শাকম্ভরীর দ্বীপ – ১৭

১৭

কড়কড় করে বাজ ডেকে খুব ধুমধাম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় সত্যিই। চারদিক ঝাপসা হতে হতে কিছু আর দেখা যায় না। গাছপালা, আকাশ, নদী সব একইরকম ধূসর রঙের। জানলার ধারে বসে বসে বৃষ্টি দেখে সুমনা। একেবারে হারিয়ে যায়। বৃষ্টি! বৃষ্টি, বজ্রপাত, শীত, আকাশ, জঙ্গল, নদী এসব একরকম রয়ে যায়। নিয়মে চলে। পরিবর্তনহীন। খালি মানুষ, মানুষের জীবন বদলে বদলে যায়। এখন টুকটুক কী করছে? সিস্টার জেনের কাছে? না কি সরিৎদা ওকে বাড়ি নিয়ে গেছে। সরিৎদার মাকে ও দিমা বলে। উনি খুব ভালোবাসেন টুকটুককে। ওখানে গেলে টুকটুক মাকেও ভুলে যায়। টুকটুক, তোর বাবার খুনের কিনারা করতে এসে যদি আমি নিজেই খুন হয়ে যাই? আর আমাকে দেখতে পাবি না। তো মায়ের মতোই অনাথ, একলা হয়ে যাবি। না না। সরিৎদা থাকতে তুই কখনও, কিছুতেই অনাথ হবি না। এই বিশ্বাস আমার আছে। তাকে নিবৃত্ত করবার জন্যে সরিৎদা কী না করেছে। শেষকালে এ-ও বলেছে, সুমনা। তোমার কি শেষে রাজেশ্বরী দেবীর সম্পত্তির লোভ হল? টুকটুক কেন ও সম্পত্তি নেবে? ওর জন্যে তুমি কি যথেষ্ট নও? আমি? আমি কি নেই?

ক্রমে রাত হচ্ছে। আজ লাঞ্চের সময়েও রাজেশ্বরী অনুপস্থিত ছিলেন। ডিনারের সময়ে তো সুমনা যায়ই নি। রতনলাল তার খাবার এনে দিয়েছিল। পরে তেজস্বিনী এসে একবার খোঁজ নিয়ে যায়।

বৃষ্টির ছাট আসছে। জানলা বন্ধ করে সুমনা। কোথা থেকে পিয়ানোর বাজনা ভেসে আসছে না? অপূর্ব বাজনা। সে চার্চ কয়ারে যা বাজাত সেগুলো সবই ক্যারল বা সাম। এই বাজনাটা শুনতে শুনতেই সে বুঝতে পারে এটা বোধহয় কোনও ক্লাসিক্যাল নাম্বার। সে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বেঠোফন, মোৎসার্ট কী! মোৎসার্টের কী! সে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। করিডর দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে তার রাত পোশাকেই। চোখে উদাস ভাব। সব দরজা বন্ধ। প্রত্যেক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে কান পাতে। অবশেষে একটা ঘরের দরজার ওপর টোকা দেয়। দরজা খুলে দেয় শর্মিষ্ঠা। অবাক হয়ে গেছে। পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। কিন্তু ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করে থাকতে ইশারা করে। জানলার দিকে মুখ করে একটা নিচু চৌকিতে বসে প্রদীপনারায়ণ। তার হাতে সরোদ। গভীর কোনও সুরে বাজছে। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে যাচ্ছে সরোদ। মাঝে মাঝে মিশে যাচ্ছে। শর্মিষ্ঠা তাকে বসতে ইঙ্গিত করে। সুমনা দাঁড়িয়েই থাকে। দাঁড়িয়েই থাকে। দাঁড়িয়েই থাকে কিছুক্ষণ পর সে আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। সুর তবু ছাড়ে না, কোথাও আরও একটা ঘর থেকে সুর ভেসে আসছে। সে আন্দাজে আন্দাজে পনেরো নম্বর ঘরে এসে পৌঁছোল, টোকা মারলো। দরজা খুলে দিল গীতা নামে নার্সটি। উল্টো দিকে পিয়োনোয় বসে রাজেশ্বরী। আঙুলগুলো উঠছে পড়ছে। অপূর্ব সুরলহরী বেরোচ্ছে। সে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর চেয়ার ঘুরিয়ে তার মুখোমুখি হলেন রাজেশ্বরী।

সুমনা বললো— মুনলাইট সোনাটা বাজাচ্ছিলেন?— তার স্বর আর্দ্র। সে এখন চিনতে পেরেছে সুরটা।

ঘাড় নাড়লেন উনি।

তুমি ভালোবাসো?

সে ঘাড় নাড়লো— সামান্য বাজাতাম। চার্চ কয়্যারে। শেখার ইচ্ছে ছিল। আমাদের ছোট্ট সংসার। পিয়ানো কেনার ক্ষমতা ছিল না তো!

রাজেশ্বরী নরম গলায় বললেন— সুমনা, মাই ব্রেভ গার্ল! তুমি আমার পাঠানো টাকা ফিরিয়ে দিলে কেন? প্রত্যেকবার পাঠিয়েছি। প্রত্যেকবার ফেরৎ পাঠিয়েছো।

সুমনা নালিশহীন গলায় বললো— ও জীবিত থাকতে আপনি তো আমায় মেনে নেননি! কীভাবে নেবো?

আই অ্যাপ্রিশিয়েট ইয়োর স্পিরিট। কিন্তু মাই গার্ল, বিশ্বাস করো প্রথমটা খুবই রাগ হয়েছিল। তারপর যখন প্রদীপ এসে বললো— ভারী চমৎকার, হাসিখুশি, আন্তরিক ধরনের মেয়ে তখন…তখন আমি বারবার রঞ্জনের সঙ্গে তোমায় আসতে বলেছি। সে চিঠি কেন পৌঁছলো না? মিস্ট্রি। অনেক অনেকগুলো জট বেঁধে রয়েছে। কী করে যে খুলি?

দাদা আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন? আমি তো বুঝতে পারিনি।

অনেকবার। প্রদীপ তোমাকে খুব স্নেহ করেছিল। আমি প্রদীপের জাজমেন্টে বিশ্বাস করি। তোমার ছবি আছে আমার কাছে। একেবারে বাচ্চা, এখন তো অনেক বড়, রাগী হয়ে গেছ। তখন একটা হরিণছানার মতো ছিলে…কে? কে? এই জট পাকালো। আমার সুখের সংসার কে ভাঙল? কে? কে?…

উনি নিজের রগ টিপে ধরলেন। চোখ বোজা। বোঝা যাচ্ছেনা এই অন্ধকারে উনি নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছেন, না নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। গীতা ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে।

সুমনা বেরিয়ে এল। এখনও কোথা থেকে ভেসে আসছে সঙ্গীত। পিয়ানো নয়। অরগ্যান। সুমনা স্বপ্নচালিতের মতো চলেছে। কোন ঘর? কোন ঘর! শব্দ অনুসরণ করে সে আরেকটা ঘরের সামনে দাঁড়ায়। কান পেতে শোনে। অরগ্যান বাজছে ঝড়ের মতো, তার পরেই আছড়ে পড়ছে কান্না, কেউ হাহাকার করে কাঁদছে।

–এ কী সুমনা? তুমি এত রাতে? এখানে? তার সামনে অর্জুন দাঁড়িয়ে।

–কার ঘর এটা? মিউজিক শুনলাম…

–এটা তো জিনির ঘর। …কোনও কোনও দিন রাতে এমনি বাজে। দাদা বাজায়, ঠাকুমা বাজান, জিনি বাজায়, রঞ্জন…রঞ্জনও বাজাতো ফ্রুট। আমি ভালোবাসি মাউথ অরগ্যান। উই আর আ মিউজিক্যাল ফ্যামিলি। কিন্তু এত রাতে এমন একা একা বেরিয়ে ঠিক করো নি। যাও, ফিরে যাও। চলো আমি যাচ্ছি।

সুমনা যন্ত্রচালিতের মতো এসে ঘরে ঢুকলো। আলো জ্বাললো, তারপরেই চিৎকার— একটা সাপ তার খাটের ওপর ফণা তুলে দুলছে।

অনেক পায়ের শব্দ, চিৎকার…তার দরজায় দমাদম ধাক্কা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *