শাকম্ভরীর দ্বীপ – ১৬

১৬

সামনে মাতলা ছোট ছোট ঢেউ তুলে বয়ে যাচ্ছে। এত চওড়া এখানটা যে ও পাড় দেখা যায় না। পুরো খোলা আকাশ, নীল। তার ছায়া পড়েছে, খোলা জলের সঙ্গে মিশছে আকাশ-নীল। ভালুকটিলার ওপর থেকে সুন্দরবনের হাওয়া যেন আরও নিষ্কলুষ। একটা শ্বাস নিলেই বোঝা যায় নতুন জীবন ঢুকে গেল ভেতরে। অথচ এইখানে একটা প্রাণশক্তিতে ভরপুর জীবন হারিয়ে গেছে। বিশ্বাস করা যায় না— এই জীবনদায়ী স্রোতস্বতী কারও প্রাণ নিতে পারে। জলের ভেতর লুকিয়ে থাকতে পারে বীভৎস মৃত্যু। টিলার ওপরটা ফুট ছয়েক মতো চতুষ্কোণ জায়গা বেশ পেটানো। তার ওপর এখন অবশ্য অনেক আগাছা, বুনো ফুল।

এইখানটায় টেলিস্কোপটা ফিট করত ও। একেক দিন সারারাত তারা দেখত।— অর্জুন বললো।

টেলিস্কোপটা এখন কোথায়? খুব কেজো গলায় সুমনা জিজ্ঞেস করলো।

বাড়িতেই আছে। ওটার বিভিন্ন পার্টস তো সব লাগাতে হয়!

আপনাদের আর কারো এ হবি ছিল না? কারও সঙ্গে আলোচনা হত না?

একটু ইতস্তত করে অর্জুন বললো— ন্ নাঃ।— তাড়াতাড়ি যোগ করল— আমার হবি এইসব গাছ পালা, পশুপাখি…আর দাদা? দাদা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে হিউম্যান। বড় তো! দাদা, অর্জুনের গলায় সামান্য আবেগ এসে যায়…দাদাই আমাদের তিন ভাইকে আগলে আগলে রেখেছে ছোট থেকে। য়ু নো হোয়াট আই মীন!

সুমনা কথা বললো না।

বাবা মা যখন মারা গেলেন আমরা দিল্লিতে। আমাদের মামার বাড়ি কাছেই এখন যেখানে নয়ডা গড়ে উঠেছে। তখন সেরকম কিছু ছিল না। মামার বাড়িতে সামহাউ আমাদের কোনও আদর ছিল না। দাদাই তখন…সুমনা…আমাদের জীবনে যা কিছু স্নেহ মমতা, মূল্যবোধ আমরা দাদার কাছ থেকেই পেয়েছি।

ঠাকুমার কাছ থেকে নয়?

অর্জুন একটু চুপ করে থেকে বললো— ঠাকুমার মধ্যে কতকগুলো ছেলেমানুষি আছে সুমনা, আশা করি বুঝতে পারছো। দাদা আরও অনেক ম্যাচিওর, লাভিং। ঠাকুমাকেই বা কে সামলায়? সান্ত্বনা দেয়? ওই দাদাই তো।

সুমনার হঠাৎ সরিতের একটা কথা মনে পড়ে গেল।— রাজেশ্বরী দেবীকে তুমি চেনো না। জানো না…। সে-ও কি তবে ওই ছেলেমানুষের দলেই পড়ে

জোর করে নিজেকে আবার বর্তমানে ফিরিয়ে আনল সে। বললো— সারা রাত বাড়ি এলো না, কেউ খোঁজ করলেন না!

অর্জুন বললো— তুমি আজকে ব্রেকফাস্ট কোথায় খেয়েছ?

নিজের ঘরে।

আমাদের ওইরকমই নিয়ম, ব্রেকফাস্ট ঘরে ঘরে যায়। লাঞ্চ টাইমের আগে বোঝাই যায়নি ও মিসিং। সকালে বাড়ি না ফেরাটাও ওর পক্ষে খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। অনেক হবি ছিল। নিজের ইচ্ছেমতো স্টোর থেকে ফ্রিজ খুলে কিছু খেয়ে নিল।

সুমনা বললো— জল থেকে ও উঠতে পারলো না, একটা অ্যাথলিট— এটা আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না….অর্জুন…দা।

এতক্ষণ প্রদীপ অন্যদিকে ছিল। এবার তার গলা শোনা গেল। হয়তো কুমিরটা ওখানেই… তখনই… তীব্র যন্ত্রণায় তার গলা আটকে গেল। সে দু হাতে মুখ ঢাকলো আঙুলের ফাঁক দিয়ে চোখের জল বেরিয়ে আসছে। সুমনা আর পারছে না নিজেকে ধরে রাখতে। সে হঠাৎ গুমরে গুমরে কাঁদতে লাগলো রঞ্জন! রঞ্জন! ওহ্ হোয়াই? হোয়াই? অর্জুন আস্তে আস্তে ওকে এসে ধরলো— সুমনা, দেখা তো হল, নিচে চল এবার।

প্রদীপ আগে আগে নেমে যাচ্ছে, তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল একবার। অর্জুন সুমনাকে ছেড়ে ছুটে গেল দাদার কাছে, খুব যত্নে ওঠালো— দাদা প্লিজ দেখে চলো।

অর্জুন আবার ফিরে গেল সুমনার কাছে।

সুমনা কান্না সামলিয়ে বললো— আমি ঠিক আছি। আপনারা প্লিজ চলে যান। আমি এখানে একটু একা থাকতে চাই। রতনলাল তো আছে!

অর্জুন বললো— তা হয় না। আমরা তোমাকে এখানে কিছুতেই একা ছাড়তে পারি না। জায়গাটা এখন ভালো নেই।

ভয় নেই। সুমনা বললো— আমি সুইসাইড করতে যাচ্ছি না। সুবিচার খুঁজছি। জাস্টিস। রঞ্জনের জন্যে। সে যে ভাবেই হোক। প্লিজ…! আপনাদের কারো একবারও মনে হয়নি আমি স্ত্রী। আমার রাইট আছে। তাকে দেখবার। জানবার।

ওহ গড, সুমনা— অর্জুন কাতর গলায় বললো— সে বীভৎস দৃশ্য তুমি তোমাকে…না…আমরা পারি নি। উচিত ছিল না। আই হ্যাভ নো রিগ্রেট ফর দ্যাট। অর্জুন যেন কিছুক্ষণের মধ্যেই সুমনার খুব অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে। সত্যিই হয়ে উঠেছে? না চেষ্টা? সে কি কিছু গোপন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে? সুমনা এত সহজে ভোলবার পাত্র নয়।

দূরে গাঙচিল উড়ে যাচ্ছে। বহুদুরে একটা পালতোলা নৌকা। জঙ্গল থেকে এই দিনের বেলাও অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ উঠছে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সুমনা। চোখ বুজিয়ে প্রার্থনা করতে যায়। যিশুকে স্মরণ করতে যায় কিন্তু সমস্ত ছাপিয়ে ভেসে ওঠে একটা কুমির। পৌরানিক ড্রাগন বা লিভিয়াথানের মতো বিরাট, ভয়াবহ। একটা মানুষের পা ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সভয়ে চোখ খুলে সে বলে ওঠে— ওহ গড

বাড়ি ফিরে সুমনা চলে গেল নিজের ঘরে। প্রদীপ আর অর্জুন ঢুকলো নিচের তলার পার্লারে। সেখানে দুই বউ খুব হাসিখুশি, গল্প করছে। সামনে টেবিলের ওপর তাস সাজানো। অর্থাৎ ওরা কিছুক্ষণ তাসই খেলেছে।

রাখী বলছিল— রঙ্গিলা টাইপের। আমার তো ফ্যানটাসটিক লাগত। অল্প দিনের মধ্যেই জমে গিয়েছিল।

শর্মিষ্ঠা বললো— আমি তো ওকে ভীষণ মিস করি। একেবারে অন্যরকম। দু ভাই ঢুকলো। তাদের মুখ দেখে এদের হাসি উবে গেল।

কী হয়েছে তোমাদের? শর্মিষ্ঠা জিজ্ঞেস করলো।

প্রদীপ ধপ করে বসে পড়ল। অর্জুন তার পাশে।

অর্জুন বললো— কী আবার হবে? তোমরা কখন ফিরলে টের পাইনি তো। রাখী বললো— কী করে টের পাবে? শোকাকুলা ভ্রাতৃবধূ না কী বলে। তাকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত ছিলে।

তুমি কি কখনও সীরিয়াস হবে না?— অর্জুন বিরক্ত হয়ে বললো। রাখী গম্ভীর।— অর্জুন! অ্যাজ ইট ইজ তোমাদের ফ্যামিলিতে জীবনটা এমনিতেই খুব গুরুগম্ভীর গুমোট। চারদিকে যেন সব সময়ে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছে। তোমার ওই পাগলাটে ঠাকুমাকে যে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে হচ্ছে, এটাই কি যথেষ্ট নয়? যখন শিলিগুড়ি কি দার্জিলিংয়ে থাকি তখন তো তোমার এ মুড দেখি না!

শর্মিষ্ঠাও ঝনঝন করে উঠল— ঠিক বলেছিস। এলাহাবাদে প্রদীপ একেবারে অন্য মানুষ। অর্জুনের মতো মিশুক নয়, রঞ্জনের মতো রংদার নয়। কিন্তু আমরা কত গান বাজনার আসরে যাই, ছবি দেখি। জানিস তো, তোর দাদা আবার লম্বা লম্বা কবিতা লেখে, শর্মি শর্মি করে পাগল করে দেয়। অথচ এখানে যেন চোখেই দেখতে পায় না। আচ্ছা প্রদীপ, এখানে তো যথেষ্ট তোমরা যাকে বল নেচার, পাখি-টাখি, গাছ-টাছ, এখানে এলে তোমার কবিতা শুকিয়ে যায় কেন বলো তো?

রাখী বললো— কেন আর? রাজেশ্বরী ঠাকুরাণীর আঁচে। ভালো নাম দিয়েছে রঞ্জনের বউ। ম্যাডাম। ভুলেও ঠাকুমা-টাকুমা বলে না।

এই সময়ে প্রবীর বললো— শর্মিষ্ঠা, রাখী ভুলে যাচ্ছো, ঠাকুমা আমাদের অত্যন্ত দুর্গত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে বুকে করে মানুষ করেছেন। অর্জুনের মনে থাকবার কথা নয়। কিন্তু আমাদের মা-বাবা সকলের অমতে বিয়ে করেছিলেন বলে মায়ের প্র্যাকটিক্যালি কেউ ছিল না। মামার বাড়িতে কী বলে…কেউ আমাদের মানুষে চোখে দেখত না।

শর্মিষ্ঠা শ্লেষের গলায় বললো— কেন? তোমাদের রাজরাজেশ্বরী ঠাকুমা? তিনিও তো ত্যাগই করে ছিলেন।

প্রদীপ বললো— হ্যাঁ করেছিলেন।

এই কথায় কথায় জ্যাগ করাটা ওঁর খুব আসে। ছেলেকে ত্যাগ করলেন বিয়ে করলো বলে। নাতিকে ত্যাগ করলেন বিয়ে করলো না বলে। কত রঙ্গই দেখবো।

প্রদীপ বললো— আমার কথা শেষ করতে দাও। সে সময়ে ঠাকুমা নির্জনবাসী, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না।

সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি, কেন?

প্রদীপ আনমনে বললো— এসব ঠাকুমার ব্যক্তিগত কথা। আলোচনা করা ঠিক নয়। উনি বড় অসুখী মানুষ। ঠাকুর্দা বোধহয়…তেমন…।

অর্জুন বললো— পরিষ্কার ভাবে বলেন নি কোনদিন। কিন্তু বাবাকে উনি খুব আঁকড়ে ধরে ছিলেন। সেই বাবা ওঁর অমতে বিয়ে করতে ভীষণ আঘাত পান।

শর্মিষ্ঠা বললো— হ্যাঁ স্নেহ, কিন্তু বাঘিনীর স্নেহ।

রাখী বললো— বাঘিনীও তো একটা বয়সের পর শাবককে চরে খেতে দেয়। প্রদীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো— তোমাদের কিছু বোঝাতে যাওয়া বৃথা। কোনও লাভ নেই।

শর্মিষ্ঠা বললো— যাই বলো, তুমি যে ওঁর পেয়ারের নাতি হওনি, সেটা আমার লাক? ওরে ব্বাপ! রঞ্জন সইতো কী করে…

অর্জুন বললো— রঞ্জন ঠাকুমাকে দারুণ ভালোবাসতো। তোমরা ওই পারস্পরিক টানের প্রকৃতিটা কখনও বোঝোনি। ইউ আর ফুলস।

শর্মিষ্ঠা হালকা গলায় বললো— নিজের বউকে বলো যা খুশি, কিন্তু বউদিকেও তাই বলে ফুল-টুল বলবে?

অর্জুন বললো— স্যরি বউদি। ডোন্ট মাইন্ড। তবে রাখী হয়ত বেশি, তুমি একটু কম। তফাতটা ডিগ্রির।

এই সময়ে তেজস্বিনী ঢুকল।

রাখী বলে উঠলো— এই আরেকজন এলেন। ইন ইটারন্যাল মোর্নিং। কাম অন জিনি। এইসব ভেক ছাড়ো? ছেড়ে দাও তো! লীড আ নর্মাল লাইফ।

তেজস্বিনী উত্তর দিল না। জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বললো— মেঘ জমছে। মনে হচ্ছে খুব বৃষ্টি হবে।

রাখী বললো— ইটস হাইটাইম।

তেজস্বিনীর গলায় শ্লেষ…বৃষ্টির মধ্যে এই হানাবাড়িতে আনইন্টারেস্টিং কতকগুলো মানুষের মধ্যে বসে থাকতে তোমার ভালো লাগবে?

একটু থেমে বললো— এই বৃষ্টির মধ্যে ওপার থেকে খাবার-দাবার, টাটকা মাছ, চিকেন, মাটন, হাঁসের মাংস বলেছিলেন, পার্কস্ট্রিট থেকে কেক। কী যে মুশকিল! ভালো কথা। অর্জুন ওই সুমনা মেয়েটি কিন্তু এখনও ফেরে নি।

ওকে দেখো নি?

অর্জুন বললো— দেখেছি।

কোথায়?

অর্জুন তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে বললো— ভালুকটিলা।

সে কী? কেন?

অর্জুন জিজ্ঞেস করলো— তোমার অসুবিধে আছে?

তেজস্বিনী একবার তার দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

শর্মিষ্ঠা হাসতে হাসতে বললো— ডাকাতকে বলে টাকার সিন্দুক পাহারা দাও। ভালো রে ভালো। হেসে বাঁচি না।

প্রদীপ ভর্ৎসনার সুরে বললো— ডোন্ট বি ভালগার শর্মি।

রাখী বললো— আই বেট দাদা। রঞ্জনের বউকে একা পেলে জিনি—

তার কথা শেষ হল না। অর্জুন চিৎকার করে বলে উঠলো— আঃ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *