।।চার।।
১৭ মে সকাল সাড়ে ন’টা থেকে ১৭ মে রাত সাড়ে এগারোটা
ঢাকুরিয়ার ‘হার্টবিট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর মালিক, চল্লিশ বছরের শিলাজিৎ বসু সকাল সাড়ে ন’টার সময় নিজের চেম্বারে ঢুকে চিৎকার করে বলল, “আমার টেবিলে এখনও নিউজপেপার আসেনি কেন?”
চল্লিশ বছরের পাপ্পু বরকন্দাজও শিলাজিতের সঙ্গে চেম্বারে ঢুকেছে। সে বসের চিৎকার শুনে অ্যাবাউট টার্ন হয়ে গেল। সকালবেলা চেম্বারে ঢুকে খবরের কাগজ দেখতে না পেলে শিলাজিতের মাধায় আগুন জ্বলতে থাকে। নিয়মিত বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি খবরের কাগজের কলকাতা এডিশনে কলকাতার বৃহত্তম হার্ট রিসার্চ সেন্টার’-এর আধপাতা বিজ্ঞাপন যায়। কাগজওয়ালারা সেই বিজ্ঞাপন কোথায় গুঁজেছে সেটা তাড়াতাড়ি দেখে নিতে হয়। জায়গা পছন্দ না হলে বিজ্ঞাপন দফতরে ফোন করে খিস্তি করতে হয়।
‘কলকাতার বৃহত্তম হার্ট রিসার্চ সেন্টার’ বিজ্ঞাপনের এই বাক্যবন্ধটির মাথায় ছোট্ট একটি তারাচিহ্ন আঁকা আছে। ফুটনোটে গিয়ে কেউ যদি এই তারাচিহ্নের মানে খোঁজেন, তা হলে দেখতে পাবেন, এই উপাধি দিয়েছে এমন একটি কাউন্সিল, যার অস্তিত্ব কেবল খাতায় কলমে। বিজ্ঞাপনে মিথ্যে কথা বলা হয়েছে। কারণ ‘হার্টবিট’ কিছুতেই কলকাতার সবচেয়ে বড় হৃদয় গবেষণাগার নয়। আয়তন বা রোগীর সংখ্যার দিকে থেকে এর চেয়ে বড় হাসপাতাল হল সিথ্রি। তাকে হারিয়ে এক নম্বরে পৌঁছনোর জন্যেই এই বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে মিথ্যে থাকবেই। প্রেমে-রণে কোনও কিছুই অন্যায় নয়।
খবরের কাগজ নিয়ে ফিরেছে পাপ্পু বরকন্দাজ। সঙ্গে এসেছে রাজা মল্লিক। তারও বয়স চল্লিশ। পাপ্পু আর রাজা হল শিলাজিতের দুই হাত। কে ডান আর কে বাঁ হাত, এই নিয়ে দু’জনের মধ্যে মতবিরোধ আছে। যে-কোনও দিন হাতাহাতিও লেগে যেতে পারে।
শিলাজিৎ পরে রয়েছে ঢলঢলে ট্রাউজার্স আর হাফহাতা শার্ট। পায়ে কাবলি জুতো। সে বরাবরই এই পোশাকে স্বচ্ছন্দ। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে বাইক চালানো শিখতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল। অপারেশন করার পরে পা ঠিক হয়নি। তখন থেকেই শুঁড়িয়ে হাঁটে। চল্লিশে পৌঁছে লাঠি ধরতে হয়েছে। চেম্বারে একটি লাঠি রাখা আছে। বাড়িতে বা হার্টবিটে হাঁটাহাঁটি করতে সেটার দরকার পড়ে না। একটু বেশি হাঁটতে গেলে লাঠিই ভরসা। শুঁড়িয়ে হাঁটার কারণেই ক্লাস টেন থেকে তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ল্যাংড়া শিলু’।
শিলাজিৎ, পাপ্পু এবং রাজা এক ইশকুলে, এক ক্লাসে লেখাপড়া করেছে। একসঙ্গে পরীক্ষায় ফেল করেছে। একসঙ্গে মদ-গাঁজা ধরেছে। একসঙ্গে স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে। অনেক পুরনো বন্ধুত্ব। তা হলে শিলাজিৎ স্পেশ্যালিটি ক্লিনিকের মালিক কী করে হল। দুই বন্ধু রুলিং পার্টির স্থানীয় নেতা কী করে হল। সেটা জানতে গেলে পিছন দিকে যেতে হবে।
শিলাজিতের বাবা মানস বসু ছিলেন ঢাকুরিয়া এলাকার নামকরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। বাড়ির একতলায় চেম্বার ছিল। সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাছির মতো পিনপিন করত হার্টের রুগিরা। একগাদা অ্যাসিস্ট্যান্ট রেখেও সামলাতে পারতেন না মানস।
কথায় আছে, ‘ঘরামির ঘর ফুটো। ছেলেকে সময় দিতে পারতেন না বলে সে কম বয়সেই বিগড়ে গেল। পরীক্ষায় ফেল করা, নেশাভাৎ করা, মেয়েদের পিছনে লাগা, সব রকম বল দোষ ছিল। মা সুধা কোনওদিনও ছেলের দোষ দেখেননি। সুধা ঘ্যানঘ্যান করে একটাই কথা বলতেন, “বাবা যদি সময় না দেয়, তা হলে ছেলে বিগড়োবেই।”
বারো ক্লাসের পরীক্ষায় টায়েটায়ে পাশ করেছিল শিলাজিৎ। মানসের জোরাজুরিতে দুই স্যাঙাতকে নিয়ে গড়িয়াহাটের কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। রুলিং পার্টির ছাত্র ইউনিয়নের খাতায় নাম লিখিয়ে মিছিল আর মিটিংয়ে সবার আগে ঝান্ডা দুলিয়ে স্লোগান দিতে লাগল। কলেজে রাজনীতির নামে দাদাগিরি করে,
ইউনিয়নের ফান্ডের টাকায় নিয়মিত দামি রেস্তরাঁর মদ-মাংস খেয়ে দিব্যি দিন কাটছিল। রাত কাটছিল অন্য ভাবে। সন্ধে নামলেই মাসাজ পার্লারে গিয়ে টাকার বিনিময়ে মেয়েদের মাসাজ ও সঙ্গলাভ করে আসছে শিলু। সময় কাটছে তোফা।
হঠাৎ মানস মারা গেলেন।
এইবার নিজের বিপদ বুঝতে পারল শিশু। এত দিন বাপের হোটেলে আরাম সে চলছিল। স্বামী মারা যাওয়ার পর সুধা শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছেন। ছেলেকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঘরের খেয়ে বনের মোষ আর তাড়ানো যাবে না। পাপ্পু আর রাজা অবশ্য ছাত্র রাজনীতি চালিয়ে যেতে লাগল পুরোদমে। বুদ্ধি না থাকার জন্যে তারা ক্ষমতাসীন দলের উপরের দিকে উঠতে পারেনি। স্থানীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবেই রয়ে গিয়েছে।
নিজেকে সামলে নিল শিলু। রাজনীতি কমিয়ে লেখাপড়া শুরু করল। বি কম পাশ করার পরে সুধার পরামর্শে, মানসের ফাঁকা চেম্বারে ডাক্তার বসাল। শুরু করল সদ্য পাশ করা দুজন বাচ্চা ডাক্তার দিয়ে। তিন বছরের মাথায় একতলায় ওষুধের দোকান খুলে ফেলল। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি করে মেলা লাভ। নতুন-নতুন ডাক্তার ধরে আনত শিলু। কয়েকদিন চেম্বারে বসিয়ে বুঝে নিত, কেমন লোক। ‘সতী’ টাইপের ডাক্তার হলে সোজা ফুটিয়ে দিত। যারা বেশি ওষুধ লেখে, যারা অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করায়, তাদের রেখে দিত। মেডিসিন ছাড়া অন্য স্কিমের ডাক্তার নিয়ে ডিল করত না শিলু।
ছ’বছরের মাথায় মেডিসিনের ডাক্তারের সংখ্যা বেড়ে হল পাঁচ। সাত বছরের মাথায় ওষুধের দোকানের পাশাপাশি প্যাথোলজিকাল ল্যাবরেটরি এবং রেডিয়োলজি সেন্টার খুলে ফেলল শিলু। নিয়ে এল দু’জন কার্ডিয়োলজিস্ট। সেই থেকে একতলাটা পুরোদস্তুর কার্ডিয়াক ক্লিনিক।
এর পরের ধাপ হল নার্সিংহোম খোলা। তার জন্যে অনেক টাকা লাগবে লাগবে ম্যানপাওয়ার, ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং কর্পোরেট কালচার। সবার আগে ঢাকুরিয়ার বাড়ির খোলনলচে বদলাতে হবে।
সেই বদল হতে সময় লাগল আরও দু’বছর রি-মডেলিংয়ের পর বাড়ি এখন ছ’তলা কার্ডিয়াক হসপিটাল। শিলু নতুন ফ্ল্যাট কিনে শিফট করে গিয়েছে রাস্তার অন্য পারে। জানলা খুললেই নিজের হাতে গড়ে তোলা ‘হার্টবিট’ দেখে গর্বে বুক ভরে ওঠে।
কলেজ ছাড়ার পর থেকে নিজের টাকাতেই মদ-মাংস খেতে হয়। তা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু আজকাল আর মাসাজ পার্লার যেতে ভাল লাগে না। টাকার বিনিময়ে শরীর জয় করে আশ মিটছে না। শুধু মনে হয়, এমন কোনও মেয়ে নেই, যে ল্যাংড়া শিলুকে ভালবাসবে। টাকার জন্য নয়। রক্তমাংসের মানুষটাকে দোষ-গুণ মিলিয়ে ভালবাসবে? শিলু বুঝতে পারে মাসাজ পার্লারের মেয়েগুলো পছন্দ করে তার টাকাকে। চোখ বন্ধ করে মনের মধ্যে সে ফুটিয়ে তোলে একটা মেয়ের মুখ। মাথায় ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। কপাল ভর্তি সিঁদুর, হাতে শাঁখা আর পলা। লজ্জার চোটে শিলুর চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। রোজ সকালবেলা তার পায়ে জড়িবুটির তেল মালিশ করে দিচ্ছে….
এই সব চিন্তা শিলুকে যৌন আনন্দের তুরীয় মুহূর্তে পৌঁছে দেয়। কাজ সেরে মাসাজ পার্লার থেকে বেরিয়ে আসে সে।
ছেলের রকম বুঝে খবরের কাগজের রবিবারের পাতার ‘পাত্রপাত্রী’ কলামে বিজ্ঞাপন দিলেন সুধা। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল, ‘প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের একমাত্র পুত্র। কলিকাতায় নিজস্ব বাড়ি ও ব্যবসা। শরীরে সামান্য খুঁত আছে।’
বাংলায় একটা কথা আছে, ‘সোনার আংটির আবার বাঁকা। সেই কথাকে সত্যি প্রমাণ করে ল্যাংড়া শিলুর জন্যেও সম্বন্ধ এল। বিজ্ঞাপন দেখে যারা যোগাযোগ করেছিল তাদের মধ্যে বিভাকে পছন্দ হয় ওর। মেয়েটার বাড়ি ছোট জাগুলিয়ায়।
রিক্তা বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। বাবা সম্পন্ন কৃষক। নিজের জমি আছে। দেদার মুনিশ খাটে জমিতে। মেয়েকে কলেজে পাঠিয়েছিলেন। পার্ট ওয়ানের বেশি পড়া হয়ে ওঠেনি। শ্যামবর্ণ রিক্তার চেহারা ডাঁসালো। ভারী গড়ন। মেয়ে দেখতে ছোট জাগুলিয়ায় গিয়ে রিক্তার মুখ টিপে হাসি আর কুটকুট করে সুপুরি চিবোনো দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল শিশু। আরও উত্তেজিত হয়েছিল বিশ্বের পর বিশ্বে চাষের জমি দেখে। প্রথম সাক্ষাতেই বিয়ের জন্যে রাজি হয়ে যায়।
প্রথম দর্শনেই একটি মেয়ের প্রেমে পড়া খুবই সৌভাগ্যের বিষয়। সবার কপালে জোটে না। কিন্তু যখন জানা যায় যে মেয়েটি বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে, তখন নিজেকে ‘মুদ্দর কা সিকন্দর’ বলে মনে হয়।
ধুমধাম করে বিয়ে হল সিক্কা প্যালেসে। একটাই রিসেপশন। সব খরচ করল রিতার বাবা। শিলু এক নয়া পয়সাও ঠেকায়নি। বিয়ের পরে আর ছোট জাগুলিয়া যাওয়া হয়নি তার অষ্টমঙ্গলা বা জামাইষষ্ঠীতেও না। রিফাই যেতে চায়নি।
বিয়ের পরে প্রথম কয়েক মাস সব কিছুই ভাল লাগত। ছেলে শান্তনুর জন্মের পরে সম্পর্ক ঠেকেছে তলানিতে। তা ছাড়া রিক্তা এখন নিজের আসল চেহারা দেখাচ্ছে। দজ্জাল বউমার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা সহ্য করতে না পেরে সুধা দেহ রেখেছেন কয়েক বছর আগে। রিক্তা বাড়ির কোনও কাজ করে না একগাদা কাজের লোকের উপর খবরদারি করে দিন কেটে যায়। সময় পেলেই গড়িয়াহাটের সোনার দোকান থেকে গয়না কিনে আনে। পেমেন্ট করে শিলুর ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। শান্তনু ছোটবেলা থেকে বাঁদর তৈরি হয়েছে। সারাদিন গেমিং কনসোলের সামনে বসে ভায়োলেন্ট সব গেম খেলে। লেখাপড়া করতে বললে ঘুমিয়ে পড়ে। যখন যেটা দাবি করে, তখনই সেটা কিনে দিতে হবে। না দিলেই জোরে জোরে কাঁদবে, দেওয়ালে মাথা ঠুকবে, বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে। মাঝেমধ্যে শান্তনুকে খুন করতে ইচ্ছে করে শিলুর।
হার্টবিট তৈরি করার জন্যে ব্যাঙ্ক থেকে অনেক টাকা লোন নিয়েছিল শিশু। এখন যত টাকা ইএমআই শুনতে হয়, সেটা জানলে মধ্যবিত্ত মানুষ হার্টফেল করবে। তা ছাড়া আছে গাড়ির লোনের ইএমআই এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদ। ঢাকের দায়ে মনসা বিকনোর অবস্থা।
রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে শিলু কলকাতার সেরা কার্ডিয়োলজিস্টদের হার্টবিটে যোগদান করতে বাধ্য করেছে। তাঁরা মুখ বুজে কাজ করে যাচ্ছেন। আইসিসিইউ, এইচডিইউ, কেবিন বা জেনারেল ওয়ার্ডে প্রচুর পেশেন্ট। কিন্তু শিলুর মনে শান্তি নেই। তার আরও চাই। আরও! একজন কার্ডিওথোরাসিক সার্জন আর একজন অ্যানাস্থেটিস্ট জোগাড় করতে পারলেই হার্টবিটে কার্ডিয়াক সার্জারি চালু করে দেবে। অপারেশন হয় না বলেই হার্টবিট সিথ্রি-র চেয়ে পিছিয়ে। তা ছাড়া সিথ্রি-র একাধিক সেন্টার আছে। শিলুও চায় অন্য শহরে শাখা খুলতে। কিন্তু তার জন্য হেড অফিসকে বড় করতে হবে।
দিন-রাত এই চিন্তায় মেতে থাকে শিলু। ফ্ল্যাটে ফিরতে চায় না। গেলেই তো রিক্তার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা আর শান্তনুর বায়না। সকাল সাড়ে ন’টা থেকে রাত সাড়ে ন’টা পর্যন্ত হার্টবিটে নিজের চেম্বারে কাটায়। কখনও-কখনও পুরো রাতও কাটিয়ে দেয়।
এত করেও যথেষ্ট লাভ হচ্ছে না। পুরণ হচ্ছে না টার্গেট। কারণ আমজনতা সিথ্রি-র উপরে ভরসা করে। বাধ্য হয়ে বিলো দ্য বেল্ট’ মারছে শিলু। বাজার দখলের লড়াইতে ‘অন্যায়’ শব্দটার অস্তিত্বই নেই।
প্রথম সুযোগ আসে কিছুদিন আগে। যখন সিথ্রি-র কার্ডিওথোরাসিক সার্জন রঘুবীরের পেশেন্ট ইলিনা মারা যায়। সুযোগটা লুফে নিয়েছিল শিলু। প্রথমে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে সিস্ত্রিকে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। পরের ধাপে পাপ্পু আর রাজার নেতৃত্বে তুমুল ভাঙচুর চালিয়েছিল সিথ্রিতে। ইলিনার বাবা-মা সুবীর আর কেকাকে দিয়ে থানায় এফআইআর করিয়েছিল, কনজিউমার ফোরামে রিপোর্ট করিয়েছিল, মেডিক্যাল কাউন্সিলে অভিযোগ জানিয়েছিল। তার পরের ধাপে এল ডিজিটাল অপপ্রচার।
শিলুর কাছে একটি গোপন স্মার্টফোন আছে। বেনামে কেনা ফোন এবং সিমকার্ড। কারও পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সেই ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টে সিথ্রি-র নানা ভিডিয়ো আসে। শিল্প ভিডিয়োগুলো ছড়িয়ে দেয় রাজা আর পাপ্পুর স্মার্টফোনে। তারা পাঠিয়ে দেয় মিডিয়ার কাছে, সিথ্রি এবং হার্টবিটের ক্লায়েন্ট বেসের কাছে। ভিডিয়োগুলো কে তোলে? এটা শিলু আর সেই ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানে না।
এত চেষ্টার পরে কলকাতার হৃদয়-ব্যাধির বাজারে সিথ্রি-র যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তাতে চিড় ধরেছে। রঘুবীরকে নিয়মিত ফোন করে শিলু অনুরোধ করে হার্টবিটে যোগদান করার জন্যে। রঘুবীর অতীতে প্রত্যেকবার ‘না’ বলেছেন। ইলিনা পর্বের পরে বলেছেন, “একটু ভেবে জানাব।” কথাটা শুনে উল্লাস চেপে রাখতে পারেনি ল্যাংড়া শিলু।
খবরের কাগজ আর চায়ের কাপ নিয়ে এসেছে পাপ্পু। চায়ে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজে ডুবে গেল শিশু। মানব মেনন নামের এক মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করেছে কর্নাটক পুলিশ। তা নিয়ে বেঙ্গালুরু আর দিল্লিতে বেজায় গন্ডগোল লেগেছে। সেই খবর শেষ করে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনের দিকে তাকাল শিলু। হার্টবিটের বিজ্ঞাপন স্নান করে ছাপা হয়েছে শ্যামবাবাজির কলকাতায় যোগ শিবির করার বিজ্ঞাপন।
সাড়ে ন’টা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত কাগজ পড়ার পর ব্রেকফাস্ট করল শিলু। ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসেছে রাজা। স্কুলজীবনে তিন বন্ধুর মধ্যে তুইতোকারির সম্পর্ক ছিল। এখনও শিশু ওদের ‘তুই’ বলে। ওরা শিলুকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে।
খাওয়া সেরে কম্পিউটার অন করল শিলু। এখন সে মেল চেক করবে আর ব্যাঙ্কের কাজ করবে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে টাকা। শিলুর চেম্বারের টেবিলে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের একটি কোটেশন ল্যামিনেট করে রাখা আছে, “ফ্রম দ্য ফার্স্ট ডে টু দিস, শিয়ার গ্রিড ওয়াজ দা ড্রাইভিং স্পিরিট অফ সিভিলাইজেশন।”
কম্পিউটারে ব্যাঙ্কের কাজ সেরে চেম্বারের দেওয়ালের দিকে তাকাল শিলু। দেওয়াল জুড়ে অজস্র মনিটর। নজরদারি ক্যামেরার যাবতীয় ফিড সেখানে দেখা যাচ্ছে। মনিটর দেখছে আর ফোনে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছে সে। সামনের চেয়ারে পোষা কুত্তার মতো বসে রয়েছে রাজা আর পাহ্। নির্দেশ দেওয়ার পর্ব চলল এক ঘণ্টা। সকাল সাড়ে এগারোটার সময় খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দফতরে ফোন করে হার্টবিটের নতুন বিজ্ঞাপনের স্কিম নিয়ে আলোচনা শুরু করল শিলু। ফোন সেরে আবার কাজে ডুবে গেল। দুপুর একটার সময় রিক্তার পাঠানো খাবার খেয়ে একঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে তিনটের থেকে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ডাক্তারদের নিয়ে মিটিং, সিস্টারদের নিয়ে মিটিং, ওয়ার্ড বয় আর টেকনিশিয়ানদের নিয়ে মিটিং, মার্কেটিং টিমের মিটিং, উকিল আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে ফোনে মিটিং… কাজ আর শেষ হয় না। কম্পিউটার শাট ডাউন করতে গিয়ে দেওয়ালের দিকে চোখ গেল শিলুর। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। রিক্তা আর শান্তনু এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। এবার ফ্ল্যাটে ফেরা যেতে পারে।
কেন জানি হঠাৎ সেই মেয়েটাকে মনে পড়ে গেল শিলুর। মাথায় ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কপাল ভর্তি সিঁদুর হাতে শাঁখা আর পলা। লজ্জার চোটে শিলুর চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। সকালবেলা ল্যাংড়া পায়ে জড়িবুটির তেল মালিশ করে দিচ্ছে।
যার অস্তিত্ব বাস্তবে নেই, তার কথা থেকে-থেকেই কেন মনে হয়। একেই কি ‘লাভ’ বলে? বাংলার ‘লাভ’ আর ইংরিজির ‘লাভ’-এর মধ্যে কোনও ফারাক খুঁজে পায় না ল্যাংড়া শিশু। গভীর রাতে, অন্ধকারের মধ্যে, খোঁড়াতে- খোঁড়াতে সে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়।
