॥ দুই ॥
১৭ মে রাত দেড়টা থেকে ১৭ মে সকাল সাড়ে ছ’টা
.
ঢাউস ডেস্কটপের দিকে তাকালেন সিথ্রি-র মালিক, পঞ্চাশ বছরের মেহুল সাহা। মনিটরের ডিজিটাল ঘড়ি বলছে, রাত দেড়টা বাজে। তার মানে, আজ তাঁর বাড়ি ফিরতে ভোর হয়ে যাবে।
মেহুল সাহা নিজের কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত, এমনটা নয়। তিনি অপেক্ষা করে আছেন কার্ডিওথোরাসিক সার্জন রঘুবীর চক্রবর্তীর জন্যে। রঘুবীর এখন অপারেশন করছেন। ওটি শেষ হতে ভোর হয়ে যাবে।
সিথ্রি-র হেড অফিস ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে, রুবির মোড় থেকে সামান্য দূরে। সিগ্রি কলকাতার এক নম্বর কার্ডিয়াক কেয়ার হাসপাতাল। সম্প্রতি সেই ইমেজে কালি লেগেছে।
মাঝারি চেহারার মেহুল সাহা পরে রয়েছেন সুট। চেহারায় মাঝারি হলেও মেহুলের মনের জোর প্রবল। ‘ম্যান অফ স্টিল’ বলতে যাঁদের বোঝায়, মেহুল সেই শ্রেণির মানুষ। কলকাতার স্বাস্থ্য ব্যবসায় প্রতিযোগিতা তীব্র। সেই বাজারে শূন্য থেকে শুরু করে দশ বছরের মধ্যে এক নম্বরে পৌঁছে যাওয়া সোজা কথা নয়।
চুপচাপ বসে না থেকে গত তিনটে কোয়ার্টারের প্রফিট অ্যান্ড লসে চোখ বোলাচ্ছেন মেহুল। শিলচর, ভুবনেশ্বর, রাঁচি বা পটনা শাখায় সিথ্রি মোটামুটি ভালই কাজ করছে। কিন্তু হেড অফিস কলকাতার অবস্থা খুব খারাপ। পরপর দুটো কোয়ার্টার লসে রান করছে। মেহুলের পকেটের জোর আছে, একাধিক ব্যাঙ্ক ঋণ দেওয়ার জন্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এগুলো কোনও কাজের কথা নয়। চৌবাচ্চার ফুটো বন্ধ না করে বালতি বালতি জল ঢেলে যাওয়া অনুচিত। আরও একটা বা দুটো কোয়ার্টার সর্বশক্তি দিয়ে কলকাতা শাখার জন্যে লড়ে যাবেন মেহুল। যদি কলকাতা শাখা লাভের মুখ দেখে তো ভাল। তা না হলে সিথ্রি-র হেড অফিস কলকাতা থেকে সরিয়ে রাঁচি বা ভুবনেশ্বরে পাঠিয়ে দিতে হবে।
কাজ করতে-করতে রাত কাবার। সিস্টার ললিতা চেম্বারের এক কোণে চেয়ারে বসে ঢুলছিল। ভোর ছটার সময় বিনা অ্যালার্মেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল। চেম্বারের কোণে রাখা টি মেকার থেকে এক কাপ চা বানিয়ে টেবিলে রেখে বলল, “স্যার। খেয়ে নিন, তারপর চেম্বার ছেড়ে বেরলো।
বছর পঁয়তাল্লিশের ললিতা সিংহ সিথ্রি-র দক্ষ নার্স। ওয়ার্ড সামলায় পাকা হাতে। পাশাপাশি ডাক্তারদের এবং মেহুলের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধের দিকে নজর রাখে। ডিউটি আওয়ার শেষ হয়ে গেলেও মেহুলের চেম্বারের এক কোণে থেকে যায়। ওর বর যোগী সিংহ সিথ্রি-র সিকিউরিটি স্টাফ।
চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে মেহুল খেয়াল করলেন ধুলো পরিষ্কার করার ঝাড়ন হাতে চেম্বারে ঢুকেছে মেনটেনেন্সের স্টাফ কাঠি সরখেল। ঢুকেই সে জানলার কাচ মুহুতে শুরু করল।
মেহুল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কাঠির একটা ভাল নাম আছে। সেটা এইচ আর ডিপার্টমেন্টের লোকেরা জানে। সিথ্রি-র সব্বাই ডাকে কাঠিনা’ বলে। এই নামের পিছনে দুটো কারণ আছে। প্রথমটি দর্শনধারী। পঞ্চাশ বছরের কাঠি ঢ্যাঙা এবং লম্বা। তাকে দেখলেই দেশলাই কাঠির কথা মনে পড়ে।
দ্বিতীয় কারণটি কাঠির সঙ্গে কিছুদিন একসঙ্গে কাজ করলে বোঝা যায়। এর কথা ওকে বলে, ওর কথা তাকে। এবং সেই কথাটা বলার আগে বলে নেয়, “কাউকে যদি না বলেন তা হলে একটা কথা বলি স্যার।” এক কথায় কাঠিবাজিতে ওস্তাদ। এই রকম লোককে সহকর্মীরা বিশ্বাস করে না।
তবে লোকটার তৃতীয় একটা বৈশিষ্ট্য আছে, যেটা বদগুণের জন্যে ঢাকা পড়ে যায়। কোনও দায়িত্ব কাঠিকে দিলে সেটা করেই ছাড়বে। কাজটা করার সময়ে পাশে যারা আছে, তাদের জীবন ওষ্ঠাগত করে ছাড়বে।
সকাল ছ’টার সময়ে কাঠি ধুলো ঝাড়ার অভিনয় করতে মেহুলের ঘরে ঢুকেছে মানে সে কিছু বলতে চায়। অন্য সময় হলে মেহুল আপত্তি করতেন না। কিন্তু এখন ভাল লাগছে না।
“কাউকে যদি না বলেন তা হলে একটা কথা বলি স্যার। ললিতাকে নিয়ে একটা কথা শুনলাম….” তোষামুদে গলায় বলল কাঠি। তৎক্ষণাৎ তাকে থামিয়ে মেহুল বললেন, “ধুলো পরে ঝাড়বে। আগে দেখো, রঘুবীরস্যারের এটি শেষ হল কি না।”
“কাউকে যদি না বলেন তা হলে আর-একটা কথা বলি স্যার? ইলিনার ঘটনাটার পর থেকে রঘুবীরস্যারের হাত স্লো হয়ে গিয়েছে…”
কাঠির কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘরে ঢুকেছেন আটত্রিশ বছরের রঘুবীর। ধলখলে চেহারা, পরে রয়েছেন ধুসর রঙের সুট। তাঁর দিকে এক পলক তাকিয়ে মেহুল কাঠিকে বললেন, “কী বলছিলে কাঠি?”
“কিছু না স্যার,” মেহুলের চেম্বার থেকে পালাল কাঠি। চেয়ারে বসে রঘুবীর বললেন, “কেন ডেকেছেন বলুন।”
মেহুল বললেন, “কী আর বলি। গত দুটো কোয়ার্টার সিথ্রি-র কলকাতা ব্রাহ্ম লসে রান করছে। উই আর ব্রিডিং লাইক এনিথিং!”
রঘুবীর যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন। তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে এক বছর আগের কথা। ইলিনা, সুবীর আর কেকা দে-র কথা…
*
ইলিনা বছরদশেকের একটা মিষ্টি মেয়ে, যাকে নিয়ে তার বাবা-মা সুবীর আর কেকা এসেছিল সিথ্রি-তে। গড়িয়ার বাসিন্দা সুবীর টোটো চালায়। তিরিশের আশপাশে বয়স। একটু বোকাসোকা। কেকা বিউটি পার্লারে চাকরি করে। নিজের সাজপোশাক সম্পর্কে সচেতন। হাতে দামি স্মার্টফোন, কথাবার্তায় তুখোড়। ইলিনার শ্বাসকষ্ট আছে। কাঁদলে বা খেতে গেলেও হাঁপায়। ওজনও বাড়ছে না। নানা পরীক্ষা করে জানা গেল, ইলিনার হার্টে ফুটো আছে। অপারেশন করলে ভাল হয়ে যাবে।
সুবীর আর কেকা অনেক কষ্টে টাকাপয়সা জোগাড় করেছিল। অপারেশনের আগে ওদের কাউন্সেলিং করেছিলেন রঘুবীর। সুবীর চুপচাপ থাকলেও কেকা খুঁটিয়ে সব জেনে নিয়েছিল। এও জেনেছিল, আর পাঁচটা অপারেশনের মতো হার্টের ফুটো রিপেয়ার করার অপারেশনেরও একটা বিস্ক হল, পেশেন্ট মারা যেতে পারে।
ইলিনা অপারেশন টেবিলে মারা যায়।
রঘুবীরই সুবীর আর কেকাকে জানিয়েছিলেন এই খবর। শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সুবীর। কেকা সপাটে থাপ্পড় কষিয়েছিল রঘুবীরের গালে।
মার খেয়ে রঘুবীর উত্তেজিত হননি বা রেগে যাননি। তিনি যখন অপারেশন করছেন, সেই সময় ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটি মারা গিয়েছে। সেটা তাঁর মেডিক্যাল নেগলিজেন্স না অন্য কিছু, সে বিচার পরে হবে। এই থাপ্পড় তাঁর প্রাপ্য। একে তিনি প্রফেশনাল হ্যাকার্ড হিসেবে নিয়েছেন।
কিন্তু সুবীর আর কেকার ক্রোধেই ব্যাপারটা মিটে গেল না। এর মধ্যে ঢুকে পড়ল রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা রাজা মল্লিক এবং পাপ্পু বরকন্দাজ। তাদের সঙ্গে সিথ্রি-র সিকিউরিটি গার্ড প্রান্তর এবং যোগী, মেনটেন্যান্সের কাঠি আর এটি স্টাফ বাদলের কথা কাটাকাটি শুরু হল। অন্য রোগীর বাড়ির লোকেরা বিক্ষোভ দেখাতে লাগল। তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সিথ্রি-র পাবলিক রিলেশন অফিসার অভব্য আচরণ করল। এবং এইসব ঘটনা কেউ বা কারা স্মার্টফোনে ভিডিয়ো রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে দিল। ঘোলা জলে মাছ ধরতে ঢুকে পড়ল উকিল, মেডিক্যাল ইনশিয়োরেন্সের দালাল, প্রিন্ট এবং অডিয়ো ভিশুয়াল মিডিয়া। টিভিতে লুপে দেখানো হতে লাগল কেকার চিৎকার, “আমার ফুটফুটে মেয়েটাকে মেরে দিল এই জহ্লাদ ডাক্তার। আমি ওই পিশাচের ফাঁসি চাই। আমার মেয়ে যেমন কষ্ট পেয়ে ধুকতে ধুঁকতে মরেছে, শয়তান ডাক্তারটা যেন ওইভাবেই মরে। *
ভিডিয়োটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং মিডিয়ায় ভাইরাল হল। হঠাৎ একদিন অচেনা একদল লোক সিথ্রি-তে ঢুকে চুরমার করে দিল রিসেপশনের ডেস্ক, টেলিফোন, কাচের পার্টিশন, কম্পিউটার, দেওয়ালঘড়ি, আলমারি, ফাইলিং ক্যাবিনেট। ভেঙে দিল ব্যাক অফিস, ফার্মাসি, ওয়েটিং রুম। মার খেল প্রান্তর, যোগী, কাঠি, বাদল এবং অন্যরা। স্থানীয় নেতা রাজা মল্লিক এবং পাপ্পু বরকন্দাজের পরামর্শে সুবীর এবং বেকা থানায় গিয়ে মেহুল এবং রঘুবীরের নামে এফআইআর করল। মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং কনজিউমার ফোরামেও লিখিত অভিযোগ জানাল।
সিথ্রি-র লিগাল সেল এখন মামলার ব্যাপারটা সামলায়। কোর্টে নিয়মিত ডেট পড়ে। সেখানে মেহুল আর রঘুবীর সিথ্রি-র উকিলসহ হাজিরা দেন। সুবীর আর কেকা কখনও উপস্থিত থাকে না। মেহুল এবং রঘুবীর জানেন, এই মামলা ধোপে টিকবে না। কারণ ময়নাতদন্তে জানা গিয়েছে ইলিনার ‘সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হয়েছিল। সেটা সামলানো স্বয়ং ঈশ্বরেরও সামর্থ্যের বাইরে।
আইনি জটিলতা থেকে মেহুল এবং রঘুবীর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছেন। কিন্তু সিথ্রি-র ভাবমূর্তিতে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। কার্ডিও-থোরাসিক সার্জন হিসেবে রঘুবীরের নিজের উপরে বিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছে। পাশাপাশি রোগী এবং তার বাড়ির লোক সিথ্রিকে সট টার্গেট পেয়ে নানারকম অন্যায় সুবিধে চাইছে। অনেকেই সুস্থ হওয়ার পরে টাকা না মিটিয়ে চলে যাচ্ছে। উলটে বলছে, “এত টাকার বিল বানিয়েছেন? আপনারা তো চোর। থানায় গিয়ে এফআইআর করব নাকি?”
তার সঙ্গে আছে রাজা আর পাপ্পুর উৎপাত। যখন-তখন এসে পার্টির নামে চাঁদা চাইছে। এইসব খুচরো ঘটনা অন্য সময় সিকিউরিটির ছেলেরা সামলে নেয়। কিন্তু এই সময়টা খুব স্পর্শকাতর।
আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে। সিথ্রি-র নানা দোষত্রুটি কেউ বা কারা মোবাইলে ভিডিয়ো করে ছড়িয়ে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। হয়তো করিডোরে বাসি লিনেন পড়ে আছে। অথবা রিসেপশনের ওয়াটার পিউরিফায়ার কাজ করছে না। অথবা পেশেন্টের খাবার খালায় মাছের পিস ছোট। এইসব জিনিস ভিডিয়ো রেকর্ড হচ্ছে। সেই ভিডিয়োর সঙ্গে পরে অডিয়ো ট্রাক যোগ করা হচ্ছে। কেউ একজন বিকট চিৎকার করে সিগ্রি-র ঘুন ধরা পরিকাঠামোর নিন্দে করে সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে সিথ্রি-র পেশেন্টের সংখ্যা কমছে।
এই ভিডিয়ো সিথ্রি-র স্টাফ ছাড়া আর কারও পক্ষে রেকর্ড করা সম্ভব নয়। সেটা মেহুল জানেন। সিথ্রি-র কম্পাউন্ডে অজস্র নজরদারি ক্যামেরা লাগানো থাকলেও সব জায়গা নজরদারির মধ্যে নেই। যে মানুষটি ভিডিয়ো বানাচ্ছে, সে জানে কোন কোন এলাকা নজরদারি ক্যামেরার বাইরে। ভিডিয়ো তোলার কাজ সেই সব জায়গাতেই হচ্ছে। কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম সেলে খবর দিয়েছেন মেহুল। পুলিশ বলে দিয়েছে কোন কোম্পানির, কোন মডেলের মোবাইলে ভিডিয়ো তোলা হচ্ছে। মোবাইল নম্বরও জানা গিয়েছে। কিন্তু সেই নম্বর কার, সেটা জানা যায়নি। ভুয়ো পরিচয়পত্র জমা দিয়ে মোবাইল এবং সিমকার্ড কেনা হয়েছে।
অর্থাৎ সিথ্রি-র নামে কুৎসা রটানোর জন্যে একটা চক্র কাজ করছে। চক্রের বাকি সদস্য কারা, এই নিয়ে মেহুলের ধারণা নেই। তবে সিথ্রি-র স্টাফদের মধ্যে তিনজন তাঁর সন্দেহের তালিকায় আছে। একজন অবশ্যই কাঠি। অন্য দু’জন হল বাদল এবং যোগী।
রঘুবীর চুপ করে বসেছিলেন। মুখ তুলে বললেন, “আপনার কি আমাকে নিয়ে সমস্যা? আমি তা হলে সিথ্রি ছেড়ে দেব।”
“একদম না, ডক্টর?” হাতজোড় করেছেন মেহুল, “আপনাকে আমি আমার ফিনান্সিয়াল লসের কথা বললাম। তার মানে এই নয় যে আপনাকে দোষ দিচ্ছি। হেল্থ বিজনেসে এইসব লেগেই থাকবে। সেটা নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না। আমি ওগুলো সামলে নেব। কিন্তু পেশেন্ট কমে গেলে কার ভাল লাগে বলুন
“আপনি আমাকে কী করতে বলছেন? আমি তো আর জেলায় জেলায় হার্টের রোগী খুঁজতে বেরব না।”
“ আপনাকে আমি তা বলিনি,” টেবিলে ঘুসি মেরে বললেন মেহুল, “আমাদের এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে সবাই চমকে যায়। পাবলিক, গভর্নমেন্ট, মিডিয়া, নেতা, মস্তান, সব্বাই। এমন ডেয়ারিং একটা কিছু, যেটা দেখে সবাই অবাক হয়ে বলবে, এই জিনিস সিথ্রি-তে সম্ভব: শুধু সিথ্রি কেন? এই জিনিস কলকাতায় সম্ভব। শ্রদ্ধায় আর ভালবাসায় সবার মাথা নিচু হয়ে আসবে।”
রঘুবীর হেসে বললেন, “আমি চিকিৎসক মেহুল। সুপারম্যান নই।”
মেহুল ডেস্কটপ শাটডাউন করে বললেন, “সেটা আমি জানি ডক্টর। আমার অসহায় অবস্থাটা বোঝানোর জন্যে কথাটা বললাম। প্লিজ অন্যভাবে নেবেন না।”
“ধুস!” হাত নেড়ে মেহুলের চেম্বার থেকে বেরলেন রঘুবীর। তাঁকে এবার বাড়ি ফিরতে হবে। সকাল সওয়া ছ’টা বেজে গেল।
সিপ্রি-র কম্পাউন্ডের মধ্যেই একটি বাংলো প্যাটার্নের একতলা বাড়িতে থাকেন রঘুবীর। সিথ্রি-র সব স্টাফই কম্পাউন্ডের মধ্যে থাকে। মেহুল এবং ডাক্তারদের জন্যে বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। বাকি স্টাফদের জন্যে কোয়ার্টার।
হাসপাতাল বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে ধীরে-ধীরে হাঁটছেন রঘুবীর। এখন তাঁর ঘুম পাচ্ছে না। ইন ফ্যাক্ট, ইলিনাকাও থিতিয়ে যাওয়ার পরে তিনি মনোবিদের চেম্বারে গিয়েছিলেন। মনের ডাক্তার জানিয়েছিলেন তিনি ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজর্ডার’ বা ‘পিটিএসডি’-তে ভুগছেন। কাউন্সেলিং এবং ওষুধ লাগবে।
চিকিৎসার পরে অনেকটা সুস্থ রঘুবীর। টেনশন কমানোর ওষুধ না খেলে তিনি ঘুমোতে পারেন না। স্ত্রী সুতপা অনেক বুঝিয়েছে। রঘুবীর ছাড়তে পারেননি।
*
সুতপা আর রঘুবীরের একটিই ছেলে। নাম বক ইলিনা পর্বের আগে তিনজনে মিলে সিথ্রি-তে দিব্যি সুখে ছিলেন। ইলিনার মৃত্যুর পরে টিভিতে খবর দেখে সবার আগে ভেঙে পড়েছিল ঋক। স্কুলে গেলেই ওকে শুনতে হত, জিহাদের ছেলে। শয়তানের বাচ্চা।” সেই সব শুনে থক ভুলে যেতে চাইত না। লেখাপড়া বন্ধ করে ঘরে বসে থাকত। সুতপা বা রঘুবীর ডাকতে গেলে ভায়োলেন্ট হয়ে যেত। হাতের কাছে যা আছে, ছুরি, কাচি বা পেপার কাটার, তাই দিয়ে নিজেকে আঘাত করার চেষ্টা করত।
স্বামীর মুখ চেয়ে কয়েক সপ্তাহ সামাজিক অত্যাচার সহ্য করেছিল সুতপা। থকের সমস্যা শুরু হতে বাঘিনি হয়ে গেল। ছেলেকে বাংলার বাইরে পাঠানোর জন্যে উঠে পড়ে লাগল। অবশেষে বিহারের বৈশালীর এক নামজাদা মিশনারি স্কুলে ঠাঁই হল ঋকের। ছেলেকে হস্টেলে রাখবে না বলে সুতপা বৈশালীতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানেই থাকে। রঘুবীরের সঙ্গে তার ঝগড়া নেই। তবে সুতপা চায় না যে রঘুবীর বৈশালীতে যান। সুতপা এটাও চায় না যে রঘুবীর থকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
বৈশালীতে চলে যাওয়ার পরে, গোড়ার দিকে, সুতপার সঙ্গে রোজ একবার ফোনে কথা হত। পরে সেটা কমে সপ্তাহে একবার দাঁড়াল। এখন দরকার ছাড়া কথা হয় না। সুতপা ডিভোর্স চায় না। তবে এও চায় না যে বাপ আর ছেলে এক ছাদের নীচে থাকুক।
জহ্লাদ, মানুষ মারা ডাক্তার, শয়তান, পিশাচ রঘুবীর কী আর করেন? মুঠো মুঠো টেনশন কমানোর ওষুধ খেয়ে কখনও কোর্টে হাজিরা দেন, কখনও মেডিক্যাল কাউন্সিলের তদন্ত কমিটির ডাকে উপস্থিত হন। আর এইসবের মাঝে টুকটাক নিরাপদ অপারেশন করেন। জটিল অস্ত্রোপচার করতে ভয় পান। যদি আবার কিছু হয়ে যায়।
*
সিকিউরিটি স্টাফদের অ্যাপার্টমেন্টের পাশ দিয়ে হাঁটছেন রঘুবীর। এই পথ দিয়ে কিছুটা গেলেই তাঁর বাড়ি। তিনটে বেডরুম, একটা ড্রয়িংরুম, বিশাল কিচেন, ডাইনিং স্পেস। সামনে-পিছনে বারান্দা, আছে কেয়ারি করা বাগান। গ্যারাজে তিনটি এসইউভি। কিন্তু এত স্বাচ্ছন্দ্য আর বিলাসিতা দিয়ে রঘুবীর করবেনটা কী? তাঁর জীবন থেকে সুখ-শান্তি চলে গিয়েছে। মেহুল যদি সিথ্রি-র কলকাতা শাখা বন্ধ করে দেন, তা হলে রঘুবীর কী করবেন। আবার বিদেশে চলে যাবেন? সিথ্রি-র অন্য শাখায় চলে যাবেন? নাকি কলকাতার দু’নম্বর হার্ট ইনস্টিটিউট ‘হার্টবিট’-এ জয়েন করবেন। ‘হার্টবিট’-এর মালিক শিলাজিৎ বসু তাঁর সঙ্গে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। এখানে যাওয়ার জন্য অফার দিয়েই রেখেছে।
বাড়ির দরজায় তালা লাগানো। চাবি দিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে রঘুবীর শুনলেন, স্টাফদের অ্যাপার্টমেন্টের একতলার ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রসংগীত, ‘হৃদয়ের এ কুল ও কুল, দু কুল ভেসে যায়, হায় সজনি…
সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে এফএম চ্যানেলে রবীন্দ্রসংগীত শোনায়। একতলায়, নিজের ফ্ল্যাটের জানলার ধারে পাথরের মতো বসে রয়েছে সিপ্রি- র কলকাতা শাখার সিকিউরিটি অফিসার-কাম-ড্রাইভার প্রান্তর দাস। সে-ও রাত জেগে ডিউটি করেছে। তারও চোখে ঘুম নেই।
টুক করে মুখে ঘুমের বড়ি ফেলে বাড়িতে ঢুকে গেলেন রঘুবীর।
