরের।”
“সেই কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে,” হাতে হাত ঘষে উত্তেজিত হয়ে বললেন। মেহুল, “সবার আগে প্রয়োজন সায়কের বাবা-মায়ের অনুমতি। সেটা পাওয়া গেল কি না দেখছি। আপনাকে ডেকেছিলাম এইটা জানতে যে আপনি অপারেশন করবেন কি না। আপনি যখন গ্রিন সিগনাল দিয়েছেন, তখন আমি বাকিটা দেখছি। আপনি রেস্ট নিন। কাল সকালে সব জানাব।”
“আচ্ছা,” মেহুলের চেম্বার থেকে বেরলেন রঘুবীর। আজ রাতে আর ঘুম আসবে না। স্বপনকে ফোন করতে হবে। মেহুল আবার তাঁকে ফোন করতে পারেন।
*
রঘুবীর যখন নিজের বাংলোর দিকে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় আযাঙ্গার হাসপাতালে চেম্বার থেকে বেরিয়ে মোহর আর রাজর্ষির মুখোমুখি হচ্ছেন পীযূষ। নিচু গলায় বলছেন, “একজন মাত্র এবি পজিটিভ রেসিপিয়েন্ট পাওয়া গিয়েছে। মাত্র একজন। অ্যান্ড শি নিডস আ হার্ট!”
পীযূষের কথা শুনে মোহর রাজধিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। রাজর্ষি স্ত্রীকে সামলাতে সামলাতে বললেন, “কোথায় কী সইসাবুদ করতে হবে বলুন। আমরা করে দিচ্ছি। বাই দা ওয়ে। উই নিড প্রাইভেসি, প্রিয়!”
সবাই আস্তে আস্তে সরে গেলেন। পীযূষের ইশারায় আয়াঙ্গার হাসপাতালের এক কর্মী এগিয়ে এল কাগজ নিয়ে।
পীযূষ বললেন, “সমস্ত ডকুমেন্ট রেডি না হওয়া পর্যন্ত সায়ক ভেন্টিলেটরেই থাকবে।”
রাজর্ষি আর মোহর চুপ করে রয়েছেন। তাঁদের একা থাকতে দিয়ে পীযূষ ফিরে যাচ্ছেন চেম্বারে। এমন সময় তাঁর মোবাইলে আবার মেহুলের ফোন এল। এই ভদ্রলোকের সঙ্গে একটু আগে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন পটনা সিথ্রি-র স্বপন। আগামী কয়েকদিন অনেকবার কথা হবে, এটা পীযূষ জানেন। তাই মোবাইল নম্বর সেভ করে রেখেছেন।
ফোন ধরে পীযূষ বললেন, “নমস্কার, বলুন।”
মেহুল বললেন, “নমস্কার ডক্টর আইচ। আমি আর-একটা কনফারেন্স কলে রয়েছি। আমার সঙ্গে আছেন ন্যাশনাল অর্গ্যান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজেশন বা নোটোর চেয়ারম্যান কিশোর ভাণ্ডারী এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজা স্বাস্থ্য দফতরের নোডাল অফিসার কমল সরকার। ডক্টর ভাণ্ডারী, আপনি শুরু করুন।”
প্রথমে কিশোর এবং তারপরে কমল অর্গ্যান ট্রানপ্লান্টের নিয়মাবলি বলে দিলেন। এগুলো সবই পীযূষের জানা। চুপচাপ শুনলেন। কনফারেন্স কল শেষ হওয়ার পরে শুরু হল ইমেল মারফত বিভিন্ন ডকুমেন্ট চালাচালি। সবাই সব নথি পেয়ে যাওয়ার পরে আরও একবার কনফারেন্স কল হল। অবশেষে রাত পৌনে দুটোর সময়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের তরফে অর্গ্যান ডোনেশান নিয়ে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা ‘এনওসি চলে এল। সেটা পেয়ে উত্তেজিত মেহুল আর একবার কনফারেন্স কল করলেন। এবারে ফোনে রয়েছেন পীযূষ আর স্বপন।
মেহুল বললেন, “এনএসি চলে এসেছে মানে কাঙলে ঝামেলা শেষ। এবার প্র্যাক্টিক্যাল সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
পীযূষ বললেন, “মিস্টার সাহা, আমার একটা বক্তব্য আছে। পেশেন্ট আছে পটনায়। অর্গ্যান আছে চেন্নাইতে। আমার তো মনে হয় অপারেশনটা চেন্নাইতে হওয়াই ভাল। আমাদের এখানে অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্টের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধেও আছে।”
মেহুল কিছু বলার আগে স্বপন বললেন, “পেশেন্ট বেড রিডন। চব্বিশ ঘণ্টা অক্সিজেন সাপোর্টে রয়েছে। কার্ডিয়াক মনিটর লাগানো আছে। প্লেন বা ট্রেন বা গাড়িতে ওকে চেন্নাই পাঠানো যাবে না।”
“তা হলে?” জিজ্ঞেস করলেন পীযূষ।
“পটনায় এটি করলে ভাল হত। কিন্তু সেই উপায় নেই। কাজেই রিমুলকে কলকাতায় নিয়ে যেতে হবে। এবং সেটা ক্রিটিকাল কেয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে।
পীযূষ বললেন, “ইন দ্যাট কেস, অর্গ্যান নিয়ে আমি কলকাতা যাব। অ্যানেস্থেটিস্ট হিসেবে আমি চেন্নাইতে একাধিক কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট কেসে অজ্ঞান করার দায়িত্বে ছিলাম। আমি ওটিতে থাকলে আপনাদের সুবিধে হবে।”
“থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর?” কৃতজ্ঞতার গলা বুজে আসছে মেহুলের।
পীযূষ বললেন, “আমি প্লেনের টিকিটের ব্যবস্থা করে আপনাকে রিং ব্যাক করব। গুড নাইট।”
কনফারেন্স কল থেকে বেরিয়ে গেলেন পীযূষ। এবার স্বপন বললেন, “পটনা সিগ্রিতে কিন্তু ক্রিটিকাল কেয়ার অ্যাম্বুল্যান্স নেই।”
এই প্রজেক্টে হাত দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক ঝামেলা শুরু হয়েছে। কিন্তু তাতে ঘাবড়ালে চলবে না। ঠান্ডা মাথায় নিজেকে বোঝালেন মেহুল। বললেন, “পটনার অন্য কোনও ক্লিনিক বা নার্সিংহোমে নেই? এদের থেকে ভাড়া নেওয়া যাবে না?”
“নেই। আমি জানি।”
“ইন দ্যাট কেস, আমি কলকাতা থেকে অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাচ্ছি। আমি অনেকবার কলকাতা থেকে বাই রোড পটনা গিয়েছি। বারো-তেরো ঘন্টা সময় লাগে। কালকের মধ্যে আপনি অ্যাম্বুল্যান্স পেয়ে যাবেন।”
“ঠিক আছে। পাঠিয়ে দিন। আমাকেও সেক্ষেত্রে রিমুলের সঙ্গে কলকাতা যেতে হবে। উইদাউট মেডিকাল সুপারভিশন ওকে পাঠানো যাবে না,“ ফোন কাটলেন স্বপন। শোওয়ার ঘরে এসে ঝিলিক আর মিলির পাশে শুয়ে পড়লেন। আজ রাতে সাউন্ড স্লিপ জরুরি।
*
চেন্নাইতে তখন পীযূষ নিজের চেম্বারের বাইরে বেরিয়ে সবাইকে বলছেন, “অর্গ্যান ডোনেশনের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র আমরা পেয়ে গিয়েছি। এখন চেন্নাই পুরসভার চেয়ারম্যান আর চেন্নাই পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে হবে, যাতে হাসপাতাল থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার রাস্তা ক্লিয়ার থাকে।
নবকুমার বললেন, “আমি চেন্নাই পুলিশে আছি। আমার স্ত্রী জ্যোতির্ময়ী চেন্নাই মিউনিসিপ্যালিটিতে আছে। গ্রিন করিডোর বানানোর দায়িত্ব আমাদের উপরে ছেড়ে দিন।”
রাজর্ষি অবাক হয়ে বললেন, “গ্রিন করিডোর? সেটা আবার কী?”
*
চেন্নাইয়ের আয়াঙ্গার হাসপাতালে পীযূষ যখন রাজর্ষি আর মোহরকে বোঝাচ্ছেন গ্রিন করিডোর’ কাকে বলে, তখন কলকাতার সিথ্রিতে নিজের চেম্বারে বসে মেহুল মোবাইলে কথা বলছেন রঘুবীরের সঙ্গে।
রঘুবীর ঘরে ফিরে পোশাক বদলেছেন। জল খেয়ে বললেন, “বলুন।”
মেহুল বললেন, “আমাদের কাছে রুংটা কোম্পানির ক্রিটিকাল কেয়ার অ্যাম্বুল্যান্স আছে না? সেটার কী খবর?”
“কী আবার খবর! ভালই আছে।”
“এর মধ্যে কী কী আছে?”
মাথা চুলকে রঘুবীর বললেন, “এই জাতীয় হাই এন্ড অ্যাম্বুল্যান্সে যা থাকে। স্ট্রেচার-কাম-টুলি-কাম-হুইলচেয়ার, সাকশন পাম্প, রিসাসিটেশন ইকুইপমেন্ট, ইমার্জেন্সি ভেন্টিলেটার, কম্পিউটারাইজড ইসিজি মেশিন। সেসব ছাড়াও পোর্টেবল ডিফিব্রিলেটার, পেসমেকার, পোর্টেবল ভাইটাল সাইন মনিটর, গ্যাস পাইপ লাইন উইথ প্যানেল, ওয়াই-ফাই।”
“পটনার পেশেন্টকে ওই অ্যাম্বুল্যান্সে করে কলকাতায় আনতে হবে। কে যেতে পারবে?”
“যে-কোনও ড্রাইভারই যেতে পারে। তবে একটু-আধটু টেকনিক্যাল কাজ জানে এমন একজনই আছে। সেটা হল প্রান্তর। এই অ্যাম্বুল্যান্সের একটাই প্রবলেম। রোডকিং ছাড়া অন্য কোনও কোম্পানির টায়ার লাগে না। আর ওই টায়ার কলকাতার একটা নির্দিষ্ট শো রুম ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।”
“সেটা নিয়ে পরে ভাবব। আপাতত যা বলছি শুনুন। আমি প্রান্তরকে ফোন করে বলছি পটনা বেরিয়ে যেতে। আশা করা যায় কাল রাতের মধ্যেই প্রান্তর রিমূলকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসতে পারবে।”
রঘুবীরের হালকা ঘুম পাচ্ছিল। প্রান্তর আর রিমুলের নাম পরপর শুনে ঘুম উড়ে গেল। তিনি বললেন, “আপনাকে ফোন করতে হবে না। প্রাপ্তর তো পাশেই থাকে। আমি ওকে বলে দিচ্ছি। আপনি পটনা সিথ্রি-র ঠিকানাটা প্রান্তরের ফোনে মেসেজ করে দিন।”
প্রান্তরকে স্মার্টফোনটা রঘুবীরই উপহার দিয়েছেন।
“আমি এক্ষুনি মেসেজ করে দিচ্ছি,” বললেন মেহুল, “আপনি প্লি প্রান্তরের সঙ্গে কথা বলে ওকে এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে বলুন। হাজার পঞ্চাশ টাকাও দিয়ে দিন। আমি সকালে আপনাকে দিয়ে দেব। আমাকে এখন কলকাতা পুলিশের ডিসি সুধীর সেন আর বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের প্রধান সায়ন্তন মিত্রর সঙ্গে কথা বলতে হবে। কলকাতায় গ্রিন করিডোর তৈরি করার জন্যে।
মেহুল ফোন কেটে দিয়েছেন। রঘুবীর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপরে স্বপনকে ফোন করলেন।
স্বপন ফোন ধরে নিচু গলায় বললেন, “আবার কী হল? ঘুমোতে দিবি না।”
রঘুবীরও নিচু গলায় বললেন, “তুই তিন বছর ধরে আমাকে বলিসনি যে রিমুল সেন এখন পটনায় থাকে।”
“এটা বলার মতো কোনও কথা হল। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকে মেয়েটাকে আর দেখিনি। ওর বাপ-মাকে তো আমি চিনতামই না। রিমুল আমাকে চিনতে পারেনি। আমিও চেপে গিয়েছি। এটা নিয়ে মাঝরাতে ঝামেলা করছিস কেন।”
রঘুবীর মৃদু হেসে বললেন, “তুই যেমন রিমুলের খবর আমার কাছে চেপে গিয়েছিস আমিও তেমনি প্রান্তরের খবর তোর কাছে চেপে গিয়েছি।”
“তা হলে আর কী! ওয়ান অল হয়ে গেল। বাই দ্য ওয়ে, প্রান্তরকে নিয়েও আমার কোনও আগ্রহ নেই। গাছটি একটা!”
“প্রান্তর এখন সিথ্রি-র কলকাতা ব্রাঞ্চের সিকিউরিটি অফিসার কাম ড্রাইভার। দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে থেকেছে বলে মেডিসিনের বেসিক কিছু কাজ জানে। ইসিজি করা, ব্লাড টানা, অক্সিজেনের নল লাগানো। সবচেয়ে বড় কথা, লং ড্রাইভের জন্যে বেস্ট লোক।
“সর্বনাশ করেছে।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন স্বপন, “তুই কি ওকেই পাঠাচ্ছিস অ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার হিসেবে?”
“হ্যাঁ।”
দীর্ঘ নীরবতার শেষে স্বপন বললেন, “এত বছর বাদে ওদের আবার দেখা হবে। কী হবে কে জানে।”
উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে, ড্রয়ার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরলেন রঘুবীর। উলটো দিকের কোয়ার্টারের কলিং বেল টিপতেই ‘চ্যাঁ’ করে আওয়াজ হল। বারমুডা পরা, খালি গা, ছ’ফুট লম্বা প্রান্তর দরজা খুলে রঘুবীরকে দেখে অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করল না, “আসুন স্যার
কুড়ি বছর আগে তুইতোকারির সম্পর্ক থাকলেও এখন প্রান্তর রঘুবীরকে ‘স্যার’ এবং ‘আপনি’ বলে। রঘুবীরও ‘তুই’ বলেন না। ‘তুমি’ বলেন। তিনি প্রান্তরকে বললেন, “কতক্ষণ ঘুমোলে?
প্রান্তর বলল, “অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি। কেন স্যার? কোথাও যেতে হবে।”
“হ্যাঁ। আমাদের ক্রিটিকাল কেয়ার অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে এখনই বেরিয়ে যাও। যেতে হবে সিথ্রি-র পটনা ব্রাঞ্চে। ওখান থেকে একজন পেশেন্টকে পিক আপ করে সঙ্গে-সঙ্গেই এখানে ফিরে আসতে হবে। বিশ্রাম নেওয়া যাবে না। পেশেন্টের এখানে কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হবে।”
প্রান্তর বিনয়ের সঙ্গে বলল, “আচ্ছা,” তারপর বাথরুমে চলে গেল। পোশাক বদলে ফিরে আসার পরে রঘুবীর তার হাতে টাকার বান্ডিল তুলে দিয়ে বললেন, “পঞ্চাশ হাজার আছে। লাগবে না। তাও রেখে দাও।”
“আচ্ছা,” হাত পেতে টাকা নিচ্ছে প্রান্তর। তার দেওয়ালঘড়িতে টুং টাং করে রাত দুটো বাজার ঘণ্টা বাজল। রঘুবীর কোয়ার্টার থেকে বেরনোর সময় বললেন, “মেহুলস্যার তোমার ফোনে পটনা সিথ্রি-র ঠিকানা মেসেজ করে দিয়েছেন। দেখে নিয়ো।”
“আচ্ছা,” কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা লাগাচ্ছে প্রান্তর।
রঘুবীর নিজের বাড়িতে ঢুকে যাওয়ার আগে বললেন, “সিথ্রি-র পটনা ব্রাঞ্চের যে পেশেন্টকে তুমি আনতে যাচ্ছ, তার নাম রিমুল সেন। বাবার নাম সরল সেন। কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট না হলে মেয়েটা মরে যাবে। প্রাপ্তর চমকে উঠে রঘুবীরের দিকে তাকাল।
