।। এগারো ॥
২০ মে রাত বারোটা বাজতে দশ থেকে ২১ মে ভোর পাঁচটা
.
২০ মে রাত সাড়ে এগারোটার সময়ে মেহুলের চেম্বার থেকে বেরিয়ে একটান ক্রিটিকাল পেশেন্টকে দেখতে গিয়েছিলেন রঘুবীর। বারোটা বাজতে দশ মিনিট নাগাদ নিজের বাড়ির দিকে এগোচ্ছেন তিনি। বাড়ি ঢুকেই তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন। কাল লম্বা এবং জটিল অপারেশন আছে।
ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সিথ্রি-র বিল্ডিংগুলো দেখছেন রঘুবীর। অনেকটা জায়গা জুড়ে বানানো বলে এখানে বাগান, মাঠ বা ফাঁকা জায়গার অভাব নেই। কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো রাস্তার দু’দিকে কেয়ারি করা গাছের ঝাড়। অনেক বড়-বড় গাছ আছে। ফ্লাওয়ার লাভার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে চুক্তি করা আছে। অর্থের বিনিময়ে ওরা নতুন গাছ বসায়, পুরনো গাছের যত্ন নেয়, নিয়মিত জল আর সার দেয়। হাসপাতাল সবুজ থাকলে সেখানে যারা আসছেন তাঁদের মন ভাল থাকে। সে রোগী হোক বা তাঁর বাড়ির লোক।
রোগীর কথা মনে আসতেই ইলিনার কথা মনে পড়ে গেল রঘুবীরের। বাচ্চাটার জন্যে মরমে মরে থাকেন তিনি। ইলিনার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করেন।
ইলিনার কথা ভাবতে গিয়ে মনে এল বকের কথা। এখন কি একবার ছেলেকে ফোন করা ঠিক হবে? ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করছেন রঘুবীর। সুতপা কখনও সরাসরি বলেনি। হাবেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে রঘুবীর ফোন করলে থক বিরক্ত হয়।
কথাটা যে সর্বৈব মিথ্যে সেটা রঘুবীরের চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। কারণ প্রতি সপ্তাহেই থকের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়। ওদের স্কুলে মোবাইল নিয়ে যাওয়া বারণ। কিন্তু কিছু ছেলে তো থাকেই যারা স্কুলব্যাগের মধ্যে মোবাইল রাখে সায়লেন্ট মোডে। দুটো ক্লাসের মাঝখানে বাথরুমে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার পর্ব সেরে আসে।
সেই রকম সহপাঠীর সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে কের। থাক একদিন অচেনা নম্বর থেকে রঘুবীরকে ফোন করেছিল। রঘুবীর ফোন ধরতেই হড়বড় করে বলেছিল ফোনটা কার, সে কীভাবে পেল, কখন সে ফোন করবে। এবং রঘুবীর যেন কখনও ওই নম্বরে ফোন না করেন। পাশাপাশি এটাও বলেছিল, সুতপার মোবাইল ফোনে বেশি রাতে ফোন করলে সুতপা টের পাবে না। কারণ সুতপা ঘুমিয়ে পড়ার পরে ফোনটা থকের জিম্মায় থাকে।
স্মার্টফোন সারারাত নিজের কাছে রাখার জন্যে ছেলেকে বকেছিলেন রঘুবীর। এটাও বলেছিলেন, প্রতি সপ্তাহে রবিবার রাতে তিনি ফোন করবেন। বাবার কাছে ধমক খাওয়ার পরে সুতপার স্মার্টফোন আর সারা রাত নিজের কাছে রাখে না থাক। শুধু রবিবার রাতে রাখে। রঘুবীরের সঙ্গে কথা হয়ে যাওয়ার পর কল লগ থেকে ‘লাস্ট ইনকামিং কল’ মুছে দেয় বক
এই সপ্তাহে রবিবার কথা বলা হয়ে গিয়েছে। আর কি ফোন করা উচিত। রঘুবীর ফোন করলে হয় সুতপা ধরবে, অথবা ওটা মিসড কল হিসেবে কল লগে থেকে যাবে। কাল ওই নিয়ে কৈফিয়ত দিতে হবে রঘুবীরকে স্বামী, স্ত্রী আর সন্তান নিয়ে পরিবারের যে বেসিক ইউনিট, তার মধ্যে সংশয় ও অবিশ্বাস, ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’, সন্দেহ আর ক্রোধ ঢুকে পড়লে সেটা আর সংসার থাকে না। যেমন রঘুবীরের কোনও সংসার নেই। তিনি তা হলে যাবেন কোথায়? কীভাবে যে এই অন্ধগলিতে এসে পড়লেন রঘুবীর।
ইলিনার মৃত্যুই সেই লক্ষ্মণরেখা, যা পেরনো মাত্র রঘুবীরের জীবন সম্পূর্ণ পালটে গিয়েছিল। আজ, এত দিন পরেও তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে চোখের সামনে সাপের ফণার মতো ঝিকিয়ে ওঠা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, টর্পেডোর মতো ধেয়ে আসা টিভি চ্যানেলের বুম, খবরের কাগজ এবং টিভি নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকদের ছুড়ে দেওয়া একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। যে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কায়দা দেশ বা বিদেশের মেডিক্যাল কলেজে শেখানো হয় না।
“ডক্টর চক্রবর্তী, পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে আপনার হাতে মারা গেল। আপনার কেমন লাগছে?” জিজ্ঞেস করল স্কুপ চ্যানেলের পরিমল।
“মানে?” উত্তেজিত হয়ে বললেন রঘুবীর, “আপনি এমন করে বলছেন যেন আমি ইচ্ছে করে মেরে ফেলেছি।”
“আমি তো তা বলিনি। এটা আপনি কেন ভাবছেন?”
ডিপ ব্রিদিং করে রাগ কমাচ্ছেন রঘুবীর, “আমার একটি পাঁচ বছরের ছেলে আছে। অপত্য স্নেহ কাকে বলে আমি জানি। আপনারা অকারণে একটা নন ইসুকে সেনসেশনালাইজ করছেন।
পিছন থেকে সিগ্রি-র পাবলিক রিলেশন অফিসার রঘুবীরের পিঠে খোঁচা দিয়েছে। ফিসফিস করে বলছে, “কম কথা বলুন।’
দিনকাল কাগজের সাংবাদিক অর্থা জিজ্ঞেস করল, “ডেথ ইন অপারেশন থিয়েটার’ বা ‘ডিও টি হয়েছে। মৃত্যুর কারণ জানার জন্যে পোস্টমর্টেম করা হবে কি?”
রঘুবীর বললেন, “আমি চাই যে পিএম হোক। কিন্তু ইলিনার বাবা-মা রাজি হচ্ছেন না।”
দ্য টেলিগ্রাম কাগজের সাংবাদিক চন্দ্রাণী বলল, “সব অপারেশনেরই নানা কমপ্লিকেশন থাকে। ডাক্তার হিসেবে আপনার কর্তব্য সেটা রোগীর বাড়ির লোককে বুঝিয়ে বলা। এই কাজটা করা হয়েছিল।’
“আমি নিজে ইলিনার বাবা-মায়ের সঙ্গে এটির আগে কথা বলেছিলাম,” বললেন রঘুবীর। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে কেকা চেঁচিয়ে উঠল, “মিথ্যে কথা। তুই আমাদের কিছু বলিসনি। যদি বলতিস যে আমার মেয়েটা মরে যাবে, তা হলে অপারেশন করাতাম না। তোর মতো জহাদের হাতে মেয়েকে বলি দেওয়ার জন্যে তুলে দিতাম না।”
সাংবাদিক সম্মেলনের স্পটলাইট নিমেষে ঘুরে গেল ক্রন্দনরতা মায়ের দিকে। কেকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, “এইসব মানুষ মারা ডাক্তারদের কুকুরের মতো গুলি করে মারা উচিত। আমার কোল যে খালি করে দিল, সে যেন মরেও শান্তি না পায়…
মেনস্ট্রিম মিডিয়া থেকে খবর ছেঁকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া খাপ পঞ্চায়েত খুলে বসল। রঘুবীরের মুখ অবলম্বন করে তৈরি হল ‘জহ্লাদ ডাক্তার’ সিরিজের মিম। তারপরে এল ‘জহ্লাদ সিথ্রি’ সিরিজ। তারপরে এল ‘কসাই ডাক্তার’ সিরিজ। মোবাইল থেকে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সেগুলো। সিগ্রি বয়কট করার জন্যে এবং রঘুবীরকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্যে কেকার আবেদন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং মিডিয়ার ‘শেয়ার বাজার’-এ ছড়াতে লাগল দ্রুত।
রঘুবীর অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এলেন। খেয়াল করলেন, তিনি এখনও রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দরদর করে ঘামছেন, পাস দৌড়চ্ছে টগবগ করে, কান আর গাল থেকে গরম ভাপ বেরচ্ছে, পেটে মোচড় দিচ্ছে।
কপালের ঘাম মুছলেন রঘুবীর। ওষুধ আর কাউন্সেলিংয়ের পরেও তিনি মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ নন। প্রায়শই তাঁর মনেও সূর্যগ্রহণ লাগে। বিষাদে ভরে যায় হৃদয়াকাশ। বৃষ্টি নামার আগে যেরকম আচম্বিতে গগন জুড়ে ছড়িয়ে যায় বিদ্যুতের ডালপালা, সেইভাবেই শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অজানা আতঙ্কের তরঙ্গ। কিছতেই নিজেকে সমে ফেরাতে পারেন না। সহ্য করতে হয় দাঁতে দাঁত চিপে। একটু পরে সব ঠিক হয়ে যায়।
এখন, এই মুহূর্তে আবার প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হয়েছিলেন তিনি। নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত কোয়ার্টারের দিকে এগোলেন। অনেক রাত হয়েছে। আজ তাঁকে দুটো ঘুমের ওষুধ খেতে হবে। মাথা সাফ না থাকলে কালকের অপারেশন করতে পারবেন না।
রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে হাঁটছেন রঘুবীর। তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে কুড়ি বছর আগের কথা প্রান্তর আর রিমুলের কথা। দু’জনে কী পাগলামিটাই না করেছিল। বাইরে কোথায় কী করে বেড়াত, জানেন না রঘুবীর। তবে তাঁর আর স্বপনের গ্রুপ স্টাডিতে ওদের ঢুকতে দেখে উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধে হয়নি। স্বপন সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, “তোরা আবার এখানে কেন রে?”
“ বোটানি একদম মাথায় ঢুকছে না,” বলেছিল রিমূল, “শত-শত বৈজ্ঞানিক নাম কারও পক্ষে মনে রাখা সম্ভব! ভাবলাম গ্রুপ স্টাডি করলে যদি মাথায় ঢোকে।
প্রাপ্তরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে স্বপন বলেছিলেন, “আর তুই? যৌন না অযৌন জনন, কোনটা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে?”
প্রান্তর স্বপনের পিঠে থাবড়া মেরে বলল, “অ্যামিবা কীভাবে সেল ডিভিশন করে জানিস তো? আমি ওইরকম ভাবে তোকে দু’টুকরো করে দিতে পারি।”
ভয়ের চোটে চুপ করে গেলেন স্বপন। তবে পরের দিন থেকে গ্রুপ স্টাডিতে আসা বন্ধ করে দিলেন। স্বপন চলে যাওয়ার পরে গ্রুপ স্টাডি বেশি দিন চলেনি। রঘুবীর নিজের স্বার্থেই স্বপনকে ফিরিয়ে আনেন। এবং কায়দা করে রিমুল আর প্রান্তরকে বুঝিয়ে দেন যে লেখাপড়ার নাম করে তাঁর বাড়িতে প্রেম করা চলবে না।
ওরা তারপরে আর আসেনি। মাত্র কয়েকটা সন্ধ্যা রঘুবীরের সঙ্গে ওরা কাটিয়েছিল। সেইসব সন্ধ্যার স্মৃতি অমলিন হয়ে রয়ে গিয়েছে রঘুবীরের মাথায়। দু’জনে দু’জনকে ছুঁয়ে বসে থাকত। পাশাপাশি বসেছে, আঙুলে আঙুল ঠেকে রয়েছে। এতেই ওদের শান্তি। রিমুল বড় বড় চোখ করে গাছপালার বৈজ্ঞানিক নাম আওড়াত। প্রায় সব নামই ভুল বলত। প্রান্তর কিছুই বুঝতে পারত না। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত রিমুলের দিকে। অল্প স্টাডি শেষ করে রঘুবীরের ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে বেরিয়ে গোলাপি সাইকেল চলে যেত আইসক্রিম বাড়ির দিকে। কালো সাইকেল রওনা দিত বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে রঘুবীর পড়ায় ডুবে যেতেন।
একে অপরকে ভালবাসার অপরাধে কত শাস্তিই না পেতে হল দু’জনকে একজন নিজের শহর ছেড়ে অন্য শহরে গিয়ে থাকতে বাধ্য হল। বিয়ে করল না। অন্যজনকে মিথ্যে অপবাদে জেল খাটতে হল, মায়ের আত্মহত্যা দেখতে হল। কোনও কাজ না পেয়ে সিকিয়োরিটির কাজ করতে হল। আর আজ, দু’দশক পরে যখন দু’জনে মুখোমুখি, তখন তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছে মৃত্যু।
রিমুল আর প্রাপ্তর এই মুহূর্তে রয়েছে একটি আপৎকালীন যানের মধ্যে। ওরা জানে না যে রঘুবীরের মতো, মেহুলের মতো, স্বপনের মতো, পীযূষের মতো, জ্যোতির্ময়ী আর নবকুমারের মতো অনেকে মিলে ওদের জন্য তৈরি করছেন একটা সবুজ সরণি। দেওদার, পপলার, ইউক্যালিস্টাস ঠাসা সেই বীথিতে আলপনা আঁকছে মত রংয়ের জারুল, কৃষ্ণ আর রাধাচূড়ার হলুদ আর লাল ফুলের পাপড়ি। দূর থেকে ভেসে আসছে গির্জার গং। সবুজ সরণির দু’প্রান্ত থেকে দৌড়ে আসছে দু’জনে। মাঝখানে ডেমোক্লিসের খড়োর মতো ঝুলছে মৃত্যু নামের খলনায়ক…
মৃদু হেসে, কৈশোরের অমলিন স্মৃতির দিব্যি খেলেন রঘুবীর। রিমুলকে সুস্থ করে তোলার জন্য তিনি জান লড়িয়ে দেবেন।
বাড়ির কাছে এসে গিয়েছেন রঘুবীর উলটো দিকের ফ্ল্যাটে প্রান্তরের কোয়ার্টারের দরজায় তালা মারা। বা পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঘুমের ওষুধের ফয়েল বের করলেন রঘুবীর। দুটো ট্যাবলেট মুখে পুরে ডান পকেটে হাত ঢোকালেন বাড়ির সদর দরজার চাবি খোঁজার জন্যে।
ঠিক এই মুহূর্তে, যখন ওষুধের প্রভাবে একটু হলেও আচ্ছন্ন রঘুবীর, যখন চাবি দিয়ে তালা খোলার জন্যে তিনি একটু হলেও নিচু হয়েছেন, যখন তাঁর রিফ্লেক্স একটু হলেও শিথিল, ঠিক তখনই মুখে কাপড় জড়ানো এক ছায়ামুর্তি এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর পিছনে। রঘুবীর কিছু বোঝার আগেই মাথায় পড়ল লাঠির বাড়ি। ‘ঠনাত’ করে একটা শব্দ হল, আর রঘুবীর নিজের বাড়ির দরজার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন।
মুখে কাপড় জড়ানো ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে এসেছিল। শব্দহীন ভাবে চলে গেল। সে জানে সিগ্রি কমপ্লেক্সের কোন কোন এলাকা নজরদারি ক্যামেরার আওতায় আছে, কোন-কোন আওতার বাইরে। কোথায় কোথায় ক্যামেরা খারাপ হয়ে গিয়েছে, অথবা ভয় দেখানোর জন্যে নকল ক্যামেরা লাগানো আছে। সে চিহ্নহীন এসেছিল। সূত্র না রেখে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রঘুবীর পড়ে রয়েছেন। তাঁর জ্ঞান নেই। মাথা দিয়ে রক্ত বেরিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে ফুটপাথ। চাবি আটকে রয়েছে তালার গর্তে। মোবাইল পড়ে রয়েছে পাশে। মোবাইলের ঘড়ি বলছে, আজ একুশ তারিখ। রাত পৌনে একটা…
জ্ঞানহীন রঘুবীর পড়ে রয়েছেন। সময় বয়ে যাচ্ছে। মোবাইলের ডিজিটাল ঘড়ির সংখ্যাগুলো নিজের মতো করে বদলে যাচ্ছে। দেড়টা বাজল, রাত দুটো। রঘুবীরের মোবাইল বাজছে। জ্ঞান থাকলে তিনি দেখতে পেতেন স্বপন ফোন করেছেন। তিনি ফোন ধরলেন না। একটু পরে মোবাইল আবার বেজে উঠল। এইবার ফোন করেছে প্রান্তর। আবারও রঘুবীর ফোন ধরতে পারলেন না। পরপর কয়েকবার প্রান্তর আর স্বপনের ফোন এল। রঘুবীর ফোন ধরলেন না। রাত আড়াইটে বাজল।
রাত পৌনে তিনটের সময়ে ফোন এল মেহুলের। একবার, দু’বার, তিনবার। রঘুবীর ফোন ধরলেন না।
রাত তিনটের সময়ে দেখা গেল নির্জন রাস্তা দিয়ে রঘুবীরের কোয়ার্টারের দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছে তিনজন মানুষ। মেহুল, কাঠি আর যোগী।
রঘুবীরকে সবার আগে দেখতে পেল যোগী। চিৎকার করে বলল, “দরজার সামনে একটা বড়ি পড়ে আছে!”
তিনজনে ছুটে এলেন রঘুবীরের কোয়ার্টারের দরজার সামনে। মেহুল মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রঘুবীরের পালস দেখলেন। বললেন, “থ্যাঙ্ক গড! পাল্স আছে। একে হসপিটালে নিয়ে চলো। কুইক।”
কাঠি কুড়িয়ে নিয়েছে রঘুবীরের মোবাইল ফোন। যোগী নিজের মোবাইলের টর্চ জ্বেলে রঘুবীরের মাথায় আলো ফেলে বলছে, “মাথায় চোট আছে স্যার। ললিতাকে ফোন করে একটা স্ট্রেচার বা টুলি আনিয়ে নেব?”
“না!” ধমক দিয়েছেন মেহুল, “কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। আমরাই এঁকে নিয়ে গিয়ে আই সি ইউ-তে ভর্তি করব। সার্জন মুন্সীকে ফোন করছি। উনি এক্ষুনি এসে ওঁকে দেখবেন। শুধু মাথার চামড়া কেটে গিয়েছে না ব্রেনেও চোট লেগেছে, সেটা জানা জরুরি।”
“কাউকে না বললে একটা কথা বলি স্যার আপনি পুলিশে খবর দেবেন না?” জিজ্ঞেস করল কাঠি, “আামাদের কমপ্লেক্সের মধ্যে ডাকাতি শুরু হয়েছে। সিকিউরিটির হেড প্রান্তর কি কোনও কাজই করছে না।”
“একদম বেশি কথা বলবে না,” কড়া গলায় ধমক দিলেন মেহুল, “বা বলছি করো।’
মেহুলের ধমক শুনে ঘাবড়ে গিয়ে কাঠি আর যোগী মিলে রঘুবীরকে চ্যাংদোলা করে তুলে ধরেছে। রঘুবীরের ঘাড় ন্যালব্যান করছে। মেহুল তাড়াতাড়ি মাথাটা ধরলেন। কাঠির হাত থেকে রঘুবীরের মোবাইল নিয়ে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে বললেন, “সুতপাকে এক্ষুনি খবর দেব না। আগে জানি কী সিচুয়েশন, তারপরে।”
রাত সাড়ে তিনটের সময়ে আই সি ইউ-তে অ্যাডমিশন করা হল রঘুবীরকে। সার্জন মুন্সী আসার আগেই মাথার সিটি স্ক্যান হয়ে গেল। সার্জন মুন্সী অজ্ঞান রঘুবীরকে পরীক্ষা করে এবং স্ক্যান দেখে বললেন, “ব্রেনে কিছু হয়নি। তবে স্ক্যাল্পে সেলাই করতে হবে। আঘাতটা বড়।”
মেহুল হুম মেরে গেলেন।
ভোর চারটের সময় শেষ হল রঘুবীরের প্রাথমিক চিকিৎসা। আই সি ইউ থেকে বের করে তাঁকে প্রাইভেট কেবিনে দেওয়া হয়েছে। ব্যথা কমানোর ইঞ্জেকশন আর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে সার্জন মুন্সী ফিরে গেলেন। যাওয়ার আগে মেহুলকে বললেন, “হিত ভাইটাস আর স্টেবল। একটু পরে জ্ঞান ফিরবে। তখন ব্যথায় ছটফট করবেন। সিস্টারকে বলবেন ব্যথার ইঞ্জেকশন দিতে। আমি আবার সকাল দশটার সময় আসছি।”
মেহুল বললেন, “কাল সকাল সাড়ে এগারোটা থেকে এঁর এটি আছে।”
মুন্সী সশব্দে হেসে বললেন, “এখন বাজে ভোর পাঁচটা। মাত্র সাড়ে ছ’ঘণ্টার মধ্যে এমন কোনও মিরাকল ঘটবে না যে, রঘুবীরদা পিটার পার্কার থেকে সুপারম্যান হয়ে যাবেন। এটি ক্যানসেল করে দিন।”
