সবুজ সরণি – ৫

॥ পাঁচ ॥

১৯ মে রাত সাড়ে এগারোটা থেকে ২০ মে রাত সাড়ে বারোটা

.

মে রাত সাড়ে এগারোটার সময়ে আয়াঙ্গার হাসপাতালের আইসিইউ-এর বাইরে মাথা নিচু করে বসে রয়েছেন রাজর্ষি এবং মোহর। ১৭ তারিখ রাতে ডক্টর পীযূষ আইচের পরামর্শ মেনে তাঁরা বাড়ি গিয়েছিলেন। স্নান করে পোশাক বদলে চলে এসেছিলেন হাসপাতালে। আর ফেরেননি। কাফেটেরিয়ার খাবার খেয়েছেন, রোগীর বাড়ির লোকের বিশ্রাম নেওয়ার ঘরে রাখা সোফায় শরীর এলিয়ে ফোনে কথা বলেছেন, আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, “সায়ক যেন বেঁচে থাকে”।

“সায়ক যেন ভাল হয়ে যায়, এত বড় প্রার্থনা করার সাহস তাঁদের নেই। সেই প্রার্থনার ফল জানা যাবে এখন। গতকাল এবং আজ পীযূষ তাঁদের সঙ্গে একটাও কথা বলেননি। সিস্টার এবং জুনিয়র ডাক্তারদের কাছ থেকে যেটুকু খবর পাওয়া গিয়েছে, সেটা আশাপ্রদ না ভীতিজনক, বোঝা শক্ত। সবাই এক সুরে বলেছে, ‘পেশেন্ট আগের মতোই আছে’।

*আগের মতোই আছে’ এই কথাটার মানে কী? সায়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়নি। তা হলে তো ভাল কথা। আগেও ভেন্টিলেটরে ছিল, এখনও আছে। এটা খুব চিন্তার কথা। কোনটা ধরবেন রাজর্ষি আর মোহর। বুঝতে না পেরে আশা আর নিরাশার দোলাচলে সময় কাটিয়েছেন দু’জনে। এবার সত্যি জানার পালা।

আইসিইউ থেকে বেরিয়ে, কাফেটেরিয়ায় বসে পীযূষ তাঁদের ডেকে নিয়েছেন। রাজর্ষি আর মোহর নীরবে বসেছেন তাঁর সামনে।

রাজর্ষির পিঠে হাত রেখে গম্ভীর গলায় পীযূষ বললেন, “মন শক্ত করুন। একটা খারাপ খবর দিতে চলেছি। সায়কের ব্রেন ডেথ হয়েছে।”

“কী হয়েছে।” ফ্যালফেলে চোখে জিজ্ঞেস করলেন রাজয়ি।

পীযূষ শান্তভাবে বললেন, “সায়কের ‘ব্রেন ডেথ’ হয়েছে। মানে ব্রেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। মানে সায়ক মারা গিয়েছে।”

মোহর টেবিলে মাথা রেখে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।

তাঁর দিকে তাকিয়ে পীযূষ বললেন, “ সোজাসুজি মারা গিয়েছে’ কথাটা না বলে ‘ব্রেন ডেথ’ কেন বলছি? কারণ এখন ক্রিটিকাল কেয়ার মেডিসিন অনেক এগিয়ে গিয়েছে। মস্তিষ্কের মৃত্যু হলেও সায়কের শ্বাসপ্রশ্বাস, রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, নাড়ির গতি, এগুলো কৃত্রিমভাবে চালু রাখা আছে। আর একটা কথা জানিয়ে রাখি। পেশেন্টের যে ব্রেন ডেথ হয়েছে এটা ঠিক করেছি হাসপাতালের কার্ডিয়োলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট, সুপারিন্টেন্ডেন্ট এবং ক্রিটিকাল কেয়ার এক্সপার্ট হিসেবে আমি, আমরা সবাই মিলে।”

রাজর্ষি চেয়ার থেকে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি যে কাঁদছেন, এটা মোহরকে দেখাতে চান না। তাঁদের একমাত্র ছেলে মারা গিয়েছে। পুত্রশোকের চেয়ে বড় শোক আর হয় না। সায়কের মৃত্যুর এই মুহূর্তটি তাঁদের জীবনকে আড়াআড়ি দু’ভাগ করে দিল। কোনও কিছুই আর আগের মতো রইল না। বাবা-মা মারা গেলে অতীত হারিয়ে যায়। সন্তান মারা গেলে হারিয়ে যায় ভবিয্যৎ! হায় রে বাকি জীবন তিনি আর মোহর একা একা বাঁচবেন। তিনি চাকরি করতে-করতে বুড়ো হয়ে যাবেন, রিটায়ার করবেন, তারপর তাঁদের মধ্যে কেউ একজন মরে যাবেন। তখন অন্যজন একা বেঁচে থাকবেন। এই অর্থহীন জীবন নিয়ে তাঁরা কী করবেন?

কান্না চেপে রাজর্ষি বললেন, “সায়ককে ভেন্টিলেশনের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে হবে না। মেশিন থেকে ওকে বের করে দিন।”

পীযূষ বললেন, “আমাদের তরফে কিছু নিয়মকানুন আছে। সেগুলো মেনেই সায়ককে ওইভাবে রাখা। নির্দিষ্ট সময়ে ছেলেকে আপনাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তবে আপনাদের কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।”

রাজর্ষি ভুরু কুঁচকে পীযূষের দিকে তাকালেন।

পীযূষ বললেন, “আমি অন্য একটা কথা বলতে চাই। সেটা বলার জন্যে এটাই একদম ঠিক সময়। যদিও আপনাদের প্রাথমিকভাবে শুনলে খারাপ লাগবে।”

“আপনি কি কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্টের কথা বলছেন?”

রাজর্ষিকে থামিয়ে মোহর বললেন, “তুমি প্লিজ চুপ করো,” তারপর পীযূষের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। ডাক্তার, ক’টা নাগাদ আমরা সায়কের ডেডবডি পাব? সেই মতো সবাইকে ইনফর্ম করতে হবে। এতদিন চেন্নাইতে আছি, শ্মশানটা কোথায়, সেটাও তো ছাই জানি না। কখনও ভাবিনি যে শ্মশানের লোকেশন জেনে রাখতে হবে।”

মোহর শিশুর মতো কাঁদছেন। রাজর্ষি তাঁর চোখের জল মুছিয়ে বললেন, “আমি এবং সায়ক, দু’জনেই কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্ট মুভমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের পরিবারের সবাই মরণোত্তর চক্ষুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। সারক আর নেই। ওর কর্নিয়া পেয়ে যদি কোনও মানুষ দৃষ্টি ফিরে পায়, তা হলে আমরা খুশিই হব। আপনি ব্যবস্থা করুন।

পীযূষ বললেন, “এই কঠিন সময়ে আপনি যে কথাটা বলতে পারছেন, এই জন্যে আপনাকে অভিনন্দন। তবে আমি শুধু কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্টের কথা বলছি না।”

“তবে কি মরণোত্তর দেহদানের কথা বলছেন?” ফুঁসে উঠেছেন মোহর। শান্ত গলায় পীযূষ বললেন, “আপনাদের ছেলেকে দু’ ইউনিট ব্লাড দেওয়া হয়েছিল। তখনই দেখেছি যে এর ব্লাড গ্রুপ এবি পজিটিভ।”

“তো!” মোহর এখনও রাগত চোখে পীযূষের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। “আমি মরণোত্তর অঙ্গদানের কথা বলছি। সায়ককে আপনারা আর ফিরে পাবেন না। কিন্তু ওর অর্গ্যান নিয়ে অন্য একজন মানুষ বেঁচে যেতে পারে। সেটাও তো সায়কের বেঁচে থাকা। তাই না?

মোহর বললেন, “এই মুহূর্তে এইসব ভাবতে পারছি না ডাক্তার।”

পীযূষ রাজর্ষির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি যখন কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে ভেবেছেন, তখন আপনাকে কথাগুলো বলাই যায়। এটা জেনে রাখুন যে অ্যাট এনি গিন ডে, ইন্ডিয়ার যে-কোনও মেট্রোপলিটন সিটির বড় হাসপাতালে এমন আট থেকে দশজন পেশেন্ট আছেন, যাঁদের ব্রেন ডেথ হয়েছে। এঁরা প্রত্যেকে সাতটা অর্গ্যান ডোনেট করতে পারেন। অ্যাট দিস

ভেরি মোমেন্ট, আমাদের দেশে কর্নিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে দশ লক্ষ মানুষ, কিডনির জন্যে অপেক্ষা করছেন দু’লক্ষের বেশি, হৃৎপিণ্ডের জন্যে পঞ্চাশ হাজার, ফুসফুসের জন্যে কুড়ি হাজার। অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্ট না করলে এঁদের অধিকাংশই মারা যাবেন।”

মোহর উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আপনার হাসপাতাল যে আমার ছেলের অর্থান নিয়ে ব্যবসা করবে না, তার গ্যারান্টি কী ডাক্তার?”

পীযূষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “অঙ্গদাতার বাড়ির লোকের মনে নানা প্রশ্ন থাকে। প্রথম প্রশ্নটা আপনি করে ফেলেছেন। এর পরে যে প্রশ্নগুলো করা হয়, সেগুলো হল, অঙ্গদানের বিনিময়ে আমরা কি কোনও সহায়তা পাব?

অঙ্গদানের পরে শেষকৃত্যের কী হবে?”

“বিনিময়ের কথা আসছেই না,” উত্তেজিত হয়ে হাত নাড়ছেন মোহর, “আমি বুঝতে পারছি না, আমার ছেলের অর্গ্যান ডোনেট হবে কি হবে না, এই নিয়ে আপনার কী স্বার্থ। আপনি তো সার্জন নন। এখানেও কি কাটমানির ব্যাপার আছে!”

“আপনাকে একটা কথা জানিয়ে রাখি,” কঠিন গলায় বললেন পীযূষ, “তামিলনাড়তে সরকারি নির্দেশ আছে যে ‘ব্রেন ডেথ’ ঘটলে সেটা ঘোষণা করতেই হবে। তামিলনাডুর যে সব হাসপাতালে আইসিসিইউ আছে, সেখানে একজন করে ‘ট্রান্সপ্লান্ট কো-অর্ডিনেটর’ আছেন। আয়াঙ্গার হাসপাতালের ক্ষেত্রে আমিই সেই কো-অর্ডিনেটর। আমাকে একদিকে যেমন দেখতে হয় যে মৃতদেহ থেকে অর্গ্যান বের করার কাজ যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করা যায়, তেমনই খুঁজতে হয় কাকে সেই অর্গ্যান ডোনেট করা যেতে পারে। অর্থাৎ

এই মুহূর্তে গ্রহীতা কে আছেন। আর আপনি যে দুর্নীতির কথা বলছেন, সেটা কখতে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ন্যাশনাল অর্গ্যান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অথরিটি’ কাজ করছে।”

মোহর চুপ করে গিয়েছেন। পীযূষ বললেন, “অঙ্গদানের ক্ষেত্রে বাংলা কেন পিছিয়ে আছে জানেন?”

মোহর বললেন, “সচেতনতার অভাব?”

পীযূষ বললেন, “বাংলার মানুষকে এইভাবে খাটো করবেন না। এখানে এখনও পর্যন্ত যে ক’টা ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে, সেগুলো মৃত ব্যক্তির বাড়ির লোকের আগ্রহেই হয়েছে। বাংলার সমস্যা অন্য জায়গায়। দাতার শরীর থেকে অর্গ্যান নেওয়া এবং গ্রহীতার শরীরে সেটা প্রতিস্থাপন করার জন্যে একটা ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ এবং ‘ফার্স্ট’ সিস্টেমের দরকার। একে সাপ্লাই চেন ‘ম্যানেজমেন্ট’-ও বলা যেতে পারে। ওইটা বাংলায় এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু এই রাজ্যে তো আছে। তা হলে আর দেরি কেন

রাজর্ষি আর মোহর চুপ। পীযূষ বললেন, “মানুষকে অর্গান ডোনেশনে উদ্বুদ্ধ করতে সরকার থেকে আরও কিছু নিয়ম চালু করেছে। যেমন দাতার চিকিৎসার জন্যে যত টাকা লেগেছে, সেই টাকা মেটাবেন গ্রহীতার বাড়ির লোক এবং এই হাসপাতাল। দাতার বাড়ির লোকের কোনও খরচই হবে না। অবশ্য গ্রহীতার বাড়ির লোক যদি গরিব হয় তা হলে হাসপাতাল কোনও খরচই নেবে না। পুরোটাই মকুব করে দেবে।”

“সবটাই আমরা পাব? আপনি মহামান্য সরকারের কাছ থেকে কিছু

পাবেন না ডাক্তার! মোহরের গলায় শেষ।

পীযূষ ম্লান হেসে বললেন, “আমি বেতনভুক কর্মচারী। কোনও কিছু পাওয়ার আশায় এই কাজ করি না।

মোহর চুপ করে গিয়েছেন। রাজর্ষি বললেন, “আপনি আমাদের একটু সময় দিন। অনেককে ফোন করে দুঃসংবাদ দিতে হবে। বাকি জীবনটা যে পুত্রশোক বয়ে বেড়াতে হবে, সে কথা না হয় না-ই বললাম।”

পীযূষ হাতজোড় করে বললেন, “বিশ্বাস করুন, এখন একটা জিনিসেরই অভাব। সেটা হল সময় সায়কের ভাইটাল সাইন্‌স যন্ত্রের কারণে এখনও স্টেবল। আমি আর ওইভাবে ওকে রাখতে চাইছি না। আপনারা ফোন করে আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়ার পাশাপাশি এটা নিয়েও ভাবুন। আজ ১৯ তারিখ, এখন রাত পৌনে বারোটা বাজে। পনেরো মিনিট পরেই ২০ তারিখ এসে যাবে। আমি ২০ তারিখ রাত সাড়ে বারোটার সময়ে আপনাদের সঙ্গে আবার দেখা করব। তখন আপনাদের সিদ্ধান্ত আমাকে জানিয়ে দেবেন।

মণ্ডল দম্পতি মোবাইলে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। চেন্নাইতে তাঁদের আত্মীয়স্বজন না থাকলেও বন্ধুবান্ধব বা অফিস কোলিগ প্রচুর। কলকাতার লোকদের এই মুহূর্তে বিব্রত করার কোনও মানে হয় না।

রাজর্ষি আর মোহরের ফোন পাওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে একদল মানুষ জড়ো হলেন আয়াঙ্গার হাসপাতালের কাফেটেরিয়ায়। তাঁদের মধ্যে রাজর্ষির ব্যাঙ্কের সহকর্মী আছেন, মোহরের বান্ধবীরা আছেন, আছে সানকের অফিস কোলিগ। সুচিত্রা এবং তার বাবা-মা নবকুমার এবং জ্যোতির্ময়ীও এসেছেন। সুচিত্রার মুখ ফুলে রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে সে খুব কেঁদেছে। তাকে শক্ত করে ধরে আছে সুন্দর।

অধ্যান ট্রান্সপ্লান্টের ব্যাপারে রাজর্ষি আগে থেকেই রাজি ছিলেন। মোহর নিমরাজি হয়েছেন। তবে তাঁর একটাই কথা, “সায়কের শরীর থেকে একগাদা অর্গ্যান খুবলে নিতে দেব না।”

সবাই চুপ করে কথাটা শুনল। শুধু সুচিত্রা ফুঁপিয়ে কেঁদে মোহরকে জড়িয়ে ধরল। জ্যোতির্ময়ী মেয়েকে সরিয়ে নিতে যাচ্ছিলেন। ইশারায় তাঁকে বসে থাকতে বলে সুচিত্রার কাঁধে হাত রেখে সুন্দর তাকে সরিয়ে নিল।

বাইরে যখন এইসব চলেছে তখন নিজের চেম্বারে কম্পিউটারের সামনে বসে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে ঢুকে গ্রহীতার তালিকা দেখছেন পীযূষ। এবি পজিটিভ ব্লাড গ্রুপ আছে এমন ক’জন পেশেন্টের এখন অর্গ্যান প্রয়োজন? কারা সেই মৃত্যুপথযাত্রী, যাঁদের জন্যে বিশল্যকরণীর ব্যবস্থা করতে পারবেন পীযূষ

চেন্নাইতে এই মুহূর্তে বিভিন্ন অর্গ্যানের অপেক্ষায় রয়েছেন সতেরোজন। তাঁদের কারও ব্লাড গ্রুপ এবি পজিটিভ নয়। সায়কের অর্গ্যান নেওয়ার জন্য চেন্নাইতে কোনও গ্রহীতা এই মুহূর্তে নেই। শুধু চেন্নাই ছেড়ে গোটা তামিলনাড়ুর গ্রহীতার তালিকার দিকে তাকালেন পীযূষ। মন দিয়ে এই রাজ্যের ওয়েটিং লিস্ট দেখতে লাগলেন।

নাহ! এখানেও এবি পজিটিভ কোনও গ্রহীতা নেই।

বাধ্য হয়ে আন্তঃরাজ্য পুলে ঢুকলেন পীযূষ। অন্য কোনও রাজ্যে কোনও পেশেন্ট আছে কিন্তু

লম্বা তালিকা দেখতে-দেখতে ঘুম পাচ্ছে পীযূষের। চোখ বোলাতে-বোলাতে মনে পড়ে যাচ্ছে কলেজ জীবনের কথা। কলকাতার কথা। তাঁর বাবা বীরেশ্বর আইচের কথা…

*

বীরেশ্বরের কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে পীযূষের স্থলজীবনেই। তখন থেকেই জল খেতে হত মেপে, প্রোটিন খাওয়া প্রায় বন্ধ, একগাদা ওষুধ খেতে হত, নিয়মিত রক্তের পরীক্ষা করাতে হত। ছকে বাঁধা জীবনে ভালই ছিলেন বীরেশ্বর। কিন্তু এমন একটা সময় এল যখন সারা শরীরে জল জমতে আরম্ভ করল। মেডিক্যাল কলেজের স্যার নিদান দিলেন, “ডায়ালিসিস করাতে হবে।”

অনেক বছর আগের কথা। তখন ডায়ালিসিস সব জায়গায় হত না। কলকাতার কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রাইভেট হাসপাতালে আর পিজি হাসপাতালে হত। পিজিতে লম্বা লাইন থাকত। বাধ্য হয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে বীরেশ্বরকে নিয়ে গিয়েছিলেন পীযূষ। কয়েকবার ডায়ালিসিস করেই বীরেশ্বর চাঙ্গা! আধুনিক চিকিৎসার উন্নতি নিয়ে তিনি খুব গর্ব অনুভব করতেন। বলতেন, “আমার ছেলে ডাক্তার। আমার আবার চিন্তা কীসের?”

কিছুদিন যাওয়ার পর আবার শরীর খারাপ হতে শুরু করে বীরেশ্বরের। চিকিৎসক পীযূষকে ডেকে বললেন, “দুটো কিডনিই ড্যামেজ হয়ে গিয়েছে। ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া গতি নেই। ভেবে দেখো!”

“কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট ভারতবর্ষে হয়?” জিজ্ঞেস করেছিলেন পীযূষ।

আজ ‘ব্রেন ডেড’ পেশেন্টের বাড়ির লোককে কাউন্সেলিং করতে গিয়ে নিজের করা সেই প্রশ্নগুলোই শুনতে পান পীযূষ। তাই ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিতে অসুবিধে হয় না।

সেই সময় খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে কিডনি ভিক্ষা করেছিলেন পীযূষ। বিজ্ঞাপনে ব্লাড গ্রুপ লিখে দিতে হয়েছিল। পীযূষের বিজ্ঞাপনের একটিও উত্তর আসেনি। কেন না বীরেশ্বর ছিলেন, সায়কের মতোই, এবি পজিটিভ। অপেক্ষাকৃত বিরল ব্লাড গ্রুপ। কিডনি না পেয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে মারা যান তিনি। ডাক্তারি পাঠরত ছেলে বাবার প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। বীরেশ্বরের মুখাগ্নি করার সময়েই পীযূষ নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, অর্গ্যানের অভাবে কোনও মানুষকে মরে যেতে দেবেন না।

অল্প বয়সের প্রতিশ্রুতি কে-ই বা রাখতে পেরেছে! পীযূষও পারেননি। কারণ তিনি মেডিসিনে এমডি করতে পারেননি। এমডি করেছেন অ্যানাস্থেসিয়ায়। তারপরে চলে এসেছেন তামিলনাডুতে। যে রাজ্যে অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়। যে সব রোগীর শল্যচিকিৎসা করা হয়, তাদের অজ্ঞান করার পাশাপাশি আইসিসিইউ সামলান পীযূষ তার সঙ্গে তিনি এই হাসপাতালের ট্রান্সপ্লান্ট কো-অর্ডিনেটর। হাসপাতালের সুপার থেকে আরম্ভ করে নিচুতলার কর্মীরাও জানে এই বিষয়ে তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহের পিছনে ব্যক্তিগত শোকের কথা।

পীযূষ ঝিমোছিলেন। এক ঝটকায় তন্দ্রা উড়ে গেল। তিনি কী যেন একটা মিস করে গিয়েছেন। আবার গোড়ার থেকে তালিকা দেখতে শুরু করলেন।

এই তো! পাওয়া গিয়েছে। এত বড় ওয়েটিং লিস্টের মধ্যে একটি মাত্র এবি পজিটিভ গ্রুপের গ্রহীতা রয়েছে। আড়মোড়া ভেঙে, চোখ মুছে নামটা পড়লেন পীযূষ।

রিমুল সেন। আটত্রিশ বছরের মহিলা। বাবার নাম সরল সেন। ডায়লেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথিতে ভুগছে। ভর্তি আছে কার্ডিয়াক কেয়ার ক্লিনিকের পটনা শাখায়। চিকিৎসকের নাম ডক্টর স্বপন মিশ্র।

আন্তঃরাজ্য পুলের ওয়েটিং লিস্টে এই মুহূর্তে আর কোনও এবি পজিটিভ রেসিপিয়েন্ট নেই।

ঠান্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করছেন পীযূষ। দাতা চেন্নাইয়ের। গ্রহীতা পটনার। ট্রান্সপ্লান্ট হবে কোথায়? হয় পটনায়, না হয় চেন্নাইতে। পটনায় অপারেশন হলে অর্গ্যান পৌঁছে দিতে হবে চেন্নাই থেকে পটনা। আর চেন্নাইতে অপারেশন হলে গ্রহীতাকে আসতে হবে পটনা থেকে চেন্নাই। জটিল প্রক্রিয়া হয়ে যাচ্ছে।

অন্য যে-কোনও চিকিৎসক এই পরিস্থিতে হাল ছেড়ে দিতেন। পীযূষ ছাড়লেন না। তার কারণ অনেক বছর আগে, বাবার মৃত্যুর পরে নিজের কাছে করা একটি প্রতিশ্রুতি। অর্গ্যানের অভাবে কোনও মানুষকে মরে যেতে দেবেন না।

কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে পীযূষ দেখলেন, ডক্টর স্বপন মিশ্রের নামের পাশে মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে। নিজের মোবাইল থেকে তাঁকে ফোন করার আগে সময়টা দেখে নিলেন পীযূষ। ২০ মে শুরু হয়ে গেছে। রাত সাড়ে বারোটা বাজে।

কিছু করার নেই। ফোনটা করতেই হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *