সবুজ সরণি – ১৩

।। তেরো ।।

২১ মে সকাল সাতটা থেকে ২১ মে সকাল আটটা পঁয়ত্রিশ।

.

সারা রাত জেগে রয়েছেন রাজর্ষি মোহর কখনও হাসপাতালের সামনের রাস্তায় হেঁটেছেন, কখনও হাসপাতালের কাফেটেরিয়ায় গিয়ে গলা ভিজিয়েছেন, কখনও ওয়েটিংরুমে বসে থেকেছেন।

ওয়েটিং রুমের বাংলা ‘প্রতীক্ষার ঘর’। রাজর্ষি আর মোহর ছেলের মৃত্যুসংবাদের প্রতীক্ষা করছেন। এঁরা জানেন যে, সকাল সাতটার সময়ে সায়ক মারা যাবে। কে কখন মারা যাবে, কীভাবে মারা যাবে, এইসব তথ্য জানার কথা একমাত্র সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের। মণ্ডল দম্পতি ঈশ্বর প্রতিম অবস্থান গ্রহণ করতে পারছেন না। এঁরা দু’জনেই চাইছেন বাড়ি চলে যেতে, নীরবে শোক পালন করতে, দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে। প্রতিটি মানুষের সহ্যের সীমা আছে। ওরা সেটা পেরিয়ে এসেছেন। এঁদের আর ভাল লাগছে না।

২১ মে সকাল সাতটার সময় হাসপাতালের পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে রাজর্ষি আর মোহরের নাম ধরে ডেকে বলা হল অপারেশন থিয়েটারের সামনে চলে আসতে।

কাফেটেরিয়া থেকে উঠে দু’জনে মিলে এসে দাঁড়ালেন অপারেশন থিয়েটারের সামনে। নবকুমার আর জ্যোতির্ময়ী ওখানেই ছিলেন। নবকুমার বললেন, “ডক্টর আইচ সায়কের ‘ডেথ ডিক্লেয়ার করেছেন।”

সবই জানতেন দু’জনে। তাই কান্না এল না। বুকের মধ্যে একটা পাথর জমেছিল ক’দিন ধরে। সেটা গড়িয়ে গিয়ে বুক হালকা হল। তবে সন্তান- শোক এত সহজে যাওয়ার নয়। সে ঘাপটি মেরে রয়েছে অবচেতনে। ঠিক সময়ে দাঁত-নখ বার করবে। চিরে ফালা ফালা করে দেবে বুক।

ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে এক সার্জন সায়কের বুকের পাঁজর কেটে হৃদয় বের করে এনেছেন। তাঁর হাত থেকে হৃদয়টি নিয়ে ছোট পাত্রে রাখলেন পীযূষ। অপারেশন থিয়েটারের এক কোণে রাখা রয়েছে ‘অর্গ্যান ট্রান্সপোর্ট বক্স’। পোলিও দিবসে স্বাস্থ্যকর্মীরা এই রকম বাক্স কাঁধে নিয়ে ঘোরেন। বাক্সটি জল-নিরোধক। এবং এতটাই শক্ত যে আঘাত লাগলে কিছু হবে না।

বাক্সের মধ্যে আছে গুঁড়ো বরফ। তার মধ্যে হৃদয়টি রেখে দিলেন পীযূষ। তিনি যখন কাজটা করছেন, তখন সার্জন সায়কের বুক সেলাই করে দিয়েছেন। এবার সায়কের মৃতদেহ বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার পালা।

ঠিক সকাল সাড়ে সাতটার সময় অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে গেল। ট্রলিতে চাপিয়ে সাদা কাপড়ে মোড়া সায়কের মৃতদেহ নিয়ে ওয়ার্ড বয়েরা নিঃশব্দে বেরিয়ে এল ওটি থেকে। লিফটে চড়ে টুলি চলে এল বেসমেন্টের কার পার্কিংয়ে। সেখানে রাখা রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শববাহী যান। ওয়ার্ড বয়েরাই যত্ন করে সায়ককে শুইয়ে দিল বরফের চাঙড়ের উপরে।

নেমে এসেছেন মোহর আর রাজর্ষি। এসেছেন রাজর্ষি আর মোহরের সহকর্মীরা। এসেছেন জ্যোতির্ময়ী এবং নবকুমার। এসেছে সুচিত্রা, সায়কের সহকর্মীরা এবং টিম লিড সুন্দর। সবার হাতে ফুলের মালা অথবা পুষ্পস্তবক। সবাই এক-এক করে মালা আর স্তবক রাখছেন সায়কের বুকের উপরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুলে ঢাকা পড়ে গেল সায়কের দেহ। শববাহী যানের চালক জানে তাকে কোন শ্মশানে যেতে হবে। সে গাড়িতে স্টার্ট দিল। তার সঙ্গে রয়েছে আয়াগার হাসপাতালের কর্মচারী। পীযূষের লেখা ডেথ সার্টিফিকেট তার কাছে রয়েছে। শ্মশানের যাবতীয় অফিসিয়াল কাজ সে-ই করবে। সদ্য সন্তানহারা মোহর বা রাজর্ষিকে মুখাগ্নি ছাড়া কিছু করতে হবে না।

রাজর্ষি আর মোহর নিজেদের গাড়িতে উঠে ডেকে নিলেন নবকুমার আর জ্যোতির্ময়ীকে। নবকুমার হাতজোড় করে বললেন, “গ্রিন করিডোর দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স যাবে। সেই নিয়ে আমি আর গিন্নি ব্যস্ত থাকব। ডক্টর আইচ চেন্নাই এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলে আমাদের ছুটি। সেখান থেকে আমরা আপনাদের কাছে আসছি।

রাজর্ষি জিজ্ঞেস করলেন, “সুচিত্রা কি আমাদের সঙ্গে যাবে?”

সুচিত্রা ম্লান হেসে বলল, “আপনারা চলে যান। আমি সুন্দরের সঙ্গে যাচ্ছি। কোলিগস উইল অলসো কাম উইথ আস।”

সুচিত্রার কাঁধে হাত রেখে সুন্দর বলল, “ইয়েস। উই উইল গো টুগেদার।”

*

আয়াঙ্গার হাসপাতালের বেসমেন্টের কার পার্কিং থেকে সায়কের মৃতদেহ নিয়ে যখন শববাহী যানটি বেরচ্ছে, ঠিক তখনই তার পাশ দিয়ে তিরের মত ছুটে বেরিয়ে গেল একটি অ্যাম্বুল্যান্স। হাসপাতালের বেসমেন্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়েই চালক রাজন জ্বালিয়ে দিয়েছে নীল বিকন, চালু করে দিয়েছে হুটার।

রাজন ছাড়া গাড়ির মধ্যে বসে রয়েছেন পীযূষ। তাঁর পাশে রাখা রয়েছে অর্গান ডোনেশন বক্স আর একটি ব্যাকপ্যাক। ব্যাকপ্যাকে রয়েছে দু’সেট জামাকাপড়, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, প্রসাধনের টুকিটাকি, মোবাইল চার্জার, ট্যাব। ফ্লাইওয়ার প্রাইভেট এয়ার লাইনসের ফ্লাইটের টিকিটের হার্ড কপি মানিব্যাগে রয়েছে। মোবাইল রয়েছে শার্টের পকেটে। এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি চেকের কথা ভেবে দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম বা ডিও নেননি পীযূষ

চালকের আসন থেকে রাজন বলল, “এখান থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার তিনটে রাস্তা আছে। আমরা যে রাস্তা দিয়ে যাব সেটা দিয়ে গেলে দূরত্ব কুড়ি কিলোমিটারের একটু বেশি। ওটাকেই গ্রিন করিডোর করা হয়েছে। বাকি দুটো রাস্তায় সকাল থেকে ট্রাফিক জ্যাম।”

জানলা দিয়ে উদিগ্ন মুখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে পীযূষ দেখলেন, অ্যাম্বুল্যান্সের ঠিক সামনে হুটার বাজিয়ে যাচ্ছে একটি পুলিশের গাড়ি। সেই গাড়ির পিছনে বসে রয়েছেন নবকুমার পীযূষের গাড়ির পিছনে আসছে চেন্নাই মিউনিসিপালিটির লোগো আঁকা অ্যাম্বুল্যান্স। সেই গাড়ির ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে জ্যোতির্ময়ী ওয়াকি-টকিতে কথা বলছেন।

রাজন সোজা গিয়ে পড়ল সিনডেনহ্যাম রোডে। তারপরে একাধিক হাই রোড আর ব্রিজ টপকে পৌঁছল যে জায়গাটায়, তার নাম কমলেশ্বরনপেট।

রাস্তা ফাঁকা। যত ক্রসিং আছে, সব জায়গায় বাস, প্রাইভেট কার আর ট্যাক্সি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাও টেনশন হচ্ছে পীযূষের। তিনি অজস্র অর্গ্যান ডোনেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভবিষ্যতেও থাকবেন। কিন্তু কখনও একটা অর্গ্যান নিয়ে এক শহর থেকে অনা শহরে উড়ে যাননি। তিনি এবং কলকাতার সিথ্রি হাসপাতালের চিকিৎসক-ম্যানেজমেন্ট মিলে যে কাজটা করতে চলেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় রিঙ্গ ফ্যাক্টর হচ্ছে সময়। সাড়ে সাতটার সময় সায়কের হার্ট ঢোকানো হয়েছে অর্গ্যান ডোনেশন বক্সে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথের কোথাও যদি এক মিনিট দেরি হয়, তা হলে অর্গ্যানটি নষ্ট হয়ে যাবে। পীযূষ সারা জীবনের জন্যে অপরাধী হয়ে থাকবেন রাজর্ষি আর মোহরের কাছে। তিনিই এঁদের কাউন্সেলিং করেছিলেন, যাতে মণ্ডল দম্পতি ছেলের অর্গ্যান দিতে রাজি হন।

পীযূষ চোখ বুজলেন। মনের মধ্যে ভেসে উঠল বীরেশ্বর আইচের মুখ। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

চোখ খুললেন পীযূষ। ঈশ্বর আছে কি নেই, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় বা সুযোগ হয়নি। তাঁর বিশ্বাসের ভরকেন্দ্র হলেন বীরেশ্বর যে কোনও সংকটের মুহূর্তে চোখ বন্ধ করলেই মৃত বাবাকে দেখতে পান। তিনিই পীযূষের বিপদভঞ্জন।

মার্শাল রোড আর পাটুল্লোস রোড পিছনে চলে গেল। এসে গেল আন্নাসালাই। একটু শাস্তি পেলেন পীযূষ। একবার চেন্নাই-ব্রিটি হাইওয়ে ধরতে পারলেই গাড়ির গতি বেড়ে যাবে। তারপরেই আসবে আর চেন্নাই- নাগাপাভিনাম হাইওয়ে। মিনারকম থেকে এয়ারপোর্টের টারমিনাল লিঙ্ক ধরে একটু গেলেই চেন্নাই এয়ারপোর্ট।

মোবাইলে সময় দেখলেন পীযূষ। আটটা বাজতে যায়। আর কত দূর রে বাবা। সামনে পুলিশের গাড়ি আর পিছনে কর্পোরেশনের অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে এই যাত্রা কতক্ষণ ধরে চলবে?

একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত পীযূষ। ডোমেস্টিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে, প্লেন ছাড়ার অনেকক্ষণ আগে প্যাসেঞ্জারদের চেক ইন করতে হয়। প্লেনে উঠে পড়তে হয় অনেক আগে। অর্গ্যান ডোনেশনের জন্যে ফ্লাই এয়ার নিয়ম ভাঙতে রাজি। পীযূষের জন্যে ওই সময়গুলো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অ্যাম্বুল্যান্স এখন চেন্নাই এয়ারপোর্টের সামনের এলিভেটেড করিডোরে উঠে পড়েছে। দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ডোমেস্টিক টার্মিনালের দিকে। পীযূষ যতবার কলকাতায় যান, এখান থেকেই প্লেন ধরেন। যাত্রী সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে চেন্নাই এয়ারপোর্টের উন্নতি চোখের সামনে ঘটতে দেখেছেন। আগের সেই পুরনো বহিরঙ্গ বদলে গিয়ে এসেছে অত্যাধুনিক স্থাপত্য। এখন দূর থেকে এয়ারপোর্ট দেখলে ডানা মেলা পাখির কথা মনে হয়। ডিপারচার ফ্লোরে কোনও কলাম স্ট্রাকচার নেই। দৃষ্টিতে বাধা পড়ে না বলে চোখের আরাম হয়। বাহান্নটা চেক-ইন কাউন্টার, দশটা হ্যান্ড ব্যাগেজ কাউন্টার, দশটা সেল্‌ফ-চেক কাউন্টার, সাতটা বোর্ডিং গেট, চারটে কনভেয়র বেল্ট নিয়ে চেন্নাই এয়ারপোর্ট যেন এক সাতমহলা রাজপ্রাসাদ। ঢুকলে মাথা ঘুরে যাবে।

পীযূষের অ্যাম্বুল্যান্সকে অবশ্য এত জটিলতার মধ্যে যেতে হল না। এয়ারপোর্ট চত্বরে ঢোকামাত্র ফ্লাইওয়ারের একটি মেয়ে আর সি আই এস এফ-এর এক জওয়ান তিনটি গাড়িকে হাতের ইশারায় দাঁড়াতে বলল। এখান থেকে ওরা অ্যাম্বুল্যান্সের দায়িত্ব নেবে।

তিনটি গাড়ি দাঁড়াতেই মেয়েটি আর জওয়ান পীযূষের অ্যাম্বুল্যান্সে উঠে বসল। নবকুমার এবং জ্যোতির্ময়ী নিজের নিজের গাড়ি থেকে পীযূষকে দেখে হাত নাড়লেন। রাজন তার অ্যাম্বুল্যান্স ছোটাল এয়ারপোর্টের মধ্যে। ঘাড় ঘুরিয়ে পীযূষ দেখলেন, পুলিশের গাড়ি বা মিউনিসিপালিটির অ্যাম্বুল্যান্সে আর হুটার বাজছে না, জ্বলছে না বিকন। নবকুমার এবং জ্যোতির্ময়ী এখন সাধারণ মানুষের মতো যানজট পেরিয়ে শ্মশানে যাবেন।

অ্যাম্বুল্যান্স দৌড়চ্ছে। পীযূষ দেখলেন সি আই এস এফ-এর জওয়ানের গলায় ঝোলানো আই কার্ড বলছে, তার নাম মোহন রাঠোড় মেয়েটির গলায় ঝোলানো আই কার্ডে লেখা আছে শ্বেতা মেনন।

মোহনের চোখে-মুখে কাঠিন্যের ছাপ। সে পীযূষের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “টিকিট?”

পীযূষ মানিব্যাগের পকেট থেকে দু’টি টিকিটের প্রিন্ট আউট বার করে মোহনের হাতে তুলে দিলেন। তাঁর ঈষৎ দুশ্চিন্তা হচ্ছে। মোহন লাগেজ চেক করার নামে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স খুলে দেখতে না চায়। সেটা করতে দেওয়া যাবে না। তাপমাত্রার অল্প এদিক-ওদিক হলেই অর্গ্যান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

মোহনের কাজ প্লেন এবং এয়ারপোর্টের সুরক্ষা শ্বেতার কাজ যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য। যাত্রী স্বার্থের কথা ভেবে শ্বেতা নিয়ম ভাঙলেও মোহন ভাঙতে রাজি হবে কি?

মোহন টিকিট দেখে পীযূষকে ফেরত দিল। শ্বেতার হাতে একটি ট্যাব রয়েছে। তাতে যাবতীয় ডেটা এন্ট্রি করে সে বলল, “ডান!” তারপরে মোহনকে বলল, “চেক হিম?”

মোহনের হাতে একটি মেটাল ডিটেক্টর। সে পীযূষের গায়ে আর ব্যাকপ্যাকে যন্ত্রটি বোলাল। অভিব্যক্তিহীন মুখে পীযূষকে বলল, “আ যাইয়ে।”

“কোথায়?” জিজ্ঞেস করলেন পীযূষ। ঠিক এই সময় রাজন অ্যাম্বুল্যান্স থামিয়ে দিল।

রাগে আর ভয়ে পীযূষের হার্ট ধকধক করছে। এই ইডিয়টগুলো তাঁকে কী ভেবেছে। তাঁকে কেন গাড়ি থেকে নামানো হচ্ছে?

অ্যাম্বুল্যান্সের পিছনের দরজা খুলে গিয়েছে। পীযূষ অবাক হয়ে দেখলেন সেখানে একটি জিপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিপ থেকে নামছে সি আই এস এফ-এর আরও দুই জওয়ান। জিপের পিছনে বিরাট বড় মাঠ। রাজন তাঁকে কোথায় নিয়ে এলা

পীযূষকে চমকে দিয়ে একটি প্লেন উড়ে গেল মাটির কাছ দিয়ে। এতক্ষণে পীযূষ বুঝতে পারলেন। অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড়িয়ে রয়েছে রানওয়ের পাশে।

দুই জওয়ান মিলে খুব সাবধানে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স নামাল। এবার পীযূষ খেয়াল করলেন, জিপে রাখা রয়েছে একটি পোর্টেবল স্ক্যানার। দুই জওয়ান স্ক্যানারের কনভেয়র বেল্টে বাক্সটা বসাল। মুহূর্তের মধ্যে বাক্স অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে এল। আড়চোখে স্ক্যানারের দিকে তাকিয়ে বাক্সটা নামাল দুই জওয়ান। একজন কঠিন মুখে বলল, “ফর্মালিটি কমপ্লিট। আপ প্লেন মে চড় সকতে হ্যায়।

অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমেছেন পীযূষ। ব্যাকপ্যাক স্ক্যানারের বেল্টে তুলে জওয়ানের দিকে তাকালেন। এক জওয়ান ভুরু কুঁচকে বলল, “পাওয়ার ব্যাঙ্ক, মোবাইল চার্জার, ট্যাব। ঠিক হ্যায়। আপ যাইয়ে।”

চেক ইনের ঝামেলা মিটে গিয়েছে। পীযূষ রাজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “গুডবাই রাজন।”

রাজন মস্ত একটা সেলাম ঠুকে বলল, “আই উইল বি প্রেয়িং ফর ইয়োর সেফ জার্নি ডক্টর।”

পীযূষকে অবাক করে অ্যাম্বুল্যান্সে বসে থাকা মোহন ফিক করে হেসে বলল, “হুম ভি আপকে লিয়ে প্রে করেছে ডক্টর। ইউ নিড লটস অফ প্রেয়ার ট্রাড়ে।”

পীযূষের হৃদয় এখনও ধকধক করছে। তবে সেটা রাগে বা ভয়ে নয় উত্তেজনায়। ভাল কাজ করলে এখনও মানুষের ভালবাসা পাওয়া যায়। এই দেশটা এখনও খারাপ লোকে ভরে যায়নি। পীযূষ এক গাল হেসে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার!”

শ্বেতা আর মোহন রাজনের অ্যাম্বুল্যান্সে করে চলে গেল। রাজন এবং তার অ্যাম্বুল্যান্সকে সিকিউরিটির বেড়ার বাইরে পৌঁছে দিয়ে ওদের কাজ শেষ হবে।

অন্য দুই জওয়ান এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। এবার তারাও চলে গেল গাড়ি এবং স্ক্যানার নিয়ে। পীযূষ এখন কী করবেন?

“কান দিস ওয়ে প্লিজ!” পীযূষকে অবাক করে দিয়ে তাঁর পিছন থেকে এক যুবক বলল। ঘাড় ঘুরিয়ে পীযূষ দেখলেন তিনি ফ্লাইওয়ারের প্লেনের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। আগে দেখতে পাননি। ছেলেটি অর্গ্যান ডোনেশন বক্স নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। পীযূষ ও উঠলেন।

প্লেনের দরজায় হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এয়ার হোস্টেস। একগাল হেসে বলল, “ওয়েলকাম ডক্টর। আই অ্যাম দীপিকা।”

প্লেনের ভিতরে ঢুকে পীযূষ বুঝতে পারলেন, প্লেন ছাড়ার আগে পাইলট যেসব ঘোষণা করেন, সেগুলো হয়ে গিয়েছে। বিমানবালাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রদর্শনীও শেষ হয়ে গিয়েছে। প্লেনের সব যাত্রীর সিটবেল্ট বাঁধা।

সামনের দিকের দু’টি আসন দেখিয়ে দীপিকা বলল, “স্যার! দিল আর ইয়োর সিটস। এইট অ্যান্ড নাইন। প্লিজ সুইচ অফ ইয়োর মোবাইল ফোন। “ আইল সিটে অর্গ্যান ডোনেশন বক্স রেখে তার উপরে সিটবেল্ট বাঁধলেন পীযূষ। নিজের সিটবেল্ট পরে নিচ্ছেন, এমন সময় পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে শুনতে পেলেন পাইলটের কণ্ঠস্বর। পাইলট যা বললেন সেটা শুনে অবাক হয়ে গেলেন তিনি।

বিমান চালক ইংরেজিতে বললেন, “আমরা আজ এক ঐতিহাসিক উড়ানের সাক্ষী হতে চলেছি। এই উড়ানে যাচ্ছেন ডক্টর পীযূষ আইচ। তিনি বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন একটি হার্ট। কলকাতার এক পেশেন্টের দেহে এই হাট ট্রান্সপ্লান্ট হবে আজই। একটু পরে যে বাক্সটি ডক্টর আইচের পাশে রাখা রয়েছে, তাতেই আছে সেই অর্গ্যান।”

আশপাশের যাত্রীরা মোবাইলে পীযূষের ছবি তুলছেন।

বিমান চালক বলছেন, “যত কম সময়ে আমরা এই অর্গ্যানকে কলকাতা শহরে পৌঁছে দিতে পারব, গ্রহীতার বাঁচার সম্ভাবনা তত বাড়বে। তাই আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, কলকাতা বিমানবন্দরে টাচ ডাউন করার পর আপনারা নিজেদের আসনে বসে থাকবেন। আমরা সবার আগে ডক্টর আইচ এবং তাঁর লাগেজকে প্লেন থেকে নামাব। তারপর আপনাদের।”

যাত্রীরা হাততালি দিচ্ছেন। কেউ-কেউ গলা তুলে বলছেন, “ব্রাভো ডক।” কেউ বলছেন, “কনগ্র্যাচুলেশনস।”

পাইলট ইতিমধ্যে কেবিন থেকে বেরিয়ে পীযূষের কাছে চলে এসেছেন। নিচু গলায় বলছেন, “আমাদের রুটের কিছু জায়গায় ঝোড়ো আবহাওয়া আছে। তবে আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা ঠিক সময়ে কলকাতা পৌঁছে যাব।”

পাইলট ফিরে গেলেন কেবিনে। একটু পরেই পীযূষ খেয়াল করলেন প্লেন গড়াতে শুরু করেছে। ধীর লয়ে কিছুদুর যাওয়া, তারপরে সেই মোক্ষম ইউ টার্ন, এবং সবার শেষে দৌড়! এবং এক লাফে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে, মাধ্যাকর্ষণকে হারিয়ে দিয়ে আকাশে উড়ে যাওয়া।

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মোবাইলের সুইচ অফ করতে গিয়ে সময় দেখলেন পীযূষ। সকাল আটটা পঁয়ত্রিশ বাজে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *