শাকম্ভরীর দ্বীপ – ৯

একেক সময়ে সুমনার কেমন অবাক লাগে। এই সেদিন সে ছিল একেবারে একলা। ত্রিসংসারে আর কেউ ছিল না। করুণাময় ঈশ্বর আর শূন্যতা কীভাবে ভরিয়ে দিলেন। আর বিশ্বাস হয় না ওই রোমাঞ্চকর পুরুষ তার স্বামী, মাখনের তালের মতো এই শিশু তার সন্তান। ইশ চাকরিটা যদি ছেড়ে দিতে পারা যেত। কী ভালো লাগে নিছক ঘর সংসার। নিজেকে ঝাঁকিয়ে বাস্তবে ফিরে আসতে হয় তাকে। চাকরি ছাড়া সম্ভব নাকি? রঞ্জনের একার আয়ে… তার ওপর সে কখন চাকরি ছাড়বে, কতদিন বসে থাকবে…. ভীষণ খেয়ালী।

মেয়ে টুকটুক বড় হচ্ছে। সুমনা মেয়েকে নিয়ে মগ্ন। তার বেশি কিছু ভাবনাচিন্তা করবার তার সময় নেই। রঞ্জনের কাজ বাচ্চাটাকে আলগা আদর দেওয়া কিন্তু কাজের কাজ যা করবার তার জন্য সরিৎদাকেই ধরতে হয়। ইতিমধ্যে শাকম্ভরীর দ্বীপ থেকে চিঠি এসেছে। রাজেশ্বরীদেবী আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন। রঞ্জন কালো মুখ করে চিঠিটা কুচিকুচি করে ছিঁড়েই ফেললো। আজকাল তার ভীষণ মেজাজ খারাপ হচ্ছে। আমন্ত্রণটা শুধু তার জন্য, সুমনার জন্য নয়। ধাক্কা খায় সুমনা, তবু সে জোর করে রঞ্জনকে পাঠায়। একটা মানুষ কতদিন তার শেকড় ছেড়ে থাকতে পারে! সে প্রতিদিন বোঝে রঞ্জন তার দ্বীপের জন্য ছটফট করছে। উইকএন্ড সুন্দরবনে কাটিয়ে রঞ্জন ফিরলে তার চোখেমুখে অন্য দীপ্তি দেখতে পাওয়া যায়। সে তখন বাচ্চাকে খুব আদর করে। সুমনাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়। বুকের ভেতরটা টনটন করতে থাকে তার। শুনে সরিৎ বলল— গুড নিউজ। যতই হোক ওঁর নাতি, উনি কখনও মাফ না করে থাকতে পারেন? যদিও মাফ করার মতো কাজ ও করেনি।

তার গলার স্বরে রুক্ষতা সুমনার ভালো লাগে না। সে হাসবার চেষ্টা করে বললো— খুব অন্যায় কিন্তু সরিৎদা। আমার সামনে আমার হাজব্যান্ডের নিন্দে করছো। আচ্ছা সরিৎদা রঞ্জন বলে তুমি নাকি জেলাস। কথাটা কি ঠিক?

সরিৎ বললো— জেলাস! রঞ্জন বলে বুঝি? তা তুমিও কি তাই মনে করো? জেলাস? ইনটারফিয়ারিং…আউটসাইডার…

সুমনা ভীষণ অপ্রতিভ হয়ে গেল— ইশশ এমনভাণে বলছো সরিৎদা। একটু ঠাট্টাও করতে পারবো না তোমার সঙ্গে? তুমি আমার কতদিনের বন্ধু বলো তো! ছি ছি! তোমাকে আঘাত দেবার জন্যে আমি…

সরিৎ চুপ। একটু পরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো— সুমনা আজ চলি। একটা কথা নিজেকে যদি ঠিক বুঝে থাকি তাহলে কোনকিছুই আমি ঠিক স্বার্থের জন্য করি না। একটা দায়িত্ববোধ থেকে করি। কী করবো…এটাই আমার স্বভাব। এখন তুমি ঠিক করো আমাকে বিশ্বাস করবে কি না করবে। আমি কোনও অন্যায় সুযোগ নেবার চেষ্টা করছি কি না। ভেবেচিন্তে ঠিক করো তারপর তোমার কনক্লুশন জানিও, আমি…

তুমি কী? আর আসবে না?

সরিৎ বললো— ধরো তাই। ডাকলে আসবো। কিন্তু এই যে রঞ্জন আইল্যান্ডে গিয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে আসছে। এই সময়টা একটা বাচ্চাকে নিয়ে তুমি কী করে কী করছো…আই ডোন্ট নো। যাক…আমার প্রতিদিন আসাটা ঠিক নয়। আমি বুঝতে পারছি।

সুমনার চোখে জল এসে গেছে— এ ভাবে বলো না সরিৎদা, তোমার কাছ থেকে আমরা শুধু নিয়েই যাচ্ছি, নিয়েই যাচ্ছি…বদলে কিছু দিতে….

সরিৎ কথা শেষ করতে দেয় না, বলে— বদলে আমার কিছু চাই, এটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট অপমান…

বলতে বলতেই বাচ্চাকে নিয়ে কাজের লোকটি ঢুকলো। বাচ্চা দু হাত বাড়িয়ে সরিতের কোলে ঝাঁপিয়ে চলে গেল।

সরিৎ বাচ্চাকে খুব আদর করলো। তারপর লোকটির কোলে ফিরিয়ে দিয়ে চলে গেল। একবারও পেছন ফিরল না আর। বাচ্চা দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে তুমুল কাঁদছে। তবুও না।

এবার সুমনার একটু অস্বস্তি, ভাবনা শুরু হয়েছে। রঞ্জন প্রত্যেকবারই দ্বীপে যায় দ্বিধাগ্রস্ত মুখে, আসে উজ্জ্বল, উচ্ছল। কিন্তু আজকাল যাচ্ছে ঘন ঘন। এবং দেরি করছে। এভাবে চললে কি ওর চাকরিই থাকবে? তাছাড়া জীবনকে কি এভাবে দুভাগে ভাগ করে ফেলা যায়? একটার সঙ্গে আরেকটার কোনও যোগ নেই? সুযোগ পেলে সে রাজেশ্বরী দেবীকে দেখে নেবে। রঞ্জনের জন্যে প্রতীক্ষায় তিনটে সন্ধে কেটে গেল। শনি, রবি সোম, আজ মঙ্গলবার। সে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছে। বাচ্চাকে ক্রেশ— এ দিয়েছে আজকাল।

এই সময়ে বেলটা বাজলো। দরজা খুলে দিল সে। রঞ্জন ঢুকলো কেমন বিধ্বস্ত, মুখে একটা ভীষণ অস্বস্তির ছাপ। কিন্তু সুমনা সেসব দেখেও দেখল না। ফিরে গিয়ে যে বইটা পড়ছিল, তুলে নিল।

রঞ্জন ডাকলো— সুমন!

বলো।

সুমন!

শুনতে পাচ্ছি।

রাগ করেছো?

সুমনা বললো— না রাগ করবো কেন? রাজকুমার সিন্ডারেল্লাকে বিয়ে করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এ তো রূপকথা! বাস্তব অন্য কথা বলে, বলছে।

রঞ্জন বললো— স্বীকার করছি আমার দেরি হয়েছে। কিন্তু কারণটা জানো?

— বললাম তো রঞ্জন, শুনছি।

সৌভিক হঠাৎ আত্মহত্যা করেছে।

সুমনার হাত থেকে বইটা পড়ে গেল।— সৌভিক? মানে তোমার মেজদা?

— ইয়েস।

এই সেদিন বিয়ে হল না?

হ্যাঁ ঠাকুমার বন্ধুর নাতনির সঙ্গে। খুব ভালো কাল। বিয়ের পরই আলমোড়া ঘুরে এল হানিমুনে। আমাদের বিয়ের ঠিক আগে।

সুমনা বললো— আচ্ছা, এই মেয়েটির সঙ্গে ঠাকুমা তোমার বিয়ে দিতে চেয়ে ছিলেন না?

হ্যাঁ, আমি রিফিউজ করি।

কেন রঞ্জন? কথাটা আমায় একটু বুঝিয়ে বলবে? তোমাদের দুই পরিবারের কতদিনের জানাশোনা, স্টেটাস এক। তাকে বিয়ে করাই তো তোমার পক্ষে ভালো ছিল। সুমনা বলছে বটে কিন্তু তার বুকের মধ্যে বিছের কামড়।

রঞ্জন বললো— আমার দাদা সুইসাইড করেছে আমি ভীষণ আপসেট। এখন তুমি এইসব বলছো?

সুমনা বললো— ঠিক আছে বলবো না? কিন্তু যাঁদের আমি দেখিনি, চিনি না যাঁরা আমার সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন, তাঁদের প্রতি আমার কী অনুভূতি তুমি আশা করো? তাঁরা বেঁচে আছেন কি নেই আমার কাছে কোনও তফাত নেই। কথাটা একটু কঠিন শোনাচ্ছে। কিন্তু এটাই সত্যি কথা।

রঞ্জন বললো— সুমন। আমরা মানে চার ভাই আরও কিছু কিছু ঠাকুমার পরিচিত বন্ধু বন্ধুকন্যার সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। তার মানে কি এই দাঁড়াবে যে ঠাকুমা জোর করে এর সঙ্গে ওর বিয়ে লাগিয়ে দেবেন?

হয়তো মেয়েটির সঙ্গে তোমার কিছু আছে বুঝেছিলেন উনি।

রঞ্জন ঘুরে দাঁড়ালো— তেজস্বিনী? নো ওয়ে। অহঙ্কারে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য একটা মেয়ে। ওর সঙ্গে আমার মিলতো না, মিলতো না। মিলতো না। আই নেভার লাভড্ হার। অ্যান্ড আই ওয়ন্টেড টু ম্যারি আ উওম্যান আই লাভ, অ্যান্ড দ্যাটস্ য়ু— সে ভীষণ আবেগে সুমনাকে জড়িয়ে ধরলো।

সেদিন রাতে সুমনা স্বপ্ন দেখে একটা রাজকীয় স্টীমারে করে সে শাকম্ভরীর দ্বীপে যাচ্ছে। রঞ্জনকে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু সে আছে। নদীর জল কাটছে। শব্দ হচ্ছে জলের। স্টীমারের। দূরে একটা পথ। স্টীমারটা জল থেকে উঠে তার ওপর দিয়েই চলে যায়। একটা হুইল চেয়ার এগিয়ে আসছে। তার ওপর বসে লেডি রানু মুখার্জি। সে দু হাত জোড় করে নমস্কার করছে। হঠাৎ আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বাঘ গর্জন করে ওঠে, হুইল চেয়ার থেকে তার দিকে লাফ দিয়ে আসে একটা বিশাল বাঘ। চিৎকার করে উঠে বসে সুমনা। উঠে বসে রঞ্জন। কী হল? কী হল? এখনও বুক ধড়াস ধড়াস করছে। সুমনা কোনমতে বলে— বাঘিনী।

স্বপ্ন দেখেছো? দূর পাগলি!— রঞ্জন তাকে জল খাওয়ায়। আদর করে। বলে ঘুমোও।

লাঞ্চের আগে রঞ্জন মন দিয়ে কাজ করছে। হঠাৎ মুখ তুলেই দেখে সরিৎ ঢুকছে। দেখেই রঞ্জন পাথর। সরিৎ ঘড়ি দেখে বললো— আধঘণ্টা আছে আর লাঞ্চ একসঙ্গে সারবো। আমি নিচে ওয়েট করছি।

বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সে। রঞ্জন চেঁচিয়ে বললো— আমি প্রচণ্ড ব্যস্ত। অনেক কাজ জমে গেছে। ওভারটাইম খাটতে হচ্ছে।

সরিৎ পেছন ফিরে বললো— তুমি আসছো, কথা আছে।

মিনিট পঁয়ত্রিশ বাদে লিন্ডসে স্ট্রিটের একটা ছোট নির্জন রেস্তোরাঁয় রঞ্জনকে নিয়ে ঢুকলো সরিৎ।

কী ব্যাপার? বাদশাহি তলব!

জবাবে সরিৎ কাগজ খুললো। একটা খবর লাল কালিতে দাগিয়ে রেখেছে। দেখালো— পড়েছো নিশ্চয়।

রঞ্জন বললো— পড়িনি। কিন্তু ন্যাচারালি জানি। আমার মানসিক অবস্থা খুব খারাপ সরিৎ। আমার দাদার মৃত্যুসংবাদ দিতে আমাকে এখানে নাটকীয় ভাবে ডেকে আনার মানে কী? মাথাটা নিচু করে সে দু হাতে রগ টিপে ধরলো।— ইটস হরিবল।

সরিৎ বললো— ব্যাপারটা কী করে ঘটলো! কেন?

— হাউ ডু আই নো? পুরোটাই আমার কাছে মিস্টরি।

আর য়ু শিওর? সৌভিকদার স্ত্রী তেজস্বিনী, তার সঙ্গে তোমার দীর্ঘদিনের অ্যাফেয়ার তুমিই বলেছো রঞ্জন। তুমি কি ওখানে থিয়েটার রোডে ওদের সঙ্গে…

ও নো। নো, আ থাউজন্ড টাইমস নো। শোনো সরিৎ আমি যখন কাউকে ছাড়ি আর ফিরে তাকাই না। টেক ইট ফ্রম মি।

তেজস্বিনী যদি তোমাকে ভুলতে না পেরে থাকে? তার ফ্রাসট্রেশন-এর জন্য যদি ওদের বনিবনা না হয়ে থাকে?

রঞ্জন এবার রাগত গলায় বললো— বাঃ তার জন্যে কি আমি দায়ী? সৌভিকেরও তো চয়েস ছিল। ও তো সব জেনেশুনেই ওই ডেঞ্জারাস মেয়েটাকে বিয়ে করেছিল। কেন করতে গেল?

সরিৎ আশ্চর্য হয়ে বললো— ডেঞ্জারাস? মানে?

ডেঞ্জারাস মানে সী হ্যাজ আ বিস্টলি টেম্পার। কোনও কিছু সহ্য করে না। অসম্ভব উদ্ধত। আই উডন’ট বি সারপ্রাইজড্ ইফ দে হ্যাড আ রো বিফোর সৌভিক… চোখদুটো লাল হয়ে গেল রঞ্জনের। সে মুখ ঢেকে বললো — হরিবল, হরিবল। আই কানট ইভন থিংক অব ইট।

— সেদিন তুমি কোথায় ছিলে?

আমি সেদিন বাড়ি ফেরার লঞ্চে— দ্বীপ থেকে। এনিওয়ে, দিস ইজ ডিসগাস্টিং। তুমি কি আমার জবানবন্দি নিচ্ছো?

সরিৎ বললো— অতবার অতদিন শাকম্ভরীতে যাবার, থাকবার দরকারই বা কী তোমার রঞ্জন?

দ্যাখো সরিৎ, তুমি অনেকদিন থেকে আমার ওপর গার্জেনি করবার চেষ্টা করে যাচ্ছো। ঠিক করছো না। আমার অ্যাবসেন্সে তুমিই বা ঘনঘন আমার বাড়িতে

যাও কেন? এগুলোও আমার জানা দরকার। আমার বাচ্চা আমার চেয়ে তোমাকে দেখলে বেশি খুশি হয়, কেন?

সরিতের মুখে একটু হাসি ফুটলো, বললো— লক্ষ্য করেছো তাহলে? যে বাবাকে ক্বচিৎ কদাচিৎ দেখে বাবাকে দেখে তার উৎসাহিত হবার কথা নয়। রূঢ় বাস্তব। যাক, জিনিসটা যে তোমার মনে দাগ কাটতে পেরেছে এতে আমি আশান্বিত।

গোঁয়ারের মতো রঞ্জন বললো— যখন-তখন আমার বাড়ি যাওয়া তোমায় বন্ধ করতে হবে।

সরিৎ বললো— তুমি খুব ভালো করে জানো…যাই না। কিন্তু তোমার বাচ্চার এনটারিক ফিভার, ভাইরাল ইত্যাদি হলে আমাকেই সামলাতে হয়। সেরে ওঠা বাচ্চার আবদারও আমাকেই মেটাতে হয়।

রঞ্জন বললো— ইনাফ। আমি এমন মেয়ে বিয়ে করেছি যে এসব সামলাতে পারে।

সরিৎ হেসে উঠল— ভালো। সে তার বাচ্চার সর্দিকাশি, ভ্যাকসিনেসন এনরিক ফিভার ব্লাড ডিসেন্ট্রি, চাকরি, ঘর সব একলা একলা সামলাবে আর তুমি তার সো— কলড্ হাজব্যান্ড সুন্দরবনে একটা আনরীচেবল দ্বীপে গিয়ে ঠাকুমার কোলে বসে চুষি কাঠি চুষবে।

রঞ্জন লাফিয়ে উঠলো— মাইন্ড ইয়োর ল্যানগুয়েজ সরিৎ। আমার যেখানে খুশি যাবো, যা খুশি করবো, রাজেশ্বরী ঠাকরুণকেও আমি ভালো করে সমঝে দিয়েছি তার গার্জেনগিরি আমার ওপর চলবে না। তোমাকেও সাবধান করে দিচ্ছি।

সরিৎ শান্ত গলায় বললো— আমিও তোমায় সাবধান করে দিচ্ছি তোমার স্ত্রী— কন্যার অযত্ন হয়, ক্ষতি হয়, তারা কষ্ট পায়— এমন কিছু তুমি করবে না। নইলে…

— নইলে কী?

দেখতেই পাবে।

সরিৎ রেস্তোরাঁ ছেড়ে চলে গেল।

সেই রাগের রেশ নিয়েই বাড়ি ফিরলো রঞ্জন। সুমনা কিছু সাংসারিক কাজ করছে। বাচ্চা কাঁদছে। রঞ্জন কোলে তুলে নিতে আরও কেঁদে উঠলো।

সুমনা বললো— ও সরিৎদাকে মিস করছে। বুঝলে?

রঞ্জন বললো— তা ভালো তো! সরিৎদাই এ বাড়িতে থাক। আমি বরং অন্য কোথাও চলে যাই।

সুমনা খানিকটা থমকে গেল, তারপর থমথমে মুখে বললো— সব বিষয়ে সন্দেহবাতিক আমার ভালো লাগে না রঞ্জন। অনেকদিন বয়স হয়ে গেল তোমার এই জেলাসিটার। বাজে না বকে মেয়ের দিকে নজর দাও।

হঠাৎ মেজাজ পাল্টে গেল রঞ্জনের। সে বললো— জানো সুমন, আমার এই মেয়েটার সঙ্গে একটা লাভ-হেট রিলেশনশিপ আছে। যত বড় হচ্ছে তত ও রাজেশ্বরী ঠাকরুণের মতো দেখতে হচ্ছে। মে বি ও-ই হবে শাকম্ভরীর দ্বীপের নেক্সট্ রাজেশ্বরী। সুমনা চোখ বড় করে বললো— লাভ হেট রিলেশনশিপ? মেয়ের সঙ্গে?

আহা ও যে আমার ঠাকুমার কথা মনে করিয়ে দেয়।

সুমনা বললো— এখন তো আর রাগারাগি নেই। দিব্যি তো গিয়ে আদর খেয়ে আসছো।

রঞ্জন কঠিন মুখে বললো— একবারও বুড়ি তোমার সম্পর্কে, বাচ্চা সম্পর্কে একটি কথা খরচ করে না। তোমার এই অপমানের শোধ আমি নেবো।

আহ্ রঞ্জন ছাড়ো, এসব কথা আমার আর ভালো লাগে না।

রঞ্জন কথা কানেই নিল না।— প্রত্যেকবার চিঠি আসে আর ভাবি এবার বুঝি বললো। বাট শী ডাজন’ট। আমার একেকসময় মনে হয় আই ক্যান কিল হার ফর দিস।— মুখটা তার রাগে ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে।

সুমনা বললো— প্লিজ রঞ্জন ধৈর্য ধরো। সময় লাগবে। তবে হ্যাঁ, উনি আমাকে না ডাকলেও আমি : যমন আছি, বেশ আছি।

ভালো কথা। আমাকে আবার যেতে লিখেছে। চিঠিটা অফিসে এসেছিল। লাল চিঠিটা বার করতেই সুমনা হঠাৎ সেটা ছিনিয়ে নিল, বললো— দেখি কী লিখেছেন!

রঞ্জন বললো— প্লিজ, দেখো না, অন গড বলছি, লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাবে।

সুমনা চিঠিটা ফিরিয়ে দিল।— মাথা কাটা যায় তো যাও কেন?

রঞ্জন বললো— এখনও আশা ছাড়িনি। আমার ভাগ আমি পাবো না কেন? এই লাইফস্টাইল আমার সুট করে না। ডোন্ট মাইন্ড। এত ছোট জায়গায় এভাবে আমি থাকিনি কখনও। একটা গাড়ি নেই। বাড়িতে একটা সেলার নেই। আমার স্ত্রী মিনি বাসে অফিস যায়। তোমাকে আজ অবধি আমি একটা দামি উপহার কিনে দিতে পারলাম না। এগুলো আমায় হন্ট করে। সব সময়ে।

সুমনা সামান্য হেসে বললো— আমি তো এ কথা তোমাকে অনেক অনেক আগেই বলেছিলাম প্রিন্স। তুমি পারবে না। তোমার ধাতে নেই। আমার কাছে এই-ই অনেক। স্বর্গ। কিন্তু তুমি…তুমি কী করে অভ্যেসের বাইরে যাবে। অত সহজ?

রঞ্জন কোমল গলায় বললো— আমি কি তোমায় কিছু বলেছি? অক্ষমতা তো আমারই। সেটাই আমাকে ক্ষেপিয়ে দেয়। আই লাভ য়ু। আমার বলবার কথা হল, যা আমার হক তা আমার বউ মেয়ে পাবে না কেন?

সুমনা কী রকম বিষণ্ণ গলায় বললো— কী জানি রঞ্জন। সব পেলে যদি আমাদের ভুলে যাও! বড় ভয় করে আজকাল। যতদিন তুমি ওই জায়গাটা থেকে না ফেরো, আমি প্রাণ হাতে করে বসে থাকি।— বলতে বলতে তার গলা ধরে এল।

রঞ্জন তার মাথাটা বুকে টেনে নিল, বললো— সুমন, তোমার হক ওই শাকম্ভরীর দ্বীপ থেকে আমি ছিনিয়ে আনবোই। সম্ভবত এবারই। জাস্ট হ্যাভ ফেথ ইন মি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *