।। উত্তরকখন ।।
৭ জুলাই। সন্ধে ছ’টা
.
ঢাকুরিয়ার নিজের ফ্ল্যাটে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে বসে রয়েছে ল্যাংড়া শিলু। গত দেড়মাসে অনেকটা রোগা হয়ে গিয়েছে। পুলিশি জেরার মুখে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তার সব অপরাধ পুলিশ জেনে গিয়েছে। ওরা জেনে গিয়েছে যে দুটো গোপন মোবাইলের মালিকই শিশু। প্রিন্ট এবং অডিও- ভিওয়াল মিডিয়ার সাংবাদিকদের ফোন করে শিলুই জানায় কবে সিগ্রিতে কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট আছে। লম্বা হাজতবাস অপেক্ষা করছিল শিশুর জন্যে।
নানা কায়দা করে শিলু নিজেকে জেল থেকে বের করে নিয়েছে। তবে তার দুই হাত রাজা আর পাপ্পু জেলের ঘানি ঘোরাচ্ছে। জেল খাটছে যোগীও। ললিতা সিস্টারকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি। জেরা করেই ছেড়ে দিয়েছে। সিথ্রি ছেড়ে সে হার্টবিটে জয়েন করেছে।
মিডিয়াতে শিলাজিৎ এবং হার্টবিটের এত নিম্নে হয়েছে যে বলার নয়। টিভিতে সেসব দেখে আর কাগজে পড়ে অনেক কার্ডিয়োলজিস্ট হার্টবিট ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে ছাড়ব ছাড়ব করছেন। হার্টবিটে গত দেড়মাসে খুব কম পেশেন্ট ভর্তি হয়েছে।
এই চাপ নিতে পারেনি শিলুর হৃদয়। প্রবল বুকে ব্যথা নিয়ে তাকে হার্টবিটে ভর্তি হতে হয়েছিল। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সেই হৃদয়ে তিনটে স্টেন্ট বসিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে। শিলুর মাইনে দিয়ে পোষা ডাক্তার শিলুকে বলে দিয়েছেন, “আর ফার্স্ট হওয়ার জন্যে দৌড়োদৌড়ি নয়। ক্লাসের লাস্ট বয় হিসেবে জীবনটা দেখুন। কোনও উত্তেজনা যেন না থাকে।”
উত্তেজনাহীন জীবন! তেতো হাসি ফুটে ওঠে ল্যাংড়া শিলুর ঠোঁটের কোণে। রিভা তার পাশে বসে মোবাইলে তারস্বরে চিৎকার করে বন্ধুকে শোনাচ্ছে কী গয়না কিনল। শান্তনু গেমিং কনসোলের সামনে বসে রোবটের মতো বোতাম টিপে যাচ্ছে আর গুলি করে ডিজিটাল শত্রুদের খুন করছে। এদের হাত থেকে পালাতে না পারলে জীবন থেকে উত্তেজনা যাবে না। ল্যাংড়া শিলু বুঝে গিয়েছে, সে আর বেশিদিন বাঁচবে না। বুকের বাধা নিয়ে কোনও একদিন তাকে হার্টবিটেই ভর্তি হতে হবে। তারপর মুক্তি!
আপাতত মুক্তির সম্ভাবনা নেই। টিভির দিকে তাকিয়ে শিলু সিথ্রি-র সাংবাদিক সম্মেলন দেখছে।
*
সিথ্রি-র কনফারেন্স রুমে সাংবাদিক সম্মেলন হচ্ছে। টেবিলের ও-প্রান্তে বসে রয়েছেন মেহুল, রঘুবীর, স্বপন এবং রিমুল। টেবিলের এই দিকে রয়েছেন সাংবাদিকরা। মাইক্রোফোনে রঘুবীর বললেন, “অপারেশনের ঠিক পরেই যে সাংবাদিক সম্মেলন হয়েছিল, তাতে ডক্টর পীযূষ আইচ আপনাদের জানিয়েছিলেন, অপারেশন সফল না ব্যর্থ, সেটা জানা যাবে দেড় মাস পরে।
সাংবাদিকদের পিছনে দাঁড়িয়ে আলোচনা শুনছে প্রান্তর। তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সরল আর জোনাকি। প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন রঘুবীর। সাংবাদিকদের উদ্দেশে বললেন, “কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছিল ২১ মে। আজ ৭ জুলাই। অপারেশনের ঠিক দেড় মাস পরে আপনাদের সামনে এসেছেন রিমুল সেন। পূর্ব ভারতের প্রথম কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট যাঁর শরীরে করা হয়েছিল।”
“কেমন আছেন।” রিমুলকে জিজ্ঞেস করল দ্য টেলিগ্রামের চন্দ্রাণী।
“ভাল আছি বললে সত্যি বলা হবে না,” আকাশি নীল সালোয়ার কামিজ পরা আর টার্কোয়েজ ব্লু ওড়না জড়ানো রিমুল হাসল, “সত্যি হল এই যে, আগের চেয়ে অন্য রকম আছি। আগে যে সব সমস্যা ছিল, সেগুলো আর নেই। কিন্তু নতুন কিছু সমস্যা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। সেগুলো সামলাতে অসুবিধে হচ্ছে।”
রঘুবীর বললেন, “ইমিউনোসাপ্রেসিভ ড্রাগ খেলে কিছু সমস্যা হয়।
“অপারেশন করে ভাল হল না খারাপ হল।” জিজ্ঞেস করল স্বপ চ্যানেলের পরিমল।
রিমুল বলল, “ভাল হল। খুব ভাল হল। আমি নতুন জীবন পেলাম!”
রিমুলের কথার মাঝখানে সরল প্রান্তরকে বললেন, “শুনলাম হার্টবিটের মালিক শিলাজিৎ বসুকে পুলিশ গ্রেফতার করেও ছেড়ে দিয়েছে।”
“ঠিকই শুনেছেন।”
“কেন?” উত্তেজিত হয়ে বললেন সরল।
“কুড়ি বছর আগে পুলিশ যেমন ছিল, এখনও সেই রকমই আছে। প্রভাবশালীর কাছে মাথা নিচু করতে বাধ্য হয়। অতীতে আপনার কাছে মাথা নিচু করেছিল। এখন ল্যাংড়া শিলুর কাছে করেছে।”
সরল চুপ করে গেলেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে তখন মেহুল বলছেন, “সিথ্রি-র কলকাতা রাক্ষের কিছু অদলবদল ঘটানো হয়েছে। ডক্টর স্বপন মিশ্র ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি কার্ডিয়ো-থোরাসিক সার্জন হিসেবে কলকাতা ব্রাঞ্চে আসতে চান। আমরা সেই ইচ্ছেকে মান্যতা দিয়ে তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনলাম। অগাস্টের এক তারিখ থেকে তিনি সপরিবারে কলকাতাবাসী হতে চলেছেন।”
মেহুলের পাশের চেয়ারে বসে রয়েছেন স্বপন। তাঁর মাথা থেকে বোঝা নামল ঝিলিককে নিয়ে তাঁর আর মিলির দুশ্চিন্তার অবসান হল এতদিনে। আর দেখতে হবে না যে মাঝরাতে বোরিং রোডের বাড়ির সামনে নম্বর প্লেট বিহীন বাইক দাঁড়িয়ে রয়েছে। জানতে হবে না যে স্কুলবাসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ঝিলিকের নাম ধরে খারাপ কথা বলেছে বাইক আরোহী। দেখতে হবে না যে স্বপনের এস ইউ ভি-র পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে দুই হাতে অশালীন ইঙ্গিত করছে বাইকবাজ। সবচেয়ে বড় কথা,
মিলির বাবাকে আর সিঁথির বাড়িতে একা থাকতে হবে না। স্বপনের বাবা-মার সঙ্গে তিনি থাকবেন। সেটা সিঁথির বাড়ি হোক বা সিথ্রি-র কোয়ার্টারে।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন স্বপন। লোকের ভাল করলে আজও ঘুরেফিরে নিজের ভাল হয় তা হলে!
স্বপনের পাশে বসে রয়েছেন রঘুবীর। যোগীর ডান্ডার বাড়ি খেয়ে তাঁর মাথায় যে ব্যথা হয়েছিল, সেটা কমে গেলেও চাকরি এবং স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে মাথাব্যথা একচুল কমেনি। স্বপন যে কলকাতায় আসছেন, এটা মেহুল রঘুবীরকে আগেই জানিয়েছিলেন। রঘুবীর এই ভেবে আনন্দ পেয়েছিলেন যে তা হলে তিনি পটনার সিথ্রি ব্রাঞ্চে চলে যাবেন। এই সিদ্ধান্তে থাক আর সুতপা খুশিও হয়েছিল। থকের স্কুলের বন্ধুরা ফোনে বলেছিল, রঘুবীর পটনায় গেলে স্কুলের তরফ থেকে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে।
খারাপ খবরটা দিলেন মেহুল। পটনাতে এই মুহূর্তে রঘুবীরকে পাঠানো যাবে না। নতুন একজন কার্ডিয়ো থোরাসিক সার্জন সিথ্রিতে যোগদান করেছেন। তাঁর বাড়ি পটনায়। রঘুবীর সে ক্ষেত্রে কলকাতাতেই থেকে যাবেন। ঠিক হ্যায়। কোই পরোয়া নেহি। জীবন এই রকমই। কেউ জেতে, কেউ জেতে না। কারও ভাল হয়। কারও হয় না।
“আপনি এইবার কীভাবে পটনা থেকে এলেন?” বিমুলকে জিজ্ঞ করল দ্য টেলিগ্রামের চন্দ্রাণী।
রিমুল একগাল হেসে বলল, “এবারে আমি অ্যাম্বুল্যান্সে আসিনি। বাবা- মায়ের সঙ্গে প্লেনে এসেছি। যদিও অ্যাম্বুল্যান্সে করে পটনা থেকে কলকাতা আসার সেই জার্নি আমি কোনও দিনও ভুলব না।”
সাংবাদিকরা উসখুস করছে ওঠার জন্যে। মেহুল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনাদের একটি মাত্র তথ্য দিয়ে এই সম্মেলন শেষ করতে চাই। তথ্যটি হল এই যে, রিমুল সেনের কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট সিথ্রি-র ব্র্যান্ড ভ্যালু, সিधি- র গুডউইল কয়েকশো গুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। খবরটি আপনারা যেভাবে প্রচার করেছিলেন তার জন্যে আপনাদের ধন্যবাদ। ওই গুডউইলের উপরে ভরসা করে আমরা সিগ্রি-র একটি নতুন ইউনিট খুলতে চলেছি…”
নিউজের গন্ধ পেয়ে সাংবাদিকরা আবার বসে পড়েছে। অর্থ জানতে চাইল, “নতুন ইউনিট মানে কী?” চন্দ্রাণী জানতে চাইল, “আউটডোর না অন্য কিছু?” পরিমল জানতে চাইল, “কোথায় খুলছেন? নর্থ বেঙ্গল ?”
“একে-একে বলছি,” হাসলেন মেহুল, “নতুন ইউনিট মানে নতুন হাসপাতাল। যেখানে কলকাতার সিথ্রি-র মতো সব রকম সুযোগ-সুবিধে থাকবে। একটা কার্ডিয়াক সেন্টার চালাতে গেলে রাজ্যের ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে তার যোগা হয়ে উঠতে হয়। পরের সিথ্রি তাই বেঙ্গলে নয়, তামিলনাডুতে তৈরি করা হচ্ছে। এখানকার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গিয়েছে। জমি পেয়ে গিয়েছি। বাকি কাজ দ্রুত শুরু হবে। এবং ওই হাসপাতালটির মাথায় থাকবেন ডক্টর রঘুবীর চক্রবর্তী। এই নিয়ে আগামী কাল আর-একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। তাতে উপস্থিত থাকবেন চেন্নাইয়ের দুই অতিথি। রিমুল সেনকে যে ছেলেটির হৃৎপিণ্ড দান করেছিল, সেই দাতার বাবা-মা। রাজর্ষি এবং মোহর মণ্ডল।”
প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে। তার মধ্যে রঘুবীর চুপ করে বসে রয়েছেন। দেখে বুঝতে পারবে না, তাঁর ভিতরে কী উত্থালপাথাল হচ্ছে। একটু আগেই তিনি জীবনকে দোষারোপ করছিলেন। ভাবছিলেন, কারও ভাল হয়। কারও হয় না। কেউ জেতে, কেউ জেতে না।
কই। আজ তা হল না তো! আজ তাঁর জীবনেও একটা ভাল দিন। কলকাতা শহর ছেড়ে চলে যেতে তাঁর একবিন্দু কষ্ট হবে না। সুতপা আর ঋকও তামিলনাডুতে চলে যেতে দ্বিধা করবে না। ওখানে কাজের সুযোগ বেশি, কাজের পরিবেশ অনেক ভাল। আর ঘুরেফিরে সেই বাঙালি রোগীদেরই তো দেখতে হবে, যারা এই রাজ্যের হেল্থ সিস্টেমে বিরক্ত হয়ে “ব্যাঙ্গল ছেড়ে সাউথ ইন্ডিয়া’ চলে যায়। তিনি স্বপনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “মেহুল আমাকে কি বলেনি। তুই জানতিস?”
“জানতাম?” রঘুবীরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন স্বপন, “মেহুলই বলছিলেন তোকে না জানাতে। উনি তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন।”
“শালা!” কড়ি বছর আগের কায়দায় স্বপনকে গালাগালি করলেন রঘুবীর। তবে নিচু গলায়। এখন, এখানে, তাঁরা কার্ডিয়ো ঘোরাসিক সার্জন। এইসব কথা যেন কেউ শুনতে না পায়।
রঘুবীরের পিঠে হাত রেখে, হাসি চেপে স্বপন বললেন, “হাজার হোক মেহুল হলেন ব্যবসায়ী। তাই না?”
মেহুল কথা বলছেন আগামী কালের সাংবাদিক সম্মেলন নিয়ে। স্বপন, রঘুবীর নিঃশব্দে নিজের চেয়ার থেকে উঠে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। দু’জনের প্ল্যান হল রঘুবীরের কোয়ার্টারে গিয়ে পানভোজন করা।
*
ঠিক সেই সময়ে রিমূলও চেয়ার থেকে উঠে চলে এসেছে প্রান্তরের কাছে। প্রাপ্তর সরল আর জোনাকিকে বলল, “আপনাদের গেস্ট হাউসে পৌঁছে দিই।”
সিথ্রি-র গেস্ট হাউসে পৌঁছে ভিতরে ঢোকার আগে জোনাকি নিচু গলায় রিমুলকে বললেন, “বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ঘরে আয়!”
প্রান্তর বলল, “রিমূলকে আমি একটু পরে আপনাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। ওকে দু’জন অতিথির সঙ্গে দেখা করতে হবে। আপনাদের মতো তাঁরাও অন্য রাজ্য থেকে আজই কলকাতা শহরে এসেছেন। আপনারা আ সকালে এসেছেন, এঁরা এসেছেন একটু আগে।
সরল আর জোনাকি গেস্ট হাউসে ঢুকে গেলেন। ওঁরা আগামী কान দুপুরের ফ্লাইটে পটনা ফেরত যাবেন। যতই বয়স হয়ে যাক না কেন, ইয়ামিকে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। রিমুল সুস্থ হয়ে ওঠার পরে এঁদের ভরসা আর সাহস আরও বেড়েছে। এঁরা জানেন, রিমুল আর প্রাপ্তর মিলে ‘ইয়ামি’কে আরও বড় করবে। এঁদের আর চিন্তা নেই।
যে গেস্ট হাউসে সরল আর জোনাকি ঢুকলেন, ঠিক তার পাশের গেস্ট হাউসের কলিং বেল টিপল প্রান্তর। দরজা খুলে দিলেন রাজর্ষি। রাজর্ষি আর মোহরকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে প্রান্তরকে পাঠিয়েছিলেন মেহুল। এঁদের কেন চেন্নাই থেকে আনা হচ্ছে, এটাও বলেছিলেন।
রাজর্ষির মুখ গম্ভীর। তিনি রিমুলকে দেখে যান্ত্রিক গলায় বললেন, “ভিতরে আসুন।”
রাজর্ষির গলা শুনে প্রান্তর ওঁর মনের অবস্থা বুঝতে পারল। মৃত সন্তানের শরীর খুঁড়ে হৃদয় বের করে নেওয়ার পরে সেই হৃদয় পেয়েছে যে মেয়েটি, তার সঙ্গে আলাপ করার ব্যাপারে ওঁদের দু’জনেরই কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয়। মেহুলের অতিথি হয়ে কলকাতায় এসেছেন। তাই ভদ্রতার অভিনয় করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজর্ষি আর মোহরকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে রিমুল সোফায় বসল। রিমুল এখানে এসেছে মেহুলের অনুরোধে একটা খবর দিতে। পাশাপাশি, মেহুলের পরামর্শ মতো একটা জিনিস সে ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে এনেছে। ঘরে এখন নিস্তব্ধতা। দেওয়ালঘড়ির টিকটিক আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
রিমুল বলল, “চেন্নাইয়ের ডক্টর পীযূষ আইচকে আপনারা বলেছিলেন, কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্লান্ট করিয়ে উনি কত কাটমানি পাবেন….”
মোহর তাড়াতাড়ি বললেন, “আমরা এইভাবে বলতে চাইনি। আসলে তখন আমাদের মাথার ঠিক ছিল না।”
রিমুল বলল, “আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এইটা আপনাদের জানা প্রয়োজন যে ডক্টর আইচের বাবা কিডনি ফেলিয়ার হয়ে মারা যান। উনি ট্রান্সপ্লান্টের জন্যে কোনও কিডনি পাননি। বাবাকে বাঁচাতে পারেননি বলে ডক্টর আইচ আপনাদের ছেলের হার্ট প্লেনে করে কলকাতা নিয়ে এসেছিলেন। সেই হার্ট আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে।”
মোহর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমরা চেন্নাই গিয়ে এঁকে ‘সরি’ বলে আসব। আপনি চা খাবেন?”
রিমুল ঘাড় নাড়ল।
রাজর্ষি বললেন, “কোল্ড ড্রিংক?”
আবার ঘাড় নাড়ল রিমুল টাকোয়েল ব্লু ওড়নার আড়াল থেকে স্টেথোস্কোপ বের করে মোহরের দিকে এগিয়ে দিল। কেন এগিয়ে দিল, বলার প্রয়োজন বোধ করল না।
মোহরকে কিছু বলতে হল না। তিনি শিশুর কৌতূহলে স্টেথোস্কোপ হাতে নিলেন। রাজর্ষির দিকে এক মুহূর্তের জন্যে তাকিয়ে, শ্রাগ করে, কানে স্টেথোর ইয়ারপিস গুঁজে রিমুলের বুকের বাঁ দিকে স্টেথোর ডায়াফ্রাম রাখলেন। মোহরের কানে আসছে সায়কের হৃদয়ের শব্দ। লাবডুব… লাবস্তুর… লাবডুব….
মোহর কাঁদছেন। স্টেথোর ইয়ারপিস রাজর্ষির দিকে এগিয়ে রিমুলকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদছেন। এখন রাজর্ষির কানে স্টেথো চোখে জল। তিনি আপনমনে বলছেন, “ফুরায় যাহা ফুরায় শুধু চোখে…”
নিঃসন্তান দম্পতিকে শোকপালন করতে দিয়ে প্রান্তর আর রিমুল গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে এল।
*
দু’জনে এখন সিথ্রি-র বাগানের নুড়ি বিছানো পথ দিয়ে হাঁটছে। নির্বাক। তাদের আশপাশে আধুনিক স্থাপত্যের বহুতল যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে অজস্র গাছ। বট, অশ্বত্থ, শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল, রঙ্গন, কদম দামি, বিদেশি গাড়ির সারির পাশেই রয়েছে পাতাবাহার আর বনতুলসি, কাগজফুল আর বকুল গাছের সারি। এ বছর জুলাই মাস পড়তে না পড়তেই তেড়ে বৃষ্টি হয়েছে। গাছ বেড়েছে ফনফনিয়ে। স্থাপত্য আর প্রকৃতির মাঝখানে, ছোট একটা রট আয়রনের বেঞ্চিতে বসল প্রান্তর আর রিমুল। যেভাবে অনেক কাল আগে বসে থাকত ছায়াতলায় আর মল্লিকাবনে। কেউ কোনও কথা বলছে না। দু’টি হাতের আঙুল পরস্পরকে ছুঁয়ে আছে শুধু এইটুকু আশ্বাস আর ভরসা চাইছে যে, আছে। পাশে আছে। ঠিক একই সময়ে চেন্নাই শহরের পেরিয়ামেটের বাড়িতে জ্যোতির্ময়ী আর নবকুমার দেখছেন যে তাঁদের মেয়ে সুচিত্রা সেজেগুজে বাড়ি থেকে বেরচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুন্দর বালাচন্দ্রর চারচাকা। সুচিত্রা গিয়ে সুন্দরের পাশে বসছে …
প্রান্তর জিজ্ঞেস করল, “এবার?”
রিমুল চুপ।
প্রান্তর বলল, “বলো! প্লিজ কিছু বলো।”
রিমুল বলল, “আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। শুধু মনে হচ্ছে, স্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই আমি দেখব যে পটনায় শুয়ে আছি। নাকে অক্সিজেনের নল লাগানো।”
রিমুলের মুখে হাত চাপা দিয়ে প্রান্তর বলল, “সারা জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছি আর না। এখন থেকে আমরা মন দিয়ে সংসার করব। অন্তত দুটো বাচ্চা আমার চাই। অবশ্য তোমার যদি কোনও প্রবলেম না হয়।”
“বিয়ে না করেই সংসার আর দুটো বাচ্চা? আমার এতে প্রবলেম
প্রান্তর লাজুক হেসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে টুক করে রিমুলের ঠোঁটে ঠোঁট রাখল….
ঠিক একই সময়ে গাড়ির মধ্যে সুচিত্রাকে চুমু খাচ্ছে সুন্দর। একটি প্রেমের কাহিনি শেষ হচ্ছে এবং আর-একটি প্রেমের কাহিনির জন্ম হচ্ছে। টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে গাছের পাতা আর বর্ষার কদম ফুল।
দুনিয়া তা হলে এখনও পুরোপুরি কালো হয়ে যায়নি। বুড়ি পৃথিবী এখনও বাসযোগ্য আছে তা হলে!
***
