॥ পনেরো ।।
২১ মে ভোর পাঁচটা থেকে ২১ মে সকাল দশটা কুড়ি
.
ডক্টর মুন্সী চলে যাওয়ার পরে আই সি ইউ-এর বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মেহুল। কী করবেন বুঝতে পারছেন না। নিজের দুটো আর রঘুবীরের একটা মোবাইল ফোন পকেটে ভরে, চিন্তাভাবনার গিঁট ছাড়ানোর জন্যে তিনি ঠিক পনেরো মিনিটের জন্যে হাসপাতাল বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে বাগানে চলে এলেন।
এত ভোরে কোথাও কোনও লোক নেই। চারদিকে অজস্র গাছ, কেয়ারি করা ফুলের বাগান, হাঁটার জন্যে মোরান বিছানো রাস্তা, বসার জন্যে রট আয়রনের বেঞ্চি। মেহুল কোনও দিনও ভাবেননি যে এখানে এসে বসবেন। আজ সেটাই করতে হচ্ছে।
“ম্যান অফ স্টিল’। তাঁকে সবাই এই নামে ডাকে। যে-কোনও সমস্যা এলে চট করে সমাধানের রাস্তা বের করে ফেলেন। তারপর সেই রাস্তায় হাঁটার জন্যে জীবন বাজি রাখেন। সিথ্রি-র জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত এভাবেই কাজ করে এসেছেন।
মেহুল ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। পাশাপাশি এটাও মানেন, যে যত বেশি পরিশ্রম করবে, ঈশ্বর তত তার প্রতি ঝুঁকবেন। গতকাল সকাল থেকে একটানা কাজ করছেন মেহুল। মাথা আর কাজ করতে চাইছে না। কিন্তু তাঁকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষুনি। নিজেকে পনেরো মিনিট সময়ে দিয়েছেন মেহুল। একটাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যে।
আজ সিথিতে কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হবে না এই প্রজেক্ট বাতিল করতে হবে?
গ্রহীতা আসছে। অর্গ্যানও এল বলে। কিন্তু যে লোকটি ট্রান্সপ্লান্ট করবে, সে সুস্থ নয়। তা হলে কী হবে।
এটা ঠিক যে কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট একটা টিমওয়ার্ক। অনেকে মিলে কাজটা করে। একজন না থাকলে কাজ হবে না, এমনটা নয়। কিন্তু প্রধান সার্জন অসুস্থ। স্বপন একা পুরোটা সামলাতে পারবেন কি? কোনও দুর্ঘটনা ঘটে গেলে? যে সুনামের আশায় প্রকল্পে হাত দিয়েছিলেন মেহুল, সেটা তো আসবেই না, উলটে সাংঘাতিক বদনাম হবে।
না-এর দিকে পাল্লা ভারী। তা সত্ত্বেও মেহুল এই প্রজেক্ট ক্যানসেল করবেন না। তিনি রঘুবীরকে মোটিভেট করবেন অপারেশন করার জন্যে। রঘুবীর পারবেন। নিশ্চয়ই পারবেন।
সিদ্ধান্ত নেওয়া শেষ। এবার সেটা ইমপ্লিমেন্ট করার পালা। বেঞ্চি থেকে উঠে হাসপাতাল বিল্ডিংয়ের দিকে এগোলেন মেহুল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে স্বপনকে ফোনে নিজের সিদ্ধান্ত জানালেন।
স্বপন মন দিয়ে পুরোটা শুনলেন। তারপর যে খবরটা দিলেন, সেটা শুনে চমকে উঠলেন মেহুল। শক্তিগড়ে অ্যাম্বুল্যান্সের টায়ার পাংচার হয়েছিল। টায়ার পালটে অ্যাম্বুল্যান্স এখন ডানকুনির পথে। একই সঙ্গে পেশেন্টের হার্ট বেগড়বাহ করছে।
দুঃসংবাদ শুনে দমে গিয়েছিলেন মেহুল। হাসপাতালে ঢুকে মন ভাল হয়ে গেল। রঘুবীরকে আগেই আই সি ইউ থেকে প্রাইভেট কেবিনে শিট করা হয়েছিল। বিছানায় আধশোওয়া হয়ে বসে আছেন তিনি। বাঁহাতে সুচ ফোটানো রয়েছে। স্ট্যান্ড থেকে ঝুলছে আই ভি ফ্লুইডের পাউচ। সেখান থেকে নলবাহিত হয়ে ফোঁটা ফোঁটা তরল ঢুকে যাচ্ছে রঘুবীরের শরীরে।
“গুড মর্নিং” এক গাল হাসলেন মেহুল।
ভুরু কুঁচকে রঘুবীর বললেন, “আমার কী হয়েছিল বলুন তো?”
কাল রাতে মেহুলের চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে কী কী হয়েছিল, সেটা রঘুবীরকে বললেন মেহুল। পুরোটা শুনে রঘুবীর বললেন, “সিটি স্ক্যানের প্লেটটা এখানে রাখা রয়েছে। আমি দেখেছি। ব্রেনে কোনও সমস্যা নেই। তবে মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। খুব ঘুমও পাচ্ছে।’
“ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্টের চোট! তারপর স্টিচ আর ব্যথা কমানোর ইঞ্জেকশন। এসব তো একটু হবেই। তা নিয়ে ভাবতে বসলে তো চলবে না। একটু পরে আপনাকে ওটি করতে হবে।”
রঘুবীর কিছুক্ষণ ভেবলুর মতো মুখ করে বসে রইলেন। তারপর হাই তুলে বললেন, “আমি আজ অপারেশন করতে পারব না।
মেহুলের মাথা ক্ষণিকের জন্যে ঘুরে গেল। তিনি বেডের পাশে রাখা চেয়ারের হাতল ধরে স্টেডি হয়ে দাঁড়ালেন। গলা থাকরে বললেন, “আপনি “হ্যাঁ” বলেছিলেন বলেই এত কাণ্ড করা হচ্ছে। পেশেন্ট আসছে পটনা থেকে। অর্গ্যান আসছে চেন্নাই থেকে। এখন পিছিয়ে আসা কি ঠিক হবে? লট অফ থিংগস আর অ্যাট স্টেক।”
রঘুবীর ক্যাজুয়ালি বললেন, “হ্যাঁ, সে তো বটেই।”
কী কথার কী উত্তর! মেহুলের ভুরু কুঁচকে গিয়েছে। মাথায় কতটা চোট লেগেছে, সেটা সব সময় সিটি স্ক্যানে বোঝা যায় না। ব্রেনের সার্কিটে কোথাও কিছু হলে সেটা ধরা পড়ে না। রঘুবীর এখন কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্টের মতো জটিল এবং পরিশ্রমসাধ্য অপারেশন করতে পারবেন তো?
“আপনি এখন ঘুমোন। আমি পরে কথা বলব, “ রঘুবীরকে বিশ্রাম নিতে বলে কেবিন থেকে বেরচ্ছেন মেহুল, এমন সময়ে মুখে একগাল হাসি নিয়ে ঢুকল কাঠি।
“কী ব্যাপার?” জিজ্ঞাসা করলেন মেহুল।
“কত মিডিয়ার লোক সাতসকালে এসে গিয়েছে স্যার?” উত্তেজনায় হাতে হাত ঘষছে কাঠি, “সব্বাই জানতে চাইছে, কখন হাট বদলাবদলি হবে!”
“মানে?” আকাশ থেকে পড়লেন মেহুল, “ওদের কে বললঃ”
“আমি?” গর্বের সঙ্গে বলল কাঠি।
কাঠির গালে একটা চড় কষাতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন মেহুল। হিসহিস করে বললেন, “মিডিয়াতে খবর দিয়েছ তুমি।”
মেহুলের মারমুখো চেহারা দেখে ঘাবড়ে গিয়েছে কাঠি দ্রুত কেবিনের বাইরে বেরিয়ে সে বলল, “না স্যার, আমি দিইনি। আমি ডিউটিতে আসছি, এমন সময় দেখলাম ওরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই ইলিনা কেসের সময় থেকেই চন্দ্রাণী, অর্থ, পরিমলদের চিনি। পরিমল আমাকে বলল, ‘কী গো কাঠিদা কেমন আছ? আমি বললাম, ‘ভাল’। তখন আমার দিকে ক্যামেরা তাক করে জিজ্ঞেস করল, ‘আজ এখানে পূর্ব ভারতের প্রথম কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হবে। এটা ভেবে কেমন লাগছে?’ আমি বলে ফেলেছি, ‘ভাল’। এর বেশি কিছু বলিনি।”
“বলতে কী আর বাকি রেখেছে।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রঘুবীর।
কাঠিকে ইশারায় চলে যেতে বলে রঘুবীরের দিকে তাকালেন মেহুল। বললেন, “আমাদেরই কোনও স্টাফ খবরটা মিডিয়ার লিক করেছে। আমার ধারণা কাঠিনাই হবে।’
“ও তো বলল যে খবর দেয়নি, “ ভুরু কুঁচকে বললেন রঘুবীর।
রঘুবীরের প্রতিক্রিয়া দেখে মেহুল খুশি হলেন। উনি ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছেন। মেহুল বললেন, “মিডিয়া যখন জানতে পারবে যে অর্গ্যান আর পেশেন্ট চলে আসার পর আপনি ঘাবড়ে গিয়ে অপারেশন করতে চাননি, তখন তুমুল মিডিয়া সার্কাস শুরু হবে। সিথ্রি-র তো বদনাম হবেই, আপনারও হবে।”
“হোক গে, “ আবার শোওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছেন রঘুবীর। এমন সময় মেহুলের পকেটে মোবাইল বেজে উঠল। অচেনা রিংটোন শুনে প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে গিয়ে মেহুলের মনে পড়ল রঘুবীরের মোবাইল গতকাল রাত থেকে তাঁর পকেটেই রয়েছে।
ঠিকই ভেবেছেন মেহুল। রঘুবীরের ফোন বাজছে। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে, ‘সুতপা কলিং…’ রঘুবীরের দিকে ফোন এগিয়ে তিনি বললেন, “গিন্নির ফোন।”
কেবিনের দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে রঘুবীর বললেন, “ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় সুতপা কেন ফোন করেছে?” তারপর মোবাইল কানে দিয়ে বললেন, “বলো।”
শব্দহীন এসি কেবিনে দু’জনের কথাই পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। মেহুল কেবিন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। খকের গলার আওয়াজ শুনে থমকে দাঁড়ালেন। ও জিজ্ঞেস করল, “বাবা: ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার প্রথম হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট তুমি করছ?”
রঘুবীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাকে কে বলল?”
“স্কুপ চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে।”
“তুমি ভোর পাঁচটার সময় টিভি খুলেছ?”
“আমি খুলিনি। মায়ের ইনসমনিয়া আছে। কাকভোরে উঠে টিভি চালিয়ে দেয়। মা-ই আমাকে বলল। বলো না বাবা, কথাটা সত্যি?”
“মায়ের ইনসমনিয়া কবে থেকে ডেভেলপ করল।”
“উফফ!” বিরক্তি প্রকাশ করে বক, “এই নাও। মায়ের সঙ্গে কথা বলো।”
মেহুল খেয়াল করছেন, রঘুবীরের মধ্যে সেই ঘুম-ঘুম ভাবটা আর নেই। দায়িত্ববান বাবার মতো কথা বলছেন। আপনভোলা অবস্থা থেকে রিকভারি হচ্ছে দ্রুত।
মোবাইলে সুতপার গলা, “আমার ইনসমনিয়া আছে না নেই, সেটা বাদ দাও। খবরটা সত্যি”
“বলো না বাবা? খবরটা সত্যি!” ফোনে আবার ঋক।
উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দিলেন রঘুবীর। মেহুলকে বললেন, “মিডিয়াকে বলুন মিথ্যে খবর না রটাতে। আমি মেন্টালি এবং ফিজিকালি অত বড় অপারেশনের ধকল নেওয়ার জন্য রেডি নই।”
মেহুল কিছু বলার আগেই তাঁর মোবাইল বেজে উঠেছে। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলেন, স্বপন ফোন করেছেন।
স্বপনের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ফোনালাপ সেরে রঘুবীরের দিকে তাকালেন মেহুল। রঘুবীর অবাক হয়ে বললেন, “আপনি ঘামছেন কেন? শরীর খারাপ লাগছে। ফোনে কোনও খারাপ খবর?”
বেডের পাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়েছেন মেহুল। রুমাল দিয়ে মুখ মুছে বলছেন, “ডক্টর মিশ্র বললেন যে শক্তিগড়ের পরে ডানকুনিতে আবার টায়ার পাংচার হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্সে এক্সটা টায়ার নেই। এবং এই অ্যাম্বুল্যান্সের টায়ার কলকাতা ছাড়া পাওয়া যায় না। উনি আমাকে একটা অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাতে বললেন।”
“আমার কোনও আগ্রহ নেই, “ উদাস মুখে বললেন রঘুবীর।
“আপনার তো এই খবরে আগ্রহ থাকা উচিত,” কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে বললেন মেহুল, “কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট না হওয়ার জন্যে কেউ আর আপনার দিকে আঙুল তুলবে না।”
কেবিনের বেডে তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন ক্লান্ত রঘুবীর।
রঘুবীরের ঘুম ভাঙল সকাল দশটায়। কেউ তাঁকে ঘুম থেকে তুলে দেয়নি। কেউ বিরক্ত করতে আসেনি। ঘুম ভাঙার কারণ মোবাইলের রিংটোন।
ঘুম ভাঙার পরে বেশ ফ্রেশ লাগছে। মাথার চোটটা ভোগাবে না তা হলে তবে একটা বিষয়ে রঘুবীর অনড়। তিনি অপারেশনটা করবেন না। মন থেকে সায় পাচ্ছেন না। শুধু মনে হচ্ছে, আবার যদি ইলিনার মতো আর-একটা ‘ডেথ ইন এটি হয়। আগের বার মিডিয়া পরে খবর পেয়েছিল। এবারে তো সিগ্রি-র সামনে অপেক্ষা করছে। কোনও অঘটন ঘটলে থানা-পুলিশ, কনজিউমার কোর্ট, হেল্থ ডিপার্টমেন্টের গ্রিভান্স সেল, সবাই ব্রেকিং নিউজ দেখতে পাবে।
মোবাইল হাতে নিয়ে রঘুবীর দেখলেন অচেনা মোবাইল নম্বর থেকে ফোন আসছে। ফোন ধরে বললেন, “হ্যালো!”
“স্যার! আমি প্রান্তর বলছি, “ রঘুবীরকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গড়গড় করে প্রান্তর বলে যাচ্ছে কেন সে অন্য ড্রাইভারের মোবাইল ফোন ধার করেছে।
“আমি তোমাদের সব কথা জানি,” বললেন রঘুবীর।
“আমিও আপনার কথা সব জানি। মেহুল স্যার বললেন, আপনি বলেছেন যে এটি করবেন না!”
রঘুবীর হাসলেন। হালকা চালে বললেন, “নেহাত অনেক বছর আগে তোর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল, তাই এই কথাটা পার্সোনালি নিলাম না। যদি ওই বাঁধনটা না থাকত, তা হলে এক্ষুনি তোর চাকরি চলে যেত।”
রঘুবীর ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’তে এসেছেন। প্রান্তর ‘আপনি’ থেকে ‘তুই তে এল, “বাঁধন আছে বলেই তোর উপরে জোর করতে পারছি। না থাকলে থোড়াই পারতাম। আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তুই আর স্বপন মিলে রিমুলকে বাঁচিয়ে দে। প্লিজ!”
“মাথায় চোট নিয়ে অত বড় অপারেশনের ঝক্কি নিতে পারব না। আবার যদি কোনও গণ্ডগোল হয়ে যায়?”
প্রান্তর ধমক দিয়ে বলল, “ন্যাকামি করতে লজ্জা করে না? করে কারা কী বলেছিল, সে কথা মাথায় ঢুকিয়ে বসে আছিস?”
“কবে কারা কী বলেছিল তোর মনে নেই! মার তো তুই খেয়েছিলি।”
“আমার সব মনে আছে। আমি কিছু ভুলিনি। কিন্তু আজ কোনও কথা শুনব না। তোকে রিমুলের অপারেশন করতেই হবে। না হলে তুই কীসের ডাক্তার? কলকাতার এক নম্বর কার্ডিয়ো থোরাসিক সার্জন না ঘোড়াচ্ছিম?”
“প্রান্তর! মুখ সামলে!” চিৎকার করে ওঠেন রঘুবীর।
“তুই মুখ সামলে!” পালটা হুঙ্কার দিল প্রান্তর, “রিমুলের হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট লাগবে, এটা কারা ঠিক করেছিল। তুই আর স্বপন। রিমুলকে আনার জন্যে আমাকে পটনায় কে পাঠিয়েছিল। তুই। তুই চেয়েছিলি রিমুল যেন ভাল হয়ে যায়। তা হলে শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যাচ্ছিস কেন?
রঘুবীর চুপ।
“রিমুল এখনও বিয়ে করেনি। কেন জানিস? অসুখের জন্যে নয়। সেটা অনেক পরে ধরা পড়েছে।”
রঘুবীর চুপ
“আমি কেন বিয়ে করিনি, কখনও জিজ্ঞেস করেছিস?”
রঘুবীর চুপ।
প্রাপ্তরের উত্তেজনা কমেছে। সে নিচ গলায় বলল, “আমাদের কাছে এখন কোনও মোবাইল ফোন নেই। আমাদের দিক থেকে এটাই শেষ ফোন। সামনে বিরাট জ্যাম। কখন হাসপাতালে ঢুকতে পারব জানি না। কিন্তু যদি ঠিক সময়ে ঢুকতে পারি, তা হলে যেন এটিতে তোকে দেখতে পাই।”
প্রান্তর ফোন কেটে দিয়েছে। কেবিনের বেডে বসে রঘুবীরের মনে পড়ে যাচ্ছে কৈশোরের দিনগুলোর কথা। তিনি আর স্বপন যখন বইয়ে মুখ গুঁজে কাটিয়েছেন, তখন তাঁদের বন্ধু প্রেমে পড়ে নিজের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। জেলে গিয়েছে। মাকে হারিয়েছে। কলেজ ছেড়েছে। আত্মহত্যা করতে গিয়েছে। দারোয়ানের চাকরি করছে। টোটাল লুজার বলতে যা বোঝায়, তার প্রোটোটাইপ। বিয়েটাও করে উঠতে পারেনি।
রঘুবীর ওই একই টাইমলাইনে একের পর এক ডিগ্রি অর্জন করেছেন, দেশ ও বিদেশের সেরা মেডিকাল স্কুল এবং কলেজ থেকে শল্যচিকিৎসা শিখেছেন। টাকার পাহাড়ে বসে থেকেছেন … কিন্তু সুখ পাননি। ঋক আর সুতপা তাঁকে ছেড়ে অন্য শহরে চলে গিয়েছে। থককে ফোন করতে গেলে আজ সুতপার অনুমতি লাগে। তাঁদের প্রেম মরে গিয়েছে।
রিমুল আর প্রান্তর একে অপরকে ভালবাসল কিন্তু কাছে পেল না। পরস্পরের জন্যে প্রতীক্ষা করে কুড়িটা বছর কাটিয়ে দিল। যদি একে অপরের সন্ধান না পেত, তা হলে আস্ত জীবনটাই একা একা কাটিয়ে দিত।
আজ যখন দু’জনে দু’জনের সন্ধান পেয়েছে, আজ যখন সুযোগ এসেছে বাকি জীবন একসঙ্গে কাটানোর, তখন ওদের ভরসা রঘুবীর। তিনিই পারেন এদের মধ্যে সবুজ সরণি তৈরি করতে। আর তিনি পিছিয়ে আসছেন। রিস্ক নিতে ভয় পাচ্ছেন।
আবার জেগে উঠেছে কার্ডিয়া থোরাসিক সার্জনের পাহাড়প্রমাণ অহং। ব্যর্থ হলে কী হবে, আর ভাবছেন না রঘুবীর। ভাবছেন সাফল্যের খতিয়ান।
থাক আবার বাবাকে নিয়ে গর্ব করবে। সুতপা আবার স্বামীকে নিয়ে অহংকার করবে। ঝাকের স্কুলের বন্ধুরা গর্ব করে বলবে, “পূর্ব ভারতের প্রথম কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি করেছেন ডক্টর রঘুবীর চক্রবর্তী। খকের বাবা!”
দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন রঘুবীর। সকাল দশটা দশ বাজে। এ দিক-ওদিক দেখে চেঁচালেন, “সিস্টার। সিস্টার!”
কেউ এল না। বেডে রাখা কলিং বেল দু’বার টিপে নিজের বাঁ হাতের দিকে দেখলেন রঘুবীর। আই ভি চ্যানেলে ফ্লুইড চলছে। ডান হাত দিয়ে লিউকোপ্লাস্ট খোলার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। বিরক্ত হয়ে এক ঝটকায় সুচসহ আই ডি চ্যানেল উপড়ে আনলেন শরীর থেকে।
যা হওয়ার তাই হয়েছে। বাঁ হাত দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে মেঝেয় ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে। সিস্টার ললিতা কেবিনে ঢুকে রঘুবীরকে দেখে আঁতকে উঠে বলল, “কী করে হল।”
বেডসাইড টেবিলে রাখা তুলোর বান্ডিল থেকে এক মুঠো তুলে ছিঁড়ে হাতে চেপে ধরে রঘুবীর বললেন, “আমি বাড়ি যাচ্ছি।”
“পাগল হয়ে গেলেন না কি?” বারবার কলিং বেল টিপছে সিস্টার ললিতা। তাকে এক ঝটকায় সরিয়ে বেড থেকে উঠে রঘুবীর বলছেন, “আমাকে একটা পেন কিলার ইঞ্জেকশন দিন।”
পাগলা ঘণ্টির মতো কলিং বেল শুনে অন্য সিস্টাররা চলে এসেছে। এসে গিয়েছে কাঠি। সে চেঁচাচ্ছে, “কী হল স্যার?”
মেহুলও চলে এসেছেন। তিনি রঘুবীরকে বললেন, “কী হল?”
রঘুবীর ঘাড় শক্ত করে বললেন, “সিস্টার, আমাকে একটা পেন কিলার ইঞ্জেকশন দিন। আমি বাড়ি গিয়ে স্নান করে ঘুমোই। এটি রেডি হলে মেহুল আমাকে ডেকে নেবেন।”
সব স্টাফ অবাক হয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মেহুল মৃদু হেসে বললেন, “সিস্টার, স্যার যা বলছেন, করুন। আমি আর কাঠিদা মিলে স্যারকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসছি।”
ললিতা কথা না বাড়িয়ে রঘুবীরের হাতে বাধা নিবারক ইঞ্জেকশন দিল। কাঠি রঘুবীরকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। মেহুলও সঙ্গে তোলেন।
বাড়ি পৌঁছে স্নান করে, সামান্য কিছু খেয়ে রঘুবীর বিছানায় শুলেন। মেহুল রঘুবীরের মোবাইল নিয়ে বললেন, “এটা এখন আমার কাছে থাক।” রঘুবীর উত্তর দিলেন না। তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। বাড়ির দরজা বাইরে থেকে টেনে মেহুল ফিরে গেলেন হাসপাতালে। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, এমন সময় কাঠি তাঁর কানে-কানে বলল, “স্যার! কাউকে যদি কিছু না বলেন, তা হলে একটা জিনিস দেখাব। তাড়াতাড়ি এদিকে আসুন।”
মেহুল বিরক্ত হয়ে বললেন, “আবার কী কুকিত্তি করেছ?”
ঠোঁটে হাত রেখে ইশারায় মেহুলকে চুপ করতে বলছে কাঠি। একই সঙ্গে তাঁর হাত ধরে হিড়হিড় করে সে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গ্রাউন্ড ফ্লোরে, সিঁড়ির পিছন দিকের ট্রলি রুমে। ওই ঘরে হুইল চেয়ার আর ট্রলি রাখা থাকে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল সে। দাঁড়িয়ে পড়লেন মেহুলও।
এখান থেকেই শোনা যাচ্ছে সিস্টার ললিতার গলার আওয়াজ। মোবাইলে বলছে, “রঘুবীর স্যার এটি করবেন বলছেন। তুমি এত গাম্বাট কেন? একটা ডান্ডা মাথায় ঠিক মতো মারতে পারলে না? স্যার কী ভাবলেন বলো তো।”
মেহুল পিছিয়ে এলেন। কাঠিকে সঙ্গে নিয়ে লিফটে করে চারতলায় পৌঁছে নিজের চেম্বারে ঢুকলেন।
কাঠি চিৎকার করে বলছে, “ললিতাকে হাতেনাতে ধরার সুযোগ পেয়ে ছেড়ে দিলেন। আপনি কি পাগল? আমি কতবার আপনাকে ঠারেঠোরে বলার চেষ্টা করেছি যে সারাক্ষণ ওকে নিজের চেম্বারে বসিয়ে রাখবেন না। আপনি আমার কথা শুনলে তো! শুধু ভাবেন যে আমি লোকের পিছনে কাঠি করি।”
মেহুল রিমোট টিপে দেওয়ালে মাউন্ট করা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার মনিটর অন করেছেন। পরদায় অজস্র খুপরি-খুপরি বাক্স। সেগুলোর তলায় লেখা, মেন এন্ট্রান্স, লবি, আউটডোর ওয়ান, আউটডোর ট…
রিমোট টিপে একের পর এক বাক্স পেরচ্ছেন মেহুল। এটি ওয়ান, টু, থ্রি, রিকভারি রুম ওয়ান, টু, থ্রি, প্যাথোলজি, রেডিয়োলজি, কিচেন, সার্জনস রুম, করিডোর ওয়ান, টু, থ্রি…
ট্রলি রুমের সামনের ক্যামেরায় থেমেছেন মেহুল। রিওইয়াইন্ড করে পিছন দিকে যাচ্ছেন…. হঠাৎ দেখা গেল সিস্টার ললিতাকে।
আর একটু পিছিয়ে প্লে বাটন টিপলেন মেহুল।
সিস্টার ললিতার পুরো ফোনালাপটাই দেখা এবং শোনা যাচ্ছে। কাঠি হাত ঘষে বলল, “এইবার যা মজা হবে না!”
মেহুল কাঠির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, “তুমি এক্ষুনি অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে এয়ারপোর্ট চলে যাও। আর কিছুক্ষণের মধ্যে চেন্নাইয়ের ফ্লাইট কলকাতায় ল্যান্ড করবে। গ্রিন করিডোর বানানো আছে। ডক্টর পীযূষ আইচ আর অর্গ্যান ডোনেশন বক্স নিয়ে এখানে চলে এসো।
“আমি?” ঘাবড়ে গিয়ে বলল কাঠি।
“হ্যাঁ। ডক্টর আইচকে তোমার নামই বলা আছে।
কাঠি দৌড়ে বেরিয়ে গেল। ম্যান অফ স্টিল’ মেহুল মোবাইল হাতে নিয়ে কলকাতা পুলিশের ডিসি ট্রাফিক সুধীর সেনকে ফোন করলেন। খেয়াল করলেন, দেওয়ালখড়ি বলছে, সকাল সাড়ে দশটা বাজে।
